কোরআনের ভ্রূণতত্ত্ব বনাম আধুনিক এমব্রায়োলজি

Table of Contents

ভূমিকা

মানবভ্রূণের গঠন ও বিকাশ নিয়ে কোরআনের আয়াতগুলো নিয়ে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ইসলামি লেখক ও দাওয়াতি চক্রের মধ্যে “বৈজ্ঞানিক মিরাকল” দাবি এক প্রচলিত আলোচনায় পরিণত হয়েছে। তারা মনে করেন, সপ্তম শতকের একজন নিরক্ষর ব্যক্তি এমন নির্ভুল ভ্রূণতত্ত্ব কেবল ঈশ্বরীয় প্রেরণার মাধ্যমেই জানতেন। এই দাবির ভিত্তি মূলত সূরা আল-মুমিনূন (২৩:১২–১৪)–এর আয়াতসমূহ, যেখানে “নুতফা (বিন্দু) → আলাকা (ঝুলন্ত বস্তু বা রক্তজমাট) → মুদগা (চিবানো পিণ্ড)”—এমন এক ধারাবর্ণনা পাওয়া যায়। ইসলামিস্ট ব্যাখ্যাকাররা বলেন, এই ভাষায় আধুনিক এমব্রায়োলজির গোপন তথ্য নিহিত আছে।

কিন্তু যখন এই দাবিগুলো বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে যাচাই করা হয়, তখন একাধিক মৌলিক সমস্যা প্রকাশ পায়। বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো—অ্যানএম্বিগুইটি (unambiguity), অর্থাৎ কোনো বৈজ্ঞানিক বক্তব্য স্পষ্ট, নির্দিষ্ট ও পুনরাবৃত্তিযোগ্য হতে হবে। বিজ্ঞানে এমন কোনো বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয় যা সময়, সংস্কৃতি, বা ব্যাখ্যাকারকের ইচ্ছানুযায়ী অর্থ বদলাতে পারে। কিন্তু কোরআনের ভ্রূণতত্ত্ব সম্পর্কিত আয়াতগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, এর শব্দ ও টার্মগুলোর অর্থ নির্দিষ্ট নয়। “আলাকা” কখনো “ঝুলে থাকা”, কখনো “জোঁকসদৃশ বস্তু”, আবার কখনো “জমাট রক্ত” বলে ব্যাখ্যা করা হয়; “মুদগা” অনুবাদ হয় কখনো “চিবানো টুকরা”, কখনো “মাংসপিণ্ড”। এই বহুবিধ অর্থগত দোলাচল প্রমাণ করে যে পাঠ্যটি অ্যাম্বিগুয়াস—এর ব্যাখ্যা ব্যাখ্যাকারকের দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করে বদলে যায়।

যে কোনো বক্তব্য যদি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যাখ্যা করা যায়, তবে সেটিকে বিজ্ঞান বলা যায় না। বিজ্ঞানের দাবিগুলো ফলসিফায়েবল (falsifiable) হতে হয়—অর্থাৎ পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভুল প্রমাণ করা সম্ভব হতে হবে। কিন্তু ইসলামিস্টদের “কোরআনের ভ্রূণতত্ত্ব” ব্যাখ্যা এমনভাবে উপস্থাপিত যে তা কখনো খণ্ডনযোগ্য নয়। বিজ্ঞান কোনো বক্তব্যকে অলৌকিক বা সর্বদা সত্য ঘোষণা করে না; বরং তার সত্যতা শর্তাধীন ও পরীক্ষাযোগ্য। অন্যদিকে কোরআনের বর্ণনাগুলো এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যেন তা যেকোনো নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্যের সাথে জোড়া লাগানো যায়—যা একে ফলসিফায়াবিলিটি থেকে মুক্ত, অর্থাৎ “অবিজ্ঞানের আওতায়” ফেলে দেয়।

এই প্রবন্ধে তাই আলোচিত হয়েছে—কোরআনের ভ্রূণতত্ত্ব আসলে আধুনিক বিজ্ঞানের পূর্বাভাস নয়, বরং প্রাচীন বিশ্বের জৈবধারণার ভাষাগত প্রতিফলন। এখানে আমরা দেখব, কীভাবে আয়াতের শব্দগুলো যুগে যুগে পরিবর্তিত ব্যাখ্যা পেয়েছে, কেন এগুলোর কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক অর্থ দাঁড়ায় না, এবং কেন ইসলামিস্টদের এই “মিরাকল” দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক যাচাইযোগ্যতা নেই।


কোরআনের দাবী

কোরআনে মানবভ্রূণের বিকাশ নিয়ে বেশ কিছু আয়াত রয়েছে। সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত হয় সূরা আল-মুমিনূন (২৩:১২–১৪) থেকে যেগুলো হচ্ছে,

আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি।
— Taisirul Quran
আমিতো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির উপাদান হতে।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর অবশ্যই আমি মানুষকে মাটির নির্যাস থেকে সৃষ্টি করেছি।
— Rawai Al-bayan
আর অবশ্যই আমরা মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির উপাদান থেকে [১],
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দু রূপে এক সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি।
— Taisirul Quran
অতঃপর আমি ওকে শুক্রবিন্দু রূপে স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে।
— Sheikh Mujibur Rahman
তারপর আমি তাকে শুক্ররূপে সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি।
— Rawai Al-bayan
তারপর আমরা তাকে শুক্রবিন্দুরূপে স্থাপন করি এক নিরাপদ ভাণ্ডারে;
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি জমাট বাঁধা রক্তে, অতঃপর মাংসপিন্ডকে পরিণত করি হাড্ডিতে, অতঃপর হাড্ডিকে আবৃত করি মাংস দিয়ে, অতঃপর তাকে এক নতুন সৃষ্টিতে উন্নীত করি। কাজেই সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কতই না মহান!
— Taisirul Quran
পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি রক্তপিন্ডে, অতঃপর রক্তপিন্ডকে পরিণত করি মাংসপিন্ডে এবং মাংসপিন্ডকে পরিণত করি অস্থিপঞ্জরে; অতঃপর অস্থিপঞ্জরকে ঢেকে দিই মাংস দ্বারা; অবশেষে ওকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টি রূপে; অতএব নিপুণতম স্রষ্টা আল্লাহ কত কল্যাণময়!
— Sheikh Mujibur Rahman
তারপর শুক্রকে আমি ‘আলাকায় পরিণত করি। তারপর ‘আলাকাকে গোশতপিন্ডে পরিণত করি। তারপর গোশতপিন্ডকে হাড়ে পরিণত করি। তারপর হাড়কে গোশ্ত দিয়ে আবৃত করি। অতঃপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুলি। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়!
— Rawai Al-bayan
পরে আমরা শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি ‘আলাকা-তে, অতঃপর ‘আলাকা-কে পরিণত করি গোশতপিণ্ডে, অতঃপর গোশতপিণ্ডকে পরিণত করি অস্থিতে; অতঃপর অস্থিকে ঢেকে দেই গোশত দিয়ে; তারপর তাকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টিরূপে [১]। অতএব, (দেখে নিন) সর্বোত্তম স্রষ্টা [২] আল্লাহ্‌ কত বরকতময় [৩]!
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria


এই আয়াতগুলোর ভিত্তিতে ইসলাম প্রচারকগণ দাবি করেন—কোরআনে এমন কিছু বৈজ্ঞানিক সত্য বলা হয়েছে, যা আধুনিক ভ্রূণবিদ্যার (embryology) সঙ্গে চমকপ্রদভাবে মিলে যায়। যা তারা কোরআনের ঈশ্বরিক গ্রন্থ হওয়ার প্রমাণ হিসেবে হাজির করেন। কিন্তু বাস্তব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এসব ধারণা আসলে সপ্তম শতকের আরব উপদ্বীপে প্রচলিত প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি ও চিন্তাধারারই প্রতিফলন—যা এর শত শত বছর আগে থেকেই গ্রীক, ভারতীয়, ইহুদি-খ্রিস্টান এবং মেসোপটেমীয় সভ্যতায় বিদ্যমান ছিল। এই প্রবন্ধে আমরা সেইসব ঐতিহাসিক দলিল প্রমাণগুলো দেখবো, একইসাথে কোরআনের এই আয়াতগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করবো।


হাদিসে ৪০–৪০–৪০ দিনের ধাপ

বুখারী ও মুসলিম সহকারে বেশ কিছু হাদিসে বর্ণিত আছে, ভ্রূণ গঠনের তিনটি ধাপ—প্রতিটি ৪০ দিন করে, অর্থাৎ ১২০ দিন পর ফেরেশতা এসে ভাগ্য নির্ধারণ করে। এই “৪০–৪০–৪০” মডেল অনুযায়ী প্রথম ৪০ দিন নুতফা, পরের ৪০ দিন আলাকা, পরের ৪০ দিন মুদগা। [1] [2] [3] [4] [5][6]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছেদঃ ৫৯/৬. ফেরেশতাদের বর্ণনা।
৩২০৮. যায়দ ইবনু ওয়াহব (রহ.) হতে বর্ণিত। ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, সত্যবাদী হিসেবে গৃহীত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, নিশ্চয় তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান নিজ নিজ মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত বীর্যরূপে অবস্থান করে, অতঃপর তা জমাট বাঁধা রক্তে পরিণত হয়। ঐভাবে চল্লিশ দিন অবস্থান করে। অতঃপর তা মাংসপিন্ডে পরিণত হয়ে (আগের মত চল্লিশ দিন) থাকে। অতঃপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। আর তাঁকে চারটি বিষয়ে আদেশ দেয়া হয়। তাঁকে লিপিবদ্ধ করতে বলা হয়, তার ‘আমল, তার রিয্ক, তার আয়ু এবং সে কি পাপী হবে না নেককার হবে। অতঃপর তার মধ্যে আত্মা ফুঁকে দেয়া হয়। কাজেই তোমাদের কোন ব্যক্তি ‘আমল করতে করতে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, তার এবং জান্নাতের মাঝে মাত্র এক হাত পার্থক্য থাকে। এমন সময় তার ‘আমলনামা তার উপর জয়ী হয়। তখন সে জাহান্নামবাসীর মত আমল করে। আর একজন ‘আমল করতে করতে এমন স্তরে পৌঁছে যে, তার এবং জাহান্নামের মাঝে মাত্র এক হাত তফাৎ থাকে, এমন সময় তার ‘আমলনামা তার উপর জয়ী হয়। ফলে সে জান্নাতবাসীর মত ‘আমল করে। (৩৩৩২, ৬৫৯৪, ৭৪৫৪) (মুসলিম ৪৭/১ হাঃ ৩৬৪৩, আহমাদ ৩৬২৪) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৯৬৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৯৭৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ যায়দ ইবনু ওয়াহব (রহঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৮/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ১. মাতৃ উদরে মানুষ সৃষ্টির অবস্থা (ক্রমধারা), তার রিযক, তার মৃত্যু, তার আমল এবং তার দুর্ভাগ্য ও তার সৌভাগ্য লিপিবদ্ধকরণ
৬৪৮২। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা ও মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ ইবন নুমায়র (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাদিকুল মাসদূক (সত্যপরায়ণ ও সত্যনিষ্ঠরূপে প্রত্যায়িত) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের হাদীস শুনিয়েছেন যে, তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি (শুক্র) তার মাতৃ উদরে চল্লিশ দিন জমাট থাকে। এরপর অনুরুপ চল্লিশ দিনে রক্তপিণ্ডে পরিণত হয়। এরপর অনুরুপ চল্লিশ দিনে তা একটি মাংস পিণ্ডের রুপ নেয়। এরপর আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে একজন ফিরিশতা পাঠানো হয়। সে তাতে রুহ ফুকে দেয়। আর তাঁকে চারটি বিষয় লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আর তা হল এই- তার রিযক, তার মৃত্যুক্ষণ, তার কর্ম, এবং তার বদকার ও নেককার হওয়া।
সেই সত্তার কসম যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই! নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ জান্নাতীদের মত আমল করতে থাকে। অবশেষে তার ও জান্নাতের মাঝখানে মাত্র একহাত ব্যবধান থাকে। এরপর তাকদীরের লিখন তার উপর জয়ী হয়ে যায়। ফলে সে জাহান্নামীদের ন্যায় কাজ-কর্ম শুরু করে। এরপর সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়। আর তোমাদের মধ্যে কোন কোন ব্যক্তি জাহান্নামের কাজ-কর্ম করতে থাকে। অবশেষে তার ও জাহান্নামের মাঝখানে একহাত মাত্র ব্যবধান থাকে। এরপর ভাগ্যলিপি তার উপর জয়ী হয়। ফলে সে জান্নাতীদের ন্যায় আমল করে। অবশেষে জান্নাতে দাখিল হয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ‌ ইব্‌ন মাসউদ (রাঃ)

সুনান আত তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৫/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ শেষ অবস্থার উপর ভিত্তি করে আমলের এ’তেবার।
২১৪০. হান্নাদ (রহঃ) ….. আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি হচ্ছেন সত্যবাদী এবং সত্যবাদী বলে স্বীকৃতও তিনি আমাদেরকে বর্ণনা করেছেনঃ মার পেটে তোমাদের কারো সৃষ্টি গঠন সমন্বিত হয় চল্লিশ দিনে। এরপর তত দিনে হয় আলাকা এরপর তত দিনে মাংসপিণ্ড। এরপর তার কাছে আল্লাহ এক ফিরিশতা পাঠান। তিনি তার মাঝে রূহ ফুঁকেন এবং তাকে চারটি বিষয়ে নির্দেশ করা হয়। তিনি লিখেন তার রিযক, তার মৃত্যু, তার আমল এবং সে নেক বখত না বদবখত।
সেই সত্তার কসম যিনি ছাড়া কোন ইলাহ নাই, আমাদের কেউ জান্নাতবাসীর আমল করতে থাকে এমনকি তার এবং জান্নাতের মাঝে মাত্র একহাতের ব্যবধান বাকী থাকতে ভাগ্যের লিখন তার উপর প্রবল হয়ে উঠে আর জাহান্নামবাসীর আমলে তার জীবনের সমাপ্তি ঘটে, অনন্তর সে জাহান্নামেই প্রবেশ করে।
আবার তোমাদের কেউ জাহান্নামবাসীর আমল করতে থাকে এমনকি তার এবং জাহান্নামের মাঝে মাত্র এক হাত ব্যবধান বাকী থাকতে তার উপর ভাগ্যলিপি প্রবল হয়ে উঠে আর জান্নাতবাসীর আমলের মাধ্যমে তার জীবন সমাপ্তি ঘটে। আর সে জান্নাতেই প্রবেশ করে। সহীহ, ইবনু মাজাহ ৭৬, বুখারি মুসলিম, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ২১৩৭ [আল মাদানী প্রকাশনী]
(আবু ঈসা বলেন) এ হাদীসটি হাসান-সহীহ। মুহাম্মদ ইবন বাশশার (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বর্ণনা করেছেন … অতপর তিনি অনুরূপ উল্লেখ করেছেন।
এ বিষয়ে অূ হুরায়রা ও আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। আহমাদ ইবন হাসান (রহঃ) বলেনঃ আমি আহমাদ ইবন হাম্বাল (রহঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ কাত্তানের মত কাউকে আমার দুই চোখে দেখিনি। এ হাদীসটি হাসান-সহীহ। শু’বা এবং ছাওরী (রহঃ)-ও এটিকে আ’মাশ থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মদ ইবন ’আলা (রহঃ) যায়দ (রহঃ) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ‌ ইব্‌ন মাসউদ (রাঃ)

কিন্তু আধুনিক ভ্রূণবিদ্যায় প্রথম ৪০ দিনের মধ্যেই হৃদযন্ত্রের স্পন্দন, অঙ্গ-অঙ্গানুর প্রাইমর্ডিয়া, লিম্ব-বাড ইত্যাদি গঠন শুরু হয়ে যায়। অর্থাৎ, কোরআন ও হাদিসের এই টাইমলাইন বাস্তব মেডিক্যাল সায়েন্স এবং জীববিজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।


প্রাচীন বিশ্বের ধারণা: কোরআনের পূর্বসূত্র

মেসোপটেমিয়া

Atrahasis কাব্যে বলা হয়: দেবতার রক্ত ও মাটির সংমিশ্রণে মানুষ সৃষ্টি। [7]

Enuma Elish-এও একই ধাঁচে Kingu দেবতার রক্ত থেকে মানুষের উৎপত্তি বর্ণিত। [8]


গ্রীক ধারা

হিপোক্রাটিস (Hippocrates, খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০–৩৭০) লিখেছিলেন—“বীজ শরীরের সব অংশ থেকে আসে; মায়ের রক্ত ভ্রূণকে পুষ্টি দেয়; গর্ভধারণ হলে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়।” [9]

এরিস্টোটল তাঁর Generation of Animals গ্রন্থে লিখেছিলেন, ভ্রূণ প্রথমে তরল রক্তের মতো, পরে ধীরে ধীরে অঙ্গ তৈরি হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ আগে গড়ে উঠে এবং “রক্তই জীবনের মূল উপাদান।” [10]

গ্যালেন (Galen, খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক) তাঁর On the Formation of the Foetus বইয়ে চার ধাপ উল্লেখ করেন—[11]
১) বীজরূপ ধাপ,
২) রক্তপূর্ণ ভ্রূণ,
৩) মাংসপিণ্ড,
৪) অঙ্গসমূহ সম্পূর্ণ গঠন।

এই চার ধাপ ও কোরআনের “নুতফা→আলাকা→মুদগা→অস্থি→মাংস” ধারার মধ্যে মিল স্পষ্ট।


হিপোক্রেটিসের লেখায় “মায়ের রক্তে পুষ্ট ঝিল্লির ভিতরে ভ্রূণ”,
এরিস্টোটলের গ্রন্থে “ঝিল্লি ও অম্বিলিকাসের মাধ্যমে রক্তের সরবরাহ”,
গ্যালেনের চার ধাপের বর্ণনায় “বীজ → রক্তপূর্ণ ভ্রূণ → মাংস → গঠিত শিশু”—এই ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়।


ইহুদি-খ্রিস্টান ঐতিহ্য

যব (Job 10:10–12): “তুমি আমাকে দুধের মতো ঢেলেছ এবং পনিরের মতো জমাট করেছ; তুমি আমাকে চামড়া ও মাংস দিয়ে ঢেকেছ; অস্থি ও সিনিউ দ্বারা আমাকে জুড়েছ।” [12]

গীতসংহিতা (Psalm 139:13–16): “তুমি আমার অন্তরের সৃষ্টি করেছ; তুমি আমাকে মাতৃগর্ভে বুনেছ; আমি তোমার প্রশংসা করি কারণ আমি আশ্চর্যভাবে গঠিত।” [13]

তালমুদ (Yevamot 69b): “গর্ভধারণের প্রথম ৪০ দিন পর্যন্ত ভ্রূণ শুধুই জল।” [14]

Niddah 30b-তেও একইরকম ব্যাখ্যা আছে। (Talmud: Niddah 30b ))


ভারতীয় ঐতিহ্য

গর্ভ উপনিষদে বলা হয়েছে: “রক্ত ও শুক্রের সংযোগে ভ্রূণ সৃষ্টি হয়। প্রথম দিনে ‘কলল’, সাত দিনে বুদবুদ, পনের দিনে গোলক, এক মাসে দৃঢ় পিণ্ড।” [15]


চীনা ধারণা

Mawangdui চিকিৎসা-পাণ্ডুলিপি (খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক): ভ্রূণ বিকাশের মাসানুক্রম বর্ণনা—“প্রথম মাসে রক্ত, দ্বিতীয় মাসে মাংস, তৃতীয় মাসে হাড়, চতুর্থ মাসে চামড়া।” [16]


তুলনামূলক সারণি (বাংলা অনুবাদ)

তারিখউৎসবর্ণনা
খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০গর্ভ উপনিষদ (হিন্দু ধর্মগ্রন্থ)“রক্ত ও শুক্রের সংযোগে ভ্রূণ জন্ম নেয়। এক দিনে ‘কলল’, সাত দিনে বুদবুদ, পনের দিনে গোলক, এক মাসে কঠিন পিণ্ড।” [17]
খ্রিস্টপূর্ব ১০০০যব (Job, ইহুদি-খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থ)“তুমি আমাকে দুধের মতো ঢেলেছ ও পনিরের মতো জমাট করেছ; মাংস ও চামড়া দিয়ে আচ্ছাদিত করেছ; অস্থি ও সিনিউ দ্বারা জুড়েছ।” [18]
খ্রিস্টপূর্ব ৫০০গীতসংহিতা (Psalm 139)“তুমি আমাকে মাতৃগর্ভে বুনেছ; আমি আশ্চর্যভাবে গঠিত।” [19]
খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০–৩৭০হিপোক্রাটিস“বীজ মায়ের শরীরের রক্তে পুষ্টি পায়; মাংস ধীরে ধীরে অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বিভক্ত হয়।” [20]
খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০এরিস্টোটল“রক্তই জীবনের উপাদান; অঙ্গ পৃথকীকরণ ক্রমান্বয়ে ঘটে।” [21]
খ্রিস্টীয় ১৫০গ্যালেন“ভ্রূণ চার ধাপে বিকাশ পায়—বীজ, রক্তপূর্ণ, মাংসপিণ্ড, সম্পূর্ণ শিশু।” [22]
খ্রিস্টীয় ২০০তালমুদ (Yevamot 69b)“গর্ভধারণের প্রথম ৪০ দিন পর্যন্ত ভ্রূণ কেবল জল।” [23]
খ্রিস্টীয় ৬৫০কোরআন“নুতফা → আলাকা → মুদগা → অস্থি → মাংস।” [24]

তুলনামূলক সারণি (ইংরেজি)

তারিখসূত্রবর্ণনা
১৪১৬ খ্রিস্টপূর্বগর্ভ উপনিষদ (হিন্দু ধর্ম গ্রন্থ)“From the conjugation of blood and semen the embryo comes into existence. During the period favorable to conception, after the sexual intercourse, (it) becomes a Kalada (one-day-old embryo). After remaining seven nights it becomes a vesicle. After a fortnight it becomes a sperical mass. After a month it becomes a firm mass”.
১০০০ খ্রিস্টপূর্বযব এর পুস্তক (ইহুদী খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থ)“Your hands formed me and made me – will you now absorb me? Remember that you formed me as if with clay – will you return me to dust? You poured me out like milk, and pulled me together like cheese. You clothed me with skin and flesh, and (inside me) did you interweave bones and sinews.”
৫০০ খ্রিস্টপূর্বPsalms(ইহুদী খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থ)“For you created my inmost being; you knit me together in my mother’s womb. I praise you because I am fearfully and wonderfully made; your works are wonderful, I know that full well. My frame was not hidden from you when I was made in the secret place. When I was woven together in the depths of the earth, your eyes saw my unformed body. All the days ordained for me were written in your book before one of them came to be.”
৪৬০-৩৭০ খ্রিস্টপূর্বহিপোক্রাটেস1st stage: “Sperm is a product which comes from the whole body of each parent, weak sperm coming from the weak parts, and strong sperm from the strong parts.”2nd stage: “The seed (embryo), then, is contained in a membrane … Moreover, it grows because of its mother’s blood, which descends to the womb. For once a woman conceives, she ceases to menstruate…”

 

3rd stage: “At this stage, with the descent and coagulation of the mother’s blood, flesh begins to be formed, with the umbilicus.”
4th stage: “As the flesh grows it is formed into distinct members by breath … The bones grow hard … moreover they send out branches like a tree …”

৩৮৪-৩২২ খ্রিস্টপূর্বএরিস্টোটল“When the material secreted by the female in the uterus has been fixed by the semen of the male…the more solid part comes together, the liquid is separated off from it, and as the earthy parts solidify membranes form all around it…Some of these are called membranes and others choria…” “So nature has first designed the two blood vessels from the heart, and from these smaller vessels branch off to the uterus, forming what is called the umbilicus…Round these is a skin-like integument, because the weakness of the vessels needs protection and shelter. The vessels join to the uterus like the roots of plants, and through them the embryo receives its nourishment”.
২৪০-১৮০ খ্রিস্টপূর্বDiocles of Carystus“on the ninth day a few points of blood, on the eighteenth beating of the heart, on the twenty-seventh traces of the spinal cord and head”
১২৯-২১০ খ্রিস্টাব্দClaudius Galenus“let us divide the creation of the foetus overall into four periods of time.
The first is that in which. as is seen both in abortions and in dissection, the form of the semen prevails (Arabic nutfah). At this time, Hippocrates too, the all-marvelous, does not yet call the conformation of the animal a foetus; as we heard just now in the case of semen voided in the sixth day, he still calls it semen. But when it has been filled with blood (Arabic alaqa), and heart, brain and liver are still unarticulated and unshaped yet have by now a certain solidarity and considerable size,
this is the second period; the substance of the foetus has the form of flesh and no longer the form of semen. Accordingly you would find that Hippocrates too no longer calls such a form semen but, as was said, foetus.
The third period follows on this, when, as was said, it is possible to see the three ruling parts clearly and a kind of outline, a silhouette, as it were, of all the other parts (Arabic mudghah). You will see the conformation of the three ruling parts more clearly, that of the parts of the stomach more dimly, and much more still, that of the limbs. Later on they form “twigs”, as Hippocrates expressed it, indicating by the term their similarity to branches.
The fourth and final period is at the stage when all the parts in the limbs have been differentiated; and at this part Hippocrates the marvelous no longer calls the foetus an embryo only, but already a child, too when he says that it jerks and moves as an animal now fully formed.””… The time has come for nature to articulate the organs precisely and to bring all the parts to completion. Thus it caused flesh to grow on and around all the bones, and at the same time … it made at the ends of the bones ligaments that bind them to each other, and along their entire length it placed around them on all sides thin membranes, called periosteal, on which it caused flesh to grow.”
প্রায় ২০০ খ্রিস্টাব্দতালমুদ (ইহুদী ধর্মগ্রন্থ)The embryo was called peri habbetten (fruit of the body) and develops as:1. golem (formless, rolled-up thing);
2. shefir meruqqam (embroidered foetus – shefir means amniotic sac);
3. ‘ubbar (something carried); v’alad (child); v’alad shel qayama (noble or viable child) and
4. ben she-kallu chadashav (child whose months have been completed).
৫৭১-৬৩২ খ্রিস্টাব্দমুহাম্মদ (কোরআন)“Allah’s Apostle, the true and truly inspired said, “(The matter of the Creation of) a human being is put together in the womb of the mother in forty days, and then he becomes a clot of thick blood for a similar period, and then a piece of flesh for a similar period.”“The Prophet said, “Allah puts an angel in charge of the uterus and the angel says, ‘O Lord, (it is) semen! O Lord, (it is now) a clot! O Lord, (it is now) a piece of flesh.’ And then, if Allah wishes to complete its creation, the angel asks, ‘O Lord, (will it be) a male or a female?”
“Verily We created man from a product of wet earth; Then placed him as a drop (of seed) in a safe lodging; Then fashioned We the drop a clot, then fashioned We the clot a little lump, then fashioned We the little lump bones, then clothed the bones with flesh, and then produced it as another creation. So blessed be Allah, the Best of creators!”

আধুনিক ভ্রূণবিদ্যা অনুযায়ী বিশ্লেষণ

আধুনিক মানবভ্রূণ বিকাশের আন্তর্জাতিক মান হলো Carnegie Stages—প্রথম ৮ সপ্তাহে ২৩টি ধাপ নির্ধারিত হয়। এই সময়ে—

  • ৩.৫–৪.৫ সপ্তাহে হৃদ্যন্ত্র স্পন্দিত হয়,
  • ৪–৫ সপ্তাহে অঙ্গ (limb bud) গঠিত হয়,
  • ৬–৭ সপ্তাহে হাড়ে প্রাথমিক ossification শুরু হয়,
  • পেশীর গঠন (myogenesis) একসাথে চলতে থাকে।

অর্থাৎ “আগে হাড়, পরে মাংস” এই ধারণা আধুনিক বিজ্ঞানে ভুল, কারণ হাড় ও পেশী একসাথে (overlapping) বিকশিত হয় [25] [26] [27]। আসুন এই সম্পর্কে একটি ভিডিও দেখে নিই,


মুহাম্মদ ধাপগুলো সম্পর্কে কীভাবে জানলো?

কোরআন যদি আসলেই আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হওয়া গ্রন্থ হতো, এতে এমন কিছু পাওয়া যেতো যা আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সাথে সামাঞ্জস্যপুর্ণ এবং সত্য। একে তো কোরআনের দাবীগুলো ভাসাভাসা, যার নির্দিষ্ট পরিষ্কার অর্থ নেই। যা আসলে বিভিন্নভাবে অনুবাদ বা ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এসব কারণে এগুলো বিজ্ঞানের সরাসরি বিপরীত, কারণ বিজ্ঞান রূপক বর্ণনা নয়।

মুহাম্মদ যদি কোরআনের আয়াতগুলো নিজেই তৈরি করে থাকেন, তাহলে বলতে হয়, তিনি এমন কিছুই আসলে বলেননি, যা সেই সময়ের মানুষ জানতো না। তিনি যা বলেছেন সেগুলো মধ্যযুগের মানুষের সাধারণ ধারনা, যা তারা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকেই মূলত পেয়েছিল। অসংখ্য গর্ভপাত, মৃত মায়ের লাশ, মৃত শিশুর লাশ, ধাত্রীদের কাজ ও অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের দেশের গ্রামের অশিক্ষিত মানুষেরাও এগুলো জানেন। সেইসাথে, হারিস ইবনে কালাদা ছিলেন মুহাম্মদের আমলের একজন আরব চিকিৎসক। কথিত আছে যে, তিনি ইসলামের আবির্ভাবের আগে চিকিৎসা বিষয়ক জ্ঞান আহরণের জন্য গুন্দেশপুর ভ্রমণ করেছিলেন। অসংখ্য ইসলামিক গ্রন্থে তার সম্পর্কে কিছু কিছু বিবরণ পাওয়া যায়, তবে খুব বিস্তারিত তথ্য জানা যায় না। এরকম হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, তিনি সেই সময়ে রীতিমত মানুষের চিকিৎসা করতেন এবং শরীর, স্বাস্থ্য, মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ইত্যাদি বিষয়ক পরামর্শ দিতেন এবং আলোচনা করতেন। আসুন উনার সম্পর্কে একটি ফতোয়া দেখি,

২১৯৯. প্রশ্ন
আমি একজন আলেমকে স্বাস্থ্য রক্ষার গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে নিম্নোক্ত হাদীসটি বলতে শুনেছি।
المعدة بيت الداء، والحمية رأس الدواء، وأعط كل بدن ما عودته
(অর্থাৎ) উদর হল সর্বরোগের কেন্দ্র। আর খাদ্য-সংযম সর্বরোগের মহৌষধ। দেহকে তা-ই দাও, যাতে তাকে অভ্যস্ত করেছ। জানার বিষয় হল, এটি কি হাদীস। হাদীস হলে তা কোন কিতাবে আছে? জানিয়ে উপকৃত করবেন।
উত্তর
প্রশ্নোক্ত কথাটি কোথাও হাদীস হিসেবে উল্লেখেতি হলেও হাদীস বিশারদগণ বলেছেন, এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস হিসেবে প্রমাণিত নয়; বরং তা আরবের প্রসিদ্ধ চিকিৎসক হারিস ইবনে কালদাহ-এর উক্তি।
অতএব তা হাদীস হিসেবে বর্ণনা করা যাবে না।
-আলমাকাসিদুল হাসানাহ পৃ. ৬১১; কাশফুল খাফা ২/৯৩; আদ্দুরারুল মুনতাছিরাহ ১৬৮; আল লাআলিল মানসুরাহ ১৪৫; আলফাওয়াইদুল মাজমূআহ ১৬৬; যাদুল মাসীর ৩/১৮৮; রুহুল মাআনী ৫/১১০; তাফসীরে কুরতুবী ৭/১৯২

শুধু তাই নয়, উনার সম্পর্কে কিছু জইফ হাদিসও পাওয়া যায়। জইফ হাদিসগুলো সঠিক হয়ে থাকলে, মুহাম্মদ তার কাছে মানুষকে চিকিৎসা নেয়ার জন্য পাঠাতেন বলেই মনে হয়। উনি গ্রীসের চিকিৎসকদের গ্রন্থগুলো আরবিতে অনুবাদ করেছিলেন বলেও কিছু কিছু সূত্র থেকে জানা যায়।

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব ২১: খাদ্য
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪২২৪-[৬৬] সা‘দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সময় আমি মারাত্মকভাবে পীড়িত হয়ে পড়লাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার খোঁজ-খবর নিতে তাশরিফ আনলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের হাতখানা আমার দু’ স্তনের মাঝখানে (বুকের উপর) রাখলেন। তাতে আমি আমার কলিজায় শীতলতা অনুভব করলাম। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি একজন হৃদ-বেদনার রোগী। সুতরাং তুমি সাক্বীফ গোত্রীয় হারিস ইবনু কালদাহ্-এর নিকট যাও। সে একজন চিকিৎসক। পরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সে যেন অবশ্যই মদীনার সাতটি ‘আজওয়াহ্ খেজুর বীচিসহ পিষে তোমার মুখের মধ্যে ঢেলে দেয়। (আবূ দাঊদ)[1]
[1] য‘ঈফ : আবূ দাঊদ ৩৮৭৫, য‘ঈফুল জামি‘উস্ সগীর ২০৩৩, আল মু‘জামুল কাবীর লিতু ত্ববারানী ৫৩৪৬, য‘ঈফুল জামি‘ ২০৩৩।
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো মুজাহিদ সা‘দ হতে বর্ণনা করাটা মুরসাল। আবূ যুর্‘আহ্ আর্ রাযী এমনটিই বলেছেন। বিস্তারিত দেখুন- ‘আওনুল মা‘বূদ ১০/২৫৫ পৃঃ, হাঃ ৩৮৭৫।
হাদিসের মানঃ যঈফ (Dai’f)
বর্ণনাকারীঃ সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)

সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২২/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ১২. আজওয়া খেজুর সম্পর্কে।
৩৮৩৫. ইসহাক ইবন ইসমাইল (রহঃ) …. সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একবার আমি পীড়িত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখার জন্য আসেন। এ সময় তিনি তাঁর হাত আমার বুকের উপর রাখলে আমি তাঁর শৈত্যতা আমার হৃদয়ে অনুভব করি। এরপর তিনি বলেনঃ তুমি হার্টের রুগী। কাজেই তুমি ছাকীফ গোত্রের অধিবাসী হারিছা ইবন কালদার নিকট যাও। কেননা, সে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক। আর সে যেন মদীনার আজওয়া খেজুরের সাতটা খেজুর নিয়ে, তা বীচিসহ চূর্ণ করে তোমার জন্য তা দিয়ে সাতটি বড়ি তৈরী করে দেয়।
হাদিসের মানঃ যঈফ (Dai’f)
বর্ণনাকারীঃ সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)


বৈজ্ঞানিক অসঙ্গতি

  • ১) ‘আলাকা’ শব্দের অর্থ: কোরআনে “আলাকা”কে অনেক অনুবাদে “জমাট রক্ত” বলা হয়েছে। বাস্তবে ভ্রূণ কোনো অবস্থাতেই রক্তজমাট নয়। তাই এটি প্রাচীন কল্পনাভিত্তিক বর্ণনা।
  • ২) ‘হাড় → মাংস’ ক্রম: আধুনিক গবেষণায় হাড় ও পেশী একসাথে বিকশিত হয়। “প্রথমে হাড়, পরে তাতে মাংস পরানো” ধারণাটি বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল।
  • ৩) ‘৪০–৪০–৪০ দিন’ সময়রেখা: প্রথম ৪০ দিনের মধ্যেই প্রায় সব অঙ্গ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়; তাই এই মডেল আধুনিক ভ্রূণবিদ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

“আলাকা” / “মুদগা” — রূপক না বৈজ্ঞানিক বিবরণ

আরবি শব্দ ‘আলাকা’ (عَلَقَة) বিভিন্ন অভিধানে একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়—“ঝুলে থাকা”, “লেগে থাকা”, “জোঁকসদৃশ বস্তু”, অথবা “রক্তজমাট”। কিছু ইসলামি ব্যাখ্যায় (যেমন Yusuf Ali, Pickthall) শব্দটি “জমাট রক্ত” হিসেবে অনূদিত হয়েছে; অন্যদিকে সাম্প্রতিক ইসলামি বিজ্ঞানপ্রবণ লেখকরা একে “leech-like” বা “clinging substance” অর্থে নিতে চান।

কিন্তু আধুনিক এমব্রায়োলজিতে ভ্রূণ কখনোই “জমাট রক্ত” নয়। ভ্রূণের প্রাথমিক পর্যায়ে রক্তকণিকার সৃষ্টি হয় ৩য় সপ্তাহের পর এবং পূর্ণাঙ্গ রক্তসঞ্চালন গড়ে ওঠে প্রায় ৬ সপ্তাহের মধ্যে। “জোঁকসদৃশ” রূপকটি কেবল বাহ্যিক আকারের একটি মোটামুটি সাদৃশ্য বর্ণনা করে, বৈজ্ঞানিক অর্থে এটি কোনো সঠিক বিবরণ নয়।

এই বিষয়ে ইসলামি অ্যাপোলজেটিক গবেষণা যেমন Saadat (2009, PMC)–এও স্বীকার করা হয়েছে যে কোরআনিক বর্ণনা “bones clothed with flesh” (অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃত করা) বৈজ্ঞানিকভাবে অনিশ্চিত। [28] [29]


“হাড় → তারপর মাংস” — ক্রম ও সময়রেখার ত্রুটি

মানবভ্রূণের হাড় ও পেশী উভয়ই মেসোডার্মাল টিস্যু থেকে উৎপন্ন হয়।
দুটি পৃথক সেল-লাইন (osteoblasts ও myoblasts) থাকলেও, এগুলোর বিকাশ সমান্তরাল ও ওভারল্যাপিংভাবে ঘটে।

হাড়ের প্রাথমিক ossification সাধারণত ৬–৭ম সপ্তাহে শুরু হয়; এর আগে মেসেনকাইমাল টিস্যু ও কার্টিলেজ মডেল তৈরি হয়।
একই সময়েই পেশীর প্রিকার্সর কোষ (myoblast) limb bud-এ মাইওটিউব তৈরি করতে থাকে।
অতএব “প্রথমে হাড়, পরে তাতে মাংস পরানো”—এমন ক্রমিক ব্যাখ্যা জীববৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।

আধুনিক গবেষণা গ্রন্থ যেমন Larsen’s Human Embryology, StatPearls (NCBI), এবং Carnegie Science Publications—সবখানেই এই সহবিকাশের (concurrent development) কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। [30] [31] [32]


“৪০–৪০–৪০ দিন” মডেল বনাম আধুনিক ভ্রূণ-বিকাশ

সহিহ বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী—প্রথম ৪০ দিন নুতফা, পরের ৪০ দিন আলাকা, এবং পরের ৪০ দিন মুদগা—অর্থাৎ ১২০ দিন পর ফেরেশতা ভাগ্য লিখে দেয়। কিন্তু বাস্তব বৈজ্ঞানিক সময়রেখা ভিন্ন। Carnegie Classification অনুসারে প্রথম ৮ সপ্তাহের মধ্যেই প্রধান অঙ্গগুলির প্রাইমর্ডিয়া তৈরি হয়—
– ৩.৫–৪.৫ সপ্তাহে হৃদ্যন্ত্র স্পন্দিত হয়,
– ৪–৫ সপ্তাহে লিম্ব-বাড গঠিত হয়,
– ৬–৭ সপ্তাহে অস্থি-পেশী গঠন একসঙ্গে শুরু হয়।

অতএব “৪০ দিন পর্যন্ত ভ্রূণ শুধু বিন্দু বা জমাট রক্ত” বলা আধুনিক তথ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। [33] [34] [35]


গ্রীক প্রভাব: কোরআনিক বর্ণনায় ধ্রুপদী ধারণার ছায়া

– হিপোক্রেটিসের লেখায় “মায়ের রক্তে পুষ্ট ঝিল্লির ভিতরে ভ্রূণ”,
– এরিস্টোটলের গ্রন্থে “ঝিল্লি ও অম্বিলিকাসের মাধ্যমে রক্তের সরবরাহ”,
– গ্যালেনের চার ধাপের বর্ণনায় “বীজ → রক্তপূর্ণ ভ্রূণ → মাংস → গঠিত শিশু”—এই ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়।

এই তিনজনের বর্ণনা এবং কোরআনের “নুতফা → আলাকা → মুদগা → অস্থি → মাংস” ক্রমের মধ্যে সুস্পষ্ট ভাবগত মিল রয়েছে।
[36] [37] [38]

এটি বোঝায় যে, কোরআনের ভাষ্য কোনো বিচ্ছিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রকাশ নয়, বরং প্রাচীন বিশ্বের প্রচলিত ভ্রূণতত্ত্বীয় ধারণারই সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা।


ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন

যখন কোরআন নাজিল হয় (৭ম শতক), তখন আরব উপদ্বীপ গ্রীক ও সিরিয়াক চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রভাবাধীন ছিল। হিপোক্রেটিস, এরিস্টোটল, গ্যালেনের রচনা সিরিয়ান-আরামাইক ভাষায় অনূদিত হয়ে অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই ধারণাগুলোরই প্রতিফলন কোরআনের “নুতফা–আলাকা–মুদগা” ক্রমে দেখা যায়। এই কারনে, কোরআনের এই বর্ণনাকে বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যদ্বাণী বলা যায় না; বরং এটি সেই সময়কার সাধারণ মানবদেহ সংক্রান্ত জ্ঞানের প্রতিচ্ছবি।


উপসংহার

কোরআনের ভ্রূণতত্ত্ব সংক্রান্ত আয়াত ও হাদিস ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকথা বা গল্প বা মধ্যযুগের মানুষের ধারণা হলেও এগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের তথ্যের সঙ্গে খাপে খায় না। “আলাকা”কে রক্তজমাট বলা, “অস্থি → মাংস” ক্রম, ও “৪০–৪০–৪০ দিন” সময়রেখা—সবই প্রমাণ করে যে এটি সপ্তম শতাব্দীর মানবজ্ঞান অনুযায়ী তৈরি বর্ণনা, কোনো “বৈজ্ঞানিক মিরাকল” নয়। মানবসভ্যতা হাজার বছর ধরে কল্পনা থেকে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার দিকে অগ্রসর হয়েছে; আধুনিক এমব্রায়োলজি সেই দীর্ঘ জ্ঞান-যাত্রার ফল।


[ai_review]


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৩২০৮ ↩︎
  2. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৪৮২ ↩︎
  3. সুনান আত তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২১৪০ ↩︎
  4. Quran 23:12–14 ↩︎
  5. Sahih al-Bukhari 3208 ↩︎
  6. Sahih Muslim 2643a ↩︎
  7. Atrahasis — Livius.org ↩︎
  8. Enuma Elish — ETCSL (Oxford) ↩︎
  9. Hippocratic Writings ↩︎
  10. Aristotle’s Biology & Embryology ↩︎
  11. On the Formation of the Foetus, Galen ↩︎
  12. BibleGateway: Job 10:10–12 ↩︎
  13. BibleGateway: Psalm 139:13–16 ↩︎
  14. Talmud: Yevamot 69b ↩︎
  15. Garbha Upanishad — Archive.org ↩︎
  16. Donald Harper, Early Chinese Medical LiteratureUC Press ↩︎
  17. Garbha Upanishad ↩︎
  18. Job 10:10–12 ↩︎
  19. Psalm 139:13–16 ↩︎
  20. Hippocratic Writings ↩︎
  21. Aristotle’s Embryology ↩︎
  22. Galen ↩︎
  23. Yevamot 69b ↩︎
  24. Quran 23:12–14 ↩︎
  25. UNSW Embryology — Carnegie Stages ↩︎
  26. O’Rahilly & Müller — Developmental Stages in Human Embryos ↩︎
  27. StatPearls — Bone Ossification ↩︎
  28. Saadat, 2009, Scientific Miracles in the Qur’an, PMC ↩︎
  29. UNSW Embryology — Carnegie Stages ↩︎
  30. Larsen’s Human Embryology, 6th ed. ↩︎
  31. StatPearls — Bone Ossification ↩︎
  32. Carnegie Institution — Developmental Stages in Human Embryos, O’Rahilly & Müller ↩︎
  33. UNSW Embryology — Carnegie Stages ↩︎
  34. Carnegie Science Publications — Developmental Stages in Human Embryos ↩︎
  35. NCBI Bookshelf — Fetal Development Overview ↩︎
  36. Hippocratic Writings — Cambridge University Press ↩︎
  37. Aristotle’s Generation of Animals — ASU Embryo Project ↩︎
  38. Galen — UCL Medicina Antiqua ↩︎