Table of Contents
- 1 ভূমিকা
- 2 জিযিয়া শব্দটির অর্থ এবং অন্তর্নিহিত বিদ্বেষ
- 3 জিজিয়ার হার: নির্দিষ্ট “ফিক্সড রেট” নেই
- 4 আলেমদের ঘৃণাত্মক বক্তব্য (ভিডিও)
- 5 আশরাফুল হিদায়াঃ ইসলামী ফিকহ
- 6 তাফসীরে মাযহারীঃ জিজিয়ার উদ্দেশ্য ও গ্রহণের পদ্ধতি
- 7 ইবনে কাসীরঃ জিজিয়ার উদ্দেশ্য ও গ্রহণের পদ্ধতি
- 8 ফতোয়ায়ে আলমগীরীঃ জিজিয়ার উদ্দেশ্য ও গ্রহণের পদ্ধতি
- 9 উমরের আমলে অবমাননাকর জিজিয়া
ভূমিকা
‘জিজিয়া’ (poll tax/tribute) ইসলামি শাসন-তত্ত্ব ও ফিকহে একটি কাঠামোগত রাজস্ব-নীতি, যা মূলত অমুসলিম ‘ধিম্মি’ জনগোষ্ঠীর (protected subjects) ক্ষেত্রে আলোচিত। কোরআনের সূরা তওবা ৯:২৯–এ জিজিয়ার উল্লেখ থাকলেও এর নির্দিষ্ট হার, আদায়ের শৈলী, এবং কাদের ওপর প্রযোজ্য—এসব বিষয়ে প্রাচীন তাফসির ও মাযহাবভিত্তিক ফিকহে বিভিন্ন আলোচনা উঠে এসেছে। এই প্রবন্ধে দেখানো হবে: (ক) কুরআন-হাদিসে জিজিয়ার একক/স্থির হার নির্ধারিত নয়, বরং বাস্তবায়নে সমকালীন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত (siyāsa/ijtihād) কার্যকর; (খ) কুরআনের নসের (text) স্তরে জিজিয়া আহলে কিতাব–কে লক্ষ্য করে বর্ণিত; (গ) তবে নবী ও খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে মাজুস (Zoroastrians)–এর ক্ষেত্রে জিজিয়া গ্রহণের নজির আছে; যার ব্যাখ্যা হযরত আলী দিয়েছেন (ঘ) মুশরিক/মূর্তিপূজকদের ক্ষেত্রে জিজিয়া গ্রহণ প্রশ্নে কোরআন হাদিস ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সিদ্ধান্ত ছিল মুশরিকদের ক্ষেত্রে জিজিয়া প্রযোজ্য নয়, তবে বিভিন্ন মাযহাবগুলোতে প্রসারিত ব্যাখ্যায় মুশরিকদের কাছ থেকে জিজিয়া নেয়ার নজির মেলে।
এখানে সবচাইতে জরুরি যেই বিষয়টি তা হচ্ছে, জিযিয়ার সংজ্ঞা এবং নেয়ার পদ্ধতি। কোরআনে খুব পরিষ্কারভাবে অমুসলিমদের অপমান অপদস্ত করার মাধ্যমে জিজিয়া আরোপের নির্দেশনা দেয়, যা কোরআন হাদিস সীরাত তাফসীর সর্বত্রই খুব খোলামেলাভাবেই বর্ণনা করা আছে। তাদের অপমান অপদস্ত করতে করতে এমন অবস্থা সৃষ্টি করতে হবে, যেন তারা অপমানের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মুসলিম হয়ে যেতে বাধ্য হয়। স্ত্রী পুত্র কন্যা ও পরিবারের সামনেই তাদেরকে এমন অপমানিত হতে হবে যে, তাদের মধ্যে যেন ইসলাম গ্রহণের একটা মানসিক চাপ সবসময় বজায় থাকে।
জিযিয়া শব্দটির অর্থ এবং অন্তর্নিহিত বিদ্বেষ
ইসলামি রাষ্ট্র-ভাবনায় জিজিয়া সাধারণত একটি রাজস্ব-কর—যা অমুসলিম ধিম্মিদের কাছ থেকে নেওয়া হয়, এবং বিনিময়ে তাদের নিরাপত্তা/আবাস/আইনি সুরক্ষা ইত্যাদির কাঠামোর কথা ফিকহ-সাহিত্যে আলোচিত। কিন্তু বিতর্কের মূল কারণ তিনটি:
- কুরআনের আয়াত ৯:২৯–এ জিজিয়াকে যুদ্ধ-পরিস্থিতির সাথে যুক্ত করে উল্লেখ করা হয়েছে—ফলে এটি কেবল “ট্যাক্স” নাকি রাজনৈতিক আধিপত্যের চিহ্ন—এ প্রশ্ন ওঠে। [1]
- ‘وَهُمْ صَاغِرُونَ (wa hum ṣāghirūn)’—এই শব্দগুচ্ছের অর্থ “অবনত/পরাভূত/হীন অবস্থায়” নাকি “রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব স্বীকার করে”—এ নিয়ে ব্যাখ্যাগত দ্বন্দ্ব আছে।
- কাদের থেকে জিজিয়া নেওয়া যাবে—শুধু আহলে কিতাব, না কি অন্যান্য অমুসলিমও—এ বিষয়ে মাযহাবভেদে বিস্তর মতভেদ।
কোরআন ও হাদিসের বিবরণ
জিযিয়া শব্দটির অর্থ কী, তা আমাদের সকলের জেনে নেয়া জরুরি । অনেকেই জিযিয়া এবং খেরাজকে মিলিয়ে ফেলে জিযিয়াকে সাধারণ অর্থে কর বা ট্যাক্স হিসেবে দাবী করেন। কথাটি সম্পূর্ণ ভুল। খেরাজ হচ্ছে অমুসলিমদের দেয়া ভূমি কর। কিন্তু জিযিয়া হচ্ছে তাদের বিজয়ী মুসলমানদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া, বেঁচে থাকার বা নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য দেয়া অর্থ। এই অর্থ দিতে হবে নত অবস্থায়, অপমানিত ভাবে। কোরআনে পরিষ্কারভাবেই বিষয়টি বলে দেয়া হয়েছে, [2]
যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে না, আর শেষ দিনের প্রতিও না, আর আল্লাহ ও তাঁর রসূল যা হারাম করেছেন তাকে হারাম গণ্য করে না, আর সত্য দ্বীনকে নিজেদের দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করে না তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যে পর্যন্ত না তারা বশ্যতা সহকারে স্বেচ্ছায় ট্যাক্স দেয়।
— Taisirul Quran
তোমরা লড়াই কর আহলে কিতাবের সে সব লোকের সাথে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম মনে করে না, আর সত্য দীন গ্রহণ করে না, যতক্ষণ না তারা স্বহস্তে নত হয়ে জিয্য়া দেয়।
— Rawai Al-bayan
যাদেরকে কিতাব প্রদান করা হয়েছে [১] তাদের মধ্যে যারা আল্লাহ্তে ঈমান আনে না এবং শেষ দিনেও নয় এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম গণ্য করে না, আর সত্য দীন অনুসরণ করে ন; তাদের সাথে যুদ্ধ কর [২], যে পর্যন্ত না তারা নত হয়ে নিজ হাতে জিয্ইয়া [৩] দেয় [৪]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আসুন শুরুতেই বুখারী শরীফ থেকে এই আয়াতের একটি শব্দের অর্থ জেনে নিই [3]

তাফসীরে জালালাইনে জিজিয়ার অর্থ
এই বিষয়ে তাফসীরে জালালাইনে যা বলা হয়েছে, তা হচ্ছে, জিযিয়া শব্দটি “জায়া” শব্দ থেকে নিষ্পন্ন অর্থাৎ তুমি মৃত্যুদণ্ডের উপযুক্ত অপরাধী ব্যক্তি। কিন্তু তোমাকে এ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে যে, তোমার উপর এ দণ্ড জারি হচ্ছে না এবং দারুল ইসলামে নিরাপত্তার সাথে অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে [4]
তাফসীরে জালালাইন : আরবি-বাংলা, দ্বিতীয় খণ্ড (দশম পারা) পৃষ্ঠা ৬৫৩
অর্থাৎ আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা আল্লাহ পাকের প্রতি ঈমান আনে না, আখিরাতের প্রতিও বিশ্বাস করে না, তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর।
মুজাহিদ (র.) বলেছেন যখন রুমীয়দের সাথে প্রিয়নবী কে জিহাদের আদেশ দেওয়া হয়, তখন এ আয়াত নাজিল হয়। এ আয়াত নাজিল হওয়ার পরই প্রিয়নবী তাবুকের যুদ্ধে তাশরিফ নিয়ে যান।
-[মা’আরিফুল কুরআন : আল্লামা ইদ্রীস কান্ধলভী (র.) খ. ৩, পৃ. ৩০৮, তাফসীরে মাযহারী খ. ৫ পৃ. ২৩৫]
আহলে কিতাব তথা ইহুদি নাসারাদের মধ্যে যখন চারটি দোষ পাওয়া যায় তখন তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা অবশ্য কর্তব্য হয়ে পড়ে। যথা-
১. এ অর্থাৎ তারা আল্লাহ পাকের প্রতি ঈমান আনে না। কেননা তারা হযরত ঈসা (আ.) ও ওজায়ের (আ.)-কে আল্লাহর পুত্র বলে দাবি করে [নাউজুবিল্লাহ] এটি ঈমান বিরোধী কাজ, আল্লাহ পাকের একত্ববাদে তারা বিশ্বাস করে না।
২. ১১। ১৮১, আর তারা আখিরাতের প্রতিও বিশ্বাস করে না। ইহুদিরা মনে করে তারাই জান্নাতে যাবে, আর নাসারারা মনে করে জান্নাতের আধিকারী একমাত্র তারাই। ইহুদিরা দাবি করে সামান্য কয়েক দিন দোজখ তাদেরকে স্পর্শ করবে, এরপর তারা নাজাত পাবে। আর ইহুদি নাসারারা এ কথাও বলে যে, জান্নাতের নিয়ামত দুনিয়ার নিয়ামতের ন্যায়ই হবে। তাদের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে যে, জান্নাত চিরস্থায়ী না সাময়িক, এসব কারণে আখিরাতের প্রতি তাদের ঈমান নেই এ কথাই প্রমাণিত হয়।
৩. … অর্থাৎ আল্লাহ পাক ও তাঁর রাসূল যে সব বিষয়কে হারাম ঘোষণা করেছেন তারা সেগুলোকে হারাম মনে করে না। এ বাক্যটির দু’টি অর্থ হতে পারে। ক. পবিত্র কুরআনে এবং প্রিয়নবী -এর মহান আদর্শে যা হারাম বলে ঘোষিত হয়েছে তারা সেগুলোকে হারাম বলে মনে করে না। খ. তাওরাত ইঞ্জিলে যা হারাম বলে ঘোষিত হয়েছে তারা সেগুলোও মানে না; বরং তাওরাত ইঞ্জিলে তারা পরিবর্তন করেছে এবং নিজেদের ইচ্ছা মতো বিধান তৈরি করেছে। কোনো কোনো তত্ত্বজ্ঞানী বলেছেন, আলোচ্য আয়াতে , শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য করা হয়েছে সেই রাসূল, যার অনুসরণের দাবি করে তারা, অথচ সে রাসূলেরও অনুসরণ তারা করে না। কেননা হযরত মূসা (আ.) ও হযরত ঈসা (আ.) আদেশ দিয়ে গেছেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ-এর অনুসরণ করতে, কিন্তু তারা তা করে না ।
৪. … অর্থাৎ তারা সত্য ধর্মকে গ্রহণ করে না। ইমাম কাতাদা (র.) বলেছেন, আলোচ্য বাক্যের ‘হক’ শব্দটি দ্বারা আল্লাহ পাককে উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। এমন অবস্থায় এর অর্থ হবে যারা আল্লাহর দীন সত্য ধর্মকে গ্রহণ করে না । কেননা অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন … অর্থাৎ “আল্লাহ পাকের নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম হলো ইসলাম” আর তারা ইসলাম গ্রহণ করে না।
জিযিয়া ও খেরাজ : জিযিয়া বলা হয় সে করকে, যা কাফেরদের জীবনের বদলে আদায় করা হয় । যিজিয়া শব্দটি “জাযা” থেকে নিষ্পন্ন অর্থাৎ তুমি মৃত্যুদণ্ডের উপযুক্ত অপরাধী ব্যক্তি। কিন্তু তোমাকে এ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে যে, তোমার উপর এ দণ্ড জারি হচ্ছে না এবং দারুল ইসলামে নিরাপত্তার সঙ্গে অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তোমাকে হত্যাও করা হয়নি এবং তোমাকে গোলামও বানানো হয়নি। যেভাবে মুক্তিপণ আদায় করলে মৃত্যুদণ্ড বাতিল হয়ে যায় ঠিক তেমনিভাবে জিযিয়া আদায় করলেও হত্যার বিধান কার্যকর হয় না।
দ্বিতীয়ত ইসলামি রাষ্ট্র আর একটি উপকার করে তা হলো, ঠিক মুসলমানদের ন্যায় তোমাদের জানমাল, ইজ্জত আবরুর হেফাজতের দায়িত্ব গ্রহণ করে। আর শরিয়তের দৃষ্টিতে জান মালের হেফাজত মুসলিম অমুসলিম সকলের ব্যাপারে সমভাবে করা হয়, এটি ইসলামি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর ইসরামি রাষ্ট্র সে রাষ্ট্রকে বলা হয় যার সংবিধান ইসলামি শরিয়তের ভিত্তিতে তৈরি হয় যাতে ইসলামি আইন কানুন কার্যকর হয়। আর খেরাজ হলো সে কর যা অমুসলিম প্রজাদের জমিনের উপর ধার্য করা হয়।
… অর্থাৎ আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা ঈমান আনে না : তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যে পর্যন্ত তারা অপমানিত অবস্থায় জিজিয়া বা অমুসলিম কর আদায় করে। আলোচ্য আয়াতে এ “আন্ ইয়াদীন” শব্দ দ্বারা আনুগত্য বুঝানো হয়েছে অথবা এর অর্থ হলো অমুসলিমরা এ জিযিয়া স্বহস্তে আদায় করবে অন্য কারো হাতে নয় ।

জিজিয়ার হার: নির্দিষ্ট “ফিক্সড রেট” নেই
কুরআন-সুন্নাহর কাঠামোয় যাকাতকে সাধারণত একটি তুলনামূলকভাবে “মানক” (standardized) ধর্মীয় কর হিসেবে দেখা হয়—কোন সম্পদে কত, কোন হারে—এসব বিষয়ে ফিকহে বিস্তৃত বিধান আছে। কিন্তু জিজিয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম কোনো একটি স্থির অঙ্ক (fixed rate) ঘোষণা করে না; ফলে ইতিহাসে জিজিয়ার হার বাস্তবে অনেক বেশি রাষ্ট্রীয় প্রশাসন-নির্ভর (policy-dependent) হয়ে ওঠে। এর সরাসরি ইঙ্গিত পাওয়া যায় সহিহ বুখারির সেই বিখ্যাত বর্ণনায়—এক অঞ্চলে জিজিয়া চার দিনার, অন্য অঞ্চলে এক দিনার কেন—জবাবে বলা হয়, এটি সমৃদ্ধি/সামর্থ্য অনুযায়ী নির্ধারিত। [5]
এই নীতিগত বাস্তবতা—অর্থাৎ জিজিয়ার হার “একটাই” নয়—শাসকের জন্য একদিকে নমনীয়তা তৈরি করে (কোন অঞ্চলে কতটা সামর্থ্য আছে, যুদ্ধ/প্রশাসনিক ব্যয় কত, ইত্যাদি বিবেচনা করে হার নির্ধারণ); কিন্তু একই সাথে এতে একটি বড় ঝুঁকিও থাকে: নিয়ম-মানদণ্ড অস্বচ্ছ হলে হার নির্ধারণ সহজেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক/ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে যেতে পারে—যা করদাতার চোখে “বৈধ রাজস্বনীতি”র বদলে “স্বেচ্ছাচার” বলে প্রতীয়মান হতে পারে।
এই “শাসক-নির্ভর হার নির্ধারণ” কীভাবে ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও সামাজিক সংঘাতের সঙ্গে জড়াতে পারে—তা দেখাতে আবু লুলু (ফিরোজ)–এর ঘটনার বর্ণনা আমরা অন্য লেখাতে বর্ণনা করেছি [6] । মুগীরা ইবন শু’বা তাঁর অধীন দাস আবু লুলুর ওপর প্রতিদিন দুই দিরহাম কর ধার্য করেন—অর্থাৎ মাসে ৬০ দিরহাম। পরে তার কারিগরি দক্ষতা উল্লেখ করে কর বাড়ানোর প্রস্তাব ওঠে, এবং বর্ণনাটি অনুযায়ী খলিফা উমর (রা.) করটিকে হুট করে মাসিক ১০০ দিরহাম পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন; এতে আবু লুলুর ক্ষোভ তীব্র হয় এবং শেষ পর্যন্ত সে উমরকে আক্রমণ করে, যার ফলাফল হিসেবে উমরের মৃত্যু ঘটে। অর্থাৎ হুট করে জিজিয়া বৃদ্ধি করায় জিজিয়া দেয়া কাফেরদের অসন্তোষ এই বিবরণ থেকে পরিষ্কার।
এখানে বিশ্লেষণগতভাবে দু’টি বিষয় আলাদা করে বলা জরুরি।
- প্রথমত, ঘটনাটির “কর” বাস্তবে জিজিয়া না অন্য কোনো কর/খারাজজাতীয় আর্থিক দায়—এই পরিভাষাগত প্রশ্ন থাকতে পারে (বিভিন্ন বর্ণনায় বিভিন্ন টার্ম ব্যবহৃত হয়)। কিন্তু মূল পয়েন্ট একই: করের অঙ্ক স্থির নীতিতে বাঁধা নয়, বরং কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে বাড়ানো-কমানোর উদাহরণ হিসেবে ঘটনাটি ব্যবহার করা হয়।
- দ্বিতীয়ত, এই ধরনের বর্ণনা দেখায়—যখন হার-নির্ধারণের “অভ্যন্তরীণ যুক্তি” (criteria) করদাতার কাছে অস্বচ্ছ থাকে বা তার আপত্তি কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি হয় না, তখন করব্যবস্থা কেবল অর্থনৈতিক চাপ নয়, ক্ষমতার অসমতা ও রাজনৈতিক ক্ষোভও উৎপাদন করতে পারে।
সুতরাং, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো: জিজিয়া “একটাই স্থির অঙ্ক”—এমন ধারণা নস-ভিত্তিতে বাধ্যতামূলক নয়; বরং ইতিহাসে জিজিয়ার হার মূলত সামর্থ্য, অঞ্চল, প্রশাসনিক প্রয়োজন—এগুলো বিবেচনায় পরিবর্তিত হয়েছে। একই সঙ্গে, এই পরিবর্তনশীলতা যদি স্বচ্ছ নীতিমালা ও জবাবদিহির বাইরে চলে যায়, তাহলে তা সহজেই ক্ষমতাকেন্দ্রিক স্বেচ্ছাচারের অভিযোগকে শক্তিশালী করতে পারে—যার একটি “অভিযোগ→ক্ষোভ” রূপক উদাহরণ হিসেবে আবু লুলু প্রসঙ্গটি আলোচনায় আসে। নস-ভিত্তিতে বাধ্যতামূলক নয়; বরং শাসক/রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও সামর্থ্য বিবেচনাই ইতিহাসে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে।
আলেমদের ঘৃণাত্মক বক্তব্য (ভিডিও)
আসুন এই নিয়ে আলোচনার শুরুতেই একটি ভিডিও দেখি, যেখানে আরবের একজন ইসলামিক আলেম শেখাচ্ছেন, কীভাবে একটি শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রে অমুসলিমদের প্রতি পদে পদে অপমান অপদস্ত করতে হবে, যেন তারা বাধ্য হয় ইসলাম গ্রহণ করতে!
আসুন আরও একজন আলেমের বক্তব্য শুনি,
আশরাফুল হিদায়াঃ ইসলামী ফিকহ
জিযিয়া কাকে বলে, এর অর্থ এবং উদ্দেশ্য আসুন আমরা পড়ে দেখি হানাফি ফিকাহ শাস্ত্রের গ্রন্থ আশরাফুল হিদায়া থেকে [7]








তাফসীরে মাযহারীঃ জিজিয়ার উদ্দেশ্য ও গ্রহণের পদ্ধতি
আল্লামা কাজী মুহাম্মদ ছানাউল্লাহ পানিপথী রচিত তাফসীরে মাযহারী কোরআনের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ তাফসীর গ্রন্থ। এই গ্রন্থে জিযিয়া সম্পর্কিত সুরা তওবার ২৯ নম্বর আয়াতে কী বলা আছে এবং তার ব্যাখ্যা কী, তা স্পষ্টভাবে বিবৃত রয়েছে। জিযিয়া যে আসলে অপমান, অপদস্থতার নিদর্শন, এবং জিযিয়া কীভাবে গ্রহণ করা হবে, সেই সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এই অধ্যায়টি পড়ে দেখতে হবে [8]











ইবনে কাসীরঃ জিজিয়ার উদ্দেশ্য ও গ্রহণের পদ্ধতি
একই বিষয় আমরা দেখতে পারি তাফসীরে ইবনে কাসীরেও [9]


ফতোয়ায়ে আলমগীরীঃ জিজিয়ার উদ্দেশ্য ও গ্রহণের পদ্ধতি
এবারে আসুন ভারত উপমহাদেশের বিখ্যাত একটি ফতোয়া গ্রন্থ ফাতায়ায়ে আলমগীরী থেকে দেখি যে, অমুসলিম জিম্মি মহিলাদের গলায় লোহার শেকল এবং তাদের হেয়তা ও তুচ্ছতা প্রমাণের জন্য বাড়িতে কিছু আলামত রাখার বিধান ইসলাম রেখেছে কিনা। তথ্যগুলো সরাসরি বই থেকে জেনে নিই, [10]
৬৪২ ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী
ভিত্তিতে হবে, না দুই বা তিন আলামতের ভিত্তিতে হবে এ বিষয়ে মাশায়িখে কিরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে । হাকিম আবূ মুহাম্মদ (র) বলেন, যদি খলীফাতুল মুসলিমীন তাদের সাথে সন্ধি করেন এবং এক আলামতের ভিত্তিতে তাদের যিম্মাদারী গ্রহণ করেন তাহলে এক্ষেত্রে আলামত একটিই থাকবে। বাড়ানো যাবে না। আর কোন দেশে বা শহর যদি জোর পূর্বক জয়যুক্ত হয় তাহলে মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের ইখতিয়ার থাকবে তিনি যত ইচ্ছা পার্থক্য সূচক আলামত তাদের উপর অবধারিত করে দিতে পারবেন, এটিই সহীহ্ অভিমত। (মুহীত)
১১. মাসআলা : রাস্তায় চলাফেরা করা এবং গোসল খানায় প্রবেশ করার অবস্থার মধ্যে মুসলমান ও যিম্মী মহিলাদের মধ্যে পার্থক্য থাকা আবশ্যক। সুতরাং যিম্মী মহিলাদের গর্দানে লোহার শৃংখল লাগিয়ে দেওয়া হবে। মুসলমান মহিলাদের ইযার থেকে তাদের ইযার ভিন্নতর হতে হবে। তাদের বাড়ী ঘরে এমন কিছু আলামত থাকবে যার দ্বারা মুসলিম বাড়ী ও যিম্মা বাড়ীর মধ্যে পার্থক্য বুঝা যাবে। যাতে কোন যাঞ্চাকারী যিম্মী বাড়ীতে দাড়িয়ে তাদের জন্য মাগফিরাতের দু’আ না করে বসে। মোদ্দাকথা হচ্ছে, তাদের মধ্যে এমন কিছু আলামত বিদ্যমান থাকা চাই যাদ্বারা তাদের হেয়তা ও তুচ্ছতা প্রতীয়মান হয় যা প্রতিযুগ ও প্রতি শহরের লোকেরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে (ইখতিয়া শরহিল মুখতার)। যদি যিম্মী ব্যক্তি কোন মুসলমানের নিকট তাদের উপাসনালয়ের দিকে পথ দেখিয়ে দেওয়ার জন্য বলে তবে মুসলমানের জন্য তাকে পথ দেখিয়ে দেওয়া সমীচীন হবে না। কেননা এটি গুনাহের কাজে সহযোগিতা করার শামিল। যদি কোন মুসলমানের পিতা-মাতা যিম্মী হয় তবে তাদেরকে গীর্জায় নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। তবে গীর্জা থেকে বাড়ীতে নিয়ে জাইয হবে (ফাতাওয়ায়ে কাযী খান)।যিম্মী লোকেরা প্রকাশ্যে হাতিয়ার বহন করে চলতে পারবে না। তারা রাস্তায় বের হলে মুসলমানগণ এমনভাবে একত্রিত হয়ে চলবে যেন তারা চলার জন্য রাস্তা না পায়। মুসলমানগণ তাদেরকে প্রথমে সালাম দিবে না। তবে তারা যদি মুসলমানদেরকে সালাম দেয় তাহলে তারা সালামের জবাব দিবে কিন্তু শুধুমাত্র “ওয়া-আলায়কুম” (Sleg) বলবে (ফাতহুল কাদীর)। যিম্মীদের গোলামদের প্রতি পৈতা বাধার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হবে না। এটিই পসন্দনীয় অভিমত। (আল ফাতাওয়াল কুবরা
১২. মাসআলা :খৃস্টান সম্প্রদায় মুসলমানদের শহরে নিজ বাড়ীতে শঙ্খ বাজাতে দেওয়া যাবে না। এমনিভাবে তাদের রীতি অনুসারে নামায আদায় করার জন্য লোকদেরকে সমবেত করার তাদের জন্য জাইয নেই। অবশ্য নিজে একা নামায আদায় করতে পারবে। তারা তাদের উপাসনালয় এবং গীর্জা থেকে ক্রশ (…..) ইত্যাদি বের করতে পারবে না। যদি তারা উচ্চকণ্ঠে যবূর এবং ইন্জীল তিলাওয়াত করে এবং এতে যদি শির্ক মিশ্রিত কথা থাকে তাহলে তাদেরকে তা করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু তদ্রূপ কিছু না থাকলে নিষেধ করা যাবে না। তবে মুসলমানদের বাজারে এসব কিছু তিলাওয়াত করতে পারবে না। ১. যেমন খলীফা তাদেরকে বললেন, তোমরা যিম্মী হিসাবে থাকবে, এ কথা আমরা মেনে নিলাম, তবে তোমােেদর ও আমাদের বেশ ভূষায় পার্থক্য থাকতে হবে। আর তা হল এই যে, তোমরা তোমাদের গলায় যুন্নার (পৈতা) বাঁধবে।

উমরের আমলে অবমাননাকর জিজিয়া
এবারে আসুন উমরের আমলের একটি ঘটনা পড়ে নিই, যেখানে দেখা যাচ্ছে, উমর কীভাবে খ্রিস্টানদের অপমান করতো এবং অপমানের বিষয়টি ব্যাখ্যা করছে [11]
তিনি সায়ফ ইবন উমরের সাথে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, এই বছর জাযীরা বিজিত হয়েছে। ইবন ইসহাক বলেন, এই বিজয় এসেছে ১৯ হিজরী সালে। জাযীরা জয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন ইয়ায ইব্ন গানাম । তাঁর সহযোগিতায় ছিলেন হযরত আবূ মূসা আশ’আরী (রা) এবং উমর ইব্ন সা’দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস। ইনি ছিলেন অল্পবয়সী বালক। যুদ্ধের কোন বড় দায়িত্ব তাঁর হাতে ছিল না। তাঁদের সাথে ছিলেন উসমান ইব্ন আবুল আস। তাঁরা ‘রাহা’ নামক স্থানে গিয়ে শিবির স্থাপন করেন। সেখানকার লোক জিয়া কর প্রদানের শর্তে সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করে। ‘হাররান’ শহরের লোকেরাও একই শর্তে সন্ধি করে। এরপর আবূ মূসা আশ’আরী (রা)-কে প্রেরণ করা হয় নসীবীনের উদ্দেশ্যে। উমর ইব্ন সা’দকে প্রেরণ করা হয় ‘রাসুল ‘আয়ন’-এর উদ্দেশ্যে। আর ইয়ায ইব্ন গানাম নিজে যাত্রা করেন ‘দারা’ অঞ্চলের উদ্দেশ্যে । এসব শহর তাঁরা জয় করে নেন। উসমান ইব্ন আবিল ‘আসকে পাঠানো হয় আরমিনিয়ার উদ্দেশ্যে। সেখানে সামান্য যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধে সাফওয়ান ইব্ন মুআত্তাল সুলামী শহীদ হন। এরপর জিয়া কর প্রদানের শর্তে তারা উসমান ইব্ন আবিল ‘আসের সাথে সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষর করে। সমঝোতা হয় যে, প্রতি পরিবার এক দীনার বা স্বর্ণমুদ্রা করে জিয়া কর পরিশোধ করবে।
সায়ফ বলেন, আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন গাস্সান যাত্রা করে মুসেল পৌঁছেন । তারপর যেতে যেতে নসীবীন পর্যন্ত অগ্রসর হন। সেখানকার অধিবাসিগণ সন্ধি স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। অতঃপর ‘রিকা’ অধিবাসিগণ যে শর্তে সন্ধি স্থাপন করেছে তারাও সেই শর্তে সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করে। তিনি জাযীরার নেতৃস্থানীয় আরব খ্রিস্টানদেরকে মদীনায় খলীফা উমর (রা)-এর নিকট পাঠিয়ে দেন। খলীফা উমর (রা) ওদেরকে বললেন, তোমরা জিয়া কর প্রদান কর। ওরা বলল, না, আপনি বরং আমাদেরকে আমাদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছিয়ে দিন। আপনি যদি আমাদের উপর জিয়া কর ধার্য করেন তাহলে আমরা রোম দেশে চলে যাব, ওদের সাথে মিলিত হব। আরব হিসেবে আমাদেরকে অপমান করা হচ্ছে। হযরত উমর (রা) বললেন, “ইসলাম গ্রহণ না করে তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে অপমানিত করেছ, তোমাদের মূলনীতির উল্টো কাজ করেছ। এখন তোমরা অবশ্যই নত হয়ে জিয়া কর প্রদান করবে। আর যদি তোমরা রোম দেশে পালিয়ে যাও তাহলে তোমাদেরকে ধরে আনার জন্যে আমি সেনা অভিযান প্রেরণ করব । তারপর তোমাদের বন্দী করে নিয়ে আসব।’ তারা বলল, ‘তবে আপনি আমাদের থেকে কিছু অর্থ সম্পদ গ্রহণ করবেন কিন্তু তা ‘জিযয়া কর’ নামে নয়। খলীফা বললেন, “আমরা জিয়া কর’ নামেই তা গ্রহণ করব, তোমরা দেয়ার সময় যে নামেই দাও না কেন ?” তখন হযরত আলী ইব্ন আবী তালিব (রা) বললেন, “হযরত সা’দ (রা) কি তাদের উপর দ্বিগুণ সাদকা ধার্য করেন নি?” খলীফা বললেন, হ্যাঁ, তাইতো, তারপর হযরত আলী (রা)-এর বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শুনলেন এবং আরব খ্রিস্টানদের প্রস্তাব মেনে নিলেন।
ইবন জারীর (র) বলেন, এই বছর অর্থাৎ ১৭ হিজরী সালে হযরত উমর (রা) সিরিয়া আগমন করেছিলেন। তিনি সারা এসে পৌঁছেন। মুহাম্মদ ইব্ন ইসহাক তাই বলেছেন। সায়ফ ইবন উমর বলেছেন যে, খলীফা জাবিয়া এসে পৌঁছেন। আমি বলি, প্রসিদ্ধ অভিমত হচ্ছে তিনি ১. ওয়াকিদীর মতে তাঁর নাম ছিল উমায়র ইব্ন সা’দ ইবন উবায়দ।

তথ্যসূত্রঃ
- কুরআন, সূরা তওবা ৯:২৯; তাফসির-সংকলন: quran.com tafsir view ↩︎
- সূরা তওবা, আয়াত ২৯ ↩︎
- সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩২৮ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, ইসলামিয়া কুতুবখানা প্রকাশনী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৫৩ ↩︎
- সহিহ বুখারি, “Jizyah and Mawaada’ah”: সিরিয়া বনাম ইয়েমেন, Mujahid-সংক্রান্ত বর্ণনা ↩︎
- খলিফা উমরের মৃত্যু ও তার কারণ ↩︎
- আশরাফুল হিদায়া, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৭৬-৪৯২ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯১-৩০১ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬৪-৫৬৫ ↩︎
- ফাতায়ায়ে আলমগীরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৪২ ↩︎
- আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ১৪৩ ↩︎
