মহাকাশ থেকে মক্কা-মদিনা: অলৌকিক জ্যোতির বাস্তবতা

ভূমিকা

ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বহুল প্রচারিত দাবি হলো—মহাকাশ থেকে (বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন/ISS-এর কক্ষপথ থেকে) পৃথিবীকে দেখলে “শুধু” মক্কা ও মদিনা অস্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল দেখা যায়; এবং এই উজ্জ্বলতা নাকি ইসলাম সত্য হওয়ার বা শহর দুটির অলৌকিক মর্যাদার প্রমাণ। অনেক প্রচারে এটিকে “কাবা থেকে নির্গত দৈবী নূর” বা বিশেষ কোনও রহস্যময় আলোর ধারণার সাথে যুক্ত করা হয়।

এই প্রবন্ধে দাবি-টির বৈজ্ঞানিক যাচাই করা হবে তিনটি প্রশ্নের আলোকে: (১) মহাকাশ থেকে “উজ্জ্বল শহর” বলতে আসলে কী বোঝায়? (২) রাতের শহরের আলো কোন প্রাকৃতিক/প্রযুক্তিগত কারণে ছবিতে উজ্জ্বল দেখায়? (৩) মক্কা-মদিনা “অনন্য” উজ্জ্বল—এই বক্তব্যের পক্ষে কি নির্ভরযোগ্য ডেটা/অফিসিয়াল উৎস/পুনরুৎপাদনযোগ্য (reproducible) বিশ্লেষণ আছে, নাকি এটি নির্বাচনী উদাহরণ (cherry-picking) ও ভুল ব্যাখ্যার ফল?


দাবি যাচাইয়ের মানদণ্ড: কী ধরনের প্রমাণ গ্রহণযোগ্য?

বিজ্ঞান-ভিত্তিক যাচাইয়ের জন্য “ভাইরাল ভিডিও”, “অজানা পেজের ক্যাপশন”, বা আবেগঘন গল্প নয়—বরং নিম্নোক্ত ধরনের প্রমাণ দরকার:

  • অফিসিয়াল উৎস: NASA/ESA বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান/অ্যাস্ট্রোনটের অফিসিয়াল বিবৃতি ও প্রসঙ্গসহ ডেটা।
  • পরিমাপযোগ্য ডেটা: স্যাটেলাইট “নাইটটাইম লাইটস” (radiance) ডেটাসেট—যেমন VIIRS Day/Night Band/Black Marble—যেখানে উজ্জ্বলতা সংখ্যায় পরিমাপ করা যায়।
  • পুনরুৎপাদনযোগ্য বিশ্লেষণ: একই পদ্ধতিতে পৃথিবীর বহু শহরের তুলনা (একই স্কেল, একই সময়সীমা, একই প্রসেসিং)।
  • ইমেজিং সীমাবদ্ধতা: ISS ফটোতে ক্যামেরা সেটিং, এক্সপোজার, সেন্সিটিভিটি, বায়ুমণ্ডলীয় ছড়ানো আলো (scattering) ইত্যাদির প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া।

বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা: মহাকাশ থেকে শহরগুলো কেন উজ্জ্বল দেখায়?

রাতের পৃথিবীতে শহর উজ্জ্বল দেখানোর প্রধান কারণ হলো কৃত্রিম আলোকসজ্জা—রাস্তার লাইট, ভবন/কমপ্লেক্স, শিল্পাঞ্চল, স্টেডিয়াম, বন্দর, বিমানবন্দর, বিজ্ঞাপন আলোকসজ্জা ইত্যাদি। ISS থেকে তোলা রাতের ছবি এবং স্যাটেলাইট “নাইট লাইটস” ম্যাপগুলো মূলত মানব-নির্মিত আলোর স্থানিক বণ্টন দেখায়; এগুলো নগরায়ন, বিদ্যুৎ ব্যবহার, অবকাঠামো, এমনকি দুর্যোগ-পরবর্তী বিদ্যুৎ বিভ্রাট পর্যবেক্ষণেও ব্যবহৃত হয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো—“উজ্জ্বল দেখানো” সবসময় “অনন্য/অস্বাভাবিক আলো” বোঝায় না। ছবি তোলার সময় দীর্ঘ এক্সপোজার (long exposure), উচ্চ ISO, লেন্সের ফোকাল লেন্থ, এবং জানালার কাচ/কম্পন—এসবের কারণে আলো ছড়িয়ে (blooming/overexposure) বাস্তবের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল মনে হতে পারে। ISS-এর রাতের ফটোগ্রাফি নিয়ে NASA-র Earth Observatory ব্যাখ্যাগুলোতে এই টেকনিক্যাল দিকগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।

NASA-র “Earth at Night” প্রজেক্টে দেখা যায় যে, পৃথিবীর সবচেয়ে উজ্জ্বল শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে টোকিও, দিল্লি, নিউ ইয়র্ক, সিঙ্গাপুর এবং সাও পাওলো। এগুলো মক্কা বা মদিনার চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল এবং বিস্তৃত। উদাহরণস্বরূপ:

  • টোকিও: জাপানের রাজধানী, যা উপসাগরের চারপাশে ছড়ানো আলোর জন্য বিখ্যাত। এর আলোকদূষণ এতটাই তীব্র যে এটাকে মহাকাশ থেকে “পার্ল স্ট্র্যান্ড” এর মতো দেখায়।
মক্কা
Cities at Night: The View from Space From NASA
Like many Japanese cities, the night lights of Tokyo, Japan, have a blue-green glow that comes from mercury vapor lighting. Image ISS016-E-27586 was taken on February 5, 2008.
  • দিল্লি: প্রায় ৩৪ মিলিয়ন জনসংখ্যা নিয়ে, যমুনা নদীর দু’পাশে সোনালি জালের মতো ছড়ানো আলো। ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি মহাকাশ থেকে সবচেয়ে উজ্জ্বল স্পটগুলোর একটি।
  • লাস ভেগাস: প্রায়ই “পৃথিবীর সবচেয়ে উজ্জ্বল শহর” বলা হয়, কারণ এর ক্যাসিনো এবং হোটেলের নিয়ন লাইট মরুভূমির মাঝে অস্বাভাবিক উজ্জ্বল। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, এটি শীর্ষ ১০-এ নেই—টোকিও বা নিউ ইয়র্কের মতো শহরগুলো বেশি উজ্জ্বল।
মক্কা 1
Cities at Night: The View from Space From NASA
Chicago, Illinois, is home to roughly three million people, but the wider metropolitan area includes nearly 10 million. By day (top), the cement-colored urban center of the city blends almost imperceptibly into the gray-green colors of suburbs and then farmland. By night (lower), the region’s ten million people cannot be missed. ISS007-E-16747 (top) was taken on October 8, 2003, with a 50 mm lens. ISS007-E-16525 (bottom) was taken on October 7, 2003, with a 50 mm lens.
মক্কা 3
Cities at Night: The View from Space From NASA
The cities of Jiddah and Mecca, Saudi Arabia, are connected by a well-lit pilgrim road. Image ISS016-E-16189 was taken on December 11, 2007, with an 85 mm lens.
মক্কা 5
Cities at Night: The View from Space From NASA
Looking east from a location southwest of Ireland, an astronaut took this nighttime panorama of population centers in Ireland and the United Kingdom. Image ISS016-E-27034 was taken on February 1, 2008, using a 28 mm lens.

মক্কা-মদিনা “অলৌকিকভাবে উজ্জ্বল”—এই দাবির সমস্যা কোথায়?

দাবিটির সাধারণত দুইটি রূপ দেখা যায়—(ক) “মক্কা-মদিনা অন্য সব শহরের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল”; (খ) “মহাকাশ থেকে শুধু/বিশেষভাবে এ দুটোই উজ্জ্বল দেখা যায়।” এই দুই রূপই শক্ত প্রমাণ ছাড়াই প্রচারিত হয়। বাস্তবে, পৃথিবীর বহু মেগাসিটি/ঘন-নগরাঞ্চল রাতের ম্যাপে অত্যন্ত উজ্জ্বল দেখা যায়—এটি একটি সুপরিচিত ও পরিমাপযোগ্য ঘটনাও।

মক্কা উজ্জ্বল দেখা যাওয়ার সম্ভাব্য “সাধারণ” কারণগুলো ব্যাখ্যা করলেই অলৌকিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না: বড় মসজিদ কমপ্লেক্স ও আশপাশের বিশাল আলোকসজ্জা, উচ্চ ঘনত্বের হোটেল/বাণিজ্যিক এলাকা, এবং হজ/উমরাহ মৌসুমে অতিরিক্ত আলোক-ব্যবস্থাপনা। এগুলো সবই মানব-নির্মিত আলো; আলাদা কোনও “দৈবী রেডিয়েশন” না ধরেই ঘটনাটি ব্যাখ্যা করা যায়।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো “রেজোলিউশন/স্কেল” ভুল বোঝা। ISS রাতের ছবির কার্যকর রেজোলিউশন সীমিত; বহু ক্ষেত্রে একটি “উজ্জ্বল স্পট” আসলে পুরো কমপ্লেক্স/পাড়া/শহরাঞ্চলের সম্মিলিত আলো। অতএব “উজ্জ্বল স্পট = কাবা নিজে আলো ছড়াচ্ছে”—এমন সিদ্ধান্ত ইমেজিং সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় টেকে না।


মিথ্যা দাবি ও ভাইরাল গল্প: সুনিতা উইলিয়ামস ‘ইসলাম গ্রহণ’ কাহিনী

দাবিটির সাথে একটি পরিচিত ভাইরাল গল্প জুড়ে দেওয়া হয়—NASA অ্যাস্ট্রোনট সুনিতা উইলিয়ামস নাকি মহাকাশ থেকে মক্কা-মদিনা “অলৌকিকভাবে উজ্জ্বল” দেখে ইসলাম গ্রহণ করেন। বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, এই গল্প বহু বছর ধরে (কমপক্ষে ২০০৮ সাল থেকে) বিভিন্ন ভাষায় ঘুরছে এবং এর পক্ষে কোনো অফিসিয়াল প্রমাণ নেই। আসুন ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ইসলাম প্রচারক বক্তাগণ কীভাবে এই মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন, একটি ওয়াজে শুনি,

ফ্যাক্ট-চেক রিপোর্টগুলো আরও দেখায়—সুনিতা উইলিয়ামস নিজেও মিডিয়া সাক্ষাৎকারে এই ধরনের “ধর্ম পরিবর্তন” সংক্রান্ত গুজবকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন—এবং ভাইরাল কনটেন্টে তার নামে যে উক্তি চালানো হয়, সেটি ভুয়া। অতএব, “মক্কা-মদিনা উজ্জ্বল → অ্যাস্ট্রোনট ইসলাম গ্রহণ”—এই চেইনটি তথ্যগতভাবেই দাঁড়ায় না।


যৌক্তিক বিশ্লেষণ: কেন এটিকে ‘ধর্মের প্রমাণ’ বলা যুক্তিসঙ্গত নয়?

এই দাবিকে “ধর্মীয় সত্যতার প্রমাণ” হিসেবে দাঁড় করাতে গেলে কয়েকটি মৌলিক যুক্তিগত ও পদ্ধতিগত সমস্যা দেখা দেয়:

  1. নির্বাচনী উদাহরণ (Cherry-picking): পৃথিবীর অসংখ্য উজ্জ্বল নগরাঞ্চল থেকে কেবল “পছন্দের” উদাহরণ তুলে ধরে তাকে অলৌকিক বলা—এটি বৈজ্ঞানিক তুলনা নয়। একই পদ্ধতিতে সব শহরের ডেটা না দেখে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।
  2. স্পেশাল প্লিডিং/ডাবল স্ট্যান্ডার্ড: উজ্জ্বলতা যদি “দৈবী” হয়, তাহলে বহু আলোকিত শহর/পবিত্রস্থান/মহানগরও একই দাবি তুলতে পারে। একই ঘটনার জন্য আলাদা নিয়ম বানালে যুক্তি দুর্বল হয়।
  3. প্রমাণের ধরন ভুল: একটি রাতের ছবি (যার ওপর ক্যামেরা সেটিং ও প্রসেসিং প্রভাব ফেলে) দিয়ে “অস্বাভাবিক বিকিরণ” প্রমাণ হয় না। “অস্বাভাবিক বিকিরণ” দাবি হলে স্পেকট্রাল/রেডিওমেট্রিক ডেটা, পুনরুৎপাদনযোগ্য পরিমাপ, এবং পিয়ার-রিভিউড বিশ্লেষণ দরকার—যা এই দাবির ক্ষেত্রে অনুপস্থিত।
  4. ব্যাখ্যার অর্থনীতি (Occam-style reasoning): মানব-নির্মিত আলো, নগরঘনত্ব, অবকাঠামো, এবং ইমেজিং সীমাবদ্ধতা—এই সাধারণ কারণগুলো দিয়েই ঘটনাটি ব্যাখ্যা করা যায়। অতিরিক্ত অলৌকিক অনুমান যোগ করা পদ্ধতিগতভাবে অপ্রয়োজনীয়।

তুলনামূলক চিত্র: “নাইট লাইটস”-এ উজ্জ্বলতা কী দ্বারা চালিত হয়?

উদাহরণধরনউজ্জ্বলতার প্রধান চালকনোট
টোকিও/জাকার্তা/ঢাকা (মেগাসিটি উদাহরণ)ঘন নগরায়নবৃহৎ নগরাঞ্চল, অবকাঠামো, ট্রান্সপোর্ট করিডর, শিল্প/বাণিজ্যিক আলোবিশাল এলাকাজুড়ে আলো—রেডিয়েন্স ডেটায় স্পষ্ট
নিউ ইয়র্ক (মেট্রো অঞ্চল উদাহরণ)উচ্চ-ঘনত্ব নগরবহুতল ভবন, সড়ক/বন্দর/ব্রিজ, আশপাশের নগর করিডরকোস্টাল করিডরে আলো ছড়িয়ে দেখা যায়
লাস ভেগাস (ডেজার্ট কনট্রাস্ট উদাহরণ)লোকালাইজড উজ্জ্বল স্পটউচ্চ আলোকসজ্জা + আশেপাশে অন্ধকার মরুভূমি (কনট্রাস্ট)দূর থেকে “খুব উজ্জ্বল” মনে হতে পারে—কনট্রাস্ট ইফেক্ট
মক্কা (কমপ্লেক্স-ড্রিভেন উদাহরণ)কমপ্লেক্স-কেন্দ্রিক আলোমসজিদ কমপ্লেক্স, হোটেল/বাণিজ্যিক এলাকা, মৌসুমি অতিরিক্ত আলোকসজ্জা“একটি স্পট” দেখালেও তা সাধারণত বৃহৎ কমপ্লেক্স/আশপাশের আলো

সিদ্ধান্ত: দাবির বনাম তথ্য—এবং যুক্তির শৃঙ্খলা

মহাকাশ থেকে মক্কা-মদিনা (বা পৃথিবীর যে কোনো আলোকিত শহর) দেখা যেতে পারে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু “একমাত্র এ দুটোই উজ্জ্বল” বা “অলৌকিক নূর” ধরনের সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য যে মানের ডেটা ও বিশ্লেষণ দরকার, তা এই ভাইরাল দাবির সাথে সাধারণত থাকে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি মানুষের তৈরি আলোর স্বাভাবিক ফল, সঙ্গে ছবি/ক্যামেরা-ভিত্তিক ভুল ব্যাখ্যা এবং নির্বাচনী উদাহরণের সমষ্টি।

ফলে, সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত অবস্থান হলো: (১) দাবিকে আবেগ দিয়ে নয়—পরিমাপযোগ্য ডেটা দিয়ে বিচার করা; (২) সোশ্যাল মিডিয়ার গল্প/কোটেশনের আগে অফিসিয়াল উৎস ও ফ্যাক্ট-চেক দেখা; এবং (৩) একই মানদণ্ডে বিশ্বব্যাপী তুলনা না করে কোনো একটি ধর্মীয় স্থানের ক্ষেত্রে “অলৌকিক ব্যতিক্রম” ঘোষণা না করা।