সময়ানুক্রমে কোরআনের সূরা

হযরত উসমানের কোরআনে নাজিলের ক্রমানুসারে সুরাসমূহের ধারাবাহিকতাটি রক্ষা করা হয়নি। এই কারণে কোন সূরা কখন কোন প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছিল, তা সাধারণ পাঠকের জন্য বোঝা মুশকিল হয়ে যায়। হেরাগুহায় কথিত প্রথম নাজিল হওয়া সূরাটি চলে গেছে ৯৬ নম্বরে, আবার ১১৩ নম্বর সূরা চলে এসেছে ৯ নম্বরে।এইসব কারণে সহজে বোঝার জন্য নিচে কুরআনের সূরাসমূহের নাজিলের সময়ানুক্রম অনুসারে সূরার নাম উল্লেখ করা হলঃ

কোরআন নাজিল টাইমলাইন (গুরুত্বপূর্ণ সূরা ও আয়াত)

প্রারম্ভিক মক্কা থেকে শেষ মদিনা পর্ব পর্যন্ত – অনুমানিক ক্রমধারা

প্রারম্ভিক মক্কা পর্ব (প্রায় ৬১০ খ্রিস্টাব্দ)

সূরা আলাক (৯৬:১–৫)
প্রথম ওহি; হেরা গুহায় আতঙ্কমিশ্রিত অভিজ্ঞতা থেকে নবুয়তের সূচনা। ব্যক্তিগত, গোপনীয় পর্যায়; এখনো প্রকাশ্য দাওয়াত নেই।

প্রারম্ভিক মক্কা পর্ব (৬১০–৬১১ খ্রিঃ)

সূরা মুদ্দাসসির (৭৪)
“ওঠো, সতর্ক করো”—প্রকাশ্য দাওয়াতের আনুষ্ঠানিক শুরু। নবীকে মিশন–কেন্দ্রিক নির্দেশনা।

প্রারম্ভিক মক্কা (৬১০–৬১২ খ্রিঃ)

সূরা মুয্জাম্মিল (৭৩)
রাতের কিয়াম, দীর্ঘ তিলাওয়াত, মানসিক দৃঢ়তা—নবুয়তের চাপ মোকাবেলার আধ্যাত্মিক নির্দেশনা।

প্রারম্ভিক মক্কা (৬১১–৬১২ খ্রিঃ)

সূরা মুরসালাত (৭৭)
কিয়ামতের আতঙ্ক ও শপথমালা—প্রথম দিককার ভয়–ভিত্তিক সতর্কবাণী।

প্রারম্ভিক মক্কা (৬১১–৬১৩ খ্রিঃ)

সূরা মাউন (১০৭)
এতিম–অবহেলা, রিয়ামিশ্রিত নামাজ ও সামাজিক অবিচারের সমালোচনা।

প্রারম্ভিক মক্কা (৬১১–৬১৩ খ্রিঃ)

সূরা তাকভীর (৮১)
সূর্য জোড়ানো, তারাদের ঝরে পড়া—কিয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্যাবলি।

প্রারম্ভিক–মধ্য মক্কা (৬১২–৬১৩ খ্রিঃ)

সূরা যিলযাল (৯৯)
সম্পূর্ণ মাক্কী; পৃথিবীর কম্পন ও কিয়ামতের নাটকীয় দৃশ্য। *তাফসিরসমূহে এর মদিনা হওয়ার মত একেবারে নেই; এটি নিশ্চিতভাবে মাক্কী।*

প্রারম্ভিক–মধ্য মক্কা (৬১২–৬১৪ খ্রিঃ)

সূরা আ’লা (৮৭)
তাওহিদ, হিদায়াত ও পরকালের প্রতিদান—প্রারম্ভিক আকীদা গঠনের মূল অংশ।

মধ্য মক্কা পর্ব (৬১৩–৬১৫ খ্রিঃ)

সূরা নাজম (৫৩)
“সে মনগড়া কথা বলে না”—দেবী–ত্রয়ী (লাত–উজ্জা–মানাত) অংশ এবং শয়তানের আয়াত বিতর্কের সাথে যুক্ত।

মধ্য মক্কা (৬১৪–৬১৬ খ্রিঃ)

সূরা মারইয়াম (১৯)
যাকারিয়া–ইয়াহইয়া–মেরি–ইসা কাহিনি; ইহুদি–খ্রিস্টান প্রশ্নের জবাব হিসেবে ধরা হয়।

মধ্য মক্কা (৬১৪–৬১৭ খ্রিঃ)

সূরা ত্বা–হা (২০)
মুসা–ফেরাউন কাহিনি; মক্কার নিপীড়িত মুসলমানদের জন্য সান্ত্বনার সূরা।

মধ্য মক্কা (৬১৪–৬১৭ খ্রিঃ)

সূরা শুআরা (২৬)
নূহ–হুদ–সালেহ–ইবরাহিম–লূত—এক দীর্ঘ কাহিনি-নির্ভর সূরা; কুরাইশের অবাধ্যের জবাবে পূর্ববর্তী জাতিদের ধ্বংসের উদাহরণ।

মধ্য মক্কা (৬১৫–৬১৭ খ্রিঃ)

সূরা ফুরকান (২৫)
“এটা মানুষের বানানো”—এমন অভিযোগের জবাব; কোরআনকে সত্য-মিথ্যার মাপকাঠি ঘোষণা।

মধ্য মক্কা (৬১৫–৬১৭ খ্রিঃ)

সূরা হিজর (১৫)
কুরাইশদের উপহাস, পূর্ব জাতিদের ধ্বংসের কাহিনি এবং “আমি নিজেই কোরআন রক্ষা করব” ঘোষণা—কোরআনের সংরক্ষণ দাবির ক্ল্যাসিক উৎস।

মধ্য মক্কা (৬১৬–৬১৮ খ্রিঃ)

সূরা ক্বাসাস (২৮)
মুসা–ফেরাউনের সংঘাত, বনি ইসরাইলের মুক্তি—দুর্বল অনুসারীদের জন্য ভবিষ্যৎ জয়ের আশাবাদী বয়ান।

মধ্য মক্কা (৬১৬–৬১৮ খ্রিঃ)

সূরা আর–রূম (৩০)
রোমানদের পরাজয়ের পর ভবিষ্যৎ বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী; পরবর্তীতে রোমের জয়কে “মুজিজা পূরণ” বলা হয়।

মধ্য–শেষ মক্কা (৬১৭–৬১৯ খ্রিঃ)

সূরা ইউনুস (১০)
তাওহিদ, রাসুলদের মিথ্যারোপকারী জাতিদের পরিণতি এবং ইউনুস কাহিনি—মক্কার অস্বীকারকারীদের প্রতি পরোক্ষ হুঁশিয়ারি।

মধ্য–শেষ মক্কা (৬১৭–৬১৯ খ্রিঃ)

সূরা হুদ (১১)
একের পর এক রাসুল ও ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির কাহিনি—এ সূরার ভারী ধমকাত্মক সুরকে ক্ল্যাসিক সূত্রে “চুল পেকে যাওয়ার মতো” কঠিন বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

মধ্য–শেষ মক্কা (৬১৮–৬২০ খ্রিঃ)

সূরা ইউসুফ (১২)
“অহসনুল কাসাস”—ইউসুফ কাহিনি; দীর্ঘ দুঃখ–কষ্টের পর ক্ষমতা ও পুনর্মিলনের happy ending। নিপীড়িত মুসলিমদের জন্য মানসিক সান্ত্বনার বয়ান হিসেবে ব্যবহৃত।

মধ্য–শেষ মক্কা (৬১৮–৬২০ খ্রিঃ)

সূরা আনআম (৬)
বিশদ তাওহিদ, মুশরিকদের দেব-দেবীর সমালোচনা, কোরবানি–সংস্কার—একই সূরায় গাদাগাদি। ক্ল্যাসিকাল বর্ণনায় “এক রাতেই পুরা সূরা নাজিল” বলে উল্লেখ আছে।

শেষ মক্কা পর্ব (৬১৯–৬২১ খ্রিঃ)

সূরা নাহল (১৬)
মৌমাছি, প্রকৃতির নেয়ামত, শিরকের সমালোচনা; “নেয়ামত স্মরণ করানো” টাইপ নরম তাওহিদী ভাষা।

শেষ মক্কা (৬২০–৬২২ খ্রিঃ)

সূরা কাহফ (১৮)
গুহাবাসী যুবক, যুলকারনাইন, প্রাচীর—ইহুদি–খ্রিস্টান উৎসের কাহিনি–প্রশ্নের জবাব বলে উপস্থাপন।

শেষ মক্কা (৬২১–৬২২ খ্রিঃ)

সূরা কাফিরুন (১০৯)
“তোমাদের দ্বীন তোমাদের, আমার দ্বীন আমার”—সমঝোতার পথ ব্যর্থ হওয়ার পর পরিষ্কার ধর্মীয় বিচ্ছেদ ঘোষণা।

শেষ মক্কা (৬২১–৬২২ খ্রিঃ)

সূরা ফাতিহা (১)
“ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম”—দোয়া, ইবাদত ও ‘সোজা পথ’–দাবির সারসংক্ষেপ; পরে প্রতিটি নামাজে বাধ্যতামূলক সূরা হিসেবে ফ্রেমবন্দি করা হয়।

প্রারম্ভিক মদিনা পর্ব (৬২২–৬২৪ খ্রিঃ)

সূরা বাকারাহ (২)
নামাজ, রোজা, কিবলা পরিবর্তন, হজ, ইহুদি–খ্রিস্টানদের সাথে তর্ক, সামাজিক–আইনগত বিধান—প্রথম বড় মদিনী আইনগত সূরা।
এখানে ২:১৯১–১৯৩-এ “তোমরা তাদের হত্যা কর যেখানে পাও…”—যুদ্ধ ও সহিংসতা বৈধ করার মূল টেক্সট হিসেবে ব্যবহৃত।

প্রারম্ভিক মদিনা (বদরের পর, ৬২৪ খ্রিঃ)

সূরা আনফাল (৮)
বদর যুদ্ধের ফলাফল, লুটের মাল বণ্টন, বন্দীদের ব্যবহার—সামরিক অর্থনীতি ও যুদ্ধ–পরবর্তী নীতির মূল সূরা।

প্রারম্ভিক মদিনা (বদরের পর, ৬২৪ খ্রিঃ)

সূরা আনফাল ৮:১২
“আমি কাফেরদের অন্তরে ভয় নিক্ষেপ করব, তাই তোমরা তাদের ঘাড়ের ওপর আঘাত করো এবং তাদের আঙুলের অগ্রভাগে আঘাত করো”— ক্ল্যাসিক তাফসিরে এটি খোলামেলা নির্মমতা ও ভীতি–সৃষ্টি নীতিকে বৈধ করার আয়াত হিসেবে আলোচিত।

প্রারম্ভিক মদিনা (৬২৪–৬২৫ খ্রিঃ)

সূরা আনফাল ৮:৩৯
“ফিতনা দূর না হওয়া পর্যন্ত এবং সব দ্বীন আল্লাহর জন্য না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করো”— জিহাদ–ফিকহে ধর্মীয় একচ্ছত্র আধিপত্যের লক্ষ্য নির্ধারণের কেন্দ্রীয় টেক্সট।

প্রারম্ভিক মদিনা (৬২৪–৬২৫ খ্রিঃ)

সূরা আনফাল ৮:৬০
“যতটা পারো শক্তি ও অশ্ব বাহন প্রস্তুত করো, যার মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর ও তোমাদের শত্রুকে ভয়ভীতিতে রাখবে”— সামরিক শক্তি ও সন্ত্রস্ত করা নিজে থেকেই ধর্মীয় নির্দেশে রূপান্তরিত হয়।

প্রারম্ভিক–মধ্য মদিনা (উহুদের পর, ৬২৫ খ্রিঃ)

সূরা আল ইমরান (৩)
উহুদে পরাজয়, মুসলিমদের পিছু হটা ও শৃঙ্খলাভঙ্গ নিয়ে আলোচনা; একই সঙ্গে খ্রিস্টীয় ইসা–ধর্মতত্ত্বের সমালোচনা—রাজনীতি ও ধর্মতত্ত্বের মিশ্র বয়ান।

মধ্য মদিনা পর্ব (৬২৫–৬২৭ খ্রিঃ)

সূরা নিসা (৪)
উত্তরাধিকার, বিয়ে–তালাক, অনাথ সম্পদ, যুদ্ধ–শহীদদের পরিবার ইত্যাদি—ইসলামী পারিবারিক আইন ও সামাজিক কাঠামোর মূল সূরা।

মধ্য মদিনা (৪ হিজরি, ৬২৫–৬২৬ খ্রিঃ)

নিসা ৪:২৪ — যুদ্ধবন্দী নারীদের বিধান
“মা মালাকাত আইমানুকুম”—ডান হাতের অধিকারভুক্ত নারী— ক্ল্যাসিক ফিকহে যুদ্ধবন্দী ও দাসী নারীদের সাথে যৌন সম্পর্কের বৈধতার মূল টেক্সট হিসেবে ব্যবহৃত।

মধ্য মদিনা (বনু নাদীর নির্বাসন, ৬২৫–৬২৬ খ্রিঃ)

সূরা হাশর (৫৯)
বনি নাদীর গোত্রের বহিষ্কার, সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও ফাই’ সম্পদের বণ্টন। “যেসব ভূমি তোমরা ঘোড়া-উট না ছুটিয়েই পেয়েছ”—এই ধরনের সম্পদ সরাসরি নবী ও রাষ্ট্রের জন্য নির্ধারণের ফ্রেমওয়ার্ক।

মধ্য মদিনা (প্রায় ৬২৬ খ্রিঃ)

সূরা মুহাম্মদ (৪৭)
সম্মুখযুদ্ধে ঘাড়ে আঘাত করা, পরে বন্দীদের শক্তভাবে বেঁধে রাখা, তারপর মুক্তিপণ/অনুগ্রহ— যুদ্ধ, হত্যা ও বন্দীব্যবস্থাকে সরাসরি ওহির ভাষায় বৈধ করার সূরা।

মধ্য মদিনা (৬২৬–৬২৭ খ্রিঃ)

সূরা জুমুআ (৬২)
ব্যবসা–বাণিজ্য ছেড়ে জুমার খুতবায় উপস্থিত হওয়া, নামাজ শেষে পুনরায় রিজিক অনুসন্ধান— সাপ্তাহিক সমষ্টিগত সমাবেশের ধর্মীয় রিচুয়াল ফ্রেম।

মধ্য মদিনা (ইফক ঘটনার পর, ৬২৬–৬২৭ খ্রিঃ)

সূরা নূর (২৪)
আইশার ইফক কাহিনি, চারজন সাক্ষীর শর্ত, অপবাদ–বিস্তারকারীদের শাস্তি এবং শালীনতা–সংক্রান্ত বিধান; নারীদের পোশাক–আচরণ ও গৃহ–শিষ্টাচার নিয়ন্ত্রণের বিস্তারিত নির্দেশ এখানে।

মধ্য মদিনা (খন্দক ও বনু কুরাইযা প্রসঙ্গ, প্রায় ৬২৭ খ্রিঃ)

সূরা আহযাব (৩৩)
মদিনা অবরোধ (খন্দক), বনু কুরাইযার পরিণতি, জয়নাব–বিয়ে, দত্তক–পুত্রের স্ট্যাটাস বাতিল, নবী–স্ত্রীদের জন্য হিজাব ও কড়া বিধান— সামরিক বিজয়, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও ব্যক্তিজীবনের সংকটকে ওহির মাধ্যমে সমাধানের ফ্রেম।

মধ্য–শেষ মদিনা (প্রায় ৬২৮–৬৩০ খ্রিঃ)

সূরা মায়েদা (৫)
খাওয়ার বিধান, নেশা, জুয়া, শিকার, চুরি, হত্যা ও রাষ্ট্রদ্রোহ–সংশ্লিষ্ট শাস্তি—আইনগত সূরা। ৫:৩৩-এ “হত্যা, ক্রুশবিদ্ধ, হাত–পা উল্টো দিকে কাটা বা দেশ থেকে নির্বাসন”—এ ধরনের শাস্তি “আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধকারীদের” জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে; ইসলামী দণ্ডবিধির সবচেয়ে কঠোর টেক্সটগুলোর একটি।

শেষ মদিনা (হুদায়বিয়া চুক্তির পর, প্রায় ৬২৮ খ্রিঃ)

সূরা ফাতহ (৪৮)
আপাতভাবে অসম–মনে হওয়া হুদায়বিয়া চুক্তিকে “পরিষ্কার বিজয়” হিসেবে ঘোষণা; মক্কার সাথে যুদ্ধবিরতি, কূটনৈতিক স্বীকৃতি এবং পরবর্তী মক্কা বিজয়ের পথ খুলে যাওয়াকে ধর্মীয় ভাষ্যে বৈধতা দেয়।

শেষ মদিনা (তাবুক ও পরবর্তী সময়, প্রায় ৬৩০–৬৩১ খ্রিঃ)

সূরা তওবা (৯)
“বারাআত” ঘোষণা—কিছু পুরোনো চুক্তি বাতিল, মুশরিকদের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠন, মুনাফিকদের কড়া ভাষায় সমালোচনা, এবং আহলে কিতাবের ওপর জিজিয়া আরোপের ভিত্তি। পরবর্তী জিহাদ–ফিকহে তলোয়ার, জিজিয়া ও মুশরিক–নীতির কেন্দ্রীয় সূরা হিসেবে ব্যবহৃত।

শেষ মদিনা (হুনাইন ও তাবুকের পর, ৬৩০–৬৩১ খ্রিঃ)

সূরা তওবা ৯:৫ — তথাকথিত “তলোয়ার আয়াত”
“অতএব হারাম মাসসমূহ অতীত হলে তোমরা মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা করো, ধরে ফেলো, অবরুদ্ধ করো এবং প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদেরকে তাড়া করো…”— বহু ক্ল্যাসিক আলেমের মতে এটি মক্কা পর্যায়ের অনেক কোমল আয়াতের নাসিখ; নির্দিষ্ট যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের টেক্সট হিসেবে ব্যবহৃত।

শেষ মদিনা (তাবুক অভিযানের প্রেক্ষাপট, ৬৩০–৬৩১ খ্রিঃ)

সূরা তওবা ৯:২৯
“যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে না… আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে এমন লোকদের সাথে যুদ্ধ করো—যতক্ষণ না তারা জিজিয়া দেয় এবং তারা হীন হয়ে থাকে।” ইসলামী সাম্রাজ্যে অমুসলিমদের জিজিয়া–দায়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধীনতা নির্ধারণে এ আয়াত মূল টেক্সট।

শেষ মদিনা (প্রায় ৬৩০–৬৩১ খ্রিঃ)

সূরা তওবা ৯:১১১
“নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের প্রাণ ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন—এর বিনিময়ে তাদের জন্য জান্নাত; তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, ফলে তারা হত্যা করে এবং নিহতও হয়…”— শহীদী আদর্শ, যুদ্ধ ও আত্মবিসর্জনকে সরাসরি “আল্লাহর সঙ্গে বাণিজ্য” আকারে পবিত্র করার ভাষা।

শেষ মদিনা (অধিকাংশ মতে ৯ হিজরি / প্রায় ৬৩০ খ্রিঃ)

সূরা তাহরীম (৬৬)
নবীর গৃহের অন্তর্কলহ—হাফসার ঘরে মারিয়ার ঘটনা, নবীর শপথ, স্ত্রীদের আচরণ ইত্যাদি নিয়ে তিরস্কার। ব্যক্তিগত পারিবারিক সংকট সরাসরি ওহিতে রূপান্তরিত হয়ে নবী–স্ত্রীদের হুঁশিয়ারি ও আনুগত্যের দাবি হিসেবে হাজির হয়। অধিকাংশ সীরাহ মতে এটি শেষদিকের মদিনা–পর্বের সূরা, তওবা–পরবর্তী সময়ের কাছাকাছি।

শেষ মদিনা (বিদায় হজের সময়, প্রায় ৬৩১ খ্রিঃ — মতভেদসহ)

মায়েদা ৫:৩ — “আজ তোমাদের দ্বীন পূর্ণ করলাম”
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম…”— সুন্নি ধারায় প্রচলিত মতে, ইসলাম সম্পূর্ণ হওয়ার ঘোষণা। অনেক বর্ণনায় এটি বিদায় হজের আরাফার ময়দানে নাজিল বলা হলেও, অন্য হাদিসে দেখা যায়—এরপরেও কিছু বিধান ও আয়াত নাজিল হয়েছে বলে ইশারা আছে; ফলে এটি “সর্বশেষ আয়াত” কি না—সে বিষয়ে ক্ল্যাসিক সূত্রে মতভেদ বিদ্যমান।

শেষ মদিনা (প্রায় ৬৩১–৬৩২ খ্রিঃ)

সূরা নাসর (১১০)
“যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে এবং তুমি দেখবে মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে…”— ক্ল্যাসিক তাফসিরে এটিকে নবুয়ত সমাপ্তি ও নবীর মৃত্যুর পূর্বাভাস হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়; রাজনৈতিক সফলতাকে ধর্মীয় ভাষায় বৈধতা দেওয়ার পাশাপাশি, “দ্বীন প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে, এখন তাসবিহ–ইস্তিগফার করো”—এই মুড।

মৃত্যুর কাছাকাছি সময় (প্রায় জুন ৬৩২ খ্রিঃ)

“শেষ মুহূর্তের হারিয়ে যাওয়া আয়াত” — সহিহ মুসলিম প্রেক্ষাপট
কিছু সহিহ বর্ণনায় উল্লেখ আছে, নবীর জীবনের শেষ দিকে (কিছু বর্ণনায় মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে) কিছু আয়াত নাজিল হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো পরে কোরআনের অফিসিয়াল মুসহাফের লিখিত রসমে সংরক্ষিত হয়নি—কেউ কেউ মুখস্থ করেছিল, কেউ ভুলে গেছে বলেও বর্ণনা আছে। কোরআন–সংকলন, নস্ক (abrogation) ও “হারানো তিলাওয়াত” বিতর্কে এসব বর্ণনা গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

শেষ মদিনা (প্রায় ৬২৯–৬৩২ খ্রিঃ, বিভিন্ন বর্ণনা)

স্তন্যপান ও রজমের “মুফতুল তিলাওয়া, মাবকী আল–হুকম” আয়াতসমূহ
কিছু সহিহ/হাসান হাদিসে “প্রাপ্তবয়স্ককে স্তন্যপান করানোর” আয়াত এবং “বিবাহিত ব্যভিচারীর জন্য রজমের” আয়াতের উল্লেখ আছে— যেগুলো কোনো এক সময় কোরআন হিসেবে তিলাওয়াত করা হতো, কিন্তু পরে মুসহাফের লিখিত পাঠে রাখা হয়নি, অথচ শাস্তি (হুকম) বহাল আছে বলে ফিকহে এগুলোকে “মুফতুল তিলাওয়া, মাবকী আল–হুকম” শ্রেণিতে আলোচনা করা হয়। দাসপ্রথা, যৌনতা ও হত্যাদণ্ড–সংক্রান্ত আধুনিক সমালোচনায় এই হারানো আয়াত–ধারণা একটি কেন্দ্রীয় বিতর্কের অংশ।

ক্রমানুসারে সুরাগুলির তালিকা

ক্রমসুরার নামবর্তমান কোরআনে ক্রমস্থানমন্তব্যআয়াতের সংখ্যা
আল-আলাক

(রক্তপিন্ড)

96মক্কী
আল-কলম

(কলম)

68মক্কী১৭-৩৩ এবং ৪৮-৫০ আয়াত মদিনায় নাজিল
আল-মুযযাম্মিল

(বস্ত্র আচ্ছাদনকারী)

73মক্কী১০, ১১ এবং ২০ আয়াত মদিনায় নাজিল
আল-মুদ্দাসসির

( পোশাক পরিহিত)

74মক্কী
আল-ফাতিহা1মক্কী
আল-মাসাদ111মক্কী
আত-তাকওয়ির81মক্কী
আল-আ’লা87মক্কী
আল-লাইল92মক্কী
১০আল-ফজর89মক্কী
১১আদ-দুহা93মক্কী
১২আশ-শরাহ94মক্কী
১৩আল-আসর103মক্কী
১৪আল-আদিয়াত100মক্কী
১৫আল-কাউসার108মক্কী
১৬আত-তাকাসুর102মক্কী
১৭আল-মাউন107মক্কী১-৩ আয়াত মক্কায়, বাকি মদিনায় নাজিল
১৮আল-কাফিরুন109মক্কী
১৯আল-ফিল105মক্কী
২০আল-ফালাক113মক্কী
২১আন-নাস114মক্কী
২২আল-ইখলাস112মক্কী
২৩আন-নাজম53মক্কী৩২ আয়াত মদিনায় নাজিল
২৪আবাসা80মক্কী
২৫আল-কদর97মক্কী
২৬আশ-শামস91মক্কী
২৭আল-বরুজ85মক্কী
২৮আত-তিন95মক্কী
২৯কুরাইশ106মক্কী
৩০আল-কারিয়া101মক্কী
৩১আল-কিয়ামাহ75মক্কী
৩২আল-হুমাজাহ104মক্কী
৩৩আল-মুরসালাত77মক্কী৪৮ আয়াত মদিনায় নাজিল
৩৪ক্বাফ50মক্কী৩৮ আয়াত মদিনায় নাজিল
৩৫আল-বালাদ90মক্কী
৩৬আত-তারিক86মক্কী
৩৭আল-কামার54মক্কী৪৪-৪৬ আয়াত মদিনায় নাজিল
৩৮সাদ38মক্কী
৩৯আল-আরাফ7মক্কী১৬৩-১৭০ আয়াত মদিনায় নাজিল
৪০আল-জিন72মক্কী
৪১ইয়াসিন36মক্কী৪৫ আয়াত মদিনায় নাজিল
৪২আল-ফুরকান25মক্কী৬৮-৭০ আয়াত মদিনায় নাজিল
৪৩ফাতির35মক্কী
৪৪মরিয়ম19মক্কী৫৮ এবং ৭১ আয়াত মদিনায় নাজিল
৪৫ত্বা-হা20মক্কী১৩০ এবং ১৩১ আয়াত মদিনায় নাজিল
৪৬আল-ওয়াকিয়া56মক্কী৮১ এবং ৮২ আয়াত মদিনায় নাজিল
৪৭আশ-শুআরা26মক্কী১৯৭ এবং ২২৪-২২৭ আয়াত মদিনায় নাজিল
৪৮আন-নামল27মক্কী
৪৯আল-কাসাস28মক্কী৫২-৫৫ আয়াত মদিনায় নাজিল; হিজরার সময় ৮৫ আয়াত জুহফায় নাজিল
৫০আল-ইসরা17মক্কী২৬, ৩২, ৩৩, ৫৭, ৭৩-৮০ আয়াত মদিনায় নাজিল
৫১ইউনুস10মক্কী৪০, ৯৪, ৯৫, ৯৬ আয়াত মদিনায় নাজিল
৫২হুদ11মক্কী১২, ১৭, ১১৪ আয়াত মদিনায় নাজিল
৫৩ইউসুফ12মক্কী১, ২, ৩, ৭ আয়াত মদিনায় নাজিল
৫৪আল-হিজর15মক্কী৮৭ আয়াত মদিনায় নাজিল
৫৫আল-আন’আম6মক্কী২০, ২৩, ৯১, ৯৩, ১১৪, ১৫১-১৫৩ আয়াত মদিনায় নাজিল
৫৬আস-সাফফাত37মক্কী
৫৭লুকমান31মক্কী২৭-২৯ আয়াত মদিনায় নাজিল
৫৮সাবা34মক্কী
৫৯আজ-জুমার39মক্কী
৬০আল-মু’মিন40মক্কী৫৬-৫৭ আয়াত মদিনায় নাজিল
৬১ফুসসিলাত41মক্কী
৬২আশ-শুরা42মক্কী২৩, ২৪, ২৫, ২৭ আয়াত মদিনায় নাজিল
৬৩আজ-যুখরুফ43মক্কী৫৪ আয়াত মদিনায় নাজিল
৬৪আদ-দুখান44মক্কী
৬৫আল-জাসিয়া45মক্কী১৪ আয়াত মদিনায় নাজিল
৬৬আল-আহকাফ46মক্কী১০, ১৫, ৩৫ আয়াত মদিনায় নাজিল
৬৭আদ-ধারিয়াত51মক্কী
৬৮আল-গাশিয়াহ88মক্কী
৬৯আল-কাহফ18মক্কী২৮, ৮৩-১০১ আয়াত মদিনায় নাজিল
৭০আন-নাহল16মক্কীশেষ তিনটি আয়াত মদিনায় নাজিল
৭১নুহ71মক্কী
৭২ইব্রাহিম14মক্কী২৮, ২৯ আয়াত মদিনায় নাজিল
৭৩আল-আম্বিয়া21মক্কী
৭৪আল-মুমিনুন23মক্কী
৭৫আস-সাজদাহ32মক্কী১৬-২০ আয়াত মদিনায় নাজিল
৭৬আত-তুর52মক্কী
৭৭আল-মুল্ক67মক্কী
৭৮আল-হাক্কাহ69মক্কী
৭৯আল-মাআরিজ70মক্কী
৮০আন-নাবা78মক্কী
৮১আন-নাজিয়াত79মক্কী
৮২আল-ইনফিতার82মক্কী
৮৩আল-ইনশিকাক84মক্কী
৮৪আর-রুম30মক্কী১৭ আয়াত মদিনায় নাজিল
৮৫আল-আনকাবুত29মক্কী১-১১ আয়াত মদিনায় নাজিল
৮৬আল-মুতাফিফিন83মক্কী
৮৭আল-বাকারা2মদিনায়২৮১ আয়াত মিনা থেকে, শেষ হজের সময় নাজিল
৮৮আল-আনফাল8মদিনায়৩০-৩৬ আয়াত মক্কায় নাজিল
৮৯আলে ইমরান3মদিনায়
৯০আল-আহযাব33মদিনায়
৯১আল-মুমতাহানা60মদিনায়
৯২আন-নিসা4মদিনায়
৯৩আজ-যালযালা99মদিনায়
৯৪আল-হাদিদ57মদিনায়
৯৫মুহাম্মদ47মদিনায়১৩ আয়াত হিজরার সময় নাজিল
৯৬আর-রাদ13মদিনায়
৯৭আর-রহমান55মদিনায়
৯৮আল-ইনসান76মদিনায়
৯৯আত-তালাক65মদিনায়
১০০আল-ব্যয়্যিনাহ98মদিনায়
১০১আল-হাশর59মদিনায়
১০২আন-নূর24মদিনায়
১০৩আল-হাজ্জ22মদিনায়৫২-৫৫ আয়াত মক্কা ও মদিনার মধ্যে নাজিল
১০৪আল-মুনাফিকুন63মদিনায়
১০৫আল-মুজাদিলা58মদিনায়
১০৬আল-হুজুরাত49মদিনায়
১০৭আত-তাহরিম66মদিনায়
১০৮আত-তাগাবুন64মদিনায়
১০৯আস-সাফ61মদিনায়
১১০আল-জুমুআ62মদিনায়
১১১আল-ফাতহ48মদিনায়হুদাইবিয়ার ফিরে আসার সময় নাজিল
১১২আল-মায়িদা5মদিনায়৩ আয়াত আরাফাতে শেষ হজের সময় নাজিল
১১৩আত-তাওবা

(অনুশোচনা)

আল বারায়াত ( সম্পর্কচ্ছেদ ও দায়িত্বমুক্ত )
9মদিনায়শেষ দুটি আয়াত মক্কায় নাজিল
১১৪আন-নাসর

(স্বর্গীয় সাহায্য)

110মদিনায়শেষ হজের সময় মিনায় নাজিল, তবে এটি মদিনার সুরা হিসেবে গণ্য