Table of Contents
- 1 সারসংক্ষেপ
- 2 ভূমিকা: পরম সত্তা ও সম্পর্কের সংকট
- 3 কোরআন আদি অনন্ত শ্বাশত চিরন্তন (ভিডিও)
- 4 কোরআন সচেতন সত্তা এবং সাক্ষ্যদাতা
- 5 কোরআন শ্বাশত ও চিরন্তন
- 6 অস্তিত্ববিদ্যার দৃষ্টিতে কোরআন: সিফাত ও উদ্দেশ্যের দ্বন্দ্ব
- 7 হিদায়াতের তাত্ত্বিক নির্ভরতা (Ontological Dependency of Guidance)
- 8 নির্দেশনার প্রকৃতি: অর্থ (Meaning) একটি Relational Entity
- 9 সময়-নির্ভরতা সংকট: ঘটনার সাথে বাঁধা আয়াত
- 10 কালাম নফসি বনাম কালাম লাফজি: একটি অসমাধেয় দ্বন্দ্ব
- 11 Null Recipient Problem: ঈশ্বরতত্ত্বের কেন্দ্রীয় দার্শনিক সংকট
- 12 কোরআনের সময়–নির্ভরতা বনাম অনন্তত্ব — একটি লজিক্যাল টেবিল
- 13 ঈশ্বরতত্ত্বের তিন ভিত্তি বনাম কোরআনের অনন্তত্ব
- 14 অনুসিদ্ধান্ত: স্বয়ংসম্পূর্ণতার পতন
- 15 শেষ কথা
সারসংক্ষেপ
ধ্রুপদী একেশ্বরবাদী দর্শনে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে সংজ্ঞায়িত করা হয় একটি পরম, অমুখাপেক্ষী এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা (Self-sufficient Being) হিসেবে, যা সম্পূর্ণভাবে অনির্ভরশীল। ইসলামি ধর্মতত্ত্বে এই ধারণাটি ‘গিনা’ (Ghani) বা অমুখাপেক্ষিতা নামে পরিচিত। একইসাথে, আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকীদা অনুসারে, কোরআন আল্লাহর একটি অনাদি ও অনন্ত গুণ (Eternal Attribute) বা সিফাত। এই প্রবন্ধে আমরা যাচাই করে দেখবো যে, কোরআনের বিষয়বস্তু যেহেতু মৌলিকভাবে মানবকেন্দ্রিক এবং হিদায়াত-নির্ভর, তাই একে আল্লাহর সত্তাগত অনাদি গুণ হিসেবে স্বীকার করে নিলে আল্লাহর ‘স্বয়ংসম্পূর্ণতা’র ধারণাটি অস্তিত্ববিদ্যার (Ontological) সংকটে পড়ে, অর্থাৎ আল্লাহর একটি নির্ভরশীলতা তৈরি হয়। এই প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য হলো—একটি চিরন্তন মানবকেন্দ্রিক গুণ আবশ্যিকভাবেই ঈশ্বরের সত্তাকে মানুষের অস্তিত্বের ওপর তাত্ত্বিকভাবে নির্ভরশীল করে তোলে।
এই প্রবন্ধের লক্ষ্য ইসলামি সিফাৎ-তত্ত্ব, কোরআনের আদি-অনন্তত্বের দাবি, এবং হিদায়াতের উদ্দেশ্যমূলক প্রকৃতি ব্যবহার করে দেখানো—আল্লাহকে “স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা” হিসেবে যে ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হয়, তা ইসলামি আকীদার নিজস্ব যুক্তিতেই অটুট থাকে না। বরং আল্লাহ মানুষের অস্তিত্ব, মানবীয় সংকট, এবং মানবীয় হিদায়াতের প্রয়োজনের ওপর শর্তাধীন একটি নির্ভরশীল ধারণায় পরিণত হয়।
ভূমিকা: পরম সত্তা ও সম্পর্কের সংকট
ধর্মীয় দর্শনের সবচেয়ে বুনিয়াদি স্বীকার্য হলো ঈশ্বরের ‘পরমত্ব’ বা Absoluteness। ঈশ্বর বা আল্লাহ হলেন এমন এক সত্তা, যার অস্তিত্ব অন্য কোনো কিছুর ওপর নির্ভর করে না। তিনি ‘ওয়াজিবুল ওয়াজুদ’ (Necessary Being)—যিনি অস্তিত্ববান থাকার জন্য কোনো শর্ত বা কার্যকারণ দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। এই ধারণাটি ধ্রুপদী একেশ্বরবাদে কেন্দ্রীয়, যা অ্যাকুইনাস বা ইবন সিনার মতো দার্শনিকদের কাজে দেখা যায়। এই সংজ্ঞার অনিবার্য অনুষঙ্গ হলো, স্রষ্টা তার সৃষ্টির অস্তিত্বের আগেও পূর্ণাঙ্গ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিলেন, এবং সৃষ্টি না করলেও তার কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি হতো না।
তবে, ইসলামি ধর্মতত্ত্বের মূল ধারায় (Orthodox Theology) যখন কোরআনকে আল্লাহর ‘কালাম’ বা ‘বাণী’ হিসেবে অনাদি (Uncreated/Eternal) ঘোষণা করা হয়, তখন একটি জটিল দার্শনিক প্রশ্নের উদয় হয়। কোরআন কেবল কিছু বিমূর্ত ধ্বনি বা অক্ষরের সমষ্টি নয়; বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট বার্তাবাহী গ্রন্থ, যার উদ্দেশ্য ‘মানুষকে সঠিক দিক নির্দেশনা দেয়া‘ বা ‘হিদায়াত’ বা পথপ্রদর্শন। এখন প্রশ্ন হলো, যে গুণটির (Attribute) অস্তিত্বই একটি সাপেক্ষ সত্তার (মানুষের) সংশোধনের ওপর নির্ভরশীল, তা কীভাবে একটি নিরপেক্ষ ও পরম সত্তার (আল্লাহর) অনাদি অংশ হতে পারে?
কোরআন আদি অনন্ত শ্বাশত চিরন্তন (ভিডিও)
আসুন শুরুতেই কিছু আলেমের বক্তব্য শুনি,
কোরআন সচেতন সত্তা এবং সাক্ষ্যদাতা
ইসলাম ধর্মের আকীদা হচ্ছে, কোরআন একটি সচেতন সত্তা যে কিয়ামতের দিনে তার পাঠকদের পক্ষে সুপারিশ করবে। সচেতন চিন্তাশীল সত্তা না হোলে এই কাজগুলো করা সম্ভব নয়। এই হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায় যে কুরআনকে একটি সচেতন বা স্বাধীন সত্তা হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা সুপারিশ করে এবং হুজ্জত করে। এটি আল্লাহর মতই আরেকটি আদি অনন্ত সত্তা, যে আল্লাহর কাছে নিজেই সাক্ষ্যও দেয়ার সামর্থ্য রাখে।
হাদীস সম্ভার
১২/ কুরআন
পরিচ্ছেদঃ কুরআন পাঠের ফযীলত
(১৪১০) আবূ উমামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, তোমরা কুরআন পাঠ কর। কেননা, কিয়ামতের দিন কুরআন, তার পাঠকের জন্য সুপারিশকারী হিসাবে আগমন করবে।
(মুসলিম ১৯১০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ উমামাহ্ বাহিলী (রাঃ)
হাদীস সম্ভার
১২/ কুরআন
পরিচ্ছেদঃ কুরআন পাঠের ফযীলত
(১৪১১) জাবের (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন এই কুরআন (কিয়ামতে) সুপারিশকারী; তার সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হবে। (কুরআন) সত্যায়িত প্রতিবাদী। যে ব্যক্তি তাকে নিজ সামনে রাখবে, সে ব্যক্তিকে সে জান্নাতের প্রতি পথপ্রদর্শন করে নিয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি তাকে পিছনে রাখবে, সে ব্যক্তিকে সে জাহান্নামের দিকে পরিচালিত করবে।
(ইবনে হিব্বান ১২৪, সহীহ তারগীব ১৪২৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)
হাদীস সম্ভার
১২/ কুরআন
পরিচ্ছেদঃ কুরআন পাঠের ফযীলত
(১৪১২) আবু উমামাহ বাহেলী (রাঃ) বলেন, আমি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে শুনেছি, তিনি বলেছেন, তোমরা কুরআন পাঠ কর। কেননা, তা কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারীরূপে উপস্থিত হবে। তোমরা দুই জ্যোতির্ময় সূরা; বাক্বারাহ ও আ-লে ইমরান পাঠ কর। কারণ উভয়েই মেঘ অথবা উড়ন্ত পাখীর ঝাঁকের ন্যায় কিয়ামতের দিন উপস্থিত হয়ে তাদের পাঠকারীদের হয়ে (আল্লাহর নিকট) হুজ্জত করবে। তোমরা সূরা বাক্বারাহ পাঠ কর। কারণ তা গ্রহণ করায় বরকত এবং বর্জন করায় পরিতাপ আছে। আর বাতেলপন্থীরা এর মোকাবেলা করতে পারে না। মুআবিয়াহ বিন সাল্লাম বলেন, আমি শুনেছি যে, বাতেলপন্থীরা অর্থাৎ যাদুকরদল।
(মুসলিম ১৯১০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ উমামাহ্ বাহিলী (রাঃ)
হাদীস সম্ভার
১২/ কুরআন
পরিচ্ছেদঃ কুরআন পাঠের ফযীলত
(১৪২৬) আবু হুরাইরা (রাঃ) প্রমুখাৎ বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কিয়ামতের দিন কুরআন উপস্থিত হয়ে বলবে, হে প্রভু! ওকে (কুরআন পাঠকারীকে) অলংকৃত করুন। সুতরাং ওকে সম্মানের মুকুট পরানো হবে। পুনরায় কুরআন বলবে, হে প্রভু! ওকে আরো অলংকার প্রদান করুন। সুতরাং ওকে সম্মানের পোশাক পরানো হবে। অতঃপর বলবে, হে প্রভু! আপনি ওর উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান। সুতরাং আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট হবেন। অতঃপর তাকে বলা হবে, তুমি পাঠ করতে থাক আর মর্যাদায় উন্নীত হতে থাক। আর প্রত্যেকটি আয়াতের বিনিময়ে তার একটি করে সওয়াব বৃদ্ধি করা হবে।
(তিরমিযী ২৯১৫, হাকেম ২০২৯, দারেমী ৩৩১১, সহীহুল জামে ৮০৩০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
কোরআন শ্বাশত ও চিরন্তন
তাফসীরে জালালাইনে বলা হয়েছে—কোরআন সৃষ্টি নয়; বরং অনন্ত, শাশ্বত এবং আল্লাহর বাণী। আল্লাহর বাণী যেহেতু আল্লাহর সত্তার অংশ, তাই সেটিও চিরন্তন [3]।
কুরআন সৃষ্ট নয়; বরং চিরন্তন ও শাশ্বতঃ আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের বিশুদ্ধ আকিদা হলো, কুরআন সৃষ্ট নয়; বরং চিরন্তন ও শাশ্বত। কারণ, কুরআন আল্লাহর কালাম ও বাণী। আর আল্লাহর ন্যায় আল্লাহর বাণী কাদীম তথা চিরন্তন।
কিন্তু মুতাযিলা সম্প্রদায় বলে যে, কুরআন মাখলুক বা সৃষ্ট। তারা দলিল দিতে গিয়ে বলে, আল্লাহ পাক স্বয়ং কুরআনে বলেন:
“আমি একে (কুরআন) বানিয়েছি আরবি ভাষায়।”
তাদের ব্যাখ্যায়, যেহেতু আল্লাহ ‘বানিয়েছি’ বলেছেন, তাই কুরআন নতুন, মাখলুক ও সৃষ্ট বলে তারা দাবি করে।
তাদের এই দাবির জবাবে ইমাম রাযী (রহ.) বলেন:
“আল্লাহর কালাম বাস্তবিক অর্থে ও প্রকৃতগত দিক থেকে কাদীম ও চিরন্তন। অতএব, আল্লাহর বাণীকে সাধারণ শাব্দিক বা জাহেরী কথাবার্তার সঙ্গে তুলনা করা যাবে না।”
আল্লামা আলূসী (রহ.) বলেন:
“উক্ত আয়াতে ‘বানিয়েছি’ শব্দের অর্থ কুরআনের সৃষ্ট হওয়া নয়। বরং এর অর্থ হলো, আল্লাহ লওহে মাহফুযে কুরআনকে আরবি ভাষায় লিখেছেন। তাই মুতাযিলাদের উত্থাপিত প্রশ্ন সঠিক নয়।”
বর্ণিত আছে, হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর নিকট এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করলেন:
“আপনি বলুন, কুরআন কি আল্লাহর বাণী, নাকি আল্লাহর সৃষ্ট কোনো বস্তু?”
তিনি (রা.) উত্তরে বললেন:
“এটা আল্লাহর বাণী। তুমি কি শুননি, আল্লাহ নিজেই বলেছেন…”
লোকটি আবার বলল:
“আপনি কি আল্লাহর বাণীর মধ্যে ‘লা ইসা কমিসলিহি শাইউন’ অর্থাৎ ‘তার মতো কিছুই নেই’— এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করেননি?”
ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন:
“এখানে কুরআনের অর্থ আল্লাহর কালাম, যা লওহে মাহফুযে আরবি ভাষায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।”
— [তাফসীরে রূহুল মা’আনী]

অস্তিত্ববিদ্যার দৃষ্টিতে কোরআন: সিফাত ও উদ্দেশ্যের দ্বন্দ্ব
আহলে সুন্নাহর আকীদা অনুযায়ী, কোরআন আল্লাহর সিফাতুল কালাম (Sifat al-Kalam)। অর্থাৎ, আল্লাহর জ্ঞান বা জীবনের মতোই তাঁর ‘কথা বলা’র গুণটিও চিরন্তন। এর অর্থ, এমন কোনো সময় ছিল না যখন আল্লাহ এই কথাগুলো বলেননি বা এই গুণটি তাঁর মধ্যে ছিল না।
কিন্তু কোরআনের পাঠ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি একটি সাপেক্ষ উদ্দেশ্য ধারণ করে: মানুষের জন্য নির্দেশনা (হিদায়াত)। এবং নির্দেশনা সর্বদাই গ্রহীতা-নির্ভর একটি relational বৈশিষ্ট্য। এখানেই সৃষ্টি হয় অস্তিত্বগত সংকট—একটি পরম ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা কীভাবে এমন একটি গুণ ধারণ করতে পারেন, যার সম্পূর্ণ অর্থই নির্ভর করে পরবর্তী কালে সৃষ্ট, সীমাবদ্ধ ও নশ্বর মানুষের অস্তিত্বের ওপর?
হিদায়াতের তাত্ত্বিক নির্ভরতা (Ontological Dependency of Guidance)
দার্শনিক পরিভাষায়, কোনো সত্তার গুণ (attribute) যদি তার অস্তিত্বের জন্য অন্য কোনো সত্তার ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে সেই গুণ কখনোই পরম (absolute) হতে পারে না। কারণ নির্ভরশীলতা একটি সৃষ্ট ও contingent (সাপেক্ষ) অবস্থা নির্দেশ করে।
ইসলামি তত্ত্ব অনুসারে কোরআন আল্লাহর সিফাতুল কালাম—অর্থাৎ আল্লাহর চিরন্তন “বাক্য”। কিন্তু কোরআন নিজের পরিচয় দেয়—‘হুদাল্লিন্ নাস’ [4] (মানুষের জন্য পথনির্দেশ)।
হিদায়াত নামক কার্য (function) তখনই অর্থপূর্ণ, যখন একটি সুনির্দিষ্ট গ্রহীতা (recipient) বিদ্যমান থাকে।
অতএব, কোরআনের উদ্দেশ্য (হিদায়াত) এবং আল্লাহর সত্তা (ধার্য অনন্ত গুণ) পরস্পরের মধ্যে একটি নির্ভরশীল সম্পর্ক সৃষ্টি করে:
- সত্তা (Allah)
- গুণ (Quran = Guidance)
- লক্ষ্যবস্তু (Human beings)
এই relational ত্রিভুজ থেকে একটি অস্বীকারযোগ্য সত্য উদ্ভাসিত হয়—
যদি গুণের উদ্দেশ্যই মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে সেই গুণ পরম হতে পারে না; আর পরম নয় এমন গুণ পরম সত্তার অনন্ত গুণও হতে পারে না।
নির্দেশনার প্রকৃতি: অর্থ (Meaning) একটি Relational Entity
মানব-নির্দেশনা, নৈতিক আইন, বা শাস্তির ঘোষণা—এসবই relational ধারণা। অর্থাৎ, এগুলোতে “বক্তা–বার্তা–গ্রহীতা” সম্পর্ক অপরিহার্য।
- বক্তা (Speaker) — আল্লাহ
- বার্তা (Message) — কোরআন
- গ্রহীতা (Recipient) — মানুষ
এই তিনটির মধ্যে কোনো একটি অনুপস্থিত হলে নির্দেশনা সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে যায়।
Meaning is inherently recipient-based. গ্রহীতা ছাড়া একটি বাণীর অর্থ মুছে যায়; এটি semantic vacuum-এ রূপান্তরিত হয়।
অতএব, “গ্রহীতা অনুপস্থিত থাকা অবস্থায় অনন্তকাল ধরে অর্থবহ বাণী”—এটি একটি logical impossibility।
সময়-নির্ভরতা সংকট: ঘটনার সাথে বাঁধা আয়াত
কোরআনের অসংখ্য আয়াত নির্দিষ্ট পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় এসেছে:
- “তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে…”
- “যখন উহুদের যুদ্ধে…”
- “তোমরা যদি স্ত্রীদের তালাক দাও…”
- “মুনাফিকরা বলে…”
- “যে দিন তোমাদের ফিরিয়ে আনা হবে…”
এগুলো সবই ঘটনানির্ভর—এগুলোর অর্থ কেবল সময়ের প্রবাহের মধ্যে অর্থবহ।
Time-indexed statements cannot be pre-eternal. সময়-নির্ভর তথ্য কখনোই timeless হতে পারে না।
ফলে, কোরআন অনন্ত হলে এই সমস্যাগুলো অবশ্যম্ভাবীভাবে তৈরি হয়:
- উহুদ কি অনন্তকাল ধরে বিদ্যমান ছিল?
- মুহাম্মাদের বিবাহ কি অনন্তকাল ধরে ঘটমান ছিল?
- সাহাবিদের প্রশ্ন কি pre-eternal?
- মুনাফিকরা কি creation-এর আগেই ছিল?
এগুলো একটি সুস্পষ্ট লজিক্যাল বৈপরীত্য তৈরি করে: ঘটনার পূর্বেই ঘটনার বর্ণনা অনন্তকাল ধরে থাকা সম্ভব নয়।
কালাম নফসি বনাম কালাম লাফজি: একটি অসমাধেয় দ্বন্দ্ব
ইসলামি আকীদায় সবচেয়ে আলোচিত প্রতিরক্ষা হলো “কালাম নফসি বনাম কালাম লাফজি” তত্ত্ব। দাবি করা হয়:
- কালাম নফসি — অর্থ-রূপী, শব্দবিহীন “অনন্ত বাণী”
- কালাম লাফজি — মানুষের কাছে পৌঁছানো শব্দ, অক্ষর, উচ্চারণ
এই তত্ত্বের উদ্দেশ্য হলো কোরআনকে একদিকে “অনন্ত” বলা এবং অন্যদিকে “শব্দ-ধ্বনি”কে সৃষ্টি বলা—দুটি অবস্থানকে একসঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখানো।
কিন্তু সমস্যাটি হলো—
অর্থ (meaning) নিজেও সম্পর্কনির্ভর (relational)। গ্রহীতা ছাড়া কোনো অর্থই অর্থ নয়; এটি “meaningless potentiality”-তে পরিণত হয়।
অতএব:
- শব্দ ছাড়া অর্থ থাকতে পারে
- কিন্তু গ্রহীতা ছাড়া অর্থ থাকতে পারে না
ফলে কালাম নফসি ধারণা সমস্যার সমাধান না করে বরং নতুন এক ontological সংকট সৃষ্টি করে—একটি চিরন্তন “অর্থ”, যার অর্থবোধকতা নির্ভর করে ভবিষ্যতে সৃষ্টি হওয়া মানুষের ওপর।
গ্রহীতা-পূর্ব অবস্থায় “অনন্ত অর্থ” ধারণ করা তার অস্তিত্বকে tautological করে তোলে—এটি একটি অসম্ভব সত্তা (Impossible Entity)।
Null Recipient Problem: ঈশ্বরতত্ত্বের কেন্দ্রীয় দার্শনিক সংকট
ধর্মতত্ত্বে একটি মূল নীতি হলো—কোনও বাণী, হিদায়াত, আইন বা উপদেশ যখন গ্রহীতা ছাড়াই থাকে, তখন সেটি metaphysically meaningless হয়ে যায়।
কিন্তু কোরআন নিজেই ঘোষণা করে যে এটি:
- মানুষের জন্য নির্দেশনা
- মানুষের প্রশ্নের সমাধান
- মানুষকে হুঁশিয়ারি
- মানুষের জন্য আইন
- মানুষের মধ্যে বিবাদ মীমাংসা
সুতরাং কোরআনের উদ্দেশ্য মানব-সাপেক্ষ।
মানুষ ছাড়া কোরআনের হিদায়াত = Null Function; Null Function কখনোই অনন্ত divine attribute হতে পারে না।
এটাই Null Recipient Problem—যা কোরআনের অনন্তত্ব ধারণাকে দার্শনিকভাবে অসম্ভব প্রমাণ করে।
সময়নির্ভর আয়াতগুলোর লজিক্যাল কনট্রাডিকশন টেবিল
কোরআনের সময়–নির্ভরতা বনাম অনন্তত্ব — একটি লজিক্যাল টেবিল
কোরআনের অনন্তত্বের দাবির সঙ্গে এর বাস্তব বিষয়বস্তুর একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। একদিকে বলা হচ্ছে—কোরআন আদি থেকে বিদ্যমান, অনন্ত ও চিরন্তন; অন্যদিকে এর বহু আয়াত সরাসরি নির্ভর করে নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট ঘটনা, নির্দিষ্ট সমাজ ও নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর। নিচের টেবিলে এই সংঘর্ষকে সংক্ষেপে ধরা হয়েছে:
| দাবি (Claim) | বাস্তবতা (Reality) | ফলাফল (Logical Outcome) |
|---|---|---|
| কোরআন চিরন্তন, অনাদি এবং আদি থেকে বিদ্যমান | কোরআনের বহু আয়াত নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রশ্ন, যুদ্ধ, সামাজিক ঘটনা ও আইনগত পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া | সময়সাপেক্ষ ও ঘটনা–নির্ভর বিষয় অনন্ত হতে পারে না → লজিক্যাল বৈপরীত্য |
| কোরআন মানুষের জন্য হিদায়াত | মানুষ নশ্বর এবং পরবর্তীকালে সৃষ্টি; মানুষের অনুপস্থিতিতে হিদায়াতের কোনো অর্থ নেই | হিদায়াতের গুণ গ্রহীতা ছাড়া চিরকাল বিদ্যমান থাকতে পারে না → Ontological dependency |
| কোরআন আল্লাহর অনন্ত গুণ (Sifat) | এই গুণের উদ্দেশ্য (Guidance, Law, Warning) মানুষের ওপর নির্ভরশীল | আল্লাহর একটি গুণ মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে → Aseity (স্বয়ংসম্পূর্ণতা) ভঙ্গ |
| কোরআনের বিধান অনন্তকাল ধরে বিদ্যমান | বিবাহ, তালাক, চুরি, যুদ্ধ, দাসত্ব, সামাজিক বিবাদ—এসব আইন ও ঘটনা সবই creation–এর পরে | ঘটনা–নির্ভর আইন অনন্ত হতে পারে না → Category error |
| কোরআন timeless (সময়ের বাইরে) | কোরআনে “আজ”, “যখন”, “যে দিন”, “তারা জিজ্ঞেস করে” ইত্যাদি time-indexed বাক্য সর্বত্র | Time-indexed বক্তব্য কখনোই timeless হতে পারে না → Temporal contradiction |
| কোরআন একটি সম্পূর্ণ, সর্বকালীন হিদায়াত | অসংখ্য আয়াত নির্দিষ্ট মুহূর্তে উপস্থিত ঘটনাবলীর জন্য ad hoc ভাবে নাজিল | Ad hoc revelation অনন্ত ও পরম পরিকল্পনার সঙ্গে অসঙ্গত |
| কোরআন একটি অনন্ত জ্ঞানসমষ্টি | এতে স্থান–বিশেষ, কাল–বিশেষ, ব্যক্তি–বিশেষ ও সমাজ–বিশেষ সম্পর্কিত প্রসঙ্গ গুচ্ছ | Context–bound content অনন্ত “universal essence” হতে পারে না → Logical impossibility |
এই টেবিল থেকে দেখা যায়—যদি কোরআনের প্রকৃত প্রকৃতি হয় একটি ইতিহাসনির্ভর, ঘটমান, মানুষ–সম্বোধিত, আইনি ও সামাজিক টেক্সট; তবে তাকে একই সাথে “অনন্ত, timeless, pre-creation state থেকে বিদ্যমান” বলা স্ববিরোধী হয়ে যায়।
একটি গ্রন্থ যদি ইতিহাসনির্ভর, ঘটনা–নির্ভর ও মানুষের প্রশ্নের প্রতিক্রিয়ায় নেমে আসা টেক্সট হয়, তবে সেটিকে “আদি থেকে অনন্ত এক divine attribute” বলা—দার্শনিকভাবে অসংগত ও আত্মবিরোধী দাবি।
ঈশ্বরতত্ত্বের তিন ভিত্তি বনাম কোরআনের অনন্তত্ব
ধ্রুপদী একেশ্বরবাদে (Classical Theism) ঈশ্বরকে শুধু সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞানী, সর্বদয় বলা হয় না; বরং তার অস্তিত্বকে আরও তিনটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করা হয়:
- Divine Aseity — ঈশ্বর স্বয়ংসম্পূর্ণ; তিনি কোনো সৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল নন
- Divine Simplicity — ঈশ্বর খণ্ডিত বা অংশবিশিষ্ট নন; তাঁর গুণাবলী তাঁর সত্তা থেকেই অবিচ্ছেদ্য
- Divine Timelessness — ঈশ্বর সময়ের বাইরে; সময়ের প্রবাহ তাঁর ওপর প্রযোজ্য নয়
কোরআনের অনন্তত্বের দাবি করা মাত্রই এই তিন ভিত্তির সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ তৈরি হয়। নিচে একে একে দেখা যাক—
১. Divine Aseity বনাম হিদায়াতের নির্ভরতা
Divine Aseity মানে হলো—ঈশ্বরের অস্তিত্ব এবং গুণাবলী স্বয়ংসম্পূর্ণ; তাঁর কোনো গুণের বাস্তবায়নের জন্য কোনো সৃষ্ট সত্তা অপরিহার্য শর্ত হতে পারে না। তিনি Ghaniyyun ‘anil ‘aalameen—সকল জগতের থেকে বেখবর নন, বরং বেকার; কারো প্রয়োজনীয়তা তাঁর নেই।
কিন্তু কোরআনকে যদি আল্লাহর একটি অনন্ত গুণ ধরা হয়, তখন সাথে সাথেই সমস্যাটি তৈরি হয়, কারণ কোরআনের নিজের দাবিই হচ্ছে—
- এটি মানুষের জন্য হিদায়াত
- মানুষের প্রশ্নের উত্তর
- মানুষের বিবাদ মীমাংসা
- মানুষের জন্য আইন ও শাস্তি
অর্থাৎ, এই গুণের পূর্ণ অর্থ, লক্ষ্য ও কার্যকারিতা নির্ভর করছে মানুষ নামক এক সৃষ্ট সত্তার উপস্থিতি, জিজ্ঞাসা, বিভ্রান্তি এবং সামাজিক বাস্তবতার ওপর।
একটি গুণ, যার উদ্দেশ্য, অর্থ ও কার্যকারিতা সৃষ্ট মানুষের ওপর নির্ভরশীল—তা কোনো পরম ও অমুখাপেক্ষী সত্তার অনন্ত গুণ হতে পারে না।
কোরআন যদি সত্যিই আল্লাহর অনাদি সিফাত হয়, তবে এটি ধরে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না যে—
- আল্লাহ এক অনন্তকাল ধরে এমন একটি গুণ ধারণ করেছেন, যার অর্থ মানুষ ছাড়া অসম্পূর্ণ
- মানুষ সৃষ্টি না করা পর্যন্ত এই গুণ বাস্তবে কোনো অর্থে “হিদায়াত” ছিল না
এর মানে দাঁড়ায়—আল্লাহর একটি গুণ মানুষের উপস্থিতি দ্বারা শর্তাধীন। আর শর্তাধীনতা মানেই aseity বা স্বয়ংসম্পূর্ণতার পতন।
২. Divine Simplicity বনাম কোরআনের খণ্ডিত কাঠামো
Divine Simplicity বলছে—ঈশ্বর কোনো সমষ্টি (composite) নন; তাঁর ভেতরে এমন কোনো অংশ নেই যা আলাদা আলাদা করে খণ্ডিত করা যায়। তাঁর জ্ঞান, শক্তি, জীবন, ইচ্ছা, বাক্য—সবই তাঁর সত্তার সঙ্গে একাত্ম।
কিন্তু কোরআনের বাস্তব কাঠামো দেখলে আমরা পাই—
- ১১৪টি সূরা
- হাজার হাজার আয়াত
- অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন টপিক—আক্বীদা, ফিকহ, দাসত্ব, যুদ্ধ, বিয়ে, তালাক, লুৎ জাতি, নূহ, মূসা, ইত্যাদি
- কখনো গল্প, কখনো আইন, কখনো উপদেশ, কখনো অভিশাপ, কখনো প্রশংসা
অর্থাৎ, কোরআন নিজেই একটি খণ্ডিত টেক্সট (highly structured and segmented composition)।
যদি কোরআন আল্লাহর অনন্ত সিফাত হয়, তবে আল্লাহর ভেতরে সূরা-ভিত্তিক, আয়াত-ভিত্তিক, শর্ত-ভিত্তিক খণ্ডিত এক টেক্সচুয়াল কাঠামো উপস্থিত—এটি Divine Simplicity ধারণার সরাসরি বিরোধী।
অন্যভাবে বললে, দুইটি বিপরীত দাবিকে একসঙ্গে দাঁড় করানো হয়—
- একদিকে বলা হচ্ছে—আল্লাহ খণ্ডিত নন; তাঁর সত্তা সরল, অবিভাজ্য
- অন্যদিকে বলা হচ্ছে—আল্লাহর একটি অনন্ত গুণ হচ্ছে একটি দীর্ঘ, অধ্যায়ভাগ, আয়াতভাগ, প্রসঙ্গভাগ, ইতিহাসভাগ করা “বই”
এ দুইটি দাবিকে একসাথে সত্য বলা দার্শনিকভাবে self-contradictory।
৩. Divine Timelessness বনাম কোরআনের সময়-সূচক আয়াত
Divine Timelessness অনুসারে, ঈশ্বর সময়ের বাইরে। তাঁর ক্ষেত্রে কোনো “আগে–পরে”, “আজ–কাল”, “অতীত–ভবিষ্যৎ” প্রযোজ্য নয়।
কিন্তু কোরআনের ভেতর আমরা দেখি প্রচুর time-indexed (সময়সূচক) বাক্য:
- “আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম…” [5]
- “যখন তোমরা উহুদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিঠ ফিরিয়ে পালিয়ে গেলে…” [6]
- “যেদিন তোমাদের ফিরিয়ে আনা হবে…”
- “তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করে পাহাড়সমূহ সম্পর্কে…”
এই বাক্যগুলো সরাসরি প্রমাণ করে—কোরআনের বক্তব্য সময় ও ঘটনার সাপেক্ষে দাঁড়িয়ে আছে। এগুলোর অর্থ ও কার্যকারিতা “সময়ের বাইরে” গিয়ে কল্পনা করা যায় না।
Time-indexed content কখনোই timeless হতে পারে না। “আজ”, “যখন”, “যে দিন”—এসব সবসময়ই কোনো নির্দিষ্ট সময়বিন্দুর প্রতি ইঙ্গিত করে।
যদি বলা হয়—
- আসল কোরআন timeless; সময়-নির্ভর অংশ কেবল মানুষের জন্য প্রকাশের ভাষা
তাহলে সমস্যাটি আরেক ধাপে চলে যায়—কারণ তখন স্বীকার করতে হয়, কোরআনের একটি “অন্তঃরূপ” আছে, যা মানুষের বোধগম্যের বাইরে; আর মানুষের কাছে এসেছে কেবল তার সময়-নির্ভর, ঘটনার প্রতিক্রিয়াভিত্তিক সংস্করণ।
অর্থাৎ:
- ট্রু-কারণ (Timeless inner speech) = মানুষের অজানা
- পরিচিত কোরআন (Revealed Quran) = সময়-নির্ভর, ঘটনা-নির্ভর, ইতিহাসনির্ভর
তাহলে আমরা যে কোরআন হাতে পাই, তা নিজেই প্রমাণ দিচ্ছে যে এটি কোনোভাবেই pure timeless reality নয়; বরং সময়ের স্রোতের ভেতরে ঢুকে পড়া একটি টেক্সট।
Timeless deity + time-bound eternal book = দার্শনিকভাবে অগ্রহণযোগ্য সমীকরণ।
অনুসিদ্ধান্ত: স্বয়ংসম্পূর্ণতার পতন
এর আগে আলোচনার প্রতিটি স্তরে আমরা দেখলাম—কোরআনকে আল্লাহর চিরন্তন, অনাদি সিফাত হিসেবে গ্রহণ করলে তা ঈশ্বরতত্ত্বের তিন মৌলিক ভিত্তির সঙ্গেই (Aseity, Simplicity, Timelessness) সরাসরি সংঘর্ষ সৃষ্টি করে।
এখন আমরা এসব যুক্তিকে একটি ধারাবাহিক যৌক্তিক রূপে সাজাতে পারি:
- স্বীকার্য ১: আল্লাহ স্বয়ংসম্পূর্ণ (Self-sufficient)। কোনো সৃষ্ট সত্তার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি তাঁর গুণকে প্রভাবিত করতে পারে না।
- স্বীকার্য ২: কোরআন আল্লাহর একটি চিরন্তন গুণ; এটি তাঁর “সিফাতুল কালাম”—যা কখনো সৃষ্টি হয়নি, বরং আল্লাহর সত্তার সঙ্গে অনাদি।
- স্বীকার্য ৩: কোরআনের উদ্দেশ্যই হলো হিদায়াত, আদেশ-নিষেধ, সামাজিক আইন, নৈতিক উপদেশ এবং মানুষের সংশোধন—যা স্বভাবতই গ্রহীতা-নির্ভর।
- স্বীকার্য ৪: মানুষের অস্তিত্ব অনাদি নয়; মানুষ সৃষ্টি হয়েছে পরবর্তীতে। মানুষের অনুপস্থিতিতে “হিদায়াত”, “উপদেশ”, “শাস্তির ঘোষণা”, “আইন”—এসব কিছুই বাস্তব অর্থ বহন করে না।
- দ্বন্দ্ব: যদি কোরআন অনন্তকাল ধরে আল্লাহর সত্তার একটি অংশ হয়ে থাকে, তবে এই গুণের অর্থপূর্ণতা মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
- ফলাফল: আল্লাহর একটি গুণ সৃষ্ট সত্তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাওয়া মানে আল্লাহ আর স্বয়ংসম্পূর্ণ নন—ধ্রুপদী ঈশ্বরতত্ত্বের (Classical Theism) মৌলিক নীতির ভঙ্গ।
- উপসংহার: সুতরাং কোরআন যদি আল্লাহর অনন্ত গুণ হয়, তবে আল্লাহর aseity (অমুখাপেক্ষিতা) ধারণা ভেঙে পড়ে। আর যদি aseity ধারণা অটুট রাখতে হয়, তবে কোরআন অবশ্যই একটি সৃষ্ট, সময়-নির্ভর, ঘটমান টেক্সট—অনন্ত নয়।
এই দ্বন্দ্বটি “mutually exclusive” — অর্থাৎ দুইটি দাবিই একসাথে সত্য হতে পারে না: (১) আল্লাহ স্বয়ংসম্পূর্ণ, (২) তাঁর চিরন্তন গুণ মানুষের ওপর নির্ভরশীল।
ইসলামি আকীদার এই কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে “কালাম নফসি” মতবাদ, “timeless meaning” ধারণা, এবং “creation-less knowledge” যুক্তি দিয়ে; কিন্তু এগুলো কোনোভাবেই relational dependency সমস্যাকে সমাধান করতে পারে না। কারণ সমস্যাটি জ্ঞানের নয়—অর্থের; আর অর্থ সর্বদাই শ্রোতা-নির্ভর।
শেষ কথা
এই প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি আকীদার একটি স্ববিরোধী, কিন্তু গভীরভাবে প্রোথিত ধারণাকে দার্শনিকভাবে বিশ্লেষণ করা—কোরআন “অনন্ত ও চিরন্তন” দাবিটি কীভাবে আল্লাহর স্বয়ংসম্পূর্ণতা, সরলতা, এবং সময়াতীত সত্তার ধারণার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
দেখা গেল—কোরআনের হিদায়াত, আদেশ-নিষেধ, আইন, সামাজিক বিধান, ব্যক্তিক ঘটনা-প্রতিক্রিয়া—এগুলো সবই মানবকেন্দ্রিক এবং সময়নির্ভর। তাই কোরআনকে “অনন্ত গুণ” বলা মানে স্বীকার করা যে আল্লাহর সত্তাগত একটি অংশ মানুষের অস্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল।
একটি চিরন্তন গ্রন্থ যদি মানবকেন্দ্রিক হয়, তবে ঈশ্বর মানবনির্ভর হয়ে পড়েন—এবং সেই মুহূর্তে “পরমত্ব” ধারণাটি ভেঙে যায়।
অতএব, দুটি সম্ভাবনার একটিই সত্য হতে পারে:
- আল্লাহ সত্যিকারার্থে পরম, স্বয়ংসম্পূর্ণ, সময়াতীত—তাহলে কোরআন অবশ্যই সৃষ্টি। উল্লেখ্য, এই স্ববিরোধিতা দার্শনিক আলোচনার জন্য উন্মুক্ত, এবং ইসলামি ধর্মতত্ত্বে এর সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে, যেমন মুতাজিলা মতবাদে কুরআনকে সৃষ্টি বলে। অথবা
- কোরআন অনন্ত—তাহলে আল্লাহর সত্তা মানুষের ওপর নির্ভরশীল ও শর্তাধীন।
উভয়টি একই সাথে সত্য হতে পারে না।
এই কারণে, দার্শনিক ও অস্তিত্ববিদ্যাগত দৃষ্টিতে কোরআনের অনন্তত্ব ধারণাটি মূলত অসঙ্গত, এবং আল্লাহর স্বয়ংসম্পূর্ণতার ধারণার সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই স্ববিরোধিতা শুধু একটি theological technicality নয়—এটি ঈশ্বরের সত্তা সম্পর্কে সবচেয়ে মৌলিক ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
