Table of Contents
ভূমিকা
ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে, নবী মুহাম্মদ মেরাজের রাতে সাত আসমানে গিয়ে আল্লাহর কাছ থেকে সালাত নিয়ে আসেন, যার মাধ্যমে মুসলিমদের জন্য প্রতিদিন পাঁচবার নামাজ আদায় করা ফরজ হয়। এই সালাত ফরজ হওয়ার পেছনে আছে একটি মজাদার কাহিনী। আল্লাহ প্রথমে মুসলিমদের জন্য ৫০ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেছিলেন। কিন্তু সর্বজ্ঞানী আল্লাহর চাইতেও বেশি পাকনা মুসা নবীর পরামর্শে নবী মুহাম্মদ আল্লাহর সাথে রীতিমত কাঁচাবাজারে কাচকি মাছের দর কষাকষির মত মুলামুলি করে নামাজের পরিমাণ কমিয়ে আনেন। এ থেকে মুসা নবীকে আল্লাহর চাইতেও বেশি পাকনা বলে যে কারো মনে হতেই পারে, যেহেতু মুসা নবী আল্লাহর নির্ধারিত সালাত বিষয়ে আপত্তি তুলে সেটি কমানোর পরামর্শ দেন। আল্লাহর শানে এহেন বেয়াদবির জন্য আল্লাহ মুসা নবীকে কী শাস্তি দেবেন জানি না, তবে আল্লাহও নবীর চাপাচাপিতে নামাজের সংখ্যা কমিয়ে দেন বলে জানা যায়। মানে আল্লাহ নিজের ভুলটিও শুধরে নেন। নইলে নামাজের সংখ্যা কমাবেন কেন? সমস্যা যদিও এখানে নয়, সমস্যাটি অন্যত্র। এই মুলামুলির সময় আল্লাহ ৫০ ওয়াক্ত থেকে একবার নামাজের সংখ্যা অর্ধেক করেন। এরপরে নবী মুহাম্মদ আবার গেলে আবারো অর্ধেক করেন। ৫০ ওয়াক্তের অর্ধেক হচ্ছে ২৫। এর অর্ধেক হচ্ছে ১২.৫। কিন্তু এভাবে নামাজ আদায় করা তো অসম্ভব। কেউ কি ১২.৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে পারবে? তাহলে আল্লাহ কোন আক্কেলে এরকম সংখ্যক নামাজের বিধান দিয়েছিলেন? নবী না হয় মূর্খ ছিলেন, গণিত শেখেননি। কিন্তু আল্লাহ এরকম ভুল কীভাবে করলেন?
হাদিসের বিবরণ
আসুন হাদিসটি পড়ি [1] –
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
৬০/ আম্বিয়া কিরাম (‘আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ৬০/৫. ইদ্রীস (আঃ)-এর বিবরণ।
৬০/৪. অধ্যায় :
(মহান আল্লাহর বাণীঃ) আর নিশ্চয়ই ইলিয়াসও রাসূলগণের মধ্যে একজন ছিলেন। স্মরণ কর, তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, তোমরা কি সাবধান হবে না? ………… আমি তা পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি। (আস্সাফফাতঃ ১২৩-১২৯)
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, (ইলয়াস আঃ-এর কথাকে) মর্যাদার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। ইলয়াসের প্রতি সালাম। আমি সৎ-কর্মশীলদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি। নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন আমার মু’মিন বান্দাদের অন্যতম- (আস্সাফফাত ১৩০-১৩২)
এবং তিনি নূহ (আঃ)-এর পিতার দাদা ছিলেন। মহান আল্লাহর বাণীঃ আর আমি তাঁকে (ইদরীস) উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছি। (মারইয়াম ৫৭)
৩৩৪২. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ যার (রাঃ) হাদীস বর্ণনা করতেন যে, রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, (লাইলাতুল মি’রাজে) আমার ঘরের ছাদ উন্মুক্ত করা হয়েছিল। তখন আমি মক্কায় ছিলাম। অতঃপর জিব্রাঈল (আঃ) অবতরণ করলেন এবং আমার বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। অতঃপর তিনি যমযমের পানি দ্বারা তা ধুলেন। এরপর হিকমত ও ঈমান (জ্ঞান ও বিশ্বাস) দ্বারা পূর্ণ একখানা সোনার তশ্তরি নিয়ে আসেন এবং তা আমার বক্ষে ঢেলে দিলেন। অতঃপর আমার বক্ষকে আগের মত মিলিয়ে দিলেন। এবার তিনি আমার হাত ধরলেন এবং আমাকে আকাশের দিকে উঠিয়ে নিলেন। অতঃপর যখন দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে পৌঁছলেন, তখন জিবরাঈল (আঃ) আকাশের দ্বাররক্ষীকে বললেন, দরজা খুলুন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে? জবাব দিলেন, আমি জিবরাঈল। দ্বাররক্ষী বললেন, আপনার সঙ্গে কি আর কেউ আছেন? তিনি বললেন, আমার সঙ্গে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আছেন। দ্বাররক্ষী জিজ্ঞেস করলেন, তাঁকে কি ডাকা হয়েছে? বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর দরজা খোলা হল। যখন আমরা আকাশের উপরে আরোহণ করলাম, হঠাৎ দেখলাম এক ব্যক্তি যার ডানে একদল লোক আর তাঁর বামেও একদল লোক। যখন তিনি তাঁর ডান দিকে তাকান তখন হাসতে থাকেন আর যখন তাঁর বাম দিকে তাকান তখন কাঁদতে থাকেন। (তিনি আমাকে দেখে) বললেন, মারাহাবা! নেক নবী ও নেক সন্তান। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাঈল! ইনি কে? তিনি জবাব দিলেন, ইনি আদম (আঃ) আর তাঁর ডানের ও বামের এ লোকগুলো হলো তাঁর সন্তান। এদের মধ্যে ডানদিকের লোকগুলো জান্নাতী আর বামদিকের লোকগুলো জাহান্নামী। অতএব যখন তিনি ডানদিকে তাকান তখন হাসেন আর যখন বামদিকে তাকান তখন কাঁদেন। অতঃপর আমাকে নিয়ে জিবরাঈল (আঃ) আরো উপরে উঠলেন। এমনকি দ্বিতীয় আকাশের দ্বারে এসে গেলেন। তখন তিনি এ আকাশের দ্বাররক্ষীকে বললেন, দরজা খুলুন! দ্বাররক্ষী তাঁকে প্রথম আকাশের দ্বাররক্ষী যেরূপ বলেছিল, তেমনি বলল। অতঃপর তিনি দরজা খুলে দিলেন।
আনাস (রাঃ) বলেন, অতঃপর আবূ যার (রাঃ) উল্লেখ করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাশসমূহে ইদ্রীস, মূসা, ‘ঈসা এবং ইবরাহীম (আঃ)-এর সাক্ষাৎ পেয়েছেন। তাঁদের কার অবস্থান কোন্ আকাশে তিনি আমার নিকট তা বর্ণনা করেননি। তবে তিনি এটা উল্লেখ করেছেন যে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে আদম (আঃ)-কে এবং ষষ্ঠ আকাশে ইবরাহীম (আঃ)-কে দেখতে পেয়েছেন।
আনাস (রাঃ) বলেন, জিবরাঈল (আঃ) যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহ) ইদ্রীস (আঃ)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, তখন তিনি (ইদ্রীস (আঃ)) বলেছিলেন, হে নেক নবী এবং নেক ভাই! আপনাকে মারহাবা। (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন) আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি (জিবরাঈল) জবাব দিলেন, ইনি ইদ্রীস (আঃ)! অতঃপর মুসা (আঃ)-এর নিকট দিয়ে অতিক্রম করলাম। তিনি বললেন, মারহাবা! হে নেক নবী এবং নেক ভাই। তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি (জিবরাঈল (আঃ)) বললেন, ইনি মূসা (আঃ)। অতঃপর ‘ঈসা (আঃ)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম। তিনি বললেন, মারহাবা! হে নেক নবী এবং নেক ভাই। তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি (জিবরাঈল (আঃ)) বললেন, ইনি ‘ঈসা (আঃ)। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম। তিনি বললেন, মারহাবা। হে নেক নবী এবং নেক সন্তান! আমি জানতে চাইলাম, ইনি কে? তিনি (জিবরাঈল (আঃ)) বললেন, ইনি ইবরাহীম (আঃ)।
ইবনু শিহাব (রহ.) বলেন, আমাকে ইবনু হাযম (রহ.) জানিয়েছেন যে, ইবনু ‘আব্বাস ও আবূ ইয়াহয়্যা আনসারী (রাঃ) বলতেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অতঃপর জিবরাঈল আমাকে ঊর্ধ্বে নিয়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত আমি একটি সমতল স্থানে গিয়ে পৌঁছলাম। সেখান হতে কলমসমূহের খসখস শব্দ শুনছিলাম।
ইবনু হাযম (রহ.) এবং আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তখন আল্লাহ আমার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেছেন। অতঃপর আমি এ নির্দেশ নিয়ে ফিরে আসলাম। যখন মূসা (আঃ)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনার রব আপনার উম্মাত উপর কী ফরজ করেছেন? আমি বললাম, তাদের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়েছে। তিনি বললেন, পুনরায় আপনার রবের নিকট ফিরে যান। কেননা আপনার উম্মাতের তা পালন করার সামর্থ্য রাখে না। তখন ফিরে গেলাম এবং আমার রবের নিকট তা কমাবার জন্য আবেদন করলাম। তিনি তার অর্ধেক কমিয়ে দিলেন। আমি মূসা (আঃ)-এর নিকট ফিরে আসলাম। তিনি বললেন, আপনার রবের নিকট গিয়ে পুনরায় কমাবার আবেদন করুন এবং তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পূর্বের অনুরূপ কথা আবার উল্লেখ করলেন। এবার তিনি (আল্লাহ) তার অর্ধেক কমিয়ে দিলেন। আবার আমি মূসা (আঃ)-এর নিকট আসলাম এবং তিনি পূর্বের মত বললেন। আমি তা করলাম। তখন আল্লাহ তার এক অংশ মাফ করে দিলেন। আমি পুনরায় মূসা (আঃ)-এর নিকট আসলাম এবং তাঁকে জানালাম। তখন তিনি বললেন, আপনার রবের নিকট গিয়ে আরো কমাবার আরয করুন। কেননা আপনার উম্মাতের তা পালন করার সামর্থ্য থাকবে না। আমি আবার ফিরে গেলাম এবং আমার রবের নিকট তা কমাবার আবেদন করলাম। তিনি বললেন, এ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত বাকী রইল। আর তা সাওয়াবের ক্ষেত্রে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সমান হবে। আমার কথার পরিবর্তন হয় না। অতঃপর আমি মূসা (আঃ)-এর নিকট ফিরে আসলাম। তিনি এবারও বললেন, আপনার রবের নিকট গিয়ে আবেদন করুন। আমি বললাম, এবার আমার রবের সম্মুখীন হতে আমি লজ্জাবোধ করছি। এবার জিবরাঈল (আঃ) চললেন এবং অবশেষে আমাকে সাথে নিয়ে সিদ্রাতুল মুন্তাহা পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। দেখলাম তা এমন চমৎকার রঙে পরিপূর্ণ যা বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই। অতঃপর আমাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করানো হল। দেখলাম এর ইট মোতির তৈরী আর এর মাটি মিসক বা কস্তুরীর মত সুগন্ধময়। (৩৪৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩০৯৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩১০৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
রূপকের মানসিক কসরত ও এড হক ফ্যালাসি
যখন কোনো ধর্মীয় দাবি, ভবিষ্যদ্বাণী বা বক্তব্য তার স্বাভাবিক অর্থে (plain reading) বাস্তবতার সাথে মেলে না, তখন প্রায়শই “এটা আসলে রূপক”, “এলেগরি”, “ভিন্ন স্তরের অর্থ”, “ছোট সংস্করণ”, “ব্যক্তিগত প্রেক্ষিতভিত্তিক” বা “আধ্যাত্মিক অর্থে”—এই জাতীয় ব্যাখ্যা এনে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়। এই ব্যাখ্যাগুলো সাধারণত শুরুতে বলা হয় না; বরং ফলাফল জানার পরে ব্যর্থতার চাপ তৈরি হওয়ার পরে যোগ করা হয়। ফলে মূল বক্তব্যের স্পষ্ট অর্থ, সময়-সীমা এবং শর্তগুলোকে পাশ কাটিয়ে নতুন অর্থ বসানো হয়—যা যুক্তিগতভাবে এড হক ফ্যালাসি (ad hoc fallacy) বা “পরবর্তী রক্ষাকবচ ব্যাখ্যা” হিসেবে পরিচিত।
এড হক ফ্যালাসি কী? এটি ঘটে যখন কোনো দাবি দুর্বল বা ভুল প্রমাণিত হওয়ার মুখে পড়লে, তাকে রক্ষা করার জন্য নতুন শর্ত, নতুন অর্থ বা নতুন ব্যাখ্যা যোগ করা হয়—যেগুলো (১) মূল বক্তব্য থেকে স্বাভাবিকভাবে উদ্ভূত হয় না, (২) স্বাধীন প্রমাণে দাঁড়ায় না, এবং (৩) দাবিটিকে এমনভাবে অস্পষ্ট করে যে আর তা ফালসিফাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দাবিটি আর পরীক্ষাযোগ্য থাকে না; এটি যেকোনো ফলাফলের সাথে “মিলিয়ে” নেওয়া যায়।
অনেকে “রূপক”কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করেন, কারণ সাহিত্যে বা প্রাচীন গ্রন্থে রূপকের ব্যবহার আছে। কিন্তু যুক্তিতর্কে প্রশ্নটি ভিন্ন: এই রূপক-ব্যাখ্যা কি মূল বক্তব্যের ভাষা, কাঠামো, সময়-ইঙ্গিত এবং শ্রোতার স্বাভাবিক প্রত্যাশা থেকে যুক্তিযুক্তভাবে বের হয়? নাকি এটি কেবল ব্যর্থতা সামাল দিতে পরে যোগ করা হয়েছে? যদি দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে “রূপক” আর সত্যিকারের ব্যাখ্যা নয়—এটি যুক্তিগত ফাঁকি হয়ে দাঁড়ায়।
এড হক উদ্ধার-ব্যাখ্যার সাধারণ কায়দা
- অর্থ-স্থানান্তর (Meaning shift): মূল বক্তব্যে “X ঘটবে” বলা হয়েছে; না ঘটলে পরে বলা হয় “X মানে আসলে Y” বা “পূর্বের বক্তব্যে X বলতে আসলে Y বোঝানো হয়েছিল”। অথচ পূর্বে Y-এর কোনো ইঙ্গিত ছিল না।
- গোলপোস্ট সরানো (Moving the goalposts): পরীক্ষার মানদণ্ড বদলে দেওয়া—যা আগে স্পষ্ট ও পরিমাপ্য ছিল, তাকে অস্পষ্ট করে ফেলা।
- বিশেষ শর্ত যোগ করা (Auxiliary assumptions): “শুধু এই শর্তে”, “আসলে ওই প্রেক্ষিতে”, “কেবল বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য”—এই ধরনের নতুন শর্ত যোগ করা, যার স্বাধীন ভিত্তি নেই।
- সিলেক্টিভ পাঠ (Selective reading): বক্তব্যের অসুবিধাজনক অংশ (যেমন সময়-সীমা) বাদ দিয়ে কেবল সুবিধাজনক অংশ নিয়ে ব্যাখ্যা দাঁড় করানো।
- অব্যর্থতার পূর্বধারণা (Presumed infallibility): শুরুতেই ধরে নেওয়া যে বক্তব্য ভুল হতেই পারে না; তাই যেকোনো অমিলকে “বোঝা ভুল” বলে চালিয়ে দেওয়া।
বাস্তব উদাহরণসমূহ
উদাহরণ ১: বন্যার ভবিষ্যদ্বাণী
কেউ বললেন, “আগামী বছর পৃথিবীব্যাপী মহাপ্লাবন হবে।” বছর শেষে কোনো বিশ্বব্যাপী বন্যা হলো না—কেবল কয়েকটি অঞ্চলে স্বাভাবিক মৌসুমি বন্যা। তখন বলা হলো, “পৃথিবী বলতে আমি আসলে ওই অঞ্চলই বুঝিয়েছিলাম” বা “এটা আসলে রূপক—মানুষের পাপের বন্যা”।
বিশ্লেষণ: মূল বক্তব্যে “পৃথিবীব্যাপী” স্পষ্ট ছিল; পরে অর্থ সংকুচিত বা রূপক করা হলো। এটি গোলপোস্ট সরানো এবং অর্থ-স্থানান্তর উভয়ই। যদি শুরুতেই রূপক বা সীমিত অর্থ উদ্দেশ্য হতো, তাহলে ভাষা সেভাবে নির্দিষ্ট হতো।
উদাহরণ ২: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি
নির্বাচনের আগে একজন নেতা বললেন, “আমি ক্ষমতায় এলে বেকারত্ব শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনব।” ক্ষমতায় এসে বেকারত্ব কমল কিন্তু শূন্য হলো না। তখন বলা হলো, “আসলে আমি বুঝিয়েছিলাম যে বেকারত্ব অনেক কমবে” বা “এটা ছিল একটা রূপক—মানুষের মনের বেকারত্ব দূর করা”।
বিশ্লেষণ: “শূন্যের কোঠায়” একটি পরিমাপ্য দাবি ছিল; পরে তাকে অস্পষ্ট করে ফেলা হলো। এটি ক্লাসিক গোলপোস্ট সরানো।
উদাহরণ ৩: বিনিয়োগের পরামর্শ
একজন বিশ্লেষক বললেন, “এই স্টকের দাম আগামী ছয় মাসে দ্বিগুণ হবে।” ছয় মাস পর দাম বাড়েনি। তখন বলা হলো, “আসলে ছয়মাস বলতে দীর্ঘ সময়কাল বুঝিয়েছিলাম” বা “দ্বিগুণ বলতে আমি মূল্যের বৃদ্ধি বুঝিয়েছিলাম”।
বিশ্লেষণ: সময়-সীমা স্পষ্ট ছিল; পরে তা বাড়িয়ে দেওয়া হলো। এটি সিলেক্টিভ পাঠ এবং বিশেষ শর্ত যোগ করা।
উদাহরণ ৪: নস্ট্রাদামাস-স্টাইলের অস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী
কেউ একটি অস্পষ্ট কবিতা লিখলেন যাতে “আগামী বছর আগুনের পাখি আকাশ থেকে নামবে”। পরে কোনো বড় ঘটনা (যেমন বিমান দুর্ঘটনা) ঘটলে বলা হয়, “দেখো, এটাই পূরণ হয়েছে”। আবার বিমান দুর্ঘটনা না হয়ে যদি কোথাও উল্কাপাত হয়, তখন বলা হবে, দেখো ভবিষ্যতবাণী মিলে গেছে।
বিশ্লেষণ: অস্পষ্টতা থেকেই এড হক ব্যাখ্যা সহজ হয়; যেকোনো ঘটনার সাথে মিলিয়ে নেওয়া যায়। এটি দাবিকে চিরকাল “সত্য” রাখে কিন্তু কোনো প্রকৃত ভবিষ্যদ্বাণী ক্ষমতা প্রমাণ করে না।
কেন এটি যুক্তিগতভাবে গুরুতর সমস্যা?
যেকোনো নির্ভরযোগ্য দাবি বা জ্ঞানের জন্য তিনটি জিনিস অপরিহার্য: (১) স্পষ্ট অর্থ, (২) স্পষ্ট পরীক্ষার মানদণ্ড (ফালসিফায়েবিলিটি), (৩) ব্যর্থতার সম্ভাবনা স্বীকার করা। এড হক ব্যাখ্যা এই তিনটিকেই ধ্বংস করে। ফলে দাবিটি আর “ভুল হতে পারে” এই ঝুঁকি নেয় না—এটি সবসময় “সত্য” থাকে, কিন্তু কোনো নতুন তথ্য দেয় না। এটি যুক্তির পরিবর্তে মানসিক সান্ত্বনা দেয়।
যদি কোনো দাবি সত্যিই শক্তিশালী প্রমাণ বা যুক্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে বারবার অর্থ পরিবর্তন বা উদ্ধার-ব্যাখ্যার প্রয়োজন কেন? এই প্রশ্নটিই এড হক ফ্যালাসির মূল দুর্বলতা প্রকাশ করে।
উপসংহার
এই মেরাজ-হাদিসের সালাত “দর কষাকষি” পর্বটিকে অনেকেই নিছক “আধ্যাত্মিক ঘটনা” বা “রূপক” বলে পাশ কাটিয়ে যেতে চান। কিন্তু সমস্যা এখানে কেবল আবেগের নয়—এটা যুক্তি, ভাষা এবং দাবির পরীক্ষাযোগ্যতার সমস্যা। হাদিসের স্বাভাবিক অর্থ অনুযায়ী আল্লাহ প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেন, এরপর বারবার “অর্ধেক” কমানোর মতো গণিত-ভাষা ব্যবহার করে শেষমেশ ৫ ওয়াক্তে নামিয়ে আনেন, এবং একই সাথে ঘোষণা দেন—“আমার কথার পরিবর্তন হয় না।” এই কাঠামো একদিকে সর্বজ্ঞ পরিকল্পনার ধারণাকে অস্বস্তিকর পর্যায়ে নিয়ে যায়, অন্যদিকে সংখ্যাগত ভাষা/প্রক্রিয়াকে এমন জায়গায় নিয়ে যায় যেখানে ভগ্নাংশ, ধারাবাহিকতা ও যুক্তির দিক থেকে প্রশ্ন উঠবেই। অর্থাৎ এটি শুধু ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক নয়—এটি গল্পের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য (internal consistency) এবং বক্তব্যের স্বাভাবিক অর্থের সাথে সংঘর্ষ।
এখানেই “উদ্ধার-ব্যাখ্যা” বা ad hoc ব্যাখ্যার প্রবণতা ঢুকে পড়ে—“অর্ধেক” মানে আসলে ‘অনেক কমে যাওয়া’, “এটা সময়-ধাপ নয়”, “এটা রূপক”, “এটা পরীক্ষাযোগ্য নয়”—ইত্যাদি। কিন্তু এই ধরনের ব্যাখ্যাগুলো যদি শুরু থেকেই বক্তব্যের স্বাভাবিক ভাষা, কাঠামো ও শ্রোতার প্রত্যাশা থেকে না আসে, তবে এগুলো ব্যাখ্যা নয়; এগুলো ব্যর্থতা সামাল দেওয়ার রক্ষাকবচ। ফলাফল হলো—দাবিটি আর স্পষ্টভাবে সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের আওতায় থাকে না; প্রয়োজনমতো অর্থ বদলে সে সবসময় “ঠিক” হয়ে যায়। আর যে দাবি যেকোনো অবস্থায় ঠিকই থাকবে, সেটি যুক্তির দৃষ্টিতে নতুন কোনো জ্ঞান দেয় না—শুধু বিশ্বাসকে রক্ষা করে।
তাই এই আলোচনার শেষ কথা খুব সোজা: যদি কোনো ধর্মীয় বিবরণ বাস্তব ভাষায়, সংখ্যায় ও ঘটনাপ্রবাহে বলা হয়, তবে সেটি একই বাস্তব মানদণ্ডে বিচারযোগ্য—এবং অমিল ধরা পড়লে “পরের উদ্ধার-ব্যাখ্যা” দিয়ে তাকে অস্পষ্ট করে ফেলা যুক্তিগতভাবে অসৎ কৌশল। মেরাজের সালাত-দরকষাকষির কাহিনীটি তাই একদিকে ধর্মীয় বর্ণনার মানবিক নির্মাণরীতি (মানুষের গল্প বলার ধরন), অন্যদিকে ad hoc rescue-এর ক্লাসিক উদাহরণ—যেখানে সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের বদলে অর্থ-স্থানান্তর দিয়ে বিশ্বাসকে অক্ষত রাখাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
তথ্যসূত্রঃ
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিস নম্বরঃ ৩৩৪২ ↩︎
