
Table of Contents
- 1 ভূমিকাঃ ১৯ সংখ্যার মোজেজা ও আধুনিক সংখ্যাতাত্ত্বিক মিরাকল
- 2 একজন রসায়নবিদ থেকে ‘ঈশ্বরের দূত’ হয়ে ওঠার বিবর্তন
- 3 আল্লাহ-মুহাম্মদ-সালাফগণ কি ১৯ সংখ্যার মিরাকলের কথা বলেছেন?
- 4 লার্জ ডেটা সেট, অ্যাপোফেনিয়াঃ গাণিতিক মিরাকল তৈরির কারখানা
- 5 চতুর্দশপদী কবিতা (Sonnet): সাহিত্যিক কারুকার্য নাকি অলৌকিকত্ব?
- 6 বাইবেলের ৭ সংখ্যার ‘মিরাকল’: গাণিতিক বিভ্রান্তির বৈশ্বিক রূপ
- 7 সূরা মুদাচ্ছিরের ৩০ নম্বর আয়াত: প্রেক্ষাপট বনাম অপব্যাখ্যা
- 8 তাফসীর কী বলে? আদি প্রমাণের বিপরীতে রাশাদ খলিফার কল্পনা
- 9 কোরআনের আয়াত সংখ্যা কি ১৯ দ্বারা বিভাজ্য? গাণিতিক জালিয়াতির ব্যবচ্ছেদ
- 10 কোরআনের সর্বমোট সূরার সংখ্যা: ঐশ্বরিক গাণিতিক কোড নাকি সংকলনের ইতিহাস?
- 11 কোরআনে বর্ণের সংখ্যা কত? গাণিতিক চাতুর্য বনাম পাণ্ডুলিপির বাস্তবতা
- 12 আরো অসংখ্য মিথ্যাচার: আয়াত কর্তন এবং নিজেকে ‘রাসুল’ ঘোষণা
- 13 বৈজ্ঞানিক এবং গাণিতিক মানদণ্ডে মিরাকলের গ্রহণযোগ্যতা
- 13.1 “Testable Prediction”: গাণিতিক মিরাকলের বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড
- 13.2 Reproducibility Crisis (পুনরুৎপাদনযোগ্যতা সমস্যা)
- 13.3 Textual Variants Problem (সবচেয়ে মারাত্মক সমস্যা)
- 13.4 Multiple Comparisons Problem (স্ট্যাটিস্টিক্যাল আঘাত)
- 13.5 Post-hoc Rationalization (পরে গিয়ে ব্যাখ্যা বানানো)
- 13.6 Psychological Reinforcement Loop (বিশ্বাস কীভাবে টিকে থাকে)
- 14 উপসংহার: অন্ধবিশ্বাস বনাম গাণিতিক বাস্তবতা
ভূমিকাঃ ১৯ সংখ্যার মোজেজা ও আধুনিক সংখ্যাতাত্ত্বিক মিরাকল
১৯৭৪ সাল—ইসলামি বিশ্বে এক নতুন ধরণের আলোড়ন সৃষ্টি হয় যখন মিশরীয়-মার্কিন জৈব-রসায়নবিদ ও ধর্মতাত্ত্বিক রাশাদ খালিফা দাবী করেন যে, তিনি পবিত্র কোরআনের অন্তরালে একটি অতিপ্রাকৃত গাণিতিক সংকেত বা ‘ম্যাথমেটিক্যাল কোড’ আবিষ্কার করেছেন। [1] তার এই দাবীর কেন্দ্রবিন্দু ছিল ১৯ সংখ্যাটি।
রাশাদ খালিফার যুক্তি ছিল অত্যন্ত চাতুর্যপূর্ণ। তিনি সংখ্যাতত্ত্ব বা ‘নিউমারোলজি’র আশ্রয় নিয়ে দাবী করেন যে, ১৯ সংখ্যাটির ১ এবং ৯ এর যোগফল হচ্ছে ১০ (1+9=10), এবং ১ ও ০ এর যোগফল হচ্ছে ১ ()। তার মতে, এই গাণিতিক প্রক্রিয়াটি আসলে ‘এক ঈশ্বর’ বা তাওহীদেরই গাণিতিক বহিঃপ্রকাশ। তিনি আরও দাবী করেন যে, কোরআনের বিভিন্ন শব্দ, অক্ষর এবং গঠন এমনভাবে বিন্যস্ত যা ১৯ দ্বারা নিঃশেষে বিভাজ্য।
সেই সময়ে মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশ বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের সমন্বয় খুঁজতে গিয়ে রাশাদ খালিফার এই ‘ডিজিটাল মিরাকল’ বা ‘কম্পিউটার কোড’-এর জালে আটকা পড়ে। দাবি করা হয়েছিল যে, ১৪০০ বছর আগে আরবের মরুভূমিতে একজন নিরক্ষর মানুষের পক্ষে এমন জটিল গাণিতিক ছকে বই লেখা অসম্ভব, সুতরাং এটিই কোরআনের ঐশ্বরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ। কিন্তু গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এই তথাকথিত ‘মিরাকল’ টিকিয়ে রাখতে রাশাদ খলিফাকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল অসংখ্য মিথ্যাচার, তথ্য বিকৃতি এবং এমনকি কোরআনের মূল পাঠ্য পরিবর্তন করার মতো ধৃষ্টতার। এই প্রবন্ধে আমরা প্রতিটি দাবিকে যুক্তি ও তথ্যের নিরিখে ব্যবচ্ছেদ করব এবং দেখাব কীভাবে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে এক বিশাল গাণিতিক প্রতারণার জাল বোনা হয়েছিল।
একজন রসায়নবিদ থেকে ‘ঈশ্বরের দূত’ হয়ে ওঠার বিবর্তন
রাশাদ খালিফার জন্ম ১৯৩৫ সালে মিশরে। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (রিভারসাইড) থেকে ১৯৬৪ সালে পিএইচডি অর্জন করেন। পেশাগত জীবনে একজন রসায়নবিদ হওয়া সত্ত্বেও তার মূল আগ্রহ ছিল কোরআনের গাণিতিক বিশ্লেষণে। ১৯৬৮ সাল থেকে তিনি কম্পিউটার ব্যবহার করে কোরআনের শব্দ ও অক্ষরের পরিসংখ্যান তৈরি করতে শুরু করেন। [2]
রাশাদ খালিফা কেবল একজন গবেষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন ইউনাইটেড সাবমিটার্স ইন্টারন্যাশনাল (United Submitters International) নামক একটি সংস্কারবাদী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। শুরুতে তার ১৯ সংখ্যার তত্ত্ব মুসলিম বিশ্বের অনেককে চমৎকৃত করলেও, ধীরে ধীরে তার আসল উদ্দেশ্য এবং মানসিক বিবর্তন স্পষ্ট হতে থাকে। তার এই বিবর্তনের ইসলামের দৃষ্টিতেই কিছু বিপজ্জনক দিক নিচে আলোচনা করা হলো:
১৯ সংখ্যার তথাকথিত মিরাকলের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর রাশাদ খালিফা দাবী করে বসেন যে তিনি স্বয়ং ‘ঈশ্বরের দূত’ (Messenger of God) বা ‘চুক্তির বার্তাবাহক’ (Messenger of the Covenant) [3]। তিনি এমনকি অফিশিয়াল প্যাডে নিজের নামের নিচে ‘Messenger of God’ লিখতেন এবং দাবী করতেন তার নাম কোরআনে সাংকেতিকভাবে বলা আছে।
তিনি ‘কুরানিস্ট’ (Quranist) বা ‘আহলে কোরআন’ মতাদর্শ প্রচার করতে শুরু করেন। তার মতে, মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহ বা হাদিস অনুসরণ করা এক ধরণের শিরক। তিনি দাবী করেন যে কোরআন বুঝতে কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই, কেবল তার গাণিতিক কোডই যথেষ্ট।
তিনি দাবী করেন যে মুহাম্মদের বিখ্যাত সাহাবী এবং বিগত ১৪০০ বছরের শ্রেষ্ঠ ইসলামি স্কলাররা কোরআন বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন, কারণ তাদের কাছে ১৯ সংখ্যার এই ‘কোড’ ছিল না।
১৯ সংখ্যার গাণিতিক ছক মেলাতে গিয়ে যখন তিনি দেখলেন যে সূরা তওবার শেষ দুটি আয়াত (১২৮ ও ১২৯) তার গাণিতিক বিন্যাসে বাধা দিচ্ছে, তখন তিনি অবলীলায় দাবী করলেন যে এই আয়াত দুটি মানুষ কোরআনে ঢুকিয়েছে এবং এগুলো ‘শয়তানি আয়াত’।

রাশাদ খালিফার এই চরমপন্থী ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে ১৯৯০ সালের ৩১শে জানুয়ারি অ্যারিজোনার টাসকনে তার নিজের মসজিদের ভেতরেই ইসলামি উগ্রপন্থীদের হাতে তিনি ছুরিকাঘাতে নিহত হন। যারা তাকে খুন করেন তাদের দাবি হচ্ছে, রাশাদ খলিফা ইসলাম থেকে বিচ্যুত একজন কাফের কারণ তিনি কোরআন বিকৃত করেছেন, একইসাথে নিজেকে রাসুল দাবী করেছেন। তার অনুসারীরা এখনও তাকে একজন নবী হিসেবে গণ্য করে, অথচ একজন প্রতারকের সাজানো গাণিতিক ছক যে আসমানী কিতাবের সত্যতার মাপকাঠি হতে পারে না, তা তার জীবন পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আসুন তার কিছু ডকুমেন্ট দেখি। অফিশিয়াল প্যাডে তিনি নিজের নামের নিচে লিখতেন Messenger of God (ঈশ্বরের দূত)। আসুন দেখি, রাশাদ খলিফার নিজ হাতের সাক্ষরের নিচে উনি কী লিখতেনঃ



আল্লাহ-মুহাম্মদ-সালাফগণ কি ১৯ সংখ্যার মিরাকলের কথা বলেছেন?
রাশাদ খলিফার ১৯ সংখ্যার এই তথাকথিত মিরাকলের দাবির ভিত্তি পরীক্ষা করতে গেলে প্রথমেই যে প্রশ্নটি সামনে আসে তা হলো—ইসলামের আদি উৎসগুলোতে এই সংখ্যার কোনো বিশেষ গাণিতিক গুরুত্বের উল্লেখ আছে কি না? উত্তরটি হলো একটি দ্ব্যর্থহীন ‘না’।
লার্জ ডেটা সেট, অ্যাপোফেনিয়াঃ গাণিতিক মিরাকল তৈরির কারখানা
গণিত নির্দোষ। অপরাধটা করে মানুষ। গাণিতিক “অলৌকিকত্বের” দাবিদাররা যে সবচেয়ে বড় সত্যটি এড়িয়ে যান, তা হলো Law of Truly Large Numbers। এই নিয়ম অনুসারে, যেকোনো যথেষ্ট বড় ডেটা সেটের (চাই সেটা কোরআন হোক, কোনো উপন্যাস হোক, কিংবা শেয়ারবাজারের তালিকা) মধ্যে যদি আপনি যথেষ্ট সময় ব্যয় করে বিভিন্ন গাণিতিক অপারেশন (যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ, ডিজিট সামিং, সাব-সেট নেওয়া ইত্যাদি) চালান, তাহলে অবধারিতভাবে আপনার পছন্দের যেকোনো সংখ্যার “কোড” বা “প্যাটার্ন” খুঁজে পাওয়া যাবে। স্ট্যানফোর্ডের বিখ্যাত স্ট্যাটিসটিশিয়ান Persi Diaconis-এর ভাষায়: “With a large enough sample, any outrageous thing is likely to happen.”
মনোবিজ্ঞানে এই ঘটনাকে বলা হয় Apophenia—এলোমেলো তথ্যের মধ্যে জোর করে অর্থপূর্ণ প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া (Klaus Conrad ১৯৫৮ সালে এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন)। এর সঙ্গে যুক্ত হয় Confirmation Bias—যেখানে মানুষ শুধুমাত্র সেই তথ্যগুলোই দেখে যা তার আগে থেকে বিশ্বাসকে সমর্থন করে, বাকি সবকিছু চুপচাপ ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। ফলাফল? একটা টেক্সট → হাজার হাজার সম্ভাব্য গণনা → মাত্র কয়েকটা “মিল” → নাটকীয় ঘোষণা: “দেখুন, মিরাকল!”
এই চ্যাপ্টারে আমরা দেখবো, কীভাবে একটি শিশুতোষ ছড়া থেকেও ইচ্ছামতো “অলৌকিক কোড” বের করা যায়। আমাদের টার্গেট সংখ্যা ১১। এই একই কৌশল রাশাদ খলিফা কোরআনে ১৯-এর জন্য ব্যবহার করেছিলেন।
প্রদর্শনী: সুকুমার রায়ের ‘বাবুরাম সাপুড়ে’
পূর্ণ ছড়াটি (যতিচিহ্ন ও হাইফেন বাদ দিয়ে):
বাবুরাম সাপুড়ে, কোথা যাস্ বাপুরে?
আয় বাবা দেখে যা, দুটো সাপ রেখে যা—
যে সাপের চোখ্ নেই, শিং নেই, নোখ্ নেই,
ছোটে না কি হাঁটে না, কাউকে যে কাটে না,
করে নাকো ফোঁস্ফাঁস্, মারে নাকো ঢুঁশ্ঢাঁশ,
নেই কোন উৎপাত, খায় শুধু দুধ ভাত—
সেই সাপ জ্যান্ত গোটা দুই আন্ তো!
তেড়ে মেরে ডাণ্ডা ক’রে দেই ঠাণ্ডা।
(মোট শব্দ: ৫৬টি—যেমন ড্রাফটে গণনা করা হয়েছে।)
প্রতিটি “মিরাকল”-এর পেছনে একই কৌশল: Search Space Explosion (হাজার হাজার সম্ভাব্য কম্বিনেশন), Confirmation Bias (শুধু মিলগুলো মনে রাখা) এবং Mental Gymnastics (নিয়ম বদলানো যতক্ষণ না ১১ আসে)।
কেন এটা জালিয়াতি? তিনটি মূল কারণ
বাস্তব তুলনা: এটা নতুন কিছু নয়
রাশাদ খলিফা একই পদ্ধতিতে কোরআনে ১৯-এর “মিরাকল” বের করেছিলেন। ঠিক একইভাবে Torah-এ Equidistant Letter Sequence (ELS) কোড পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান গণিতবিদ Brendan McKay Moby-Dick উপন্যাস থেকে Lincoln, JFK, Indira Gandhi-সহ অনেক নেতার হত্যার “ভবিষ্যদ্বাণী” বের করে দেখিয়েছিলেন যে এটা যেকোনো বড় টেক্সটে সম্ভব।
যদি সব জায়গায় “মিরাকল” পাওয়া যায়, তাহলে কোথাও আসলে মিরাকল নেই।
চূড়ান্ত কথা
সংখ্যা দিয়ে অলৌকিকতা বানানো অত্যন্ত সহজ। শুধু তিনটি জিনিস লাগে: বড় ডেটা, ধৈর্য এবং সততার অভাব। একটা শিশুতোষ ছড়াকে ১০ মিনিটে “দিব্য কোড”-এ রূপান্তরিত করা যায়, তাহলে ৬০০০+ আয়াতের একটি গ্রন্থ থেকে বছরের পর বছর ধরে ১৯ বের করা কোনো অলৌকিক প্রমাণ নয়—এটা শুধু সময় নষ্টের উন্নত সংস্করণ।
গণিত সত্য বলছে। মানুষ সেটাকে গল্পে পরিণত করছে। যারা এই “মিরাকল” দাবি করেন, তাদের উদ্দেশ্য হয়তো ভালো, কিন্তু পদ্ধতি বৈজ্ঞানিক নয়—এটা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা। সত্যিকারের বিশ্বাস যুক্তি ও প্রমাণের ওপর দাঁড়ায়, সংখ্যার জাদুতে নয়।
চতুর্দশপদী কবিতা (Sonnet): সাহিত্যিক কারুকার্য নাকি অলৌকিকত্ব?
রাশাদ খলিফার ১৯ সংখ্যার গাণিতিক দাবিগুলোকে খতিয়ে দেখার আগে আমাদের বোঝা প্রয়োজন যে, কোনো গ্রন্থে বা কবিতায় নির্দিষ্ট একটি সংখ্যার পুনরাবৃত্তি বা গাণিতিক ছন্দ থাকলেই তা অলৌকিক হয়ে যায় কি না। সাহিত্যে সুনির্দিষ্ট গাণিতিক ছক বা কাঠামোর অনুসরণ একটি অতি প্রাচীন ও প্রতিষ্ঠিত শিল্পরীতি। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো চতুর্দশপদী কবিতা বা সনেট (Sonnet)।
চতুর্দশপদীর গাণিতিক কাঠামো
চতুর্দশপদী কবিতার উদ্ভব হয়েছিল মধ্যযুগে ইতালিতে (বিশেষ করে পেট্রার্কের মাধ্যমে)। এই কবিতার প্রতিটি পরতে পরতে থাকে নিখুঁত গাণিতিক হিসাব:
- ✦ এটি সর্বমোট ১৪টি চরণে বা লাইনে গঠিত।
- ✦ প্রতিটি চরণে সাধারণভাবে মোট ১৪টি করে অক্ষর থাকে।
- ✦ কবিতাটি দুটি অংশে বিভক্ত—প্রথম আট চরণকে বলা হয় অষ্টক (Octave) এবং পরবর্তী ছয় চরণকে বলা হয় ষষ্টক (Sestet)।
একজন কবি যখন সনেট লেখেন, তাকে প্রতিটি শব্দ এবং অক্ষর এমনভাবে মাপজোখ করে বসাতে হয় যেন তা ১৪-এর এই গাণিতিক ছক থেকে বিচ্যুত না হয়। এটি কোনো অলৌকিক বিষয় নয়, বরং কবির ভাষাগত দক্ষতা এবং কাঠামোগত কারুকার্যের প্রমাণ। বেশ কিছুদিন কবিতার এই ছন্দ চর্চা করলে একসময় কবিরা হিসেব না করেই গড়গড় করে নিখুঁত হিসেবের কবিতা রচনা করে ফেলতে পারেন।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের উদাহরণ
বাংলা সাহিত্যে সনেটের সার্থক প্রবর্তক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তার ‘বউ কথা কও’ কবিতার একটি অংশ লক্ষ্য করি:
“বউ কথা কও”
কি দুখে, হে পাখি, তুমি শাখার উপরে
বসি, বউ কথা কও, কও এ কাননে ?—
মানিনী ভামিনী কি হে, ভামের গুমরে,
পাখা-রূপ ঘোমটায় ঢেকেছে বদনে ?
তেঁই সাধ তারে তুমি মিনতি-বচনে ?
তেঁই হে এ কথাগুলি কহিছ কাতরে ?
বড়ই কৌতুক, পাখি, জনমে এ মনে—
নর-নারী-রঙ্গ কি হে বিহঙ্গিনী করে ?
সত্য যদি, তবে শুন, দিতেছি যুকতি;
(শিখাইব শিখেছি যা ঠেকি এ কু-দায়ে)
পবনের বেগে যাও যথায় যুবতী;
“ক্ষম, প্রিয়ে” এই বলি পড় গিয়া পায়ে!—
কভু দাস, কভু প্রভু, শুন, ক্ষুন্ন-মতি,
প্রেম-রাজ্যে রাজাসন থাকে এ উপায়ে।
এখানে প্রতিটি চরণে ঠিক ১৪টি করে অক্ষর রয়েছে। যদি আমরা এই ১৪ সংখ্যাটিকে কেন্দ্র করে কোনো ‘মিরাকল’ খুঁজতে বসি, তবে দেখা যাবে পুরো কাব্যগ্রন্থটিই ১৪ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এখন প্রশ্ন হলো, মাইকেল মধুসূদন দত্ত কি তবে ঐশ্বরিক কোনো ক্ষমতাবলে এটি লিখেছেন? অবশ্যই না। এটি তার অর্জিত সাহিত্যিক প্রতিভা।
অলৌকিকত্বের দাবি বনাম সাহিত্যিক প্রতিভা
রাশাদ খলিফার অনুসারীরা দাবি করেন যে, মুহাম্মদের মতো একজন মানুষের পক্ষে ১৯-এর ছক মেনে কুরআন লেখা অসম্ভব। কিন্তু আমরা যদি মানুষের লেখা বিভিন্ন ধ্রুপদী সাহিত্য বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যাবে মানুষ এর চাইতেও জটিল গাণিতিক ছন্দে সাহিত্য রচনা করেছে।
সংস্কৃত কাব্য: প্রাচীন সংস্কৃত কাব্যে এমন কিছু শ্লোক আছে যা উল্টো করে পড়লে ভিন্ন অর্থ দেয়, কিন্তু মাত্রা ও ছন্দের কোনো পরিবর্তন হয় না।
লিওনার্দো দা ভিঞ্চির চিত্রকর্ম: ভিঞ্চির চিত্রকর্মে ‘গোল্ডেন রেশিও’ বা সুনির্দিষ্ট জ্যামিতিক অনুপাত পাওয়া যায়। [6]
বিশ্লেষণ: যদি একজন কবির পক্ষে অক্ষর গুনে গুনে ১৪-১৪ ছন্দে কবিতা লেখা সম্ভব হয়, তবে কুরআনের মতো একটি বিশাল গ্রন্থে কিছু শব্দের পুনরাবৃত্তি বা সংখ্যার মিল পাওয়া যাওয়াটা কোনোভাবেই ‘অসম্ভব’ কিছু নয়। সমস্যাটি তৈরি হয় তখন, যখন রাশাদ খলিফার মতো কেউ এই গাণিতিক মিলগুলো পাওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য বিকৃত করেন অথবা যেখানে মিল নেই সেখানে জোর করে মিল তৈরি করেন (যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘Texas Sharpshooter Fallacy’ বলা হয়)। অর্থাৎ, আগে লক্ষ্যভেদ করে তারপর চারপাশ দিয়ে গোল বৃত্ত এঁকে দাবি করা যে—দেখুন, ঠিক মাঝখানে গুলি লেগেছে!
বাইবেলের ৭ সংখ্যার ‘মিরাকল’: গাণিতিক বিভ্রান্তির বৈশ্বিক রূপ
রাশাদ খলিফা ১৯ সংখ্যার যে গাণিতিক জাল বুনেছিলেন, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ধর্মগ্রন্থে সংখ্যাতাত্ত্বিক ‘প্যাটার্ন’ খুঁজে বের করার এই প্রবণতা খ্রিস্টান এবং ইহুদি ধর্মতাত্ত্বিকদের মধ্যেও প্রবলভাবে লক্ষ্য করা যায়। এর অন্যতম প্রধান উদাহরণ হলেন রুশ বংশোদ্ভূত গণিতবিদ এবং খ্রিস্টান ধর্মতাত্ত্বিক ড. ইভান প্যানিন (Ivan Panin)।
ইভান প্যানিনের ৭-এর মিরাকল
ইভান প্যানিন তার জীবনের প্রায় ৫০ বছর ব্যয় করেছেন বাইবেলের মূল হিব্রু (পুরাতন নিয়ম) এবং গ্রীক (নতুন নিয়ম) পাঠ্যের মধ্যে গাণিতিক সামঞ্জস্য খুঁজে বের করতে। তার মূল দাবি ছিল, বাইবেলের প্রতিটি অনুচ্ছেদ, বাক্য এমনকি শব্দও ৭ সংখ্যাটি দ্বারা অলৌকিকভাবে বিন্যস্ত [7]।
তার দাবির কিছু নমুনা নিচে দেওয়া হলো:
- • বাইবেলের প্রথম বাক্যের (আদিপুস্তক ১:১) হিব্রু শব্দ সংখ্যা ৭টি।
- • এই ৭টি শব্দের মোট অক্ষরের সংখ্যা ২৮, যা ৭ দ্বারা বিভাজ্য (7 × 4 = 28)।
- • বাক্যটির প্রধান তিনটি শব্দ (ঈশ্বর, আকাশ ও পৃথিবী)-এর বর্ণগুলোর সংখ্যাতাত্ত্বিক মান যোগ করলে তাও ৭ দ্বারা বিভাজ্য হয়।
প্যানিন দাবি করেছিলেন যে, হাজার হাজার বছর ধরে শত শত লেখকের হাত দিয়ে লেখা একটি গ্রন্থে এমন গাণিতিক নিখুঁততা কোনো মানুষের পক্ষে বজায় রাখা অসম্ভব। এটিই বাইবেলের ঐশ্বরিকত্বের প্রমাণ। যাদের আগ্রহ আছে, তারা এই [8] ওয়েবসাইটে গিয়ে ক্রিশ্চানদের এজাতীয় দাবীসমূহ পড়ে দেখতে পারেন। কেউ আবার ১২ সংখ্যাটির সাথে বাইবেলের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন।
ইহুদিদের ৭২-এর রহস্য (Shemhamphorasch)
ইহুদি মরমীবাদের (Kabbalah) একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘শেমহামফোরশ’ (Shemhamphorasch)। এক্সোডাস (Exodus) বা যাত্রাপুস্তক-এর ১৪:১৯-২১—এই তিনটি আয়াতের প্রতিটি হিব্রু ভাষায় ঠিক ৭২টি করে বর্ণ দিয়ে গঠিত। এই বর্ণগুলোকে একটি নির্দিষ্ট জ্যামিতিক বিন্যাসে সাজিয়ে ইহুদিরা ঈশ্বরের ৭২টি গুপ্ত নাম (Names of God) বের করে থাকে। [9] তারা দাবি করে, এই সুনির্দিষ্ট সংখ্যার বিন্যাস কোনো মানুষের পক্ষে কাকতালীয়ভাবে করা সম্ভব নয়।
গাণিতিক বিশ্লেষণঃ মিরাকল নাকি ‘অ্যাপোফেনিয়া’?
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় অ্যাপোফেনিয়া (Apophenia) বা ক্লাস্টারিং ইলিউশন (Clustering Illusion)। এটি মানুষের একটি জৈবিক প্রবণতা, যার মাধ্যমে সে অসংলগ্ন বা দৈব তথ্যের মধ্যেও কোনো একটি প্যাটার্ন বা অর্থ খুঁজে পায়।
টার্গেট সিলেকশন: রাশাদ খলিফা যেমন ১৯-কে বেছে নিয়েছেন, প্যানিন বেছে নিয়েছেন ৭-কে। যদি কেউ কোনো বিশাল বইয়ের মধ্যে ৫, ৮ বা ১১ সংখ্যাটি খোঁজেন, তবে পরিসংখ্যানগতভাবে সেই সংখ্যাটিরও অসংখ্য মিল খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
তথ্য ছাঁটাই (Cherry Picking): প্যানিন বা খলিফার মতো গবেষকরা কেবল সেই তথ্যগুলোই জনসমক্ষে আনেন যা তাদের পছন্দের সংখ্যার সাথে মেলে। যে হাজার হাজার শব্দ বা বাক্য তাদের সংজ্ঞায়িত ছকের সাথে মেলে না, সেগুলোকে তারা অত্যন্ত সুকৌশলে এড়িয়ে যান অথবা ‘পাঠ্যগত ত্রুটি’ হিসেবে অভিহিত করেন।
একাডেমিক প্রত্যাখ্যান: আধুনিক গণিতবিদ এবং বাইবেল গবেষকরা প্যানিনের এই কাজকে ‘সুডো-সায়েন্স’ বা ছদ্ম-বিজ্ঞান হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ব্রেন্ডন ম্যাককে (Brendan McKay)-এর মতো গণিতবিদরা দেখিয়েছেন যে, একই ধরণের গাণিতিক প্যাটার্ন এমনকি সাধারণ খবরের কাগজ বা উপন্যাসের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া সম্ভব, যদি পর্যাপ্ত সময় ব্যয় করা হয়। [10]
বিশ্লেষণ: রাশাদ খলিফার ১৯ সংখ্যার দাবি আসলে বাইবেলের ৭-এর মিরাকলেরই একটি ইসলামি সংস্করণ মাত্র। ধর্মের মহিমা প্রচারের জন্য তথ্যের এই ধরণের নির্লজ্জ বিকৃতি এবং গাণিতিক কারসাজি কেবল ইসলামে নয়, প্রায় সকল ধর্মেই বিদ্যমান। এটি আসলে কোনো অলৌকিকত্ব নয়, বরং মানুষের ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বা স্ব-পক্ষীয় সত্য খুঁজে পাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষার ফল। প্যানিন যেমন ৭-এর ছক মেলাতে বাইবেলের পাঠ্য নিয়ে কারসাজি করেছেন, রাশাদ খলিফাও ১৯-এর ছক মেলাতে কুরআনের পাঠ্য পরিবর্তন করতে দ্বিধা করেননি।
সূরা মুদাচ্ছিরের ৩০ নম্বর আয়াত: প্রেক্ষাপট বনাম অপব্যাখ্যা
রাশাদ খলিফা তার ১৯ সংখ্যার গাণিতিক অলৌকিকত্বের দাবির প্রধান ‘দলিল’ হিসেবে পবিত্র কোরআনের সূরা মুদাচ্ছিরের ৩০ নম্বর আয়াতটিকে ব্যবহার করেছেন। তার দাবি অনুযায়ী, এই আয়াতে ১৯ সংখ্যার কথা উল্লেখ করে আল্লাহ আসলে কোরআনের একটি ‘গাণিতিক কোড’ বা ‘সুরক্ষাকবচ’-এর দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন। আসুন আমরা আয়াতের প্রকৃত প্রেক্ষাপট এবং পরবর্তী আয়াতের সাথে এর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে দেখি।
আয়াতের আক্ষরিক অর্থ ও সরাসরি প্রেক্ষাপট
সূরা মুদাচ্ছিরের ৩০ নম্বর আয়াতটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত:
“ইহার উপরে আছে উনিশ।” (কুরআন ৭৪:৩০)
আসুন এবারে এই সূরাটির ২৬ নম্বর আয়াত থেকে পড়ি, MUHIUDDIN KHAN এর অনুবাদ থেকে,
আমি তাকে দাখিল করব অগ্নিতে।
আপনি কি বুঝলেন অগ্নি কি?
এটা অক্ষত রাখবে না এবং ছাড়বেও না।
মানুষকে দগ্ধ করবে।
এর উপর নিয়োজিত আছে উনিশ (ফেরেশতা)।
আমি জাহান্নামের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতাই রেখেছি। আমি কাফেরদেরকে পরীক্ষা করার জন্যেই তার এই সংখ্যা করেছি-যাতে কিতাবীরা দৃঢ়বিশ্বাসী হয়, মুমিনদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং কিতাবীরা ও মুমিনগণ সন্দেহ পোষণ না করে এবং যাতে যাদের অন্তরে রোগ আছে, তারা এবং কাফেররা বলে যে, আল্লাহ এর দ্বারা কি বোঝাতে চেয়েছেন। এমনিভাবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে চালান। আপনার পালনকর্তার বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন এটা তো মানুষের জন্যে উপদেশ বৈ নয়।
লক্ষ্য করে দেখুন, এখানে পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে, ১৯ দ্বারা আসলে জাহান্নামের প্রহরী হিসেবে নিয়োজিত ফেরেশতাদের কথাই বোঝানো হয়েছে। কোরআনের আরেক জায়গাতে বলা আছে, আল্লাহর আরশ বহন করবেন ৮ জন ফেরেশতা।
এবং ফেরেশতাগণ আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে ও আট জন ফেরেশতা আপনার পালনকর্তার আরশকে তাদের উর্ধ্বে বহন করবে। সূরা আল-হাক্বক্বাহঃ আয়াত-১৭
৩১ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা: ১৯ দ্বারা আসলে কী বোঝানো হয়েছে?
৩০ নম্বর আয়াতে ‘উনিশ’ উল্লেখ করার পর, ৩১ নম্বর আয়াতেই আল্লাহ পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে এই ১৯ জন আসলে কারা। আয়াতের ভাষ্য অনুযায়ী:
তারা ফেরেশতা: আয়াতটিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “আমি জাহান্নামের তত্ত্বাবধায়ক (Guardians of the Fire) হিসেবে কেবল ফেরেশতাদেরই নিযুক্ত করেছি।”
কেন এই সংখ্যাটি ১৯? আল্লাহ নিজেই বলছেন, এই সংখ্যাটি রাখা হয়েছে কাফেরদের পরীক্ষা করার জন্য (Fitnah), যাতে কিতাবীরা (ইহুদি ও খ্রিস্টান) দৃঢ়বিশ্বাসী হয় এবং মুমিনদের ঈমান বৃদ্ধি পায়।
এখানে কোথাও বলা হয়নি যে এই ১৯ সংখ্যাটি দিয়ে পুরো কোরআনকে গাণিতিকভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে। বরং ধ্রুপদী তাফসীরকারকগণ—যেমন ইবনে আব্বাস বা ইমাম ইবনে কাসীর—একমত হয়েছেন যে, জাহান্নামের শাস্তি পরিচালনায় ১৯ জন প্রধান ফেরেশতা নিযুক্ত রয়েছেন। আসুন প্রখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসিরে ইবনে কাশ্মীর থেকে দেখে নিই,
কোন কথার সহিত তাহার কোন মিল খুঁজিয়া পাই না। অপূর্ব মাধুর্যে ভরা তাহার কথা। অন্য সব কথাই তাহার কথার সামনে তুচ্ছ ও হীন বলিয়া মনে হয়। আবূ জাহল! তুমিই বল, এমতাবস্থায় আমি তাহার সম্পর্কে কি-ই-বা বিরূপ মন্তব্য করিতে পারি? আবূ জাহল বলিল, তবে মনে রাখিবেন মুহাম্মদ সম্পর্কে কঠোর ভাষায় কোন মন্তব্য না করা পর্যন্ত আপনার সম্প্রদায় আপনার সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করিতেছে তাহাদিগের অন্তর হইতে উহা মোচন করা যাইবে না। ওলীদ বলিল, আচ্ছা ঠিক আছে, আমাকে একটু সময় দিন, আমি চিন্তা করিয়া দেখি, কি বলা যায়। ওলীদ কিছুক্ষণ চিন্তা-ভাবনা করিয়া বলিল, আসলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, মুহাম্মদ যাহা বলে উহা লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু বৈ কিছুই নয়। তখন আল্লাহ্ তা’আলা يَسْعَةً عَشَرَ নাযিল করেন। ذَرْنِي وَمَنْ خَلَقْتُ .
সুদ্দী (র)-এর মতে দারুন্নদওয়ার বৈঠকে কুরাইশ নেতৃবৃন্দের কেহ বলিল, মুহাম্মদকে কবি আখ্যা দেওয়া হউক, কেহ বলিল যাদুকর সাব্যস্ত করা হউক, কেহ বলিল, গণক আবার কেহ বলিল, পাগল উপাধিতে ভূষিত করা হউক। তখন ওলীদ ইন্ন মুগীরা কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া চোখ তুলিয়া তাকাইয়া ভ্রু কুঞ্চিত করিয়া ও মুখ বিকৃত করিয়া বলিল, মুহাম্মদ যাহা বলে, উহা লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু বৈ নহে, ইহা তো মানুষেরই কথা। অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:
سَأَصْلِيْهِ سَقَرْ অর্থাৎ আমি তাহাকে সাকার নামক জাহান্নামে নিক্ষেপ করিব। তাহার পর আল্লাহ্ তা’আলা সাকার এর ভয়াবহতার প্রতি ইংগিত করিয়া বলেন:
وَمَا أَدْرَكَ مَا سَقَرُ আপনি কি জানেন যে, সাকার কি জিনিস?” অতঃপর
আল্লাহ্ তা’আলা ইহার ব্যাখ্যা প্রদান করিয়া বলেন:
لَا تُبْقَى وَلَا تَذَرُ অর্থাৎ এই সাকার জাহান্নামীদের অস্থি-মজ্জা, মেদ-গোস্ত, চর্ম-চর্বি ইত্যাদি খাইয়া ফেলিবে। আবার পূর্বের ন্যায় ভালো হইয়া যাইবে। তা তথায় তাহারা মরিবেও না বাঁচিবেও না। আবু সিনান, ইন্ন বুরায়দা এবং আরো অনেকে এই ব্যাখ্যা করিয়াছেন।
لَوَّاحَةُ لِلْبَشَرٍ অর্থাৎ সাকার জাহান্নামীদের গাত্রচর্ম দগ্ধ করিয়া অন্ধকার রাতের চেয়েও কালো করিয়া ফেলিবে এবং দেহকে জ্বালাইয়া ভুনা করিয়া ফেলিবে।
عَلَيْهَا تِسْعَةَ عَشَرَ অর্থাৎ সাকার-এর তত্ত্বাবধানে রহিয়াছে ভয়ানক আকৃতি বিশিষ্ট বৃহাদাকার ঊনিশজন প্রহরী।
ইব্ন আবূ হাতিম (র) বারা (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, বারা (রা) এর
ব্যাখ্যায় বলিয়াছেন: একদল ইয়াহুদী জনৈক সাহাবীকে জাহান্নামের প্রহরী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন, আল্লাহ্ এবং তাঁহার রাসূলই এই ব্যাপারে ভালো জানেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কানেও এই সংবাদ দেওয়া হয়। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ্ তা’আলা عَلَيْهَا تَسْعَةً عَشَرَ নাযিল করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবাদেরকে এই
৩৩২ ‘তাফসীরে ইব্ন কাছীর আয়াত শুনাইয়া বলিলেন, ‘ইয়াহুদীদেরকে আমার কাছে ডাকিয়া আন্। তাহারা আসিলে আমি তাহাদিকে জিজ্ঞাসা করিব যে, জান্নাতের মাটি কেমন। তোমরা শুনিয়া রাখ যে, জান্নাতের মাটি হইল সাদা ময়দার ন্যায়।” কিছুক্ষণ পর ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল যে, বলুন তো জাহান্নামের প্রহরী কতজন? রাসূলুল্লাহ (সা) দুইবার দুই হাতের আঙ্গুল উঠাইয়া দ্বিতীয়বারে এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল বন্ধ করিয়া বুঝাইয়া দিলেন যে, ঊনিশ জন। অতঃপর বলিলেন, “তোমরা বলতো জান্নাতের মাটি কেমন হইবে?” তাহারা বলিল, ভাই ইব্ন্ন সালাম আপনিই জবাব দিন। ইব্ন সালাম বলিল, জান্নাতের মাটি হইল সাদা রুটির ন্যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলিলেন, “এই রুটি হইল ময়দার তৈরি।” আবূ বকর ইবন বায্যার (র) জাবির ইব্ন আব্দুল্লাহ (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, জাবির (রা) বলেন: এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আসিয়া বলিল, মুহাম্মদ! আপনার সাহাবীরা তো আজ ঠকিয়া গেল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলিলেন: কোন্ ব্যাপারে? লোকটি বলিল, কতিপয় ইয়াহুদী তাদের জাহান্নামীদের সংখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা বলিল যে, আমরা আমাদিগের রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট জিজ্ঞাসা না করিয়া বলিতে পারিব না। শুনিয়া রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলিলেন, “যাহাদিগকে কোন অজানা বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হইলে তাহারা বলে যে, আমাদিগের নবীকে জিজ্ঞাসা না করিয়া আমরা বলিতে পাারিব না; তাহারা ঠকিল কি করিয়া? ঐ আল্লাহর শত্রুেেদরকে আমার কাছে ডাকিয়া আন। ওরা তো সেই জাত যাহারা তাহাদিগের নবীর কাছে দাবি করিয়াছিল যে, আমাদিগকে আল্লাহকে প্রকাশ্যে দেখাও।” সাহাবাগণ ইয়াহুদীদেরকে ডাকিয়া আনিলেন। আসিয়া তাহারা জিজ্ঞাসা করিল যে, বল তো, আবুল কাসেম! জাহান্নামীদের প্রহরী কতজন? রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইংগিতে বুঝাইয়া দিলেন যে, উনিশ জন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) জিজ্ঞাসা করিলেন, আচ্ছা, তোমরা বলতো, জান্নাতের মাটি কেমন? প্রশ্ন শুনিয়া তাহারা একজন আরেকজনের দিকে তাকাইতে লাগিল। অতঃপর একটু ইতস্তত করিয়া বলিল, এই তো রুটির ন্যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলিলেনঃ “বল, ময়দার রুটির ন্যায়।” (۳۱) وَمَا جَعَلْنَا أَصْحُبَ النَّارِ إِلَّا مَلَئِكَةٌ ، وَمَا جَعَلْنَا عِدَّتَهُمْ إِلَّا فِتْنَةً لِلَّذِينَ كَفَرُوا لِيَسْتَيْقِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتٰبَ وَيَزْدَادَ الَّذِينَ امَنُوا إِيمَانًا وَلَا يَرْتَابَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتٰبَ وَالْمُؤْمِنُونَ وَلِيَقُولُ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ وَالْكَفِرُونَ مَا ذَا أَرَادَ اللَّهُ بِهَذَا مَثَلًا كَذَلِكَ يُضِلُّ اللهُ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي مَن يَشَاءُ ، وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلَّا هُوَ، وَمَا هِيَ إِلَّا ذِكْرَى لِلْبَشَرِةُ



গাণিতিক বৈষম্য: ১৯ কেন, ৮ কেন নয়?
রাশাদ খলিফা যদি দাবি করেন যে ৩০ নম্বর আয়াতে ১৯ উল্লেখ করা মানেই ১৯-এর গাণিতিক মিরাকল, তবে তাকে কোরআনের অন্যান্য সংখ্যার ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রয়োগ করতে হতো। উদাহরণস্বরূপ:
- ৮ সংখ্যাটি: কোরআনে বলা হয়েছে, কেয়ামতের দিন ৮ জন ফেরেশতা আল্লাহর আরশ বহন করবেন।”…এবং আপনার পালনকর্তার আরশকে সেদিন আটজন ফেরেশতা তাদের উর্ধ্বে বহন করবে।” [11]
ইসলামি আকিদায় আল্লাহর আরশ বহন করা জাহান্নামের প্রহরীর তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাহলে রাশাদ খলিফা কেন ৮ সংখ্যার কোনো ‘গাণিতিক কোড’ খুঁজে বের করলেন না? কারণটি সরল—তিনি আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ১৯ সংখ্যাটিকে মিরাকল হিসেবে দাঁড় করাবেন (যাকে ‘Pre-conceived Conclusion’ বলা হয়), এবং তারপর কেবল সেই আয়াতগুলোই বেছে নিয়েছেন যা তার এই তত্ত্বকে সমর্থন করতে পারে। এটি একটি বিশুদ্ধ গাণিতিক পক্ষপাত বা ‘Selection Bias’।
লজিক্যাল ফ্যালাসি বা যুক্তির ভ্রান্তি
রাশাদ খলিফা এখানে একটি বড় ধরণের যুক্তির ধোঁকা (Fallacy of Reification) ব্যবহার করেছেন। তিনি একটি বিমূর্ত বা সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটের সংখ্যাকে (জাহান্নামের প্রহরী) পুরো গ্রন্থের কাঠামোগত সংখ্যা হিসেবে চাপিয়ে দিয়েছেন। এটি অনেকটা এমন যে, কোনো এক উপন্যাসের ৩০ নম্বর পৃষ্ঠায় যদি লেখা থাকে “সেখানে ১৯ জন ডাকাত ছিল”, আর পাঠক যদি সেই ১৯ সংখ্যাটি নিয়ে পুরো উপন্যাসের শব্দ ও অক্ষর গুনে ১৯ মেলাতে শুরু করে এবং দাবি করে যে এটি একটি ‘গাণিতিক মিরাকল’।
বিশ্লেষণ: রাশাদ খলিফা জানতেন যে সাধারণ মানুষ যারা গভীরভাবে কুরআন পাঠ বা গবেষণা করে না, তাদের কাছে “ইহার উপরে আছে উনিশ” বাক্যটি একটি রহস্যময় ধাঁধার মতো মনে হবে। তিনি এই রহস্যময়তাকেই পুঁজি করেছিলেন। অথচ সূরা মুদাচ্ছিরের পরবর্তী আয়াতেই (৩১ নম্বর আয়াত) এই সংখ্যাটির উদ্দেশ্য এবং পরিচয় স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া আছে। রাশাদ খলিফা অত্যন্ত চতুরতার সাথে পরবর্তী আয়াতের ব্যাখ্যাটিকে এড়িয়ে গিয়ে কেবল ৩০ নম্বর আয়াতটিকে তার ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করেছেন।
তাফসীর কী বলে? আদি প্রমাণের বিপরীতে রাশাদ খলিফার কল্পনা
রাশাদ খলিফা এবং তার অনুসারীরা দাবি করেন যে, সূরা মুদাচ্ছিরের ৩০ নম্বর আয়াতের ‘১৯’ সংখ্যাটি একটি গাণিতিক সংকেত, যা কোনো ফেরেশতা বা প্রহরীর সংখ্যা নয়। কিন্তু আমরা যদি ইসলামের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ এবং প্রাচীনতম তাফসীর (ব্যাখ্যা) গ্রন্থগুলো পর্যালোচনা করি, তবে দেখা যায় যে রাশাদ খলিফার এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং মনগড়া।
তাফসীরে ইবনে কাসীর: সর্বসম্মত মত
তাফসীর শাস্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ ইমাম ইবনে কাসীর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং সাহাবীদের বর্ণনা উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন যে, এই ১৯ বলতে জাহান্নামের ১৯ জন শক্তিশালী প্রধান ফেরেশতাকে বোঝানো হয়েছে। [12] সেখানে বলা হয়েছে:
- জাহান্নামের আগুনের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আল্লাহ এই ১৯ জন ফেরেশতাকে নিয়োজিত করেছেন।
- তাদের শারীরিক গঠন এবং ক্ষমতা সাধারণ মানুষের কল্পনার অতীত।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: আবু জাহেলের বিদ্রূপ
কুরআনের এই ১৯ সংখ্যাটি কেন উল্লেখ করা হয়েছিল, তার একটি শক্তিশালী ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। যখন এই আয়াতটি নাজিল হয়, তখন মক্কার মুশরিকরা এটিকে উপহাসের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
আবু জাহেলের দম্ভ: আবু জাহেল উপহাস করে বলেছিল, “মুহাম্মদ দাবি করছে জাহান্নামের প্রহরী মাত্র ১৯ জন! অথচ আমরা কুরাইশরা সংখ্যায় হাজার হাজার। আমরা কি এই ১৯ জনকে পরাজিত করতে পারব না?” [13]
আবু আসাদ ইবনে কালদাহর দম্ভ: সে দাবি করেছিল যে, সে একাই ১০ জনকে ডান হাত দিয়ে এবং ৯ জনকে বাম হাত দিয়ে কুপোকাত করতে পারবে।
মক্কার কাফেরদের এই দম্ভ এবং মূর্খতার জবাব দিতেই পরবর্তী আয়াত (৩১ নম্বর আয়াত) নাজিল হয়, যেখানে আল্লাহ বলেন যে এই সংখ্যাটি আসলে তাদের জন্য একটি ‘ফিতনা’ বা পরীক্ষা। অর্থাৎ, তারা কি এই সংখ্যার আড়ালে থাকা ফেরেশতাদের শক্তিতে বিশ্বাস করে, নাকি কেবল সংখ্যাটি ছোট দেখে উপহাস করে—এটাই ছিল পরীক্ষা। রাশাদ খলিফা এই পুরো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি সম্পূর্ণ চেপে গেছেন।
ভাষাগত বিশ্লেষণ (Linguistic Analysis)
আয়াতে বলা হয়েছে— “আলাইহা তিসআতা আশারা” (ইহার উপরে আছে উনিশ)। এখানে ‘আলাইহা’ (ইহার উপরে) বলতে এর আগের আয়াতের ‘সাকার’ (জাহান্নামের আগুন)-কে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, আগুনের ওপর ১৯ জন নিযুক্ত। অথচ রাশাদ খলিফা জোর করে এই ‘আলাইহা’-কে ‘কুরআন’-এর ওপর প্রয়োগ করার চেষ্টা করেন, যার কোনো ব্যাকরণগত ভিত্তি নেই।
৩১ নম্বর আয়াতের অকাট্য প্রমাণ
রাশাদ খলিফার দাবির সবচাইতে বড় খণ্ডন খোদ কুরআনেই বিদ্যমান। ৩১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
“আমি জাহান্নামের প্রহরী হিসেবে কেবল ফেরেশতাদেরই নিযুক্ত করেছি।” [14]
এই আয়াতটি পড়ার পর আর কোনো তর্কের অবকাশ থাকে না। এখানে ‘১৯’ সংখ্যাটি প্রহরীদের (Guardians) পরিচয় দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু রাশাদ খলিফা এই ১৯-কে কোনো প্রহরী বা ফেরেশতা হিসেবে মানতে নারাজ ছিলেন, কারণ তা মানলে তার ‘গাণিতিক কোড’ তত্ত্বটি মুখ থুবড়ে পড়ে।
ইসোটেরিক (Esoteric) বা বাতিনী ব্যাখ্যার বিপদ
রাশাদ খলিফার পদ্ধতিটি ছিল প্রাচীন ‘বাতিনী’ বা গোপন জ্ঞানবাদীদের মতো। তারা দাবি করত যে, আয়াতের বাহ্যিক অর্থের আড়ালে এক রহস্যময় অর্থ লুকিয়ে আছে যা কেবল তারাই জানে। কিন্তু যুক্তি ও প্রমাণের নিরিখে দেখা যায়, যখন আল্লাহ নিজেই পরবর্তী আয়াতে ১৯-এর পরিচয় দিয়ে দিচ্ছেন, তখন সেই পরিচয় বদলে দিয়ে তাকে গাণিতিক ছক হিসেবে দাবি করা কেবল মিথ্যাচার নয়, বরং কুরআনের মূল বার্তার সাথে প্রতারণা।
বিশ্লেষণ: তাফসীরশাস্ত্রের কোনো একটি বর্ণনাও রাশাদ খলিফার পক্ষে যায় না। উল্টো, তৎকালীন আরবের কাফেররা যেভাবে ১৯ সংখ্যাটি শুনে বিভ্রান্ত হয়েছিল, রাশাদ খলিফাও ঠিক একইভাবে এই সংখ্যাটি নিয়ে একটি নতুন ধরণের বিভ্রান্তি বা ‘ফিতনা’ তৈরি করেছেন। তিনি মূলত মুমিনদের বিশ্বাসকে গাণিতিক জাদুর জালে বন্দি করার জন্য ধ্রুপদী সকল জ্ঞান ও প্রমাণকে অস্বীকার করেছেন।
কোরআনের আয়াত সংখ্যা কি ১৯ দ্বারা বিভাজ্য? গাণিতিক জালিয়াতির ব্যবচ্ছেদ
রাশাদ খলিফার ১৯ সংখ্যার তত্ত্বের একটি প্রধান খুঁটি হলো এই দাবি যে, কোরআনের মোট আয়াত সংখ্যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য। তিনি সগর্বে ঘোষণা করেন যে, কোরআনের মোট আয়াত সংখ্যা হলো ৬৩৪৬টি। তার গাণিতিক হিসাবটি ছিল নিম্নরূপ:
একইসাথে তিনি আরও একধাপ এগিয়ে দাবি করেন যে, এই সংখ্যাটির অংকগুলোর যোগফলও ১৯, অর্থাৎ: । আপাতদৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত চমকপ্রদ মনে হলেও, একটু গভীরে গেলেই রাশাদ খলিফার ভয়াবহ তথ্য বিকৃতি ও জালিয়াতি ধরা পড়ে।
আয়াত সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিক মতভেদ
কোরআনের আয়াত ঠিক কতটি, তা নিয়ে ইসলামের ইতিহাসের শুরু থেকেই বিভিন্ন ‘কিরাত’ বা পঠনপদ্ধতি অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন গণনা প্রচলিত আছে। ইসলামের কোনো প্রামাণ্য উৎস বা কোনো প্রখ্যাত ইমামই কখনো ‘৬৩৪৬’ সংখ্যাটি উল্লেখ করেননি। প্রখ্যাত তাফসীরকারক ইবনে কাসীর তার তাফসীরের ভূমিকায় আয়াত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মত উল্লেখ করেছেন:
- 🔹 মাদানি গণনা: ৬২১৪টি অথবা ৬২১৭টি।
- 🔹 মক্কি গণনা: ৬২১৯টি।
- 🔹 বশরি গণনা: ৬২০৪টি।
- 🔹 কুফি গণনা: ৬২৩৬টি (যা বর্তমানে বিশ্বে সর্বাধিক প্রচলিত)।
- 🔹 শামি গণনা: ৬২২৬টি।
লক্ষ্য করুন, উপরের কোনো একটি গণনাপদ্ধতিতেও ‘৬৩৪৬’ সংখ্যাটির অস্তিত্ব নেই। তাহলে রাশাদ খলিফা এই সংখ্যাটি পেলেন কোথায়?
কোরআন সংকলন এবং পরিমার্জনের ইতিহাস থেকে জানা যায়, কোরআনের আয়াতের সংখ্যা আসলে কত, তা নিয়ে ইসলামের অনুসারীদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। বিভিন্ন জনের মতামত অনুযায়ী এই সংখ্যাটি ৬০০০/ ৬২০৪/ ৬২১৪/ ৬২১৯/ ৬২২৫/ ৬২২৬/ ৬২৩৬/ ৬২১৬/ ৬২৫০/ ৬২১২/ ৬২১৮/ ৬৬৬৬/ ৬২২১/ ৬৩৪৮, অর্থাৎ আয়াত ঠিক কয়টি, তা সেই সম্পর্কে সঠিকভাবে কিছু বলা যায় না। আয়াতের পাশাপাশি অক্ষর ও শব্দের সংখ্যা নিয়েও প্রচুর মতানৈক্য রয়েছে। শুধু তাই নয়, এই নিয়ে ঘটে গেছে বহু রক্তারক্তি কাণ্ড। [16]

৬৩৪৬ সংখ্যাটি তৈরির ‘রেসিপি’ ও জালিয়াতি
রাশাদ খলিফা তার ১৯-এর ছক মেলাতে গিয়ে অত্যন্ত চতুরতার সাথে একটি কৃত্রিম সংখ্যা তৈরি করেছেন। বর্তমানে বহুল প্রচলিত হাফস (Hafs) কিরাত অনুযায়ী কোরআনের আয়াত সংখ্যা হলো ৬২৩৬টি। রাশাদ খলিফা এর সাথে ১১২টি ‘বিসমিল্লাহ’ (সূরার শুরুতে থাকা) যোগ করেন।
হিসাবটি দাঁড়ায়: ।
এখন সমস্যা হলো, ৬৩৪৮ সংখ্যাটি ১৯ দিয়ে বিভাজ্য নয়। ১৯ দিয়ে বিভাজ্য করতে হলে একে ৬৩৪৬ হতে হবে। অর্থাৎ, ২ কম হতে হবে।
এই ‘২’ কমানোর জন্য রাশাদ খলিফা যা করেছেন, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষের কাছে চরম ধৃষ্টতা হিসেবে গণ্য হবে। তিনি দাবি করে বসেন যে, সূরা তওবার শেষ দুটি আয়াত (১২৮ ও ১২৯ নং আয়াত) জাল! তার মতে, এই দুটি আয়াত মানুষ পরবর্তীতে কোরআনে ঢুকিয়েছে এবং এগুলো বাদ দিলেই কেবল কোরআনের আয়াত সংখ্যা ৬৩৪৬ হয়, যা ১৯ দিয়ে বিভাজ্য। [17]
উদ্দেশ্যমূলক তথ্য ছাঁটাই (Cherry Picking)
বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘Data Torturing’। অর্থাৎ, তথ্যকে ততক্ষণ পর্যন্ত নির্যাতন করা যতক্ষণ না সে আপনার মনের মতো স্বীকারোক্তি দেয়। রাশাদ খলিফা আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলেন যে তাকে ‘১৯’ মেলাতে হবে। যখন দেখলেন প্রচলিত কোরআনের আয়াত সংখ্যা দিয়ে তা মিলছে না, তখন তিনি আয়াত সংখ্যাই কমিয়ে দিলেন।
যদি কোনো ছাত্র পরীক্ষায় অংক মেলাতে না পেরে প্রশ্নপত্রের সংখ্যাই বদলে দেয় এবং শেষে বলে ‘অংক মিলে গেছে’, তবে তাকে মেধাবী বলা হয় না, বলা হয় ‘প্রতারক’। রাশাদ খলিফা ঠিক এই কাজটিই করেছেন।
লজিক্যাল ফ্যালাসি: বৃত্তাকার যুক্তি
রাশাদ খলিফার যুক্তিটি ছিল অনেকটা এরকম:
এটি একটি ক্লাসিক Circular Reasoning বা বৃত্তাকার যুক্তি। তিনি ১৯-কে সত্য প্রমাণের জন্য আয়াত বাদ দিচ্ছেন, আবার আয়াত বাদ দেওয়াকে জায়েজ করছেন ১৯-এর দোহাই দিয়ে।
বিশ্লেষণ: রাশাদ খলিফার এই দাবি কেবল গাণিতিকভাবেই অশুদ্ধ নয়, বরং এটি ঐতিহাসিকভাবেও চরম মিথ্যাচার। তিনি দাবি করেছিলেন যে কোরআনের একটি অক্ষরও পরিবর্তিত হয়নি এবং ১৯ হলো তার রক্ষাকবচ। অথচ সেই ১৯-কে রক্ষা করতেই তিনি নিজে কোরআনের দুটি আয়াতকে অস্বীকার করলেন। এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে? মূলত ৬৩৪৬ সংখ্যাটি কোনো অলৌকিক সংখ্যা নয়, বরং এটি রাশাদ খলিফার নিজের হাতে গড়া একটি ‘ম্যানিপুলেটেড’ সংখ্যা।
কোরআনের সর্বমোট সূরার সংখ্যা: ঐশ্বরিক গাণিতিক কোড নাকি সংকলনের ইতিহাস?
রাশাদ খলিফার ১৯ তত্ত্বের অন্যতম একটি ভিত্তি হলো কোরআনের মোট সূরার সংখ্যা ১১৪ টি। এটি খুব সহজেই ১৯ দ্বারা বিভাজ্য ($114 = 19 \times 6$) হওয়ায় একে একটি মোজেজা হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু আমরা যদি কোরআন সংকলনের ঐতিহাসিক দলিল এবং ধ্রুপদী তাফসীরগুলোর গভীরে প্রবেশ করি, তবে দেখা যায় যে এই ১১৪ সংখ্যাটি কোনো ‘অপরিবর্তনীয় মহাজাগতিক সত্য’ নয়, বরং এটি সাহাবীদের ব্যক্তিগত ইজতিহাদ বা সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।
সূরা তওবা ও সূরা আনফালের বিতর্ক
কোরআনের সূরার সংখ্যা ১১৪টি হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হলো সূরা তওবা। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কোরআনের বাকি ১১৩টি সূরার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ থাকলেও সূরা তওবার শুরুতে এটি নেই। কেন নেই? এর উত্তর লুকিয়ে আছে কোরআন সংকলনের ইতিহাসে।
রাশাদ খলিফা দাবী করেছেন, কোরআনের সর্বমোট সূরার সংখ্যা ১১৪ টি, যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য। অথচ, তাফসীরে ইবনে কাসীর [18] থেকে জানা যায়, সূরা তওবা যে স্বতন্ত্র সূরা, এটি ছিল উসমানের ধারণা। মুহাম্মদ এবিষয়ে কিছু বলে যাননি। সূরা তওবার শুরুতে তাই বিসমিল্লাহও পড়া হয় না। এখন লাওহে মাহফুজের কোরআনে সূরা তওবা আলাদা সূরা নাকি তা সূরা আনফালের অংশ, তা কারো পক্ষেই জানা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, উসমানের ধারণার ওপর যা প্রতিষ্ঠিত, তা কি আমরা শতভাগ শুদ্ধ হিসেবে গণ্য করতে পারি? তাহলে সূরা তওবা যদি স্বতন্ত্র সূরা না হয়েই থাকে, তাহলে কোরআনে সূরার সংখ্যা হয় ১১৩ টি। যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়।
সূরা তাওবা
॥ ১২৯ আয়াত, ১৬ রুকু, মাদানী ॥
অবতরণকাল: যে সকল সূরা নবী করীম (সা)-এর জীবনের শেষ দিকে নাযিল হইয়াছিল,
সূরা তাওবা ঐগুলির অন্যতম। ইমাম বুখারী (র) বলেন: আবুল ওয়ালীদ (র) বিভিন্ন রাবীর সূত্রে বারা (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত হইতেছে )ستفْتُونَكَ قُلِ اللَّهُ يُفْتِيْكُمْ فِي الْكَلالَةِ( এই আয়াত এবং সর্বশেষে অবতীর্ণ সূরা হইতেছে-সূরা বারাআত (সূরা তাওবা)।
সূরা তাওবার প্রথমে ‘বিসমিল্লাহ্ )بسم الله الرَّحْمَنِ الرَّحِيم( লিখিত না থাকিবার কারণ:
সাহাবীগণ উসমান (রা)-এর তত্ত্বাবধানে কুরআন মজীদ সংকলন করিবার কালে এই সূরার প্রথমে বিসমিল্লাহ্ লিখেন নাই। তাঁহারা উসমান (রা)-এর নির্দেশে এইরূপ করিয়াছিলেন। তিনি এইরূপ নির্দেশ কেন দিয়াছিলেন, নিম্নোক্ত রিওয়ায়েতে তাহা বর্ণিত হইয়াছে:
ইমাম তিরমিযী (র) বিভিন্ন বর্ণনাকারীর বরাতে মুহাম্মদ ইব্ন্ন বাশার (র) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: একদা আমি উসমান (রা)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করিলাম, সূরা আনফাল যাহার আয়াতের সংখ্যা এক শতের নিম্নে এবং সূরা তাওবা যাহার আয়াতের সংখ্যা অন্যূন একশত -এই দুইটি সূরার মধ্যবর্তী স্থানে আপনারা ‘বিসমমিল্লাহ’ লিখেন নাই কেন? এতদ্ব্যতীত উক্ত সূরাদ্বয়কে আপনারা যে ‘দীর্ঘ সূরা সপ্তক )السبع الطول( -এর মধ্যে স্থাপন করিয়াছেন; উহার কারণ কি? উসমান (রা) বলিলেন: অনেক সময়ে এইরূপ ঘটিত যে, নবী করীম (সা)-এর প্রতি একটি সূরার অংশ বিশেষ নাযিল হইবার পর অন্য একটি সূরার অংশ বিশেষ নাযিল হইত। এইরূপ নবী করীম (সা)-এর উপর একটি সূরা নাযিল হওয়া শেষ হইবার পূর্বে অন্য একটি সূরার অংশ বিশেষ নাযিল হইত। এমতাবস্থায় কোন আয়াত নাযিল হইলে তিনি কোন ওয়াহী লেখক সাহাবীকে ডাকিয়া বলিতেন: ‘যে সূরায় এই এই বিষয় বর্ণিত হইয়াছে, এই আয়াতটিকে উহার মধ্যে (অমুক স্থানে) স্থাপন কর।’ সূরা-আনফাল হইতেছে মদীনায় অবতীর্ণ প্রথম সূরাসমূহের অন্যতম। পক্ষান্তরে, সূরা বারাআত (সূরা তাওবা) হইতেছে মদীনায় অবতীর্ণ শেষ সূরাসমূহের অন্যতম। কিন্তু, উভয় সূরায় বর্ণিত ঘটনা ও কাহিনী প্রায় একরূপ। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমি ধারণা করিলাম: ‘সূরা বারাআত পৃথক কোন সূরা নহে; বরং উহা সূরা আনফাল-এর একটি অংশ।’ অথচ নবী করীম (সা) এ সম্বন্ধে কিছু বলিয়া যান নাই। উপরোক্ত কারণে আমি উহাদিগকে পরস্পর সন্নিহিত করিয়া স্থাপন করিয়াছি; কিন্তু উহাদের মধ্যবর্তী স্থানে (সূরা তাওবার প্রথমে) বিসমিল্লাহ্ লিখি নাই। তেমনি উপরোক্ত কারণে উভয় সূরা মিলিয়া দীর্ঘ সূরার আকার গ্রহণ করে বলিয়া উহাদিগকে ‘দীর্ঘ সূরা-সপ্তক’-এর মধ্যে স্থাপন করিয়াছি।


আরো বিবরণ পাওয়া যায় সুনানু আবু দাউদ শরীফের হাদিস থেকে। [19]
৭৮৬। আমর ইব্ন আওন ইব্ন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হযরত উছমান (রা)-কে জিজ্ঞেস করি যে, আপনারা সূরা বারাআত-কে সূরা আনফালের অন্তর্ভুক্ত করে আল-কুরআনের সাবউল মাছানী (সাতটি দীর্ঘ সূরা)-এর মধ্যে কিরূপে পরিগণিত করেন এবং উভয় সূরার মধ্যস্থলে বিস্মিল্লাহির রহমানির রাহীম কেন লিখেন নাই? অথচ বারাআত সূরাটি মিইন-এর অন্তর্ভুক্ত (অর্থাৎ যাতে ১০০-র অধিক আয়াত আছে এবং বারাআতে ১২৯ আয়াত আছে)। অপরপক্ষে সূরা আনফাল মাছানীর অন্তর্ভুক্ত (কেননা এতে ১০০-এর কম অর্থাৎ ৭৫ টি আয়াতআছে)।
উছমান (রা) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উপর যখনই কোন আয়াত নাযিল হত, তখন তিনি ওহী লেখক সাহাবীদের ডেকে বলতেনঃ এই আয়াত অমুক সূরার অমুক স্থানে সন্নিবেশিত কর যার মধ্যে এই এই বিষয় আলোচিত হয়েছে। অতঃপর তাঁর উপর যখন একটি বা দুটি আয়াত নাযিল হত, তখনও তিনি ঐরূপ বলতেন। ১
সুরা আল্-আনফাল নবী করীম (স)-এর উপর মদীনায় আসার পরপরই নাযিলকৃত সুরাসমূহের অন্যতম এবং সুরা বারাআত অবতীর্ণ হয় কুরআন নাযিলের সমাপ্তিকালে। কিন্তু সূরা আনফালে বর্ণিত ঘটনাবলীর সংগে সূরা বারাআতে বর্ণিত ঘটনাবলীর সাদৃশ্য রয়েছে। কাজেই আমি মনে
মনে স্থির করি যে, এটি সূরা আনফালের অন্তর্ভুক্ত। এজন্য আমি দুটি সূরাকে একত্রে
১। প্রকাশ থাকে যে, আল-কুরআনের কোন্ আয়াফ কোন্ সূরার কোন্ স্থানে সন্নিবেশিত হবে- তাও ওহী দ্বারা নির্ধারিত হত। (অনুবাদক)
সাবউত-তিওয়াল-এর অন্তর্ভুক্ত করেছি এবং এ কারণেই এই দুইটি সূরার মাঝখানে বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম লিপিবদ্ধ করিনি- (তিরমিযী)। ۷۸۷- حَدَّثَنَا زِيَادُ بْنُ أَيُّوبَ نَا مَرْوَانُ يَعْنِي ابْنَ مُعَاوِيَةَ أَنَا عَوْفٌ الْأَعْرَابِيُّ عَنْ يَزِيدَ الْفَارِسِي حَدَّثَنِي ابْنُ عَبَّاسِ بِمَعْنَاهُ قَالَ فِيهِ فَقُبِضَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَمْ يُبَيِّنَ لَنَا أَنَّهَا مِنْهَا – قَالَ أَبُو دَاوُدَ قَالَ الشَّعَبِيُّ وَأَبُو مَالِكِ وَقَتَادَةُ وَثَابِتُ بْنُ عُمَارَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يَكْتُبْ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ حَتَّى نَزَلَتْ سُورَةُ النَّمْلِ هَذَا مَعْنَاهُ . ৭৮-৭। যিয়াদ ইব্ন আইউব ইব্ন আবাস (রা) থেকে এই সূত্রেও পূর্বোক্ত হাদীছের অনুরূপ বর্ণিত আছে। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম আমাদের মধ্য হতে বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু তিনি সূরা বারাআত সূরা আনফালের অন্তর্ভুক্ত কি না- এ সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে কিছুই বলেননি। ইমাম আবু দাউদ (রহ) বলেন, শাবী, আবু মালিক, কাতাদা ও ছাবেত বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উপর সুরা নাম্ল অবতীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত (কোন সূরার প্রারম্ভে) বিস্মিল্লাহ লিখেন নি।১ بن سعيد وأحمد بن محمد الْمَرْوَزِي وَابْنُ السَّرْحِ قَالُوا نَا ۷۸۸- حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ . سُفْيَانُ عَنْ عَمْرٍو عَنْ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ قَالَ قُتَيْبَةٌ فِيهِ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَعْرِفُ فَصَلَ السُّورَةِ حَتَّى تَنْزِلَ عَلَيْهِ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ وَهُذَا لَفْظُ ابْنِ السَّرْحِ . ৭৮৮। কুতায়বা ইব্ন সাঈদ ইব্ন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উপর বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম নাযিল না হওয়া পর্যন্ত কোন সূরার শুরু চিহ্নিত করতে পারতেন না। হাদীছের এই পাঠ ইবনুস সারহ-এর। ۱۳۲ . بَابُ تَخْفِيفِ الصَّلوةَ لِلْأَمْرِ يَحْدُثُ ১৩২. অনুচ্ছেদঃ কোন অনিবার্য কারণ বশতঃ নামায সংক্ষিপ্ত করা ১। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, “বিসমিল্লাহ” সূরা নামল-এর আয়াত, অন্য কোন সূরার আয়াত নয়।


১১৩ নাকি ১১৪?
উপরোক্ত ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে স্পষ্ট যে, সূরা তওবা একটি স্বতন্ত্র সূরা নাকি সূরা আনফালেরই অংশ—এটি নিয়ে সাহাবীদের মধ্যেই সংশয় ছিল। তাফসীরে ইবনে কাসীরে উল্লেখ আছে যে, অনেকের মতেই এই দুটি সূরা আসলে একটিই সূরার দুটি অংশ। [20]
এখন আমরা যদি যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করি:
যদি সূরা তওবা এবং সূরা আনফাল একটি সূরার অন্তর্ভুক্ত হয় (যেমনটি অনেক সাহাবী ও পরবর্তী স্কলারগণ মনে করতেন), তবে কোরআনের মোট সূরার সংখ্যা দাঁড়ায় ১১৩ টি।
রাশাদ খলিফার তথাকথিত গাণিতিক মোজেজাটি দাঁড়িয়ে আছে খলিফা উসমানের একটি ব্যক্তিগত ‘ধারণা’ বা ‘অনুমান’-এর ওপর ভিত্তি করে। যদি উসমান (রা.) সেগুলোকে একটি সূরা হিসেবে গণ্য করতেন, তবে ১৯-এর এই জাদুর খেলা শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ত।
সাহাবীদের ব্যক্তিগত মুসহাফ (Manuscripts)
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, সকল সাহাবীর কাছে থাকা কোরআনের কপিতে ১১৪টি সূরাই ছিল না।
তাঁর মুসহাফে সূরা আল-হাফাদ এবং সূরা আল-খাল নামে আরও দুটি অতিরিক্ত সূরা ছিল, যা বর্তমান কোরআনে নেই।
তাঁর মুসহাফে সূরা ফাতিহা এবং শেষ দুটি সূরা (নাস ও ফালাক) অন্তর্ভুক্ত ছিল না, কারণ তিনি মনে করতেন এগুলো কেবল দোয়ার অংশ。
অর্থাৎ, সূরার সংখ্যা যে ১১৪টিই হতে হবে—এই ধারণাটি ইসলামের ইতিহাসের শুরুতে কোনো ‘ডিভাইন কনস্ট্যান্ট’ ছিল না। এটি ছিল প্রশাসনিকভাবে সংকলিত একটি বিন্যাস মাত্র।
লজিক্যাল ফ্যালাসি: সার্কেল অফ জাস্টিফিকেশন
রাশাদ খলিফা এখানে একটি বড় ধরণের যুক্তির ভ্রান্তি ব্যবহার করেছেন। তিনি ১১৪ সংখ্যাটিকে ১৯ দ্বারা বিভাজ্য বলে ‘অলৌকিক’ বলছেন, অথচ এই ১১৪ সংখ্যাটি যে সংকলন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসেছে, সেই প্রক্রিয়াটি নিজেই মানুষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। একটি অলৌকিক গাণিতিক কোড যদি মানুষের ‘ধারণা’ (Assumption)-এর ওপর নির্ভর করে, তবে তাকে আর অলৌকিক বলা চলে না।
বিশ্লেষণ: রাশাদ খলিফা ১১৪ সংখ্যাটিকে ১৯-এর ছাঁচে ফেলার জন্য সূরা তওবার স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে ধ্রুব সত্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু একই মানুষ যখন দেখেন সূরা তওবার শেষ দুটি আয়াত তার ১৯-এর হিসাব মেলাতে বাধা দিচ্ছে, তখন তিনি অবলীলায় সেই আয়াত দুটিকে ‘শয়তানি সংযোজন’ বলে বাদ দিয়ে দেন। অর্থাৎ, নিজের প্রয়োজন মতো তিনি একবার সূরার সংকলনকে ‘ঐশ্বরিক’ ধরছেন, আবার নিজের অংক মেলাতে সেই একই সূরার আয়াতকে ‘নকল’ বলছেন। এটি কোনো গবেষকের কাজ নয়, এটি একজন চতুর জালিয়াতির লক্ষণ।
কোরআনে বর্ণের সংখ্যা কত? গাণিতিক চাতুর্য বনাম পাণ্ডুলিপির বাস্তবতা
রাশাদ খলিফার ১৯-ভিত্তিক অলৌকিকত্বের দাবির একটি বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে কোরআনের মোট বর্ণ বা অক্ষরের (Letters) সংখ্যার ওপর। তিনি দাবি করেন যে, কোরআনের মোট বর্ণ সংখ্যা হলো ৩২৯,১৫৬ টি। তার হিসাব অনুযায়ী:
শুনতে খুব নিখুঁত মনে হলেও, কোরআনের বর্ণ গণনার ইতিহাস এবং আরবী লিপিশৈলীর বিবর্তন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সংখ্যাটি রাশাদ খলিফার একটি মনগড়া উদ্ভাবন ছাড়া আর কিছুই নয়।
ঐতিহাসিক বর্ণ গণনায় বিশাল পার্থক্য
কোরআনের বর্ণ সংখ্যা ঠিক কত, তা নিয়ে ইসলামের ইতিহাসের প্রখ্যাত সাহাবী এবং পরবর্তী যুগের স্কলারদের মধ্যে কখনোই কোনো ঐক্যমত্য ছিল না। বিভিন্ন প্রামাণ্য গ্রন্থ ও তাফসীর থেকে পাওয়া কিছু পরিসংখ্যান লক্ষ্য করি:
লক্ষ্য করার বিষয় হলো, প্রাচীন কোনো স্কলারের গণনাই রাশাদ খলিফার দাবি করা ৩,২৯,১৫৬ সংখ্যার ধারেকাছেও নেই। এমনকি এই প্রতিটি সংখ্যাই ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়। রাশাদ খলিফা তার গাণিতিক ছক মেলাতে গিয়ে প্রাচীন সকল বিশেষজ্ঞের হিসাবকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের মতো একটি বিশাল সংখ্যা তৈরি করেছেন।
আরবী লিপিশৈলী ও গণনার জটিলতা
বর্ণ গণনার ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় প্রশ্ন হলো—আপনি ঠিক কোন পদ্ধতি অনুসরণ করে বর্ণ গুনছেন? আরবী ভাষা ও লিপিশৈলী (Orthography) সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে।
প্রাচীন কুফি লিপিতে অনেক জায়গায় ‘আলিফ’ লেখা হতো না কিন্তু উচ্চারিত হতো (যেমন: ‘আল-আলামিন’ শব্দে ‘আলাম’ এর আলিফ)। এখন আপনি কি কেবল লিখিত বর্ণ গুনবেন নাকি উচ্চারিত বর্ণও গুনবেন?
আদি কোরআনিক লিপিতে হামজা বা শাদ্দাহর মতো চিহ্ন ছিল না। আধুনিক লিপিতে এগুলোকে বর্ণ হিসেবে গণ্য করা হবে কি না, তা নিয়ে গণনাকারীদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে।
কোরআনের বর্তমান ছাপানো কপিতে ‘ইমলা’ (আধুনিক বানান) এবং ‘রাসম’ (প্রাচীন লিখনরীতি) এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। রাশাদ খলিফা তার সুবিধামতো কখনো একটি পদ্ধতি, আবার কখনো অন্যটি ব্যবহার করেছেন যেন ১৯-এর ভাগফল মিলে যায়।
‘হারিয়ে যাওয়া’ অংশ ও বর্ণ সংখ্যা
ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনা এবং খোদ সহিহ হাদিস থেকেই জানা যায় যে, কোরআনের কিছু অংশ সংকলনের সময় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বা কালক্রমে ‘মানসুখ’ (রহিত) হয়ে গেছে। যেমন, সূরা আহজাব একসময় সূরা বাকারার সমান বড় ছিল বলে হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা পাওয়া যায়। [23] এছাড়াও উবাই ইবনে কাবের মুসহাফে অতিরিক্ত দুটি সূরার অস্তিত্বের কথা জানা যায়। এখন প্রশ্ন হলো, যদি ১৯-এর এই গাণিতিক কোডটিই কোরআনের ঐশ্বরিকত্বের প্রমাণ হয়, তবে এই হারিয়ে যাওয়া বর্ণগুলো ছাড়াই কোডটি কীভাবে মিলছে? তার মানে কি এই তথাকথিত কোডটি কেবল ‘অসম্পূর্ণ’ বা ‘পরিমার্জিত’ একটি পাঠ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি?
রাশাদ খলিফা দাবী করেছেন, কোরআনের মোট বর্ণ সংখ্যা ৩২৯১৫৬, যা ১৯ দিয়ে বিভাজ্য (১৯×১৭৩২৪=৩২৯১৫৬)। কোরআনের মোট বর্ণ সংখ্যা কত, তা নিয়েও রয়েছে বিভিন্ন ইসলামিক স্কলারের বিভিন্ন রকম মতামত বা ধারণা।
- হযরত মুহাম্মদের প্রখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ এর মতে কোরআনের বর্ণের সংখ্যা ৩,২২,৬৭১ টি ( ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয় )
- মোজাহেদ এর মতে, ৩,২১,১২১ টি ( ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয় )
এরকম আরো অনেক মত রয়েছে। আসুন সরাসরি বই থেকেই পড়ি, [24]
বিভিন্ন অক্ষরের সংখ্যা
আলিফ ৪৮৮৭২, বা ১১৪২৮, তা ১১৯৯, ছা, ১২৭৬, জীম ৩২৭৩, হা ৯৭৩, খা, ২৪১৬, দাল ৫৬০২, যাল, ৪৬৭৭, রা, ১১৭৯৩, যা ১৫৯০, সীন ৫৯৯১, শীন ২১১৫, ছোয়াদ ২০১২, দোয়াদ, ১৩০৭, তোয়া ১২৭৭, যোয়া ৮৪২, আঈন ৯২২০, গাঈন ২২০৮, ফা, ৮৪৯৯, ক্বাফ ৬৮১৩, কাফ ৯৫০০, লাম ২৪৩২, মীম ৩৬৫৩৫, নূন ৪০১৯০, ওয়াও ২৫৫৪৬, হা ১৯০৭০, লাম-আলিফ ৩৭৭০, ইয়া ৪৫৯১৯।
সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-ও কোরআনের অক্ষর গণনা করেছেন বলে অনেকে মনে করেন। তাঁর গণনা মতে কোরআনের অক্ষর হচ্ছে ৩,২২,৬৭১। তাবেয়ীদের মাঝে মোজাহেদ (র.)-এর গণনা অনুযায়ী কোরআনের অক্ষর হচ্ছে ৩,২১,১২১। তবে সাধারণভাবে ৩,২০,২৬৭ সংখ্যাটিই বেশী প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।
কোরআনের শব্দ সংখ্যা
সাহাবায়ে কেরামরা তাদের যুগে কোরআনের শব্দ সংখ্যাও নির্ণয় করেছেন। অবশ্য এ সম্পর্কে সরাসরি তাদের সাথে সম্পৃক্ত কোন রেওয়ায়াত পাওয়া যায় না। যা কিছু আছে সবই পরবর্তীকালের। হুমায়দা আযরাজের গণনা অনুযায়ী ৭৬,৪৩০, আবদুল আযীয ইবনে আবদুল্লাহর গণনা মোতাবেক ৭০৪৩৯, মোজাহেদের গণনা মোতাবেক ৭৬২৫০, তবে যে সখ্যাটি সাধারণভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে তা হচ্ছে ৮৬৪৩০।
কোরআনের আয়াত সংখ্যা
হযরত আয়েশা (রা.)-এর মতে ৬৬৬৬, হযরত ওসমান (রা.)-এর মতে ৬২৫০, হযরত আলী (রা.) -এর মতে ৬২৩৬, হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) -এর মতে ৬২১৮, মক্কার গণনা মতে ৬২১২, বসরার গণনা মতে ৬২২৬, ইরাকের গণনা মতে ৬২১৪, ঐতিহাসিকদের মতে হযরত আয়েশার গণনাই বেশী প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। যদিও আমাদের এখানে প্রচলিত কোরআনের নোসফাসমূহ থেকে আয়াতের সংখ্যা গুনলে এ মতের সমর্থন পাওয়া যায় না।

আগ্রহী পাঠকগণের জন্য বলছি, কোরআনে আরো দুইটি সূরা নাজিল হয়েছিল, যা কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। এই বিষয়ে কোরআন সংকলনের ইতিহাস নামক লেখাটিতে সমস্ত তথ্যপ্রমাণ সন্নিবেশিত রয়েছে। রাশাদ খলিফার এই জ্বালিয়াতি আর মিথ্যাচার সম্ভবত সকল সীমাই এখানে অতিক্রম করে ফেলেছে!
গাণিতিক প্রবঞ্চনা: চেরি পিকিং (Cherry Picking)
রাশাদ খলিফা এখানে একটি বিশুদ্ধ ‘ডেটা ম্যানিপুলেশন’ করেছেন। তিনি অসংখ্যবার অক্ষর গণনা করেছেন এবং যখনই দেখেছেন সংখ্যাটি ১৯ দিয়ে বিভাজ্য হচ্ছে না, তখনই তিনি গণনার নিয়ম পরিবর্তন করেছেন। কখনো কোনো নির্দিষ্ট শব্দের ‘আলিফ’ বাদ দিয়েছেন, কখনো বা যুক্তাক্ষরকে ভিন্নভাবে গুনেছেন। এটি বিজ্ঞানের ভাষায় একটি জালিয়াতি, যেখানে ফলাফল আগে থেকেই জানা থাকে এবং সেই অনুযায়ী উপাত্ত বা ডেটা পরিবর্তন করা হয়।
বিশ্লেষণ: রাশাদ খলিফা দাবি করেছিলেন যে কোরআনের একটি বর্ণও এদিক-সেদিক হওয়া অসম্ভব কারণ ১৯ হলো তার প্রহরী। অথচ দেখা যাচ্ছে, তিনি নিজেই সেই ১৯-কে রক্ষা করতে গিয়ে কয়েক হাজার বর্ণের জালিয়াতি করেছেন এবং প্রাচীন সকল নির্ভরযোগ্য ইতিহাসকে অস্বীকার করেছেন। তার দাবি করা ৩,২৯,১৫৬ সংখ্যাটি কোনো ঐশ্বরিক সংখ্যা নয়, বরং ১৯ দ্বারা বিভাজ্য একটি কৃত্রিম গাণিতিক লক্ষ্যমাত্রা মাত্র।
আরো অসংখ্য মিথ্যাচার: আয়াত কর্তন এবং নিজেকে ‘রাসুল’ ঘোষণা
রাশাদ খলিফার ১৯ সংখ্যার তত্ত্বটি যখনই কোনো বড় ধরণের গাণিতিক বাধার সম্মুখীন হয়েছে, তিনি তখন সত্যকে স্বীকার না করে বরং কোরআনের মূল পাঠ্যকেই (Text) পরিবর্তন করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। তার এই জালিয়াতি কেবল সংখ্যাতত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তিনি নিজেকে সরাসরি ‘ঐশ্বরিক দূত’ হিসেবে দাবি করে বসেন।
সূরা তওবার শেষ দুটি আয়াত উধাও করার নেপথ্যে
রাশাদ খলিফার ১৯-এর ছক মেলাতে গিয়ে সবচাইতে বড় হোঁচটটি ছিল সূরা তওবার ১২৮ এবং ১২৯ নম্বর আয়াত। এই দুটি আয়াত কোরআনে থাকলে তার গাণিতিক বিন্যাস সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ত। উদাহরণস্বরূপ:
রাশাদ খলিফা দাবি করেন যে, কোরআনে ‘আল্লাহ’ শব্দটি ২৬৯৮ বার এসেছে, যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য ()। কিন্তু সমস্যা হলো, সূরা তওবার শেষ দুই আয়াত অন্তর্ভুক্ত করলে এই সংখ্যাটি হয় ২৬৯৯, যা ১৯ দ্বারা বিভাজ্য নয়।
পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে যেমন বলা হয়েছে, তার দাবি করা আয়াত সংখ্যা ৬৩৪৬ মেলাতে হলেও এই দুটি আয়াত বাদ দেওয়া আবশ্যিক ছিল。
এই সংকট নিরসনে রাশাদ খলিফা দাবি করেন যে, এই দুটি আয়াত আসলে ‘শয়তানি আয়াত’ (Satanic Verses) এবং এগুলো মুহাম্মদের মৃত্যুর পর তাঁর অতি-উৎসাহী অনুসারীরা তাঁকে অতিমানবিক হিসেবে উপস্থাপনের জন্য যোগ করেছে। [17] অথচ ইতিহাসের সকল প্রাচীন পাণ্ডুলিপি (যেমন: সানআ পাণ্ডুলিপি, তোপকাপি পাণ্ডুলিপি) এবং সাহাবীদের নিরবচ্ছিন্ন বর্ণনায় এই দুটি আয়াতের অস্তিত্ব অকাট্যভাবে প্রমাণিত। ১৯-এর ছক মেলাতে গিয়ে খোদ আল্লাহ’র কিতাব থেকে আয়াত ডিলিট করা ছিল তার জালিয়াতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
অনুবাদের আড়ালে নিজের নাম অন্তর্ভুক্তি
রাশাদ খলিফা কেবল আয়াত মোছেননি, বরং তিনি তাঁর ইংরেজি কোরআন অনুবাদে (The Final Testament) সুকৌশলে নিজের নাম ঢুকিয়ে দিয়ে নিজেকে ‘রাসুল’ হিসেবে দাবি করেছেন। তিনি দাবি করেন যে, তিনি হচ্ছেন সেই ‘চুক্তির বার্তাবাহক’ (Messenger of the Covenant), যার কথা ৩:৮১ আয়াতে বলা হয়েছে।
আসুন তাঁর করা কিছু অনুবাদের নমুনা দেখি:
মূল আরবী আয়াতটি মুহাম্মদের প্রতি উদ্দেশ্য করে নাজিল হলেও রাশাদ খলিফা অনুবাদ করেন— “We have sent you (Rashad) as a deliverer of good news, as well as a warner.” [25]
এখানেও তিনি অনুবাদে নিজের নাম জুড়ে দেন— “Most assuredly, you (Rashad) are one of the messengers.”
ব্রাকেটের ভেতরে নিজের নাম ঢুকিয়ে দিয়ে তিনি সাধারণ পাঠকদের বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, কোরআন আসলে ১৪০০ বছর আগে থেকেই তাঁর আগমনের ভবিষ্যৎবাণী করে রেখেছে। এটি কোনো অনুবাদ নয়, এটি ছিল কোরআনের অর্থের ওপর সরাসরি চৌর্যবৃত্তি।
‘রাসুল’ হিসেবে অফিশিয়াল দম্ভ
রাশাদ খলিফা তাঁর আধ্যাত্মিক উন্মাদনা এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন যে, তিনি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে চিঠি লিখে নিজেকে আল্লাহর রাসুল হিসেবে ঘোষণা করেন এবং তাঁদেরকে তাঁর ১৯-তত্ত্ব মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি তাঁর অফিশিয়াল প্যাডে নিজের নামের নিচে গর্বের সাথে লিখতেন— “Rashad Khalifa, Ph.D., Messenger of God”।
ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী, মুহাম্মদ-কে ‘খাতামুন নাবিয়্যিন’ বা শেষ নবী হিসেবে বিশ্বাস করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিজেকে নবীর সমমর্যাদার বা তাঁর পরবর্তী কোনো রাসুল হিসেবে দাবি করা ইসলামের মূল কাঠামোর সাথে সরাসরি বিদ্রোহ। রাশাদ খলিফা ১৯-এর মোজেজাকে একটি টোপ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন যেন মানুষ তাঁর এই নবুওয়তের দাবিকে অন্ধভাবে গ্রহণ করে।
লজিক্যাল ফ্যালাসি: ‘ফলস ডিসকভারি’ (False Discovery)
রাশাদ খলিফার পুরো প্রসেসটি ছিল ‘টেক্সাস শার্পশুটার ফ্যালাসি’র একটি প্রকট উদাহরণ। তিনি আগে নিজের নাম এবং ১৯ সংখ্যাটিকে কেন্দ্র করে একটি নবুওয়তের ফ্রেম তৈরি করেছিলেন। এরপর সেই ফ্রেমে ফিট করার জন্য কোরআনের যেখানে যেখানে পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল, তিনি সেখানে ছুরি চালিয়েছেন। অর্থাৎ, ১৯ সংখ্যাটি কোরআনকে রক্ষা করেনি, বরং রাশাদ খলিফা ১৯-কে রক্ষা করতে গিয়ে কোরআনের অঙ্গহানি করেছেন।
বিশ্লেষণ: একজন মানুষ যখন নিজের গাণিতিক তত্ত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে ধর্মের পবিত্রতম গ্রন্থ থেকে আয়াত মুছে ফেলেন এবং সেখানে নিজের নাম প্রতিস্থাপন করেন, তখন তার উদ্দেশ্য যে আর ‘গবেষণা’ থাকে না, বরং তা ‘প্রতারণা’য় রূপান্তরিত হয়, তা স্পষ্ট। রাশাদ খলিফা ১৯-এর এই জাদুর খেলা দেখিয়ে আসলে একটি কাল্ট (Cult) তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন তিনি স্বয়ং।
বৈজ্ঞানিক এবং গাণিতিক মানদণ্ডে মিরাকলের গ্রহণযোগ্যতা
রাশাদ খলিফার ১৯-সংখ্যার দাবিসমূহকে বৈজ্ঞানিক এবং গাণিতিক মানদণ্ডে বিশ্লেষণ করলে আরও কিছু গভীর কাঠামোগত ত্রুটি সামনে আসে। নিচে এই তত্ত্বের অসারতা প্রমাণের প্রধান পয়েন্টগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
“Testable Prediction”: গাণিতিক মিরাকলের বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড
একটি গাণিতিক অলৌকিকত্বের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত ছিল “Testable Prediction” বা যাচাইযোগ্য ভবিষ্যৎবাণী। বিজ্ঞানের মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো প্যাটার্নকে তখনই অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত বলা যায়, যখন তা কোনো প্রকার কাটছাঁট ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধরা দেয় এবং যার ফলাফল যেকোনো নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের কাছে একই হয়। রাশাদ খলিফার ১৯-তত্ত্বে এর চরম অভাব লক্ষ্য করা যায়; তিনি কোনো গাণিতিক মানদণ্ড আগে থেকে নির্ধারণ করেননি, বরং তার ফলাফল মেলাতে গিয়ে তিনি বারবার গণনার নিয়ম পরিবর্তন করেছেন । একটি সত্যিকারের ঐশ্বরিক কোড হলে তা কোরআনের যেকোনো নির্ভরযোগ্য পাণ্ডুলিপি বা গণনা পদ্ধতিতে অভিন্ন ফলাফল দিত, কিন্তু খলিফাকে তার তথাকথিত মিরাকল টিকিয়ে রাখতে সূরা তওবার আয়াত পর্যন্ত মুছে ফেলতে হয়েছে । সত্যিকারের বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে একটি কোডকে “Falsifiable” হতে হয়, অর্থাৎ এমন একটি শর্ত থাকতে হয় যা ভুল প্রমাণিত হলে পুরো তত্ত্বটিই বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু খলিফার ক্ষেত্রে দেখা যায়, যখনই কোনো তথ্য ১৯ দ্বারা বিভাজ্য হয়নি, তিনি সেটিকে ‘মানুষের ভুল’ বা ‘জাল আয়াত’ বলে এড়িয়ে গেছেন, যা একে একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের বদলে একটি সুবিধাবাদী মানসিক কাঠামোতে পরিণত করেছে ।
Reproducibility Crisis (পুনরুৎপাদনযোগ্যতা সমস্যা)
বিজ্ঞানের যেকোনো প্রতিষ্ঠিত সত্যের একটি প্রধান শর্ত হলো তার পুনরুৎপাদনযোগ্যতা বা ‘রিপ্রোডাক্টিবিলিটি’। অর্থাৎ, একজন গবেষক যে পদ্ধতিতে পরীক্ষা করে একটি ফলাফল পেয়েছেন, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের অন্য যেকোনো ব্যক্তি একই পদ্ধতি অনুসরণ করলে একই ফলাফল পেতে বাধ্য। রাশাদ খলিফার ১৯-তত্ত্বের ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় সংকট হলো এর প্রমাণের অভাব। খলিফা দাবি করেছিলেন যে তিনি কম্পিউটার ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে অক্ষর গণনা করেছেন, কিন্তু পরবর্তীতে যখন নিরপেক্ষ গবেষক এবং গণিতবিদগণ একই টেক্সট নিয়ে গণনা করতে বসেন, তখন তারা খলিফার দেওয়া সংখ্যার সাথে বাস্তব সংখ্যার বিশাল গরমিল খুঁজে পান। উদাহরণস্বরূপ, সূরা ‘ক্বাফ’-এ ‘ক্বাফ’ অক্ষরের সংখ্যা কিংবা সূরা ‘নুন’-এ ‘নুন’ অক্ষরের গণনা খলিফা যেভাবে ১৯ দ্বারা বিভাজ্য দেখিয়েছেন, সাধারণ গণনায় সেই সংখ্যাটি মেলে না। খলিফা এই অংক মেলাতে গিয়ে কোথাও ‘হামজা’কে ‘আলিফ’ হিসেবে গুনেছেন, আবার কোথাও ‘আলিফ’ থাকা সত্ত্বেও তা এড়িয়ে গেছেন। এই ধরণের পদ্ধতিগত অসংগতি প্রমাণ করে যে ফলাফলটি আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল এবং তথ্যগুলোকে জোর করে সেই ছাঁচে ফেলা হয়েছে। যদি একটি গাণিতিক কোড ব্যক্তিভেদে বা গণনা পদ্ধতিভেদে পরিবর্তিত হয়, তবে তাকে আর ‘ধ্রুব সত্য’ বা ‘অলৌকিক’ বলার কোনো অবকাশ থাকে না। [26]
Textual Variants Problem (সবচেয়ে মারাত্মক সমস্যা)
১৯-তত্ত্বের কফিনে শেষ পেরেকটি হলো কুরআনের পাঠ্যগত বৈচিত্র্য বা ‘টেক্সচুয়াল ভ্যারিয়েন্টস’। রাশাদ খলিফা তাঁর সমস্ত গাণিতিক হিসাব সাজিয়েছিলেন ১৯২৪ সালের কায়রো এডিশনের (হাফস কিরাত) ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো, কুরআনের প্রাচীন পাণ্ডুলিপিগুলোতে (যেমন: সানা পাণ্ডুলিপি বা সমরখন্দ পাণ্ডুলিপি) বানানের ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। প্রাচীন আরবী লিপিতে ‘আলিফ’ বা ‘ওয়াও’-এর মতো অনেক অক্ষর বর্তমানের মতো লিখিত হতো না, বরং সেগুলো উহ্য থাকতো। এমনকি বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত ‘ওয়ারশ’ (Warsh) পঠনশৈলী এবং ‘হাফস’ পঠনশৈলীর মধ্যেও অনেক শব্দের বানানে অক্ষরের সংখ্যার পার্থক্য রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, যদি ১৯-এর এই কোডটি ঐশ্বরিক হয়ে থাকে, তবে সেটি কোন পাণ্ডুলিপি বা কোন পঠনশৈলীর ওপর ভিত্তি করে তৈরি? খলিফা যে আধুনিক ছাপানো কুরআনের ওপর ভিত্তি করে অংক কষেছেন, সেই লিপি ও বানান পদ্ধতিটি মূলত বিংশ শতাব্দীর সংকলকদের একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত মাত্র। পাণ্ডুলিপিভেদে যেখানে বর্ণের সংখ্যাই স্থির নয়, সেখানে বর্ণ গুনে গুনে ১৯-এর অলৌকিকত্ব দাবি করা একটি ঐতিহাসিক এবং ভাষাতাত্ত্বিক মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়। [27]
Multiple Comparisons Problem (স্ট্যাটিস্টিক্যাল আঘাত)
পরিসংখ্যানবিজ্ঞানে একটি সাধারণ সমস্যা হলো ‘মাল্টিপল কম্পারিশন’ বা অনেকগুলো বিষয়ের মধ্যে তুলনা করে কাকতালীয় মিলকে সত্য বলে ধরে নেওয়া। একটি বিশাল ধর্মগ্রন্থ বা ডেটাসেটে হাজার হাজার শব্দ, বর্ণ, এবং গাণিতিক চলক (Variables) থাকে। যখন কেউ কোনো একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা (যেমন ১৯) নিয়ে কোটি কোটি সম্ভাব্য গাণিতিক বিন্যাস বা কম্বিনেশন পরীক্ষা করতে থাকেন, তখন পরিসংখ্যানগতভাবে এটি অবধারিত যে তার মধ্যে কিছু ফলাফল ১৯ দ্বারা বিভাজ্য হবেই। এটি কোনো মিরাকল নয়, বরং বিশুদ্ধ গণিত। রাশাদ খলিফা কোরআনের যেখানেই ১৯ পেয়েছেন, সেটিকে মিরাকল হিসেবে প্রচার করেছেন, কিন্তু যেখানে পাননি (যা সংখ্যার দিক থেকে কয়েক হাজার গুণ বেশি), সেগুলোকে তিনি স্রেফ উপেক্ষা করেছেন। একে বলা হয় ‘ল অব টরচারড ডেটা’—অর্থাৎ উপাত্তকে ততক্ষণ পর্যন্ত নির্যাতন করা যতক্ষণ না সে আপনার মনের মতো ফলাফল স্বীকার করে। পরিসংখ্যানবিদদের মতে, এই ধরণের পদ্ধতিতে যেকোনো বই থেকেই (এমনকি সাধারণ কোনো উপন্যাস বা ডিকশনারি থেকেও) ১৯-এর মিরাকল বের করা সম্ভব, যদি আপনি হাজার হাজার উপায়ে যোগ-বিয়োগ করার সুযোগ পান। [28]
Post-hoc Rationalization (পরে গিয়ে ব্যাখ্যা বানানো)
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মূল নিয়ম হলো প্রথমে একটি হাইপোথিসিস বা তত্ত্ব দাঁড় করানো এবং তারপর তথ্য দিয়ে তা যাচাই করা। কিন্তু রাশাদ খলিফা করেছেন এর সম্পূর্ণ উল্টো—যাকে বলা হয় ‘পোস্ট-হক র্যাশনালাইজেশন’ বা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তার ব্যাখ্যা তৈরি করা। তিনি প্রথমে তথ্য ঘেঁটে ১৯-এর কিছু মিল খুঁজে বের করেছেন এবং তারপর সেই মিলগুলোকে জায়েজ করার জন্য নতুন নতুন সব ‘গাণিতিক নিয়ম’ উদ্ভাবন করেছেন। যখন কোনো শব্দ গণনা ১৯-এর গুণিতক হয়নি, তখন তিনি সেই গণনার নিয়ম বদলে দিয়েছেন (যেমন: কখনো কোনো বিশেষ বর্ণকে ধরেছেন, কখনো ছাড় দিয়েছেন, কখনো বিসমিল্লাহ গুনেছেন, কখনো গুনেননি) যেন ফলাফলটি ১৯ হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি বড় ধরণের জালিয়াতি। তিনি আসলে কোনো গোপন কোড ‘আবিষ্কার’ করেননি, বরং নিজের মনের মতো একটি প্যাটার্ন তৈরি করে সেটিকে জোর করে কোরআনের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। সত্যিকারের গাণিতিক মিরাকল হলে তার নিয়মগুলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অভিন্ন থাকতো, কিন্তু খলিফার ক্ষেত্রে দেখা যায় তিনি প্রতি পদে পদে তার গণনার মাপকাঠি পরিবর্তন করেছেন কেবল ১৯-এর বিভাজ্যতা বজায় রাখার জন্য। [29]
Psychological Reinforcement Loop (বিশ্বাস কীভাবে টিকে থাকে)
কেন মানুষ এই ধরণের অবৈজ্ঞানিক ও গাণিতিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ দাবিতে প্রলুব্ধ হয়, তার উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে । মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘অ্যাপোফেনিয়া’ (Apophenia) বা ‘ক্লাস্টারিং ইলিউশন’, যা মানুষকে অসংলগ্ন বা দৈব তথ্যের মধ্যেও কোনো একটি প্যাটার্ন বা অর্থ খুঁজে পেতে প্ররোচিত করে । এর সাথে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে কাজ করে ‘কনফার্মেশন বায়াস’ (Confirmation Bias) বা নিশ্চিতকরণ পক্ষপাত । এই মানসিক অবস্থায় মানুষ কেবল সেই তথ্যগুলোই গ্রহণ করে যা তার বিশ্বাসের অনুকূলে থাকে এবং বাকি সব বিপরীত তথ্যকে সুকৌশলে এড়িয়ে যায় বা ‘শয়তানি চক্রান্ত’ হিসেবে বর্জন করে ।
রাশাদ খলিফা মানুষের এই মানসিক দুর্বলতাকেই অত্যন্ত চতুরভাবে পুঁজি করেছিলেন; তিনি জানতেন যে অধিকাংশ মুমিন ব্যক্তিই তাঁর দেওয়া বিশাল গাণিতিক সংখ্যাগুলো নিজে গুনে যাচাই করার পরিশ্রম করতে যাবেন না । ফলে এক ধরণের ‘ব্লাইন্ড ট্রাস্ট’ বা অন্ধ আনুগত্য তৈরি হয়। যখনই কোনো নিরপেক্ষ গবেষক বা গণিতবিদ এই তত্ত্বের যৌক্তিক ভুল বা জালিয়াতি ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন এই লুপে থাকা ব্যক্তিরা তাঁকে ‘ঈমানহীন’ বা ‘অন্ধ’ বলে খারিজ করে দেন । এভাবে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার বলয় বা ‘ইকো চেম্বার’ তৈরি হয়, যা ব্যক্তিকে সত্যের মুখোমুখি হতে বাধা দেয় । মূলত সত্যিকারের বিশ্বাস যুক্তি ও প্রমাণের ওপর দাঁড়ায়, সংখ্যার কৃত্রিম জাদুতে নয়; কিন্তু এই ধরণের প্যাটার্ন মানুষের অতিপ্রাকৃত কিছু দেখার আদিম আকাঙ্ক্ষাকে তৃপ্ত করে বলেই তা বছরের পর বছর টিকে থাকে । [30]
উপসংহার: অন্ধবিশ্বাস বনাম গাণিতিক বাস্তবতা
রাশাদ খলিফার ১৯ সংখ্যার গাণিতিক তত্ত্বটি ব্যবচ্ছেদ করলে এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এটি কোনো ‘ঐশ্বরিক মোজেজা’ নয়, বরং একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত গাণিতিক জালিয়াতি (Mathematical Fraud)। তিনি ধর্মের আবেগকে পুঁজি করে এমন একটি গোলকধাঁধা তৈরি করেছিলেন, যেখানে সাধারণ মানুষ তথ্যের গভীরে না গিয়ে কেবল ‘সংখ্যা’ দেখেই বিমোহিত হয়ে পড়ে।
‘টেক্সাস শার্পশুটার’ ও রাশাদ খলিফা
রাশাদ খলিফার পুরো পদ্ধতিটি ছিল ‘টেক্সাস শার্পশুটার ফ্যালাসি’র একটি আদর্শ উদাহরণ। একজন শিকারি যেমন দেয়ালে এলোপাথাড়ি গুলি করার পর যেখানে গুলি লেগেছে তার চারপাশ দিয়ে বৃত্ত এঁকে নিজেকে সেরা লক্ষ্যভেদকারী দাবি করেন, রাশাদ খলিফাও ঠিক তা-ই করেছেন। তিনি আগে থেকেই ‘১৯’ সংখ্যাটিকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন এবং তারপর কোরআনের বিশাল তথ্যভাণ্ডার থেকে কেবল সেই উপাত্তগুলোই (Data) সংগ্রহ করেছেন যা ১৯ দিয়ে বিভাজ্য। আর যেখানে মিল পাওয়া যায়নি, সেখানে তিনি অবলীলায় আয়াত মুছে ফেলা কিংবা বর্ণ গণনার নিয়ম পরিবর্তনের মতো জালিয়াতি করেছেন। [31]
সংখ্যার গোলকধাঁধায় ধর্মের পরাজয়
রাশাদ খলিফার দাবি যদি সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়, তবে ধর্মগ্রন্থ আর কোনো জীবনবিধান থাকে না, বরং তা হয়ে যায় একটি ‘গাণিতিক ধাঁধা’। যদি ১৯ সংখ্যার কোডই কোরআনের সত্যতার একমাত্র গ্যারান্টি হয়, তবে সেই ১৯-কে রক্ষা করতে গিয়ে যখন খোদ কোরআনের আয়াত বিসর্জন দিতে হয়, তখন বুঝতে হবে এই ‘কোড’ আসলে কুরআনকে রক্ষা করছে না, বরং বিকৃত করছে। যারা এই ধরণের সংখ্যাতাত্ত্বিক মিরাকলের পেছনে ছোটেন, তারা অজান্তেই ধর্মের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষাকে অগ্রাহ্য করে একটি অন্তঃসারশূন্য গাণিতিক কাঠামোর উপাসনা শুরু করেন।
বিশ্বাসের মনস্তত্ত্ব ও কুসংস্কার
মানুষ কেন এসব অবৈজ্ঞানিক দাবিতে প্রলুব্ধ হয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের নিশ্চিতকরণ পক্ষপাত (Confirmation Bias)-এর মধ্যে। মানুষ যা বিশ্বাস করতে চায়, তার স্বপক্ষে সামান্য গাণিতিক যুক্তি পেলেই সে বিচার-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। রাশাদ খলিফা মানুষের এই দুর্বলতাকেই ব্যবহার করেছিলেন। তিনি জানতেন যে, অধিকাংশ মুমিন ব্যক্তিই তার দেওয়া সংখ্যাগুলো নিজ হাতে গুনে দেখতে যাবেন না। আর যারা গুনে ভুল ধরবেন, তাদেরকে তিনি ‘ঈমানহীন’ বা ‘অন্ধ’ বলে খারিজ করে দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
চূড়ান্ত মূল্যায়ন
পরিশেষে বলা যায়, রাশাদ খলিফা কোনো গবেষক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন ধুরন্ধর প্রতারক। তিনি ১৯-এর জাদুর কাঠি দিয়ে কোরআনকে বদলে দিতে চেয়েছিলেন এবং নিজেকে নব্য রাসুল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তথ্য ও যুক্তির নিরিখে তাঁর প্রতিটি দাবিই আজ অসার প্রমাণিত। ধর্মকে যুক্তির তুলাদণ্ডে বিচার করলে দেখা যায়, কোনো গ্রন্থের সত্যতা তার গাণিতিক জাদুকরী বিন্যাসের ওপর নয়, বরং তার মানবিক আবেদন ও যৌক্তিক শিক্ষার ওপর নির্ভর করে। রাশাদ খলিফার এই ১৯-এর বুদবুদ আসলে আধুনিক যুগের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। [32]
তথ্যসূত্রঃ
- Rashad Khalifa, “The Computer Speaks: God’s Message to the World” ↩︎
- Rashid Khalifa, “Miracle of the Quran: Significance of the Mysterious Alphabets” ↩︎
- Appendix 2, “Quran: The Final Testament”, Translated by Rashad Khalifa ↩︎
- সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিম-এর কোনো কিতাবুত তাফসীর বা কিতাবুল ফাদাইল-এ এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। ↩︎
- ইবনে কাসীর, তাফসীর আল-কুরআন আল-আজিম, ভূমিকা অংশ। ↩︎
- Livio, Mario. “The Golden Ratio: The Story of Phi, the World’s Most Astonishing Number”. ↩︎
- Panin, Ivan. “The Numeric English New Testament” ↩︎
- God is A Mathematician ↩︎
- Trachtenberg, Joshua. “Jewish Magic and Superstition: A Study in Folk Religion” ↩︎
- McKay, Brendan. “Assessing the Bible Code” ↩︎
- সূরা আল-হাক্বক্বাহ, আয়াত: ১৭ ↩︎
- তাফসীর ইবনে কাসীর, সূরা আল-মুদাচ্ছির অংশ ↩︎
- ইবনে কাসীর, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৪২ ↩︎
- কুরআন ৭৪:৩১ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭৯ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর। ইসলামিক ফাউন্ডেশন। প্রথম খণ্ড। পৃষ্ঠা ১৭৯ ↩︎
- Rashad Khalifa, “Quran: The Final Testament”, Appendix 24 1 2
- তাফসীরে ইবনে কাসীর। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১২, ৫১৩ ↩︎
- সুনানু আবু দাউদ শরীফে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন। প্রথম খণ্ড। পৃষ্ঠা ৪২৭, ৪২৮। হাদিস নম্বর ৭৮৬, ৭৮৭ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর। ইসলামিক ফাউন্ডেশন। চতুর্থ খণ্ড। পৃষ্ঠা ৫১২, ৫১৩ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ভূমিকা অংশ; হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমেদ, কোরআন শরীফ সহজ সরল বাংলা অনুবাদ, পৃষ্ঠা ১২ ↩︎
- প্রাগুক্ত ↩︎
- সহিহ মুসলিম, কিতাবুল রেদা; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৯৩৪ ↩︎
- কোরআন শরীফ, সহজ সরল বাংলা অনুবাদ, পৃষ্ঠা ১২, হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমেদ ↩︎
- Rashad Khalifa, “Sura 25: The Statute Book (Al-Furqan)” ↩︎
- James Bellamy, “The Mysterious Letters of the Koran: Old Abbreviations of the Titles of Suras” ↩︎
- Keith Moore, “The Textual History of the Qur’an” ↩︎
- Persi Diaconis and Frederick Mosteller, “Methods for Studying Coincidences” ↩︎
- Nassim Nicholas Taleb, “Fooled by Randomness: The Hidden Role of Chance in Life and in the Markets” ↩︎
- Shermer, Michael. “The Believing Brain: From Ghosts and Gods to Politics and Conspiracies—How We Construct Beliefs and Reinforce Them as Truths”. ↩︎
- Brendan McKay, “Assessing the Bible Code”, Department of Computer Science, Australian National University ↩︎
- Rashad Khalifa, “The Computer Speaks: God’s Message to the World” – Critical Analysis by various Islamic and Secular scholars ↩︎
