Table of Contents
ভূমিকা
১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ভূখণ্ডগত সংঘাত ছিল না, বরং এটি ছিল একটি আধুনিক সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের সাথে একটি উগ্র ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্রকাঠামোর আদর্শিক লড়াই। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাদের ঔপনিবেশিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে এবং বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনকে দমন করতে ইসলাম ধর্মকে নির্লজ্জভাবে একটি রাজনৈতিক ও সামরিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল [1]। যুদ্ধের শুরু থেকেই পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং তাদের এদেশীয় দোসররা এই রক্তক্ষয়ী গণহত্যাকে ‘ধর্মীয় যুদ্ধ’ বা ‘পবিত্র জিহাদ’ হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা চালায়, যার মূল লক্ষ্য ছিল নির্বিচার হত্যাকাণ্ড এবং অমানবিক নির্যাতনকে ধর্মতাত্ত্বিক বৈধতা প্রদান করা [2]। এই প্রক্রিয়ায় ধর্মকে ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ‘ইসলামের শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যায় রূপ নেয়।
পাকিস্তানি প্রচারযন্ত্র এবং ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পরিকল্পিতভাবে এই যুদ্ধকে ‘আদর্শিক সংঘাত’ হিসেবে উপস্থাপনের কৌশল গ্রহণ করে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং জেনারেল টিক্কা খান অপারেশন সার্চলাইটের সূচনালগ্ন থেকেই প্রচার করতে থাকেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা মূলত ‘আসল মুসলিম’ নয়, বরং তারা হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি দ্বারা কলুষিত এবং ভারতের চর [3]। এই প্রোপাগান্ডার মূল উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি সাধারণ সৈনিকদের মনে বাঙালির প্রতি ঘৃণার উদ্রেক করা, যাতে তারা গণহত্যা ও নারী নির্যাতনে কোনো দ্বিধা বোধ না করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে এই সশস্ত্র অভিযানকে ‘পবিত্র জিহাদ’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং ফতোয়া প্রচার করা হয় যে, পাকিস্তানের সংহতি বজায় রাখা ইমানের অংশ এবং এর বিরোধিতাকারীরা ‘কাফের’ বা ইসলামের শত্রু [4]। প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে বারবার বলা হয়, এই যুদ্ধ কেবল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, বরং এটি ইসলাম ও হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির মধ্যকার একটি চূড়ান্ত লড়াই, যেখানে হিন্দুদের সহযোগী বাঙালি মুসলমানদের হত্যা করা ধর্মীয়ভাবে বৈধ [5]। এই সুদূরপ্রসারী উস্কানি কেবল সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেনি, বরং একটি পরিকল্পিত জাতিগত ও ধর্মীয় নিধনের (Genocide) ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল।


সহযোগী বাহিনীসমূহের ভূমিকা এবং নারী নির্যাতনকে ধর্মীয় বৈধতা দান
১৯৭১ সালের গণহত্যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রধান সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয় জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত আল-বদর, আল-শামস এবং মুসলিম লীগ প্রভাবিত রাজাকার বাহিনী। এই আধাসামরিক বাহিনীগুলো ‘ইসলাম রক্ষা’ এবং ‘পাকিস্তানের অখণ্ডতা’ বজায় রাখার দোহাই দিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী নিধন এবং সাধারণ জনগণের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায় [6]। এই যুদ্ধের সবচেয়ে জঘন্যতম অধ্যায় ছিল নারীদের ওপর চালানো পদ্ধতিগত যৌন সহিংসতা, যাকে ধর্মীয় মোড়কে বৈধতা প্রদানের চেষ্টা করা হয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসররা বাঙালি নারীদের ‘গনিমতের মাল’ (যুদ্ধের লুটের মাল) হিসেবে চিহ্নিত করে এবং প্রচার করে যে, ইসলামের শত্রুদের পরিবারের নারীদের ভোগ করা যুদ্ধের ময়দানে বৈধ [7]।
গবেষণায় দেখা যায়, আল-বদর ও আল-শামসের মতো সংগঠনগুলো ধর্মীয় উগ্রবাদকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা গেঁথে দিয়েছিল যে, মুক্তিপাগল বাঙালিরা মূলত ‘মুরতাদ’ বা ধর্মত্যাগী, তাই তাদের সম্পদ লুণ্ঠন এবং নারীদের সম্ভ্রমহানি করা কোনো পাপ নয় [8]। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন সাক্ষ্যপ্রমাণেও উঠে এসেছে যে, স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের একটি অংশ ফতোয়া জারি করে পাকিস্তানি সেনাদের এই পাশবিকতায় উৎসাহ যুগিয়েছিল [9]। এভাবে একটি ধর্মকে রাজনৈতিক ও সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার জন্য ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা মানবতার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে আছে।
সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ এবং ‘হিন্দুয়ানী’ ট্যাগিং
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দমনপীড়নের অন্যতম প্রধান মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার ছিল বাঙালির হাজার বছরের সংকর সংস্কৃতিকে ‘অ-ইসলামিক’ বা ‘হিন্দুয়ানী’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া। পশ্চিম পাকিস্তানি এলিট শ্রেণী এবং সামরিক জান্তা বিশ্বাস করত যে, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলমানরা প্রকৃত ইসলাম থেকে বিচ্যুত এবং তাদের জীবনাচরণে হিন্দুয়ানী প্রভাব প্রবল [10]। এই তথাকথিত ‘সাংস্কৃতিক শুদ্ধি’ বা পিউরিফিকেশন অভিযানের অংশ হিসেবেই রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করা, বাংলা নববর্ষের মতো উৎসবগুলোকে অ-ইসলামিক হিসেবে অপপ্রচার করা এবং বাংলা ভাষার ওপর উর্দুর কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্ব চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছিল [11]।
১৯৭১ সালের গণহত্যায় এই সাংস্কৃতিক ঘৃণা সরাসরি সশস্ত্র নৃশংসতায় রূপ নেয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের কাছে হিন্দু সম্প্রদায় ছিল ‘সহজাত শত্রু’, যাদের নির্মূল করাকে তারা ধর্মীয় কর্তব্য বলে প্রচার করত [12]। একইসাথে, যেসব বাঙালি মুসলমান সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ বা প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল, তাদের ‘হিন্দুদের এজেন্ট’ বা ‘কাফেরের দোসর’ হিসেবে চিহ্নিত করে হত্যা করা হয় [3]। এই জাতিগত ও ধর্মীয় ঘৃণা ব্যবহারের মাধ্যমেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী একটি রাজনৈতিক মুক্তির আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জাতিগত নিধনে (Ethnic Cleansing) পর্যবসিত হয়।
উপসংহারঃ ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের কুফল এবং রাষ্ট্র ও ধর্মের বিচ্ছেদ
১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে, যখনই ধর্মকে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখনই তা চরম নৃশংসতা ও অমানবিকতার জন্ম দেয় [2]। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার মাধ্যমে ধর্মের মধ্যযুগীয় বিধানগুলো দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে প্ররোচিত করা এবং নির্বিচার গণহত্যা ও নারী নির্যাতনকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা ছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক নিকৃষ্টতম হিংস্রতা [8]। বাংলাদেশের এই মুক্তি সংগ্রাম কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা ছিল না, বরং তা ছিল ধর্মীয় উগ্রবাদের বিপরীতে একটি সেক্যুলার ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের দৃঢ় অঙ্গীকার [10]। আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজে ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহার রোধ এবং প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্র থেকে ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছেদ যে কতটা অপরিহার্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তার এক অনস্বীকার্য ঐতিহাসিক প্রমাণ [1]। পরিশেষে বলা যায়, ধর্মের লেবাসে শোষণের বিরুদ্ধে মানবতার এই জয়গানই ১৯৭১ সালের মূল চেতনা, যা আজও বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় উগ্রবাদ বিরোধী লড়াইয়ে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয় [4]।
তথ্যসূত্রঃ
- চৌধুরী, এ. (২০০৪)। বাংলাদেশ: ১৯৭১ 1 2
- সরকার, স. (২০১২)। বাংলাদেশের রাজনীতি ও পাকিস্তান সামরিকতন্ত্র 1 2
- মাসকারেনহাস, এ. (১৯৭১)। দ্য রেপ অব বাংলাদেশ 1 2
- বাস, জি. জে. (২০১৩)। দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম: নিক্সন, কিসিঞ্জার অ্যান্ড আ ফরগোটেন জেনোসাইড 1 2
- রুমেল, আর. জে. (১৯৯৪)। ডেথ বাই গভর্নমেন্ট ↩︎
- মামুন, ম. (২০১০)। পাকিস্তানি জেনারেলদের মনস্তত্ত্ব ও ১৯৭১ ↩︎
- ব্রাউনমিলার, এস. (১৯৭৫)। এগেইনস্ট আওয়ার উইল: মেন, উইমেন অ্যান্ড রেপ ↩︎
- হাসান, এম. এ. (২০০১)। যুদ্ধ ও নারী 1 2
- ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) বাংলাদেশ, বিভিন্ন মামলার রায় ↩︎
- ভ্যান শেন্ডেল, ডব্লিউ. (২০০৯)। এ হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশ 1 2
- হোসেন, এস. এ. (২০১০)। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস ↩︎
- কুইপার্স, ই. (২০১১)। দি ইনডিপেনডেন্ট: বাংলাদেশ জেনোসাইড ↩︎
