ইহুদিদের আকৃষ্ট করার জন্য আল্লাহর কিবলা পরিবর্তন

ভূমিকাঃ পৌত্তলিকতার ছাঁচে নতুন ধর্মতত্ত্ব

ইসলামকে একটি সম্পূর্ণ মৌলিক ও স্বর্গীয় জীবনব্যবস্থা হিসেবে দাবি করা হলেও, এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত বা আচারগুলোর গভীরে দৃষ্টি দিলে এক ভিন্ন বাস্তবতা উন্মোচিত হয়। ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, ইসলামের প্রধান স্তম্ভগুলোর একটি—’হজ্জ’ এবং এর সাথে জড়িত প্রায় প্রতিটি কর্মকাণ্ডই মূলত আরবের প্রাক-ইসলামিক ‘প্যাগান’ বা পৌত্তলিক ধর্মের অবিকৃত অবশেষ। মক্কার কাবা গৃহটি ইসলাম আবির্ভাবের বহুকাল আগে থেকেই আরবের বিভিন্ন গোত্রের দেবদেবীর মূর্তিতে পরিপূর্ণ ছিল এবং বছরে একবার সেখানে তীর্থযাত্রীদের বিশাল সমাগম হতো। এই প্রাচীন প্রথাগুলোকে সমূলে উৎপাটন না করে বরং সেগুলোকে একটি ‘ইব্রাহিমী’ মোড়কে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করাই ছিল নবগঠিত ধর্মের অন্যতম রাজনৈতিক ও সামাজিক কৌশল।


আচারের প্রত্নতাত্ত্বিকতা ও অনুকরণ

প্রাচীন আরবের পৌত্তলিক সমাজে কাবার উপাসনা ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং নির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা। তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী, অপবিত্র বা সাধারণ কাপড় পরে কাবা প্রদক্ষিণ নিষিদ্ধ ছিল। এই নিষেধাজ্ঞার কারণেই তীর্থযাত্রীদের সেলাইবিহীন কাপড় পরতে হতো, যা বর্তমানে ‘এহরাম’ নামে পরিচিত। এমনকি কিছু কট্টর পৌত্তলিক গোত্র তাদের দেবতাকে সম্মান জানাতে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়েও কাবা প্রদক্ষিণ করত। কাবার চারদিকে বাম দিক থেকে সাতবার চক্কর দেওয়া (তাওয়াফ), কালো পাথর বা হাজরে আসওয়াদকে পরম মমতায় চুম্বন করা এবং মাথা নত করার যে প্রথা বর্তমানে পালিত হয়, তা মূলত প্রাক-ইসলামিক আরবীয় প্রস্তর পূজার (Litholatry) এক আধুনিক সংস্করণ।

মক্কার দুই পাহাড় সাফা ও মারওয়ার মধ্যে দৌড়ানো থেকে শুরু করে মিনায় ‘শয়তানকে পাথর মারা’—এই প্রতিটি কর্মকাণ্ডই ছিল প্রাচীন প্যাগান ধর্মের কাল্ট-রিচুয়াল। এমনকি দেবতার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে গরু, উট বা ছাগল উৎসর্গ করার যে কুরবানি প্রথা, তা-ও ছিল মূর্তিপূজক আরীয় ও আরবীয়দের একটি অতি প্রাচীন উপাচার। এই প্রথাগুলোকে পরবর্তীতে মুহাম্মদের উদ্ভাবিত উপকথার সাথে মিশিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন মনে হয় এগুলো আদিতে একেশ্বরবাদী ছিল। অথচ বাস্তব কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই যা প্রমাণ করে যে, ইব্রাহিম নামক কেউ কখনো মক্কায় এসেছিলেন বা কাবা পুনর্নির্মাণ করেছিলেন। বরং এটি ছিল আরবের প্রচলিত প্যাগান অনুষ্ঠানগুলোকে ইসলামীকরণের মাধ্যমে আরবের মানুষের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর একটি সুপরিকল্পিত পদ্ধতি।

ইসলামের এই প্রথাগত সংশ্লেষণ কেবল আরবের মূর্তিপূজকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নামাজের সময়সূচী এবং ওজুর পদ্ধতির দিকে তাকালে তৎকালীন ‘সাবেইন’ (Sabians) বা তারকা পূজারীদের প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাবেইনরা দিনে পাঁচবার প্রার্থনা করত এবং প্রার্থনার আগে হাত-পা ধৌত করার (ওজু) বিধান পালন করত। এমনকি তাদের সিজদাহ এবং রুকু করার ভঙ্গিও ছিল মুহাম্মদের প্রবর্তিত নামাজের হুবহু আদি রূপ [1] এমনকি তাদের সিজদাহ এবং রুকু করার ভঙ্গিও ছিল মুহাম্মদের প্রবর্তিত নামাজের হুবহু আদি রূপ। এটি প্রমাণ করে যে, ওহী কোনো মৌলিক ঐশ্বরিক আবিষ্কার নয়, বরং এটি ছিল তৎকালীন আরবের বিভিন্ন ধর্মীয় আচারের একটি সুপরিস্থ বিন্যাস (Eclectic arrangement)।


ইহুদি তোষণ ও কিবলা পরিবর্তনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

ইসলামের প্রাথমিক বিকাশের স্তরগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুহাম্মদ তার নতুন ধর্মমতকে কেবল আরবের পৌত্তলিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি, বরং তৎকালীন আরবের ধনী, প্রভাবশালী ও শিক্ষিত ইহুদি সম্প্রদায়কে নিজের পক্ষে টানার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। ইহুদিরা তখন কেবল অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালীই ছিল না, বরং ‘কিতাবধারী’ বা পূর্ববর্তী নবীদের আশীর্বাদধন্য জাতি হিসেবে আরবের সামাজিক প্রেক্ষাপটে তারা ব্যাপক সম্মান লাভ করত। এই কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনা করেই মুহাম্মদ তার নতুন ধর্মের বহু আচার-প্রথা ইহুদিদের ধর্মীয় বিধিবিধান থেকে সরাসরি ধার করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ইহুদিদের কাছে নিজেকে তাদেরই প্রতিশ্রুত ‘শেষ নবী’ হিসেবে প্রমাণ করা এবং তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন আদায় করা।

এই ‘তোষণ নীতি’র সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল নামাজের দিক বা ‘কিবলা’ নির্ধারণ। মদিনায় হিজরতের পর দীর্ঘ ১৬ থেকে ১৭ মাস পর্যন্ত মুহাম্মদ এবং তার অনুসারীরা ইহুদিদের পবিত্র কেন্দ্র জেরুজালেমের (বায়তুল মোকাদ্দাস) দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করতেন। এটি ছিল ইহুদিদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রভাবিত করার একটি পরিষ্কার ধর্মীয় চাল। এমনকি ইহুদিদের ‘জেদাকাহ’ (Tzedakah) প্রথাকে ‘যাকাত’ ও ‘সাদাকাহ’ নামে গ্রহণ করা, আশুরার রোজা (যা ইহুদিদের ইয়োম কিপুর বা উপবাসের সমান্তরাল) পালন করা এবং শুকরের মাংস হারাম করার মতো বিধানগুলো মূলত ইহুদি ধর্মতত্ত্বের একটি সচেতন অনুকরণ ছিল। এমনকি পুরুষদের খৎনা করার প্রথাটিও—যা বর্তমানে ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিচিত—মূলত ইহুদিদের ‘ব্রিট মিলাহ’ (Brit Milah) প্রথার এক আরবীয় সংস্করণ মাত্র।

তবে এই সখ্যতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। যখন ইহুদি পণ্ডিতরা মুহাম্মদের নবুয়তের দাবির সাথে তাদের কিতাবের অমিল খুঁজে পেলেন এবং তাকে নবী হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে ‘ভণ্ড’ ও ‘উন্মাদ’ আখ্যা দিলেন, তখনই ওহীর গতিপথ নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে একটি নতুন আয়াত নাজিল হওয়ার দাবি করা হয়, যার মাধ্যমে কিবলা জেরুজালেম থেকে সরিয়ে পুনরায় সেই ‘পৌত্তলিক’ কেন্দ্র কাবার দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে, কিবলা কোনো ধ্রুব ঐশ্বরিক সত্য ছিল না, বরং এটি ছিল মুহাম্মদের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রয়োজনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এক পরিবর্তনশীল কৌশল।

আসুন কিবলা পরিবর্তনের এই নাটকীয় পটভূমি সহীহ হাদিসের আলোকে দেখে নিই: [2] [3] [4]

সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫/ নামাজ প্রসঙ্গে
পরিচ্ছেদঃ ২২/ কিবলামুখী হওয়া ফরজ প্রসঙ্গে
৪৮৯। মুহাম্মদ ইবনু বাশ্‌শার (রহঃ) … বা’রা ইবনু আযিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ষোল মাস বা সতর মাস (বর্ণনাকারী সুফিয়ানের সন্দেহ) বায়তুল মুকাদ্দাস অভিমুখী হয়ে সালাত আদায় করি। পরে তাঁকে (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে) কাবার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।
সহিহ, ইরউয়াউল গালীল হাঃ ৪৯০, বুখারি হাঃ ৪৪৯২, মুসলিম (ইসলামিক সেন্টার) হাঃ ১০৬৬
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ বারা’আ ইবনু আযিব (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫/ মসজিদ ও সালাতের স্থান
পরিচ্ছেদঃ ২. বায়তুল মুকাদ্দাস হতে কা’বার দিকে কিবলা পরিবর্তন
১০৬১। শায়বান ইবনু ফাররূখ ও কুতায়বা ইবনু সাঈদ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকেরা কুবাতে ফজরের সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করছিল, ইতিমধ্যে একজন লোক এসে বলল, এ রাত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে এবং কাবার দিকে মুখ করবার আদেশ প্রদান করা হয়েছে। অতএব, তোমরাও কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়াও। তাদের চেহারা ছিল তখন সিরিয়ার দিকে। অতঃপর তারা কা’বার দিকে ঘূরে গেলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)

আল-লুলু ওয়াল মারজান
৫/ মাসজিদ ও সালাতের স্থানসমূহের বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ ৫/২. বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে কা’বার দিকে কিবলা পরিবর্তন।
৩০৪. ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা লোকেরা কুবা নামক স্থানে ফজরের সালাত আদায় করছিলেন। এমন সময় তাদের নিকট এক ব্যক্তি এসে বললেন যে, এ রাতে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছে। আর তাঁকে কা‘বামুখী হবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কাজেই তোমারা কা‘বার দিকে মুখ কর। তখন তাঁদের চেহারা ছিল শামের (বায়তুল মুকাদ্দাসের) দিকে। একথা শুনে তাঁরা কা‘বার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
সহীহুল বুখারী, পৰ্ব ৮। সালাত, অধ্যায় ৩২, হাঃ ৪০৩; মুসলিম, পর্ব ৫ মসজিদ ও সালাতের স্থানসমূহের বর্ণনা, অধ্যায় ২, হাঃ ৫২৬
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)

আসুন মুসলিম পণ্ডিত ইবন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা কর্তৃক রচিত যাদুল মা’আদ গ্রন্থ থেকে এই বিষয়ে কী বলা আছে দেখে নেয়া যাক [5]

মুশরিকরা বলতে লাগল, সে যেমন আমাদের কিবলার (কাবার) দিকে ফেরত এসেছে তেমন অচিরেই আমাদের দ্বীনে ফেরত আসবে। আমাদের কিবলাকে সত্য মনে করেই সেদিকে ফিরে এসেছে। ইহুদীরা বলতে লাগল- সে তাঁর পূর্বের সকল নাবীদের কিবলার বিরোধীতা করছে।
মুনাফিকরা বলতে লাগল- জানিনা, এই লোক কোথায় যাচ্ছে? প্রথম কিবলা সঠিক হয়ে থাকলে সে একটি সত্য বিষয় পরিত্যাগ করেছে। আর দ্বিতীয়টি সঠিক হয়ে থাকলে প্রথমে সে বাতিলের উপর ছিল। এ ছাড়া মূর্খরা আরও অনেক কথাই বলেছে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন-
وَإِنْ كَانَتْ لَكَبِيرَةً إِلَّا عَلَى الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ )
“নিশ্চয়ই এটা (কিবলা পরিবর্তন) কঠিন বিষয়, কিন্তু তাদের জন্যে নয়, যাদেরকে আল্লাহ্ পথ প্রদর্শন করেছেন”। (সূরা বাকারা-২:১৪৩)
নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ হতে এটি মুমিন বান্দাদের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষাও ছিল। যাতে তিনি দেখে নেন কে রসূলের অনুসরণ করে এবং কে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিবলার বিষয়টি যেহেতু একটি বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাই আল্লাহ্ তআলা কিবলা পরিবর্তনের পূর্বে ভূমিকা স্বরূপ নাসেখ-মানসুখ তথা শরীয়তের কোন বিষয়কে রহিত করার বিধি-বিধান বর্ণনা করেছেন। এ বিষয়ে আল্লাহ্ তা’আলা পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি বলেছেন যে, কোন বিষয়কে মানসুখ (রহিত) করলে তার স্থলে আরও উত্তম হুকুম প্রদান করেন কিংবা অনুরূপ বিষয় স্থাপন করেন। এরপরই তিনি ঐ সমস্ত লোকদেরকে ধমক দিয়েছেন, যারা রসূল এর হুকুমের বিরুদ্ধে হঠকারিতা প্রদর্শন করে এবং তাঁর হুকুমের সামনে মাথা নত করেনা।

কিবলা

এখানেই একটি বড় প্রশ্ন উত্থাপিত হয়—আল্লাহ যদি সর্বজ্ঞ (Omniscient) হন, তবে ১৬ মাস ধরে একটি ‘ভুল’ কিবলার দিকে নামাজ পড়িয়ে পরে তা বাতিল করার প্রয়োজন কেন পড়ল? ইবন কায়্যিম এখানে ‘নাসেখ-মানসুখ’ বা রহিতকরণের যে দোহাই দিয়েছেন, তা মূলত এক ধরনের ‘ধর্মতাত্ত্বিক হঠকারিতা’। কোনো শাশ্বত সত্য কখনও সময়ের সাথে বদলে যেতে পারে না। এই ‘পরীক্ষা’ বা ফিতনার অজুহাতটি ছিল মূলত একটি ‘পোস্ট-হক রেশনালিজেশন’ (Post-hoc Rationalization)। অর্থাৎ, যখন ইহুদিদের সাথে মিত্রতা স্থাপনের রাজনৈতিক চালটি ব্যর্থ হলো, তখন সেই ব্যর্থতাকে ঢাকতে ওহীর মাধ্যমে ‘পরীক্ষা’র নতুন তত্ত্ব হাজির করা হলো। এটি নির্দেশ করে যে, ওহীর গতিপথ কোনো ঐশ্বরিক মানচিত্র অনুযায়ী নয়, বরং মুহাম্মদের রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হতো।


ইহুদি সখ্যতা থেকে চিরস্থায়ী শত্রুতা: এক প্রতিশোধমূলক বিবর্তন

মুহাম্মদের প্রাথমিক কৌশল ছিল ইহুদিদের মন জয় করে তার নবুওয়তের এক সর্বজনীন স্বীকৃতি আদায় করা। কিন্তু যখন মদিনার শিক্ষিত ও কিতাবধারী ইহুদি সমাজ তার দাবির অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরে তাকে নবী হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করল, তখন মুহাম্মদের সেই তথাকথিত ‘তোষণ নীতি’ এক চরম ও নৃশংস ‘বিদ্বেষ নীতিতে’ রূপান্তরিত হয়। ইহুদিদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত স্বীকৃতি না পেয়ে মুহাম্মদ তাদের ‘ভণ্ড’ ও ‘উন্মাদ’ আখ্যা দেন এবং এই ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটে তার পরবর্তী জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে।

এই শত্রুতার প্রথম ও প্রধান বহিঃপ্রকাশ ছিল কিবলা পরিবর্তন। জেরুজালেমের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া কেবল একটি ধর্মীয় পরিবর্তন ছিল না, বরং এটি ছিল ইহুদিদের প্রতি মুহাম্মদের চরম বিরক্তির এক প্রকাশ্য ঘোষণা। এই পরিবর্তনের পেছনের কৌশলগত কারণগুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, শীর্ষস্থানীয় ইসলামিক পণ্ডিতদের ব্যাখ্যায় তা স্পষ্টভাবে বেরিয়ে এসেছে। পাকিস্তানের বিখ্যাত মুফতি মুহাম্মদ শফি তার তাফসীরে মা’আরেফুল কোরআন-এ সরাসরি স্বীকার করেছেন যে, কিবলা পরিবর্তনটি ছিল মূলত ইহুদিদের প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত এবং তাদের আকৃষ্ট করার এক ব্যর্থ প্রচেষ্টার অবসান [6]

কা’বা শরীফ সর্বপ্রথম কখন নামাযের কেবলা হয়: হিজরতের পূর্বে মক্কা
মোকাররমায় যখন নামায ফরয হয়, তখন কা’বাগৃহই নামাযের জন্য কেবলা ছিল, না বায়তুল-মোকাদ্দাস ছিল-এ প্রশ্নে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন: শুরু থেকেই কেবলা ছিল বায়তুল-মোকাদ্দাস। হিজরতের পরও ষোল-সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল-মোকাদ্দাসই কেবলা ছিল। এরপর কা’বাকে কেবলা করার নির্দেশ আসে। তবে রসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় অবস্থানকালে হাজরে-আসওয়াদ ও রোকনে-ইয়ামানীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে নামায পড়তেন যাতে কা’বা ও বায়তুল-মোকাদ্দাস-উভয়টিই সামনে থাকে। মদীনায় পৌঁছার পর এরূপ করা সম্ভবপর ছিল না। তাই তাঁর মনে কেবলা পরি-বর্তনের বাসনা দানা বাঁধতে থাকে।-(ইবনে কাসীর)
অন্যান্য সাহাবী ও তাবেয়ীগণ বলেন: মক্কায় নামায ফরয হওয়ার সময় কা’বাগৃহই ছিল মুসলমানদের প্রাথমিক কেবলা। কেননা, হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ)-এর কেবলাও তাই ছিল। মহানবী (সা) মক্কায় অবস্থানকালে কা’বাগৃহের দিকে মুখ করেই নামায পড়তেন। মদীনায় হিজরতের পর তাঁর কেবলা বায়তুল-মোকাদ্দাস সাব্যস্ত হয়। তিনি মদীনায় ষোল-সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল-মোকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়েন। এরপর প্রথম কেবলা অর্থাৎ কা’বা-গৃহের দিকে মুখ করার নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। তফসীরে-কুরতুবীতে আবু আমরের বরাত দিয়ে এ শেষোক্ত উক্তিকেই অধিকতর বিশুদ্ধ বলা হয়েছে। এর রহস্য বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয় যে, মদীনায় আগমনের পর যখন ইহুদীদের সাথে মেলামেশা শুরু হয়, তখন মহানবী (সা) তাদের আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে আল্লাহর নির্দেশে তাদের কেবলাকেই কেবলা হিসাবে গ্রহণ করেন। কিন্তু পরে যখন অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ইহুদীরা হঠকারিতা ত্যাগ করবে না, তখন হুযুর (সা)-কে সাবেক কেবলার দিকে মুখ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কারণ, পিতৃপুরুষ হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈলের কেবলা হওয়ার কারণে তিনি স্বভাবতই তাকে পছন্দ করতেন।

কিবলা 1

একই বিষয়ের প্রতিফলন পাওয়া যায় তাফসীরে জালালাইন-এও, যেখানে ইহুদিদের সাথে মুহাম্মদের সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং কিবলা পরিবর্তনের যৌক্তিকতাকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে [7] [8]

১. ইহুদিদের থেকে তাঁর কিবলা স্বতন্ত্র ও ভিন্নতর হওয়া।
২. মহানবী ওহী অবতরণ ও নবুয়তপ্রাপ্তির পূর্বে স্বীয় স্বভাবগত ঝোঁকে দীনে ইবরাহীমীর অনুসরণ করতেন। ওহী অবতরণের পর কুরআনও তাঁর শরিয়তকে দীনে ইবরাহীমীর অনুরূপ বলেই আখ্যা দিয়েছে। হযরত ইবরাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর কিবলাও কা’বাই ছিল।
৩. তাতে আরবের লোকদেরকে ঈমানের দিকে নিয়ে আসা অধিক সহজ ছিল। কেননা আরবের গোত্রগুলো মৌখিকভাবে হলেও দীনে ইবরাহীমী স্বীকার করত এবং নিজেদেরকে তাঁর অনুসারী বলে দাবি করত।
৪. সাবেক কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস দ্বারা আহলে কিতাবদের আকৃষ্ট করা উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু ষোলো / সতের মাসের অভিজ্ঞতার পর সে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যায়। কারণ মদিনার ইহুদিরা এর কারণে ইসলামের নিকটবর্তী হওয়ার পরিবর্তে দূরেই সরে যাচ্ছিল। [তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআন: মুফতি শফী (র.) ও আহকামুল কুরআন থেকে সংক্ষপিত]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা
قوله ولن تَرْضَى عَنْكَ اليهود : আপনি তাদের যতই মন যুগিয়ে চলুন না কেন এবং তাদের সাথে সমবেদনা ও
সহমর্মিতার আচরণই করুন না কেন তারা কিছুতেই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না। কেননা তাদের অসন্তুষ্টির কারণ হলো বিদ্বেষ এবং হিংসা। এর কোনো চিকিৎসা নেই। আপনি তাদের মনতুষ্টির জন্য বায়তুল মুকাদ্দাসের অভিমুখী হয়ে নামাজ পড়েছেন। এতে তাদের হিংসা ও বিদ্বেষের সীমা বৃদ্ধি হওয়া ছাড়া আর কোনো ফল হয়নি। তাদের অসন্তুষ্টির কারণ তো এটা নয় যে, তারা প্রকৃত সত্যের সন্ধান করছে আর আপনি তাদের সামনে সত্য প্রকাশ করতে কৃপণতা করছেন; বরং তাদের মনোবাসনা হলো আপনিও তাদের রঙ্গে রঞ্জিত হয়ে যান। আপনিও তাদের চরিত্রে চরিত্রবান হোন। তবেই তারা আপনাকে সাহায্য-সহযোগিতা করবে। সুতরাং যারা প্রকাশ্য মুশরিক এবং ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসে যাদের সঙ্গে কোনো স্তরেই সমদর্শিতা-সংযোগ নেই, তাদের তুষ্টি কামনা ও তাদের সঙ্গে আপস-মিল রক্ষা করে চলার চেষ্টা সম্পর্কে কি বিধান হতে পারে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। [জামালাইন: খ. ১, পৃ. ২১৫]
قَوْلَهُ حَتَّى تَتَّبِعَ مِلْتَهُمْ : এখানে বলতে সে ধর্মমত বুঝানো হয়েছে, যা তারা নিজেরা তৈরি করে রেখেছিল। অর্থ মাযহাব-ধর্মমত ও জীবনবিধান। [কামূস।
ملت دين -এর মাঝে পার্থক্য এই যে, আল্লাহ তা’আলার সঙ্গে ও উম্মতের একক ব্যক্তির সঙ্গে সম্বন্ধ করে দীন ব্যবহৃত হয়। যেমন- دین الله আল্লাহ তা’আলার দীন। ن زند১ অর্থাৎ যায়েদের দীন। আর মিল্লাত ব্যবহৃত হয় নবী ও সমষ্টি ]জামাত] এর সঙ্গে যুক্ত করে। যেমন- مِل ابراهيم ইবরাহীমি মিল্লাত, ইহুদি মিল্লাত, মুসলিম মিল্লাত। [রাগিব[
أَمَرَاء : قَوْلَهُ وَلَيْنِ اتَّبَعْتَ أَهْوَاءَهُمْ দ্বারা উদ্দেশ্য সেসব মতধারা ও ধ্যান-ধারণা যার ভিত্তি জ্ঞানও বাস্তব সত্যের পরিবর্তে প্রবৃত্তির চাহিদাও খেয়ালখুশির উপরে। আর ইলম দ্বারা উদ্দেশ্য ওহীভিত্তিক ইলম, যা যে কোনো বিচারে নিশ্চয়তা ও প্রামাণ্যতা
বহন করে এবং যা যে কোনো দ্বিধা-সংশয়ের ঊর্ধ্বে। -(বায়যাবী) প্রদান করা হয়েছে তার সঙ্গে আপনার কাছে বাস্তব ইলম আসার পর শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। এ শর্তের আলোকে ইমাম রাজী
A for a c t af : قَوْلُهُ بَعْدَ الَّذِي جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ مَا لَكَ مِنَ اللَّهِ مِنْ وَلِي وَلَا نَصِيرٍ
(র.) মত প্রকাশ করেছেন যে, হুমকি প্রদান সব সময়ই সুস্পষ্ট দলিল প্রমাণ সরবরাহ করার পরেই হতে পারবে।
الَّذِيْنَ أَتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَتْلُونَهُ حَقَّ تِلَاوَتِهِ : অন্তর দিয়ে তার শ্রদ্ধা-সম্মান, তার বিধানমতে জীবন গড়ে আমল করে তাকে রদবদল, সংযোজন বিয়োজন ও বিকৃতি সাধানের অবকাশ দেয় না। যথাযথ তেলাওয়াত ও তেলাওয়াতের হক আদায় করার মাঝে এ সবই অন্তর্ভুক্ত। الكتاب দ্বারা এখানে তাওরাত উদ্দেশ্য।
ولن ترضى الخ আয়াতের শানে নুযুল : وَلَن ترضى আয়াতের শানে নুযূল সম্পর্কে ১-এর বর্ণনা হচ্ছে- লোকেরা
রাসূল-এর কাছে প্রশ্নাদি করে যেগুলোর উত্তর তিনি তো এ মনে করে দেন, যাতে করে লোকেরা ইসলামের দিকে ধাবিত হয়ে যায়। অথচ তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্বয়ং রাসূল-কে নিজেদের দিকে ধাবিত করা। অথবা হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সিদ্ধান্ত হচ্ছে যে, নবী করীম যখন বায়তুল মাকদিসকে কিবলারূপে গ্রহণ করেছেন, তখন ইহুদি ও নাজরানের খ্রিস্টানদের এ আশা হয়েছিল যে, অবশেষে তিনি তাদের ধর্মকেই গ্রহণ করে নেবেন। কিন্তু বায়তুল্লাহ শরীফ এর দিকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ হলো তখন, সে আশা নিরাশায় রূপান্তরিত হয়ে গেল এবং তারা নিরাশ হয়ে গেল। রূহুল মা’আনীতে এটা লেখা হয়েছে যে, রাসূল সর্বশ্রেণির লোকদের অন্তর সংযুক্ত করতেন এ আশায় যে, হতে পারে এ লোকগুলো মুসলমান হয়ে যাবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে।

কিবলা 3
কিবলা 5

মুহাম্মদের এই বিদ্বেষ কেবল কিবলা পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নেয়। যে ইহুদি গোত্রগুলোর প্রথা তিনি একসময় মুগ্ধ হয়ে অনুকরণ করতেন, তাদেরই তিনি মদিনা থেকে চিরতরে নির্মূল করার পরিকল্পনা করেন [9]। একের পর এক ইহুদি গোত্রকে উচ্ছেদ করা হয়, তাদের পুরুষদের গণহারে হত্যা করা হয় এবং নারী ও শিশুদের ‘যৌনদাসী’ ও ‘গোলাম’ হিসেবে বণ্টন করা হয় [10]। এই নির্মম গণহত্যার বৈধতা দিতেই পরবর্তীকালে ইহুদি-বিদ্বেষী অসংখ্য আয়াত ও হাদিস তৈরি করা হয়। এমনকি মুহাম্মদের জীবনের শেষ ওসিয়তগুলোর একটি ছিল—পুরো আরব উপদ্বীপ থেকে ইহুদি, খ্রিস্টান ও পৌত্তলিকদের সমূলে বিতাড়িত করা। এই অসহিষ্ণুতা ও নিষ্ঠুরতার বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যায় ইসলামি শাসনতন্ত্রের অমুসলিমদের অধিকার সংক্রান্ত বিশ্লেষণে [11]

ইব্রাহিমীয় সংযোগ স্থাপনের জন্য মুহাম্মদ মূলত আরবে প্রচলিত ‘হানিফ’ নামক একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর উপকথাকে ব্যবহার করেছিলেন। হানিফরা নিজেদের ইব্রাহিমের অনুসারী দাবি করে মূর্তিপূজা ত্যাগ করেছিল। মুহাম্মদ এই প্রাক-বিদ্যমান সামাজিক অবস্থাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে আরবের পৌত্তলিক কেন্দ্র কা’বাকে ইব্রাহিমের সাথে জুড়ে দেন। অথচ আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব এবং ইতিহাসবিদদের মতে, মক্কা কোনো প্রাচীন শহর ছিল না এবং ইব্রাহিমীয় ঐতিহ্যের সাথে এর কোনো দূরতম সম্পর্কও ছিল না। এই কাল্পনিক বংশলতিকা (Constructed Lineage) তৈরির মূল কারণ ছিল মূর্তিপূজক আরবদের এই বিশ্বাস করানো যে, হজ্জ আসলে কোনো নতুন প্রথা নয়, বরং তাদের হারানো পিতৃধর্মের পুনরুদ্ধার। এই ‘সাংস্কৃতিক ছদ্মবেশ’ ধারণের মাধ্যমেই মুহাম্মদ আরবের আদি প্রথাগুলোকে নিজের ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করতে সক্ষম হন।


উপসংহারঃ আরবের প্রাচীন সভ্যতা ধ্বংস ও কাল্পনিক ইতিহাসের বিনির্মাণ

প্যাগান ও ইহুদি প্রথাগুলোকে আত্মসাৎ করার পর মুহাম্মদ সেগুলোকে বৈধতা দিতে আরবে প্রচলিত লোকগাঁথা ও উপকথাগুলোকে নিজের সুবিধামতো পুনর্গঠন করেন। প্রাচীন আরবের কোনো ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক দলিলে ইব্রাহিম নামক কোনো চরিত্রের মক্কায় আসা কিংবা কাবা পুনর্নির্মাণের নূন্যতম প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবুও মুহাম্মদ অত্যন্ত চতুরতার সাথে নিজেকে ইসমাইলের বংশধর দাবি করে ইহুদিদের নবী হওয়ার বাসনা চরিতার্থ করতে চেয়েছিলেন। হজ্জের প্রতিটি পুঙ্খানুপুঙ্খ আচার—যা মূলত মূর্তিপূজক প্যাগানদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ছিল—সেটিকে ‘ইসলামীকরণ’-এর মাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন তা আদিতে একেশ্বরবাদী ছিল। এই কাল্পনিক ইতিহাস নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল আরবের মানুষের কাছে ইসলামের বিজাতীয় চরিত্র ঢেকে রাখা।

মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তা আরবের হাজার বছরের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, আচার এবং ঐতিহ্যের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। মুহাম্মদের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর কাবার শত শত বছরের আরব শিল্পকলা, ভাস্কর্য এবং ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোকে ‘শিরক’ বা পৌত্তলিকতার দোহাই দিয়ে ধ্বংস করা হয়। আরবদের গর্বের সাহিত্য, কালজয়ী কবিতা এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে স্তব্ধ করে দিয়ে সেখানে চাপিয়ে দেওয়া হয় এক কঠোর ও একপাক্ষিক ধর্মীয় শাসন। সঙ্গীত নিষিদ্ধ করা, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় গুড়িয়ে দেওয়া এবং ‘ইসলাম অবমাননা’র অজুহাতে প্রাচীন দুর্লভ বইপুস্তক পুড়িয়ে ফেলার মাধ্যমে আরবের প্রকৃত সভ্যতাকে চিরতরে মুছে দেওয়া হয়।

পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের এই বিবর্তন কোনো অলৌকিক ওহীর ফসল নয়, বরং এটি ছিল তৎকালীন আরবের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মুহাম্মদের ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষার এক সুপরিকল্পিত সংশ্লেষণ। প্যাগান ও ইহুদি ধর্মের ছাইভস্মের ওপর যে ধর্মীয় কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, তার গভীরে অনুসন্ধান করলে দেখা যায়—ইসলাম তার মৌলিকত্বের দাবিদার নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত ‘সাংস্কৃতিক ডাকাতি’র ফসল। আরবের প্রাচীন সংস্কৃতি ধ্বংস করে তার ওপর এক অসহিষ্ণু সাম্রাজ্যবাদ চাপিয়ে দেওয়াই ছিল এই নতুন ধর্মের মূল সাফল্য। সচেতন মানুষের জন্য আজ এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, ইসলামের ঐশ্বরিক দাবি মূলত ইতিহাসের এক বিশাল জ্ঞানতাত্ত্বিক জালিয়াতি।


তথ্যসূত্রঃ
  1. Tamara M. Green, The City of the Moon God: Religious Traditions of Harran, Brill, 1992, pp. 144-161 ↩︎
  2. সুনান আন-নাসায়ী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৮৯ ↩︎
  3. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১০৬১ ↩︎
  4. আল-লুলু ওয়াল মারজান, হাদিসঃ ৩০৪ ↩︎
  5. মুখতাসার যাদুল মাআদ, আল্লামা ইমাম ইবনে কাইয়্যিম জাওজিয়্যা, ওয়াহিদীয়া ইসলামিয়া লাইব্রেরি, পৃষ্ঠা  ২৩৩ ↩︎
  6. তফসীরে মা’আরেফুল কোরআন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১২ ↩︎
  7. তাফসীরে জালালাইন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৪ ↩︎
  8. তাফসীরে জালালাইন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০১ ↩︎
  9. বনু কুরাইজার গণহত্যা ↩︎
  10. ইহুদীকন্যা সাফিয়ার না-বলা গল্প ↩︎
  11. ইসলামি শরিয়া রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার ↩︎