
Table of Contents
ভূমিকা
ইসলামী ধর্মতত্ত্বে আল্লাহকে ‘আল-আলিম’ বা সর্বজ্ঞ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যার জ্ঞান অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ—সবকিছুর ওপর পরিব্যপ্ত বলে দাবি করা হয়। তবে হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রাক্কালে সংঘটিত ‘বাই’আতুর রিদওয়ান’ বা রিদওয়ানের শপথের ঘটনাবলি এই দাবিকে এক চরম যৌক্তিক ও তাত্ত্বিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে মক্কা অভিযানের সময় হযরত উসমান ইবনে আফফানের কথিত হত্যার গুজবকে কেন্দ্র করে যে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এবং তাতে স্বয়ং আল্লাহর যেভাবে ‘অংশগ্রহণের’ দাবি কোরআন, সহিহ হাদিস এবং তাফসীরসমূহে করা হয়েছে, তা মূলত একটি গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemological) অসঙ্গতিকে স্পষ্ট করে তোলে। এই প্রবন্ধে আমরা পরীক্ষা করে দেখব, কীভাবে একটি ভিত্তিহীন গুজবের ওপর ভিত্তি করে স্বয়ং সর্বজ্ঞানী আল্লাহ পাক একটি প্রতিশোধের শপথে শরিক হলেন এবং কেন এই ঘটনাটি আল্লাহর সর্বজ্ঞতার প্রচলিত ধারণাকে সরাসরি খারিজ করে দেয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটঃ গুজবের ওপর নির্মিত একটি ‘ঐশ্বরিক’ ভিত্তি
১৪০০ থেকে ১৫০০ অনুসারীর একটি সশস্ত্র বহর নিয়ে নবী মুহাম্মদের মক্কা অভিমুখে যাত্রা ছিল ইসলামের ইতিহাসের এক চরম উত্তেজনাকর সন্ধিক্ষণ। মক্কাবাসীরা যখন তাদের প্রবেশে বাধা দেয়, তখন রক্তপাত এড়াতে কূটনৈতিক আলোচনার পথ বেছে নেওয়া হয় এবং উসমান ইবনে আফফানকে মক্কার নেতৃত্বের কাছে দূত হিসেবে পাঠানো হয়। ঠিক এই সন্ধিক্ষণেই উদ্ভূত হয় সেই বিতর্কিত পরিস্থিতি—উসমানের সম্ভাব্য হত্যার একটি ভিত্তিহীন গুজব। নবী মুহাম্মদ এই অসমর্থিত খবরে বিচলিত হন এবং সাহাবিদের কাছ থেকে এক চূড়ান্ত প্রতিশোধের শপথ বা ‘বাই’আতুর রিদওয়ান’ গ্রহণ করেন।
এই শপথের তাৎপর্য কেবল সাহাবিদের আনুগত্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এতে সরাসরি আল্লাহর সম্পৃক্ততা ও সমর্থন ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই নাটকীয় মুহূর্তেই নাজিল হয় সেই আয়াত, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে নবীর হাতে হাত রাখা মানেই স্বয়ং আল্লাহর হাতে হাত রাখা। অর্থাৎ, একটি ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যে আবেগপ্রসূত শপথ নেওয়া হচ্ছিল, আল্লাহ সেখানে নিজের ‘ঐশ্বরিক সিলমোহর’ এঁটে দেন। আসুন সেই আয়াতের বিভিন্ন অনুবাদ এক নজরে দেখে নিই: [1]
যারা তোমার কাছে বাই‘আত (অর্থাৎ আনুগত্য করার শপথ) করে আসলে তারা আল্লাহর কাছে বাই‘আত করে। তাদের হাতের উপর আছে আল্লাহর হাত। এক্ষণে যে এ ও‘য়াদা ভঙ্গ করে, এ ও‘য়াদা ভঙ্গের কুফল তার নিজেরই উপর পড়বে। আর যে ও‘য়াদা পূর্ণ করবে- যা সে আল্লাহর সঙ্গে করেছে- তিনি অচিরেই তাকে মহা পুরস্কার দান করবেন।
— Taisirul Quran
যারা তোমার বাইআত গ্রহণ করে তারাতো আল্লাহরই বাইআত গ্রহণ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর। সুতরাং যে ওটা ভঙ্গ করে, ওটা ভঙ্গ করার পরিনাম তারই এবং যে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার পূর্ণ করে তিনি তাকে মহা পুরস্কার দেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর যারা তোমার কাছে বাই‘য়াত গ্রহণ করে, তারা শুধু আল্লাহরই কাছে বাই‘য়াত গ্রহণ করে; আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর; অতঃপর যে কেউ ওয়াদা ভঙ্গ করলে তার ওয়াদা ভঙ্গের পরিণাম বর্তাবে তারই উপর। আর যে আল্লাহকে দেয়া ওয়াদা পূরণ করবে অচিরেই আল্লাহ তাকে মহা পুরস্কার দেবেন।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় যারা আপনার কাছে বাই’আত করে [১] তারা তো আল্লাহরই হাতে বাই’আত করে। আল্লাহর হাত [২] তাদের হাতের উপর [৩]। তারপর যে তা ভঙ্গ করে, তা ভঙ্গ করার পরিণাম বর্তাবে তারই উপর এবং যে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে, তবে তিনি অবশ্যই তাকে মহাপুরস্কার দেন।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তথ্যের সংকট ও আল্লাহর ‘অজ্ঞতা’
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ একটি গভীর দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। যদি আল্লাহ সত্যিই সবজান্তা (Omniscient) হয়ে থাকেন, তবে তিনি কেন একটি মিথ্যা গুজবের ভিত্তিতে উসমান হত্যার প্রতিশোধের জন্য এই বিশাল মহড়া আয়োজনের অনুমতি দিলেন? নিজেও কেন উসমান হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার বায়াতে অংশ নিলেন? সর্বজ্ঞানী আল্লাহর তো তখন ওহীর মাধ্যমে জানানো উচিত ছিল যে, “হে নবী, তুমি শান্ত হও। উসমানের কিছুই হয়নি, সে একটু পরেই ফিরে আসবে!” উসমান যখন মক্কায় কুরাইশদের সাথে নিরাপদে আলোচনা করছিলেন, তখন হুদায়বিয়ার প্রান্তরে আল্লাহ এবং তাঁর নবী একটি ‘গুজব’-থেকে উদ্ভূত ‘কাল্পনিক’ হত্যার বিচার চেয়ে শপথ নিচ্ছিলেন।
এখানেই ধর্মতত্ত্বের সাথে যুক্তির সংঘাত ঘটে। আল্লাহ কি জানতেন না যে উসমান জীবিত আছেন? যদি জানতেন, তবে তিনি কেন নবীকে তা জানিয়ে ওহী নাজিল করলেন না? বরং দেখা যাচ্ছে, আল্লাহও সেই মুহূর্তের গুজবে এতটাই ‘প্রভাবিত’ ছিলেন যে তিনি যুদ্ধের প্রস্তুতিতে সম্মতি দিচ্ছেন, সাহাবিদের উসমান হত্যার প্রতিশোধের শপথে সরাসরি শরিক হচ্ছেন। এই ঘটনাটি স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, ওহীর জ্ঞান মূলত মুহাম্মদের তৎকালীন মানসিক অবস্থা, রাজনৈতিক বুদ্ধি এবং প্রাপ্ত তথ্যের গণ্ডির বাইরে যেতে পারেনি। আল্লাহর ভূমিকা এখানে কেবল নবীর তাৎক্ষণিক আবেগকে বৈধতা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
নবী মুহাম্মদ মক্কার বাইরে হুদায়বিয়ায় অবস্থানরত। হযরত উসমান মক্কায় দূত হিসেবে প্রেরিত।
খবর ছড়িয়ে পড়ল: “উসমান মক্কায় নিহত হয়েছেন!” (বাস্তবে এটি মিথ্যা ছিল)।
গুজব বিশ্বাস করে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হলেন। প্রতিশোধের জন্য সাহাবীদের নিয়ে শপথ গ্রহণ করলেন।
আয়াত নাজিল করলেন (৪৮:১০): “আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর”। শপথে নিজের অংশগ্রহণ ও সমর্থন নিশ্চিত করলেন।
হযরত উসমান সুস্থ ও অক্ষত অবস্থায় মক্কা থেকে ফিরে এলেন। গুজব মিথ্যা প্রমাণিত হলো।
১. আল্লাহ সর্বজ্ঞ হলে কেন মিথ্যা গুজবের ভিত্তিতে প্রতিশোধের শপথে অংশ নিলেন?
২. ওহী কি তাহলে কেবল নবীর তৎকালীন মানসিক জ্ঞান ও তথ্যেরই প্রতিফলন ছিল?
এই পরিস্থিতির অযৌক্তিকতা আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায়, উসমান অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসার সাথে সাথে নবী মুহাম্মদের মানসিক অবস্থার সাথে সঙ্গতি রেখে এই পুরো ‘ঐশ্বরিক ক্ষোভ’ নিমেষেই মিলিয়ে যায়। আসুন এই বিষয়ে একটি আলোচনা শুনি:
তাফসিরকারকদের ভাষ্য ও জ্ঞানতাত্ত্বিক জটিলতা
এই ঐতিহাসিক অসঙ্গতিকে ঢাকতে গিয়ে মধ্যযুগীয় ও আধুনিক তাফসিরকারকগণ নানাবিধ ভাষাতাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সৌদি সরকার স্বীকৃত আলেম আবু বকর যাকারিয়া এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লাহর ‘হাত’ থাকা বা না থাকা নিয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদাগত বর্ণনায় বেশি লিপ্ত হয়েছেন, আল্লাহর হাত আছে নাকি নেই তা নিয়েই বেশি আলোচনা করেছেন, কিন্তু মূল যৌক্তিক সংকটটি সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন।
তাফসীরে যাকারিয়াঃ আল্লাহর হাত নিয়ে আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ
তার তাফসির গ্রন্থ থেকে আমরা দেখতে পাই, তিনি এই শপথকে সাহাবিদের এক বিরাট সম্মান হিসেবে চিত্রিত করেছেন। কিন্তু তিনি এটি স্পষ্ট করেননি যে, একজন সর্বজ্ঞ স্রষ্টা কেন তাঁর সাহাবিদের এমন এক ‘ভুল’ শপথে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সম্মানিত করবেন যার কোনো বাস্তব ভিত্তিই নেই। আসুন বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম আবু বকর যাকারিয়া, যার তাফসীর সৌদি সরকার দ্বারা স্বীকৃত, তার তাফসীর গ্রন্থ থেকে এই বিষয়ের ব্যাখ্যাটি দেখে নিই, [2]
১০.
নিশ্চয় যারা আপনার কাছে বাই’আত করে(৩) তারা তো আল্লাহ্ই হাতে… বাই’আত করে। আল্লাহ্ হাত (১) তাদের হাতের উপর (২)। তারপর যে তা ভঙ্গ করে, তা ভঙ্গ করার পরিণাম বর্তাবে তারই উপর এবং যে আল্লাহ্র সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে, তবে তিনি অবশ্যই তাকে মহাপুরস্কার দেন।
– পবিত্র মক্কা নগরীতে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর শহাদ হয়ে যাওয়ার খবর শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরাম থেকে হুদাইবিয়া নামক… স্থানে গাছের নীচে যে বাইয়াত নিয়েছিলেন সেই বাইয়াতের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে। [দেখুন- ফাতহুল কাদীর]
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের আকীদা-বিশ্বাস হচ্ছে যে, আল্লাহ্ তা’আলার হাত রয়েছে। যেভাবে তাঁর হাত থাকা উপযোগী ঠিক সেভাবেই তাঁর হাত রয়েছে। এ হাতকে কোন প্রকার অপব্যাখা করা অবৈধ। তবে এটা স্মরণ রাখতে হবে যে, তাঁর হাত কোন সৃষ্টির হাতের মত নয়। তিনি যেমন তাঁর হাতও সে রকম। প্রত্যেক সত্ত্বা অনুসারে তার গুণাগুণ নির্ধারিত হয়ে থাকে। সুতরাং আমরা বিশ্বাস করব যে, আল্লাহ্ তা’আলার হাত রয়েছে। তবে তাঁর হাত আমাদের পরিচিত কারও হাতের মত নয়।
আল্লাহ বলেন, যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে বাই’আত করেছে, তারা যেন স্বয়ং আল্লাহর হাতে বাই’আত করেছে। কারণ, এই বাই’আতের উদ্দেশ্য আল্লাহর আদেশ পালন করা ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। রাসূলের আনুগত্য যেমন আল্লাহর আনুগত্যেরই নামান্তর, তেমনিভাবে রাসূলের হাতে বাই’আত হওয়া আল্লাহর হাতে বাই’আত হওয়ারই নামান্তর। কাজেই তারা যখন রাসূলের হাতে হাত রেখে বাই’আত করল, তখন যেন আল্লাহর হাতেই বাই’আত করল। মহান আল্লাহ্ এ কথা বলে সাহাবীদের সম্মানিত করেছেন। আল্লাহ্ তাদের কথা শুনছিলেন, তাদের অবস্থান অবলোকন করছিলেন, তাদের বাহ্যিক অবস্থা ও মনের অবস্থা জেনে নিয়েছিলেন। সে সময় লোকেরা যে হাতে বাইয়াত করছিলো তা আল্লাহর প্রতিনিধি রাসূলের হাত ছিল এবং রাসূলের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সাথে এ বাইয়াত অনুষ্ঠিত হচ্ছিলো। [ইবন কাসীর, কুরতুবী]


তাফসীরে মাযহারীঃ আল্লাহর ‘অংশগ্রহণের’ ঘোষণা
একইভাবে ‘তাফসীরে মাযহারী’র বর্ণনায় দেখা যায়, কুরাইশদের বাধার মুখে ও উসমানের অনুপস্থিতিতে নবী ও সাহাবিদের মানসিক অবস্থা ছিল চরম মারমুখী। সেখানে দাবি করা হয়েছে যে, নবী যখন উসমানের নিরাপত্তার অভাব বোধ করছিলেন, ঠিক তখনই আল্লাহ তাঁর ‘অংশগ্রহণের’ ঘোষণা দেন। মজার ব্যাপার হলো, মাযহারীর বর্ণনাতেই আছে যে উসমান মক্কায় তিন দিন নিরাপদ ছিলেন এবং কুরাইশ নেতাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করছিলেন। তাহলে প্রশ্ন জাগে, মক্কায় উসমানের এই তিন দিনের ‘নিরাপদ অবস্থান’ কি আল্লাহর অজানা ছিল? নাকি আরবের মরুভূমিতে বসে নবী মুহাম্মদ যা কল্পনা করছিলেন, আকাশ থেকে আসা ওহী কেবল তারই প্রতিধ্বনি করছিল?
আসুন তাফসীরে মাযহারী থেকেও উপরের আয়াতের তাফসীর পড়ে দেখি, [3]-
যাহারা তোমার হাতে বায়’আত করে তাহারা তো আল্লাহরই হাতে বায়’আত করে। আল্লাহর হাত তাহাদের হাতের উপর। অতঃপর যে উহা ভঙ্গ করে, উহা ভঙ্গ করিবার পরিণাম তাহারই এবং যে আল্লাহর সহিত অঙ্গীকার পূর্ণ করে তিনি অবশ্যই তাহাকে মহাপুরস্কার দেন।
আলোচ্য আয়াতের মর্মার্থ হচ্ছে- হে আমার প্রিয়তম রসুল! এই হুদায়বিয়া প্রান্তরে যারা এখন আপনার হাতে হাত রেখে জেহাদ ও ধর্মপারায়ণতার বায়াত গ্রহণ করছে, তারা প্রকৃত অর্থে বায়াত গ্রহণ করছে আল্লাহর কাছে। এরপর যদি কেউ এই বায়াত ভঙ্গ করে, তাকে অবশ্যই ভোগ করতে হবে এর ভয়াবহ প্রতিফল। আল্লাহ্ দুনিয়া ও আখেরাতে তাকে শান্তিদান করবেনই। আর যারা এই বায়াত অনুসারে তার কৃত অঙ্গীকার যথারীতি পালন করে চলবে, তিনি অবশ্যই তাকে দান করবেন অক্ষয় পুরস্কার।
এখানে ‘যারা তোমার হাতে বায়াত গ্রহণ করে’ অর্থ হে রসুল! যারা আপনার কাছে এই মর্মে জেহাদের অঙ্গীকার করে যে, তারা কোনোক্রমেই জেহাদের ময়দান থেকে পশ্চাপসরণ করবে না, মৃত্যু অথবা বিজয় পর্যন্ত প্রাণপনে লড়াই করে যাবে। ‘তারা তো আল্লাহর হাতে বায়াত গ্রহণ করে’ অর্থ হে আমার রসুল! আমার কাছে বায়াত গ্রহণ করতে হলে তো অবশ্যই বায়াত গ্রহণ করতে হবে আপনার কাছেই, কেননা আপনিই আমার নিযুক্ত প্রতিনিধি, আমার রসুল।
‘ইয়াদুল্লহি ফাওকা আইদীহিম’ (আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর) এই বাক্যটির ভিত্তি এখানে ইস্তেআ’রায়ে তাখলিয়া (সংবেদী উপমার) উপর। অর্থাৎ রসুল স. এর হাতে বায়াত হওয়াকে যখন এখানে আল্লাহর আনুরূপ্যবিহীন হাতে বায়াত হওয়ারূপে সাব্যস্ত করা হয়েছে, তখন এরকম ধারণার সৃষ্টি হতে পারে যে, তাহলে রসুলের হাতই আল্লাহর হাত। তাই অপধারণা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাটুকুকে তিরোহিত করার উদ্দেশ্যে এখানে বলা হয়েছে ‘আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর’। অর্থাৎ রসুল ও তাঁর কাছে বায়াত গ্রহণকারীদের হাতের চেয়ে আল্লাহর হাত ভিন্ন। কেননা তিনি আকারসম্ভূত নন। অর্থাৎ বায়াতকারী ও বায়াত গ্রহণকারীদের বায়াত অনুমোদন করে যে হাত সে হাত আল্লাহর এবং অবশ্যই সে হাত অন্য কারো মতো হওয়া থেকে পবিত্র। সে হাত আনুরূপ্যবিহীন।
হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, আল্লাহ্ তাদের কল্যাণদানের যে অঙ্গীকার করেছিলেন, তা পরিপূর্ণ করবার জন্য আল্লাহর আনুরূপ্যবিহীন হাত তাঁদের হাতের উপরে ছিলো। আমি বলি, হজরত ইবনে আব্বাসের বক্তব্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ্ তখন
তাঁদের হাতের উপরে রেখেছিলেন তাঁর অঙ্গীকার সম্পন্ন করার হাত। এমতাবস্থায় আল্লাহর হাতকে মনে করতে হবে তাঁর এক বিশেষ গুণ, আর সে গুণও হবে তাঁর অন্যান্য গুণের মতো আনুরূপ্যবিহীন, যা কল্পনার অতীত।
কালাবী বলেছেন, এখানে ‘আল্লাহর হাত’ অর্থ তাঁর পক্ষ থেকে সৎপথ প্রাপ্তির অনুগ্রহ। আর তাঁর এমতো অনুগ্রহের অর্থ হবে, সাহাবীগণ রসুল স. এর নিকটে আনুগত্যের যে শপথ নিয়েছিলেন, তদপেক্ষা অনেক উত্তম নেয়ামত সৎপথপ্রাপ্তি বা হেদায়েত তিনি তাঁদেরকে দান করেছিলেন।
হজরত ওরওয়া থেকে বায়হাকী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. যখন হুদায়বিয়ায় অবস্থান গ্রহণ করলেন, তখন কুরায়েশেরা ঘাবড়ে গেলো। রসুল স. সাহাবীগণের মধ্যে একজনকে তাদের কাছে দূত হিসেবে পাঠাতে মনস্থ করলেন। এই ভেবে ডাকলেন হজরত ওমরকে। হজরত ওমর সব শুনে বললেন, হে আল্লাহর বার্তাবাহক! কুরায়েশেরা তো আমার কথা শোনার আগেই আমার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কেননা তারা তো জানে যে, আমি তাদের কতো বড় শত্রু। বনী আদী সম্প্রদায়ের কেউই আমাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে না। আমি বরং নাম প্রস্তাব করছি এমন এক জনের, যিনি কুরায়েশদের চোখেও সাম্মানার্হ ও নিরাপদ। তিনি হচ্ছেন ওসমান ইবনে আফ্ফান। প্রস্তাবটি রসুল স. এর মনঃপুত হলো। তিনি স. হজরত ওসমানকে ডেকে বললেন, তুমিই যাও। গিয়ে তাদেরকে বুঝিয়ে বলো যে, আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি। এসেছি কেবল ওমরা পালন করতে। তারপর তাদেরকে ইসলামের প্রতিও আহ্বান জানিয়ো। আর অসহায় মুসলমানদেরকে দিয়ো বিজয়ের সুসংবাদ। বোলো, আল্লাহ্ মক্কার ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবেন। ফলে মক্কার কেউ আর তাদের ইমানকে গোপন করবে
না। হজরত ওসমান যথারীতি যাত্রা শুরু করলেন। পথিমধ্যে বলদাহ নামক স্থানে পৌঁছলে সেখানকার লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাবেন? হজরত ওসমান বললেন, রসুল স. আমাকে প্রেরণ করেছেন সবাইকে ইসলামের আহ্বান জানাতে। তাই আমি বলি, তোমরাও ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হও। কেননা আল্লাহ তাঁর মনোনীত ধর্মকে অবশ্যই জয়যুক্ত করবেন এবং তাঁর রসুলকে করবেন মর্যাদায়িত। এরপর আর একটু এগিয়ে গিয়ে কুরায়েশদেরকে জানালেন, তোমরা আমাদেরকে বাধা দিতে চাইছো কেনো? আমাদেরকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে দাও। অন্য সম্প্রদায় যদি আমাদের উপরে প্রবল হয়ে যায়, তবে তো তোমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবেই। আর রসুল স. যদি অন্যান্য গোত্রগুলোর উপরে বিজয়ী হন, তবে তোমরা তাঁর ধর্মে চলে আসতে পারবে। কিংবা আমাদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করতে পারবে। এখনো তোমাদের সংখ্যা অনেক থাকলেও তোমরা যুদ্ধে পর্যুদস্তপ্রায়। তোমাদের প্রধান প্রধান নেতারাও ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছে। আর একথাটিও তোমরা অনুধাবন করতে চেষ্ট করো যে, রসুল স. এখানে যুদ্ধ করতে আসেননি। এসেছেন কেবল ওমরা পালন করতে। তাঁর সঙ্গে রয়েছে কোরবানীর জন্য অনেক চিহ্নিত উট। ওমরা ও কোরবানী সম্পন্ন করার পর তিনি স. মদীনায় ফিরে যাবেন। পৌত্তলিকেরা বললো, তোমার কথা আমরা শুনলাম। কিন্তু একথাও তুমি শুনে রাখো যে, আমরা তাঁর অভিপ্রায় পূর্ণ করতে দিবো না। ফিরে গিয়ে তাঁকে জানাও, আমরা তাঁকে আর মক্কার দিকে অগ্রসর হতে দিবোই না। হজরত ওসমানের সঙ্গে আব্বাস ইবনে সাঈদের সাক্ষাত হলো। তিনি পরবর্তীতে মুসলমান হয়েছিলেন। তিনি হজরত ওসমানকে দেখেই বললেন, মারহাবা। আপনি যা করতে আদিষ্ট হয়েছেন, তা-ই করুন। আমি আপনাকে নিরাপত্তা প্রদান করলাম। এরপর আব্বাস তাঁর ঘোড়া থেকে নামলেন। হজরত ওসমানকে প্রথমে তাঁর ঘোড়ায় চড়িয়ে নিজে উঠে বসলেন তাঁর পিছনে। বললেন, আপনি এখানে নিশ্চিন্তে আসা-যাওয়া করে আপনার দৌত্যকর্ম করে যেতে পারেন। কাউকে ভয় করার প্রয়োজন নেই। উল্লেখ্য, আব্বাস ইবনে সাইদ ছিলেন কাবাগৃহের সেবক। তাই সকলেই তাঁকে সম্মান করতো। তিনি হজরত ওসমানকে মক্কায় নিয়ে গেলেন। তিনি একে একে সকল কুরায়েশ নেতার সঙ্গে সাক্ষাত করে রসুল স. এর বক্তব্য জানালেন। কিন্তু সকলেই প্রকাশ করলো নেতিবাচক মনোভাব। বললো, মোহাম্মদকে কখনোই মক্কায় প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। হজরত ওসমান শেষে সাক্ষাত করলেন মক্কার বন্দীপ্রায় মুসলমান নারী-পুরুষদের কাছে। তারা কুরায়েশদের বাধার কারণে হিজরত না করতে পেরে মক্কাতেই রয়ে গিয়েছিলেন। হজরত ওসমান তাদেরকে এই মর্মে সান্ত্বনার বাণী শোনালেন যে, রসুল স. জানিয়েছেন, আমি খুব শীগগিরই বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করবো। তখন অবস্থা এমন হবে যে, কাউকে আর ইমান গোপন রাখতে হবে না। তাঁর এই সংবাদ শুনে খুব খুশী হলেন তাঁরা। বললেন, রসুল স. কে আমাদের অভিবাদন জানাবেন। তাঁদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাত শেষ করে যখন হজরত ওসমান কুরায়েশ
নেতাদের কাছে ফিরে এলেন, তখন তারা বললো, আপনি যদি চান তবে কাবা তাওয়াফ করতে পারেন। হজরত ওসমান বললেন, আল্লাহর রসুল তওয়াফ না করা পর্যন্ত আমি তাওয়াফ করতে পারি না। তিনি মক্কায় অবস্থান করলেন তিন দিন।
এরমধ্যে তিনি কুরায়েশদেরকে ইসলামের প্রতি পুনঃপুনঃ আহ্বান জানালেন।
ওদিকে রসুল স. এর সঙ্গী সাথীদের মধ্যে কেউ কেউ বলাবলি করতে লাগলেন, ওসমান নিশ্চয় কাবাগৃহ প্রদক্ষিণ করবার সৌভাগ্য লাভ করেছে। রসুল স. বললেন, কখনোই নয়। সে যদি সেখানে বছরের পর বছর অবস্থান করে, তবুও আমি তাওয়াফ করার আগে সে তাওয়াফ করবে না। রসুল স. হুদায়বিয়ায় প্রহরীরূপে নিযুক্ত করেছিলেন হজরত আউস ইবনে আওবা, হজরত উব্বাদ ইবনে বিশর এবং হজরত মোহাম্মদ ইবনে মুসলিমাকে। তাঁরা পালাক্রমে শিবির পাহারা দিতেন।
হজরত ওসমান যখন মক্কায়, তখন একরাতে পাহারায় ছিলেন হজরত মোহাম্মদ ইবনে মুসলিমা। গভীর রাতে মাকরয ইবনে হাফসের নেতৃত্বে পঞ্চাশ জনের একটি দল এলো আক্রমণ করতে। তাদেরকে বলে দেওয়া হয়েছিলো, তারা অতি সন্তর্পণে রসুল স. এর শিবিরের চতুষ্পার্শ্ব প্রদক্ষিণ করবে। মুসলমানদের অসতর্ককতার সুযোগ হয়তো পাওয়া যেতেও পারে। কিন্তু অতন্দ্র প্রহরী মোহাম্মদ ইবনে মুসলিমার হাতে ধরা পড়ে গেলো মাকরয। রসুল স. যে তাঁকে অত্যন্ত অসৎ বলেছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া গেলো হাতে হাতে। ওদিকে রসুল স. এর অনুমতিক্রমে কয়েকজন মুসলমান হজরত ওসমানের নিরাপত্তারক্ষা অথবা তাঁর কুশলবার্তা সংগ্রহের জন্য গোপনে মক্কায় প্রবেশ করলেন। তাঁরা হলেন সর্বহজরত করযবিন জাবের ফাহরি, আবদুল্লাহ ইবনে সুহাইল ইবনে আমর ইবনে আবদুস শামস্, আবদুল্লাহ্ ইবনে হুজাফা সাহমী আবুর রুম ইবনে উমায়ের ইবনে আমর, উমায়ের ইবনে ওহাব জামুহী, হাতেব ইবনে আবী বালতা এবং আবদুল্লাহ ইবনে উমাইয়া। কুরায়েশরা তাঁদের অনুপ্রবেশের সংবাদ জানতে পেরে তাদেরকে বন্দী করে ফেললো। কুরায়েশরা এ সংবাদও পেলো যে মোহাম্মদ ইবনে মুসলিমা তাদের লোককে আটক করে রেখেছে। তাদের উদ্ধারের জন্য তারাও গোপনে পাঠালো একটি সশস্ত্র বাহিনী। মুসলমানেরাও তাদের গতিবিধি টের পেয়ে গেলো। দুই দল মুখোমুখিতেই তাদের মধ্যে শুরু হলো তীর ও পাথরবর্ষণ। মুসলমানেরা গ্রেফতার করতে সমর্থ হলো শত্রুপক্ষের বারোজনকে। হজরত ইবনে জানীম এক পাহাড়ে আরোহণ করেছিলেন। শত্রুরা হঠাৎ তাঁকে তীরবিদ্ধ করে শহীদ করলো। ইত্যবসরে সংবাদ এসে পৌঁছলো, হজরত ওসমান ও তাঁর সঙ্গীগণকে শহীদ করা হয়েছে। সংবাদ শুনে রসুল স. মর্মাহত হলেন। আনুগত্যের বায়াত গ্রহণের জন্য ডেকে পাঠালেন সবাইকে।
হজরত সালমা ইবনে আকওয়া থেকে ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতেম; হজরত ওরওয়া থেকে বায়হাকী, জুহুরী সূত্রে ইসহাক এবং স্বীয় শিক্ষক সূত্রে
মোহাম্মদ ইবনে ওমর বর্ণনা করেছেন, হজরত সালমা বলেছেন, তখন দ্বিপ্রহর। আমি শায়িত ছিলাম। এমন সময় ঘোষণা কানে এলো, হে লোকসকল! রুহুল কুদ্দুস অবতীর্ণ হয়েছে। এসো, আনুগত্যের শপথ সম্পন্ন করো। বহিষ্কৃত হও এবং এগিয়ে এসো আল্লাহর নামে। মুসলিম বর্ণনা করেছেন, হজরত সালমা বলেছেন, সর্বপ্রথম রসুল স. এর কাছে বায়াত গ্রহণ করলাম আমি। এরপর একে একে বায়াত হতে লাগলো অন্যান্যরা। এভাবে প্রায় অর্ধেক লোক বায়াত গ্রহণ করার পর রসুল স. আমাকে বললেন, সালমা। আনুগত্যের বায়াত গ্রহণ করো। আমি বললাম, হে আল্লাহর রসুল! আমিতো বায়াত গ্রহণ করেছি। তিনি স. বললেন পুনরায় গ্রহণ করো। আমি পুনরায় রসুল স. এর পবিত্র হস্তে বায়াতের শপথ উচ্চারণ করলাম। এরপর রসুল স. সম্পন্ন করলেন অবশিষ্টদের বায়াত। যখন সকলের বায়াত শেষ হলো, তখন রসুল স. পুনরায় আমাকে বললেন, তুমি কি শপথ করবে না? আমি বললাম, হে আল্লাহর বচনবাহক! আমি তো দু’বার শপথ উচ্চারণ করেছি প্রথমে ও মধ্যভাগে। তিনি স. বললেন, আরো একবার করো, অধিকতর শুদ্ধভাবে। কাজেই আমি বায়াত গ্রহণ করলাম তৃতীয় বারের মতো। ‘সহীহ বোখারী’ গ্রন্থে এসেছে, হজরত সালমাকে পরবর্তীতে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, আপনারা কিসের উপরে শপথ নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মৃত্যুর উপর।
‘সহীহ মুসলিম’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, হজরত জাবের বলেছেন, একটি ফলবান বৃক্ষের নিচে যখন ওমর বায়াত গ্রহণ করছিলেন, তখন আমরাও অগ্রসর হলাম। তাঁর বায়াতের পর বায়াত গ্রহণ করলাম আমরা। তখন কেবল জদ ইবনে কায়েস ছাড়া সকলেই বায়াত গ্রহণ করে। জদ তখন লুকিয়েছিলো তার উটের পিছনে।
হজরত ইবনে ওমর থেকে তিবরানী, শা’বী সূত্রে বায়হাকী এবং জায়েদ ইবনে হুবাইশ সূত্রে ইবনে মানদাহ্ বর্ণনা করেছেন, ওই সময় সর্বপ্রথম রসুল স. এর কাছে এগিয়ে গেলেন আবু সানান আসাদী। বললেন, হে আল্লাহর রসুল! হস্ত প্রসারিত করুন। আমি আপনার হাতে আনুগত্যের শপথ করতে ইচ্ছুক। রসুল স. বললেন, তুমি সেই কথার উপর আনুগত্যের শপথ করো, যা তোমার অন্তরে রয়েছে। হজরত ইবনে ওমর বর্ণনা করেছেন, আবু সানান তখন শুধালেন, আমার অন্তরে কী আছে? রসুল স.
বললেন, হয় বিজয়, নয় মৃত্যু। আর তা হতে হবে আল্লাহর রসুলের সামনে। আবু সানান আর দ্বিরুক্তি না করে শপথ গ্রহণ
করলেন। এরপর একে একে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেন অন্যেরাও।
হজরত আনাস থেকে বায়হাকী এবং হজরত ইবনে ওমর থেকে ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, রসুল স. সাহাবীগণকে অঙ্গীকারাবদ্ধ করলেন তখন, যখন হজরত ওসমান দূত হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন কুরায়েশদের কাছে। সকলে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার পর তিনি স. তাঁর এক হাত দিয়ে অন্য হাত আঁকড়ে ধরে বললেন, হে আল্লাহ্! এই হাতটি ওসমানের হাত। আর এই হাত নিশ্চয় অন্যান্যদের হাতের চেয়ে উত্তম।



তাফসীরে জালালাইনঃ উসমানের মৃত্যুর উপর বায়’আত
এবারে আসুন তাফসীরে জালালাইনে সূরা ফাতহ এর ১৮ নম্বর আয়াতটির ব্যাখ্যা পড়ে নিই, [4] –
قَوْلُهُ لَقَدْ رَضِيَ اللهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ الخ
: শানে নুযূল: হুদায়বিয়ায় মুসলমানগণ নবী করীম-এর নিকট মৃত্যুর উপর যে বায়’আত করেছিলেন এখানে সেদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। অত্র বাইয়াতের প্রেক্ষাপট নিম্নরূপ-নবী করীম ষষ্ঠ হিজরির জুলকাআদ মাসে প্রায় দেড় সহস্র সাহাবীগণসহ ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে জানতে পারলেন যে, কুরাইশরা তাঁকে বাধা প্রদান করবে- মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না। তাই সাধারণ পথ ত্যাগ করত পার্বত্য পথ পাড়ি দিয়ে সাহাবীগণসহ তিনি হুদায়বিয়ার প্রান্তরে উপস্থিত হলেন এবং তথায় অবস্থান করলেন। কুরাইশদের পক্ষ হতে বুদায়েল বিন ওয়ারাকা, ওরওয়াহ ইবনে মাসউদ এবং আরো কয়েকজন দূত পর পর নবী করীম -এর নিকট আসল। নবী করীম তাদের মারফত কুরাইশদেরকে জানিয়ে দিলেন যে, আমরা শুধু ওমরা পালনের উদ্দেশ্যেই এসেছি। যুদ্ধ-বিগ্রহ বা মক্কা দখলের কোনো ইচ্ছাই আমাদের নেই। কিন্তু কুরাইশরা তাদের সিদ্ধান্তে অটল-তাদের একই কথা আমরা মুহাম্মদ ও তাঁর সাথীদেরকে মক্কায় প্রবেশ করতে দেব না।
রাসূল হযরত ওমর (রা.)-কে ডেকে পাঠালেন মক্কায় প্রেরণের জন্য। কিন্তু তিনি অপারগতা প্রকাশ করলেন এবং হযরত
ওসমান (রা.)-কে পাঠানোর পরামর্শ দিলেন। হযরত ওসমান (রা.) কুরাইশ নেতৃবৃন্দের নিকট নবী করীম-এর বার্তা পৌঁছে দিলেন। তাদেরকে জানিয়ে দিলেন যে, তাঁদের সাথে হাদীর পশুও রয়েছে- সেগুলোকে ওমরা পরবর্তী ‘কুরবানির উদ্দেশ্যে তাঁরা নিয়ে এসেছেন। কুরাইশরা তা মানতে রাজি হলো না। তারা বলল, ইচ্ছা হয় তুমি নিজেই বায়তুল্লার তওয়াফ করে যেতে পার। কিন্তু হযরত ওসমান (রা.) বললেন, রাসূলুল্লাহকে ব্যতীত আমি ওমরা পালন করতে পারি না-বায়তুল্লাহর তওয়াফ করতে পারি না। কুরাইশরা হযরত ওসমান (রা.)-কে আটক করে রাখল।
এ দিকে মুসলমানদের নিকট সংবাদ পৌঁছল যে, কুরাইশরা হযরত ওসমান (রা.)-কে শহীদ করে ফেলেছে। এতদশ্রবণে নবী
করীম ও মর্মাহত হলেন। তিনি সাহাবীগণকে ডাকলেন। সমবেত সাহাবীগণ একটি বাবলা গাছের নিচে নবী করীম -এর নিকট এ মর্মে বায়’আত গ্রহণ করলেন যে, আমরা জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করব- হযরত ওসমান (রা.)-কে হত্যার
প্রতিশোধ গ্রহণ করব এবং মৃত্যুর ভয়ে ময়দান ত্যাগ করব না। এটাই ইতিহাসে بیعت رضوان হিসেবে খ্যাত।
উক্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলোচ্য আয়াত কয়টি নাজিল হয়েছে। এতে বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশ গ্রহণকারী সাহাবীগণের ফজিলত ও মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে।
এখানে হযরত সালামা ইবনে আকওয়া (রা) হতে বর্ণিত একটি হাদীস প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, হুদায়বিয়ায় আমরা কথাবার্তা ও আলাপচারিতায় লিপ্ত ছিলাম। এমতাবস্থায় নবী করীম-এর পক্ষ হতে এক ঘোষক ঘোষণা দিলেন যে, الْبَيْعَةُ – الْبَيْعَةُ অর্থাৎ বায়’আত গ্রহণ করুন- বায়’আত। ইতোমধ্যে হযরত জিবরাইল (আ.) অবতীর্ণ হয়েছেন। তখন আমরা নবী করীম-এর নিকট দৌড়ে গেলাম। দেখলাম যে, তিনি একটি বৃক্ষের নিচে রয়েছেন। তখন আমরা তাঁর নিকট বায়’আত গ্রহণ করলাম। এটাকে উপলক্ষ করে আল্লাহ তা’আলা নাজিল করলেন- لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ الخ
পূর্ববর্তী আয়াতের সাথে সম্পর্ক: পূর্ববর্তী আয়াতে সেসব বেদুঈনদের কথা বলা হয়েছে, যারা হুদায়বিয়ার অভিযানে শরিক হয়নি এবং এজন্যে ভিত্তিহীন ওজর-আপত্তি পেশ করেছে। আল্লাহ তা’আলা তাদের সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। আর আলোচ্য আয়াতে খাঁটি মুমিনদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যারা হুদায়বিয়ায় একটি বৃক্ষতলে রাসূলে কারীম-এর হস্ত মোবারকে এ মর্মে বায়’আত করেছিলেন যে, জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও রাসূলে কারীম-কে সাহায্য করতে থাকবেন এবং ইসলামের খেদমতে আত্মনিয়োগ করবেন। আলোচ্য আয়াতে এমন ত্যাগী, নিবেদিত প্রাণ মুমিনগণের প্রশংসা করা হয়েছে এবং তাঁদের প্রতি আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি লাভের কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

হাদিসের সাক্ষ্যঃ উসমান হত্যার ‘কাল্পনিক’ প্রতিশোধ
এই বাইয়াতটি যে কেবল একটি রাজনৈতিক আনুগত্য ছিল না, বরং উসমান হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য একটি ‘রক্তক্ষয়ী শপথ’ ছিল, তা সহীহ হাদিসের বর্ণনা থেকে দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। সুনান আত তিরমিজীর একটি বর্ণনায় দেখা যায়, উসমান বদর বা রিদওয়ানের শপথে সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও নবী মুহাম্মদ তাঁর এক হাতকে উসমানের হাত হিসেবে ঘোষণা করে এই প্রতীকী প্রতিশোধের শপথ সম্পন্ন করেন। আসুন হাদিসটি পড়ি, যেখান থেকে বোঝা যাবে, এই বায়াতটি ছিল উসমান হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার বায়াত [5]
সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৪৬/ রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তার সাহাবীগণের মর্যাদা
পরিচ্ছেদঃ ১৯. ‘উসমান ইবনু আফফান (রাযিঃ)-এর মর্যাদা।
৩৭০৬। উসমান ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু মাওহিব (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এক মিসরবাসী বাইতুল্লাহর হাজ্জ আদায় করে। সে একদল লোককে বসা দেখে বলে, এরা কারা? লোকেরা বলল, এরা কুরাইশ বংশীয়। সে পুনরায় বলে, এই বয়স্ক (শায়খ) লোকটি কে? লোকেরা বলল, ইবনু উমর (রাযিঃ)। সে সময় সে তার নিকটে এসে বলল, আপনাকে আমি কয়েকটি বিষয় প্রশ্ন করব। অতএব আপনি আমাকে (তা) বলুন।
আমি এ বাইতুল্লাহর মর্যাদার শপথ দিয়ে আপনাকে প্রশ্ন করছি, আপনি কি অবহিত আছেন যে, উসমান (রাযিঃ) উহুদ যুদ্ধের দিন (যুদ্ধক্ষেত্র হতে) পলায়ন করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। সে আবার বলল, আপনি কি জানেন, তিনি (হুদাইবিয়ায় অনুষ্ঠিত) বাই’আতুর রিযওয়ানে অনুপস্থিত ছিলেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। সে পুনরায়ও বলল, আপনি কি অবহিত আছেন যে, তিনি বদরের যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলেন এবং তাতে উপস্থিত হননি? তিনি বললেন, হ্যাঁ।
সে বলল, আল্লাহু আকবার। তারপর ইবনু উমার (রাযিঃ) তাকে বললেন, এবার এসো। যেসব বিষয়ে তুমি প্রশ্ন করেছ তা তোমাকে আমি সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেই।
উহুদের দিন তার পলায়নের ঘটনা প্রসঙ্গে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তার ঐ ব্যাপারটা ইতোমধ্যেই আল্লাহ তা’আলা ক্ষমা করে দিয়েছেন, সম্পূর্ণভাবে মাফ করেছেন। তারপর বদরের যুদ্ধে তার অনুপস্থিতির কারণ এই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মেয়ে (রুকাইয়াহ্) তার সহধর্মিণী ছিলেন (এবং সে সময় তিনি মারাত্মক অসুস্থ ছিলেন)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ যে লোক বদরের যুদ্ধে যোগদান করেছে তার সমপরিমাণ সাওয়াব ও গানীমাত তুমি পাবে। আর তিনি রুকাইয়ার দেখাশুনা করার জন্য তাকে মদীনাতে থাকারই নির্দেশ দিলেন। আর বাই’আতে রিদওয়ানে তার অনুপস্থিতির কারণ এই যে, মক্কাবাসীদের কাছে উসমান (রাযিঃ)-এর চাইতে বেশি মর্যাদাবান কোন মুসলিম লোক (হুদাইবিয়ায়) উপস্থিত থাকলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তার পরিবর্তে) তাকেই প্রেরণ করতেন। তা না থাকাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসমান (রাযিঃ)-কেই (মক্কায়) প্রেরণ করলেন। আর উসমান (রাযিঃ)-এর মক্কার অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যাওয়ার পর বাই’আতুর রিযওয়ান অনুষ্ঠিত হয়।
বর্ণনাকারী বলেন, (বাই’আত অনুষ্ঠানকালে)রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ডান হাতের দিকে ইশারা করে বললেনঃ এটা উসমানের হাত। তারপর তিনি ঐ হাতটি তার অন্য হাতের উপর স্থাপন করে বললেনঃ এটি উসমানের (বাই’আত) তারপর ইবনু উমার (রাযিঃ) লোকটিকে বললেন, এবার তুমি এ ব্যাখ্যা সঙ্গে নিয়ে যাও।
সহীহঃ বুখারী (৯৬৯৮)।
আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উসমান ইবনু মাওহাব (রহঃ)
পাঠকের কাছে নিবেদন, এই দৃশ্যটি কল্পনা করুন: উসমান মক্কায় নিরাপদে আলোচনারত, অথচ হুদায়বিয়ায় এক হাজারেরও বেশি মানুষ একটি গুজবের ভিত্তিতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার শপথ নিচ্ছেন এবং স্বয়ং আল্লাহ সেই শপথে শরিক হচ্ছেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি কি কোনো সর্বজ্ঞ স্রষ্টার পরিকল্পনার অংশ হতে পারে, নাকি এটি ছিল তৎকালীন একটি চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির ফসল যেখানে ‘ওহী’ কেবল নবীর রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল?
উপসংহারঃ এক ‘ভুল’ বিশ্বাসের ধ্বংসস্তূপ
বাই’আতুর রিদওয়ানের এই পুরো ঘটনাক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে একটি নির্মম সত্য বেরিয়ে আসে—ইসলামী ধর্মতত্ত্বের ‘সর্বজ্ঞ আল্লাহ’ মূলত নবীর সীমাবদ্ধ জ্ঞানেরই এক অলঙ্কৃত রূপ। আল্লাহ যদি সত্যিই সবকিছু জানতেন, তবে তিনি এই ভিত্তিহীন শপথের নাটক মঞ্চস্থ না করে শুরুতেই উসমানের কুশল সংবাদ জানিয়ে ওহী নাজিল করতে পারতেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নবী মুহাম্মদ যতক্ষণ গুজবের ঘোরে ছিলেন, আল্লাহও ততক্ষণ সেই গুজবের ওপর ভিত্তি করেই আয়াত পাঠিয়েছেন।
উসমান ফিরে আসার পর পরিস্থিতির শান্ত হওয়া এবং উসমান হত্যার সেই ‘প্রতিশোধের শপথ’ এর প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাওয়া ইসলামী বিশ্বাসের সমস্ত যৌক্তিক ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়। যদি একটি ওহী ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নাজিল হতে পারে, তবে সামগ্রিকভাবে কোরআনের ঐশ্বরিক দাবি কতটুকু গ্রহণযোগ্য? সচেতন ও যুক্তিবাদী মানুষের কাছে এটি স্পষ্ট যে, এই ঘটনাটি আল্লাহর সর্বজ্ঞতার দাবিকে কেবল খারিজই করে না, বরং প্রমাণ করে যে ঐ সময়ের সিদ্ধান্তগুলো ছিল নিছক মানবিক আবেগ ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার ফল। ধার্মিক মুসলমানরা কি এই সহজ সত্যটি অনুধাবন করার সাহস রাখবেন?
