Table of Contents
ভূমিকা
বৈজ্ঞানিক যুগেও ধর্মীয় কাহিনিগুলো প্রায়ই এমন দাবি করে যা প্রকৃতির মৌলিক নিয়মের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। ইসলামী ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মাংস পচন ধরার সূচনা নাকি হয়েছিল ইহুদিদের “আল্লাহর অবাধ্যতার” কারণে। বলা হয়—এর আগে পৃথিবীতে মাংস কখনোই পচতো না; কিন্তু যখন কিছু ইহুদি আল্লাহর দেওয়া সালওয়া পাখির মাংস জমা করে রাখে, তখন আল্লাহ রাগ করে গজব হিসেবে “পচন” নামক প্রক্রিয়াটি সৃষ্টি করেন। এই বিশ্বাস শুধু অযৌক্তিক নয়, বরং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে মৌলিক আবিষ্কারগুলোর সঙ্গেও সরাসরি বিরোধী।
ইসলামী রূপকথার উৎস
এই গল্পের মূল পাওয়া যায় কোরআনের সূরা বাকারা (২:৫৭–৬১) তে এবং তার ইসলামি তাফসিরে (বিশেষত তাফসির ইবন কাসীর ও আল-তাবারী)। কোরআনে বলা হয়েছে—[1]
আমি মেঘ দ্বারা তোমাদের উপর ছায়া বিস্তার করলাম, তোমাদের কাছে মান্না ও সালওয়া প্রেরণ করলাম, (আর বললাম)তোমাদেরকে যা দান করেছি তাথেকে বৈধ বস্তুগুলো খাও, আর মূলত তারা আমার প্রতি কোন যুলম করেনি, বরং তারা নিজেদের প্রতিই যুলম করেছিল।
— Taisirul Quran
এবং আমি তোমাদের উপর মেঘমালার ছায়া দান করেছিলাম এবং তোমাদের প্রতি ‘মান্না’ ও ‘সালওয়া’ অবতীর্ণ করেছিলাম; আমি তোমাদেরকে যে উপজীবিকা দান করেছি সেই পবিত্র জিনিস হতে আহার কর; এবং তারা আমার কোন অনিষ্ট করেনি, বরং তারা নিজেদের অনিষ্ট করেছিল।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর আমি তোমাদের উপর মেঘের ছায়া দিলাম এবং তোমাদের প্রতি নাযিল করলাম ‘মান্না’* ও ‘সালওয়া’**। তোমরা সে পবিত্র বস্ত্ত থেকে আহার কর, যা আমি তোমাদেরকে রিয্ক দিয়েছি। আর তারা আমার প্রতি যুলম করেনি, বরং তারা নিজদেরকেই যুলম করত। *‘মান্না’ এক ধরণের সুস্বাদু খাবার, যা শিশিরের মত গাছের পাতায় ও ঘাসের উপর জমে থাকত। আল্লাহ বিশেষভাবে তা বনী ইসরাঈলের জন্য প্রেরণ করেছিলেন।
— Rawai Al-bayan
আর আমরা মেঘ দ্বারা তোমাদের উপর ছায়া বিস্তার করলাম এবং তোমাদের নিকট ‘মান্না’ ও ‘সাল্ওয়া’ [১] প্রেরণ করলাম। (বলেছিলাম), ‘আহার কর উত্তম জীবিকা, যা আমরা তোমাদেরকে দান করেছি’। আর তারা আমাদের প্রতি যুলুম করেনি, বরং তারা নিজেদের প্রতিই যুলুম করেছিল।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
ইসলামী ব্যাখ্যা অনুযায়ী “সালওয়া” ছিল এক প্রকার পাখি যার মাংস ইহুদিদের জন্য পাঠানো হয়েছিল। কিছু ব্যাখ্যাকার (যেমন: কাতাদা ও মুজাহিদ) বলেন, কিছু ইহুদি এই মাংস আল্লাহর নিষেধ সত্ত্বেও জমা রাখে, যার ফলে আল্লাহ তাদের ওপর অভিশাপ পাঠান, এবং তখন থেকেই রান্না করা মাংস পচতে শুরু করে। এর পূর্ব পর্যন্ত মাংস রান্না করে হাজার বছর রেখে দিলেও নাকি পচন ধরত না। অর্থাৎ ইসলামিক ব্যাখ্যানুযায়ী, পচনপ্রক্রিয়া কোনো প্রাকৃতিক জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া নয়, বরং একটি “আল্লাহর শাস্তি”। আসুন মুফতি ইব্রাহীমের বক্তব্য শুনে নিই,
এবারে এই সম্পর্কিত সহিহ হাদিস এবং হাদিসের সাথে ব্যাখ্যা তুলে দেয়া হলো [2] [3]
সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছদঃ ২০২৩. মহান আল্লাহর বাণীঃ আর আমি ওয়াদা করেছিলাম মুসার সাথে ত্রিশ রাতের … আর আমিই মু’মিনদের মধ্যে সর্বপ্রথম। (৭ঃ ১৪২-৪৩) বলা হয়, دكة অর্থ ভুকম্পন। আয়াতে উল্লেখিত فَدُكَّتَا দ্বিবচন বহুবচন অর্থে ব্যবহৃত। এখানে الْجِبَالَ শব্দটিকে এক ধরে নিয়ে الأَرْضَ সহ দ্বিবচনরূপে دُكَّتَا বলা হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহর বাণীঃ كَانَتَا رَتْقًا এর মধ্যে سمَوَاتِ এক ধরে দ্বিবচনে উল্লেখ করা হয়েছে। كُنَّ رَتقا বহুবচন বলা হয়নি। رَتْقًا অর্থ পরস্পর মিলিত। أُشْرِبُوا অর্থাৎ তাদের হৃদয়ে গোবৎস প্রীতি নিশ্চিত করেছিল। বলা হয় ثَوْبٌ مُشَرَّبٌ অর্থ রঞ্জিত কাপড়। ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন, انْبَجَسَتْ অর্থ প্রবাহিত হয়েছিল। نَتَقْنَا الْجَبَلَ অর্থ আমি পাহাড়কে তাদের উপর উপচিয়ে ছিলাম।
৩১৬০। আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ জু‘ফী (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি বনী ইসরাঈল না হত, তবে গোশ্ত পচন ধরত না। আর যদি (মা) হাওয়া (আলাইহিস সালাম) না হতেন, তাহলে কোন সময় কোন নারী তাঁর স্বামীর খেয়ানত করত না।
Narrated Abu Huraira: The Prophet (ﷺ) said, “Were it not for Bani Israel, meat would not decay; and were it not for Eve, no woman would ever betray her husband.”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছদঃ ২০০০. আদম (আঃ) ও তাঁর সন্তানদের সৃষ্টি।
৩০৯৫। বিশ্র ইবনু মুহাম্মদ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনুরূপ বর্ণিত আছে। অর্থাৎ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বনী ইসরাঈল যদি না হত তবে গোশত দুর্গন্ধযুক্ত হতো না। আর যদি হাওয়া (আলাইহিস সালাম) না হতেন তবে কোন নারীই তাঁর স্বামীর খেয়ানত করত না।
Narrated Abu Huraira: The Prophet (ﷺ) said, “But for the Israelis, meat would not decay and but for Eve, wives would never betray their husbands.”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এবারে আসুন নসরুল বারী থেকে দেখে নিই [4]

বৈজ্ঞানিক সত্য: পচন হলো জীবাণুর প্রাকৃতিক কার্যক্রম
আধুনিক মাইক্রোবায়োলজি ও বায়োকেমিস্ট্রি প্রমাণ করে যে খাদ্যের পচন (Decomposition) একটি প্রাকৃতিক জৈব প্রক্রিয়া, যার সঙ্গে ধর্ম বা নৈতিকতা কোনো সম্পর্ক নেই। এই পচন ধরে কোনভাবেই কোন আল্লাহর নির্দেশের তোয়াক্কা করে না। এর মূল কারণ হলো ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস ও এনজাইমের ক্রিয়া।
- ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস:
প্রকৃতিতে কোটি কোটি ক্ষুদ্রজীব আছে, যেমন Pseudomonas, Clostridium, Bacillus, Aspergillus প্রভৃতি। এরা মৃত প্রাণীদেহ বা খাদ্য পদার্থের প্রোটিন, ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেট ভেঙে ফেলে। এর ফলে গ্যাস, দুর্গন্ধ ও রঙ পরিবর্তন ঘটে — এটিই পচন। - এনজাইম্যাটিক ক্রিয়া:
রান্না করা বা কাটা মাংসের কোষ যখন মৃত হয়, তখন কোষের ভেতরকার প্রোটিওলাইটিক এনজাইম (যেমন ক্যাটেপসিন) নিজেরাই প্রোটিন ভাঙতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুরু হয়, কোনো “গজব” লাগেনা। - অক্সিজেন ও তাপমাত্রা:
উচ্চ তাপমাত্রা ও অক্সিজেনের উপস্থিতি ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে, ফলে মাংস দ্রুত পচে।
ঠান্ডা জায়গায় (যেমন: রেফ্রিজারেটর) রাখলে ব্যাকটেরিয়া নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, তাই সংরক্ষণ সম্ভব হয়।
এই নীতিগুলো ১৮৫৭ সালে Louis Pasteur-এর বিখ্যাত পরীক্ষাগুলো দ্বারা প্রমাণিত হয়েছিল, যিনি দেখিয়েছিলেন— [5]
জীবাণু ছাড়া কোনো পচন ঘটে না।
ইসলামী ব্যাখ্যার অযৌক্তিকতা
১. “ইহুদিরা মাংস পচনের কারণ”—ঐতিহাসিকভাবে কাল্পনিক রূপকথা
জীবনের সূচনা থেকেই পৃথিবীতে জৈব অবক্ষয় (decomposition) বিদ্যমান। প্রাণী ও উদ্ভিদের পচনের মাধ্যমে কার্বন, নাইট্রোজেন ও অন্যান্য উপাদান পরিবেশে পুনঃচক্রায়িত হয়। যদি পচন প্রক্রিয়া ইহুদিদের ঘটনার আগে না থাকতো, তবে পৃথিবী মৃতদেহ ও জৈব বর্জ্যে ভরে যেত—জীবনই টিকে থাকতে পারত না। তাই এই ধরণের অন্ধবিশ্বাসের পক্ষে কোন যুক্তি নেই।
২. পচন একটি পরিবেশগত প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া।
এটি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। যদি পচন না ঘটত, তাহলে মৃত প্রাণীর জৈব উপাদান কখনোই পুনর্ব্যবহৃত হতো না—যা জীবচক্র (biogeochemical cycle) কে ভেঙে ফেলত। অর্থাৎ জীবজগতের টিকে থাকার পেছনে পচন ধরা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।
৩. আল্লাহর গজব তত্ত্ব বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গত।
ইসলামিক গল্পে “গজব” হিসেবে যে পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, তা আসলে কোটি বছরের প্রাকৃতিক জীববৈজ্ঞানিক নিয়মের অংশ।
ব্যাকটেরিয়া ও এনজাইমের বিবর্তন এই পৃথিবীতে ইহুদি জাতির আগেই ছিল (প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন বছর আগে থেকে জীবাণু বিদ্যমান)।
৪. সব দুর্দশার জন্য ইহুদীরাই দায়ী – এই বর্ণবাদী ধারণার বিস্তার।
পৃথিবীর নানা প্রান্তে নানা উপকথায় ইহুদিদেরকে ভিলেন বা বদ চরিত্র হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে তাদের সম্পর্কে জাতিগত ঘৃণা এবং বিদ্বেষের চর্চা প্রায় কয়েক হাজার বছর ধরেই বিদ্যমান। পৃথিবীর সকল দুঃখ দুর্দশার জন্য ইহুদিরাই দায়ী, সকল কিছুই ইহুদিরাই নিয়ন্ত্রণ করছে, এগুলো সব যুগে সবচাইতে জনপ্রিয় ষড়যন্ত্রতত্ত্ব। এই ইসলামিক গল্পেও সেই ষড়যন্ত্রতত্ত্বেরই পরিষ্কার ছায়া পাওয়া যায়।
ধর্মীয় বিশ্বাস ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার সংঘাত
এ ধরনের কাহিনি ধর্মকে প্রকৃতির যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মানুষ যখন ভাবে—“রান্না করা মাংস পচে কারণ আল্লাহ রেগে গিয়েছিলেন”—তখন সে কখনো বুঝতে চায় না যে পচনই জীবনের পুনর্জন্মের প্রক্রিয়া। বিজ্ঞান অনুসারে, মৃত্যু কোনো গজব নয়; বরং জীবনচক্রের অপরিহার্য ধাপ, যা পরিবেশে শক্তি ও উপাদানের ভারসাম্য রক্ষা করে।
এ ধরনের গল্প সমাজে বিজ্ঞানবিরোধী মনোভাব তৈরি করে, এবং বাস্তব অনুসন্ধানকে “অবিশ্বাস” হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলাফল—অন্ধবিশ্বাস, অগ্রগতিহীনতা ও জ্ঞানের স্থবিরতা।
উপসংহার
ইসলামের এই কাহিনি প্রকৃতির নিয়মকে ধর্মীয় রূপকে পরিণত করে। “রান্না করা মাংস পচন শুরু হলো ইহুদিদের কারণে” — এই ধারণা শুধু হাস্যকর নয়, বরং বিপজ্জনক, কারণ এটি বিজ্ঞান ও ইতিহাস উভয়েরই পরিপন্থী। একইসাথে ইহুদিবিদ্বেষী, বর্ণবাদী। আজকের দিনে আমরা জানি, পচন প্রক্রিয়া হলো পৃথিবীর পরিবেশব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ, যা ছাড়া জীবন টিকে থাকতে পারে না। বিজ্ঞান আল্লাহভীতি নয়, বরং প্রকৃতির নিয়ম সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে শেখায়—যা পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, কোনো গজব বা অলৌকিকতার ওপর নয়।
[ai_review]
তথ্যসূত্রঃ
- সূরা বাকারা (২:৫৭–৬১) ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩১৬০ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩০৯৫ ↩︎
- সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী, ৭ম খণ্ড, আরবি-বাংলা, সহজ তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, হযরত মাওলানা মুহাম্মদ উসমান গনী, আল কাউসার প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪১৩, ৪১৪ ↩︎
- Louis Pasteur, Mémoire sur les corpuscules organisés existant dans l’atmosphère, 1861 ↩︎
