
Table of Contents
ভূমিকা
দার্শনিকরা দীর্ঘদিন ধরে ঈশ্বরের সর্বশক্তিমান হওয়ার ধারণা নিয়ে আলোচনা করে আসছেন। এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সহজ ও সাধারণ প্রশ্ন: “ঈশ্বর কি এমন একটি পাথর তৈরি করতে পারেন যা তিনি নিজেই উত্তোলন করতে পারবেন না?” এই প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে একটি সাধারণ প্রশ্ন মনে হলেও, এর গভীরে রয়েছে এক ধরনের যুক্তিগত দ্বন্দ্ব, যা প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন ধর্মতত্ত্ববিদ ও দার্শনিকদের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এই প্যারাডক্সটি “ঈশ্বরের সর্বশক্তিমত্তা” ধারণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই প্রবন্ধে আমরা সেই প্রশ্নের মূল বিষয়বস্তু এবং এর সমাধানের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করবো। আমরা মূলত থমাস অ্যাকুইনাসের চিন্তাধারা এবং অন্যান্য দার্শনিক ধারণার ভিত্তিতে বিষয়টি আলোচনায় আনবো।
প্যারাডক্স কাকে বলে?
প্যারাডক্সের সঠিক বাংলা হলো “প্রতিকথন” বা “স্ববিরোধ”। এটি এমন একটি ধারণা বা প্রস্তাবনা বোঝায়, যা আপাতদৃষ্টিতে সঠিক মনে হয় কিন্তু গভীরে গেলে একটি অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব বা বিরোধিতা প্রকাশ করে। দার্শনিক প্যারাডক্সগুলো প্রায়ই গভীর চিন্তার উদ্রেক করে এবং অনেক সময় বাস্তবতাকে নতুন আলোকে দেখতে বাধ্য করে। প্যারাডক্সগুলোকে ব্যবহার করা হয় দর্শনের জগতে বিভিন্ন প্রস্তাবনার সত্যতা বা মিথ্যাতা যাচাইয়ের জন্য। প্যারাডক্স সাধারণ চিন্তায় ব্যবহৃত নিয়ম ও ধারণাগুলোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে এবং এই সীমাবদ্ধতাগুলো আমাদের দার্শনিক বিশ্লেষণের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
ঈশ্বরের পাথর প্যারাডক্সঃ সমস্যা এবং বিশ্লেষণ
ঈশ্বরের সর্বশক্তিমত্তার ধারণাকে যাচাই করতে এই প্রশ্নটি অত্যন্ত কার্যকর। প্রশ্নটি মূলত এইভাবে উত্থাপিত হয়: যদি ঈশ্বর সর্বশক্তিমান হন, তবে কি তিনি এমন একটি পাথর তৈরি করতে পারেন যা তিনি নিজেই উত্তোলন করতে পারবেন না? এই প্যারাডক্সটি দুই ধরনের ফলাফলের দিকে নিয়ে যায়, এবং উভয় ক্ষেত্রেই ঈশ্বরের সর্বশক্তিমান হওয়ার ধারণাটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
- প্রস্তাবনাঃ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ঈশ্বর সর্বশক্তিমান।
- সিদ্ধান্তঃ তিনি “সবকিছু” করতে পারেন।
- সিদ্ধান্তটি ঠিক নাকি বেঠিক তার পরীক্ষার জন্য প্যারাডক্সঃ তিনি কি এমন একটি ভারী পাথর সৃষ্টি করতে পারবেন, যেই পাথরটি এত ভারী হবে যে, তিনি নিজেই সেটি উত্তোলন করতে পারবেন না?
- উত্তরঃ হ্যাঁ, সৃষ্টি করতে পারবেন। তবে সেই পাথরটি সৃষ্টি করতে পারলে, তিনি সেটি উত্তোলন করতে পারবেন না। অর্থাৎ তার ক্ষমতার সীমা তৈরি হয়ে গেল, অর্থাৎ তিনি সর্বশক্তিমান নন। মূল প্রস্তাবনাটি এখানে ভুল প্রমাণ হল।
- উত্তরঃ না, সৃষ্টি করতে পারবেন না। সেটি না পারলে তার অক্ষমতা প্রমাণ হয়ে গেল যে, কিছু কাজ আছে যা তিনি পারেন না। অর্থাৎ তিনি সব পারেন না। অর্থাৎ মূল প্রস্তাবনাটি ভুল প্রমাণ হল।
এই প্রশ্নটি ঈশ্বরের ক্ষমতার একটি সীমা তৈরি করে। যদি ঈশ্বর এমন একটি পাথর তৈরি করতে না পারেন যা তিনি নিজেই উত্তোলন করতে পারবেন না, তাহলে তিনি সর্বশক্তিমান নন। আবার, যদি তিনি সেই পাথর তৈরি করেন এবং তা উত্তোলন করতে না পারেন, তাহলে তিনি তখনও সর্বশক্তিমান নন। এই দ্বন্দ্বই প্যারাডক্সের মূল কারণ।
ঈশ্বরের ক্ষমতার প্রকৃতি

এই প্যারাডক্সের মূল প্রশ্নটি আসলে ঈশ্বরের ক্ষমতার প্রকৃতি সম্পর্কে। ঈশ্বর সর্বশক্তিমান হলে তার ক্ষমতার কোনও সীমা থাকা যৌক্তিক নয়। কিন্তু, এই প্যারাডক্সটি সেই ধারণাটিকে চ্যালেঞ্জ করে। ঈশ্বর যদি সত্যিকার অর্থে সর্বশক্তিমান হন, তবে তার ক্ষমতার কোনো যৌক্তিক বা লজিক্যাল সীমা থাকা অসম্ভব। তবে, একটি প্রশ্ন থেকে যায়: সব ধরনের কাজ কি করা সম্ভব? যেমন, যুক্তিগতভাবে অসম্ভব কিছু কি আদৌ সম্ভব? সেটি না হলে, ঈশ্বর কি যুক্তির নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ? অর্থাৎ ঈশ্বর কী প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন, নাকি প্রাকৃতিক নিয়ম তার অধীন?
কিছু দার্শনিক মনে করেন যে, যুক্তিগতভাবে অসম্ভব কিছু ঈশ্বরের ক্ষমতার বাইরে। অর্থাৎ ঈশ্বর যুক্তির অধীন। যেমন, একটি গোলককে একই সময়ে চতুর্ভুজ করা সম্ভব নয়। একইভাবে, একটি পাথরকে ঈশ্বরের উত্তোলন ক্ষমতার বাইরে হওয়া একটি স্ববিরোধী ধারণা তৈরি করা, যা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, ঈশ্বর এমন একটি কাজ করতে পারেন না যা স্ববিরোধী বা যুক্তিগতভাবে অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে দেখা যায়, ঈশ্বরের ক্ষমতা যুক্তির নিয়মের অধীনে থাকে। প্রখ্যাত দার্শনিক এবং ধর্মতত্ত্ববিদ থমাস অ্যাকুইনাস তার “Summa Theologica” গ্রন্থে ঈশ্বরের সর্বশক্তিমান ধারণার সীমা নির্ধারণ করেছেন। তার মতে, ঈশ্বর এমন কিছু করতে পারেন না, যা তার নিজের প্রকৃতির বিরোধী, যেমন মিথ্যা বলা বা নিজেকে অস্বীকার করা বা নিজেকে হত্যা করা। [1]
থমাস অ্যাকুইনাসের দৃষ্টিভঙ্গি
থমাস অ্যাকুইনাসের মতে, ঈশ্বর সর্বশক্তিমান হলেও তিনি যুক্তিসঙ্গত নিয়মের বাইরে কিছু করতে পারেন না। অ্যাকুইনাস যুক্তি দেন যে, ঈশ্বরের ক্ষমতা শুধুমাত্র যুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তিনি যুক্তির নিয়মগুলোকে সম্মান করেন। তিনি বলেছেন, “যে কোনো সত্তা যা তার নিজের সত্তার বিরুদ্ধে যায়, সেটি ঈশ্বরের ক্ষমতার বাইরে।”
অ্যাকুইনাসের মতে, ঈশ্বরের ক্ষমতার একটি সীমা রয়েছে, যা যুক্তির অধীনে থাকে। তিনি আরও যুক্তি দেন যে, ঈশ্বরের ক্ষমতা তার প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। সুতরাং, যদি ঈশ্বর এমন একটি পাথর তৈরি করেন যা তিনি উত্তোলন করতে পারেন না, তাহলে সেই কাজটি ঈশ্বরের প্রকৃতির সঙ্গে বা প্রাকৃতিক নিয়মকানুনের সাথে সাংঘর্ষিক হবে।
ঈশ্বরের সর্বশক্তিমত্তা এবং যুক্তি
আস্তিকদের বর্তমান সময়ের একটি দাবী হচ্ছে, সর্বশক্তিমান হওয়ার ধারণাটি এই প্যারাডক্সে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সর্বশক্তিমান হওয়া বা সব করতে পারা মানে অযৌক্তিক বা যুক্তিসংগতভাবে অসম্ভব কাজ করতে পারা নয়। এক্ষেত্রে যুক্তি, প্রাকৃতিক নিয়মাবলী এবং বাস্তবতার ভিত্তিতে ঈশ্বরের ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারিত হয়। যেমন, ঈশ্বর একটি চতুর্ভুজাকৃতি বৃত্ত তৈরি করতে পারবেন না, কারণ এটি যুক্তিগতভাবে অসম্ভব এবং প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে। একইভাবে, “ঈশ্বরের উত্তোলন ক্ষমতার বাইরে একটি পাথর তৈরি” করা যুক্তিগতভাবে অসম্ভব এবং প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে।
ঈশ্বরের সার্বভৌমত্বঃ যুক্তি বনাম ক্ষমতা
অন্যভাবে বলতে গেলে, এই প্যারাডক্সটি ঈশ্বরের প্রকৃতি সম্পর্কে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। ঈশ্বরের ক্ষমতা যুক্তির ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব ঈশ্বরের নয়, যুক্তির। ঈশ্বর যদি থেকে থাকেন, তিনিও যুক্তি বা নিয়মের অধীন এবং তাকেও প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। এই প্যারাডক্সটি আসলে ঈশ্বরের প্রকৃতির বিষয়ে একটি ভুল দাবীকে খণ্ডন করে। সর্বশক্তিমান বা যা খুশি তাই করতে পারা যৌক্তিকভাবে অসম্ভব, এমনকি ঈশ্বর থাকলে তার জন্যেও অসম্ভব।
আধুনিক সমালোচনা ও তার খণ্ডন
ঈশ্বরের পাথর উত্তোলন প্যারাডক্স (ওমনিপটেন্স প্যারাডক্স) নিয়ে আধুনিক দার্শনিক আলোচনায় বিভিন্ন সমালোচনা উঠেছে, যা মূলত এই প্যারাডক্সকে শক্তিশালী করে এবং দেখায় যে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ধারণা যৌক্তিকভাবে অসংগত বা অসম্ভব। এই সমালোচনাগুলো অ্যাথিস্ট বা যৌক্তিক সংশয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আসে, যেমন গ্রাহাম ওপি, ওয়েস মরিস্টন বা রিচার্ড ডকিন্সের মতো চিন্তাবিদদের কাজে। এরা যুক্তি দেন যে প্যারাডক্সটি শুধু একটি ভাষাগত খেলা নয়, বরং ওমনিপটেন্সের মূল সংজ্ঞার অসংগতি প্রকাশ করে, যা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে যৌক্তিকভাবে অসম্ভব করে তোলে। নীচে প্রধান আধুনিক সমালোচনাগুলো বর্ণনা করা হলো, সাথে আস্তিকদের (থিস্টদের) খণ্ডন প্রচেষ্টাগুলোর যৌক্তিক দুর্বলতা বা খণ্ডন। এই অংশটি প্যারাডক্সের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে, যাতে দেখানো যায় যে আস্তিক খণ্ডনগুলো অপর্যাপ্ত এবং প্যারাডক্সটি অটুট থাকে।
লজিকের অধীনতা (Logical Subordination Critique)
আধুনিক নাস্তিক সমালোচকরা, যেমন গ্রাহাম ওপি বা মাইকেল রিন, যুক্তি দেন যে, যদি ঈশ্বর যুক্তি বা লজিকের অধীন হন, তাহলে তিনি সত্যিকারের সর্বশক্তিমান নন—কারণ লজিক তাঁর ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে। এটি প্যারাডক্সকে শক্তিশালী করে, কারণ ওমনিপটেন্সের সংজ্ঞা “সবকিছু করতে পারা” হলে লজিকের সীমা (যেমন অসম্ভব কাজ বাদ দেওয়া) এটিকে অসংগত করে তোলে। রেনে ডেকার্টের মতো যারা বলেন ঈশ্বর লজিকের উপরে, তারাও স্ববিরোধিতায় পড়েন, কারণ তাহলে ঈশ্বর অসম্ভব কাজ (যেমন স্কোয়ার সার্কেল) করতে পারেন, যা লজিকের ভিত্তি ভেঙে দেয়। এই সমালোচনা দেখায় যে, ওমনিপটেন্স যৌক্তিকভাবে অসম্ভব, কারণ এটি লজিককে হয় সীমাবদ্ধ করে (অর্থাৎ ঈশ্বর লজিকের দাস, বা ঈশ্বরের সার্বোভৌমত্ব খণ্ডিত হয়ে তা যুক্তি বা লজিকের নিয়ম মানতে বাধ্য) অথবা ভেঙে দেয় (অর্থাৎ সবকিছু অসংগত হয়ে যায়)।
থিস্টিক খণ্ডনের সমালোচনা: থমাস অ্যাকুইনাসের মতো আস্তিকরা বলেন যে ওমনিপটেন্স “যুক্তিগতভাবে সম্ভব সবকিছু করা”, তাই অসম্ভব কাজ (যেমন পাথর উত্তোলনের প্যারাডক্স) বাদ যায়। কিন্তু এই খণ্ডন সমালোচিত হয় কারণ এটি কোয়েশ্চন-বেগিং: এতে ওমনিপটেন্সকে পুনর্ব্যাখ্যা করে লিমিট করা হয়, যা সত্যিকারের “সর্বশক্তি” নয়। ওয়েস মরিস্টনের মতো সমালোচকরা বলেন যে এতে ঈশ্বরের ক্ষমতা লজিকের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা ঈশ্বরের সার্বভৌমত্বের সাথে বিরোধী এবং প্যারাডক্সকে এড়াতে পারে না—বরং এটি স্বীকার করে যে ওমনিপটেন্স অসংগত। উইলিয়াম লেন ক্রেইগের মতো যারা বলেন লজিক ঈশ্বরের মনে নিহিত, তারাও ব্যর্থ হন কারণ এতে বোঝা যায় ঈশ্বর লজিককে পরিবর্তন করতে পারেন না, যা প্যারাডক্সকে অটুট রাখে।
সেল্ফ-রেফারেন্সিয়াল সমস্যা (Self-Referential Paradox)
এই সমালোচনায় আধুনিক নাস্তিকরা, যেমন নেলসন পাইক বা ফিলোসফি স্ট্যাক এক্সচেঞ্জের আলোচকরা যুক্তি দেন যে, প্যারাডক্সটি সেল্ফ-রেফারেন্সিয়াল, অর্থাৎ এটি নিজের মধ্যে স্ববিরোধী এবং ওমনিপটেন্সের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ করে। উদাহরণ: ঈশ্বর যদি পাথর তৈরি করেন, তাহলে উত্তোলন না করতে পারা দুর্বলতা; না করলে তৈরির অক্ষমতা। এটি শুধু পাথর নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রসারিত—যেমন অতীত পরিবর্তন (যেমন একটি বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার সময় পরিবর্তন) বা অন্যের ফ্রি উইল নিয়ন্ত্রণ (যেমন প্লেটোকে একটি ডায়ালগ লিখতে বাধ্য করা ছাড়াই)। এই সমালোচনা দেখায় যে ওমনিপটেন্স যৌক্তিকভাবে অসম্ভব, কারণ এটি স্ববিরোধিতা সৃষ্টি করে এবং সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অসম্ভব করে তোলে।
থিস্টিক খণ্ডনের সমালোচনা: অ্যালভিন প্লান্টিঙ্গা বলেন, সর্বশক্তিমানত্ব মানে “মূলত সর্বশক্তিমান”—যেখানে অসম্ভব কাজগুলো কোনো ক্ষমতার অংশ নয়। আর মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার জন্য ঈশ্বর মন্দকে অনুমতি দেন। কিন্তু সমালোচকরা বলেন এটি ব্যর্থ যুক্তি কারণ এতে ঈশ্বর সবকিছু করতে পারেন না (যেমন ফ্রি উইলকে অগ্রাহ্য করে মন্দ প্রতিরোধ করা), যা একটি “রাইভাল এজেন্ট” (যেমন পাপী মানুষ) কে ঈশ্বরের ইচ্ছার চাইতে চেয়ে শক্তিশালী করে তোলে। একে মেনে নিলে তা ঈশ্বরের সার্বোভৌমত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে। জর্জ মাভ্রোডেস বা সি.এস. লুইসের মতো যারা বলেন এটি “ননসেন্স” প্রশ্ন, তারাও সমালোচিত হন কারণ এটি প্যারাডক্সকে এড়িয়ে যায় না—বরং স্বীকার করে যে ওমনিপটেন্স সীমিত, যা ঈশ্বরের ধারণাকে অসংগত করে। এভাবে প্যারাডক্স অটুট থাকে।
প্যারাকনসিস্টেন্ট লজিক (Paraconsistent Logic Resolution)
আধুনিক সমালোচকরা, যেমন আর্ল কোনি বা অন্যান্য যুক্তিবাদীগণ, প্যারাকনসিস্টেন্ট লজিকের মাধ্যমে যুক্তি দেন যে, যদি স্ববিরোধিতা (contradictions) অনুমোদিত হয়, তাহলে ঈশ্বর অসম্ভব কাজ করতে পারেন—কিন্তু এটি আসলে প্যারাডক্সকে শক্তিশালী করে, কারণ এই লজিকে সবকিছু (যেমন ট্রু কনট্রাডিকশন) গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়, যা যুক্তির ভিত্তি ভেঙে দেয়। নাস্তিকরা বলেন এটি ওমনিপটেন্সকে আরও অসংগত করে, কারণ যুক্তিতে এই প্যারাডক্সটি একটি অসম্ভবতা প্রমাণ করে।
থিস্টিক খণ্ডনের সমালোচনা: কিছু আস্তিকরা এই লজিককে গ্রহণ করেন যাতে ঈশ্বর স্ববিরোধিতা করতে পারেন, কিন্তু অধিকাংশ দার্শনিক (যেমন হফম্যান এবং রোজেনক্রান্টজ) এটিকে প্রত্যাখ্যান করেন কারণ এতে “এক্সপ্লোশন প্রিন্সিপল” সৃষ্টি হয় (যেকোনো স্ববিরোধিতা থেকে সবকিছু প্রমাণিত)। সমালোচকরা বলেন এই খণ্ডন ব্যর্থ কারণ এটি লজিককে অর্থহীন করে, এবং লুডভিগ উইটগেনস্টাইনের মতো চিন্তাবিদরা বলেন যে, এমন প্রশ্ন ভাষার সীমায় অর্থহীন, তাই প্যারাকনসিস্টেন্ট লজিকের দরকার নেই—বরং এটি প্যারাডক্সের যৌক্তিক অসম্ভবতা নিশ্চিত করে।
উপসংহার
ঈশ্বরের পাথর উত্তোলন প্যারাডক্সটি দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে আস্তিক বা ঈশ্বরে বিশ্বাসীদের জন্য একটি মস্তবড় চ্যালেঞ্জ। যুগযুগ ধরে ধার্মিকগণ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন, উত্তর দিতে না পেরে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রশ্ন কর্তাকে আক্রমণ করেছেন, ভয় দেখিয়েছেন, অভিশাপ দিয়েছেন। সেগুলো করা সম্ভব না হলে দার্শনিকদের অপমান অপদস্থ করতে চেয়েছেন। কিন্তু উত্তর দিতে পারেননি। পরে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, ঈশ্বরের সর্বশক্তিমান ধারণা মানে তিনি সবকিছু নয়, যুক্তিসঙ্গত কিছু। সেসব তিনি করতে পারেন যা যুক্তিসংগত এবং বাস্তবসম্মত, অর্থাৎ ঈশ্বরকেও পদার্থবিজ্ঞানের বা প্রকৃতির নিয়মের মধ্যেই থাকতে হয়। এই প্যারাডক্স আমাদের চিন্তা করতে শেখায় এবং ক্রিটিকাল থিঙ্কিং এর পথ উন্মুক্ত করে। তাই এরকম যৌক্তিক প্রশ্ন মানুষের মনে আসা এবং তা নিয়ে চিন্তা করা খুবই জরুরি।
তথ্যসূত্রঃ
- Aquinas, T. 1265-1274, Summa Theologica ↩︎
