কোরআনের আয়াত স্মরণের ঐশ্বরিক গ্যারান্টি এবং নবীর আয়াত ভুলে যাওয়া

ভূমিকা

ওহী বা ঐশ্বরিক বাণীর নির্ভুল সংরক্ষণ ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস। ধর্মতাত্ত্বিক দাবি অনুযায়ী, কোরআন কেবল শব্দগতভাবেই অপরিবর্তনীয় নয়, বরং এটি নবীর স্মৃতিতেও অলৌকিকভাবে সংরক্ষিত ছিল। কোরআনের সূরা আল-আলায় আল্লাহ সরাসরি ঘোষণা করেছেন, “আমি তোমাকে পড়িয়ে দেব, যার ফলে তুমি ভুলে যাবে না”। এই আয়াতের মাধ্যমে একটি ‘ডিভাইন গ্যারান্টি’ বা ঐশ্বরিক নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে যে, বাণীর গ্রাহক (মুহাম্মদ) কোনোভাবেই তা বিস্মৃত হবেন না।

তবে ইসলামের প্রধান উৎসসমূহ—বিশেষ করে সহিহ হাদিস এবং তাফসীর গ্রন্থগুলো বিশ্লেষণ করলে এই দাবির বিপরীতে এক ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। সেখানে দেখা যায়, মুহাম্মদ বারবার আয়াতের অংশবিশেষ ভুলে যেতেন এবং অন্য কারো পাঠ শুনে তা পুনরায় মনে করতেন। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে স্মৃতিভ্রম হওয়া স্বাভাবিক হলেও, যখন খোদ ঈশ্বরের পক্ষ থেকে ‘ভুলে না যাওয়ার’ প্রতিশ্রুতি থাকে, তখন এই বিস্মৃতি একটি গভীর তাত্ত্বিক ও যৌক্তিক সংকট তৈরি করে।

এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো, ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতির সাথে নবীর মানবিক সীমাবদ্ধতার এই দ্বন্দ্বকে একটি যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করা। আমরা দেখার চেষ্টা করবো, কেন এবং কীভাবে এই বিস্মৃতির দায়ভার ব্যক্তিগত স্তর থেকে সরিয়ে পুনরায় ‘ঐশ্বরিক ইচ্ছার’ ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এটি ওহীর বিশুদ্ধতার দাবিকে কতটা প্রশ্নবিদ্ধ করে।


ঐশ্বরিক গ্যারান্টি ও ওহীর বিস্মৃতি

আল্লাহ পাক ওহী নাজিলের সময় মুহাম্মদকে ভালভাবে আয়াতগুলো পড়িয়ে দিতেন, যেন মুহাম্মদ আবার সেগুলো ভুলে না যায়। কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহই নাকি এমনভাবে মুহাম্মদকে পড়িয়ে দিয়েছে, যেন সে ভুলে না যায়। অর্থাৎ আল্লাহই সেই দায়িত্ব নিয়েছে। আসুন কোরআন থেকে এটি জেনে নিই, [1]

আমি তোমাকে পড়িয়ে দেব, যার ফলে তুমি ভুলে যাবে না
— Taisirul Quran
অচিরেই আমি তোমাকে পাঠ করাব, ফলে তুমি বিস্মৃত হবেনা
— Sheikh Mujibur Rahman
আমি তোমাকে পড়িয়ে দেব অতঃপর তুমি ভুলবে না
— Rawai Al-bayan
শীঘ্রই আমরা আপনাকে পাঠ করাব, ফলে আপনি ভুলবেন না [১] ,
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

আশ্চর্যের বিষয় হলো, আল্লাহ স্বয়ং কোরআনে স্বীকার করছেন যে তিনি আয়াত রহিত করেন বা মানুষকে ভুলিয়ে দেন। কোরআনে বলা আছে, [2] [3]

আমি কোন আয়াত রহিত করলে কিংবা ভুলিয়ে দিলে, তাত্থেকে উত্তম কিংবা তারই মত আয়াত নিয়ে আসি, তুমি কি জান না যে, আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর উপর ক্ষমতাবান।
— Taisirul Quran
আমি কোন আয়াতের হুকুম রহিত করলে কিংবা আয়াতটিকে বিস্মৃত করিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা তদনুরূপ আয়াত আনয়ন করি। তুমি কি জাননা যে, আল্লাহ সর্ব বিষয়ের উপরই ক্ষমতাবান?
— Sheikh Mujibur Rahman
আমি যে আয়াত রহিত করি কিংবা ভুলিয়ে দেই, তার চেয়ে উত্তম কিংবা তার মত আনয়ন করি। তুমি কি জান না যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।
— Rawai Al-bayan
আমরা কোনো আয়াত রহিত করলে বা ভুলিয়ে দিলে তা থেকে উত্তম অথবা তার সমান কোনো আয়াত এনে দেই [১] আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ্‌ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

আমি যখন এক আয়াতের বদলে অন্য আয়াত নাযিল করি- আর আল্লাহ ভালভাবেই জানেন, যা তিনি নাযিল করেন– তখন এই লোকেরা বলে, ‘তুমি তো মিথ্যা রচনাকারী।’ প্রকৃত ব্যাপার এই যে, এ সম্পর্কে তাদের অধিকাংশেরই কোন জ্ঞান নেই।
— Taisirul Quran
আমি যখন এক আয়াতের পরিবর্তে অন্য এক আয়াত উপস্থিত করি, আর আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেন তা তিনিই ভাল জানেন, তখন তারা বলেঃ তুমিতো শুধু মিথ্যা উদ্ভাবনকারী, কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানেনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর যখন আমি একটি আয়াতের স্থানে পরিবর্তন করে আরেকটি আয়াত দেই- আল্লাহ ভাল জানেন সে সম্পর্কে, যা তিনি নাযিল করেন– তখন তারা বলে, তুমি তো কেবল মিথ্যা রটনাকারী; রবং তাদের অধিকাংশই জানে না।
— Rawai Al-bayan
আর যখন আমরা এক আয়াতের স্থান পরিবর্তন করে অন্য আয়াত দেই— আর আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন যা তিনি নাযিল করবেন সে সম্পর্কে— , তখন তারা বলে, ‘আপনি তো শুধু মিথ্যা রটনাকারী’, বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

অর্থাৎ পুরো বিষয়টি যেরকম দাঁড়াচ্ছে,

VS
অপরিবর্তনীয় সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি

আল্লাহ পাক ওহী নাজিলের সময় মুহাম্মদকে বিশেষভাবে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, তিনি তাঁকে এমনভাবে পাঠ করাবেন যেন তিনি কখনো ভুলে না যান। এখানে ওহী সংরক্ষণের পূর্ণ দায়ভার স্রষ্টা নিজেই গ্রহণ করেছেন।

“আমি তোমাকে পড়িয়ে দেব, যার ফলে তুমি ভুলে যাবে না।” “অচিরেই আমি তোমাকে পাঠ করাব, ফলে তুমি বিস্মৃত হবে না।”

এই ঘোষণাটি ওহীর অলঙ্ঘনীয়তা এবং অতিমানবিক স্মৃতির একটি শাশ্বত গ্যারান্টি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

সূরা আল-আলা, আয়াত: ৬
রহিতকরণ ও বিস্মৃতির বাস্তবতা

আশ্চর্যের বিষয় হলো, অন্য আয়াতে আল্লাহ নিজেই স্বীকার করছেন যে তিনি প্রয়োজনে আয়াত রহিত করেন অথবা মানুষকে ভুলিয়ে দেন। অর্থাৎ পূর্বের ‘না ভোলার’ প্রতিশ্রুতি এখানে সরাসরি লঙ্ঘিত হচ্ছে।

“আমি যে আয়াত রহিত করি কিংবা ভুলিয়ে দেই, তার চেয়ে উত্তম কিংবা তার মত আনয়ন করি।” “যখন আমি এক আয়াতের বদলে অন্য আয়াত নাযিল করি—তখন তারা বলে, তুমি তো মিথ্যা রচনাকারী।”

এই ‘ভুলিয়ে দেওয়া’ বা ‘পরিবর্তন করা’ নির্দেশ করে যে, ওহী কোনো স্থির বা শাশ্বত পরিকল্পনা নয়, বরং এটি একটি প্রক্রিয়াগত বিবর্তন বা পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া।

সূরা বাকারা: ১০৬, সূরা নাহল: ১০১

ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তব প্রয়োগ: বিস্মৃতির প্রামাণিক দলিল

কোরআনের সূরা আল-আলায় দেওয়া অলৌকিক নিশ্চয়তার বিপরীতে ইসলামের নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থগুলো নবীর স্মৃতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে এক ভিন্ন বাস্তবতাকে তুলে ধরে। সহিহ বুখারীতে বর্ণিত একটি ঘটনায় দেখা যায়, মুহাম্মদ মসজিদে জনৈক ব্যক্তিকে কোরআন তিলাওয়াত করতে শুনে মন্তব্য করেন, “আল্লাহ তার ওপর রহমত করুন, সে আমাকে অমুক অমুক আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যা আমি অমুক অমুক সূরা থেকে ভুলে গিয়েছিলাম” [4]। এই বর্ণনাটি কেবল একটি সাধারণ স্মৃতিভ্রমের ঘটনা নয়, বরং এটি ওহীর সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার ওপর একটি গুরুতর যৌক্তিক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।

যদি ওহীর শিক্ষক খোদ আল্লাহ হন এবং তিনি ‘ভুলে না যাওয়ার’ গ্যারান্টি প্রদান করেন, তবে একজন সাধারণ মানুষের পাঠ শুনে নবীর স্মৃতি ফিরে পাওয়া আল্লাহর সেই প্রতিশ্রুতির কার্যকারিতা নিয়েই সংশয় তৈরি করে। তাত্ত্বিকভাবে, একজন সর্বশক্তিমান সত্তার পাঠদান পদ্ধতি ত্রুটিমুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু নবীর এই বিস্মৃতি নির্দেশ করে যে, ওহী গ্রহণের প্রক্রিয়াটি অলৌকিক কোনো সুরক্ষা বলয় দ্বারা আবৃত ছিল না, বরং তা ছিল সম্পূর্ণ মানবিক এবং স্মৃতিশক্তির সাধারণ নিয়মের অধীন। এই বৈপরীত্যটি প্রমাণ করে যে, হয় কোরআনের দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতিটি অলঙ্কারিক ছিল, অথবা নবীর স্মৃতিশক্তি ওহী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ছিল না—যা শেষ পর্যন্ত ঐশ্বরিক বাণীর অলঙ্ঘনীয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

আসুন গুরুত্বপূর্ণ হাদিসটি পড়ি, [5] [6]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
অধ্যায়ঃ ৬৭/ দু’আ
পরিচ্ছেদঃ ২৬৩২. আল্লাহ তা’আলার বাণীঃ তুমি দু’আ করবে …. (৯ঃ ১০৩) আর যিনি নিজেকে বাদ দিয়ে কেবল নিজের ভাই এর জন্য দু’আ করেন। আবূ মূসা (রাঃ) বলেন, নাবী (সাঃ) দু‘আ করেন, ইয়া আল্লাহ! আপনি ‘উবায়দ আবূ আমিরকে মাফ করুন। হে আল্লাহ! আপনি ‘আবদুল্লাহ ইবনু কায়সের গুনাহ মাফ করে দিন।
৫৮৯৬। উসমান ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যাক্তিকে মসজিদে কুরআন তিলাওয়াত করতে বললেন। তখন তিনি বললেনঃ আল্লাহ তার উপর রহমত করুন। সে আমাকে অমুক অমুক আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যা আমি অমুক অমুক সূরা থেকে ভুলে গিয়েছিলাম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
Narrated `Aisha:
The Prophet (ﷺ) heard a man reciting (the Qur’an) in the mosque. He said,” May Allah bestow His Mercy on him, as he made me remember such and-such Verse which I had missed in such-and-such Sura.

মুহাম্মদ কোরআন ভুলে যেতেন

বিস্মৃতির দায়ভার: ব্যক্তিগত ভুল বনাম ঐশ্বরিক নির্ধারণ

নবী মুহাম্মদের এই বিস্মৃতি যখন স্পষ্ট হয়ে ধরা দিচ্ছিল, তখন এই মানবিক সীমাবদ্ধতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য একটি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করা হয়। সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় দেখা যায়, মুহাম্মদ তার অনুসারীদের নির্দেশ দিচ্ছেন যেন তারা ‘ভুলে গিয়েছি’ বলার পরিবর্তে ‘আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করে। সত্যিকার অর্থে, নবী মুহাম্মদ আয়াত ভুলে যাওয়ার বিষয়টি খুব সুন্দরভাবে আল্লাহর কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছেন [7] [8]

সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৭। কুরআনের মর্যাদাসমূহ ও এতদসংশ্লিষ্ট বিষয়
পরিচ্ছদঃ ১. কুরআন সংরক্ষণে যত্নবান হওয়ার নির্দেশ, অমুক আয়াত ভুল গিয়েছি বলার অপছন্দনীয়তা ও আমাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে বলার বৈধতা প্রসঙ্গে
১৭২৭-(২২৯/…) ইবনু নুমায়র এবং ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) (শব্দাবলী তার) …. শাকীক (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) বলেছেনঃ এই পবিত্র গ্রন্থের আবার কখনো বলেছেন এ কুরআনের রক্ষণাবেক্ষণ কর। কেননা মানুষের মন থেকে তা এক পা বাঁধা চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও (অধিক বেগে) পলায়নপর। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) আরো বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন তোমরা কেউ যেন এ কথা না বলে যে, আমি (কুরআন মাজীদের) অমুক অমুক আয়াত ভুলে গিয়েছি। বরং তার থেকে আয়াতগুলো বিস্মৃত হয়ে গিয়েছে (এরূপ বলা উত্তম)। (ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৭১২, ইসলামীক সেন্টার ১৭১৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৭। কুরআনের মর্যাদাসমূহ ও এতদসংশ্লিষ্ট বিষয়
পরিচ্ছদঃ ১. কুরআন সংরক্ষণে যত্নবান হওয়ার নির্দেশ, অমুক আয়াত ভুল গিয়েছি বলার অপছন্দনীয়তা ও আমাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে বলার বৈধতা প্রসঙ্গে
১৭২৮-(২৩০/…) মুহাম্মাদ ইবনু হাতিম (রহঃ) ….. শাকীক ইবনু সালামাহ্ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদকে বলতে শুনেছি। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেনঃ কোন ব্যক্তির পক্ষে এরূপ কথা বলা খুবই খারাপ যে, সে অমুক অমুক সূরাহ বা অমুক অমুক আয়াত ভুলে গিয়েছে। বরং বলবে যে ঐগুলো (সূরাহ বা আয়াত) তাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। (ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৭১৩, ইসলামীক সেন্টার ১৭২০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভাষাগত পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘আমি ভুলে গেছি’ বলা মানে নিজের স্মৃতির দুর্বলতা বা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা স্বীকার করে নেওয়া। পক্ষান্তরে, ‘আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে’ বলা মানে এই বিস্মৃতির দায়ভার নিজের ওপর থেকে সরিয়ে একটি বহিঃস্থ শক্তি বা ঈশ্বরের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষা কৌশল হিসেবে কাজ করে, যা নবীর ব্যক্তিগত ইমেজকে ত্রুটিমুক্ত রাখতে সাহায্য করে।

যদি বিস্মৃতিকে ‘ঐশ্বরিক নির্ধারণ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তবে প্রশ্ন ওঠে—কেন ঈশ্বর প্রথমে একটি আয়াত পাঠ করাবেন এবং পরবর্তীতে তা ভুলিয়ে দেবেন? এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান ওহীর সংলগ্নতা (Consistency) নষ্ট করে। এটি কি ওহীর কোনো ভুল বা অসঙ্গতিকে ঢাকবার একটি পথ ছিল? নবীর এই নির্দেশ মূলত প্রমাণ করে যে, ওহী সংরক্ষণের বিষয়টি যতটা না ঐশ্বরিক ছিল, তার চেয়েও বেশি ছিল পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল এবং মানবিক ভুল সংশোধনের একটি প্রচেষ্টা।


নাসিখ-মানসুখ এবং বিস্মৃতির ধর্মতাত্ত্বিক অজুহাত

নবীর এই বিস্মৃতিকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ইসলামি ধর্মতত্ত্বে ‘নাসিখ-মানসুখ’ বা রহিতকরণের ধারণাকে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে [9]। অনেক তফসিরকারক দাবি করেন যে, মুহাম্মদ যখন কোনো আয়াত ভুলে যেতেন, সেটি আসলে আল্লাহর ইচ্ছায় হতো কারণ সেই আয়াতটি হয়তো বাতিল বা রহিত করা হয়েছিল। কোরআনেই বলা হয়েছে, “আমি কোনো আয়াত রহিত করলে বা বিস্মৃত করিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম বা তার সমপর্যায়ের আয়াত আনয়ন করি।” [10]। ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত ইবনে কাসীরের তাফসীরে [11] বর্ণিত আছে,

মুহাম্মদ ভুলে যেতেন আল্লাহর আয়াত

কিন্তু এই তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার পেছনে একটি বিশাল যৌক্তিক ফাঁক রয়ে গেছে। যদি কোনো আয়াত বিস্মৃত করিয়ে দেওয়া আল্লাহর পরিকল্পিত ‘রহিতকরণ’ প্রক্রিয়ার অংশ হয়, তবে অন্য একজন সাধারণ মানুষের সেই আয়াতটি মনে থাকা এবং নবীকে তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া কীভাবে সম্ভব? সহিহ বুখারীর সেই হাদিসে দেখা যাচ্ছে, জনৈক ব্যক্তির তিলাওয়াত শুনেই নবীর ভুলে যাওয়া আয়াত মনে পড়েছে। [4]। যদি আল্লাহ সত্যিই সেই আয়াতটি ভুলিয়ে দিতে চাইতেন (রহিত করার উদ্দেশ্যে), তবে তা কেবল নবীর স্মৃতি থেকে নয়, বরং জনসমষ্টির স্মৃতি থেকেও মুছে যাওয়ার কথা ছিল।

এখানেই যৌক্তিক প্রশ্নের উদয় হয়: ওহীর এই তথাকথিত ‘বিস্মৃতি’ কি আসলে কোনো ঐশ্বরিক পরিকল্পনা ছিল, নাকি এটি ছিল ওহী সংকলন ও প্রচারের সময়ে ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খলা ও মানবিক স্মৃতির সীমাবদ্ধতা? যখন কোনো আয়াত নবীর স্মৃতি থেকে হারিয়ে যেত এবং অন্য কেউ তা মনে করিয়ে দিত, তখন তাকে ‘আল্লাহর রহমত’ হিসেবে অভিহিত করা মূলত একটি বিব্রতকর পরিস্থিতিকে আধ্যাত্মিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা মাত্র। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ওহী কোনো সুসংগত ঐশ্বরিক ডাটাবেজ থেকে আসেনি, বরং তা ছিল সমসাময়িক মানুষের স্মৃতি ও শ্রুতির ওপর নির্ভরশীল একটি পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া।


উপসংহার: ঐশ্বরিক সংকলনের অসারতা ও মানবিক ওহী

পরিশেষে বলা যায়, কোরআনের ঐশ্বরিক ও অলৌকিক সংরক্ষণের যে দাবি ধর্মতাত্ত্বিকভাবে করা হয়, ঐতিহাসিক দলিল ও হাদিসের বর্ণনা তাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সূরা আল-আলায় দেওয়া “ভুলে না যাওয়ার” গ্যারান্টি এবং পরবর্তীতে নবীর বারবার আয়াত বিস্মৃত হওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে যে বিস্তর ব্যবধান, তা কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। ওহীর বিশুদ্ধতা রক্ষায় যেখানে খোদ আল্লাহ দায়িত্ব নিয়েছেন বলে দাবি করা হয়, সেখানে নবীর স্মৃতিভ্রম এবং অন্য সাধারণ মানুষের পাঠের ওপর নির্ভরতা ওহীর ‘ডিভাইন সোর্স’ বা ঐশ্বরিক উৎসের ধারণাকেই দুর্বল করে দেয়।

বিস্মৃতির দায়ভার নিজের ওপর থেকে সরিয়ে আল্লাহর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার যে ভাষাগত কৌশল (ভুলে যাওয়ার বদলে ‘ভুলিয়ে দেওয়া’ বলা) আমরা সহিহ মুসলিমের হাদিসে দেখতে পাই, তা মূলত একটি রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এটি নবীর অভ্রান্ততাকে রক্ষা করার একটি মরিয়া প্রচেষ্টা মাত্র। এছাড়া, ‘নাসিখ-মানসুখ’ বা রহিতকরণের অজুহাতটিও ধোপে টেকে না, কারণ যে আয়াত ঈশ্বর নবীর স্মৃতি থেকে মুছে দিতে চান, তা অন্য সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে সংরক্ষিত থাকা এক চরম তাত্ত্বিক বিড়ম্বনা।

সামগ্রিক বিশ্লেষণে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, কোরআন কোনো অলৌকিক বা সংরক্ষিত স্বর্গীয় গ্রন্থ হিসেবে অবতীর্ণ হয়নি; বরং এটি ছিল মুহাম্মদের স্মৃতি, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং তার অনুসারীদের শ্রুতির ওপর নির্ভরশীল একটি মানবিক সংকলন। ওহী সংরক্ষণের এই ত্রুটিগুলো প্রমাণ করে যে, ওহীর প্রক্রিয়াটি যতটা না অতিপ্রাকৃত ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল লৌকিক ও সাধারণ মানবীয় সীমাবদ্ধতায় জর্জরিত।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সূরা আল-আলা, আয়াত ৬ ↩︎
  2. সূরা বাকারাঃ ১০৬ ↩︎
  3. সূরা নাহলঃ ১০১ ↩︎
  4. সহীহ বুখারী, হাদিসঃ ৫৮৯৬ 1 2
  5. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৮৯৬ ↩︎
  6. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬৬, হাদিসঃ ৪৬৬৭, ৪৬৬৮, ৪৬৬৯ ↩︎
  7. সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ১৭২৭ ↩︎
  8. সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ১৭২৮ ↩︎
  9. নাসেখ মানসুখঃ আল্লাহর মত পরিবর্তনের বদভ্যাস ↩︎
  10. সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১০৬ ↩︎
  11. তাফসীরে ইবনে কাসীর, আল্লামা ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬২৬ ↩︎