জর্জ বার্নার্ড শ’ ও ইসলামি প্রচারকদের ‘জালিয়াতি’র ব্যবচ্ছেদ

ভূমিকা

সামাজিক মাধ্যম এবং ইসলামি প্রচারণার প্ল্যাটফর্মগুলোতে একটি সাধারণ কৌশল লক্ষ্য করা যায়: নিজেদের ধর্মীয় দাবির সত্যতা প্রমাণের জন্য পশ্চিমা বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী বা সাহিত্যিকদের নাম ব্যবহার করা। যখন এমন কোনো প্রকৃত প্রশংসা পাওয়া যায় না, তখন তারা নির্লজ্জভাবে জাল উদ্ধৃতি তৈরি করে প্রচার করে। এই আচরণের মূলে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক হীনমনত্ব—যেখানে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের অভ্যন্তরীণ যৌক্তিকতা বা প্রমাণের অভাবে বাইরের কর্তৃপক্ষের স্বীকৃতির উপর নির্ভর করতে হয়। এই প্রবণতা শুধু বানোয়াট গল্পই জন্ম দেয় না, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক সততার চরম অভাবকেও প্রকাশ করে। আইরিশ নাট্যকার এবং নোবেল বিজয়ী জর্জ বার্নার্ড শ (George Bernard Shaw) এই ধরনের জালিয়াতির অন্যতম প্রধান শিকার।

এই প্রবন্ধে এই অপপ্রচারের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো, যেখানে বিশেষভাবে মনস্তাত্ত্বিক হীনমনত্ব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার দিকগুলো আলোচনা করা হয়েছে।


প্রচারিত বানোয়াট উদ্ধৃতি ও এর প্রসার

ফেসবুক, ইউটিউব এবং বিভিন্ন ইসলামি ওয়েবসাইটে বার্নার্ড শ-এর নামে নিম্নলিখিত উদ্ধৃতিটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়:

ইংরেজি: “I believe that if a man like him were to assume the dictatorship of the modern world he would succeed in solving its problems in a way that would bring it the much needed peace and happiness: I have prophesied about the faith of Muhammad that it would be acceptable to the Europe of tomorrow as it is beginning to be acceptable to the Europe of today.”

বাংলা অনুবাদ: “আমি বিশ্বাস করি, তাঁর (মুহাম্মদ) মতো একজন মানুষ যদি আধুনিক বিশ্বের একনায়কত্ব গ্রহণ করতেন, তবে তিনি এমনভাবে এর সমস্যাবলি সমাধানে সফল হতেন যা বিশ্বে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শান্তি ও সুখ বয়ে আনত। আমি মুহাম্মদের ধর্ম সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছি যে, এটি আগামীর ইউরোপের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, ঠিক যেমন আজকের ইউরোপে এটি গ্রহণযোগ্য হতে শুরু করেছে।”

এই উদ্ধৃতিটি সাধারণত ‘The Genuine Islam’ (Vol. 1, No. 8, 1936) নামক সোর্সের সাথে যুক্ত করা হয়।


তথ্যের অসারতা ও জালিয়াতির প্রমাণ

এই উদ্ধৃতিটি সম্পূর্ণ বানোয়াট। ‘The Genuine Islam’ নামে একটি ম্যাগাজিন সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু এটি বার্নার্ড শ-এর লেখা কোনো বই বা অনুমোদিত প্রকাশনা নয়। আন্তর্জাতিক বার্নার্ড শ সোসাইটি এবং বিভিন্ন স্বাধীন গবেষণায় [1] এটি স্পষ্টভাবে ফেব্রিকেটেড বলে চিহ্নিত হয়েছে। শ এমন কোনো বই লেখেননি এবং এই কথাগুলো তাঁর কোনো প্রকাশিত লেখায় পাওয়া যায় না। প্রচারকরা কেবল একজন নোবেল বিজয়ীর নামের মর্যাদা চুরি করে নিজেদের দাবিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।


বার্নার্ড শ-এর প্রকৃত অবস্থান

জর্জ বার্নার্ড শ একজন অত্যন্ত বিখ্যাত আইরিশ নাট্যকার, সমালোচক এবং রাজনীতি চিন্তক। ১৮৮০-এর দশক থেকে শুরু করে তার মৃত্যুর পরও আজ পর্যন্ত পশ্চিমা মঞ্চনাটক, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাব বিদ্যমান। তিনি ম্যান অ্যান্ড সুপারম্যান (১৯০২), পিগম্যালিয়ন (১৯১২) ও সেন্ট জোন (১৯২৩)-সহ ষাটের অধিক নাটক রচনা করেছেন। সমসাময়িক ব্যঙ্গরচনা থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক রূপক কাহিনি দিয়ে তিনি তার প্রজন্মের অন্যতম নাট্যকার হিসেবে প্রসিদ্ধি অর্জন করেন এবং ১৯২৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তার রচনাবলী থেকে জানা যায়, তিনি ছিলেন প্রচণ্ড রকমের ধর্মবিরোধী, বিশেষভাবে ক্যাথলিক চারর ও ইসলাম ধর্মের অত্যন্ত কঠোর সমালোচক।

জর্জ বার্নার্ড শ এর নামে একটা সংস্থা আছে, যার নাম ইন্টারন্যাশনাল শ সোসাইটি। যার ট্রেজারারের নাম হচ্ছে Richard F Dietrich, যিনি জর্জ বার্নার্ড শ এর সব লেখা কম্পাইল করেছেন। তিনি বলেছেন, দ্যা জেনুইন ইসলাম নামে শ আসলে কোন বই-ই লেখেন নি। পুরোটাই বানোয়াট বিবরণ। বার্নার্ড শ এর নামে যেই বক্তব্যটি প্রচার করা হয়, এরকম কোন লিখিত বই বার্নার্ড শ এর লিখিত বইয়ের তালিকাতেই নেই। শুধু তাই নয়, শ আসলে ইসলাম এবং মুহাম্মদ সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করতেন, তা তার একটা চিঠি থেকেই পরিষ্কার হয়। ১৯৩৩ সালে রেভারেন্ড এনসর ওয়াল্টার্সকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন, [2]

ইংরেজি: “Islam is very different, being ferociously intolerant… When the Arabs had run this sort of idolatry to such extremes… Mahomet rose up at the risk of his life and insulted the stones shockingly, declaring that there is only one God, Allah, the glorious, the great… And there was to be no nonsense about toleration. You accepted Allah or you had your throat cut by someone who did accept him, and who went to Paradise for having sent you to Hell.”

বাংলা অনুবাদ: “ইসলাম একেবারেই ভিন্ন, এটি প্রচণ্ডভাবে অসহিষ্ণু… আরবরা যখন মূর্তিপূজায় চরমে পৌঁছেছিল, তখন মুহাম্মদ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাথরগুলোকে অপমান করেছিলেন এবং ঘোষণা করেছিলেন যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই… এখানে সহনশীলতার সমর্থনে কোনো হালকা কথা ছিল না। হয় আপনি আল্লাহকে গ্রহণ করবেন, নয়তো যারা তাকে মেনেছে তাদের হাতে আপনার গলা কাটা পড়বে—তারা আপনাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে নিজেরা জান্নাতে যাবে।”

এই উদ্ধৃতি থেকে স্পষ্ট যে শ ইসলামকে একটি জোরপূর্বক ধর্মান্তরণের ধর্ম হিসেবে দেখেছেন, যা সহিষ্ণুতার পরিবর্তে হিংস্রতার উপর ভিত্তি করে।


প্রচারকদের জোচ্চুরি: মনস্তাত্ত্বিক হীনমনত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা

দুটি উদ্ধৃতি পাশাপাশি রাখলে প্রচারকদের জালিয়াতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে: একদিকে ভুয়া প্রশংসা তৈরি, অন্যদিকে প্রকৃত সমালোচনা লুকানো। এর পেছনে মূল কারণগুলো হলো:

১. মনস্তাত্ত্বিক হীনমনত্ব (Psychological Inferiority Complex): এই প্রবণতা একটি গভীর অভ্যন্তরীণ অনিরাপত্তার লক্ষণ। যখন কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস নিজস্ব যুক্তি, প্রমাণ বা দার্শনিক গভীরতার ভিত্তিতে দাঁড়াতে পারে না, তখন তার অনুসারীরা বাইরের কর্তৃপক্ষের (যেমন পশ্চিমা বুদ্ধিজীবী) স্বীকৃতির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এটি এক ধরনের কলোনিয়াল মানসিকতার অবশেষ—যেখানে পশ্চিমা স্বীকৃতিকেই সর্বোচ্চ মানদণ্ড মনে করা হয়। যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি প্রকাশ করে যে, ধর্মটির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এতটাই যে নিজস্ব মেধা বা গ্রন্থের যৌক্তিকতা দিয়ে প্রমাণ করা সম্ভব নয়; তাই জালিয়াতির আশ্রয় নিতে হয়। এই হীনমনত্ব শুধু ব্যক্তিগত নয়, সমষ্টিগত—যা একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর অনিরাপত্তাবোধ থেকে উদ্ভূত হয়।

২. বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা (Intellectual Dishonesty): এখানে deliberate fabrication, cherry-picking এবং evidence suppression স্পষ্ট। প্রচারকরা জেনেশুনে মিথ্যা রেফারেন্স ব্যবহার করেন (অস্তিত্বহীন বই), বিরোধী প্রমাণ লুকান এবং প্রসঙ্গহীনভাবে কথা টুইস্ট করেন। দার্শনিকভাবে এটি একটি গুরুতর অপরাধ—কারণ সত্যের অনুসন্ধানে সততা ছাড়া কোনো যুক্তি বা বিশ্বাস টিকে থাকতে পারে না। এই অসততা প্রকাশ করে যে, ধর্মটি rational scrutiny-এর আলোকে দাঁড়াতে পারে না; তাই প্রতারণার উপর নির্ভর করে। মুক্তচিন্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি দেউলিয়াত্বের লক্ষণ—যেখানে বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখতে মিথ্যার সহায়তা লাগে।

৩. অজ্ঞ অনুসারীদের সুযোগ নেওয়া: সাধারণ মানুষ যাচাই করবে না—এই ধারণা থেকে তারা নির্লজ্জভাবে মিথ্যা ছড়ায়। এটি শুধু অসততা নয়, এক ধরনের মানসিক শোষণ।


উপসংহার

যিনি ইসলামকে “প্রচণ্ড অসহিষ্ণু” এবং “গলা কাটার ধর্ম” বলে বর্ণনা করেছেন, তাঁকেই ইসলামের ভক্ত বা শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করা না শুধু হাস্যকর, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বের চরম উদাহরণ। জর্জ বার্নার্ড শ যদি এতটাই ইসলামপ্রেমি হতেন, তাহলে তিনি নিজেই তো ইসলাম গ্রহণ করতেন। সেটি না করে, তার নিজের কোন বইতে বিষয়টি না লিখে কেন তিনি সিঙ্গাপুরের কোন এক মুসলিম লেখককে বিষয়টি অবগত করতে যাবেন? যদি কোনো ধর্মের সত্যতা প্রমাণে লক্ষ লক্ষ জালিয়াতি ও মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়, তবে তার নৈতিক ও যৌক্তিক ভিত্তি কতটা দুর্বল তা সহজেই বোঝা যায়। যুক্তি ও প্রমাণের যুগে এই ধরনের সস্তা প্রতারণা কেবল প্রচারকদের মনস্তাত্ত্বিক হীনমনত্ব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অসততাকেই উন্মোচিত করে—যা মুক্তচিন্তা ও যুক্তির কাছে পরাজয়ের স্বীকারোক্তি ছাড়া আর কিছু নয়।


তথ্যসূত্রঃ
  1. WikiIslam, GetReligion এবং অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া রিপোর্ট ↩︎
  2. Bernard Shaw: Collected Letters, 1926-1950, পৃষ্ঠা ৩০৫ ↩︎