আল্লাহর ভূগোল জ্ঞানঃ মেরু অঞ্চলের দিন-রাত্রি এবং ইসলামি রোজার বিধান

ভূমিকা

ইসলাম নিজেকে বিশ্বের একমাত্র ‘সার্বজনীন’ (universal), ‘কালজয়ী’ (timeless) এবং ‘ঐশ্বরিক’ ধর্ম হিসেবে দাবি করে। কোরআন বারবার বলে যে এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য নির্দেশনা (৩৪:২৮)। কিন্তু যখন আমরা এর মৌলিক ইবাদত—রমজানের রোজা—এর সময়সীমা নির্ধারণের বিধানকে বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করি, তখন এক চরম ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা, সপ্তম শতকের আরব-কেন্দ্রিক অজ্ঞতা এবং মহাবিশ্বের স্রষ্টার তথাকথিত ‘সর্বজ্ঞতা’র অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পৃথিবীর মেরু অঞ্চলে যেখানে মাসের পর মাস সূর্য অস্ত যায় না বা উদিত হয় না, সেখানে কোরআন-হাদিসের সরাসরি নির্দেশনা একেবারে অচল। এটি কোনো ‘ঐশ্বরিক অলৌকিকতা’ নয়; বরং এটি একজন মরুভূমির অশিক্ষিত ব্যক্তির সীমিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রত্যক্ষ প্রমাণ, যিনি পৃথিবীকে সমতল এবং সূর্যের গতিকে সর্বত্র একই রকম ধরে নিয়েছিলেন। এই একটি বিষয়ই ইসলামের ‘সার্বজনীনতা’র দাবিকে বালির প্রাসাদের মতো ভেঙে ফেলে।


কোরআনঃ একটি নিখুঁত আঞ্চলিক ও ভূ-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি

কোরআন সুরা আল-বাকারাহ ২:১৮৭-এ রোজার সময়সীমা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছে:

তোমাদের জন্য রমাযানের রাতে তোমাদের বিবিগণের নিকট গমন করা জায়িয করা হয়েছে, তারা তোমাদের আচ্ছাদন আর তোমরা তাদের আচ্ছাদন। আল্লাহ জানতেন যে, তোমরা নিজেদের সঙ্গে প্রতারণা করছিলে। সুতরাং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করলেন এবং তোমাদের অব্যাহতি দিলেন। অতএব, এখন থেকে তোমরা তাদের সঙ্গে সহবাস করতে পার এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা কিছু বিধিবদ্ধ করেছেন তা লাভ কর এবং তোমরা আহার ও পান করতে থাক যে পর্যন্ত তোমাদের জন্য কালো রেখা হতে ঊষাকালের সাদা রেখা প্রকাশ না পায়। তৎপর রাতের আগমন পর্যন্ত রোযা পূর্ণ কর, আর মাসজিদে ই’তিকাফ অবস্থায় তাদের সাথে সহবাস করো না। এসব আল্লাহর আইন, কাজেই এগুলোর নিকটবর্তী হয়ো না। আল্লাহ মানবজাতির জন্য নিজের আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তারা মুত্তাকী হতে পারে।
— Taisirul Quran
রামাযানের রাতে আপন স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে, তারা তোমাদের জন্য এবং তোমরা তাদের জন্য আবরণ, তোমরা যে নিজেদের ক্ষতি করছিলে আল্লাহ তা জ্ঞাত আছেন, এ জন্য তিনি তোমাদের প্রতি প্রত্যাবৃত্ত হলেন এবং তোমাদের (ভার) লাঘব করে দিলেন; অতএব এক্ষণে তোমরা (রামাযানের রাতেও) তাদের সাথে মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিপিবদ্ধ করেছেন তা অনুসন্ধান কর এবং প্রত্যুষে কালো সূতা হতে সাদা সূতা প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত তোমরা আহার ও পান কর, অতঃপর রাত সমাগম পর্যন্ত তোমরা সিয়াম পূর্ণ কর; তোমরা মাসজিদে ই‘তিকাফ করার সময় (তোমাদের স্ত্রীদের সাথে) মিলিত হবেনা; এটিই আল্লাহর সীমা। অতএব তোমরা উহার নিকটেও যাবেনা; এভাবে আল্লাহ মানবমন্ডলীর জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহ বিবৃত করেন, যেন তারা সংযত হয়।
— Sheikh Mujibur Rahman
সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীদের নিকট গমন হালাল করা হয়েছে। তারা তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের জন্য পরিচ্ছদ। আল্লাহ জেনেছেন যে, তোমরা নিজদের সাথে খিয়ানত করছিলে। অতঃপর তিনি তোমাদের তাওবা কবূল করেছেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করেছেন। অতএব, এখন তোমরা তাদের সাথে মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিখে দিয়েছেন, তা অনুসন্ধান কর। আর আহার কর ও পান কর যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কাল রেখা থেকে স্পষ্ট হয়। অতঃপর রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর। আর তোমরা মাসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হয়ো না। এটা আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তার নিকটবর্তী হয়ো না। এভাবেই আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ মানুষের জন্য স্পষ্ট করেন যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে।
— Rawai Al-bayan
সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রী-সম্ভোগ বৈধ করা হয়েছে [১]। তারা তোমাদের পোষাকস্বরূপ এবং তোমরাও তাদের পোষাকস্বরূপ। আল্লাহ্‌ জানেন যে, তোমরা নিজদের সাথে খিয়ানত করছিলে। সুতরাং তিনি তোমাদের তওবা কবুল করেছেন এবং তোমাদেরকে মার্জনা করেছেন। কাজেই এখন তোমরা তাদের সাথে সংগত হও এবং আল্লাহ্‌ যা তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন তা কামনা কর। আর তোমরা পানাহার কর যতক্ষণ রাতের কালোরেখা থেকে উষার সাদা রেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের নিকট প্রকাশ না হয় [২]। তারপর রাতের আগমন পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর। আর তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত [৩] অবস্থায় তাদের সাথে সংগত হয়ো না। এগুলো আল্লাহ্‌র সীমারেখা। কাজেই এগুলোর নিকটবতী হয়ো না [৪]। এভাবে আল্লাহ্‌ তাঁর আয়াতসমূহ মানুষদের জন্য সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এই আয়াতটি কোনো অস্পষ্ট রূপক নয়; এটি একটি দৃশ্যমান, প্রাকৃতিক ঘটনা—ভোরের আলোয় সাদা-কালো সুতা আলাদা করা—এর ওপর নির্ভরশীল। এই নির্দেশ সপ্তম শতকের হেজাজ (মক্কা-মদিনা) অঞ্চলের জন্য পুরোপুরি উপযোগী, যেখানে দিন-রাতের পার্থক্য স্পষ্ট এবং ঋতুগত পরিবর্তন মোটামুটি নিয়মিত। কিন্তু পৃথিবীর অক্ষীয় ঝুঁকি (axial tilt ≈ 23.5°) এবং গোলাকার আকৃতির কারণে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর ৬৬.৫° অক্ষাংশের উপরে (Arctic ও Antarctic Circle) গ্রীষ্মকালে ‘মিডনাইট সান’ (midnight sun) দেখা যায়—সূর্য মাসের পর মাস অস্ত যায় না। শীতকালে ‘পোলার নাইট’—সূর্য একদম উদিত হয় না। নরওয়ের ট্রমসো, আইসল্যান্ডের রেকজাভিক বা ফিনল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে রমজান যদি গ্রীষ্মে পড়ে, তাহলে ২০-২৩ ঘণ্টার রোজা অথবা একেবারে অসম্ভব অবস্থা তৈরি হয়।

যদি এই বিধান সত্যিই মহাবিশ্বের স্রষ্টার কাছ থেকে আসত, তবে তিনি নিশ্চয়ই জানতেন যে তাঁর সৃষ্ট পৃথিবীতে এমন অঞ্চল রয়েছে যেখানে “সাদা সুতা ও কালো সুতা” কোনোদিনই আলাদা করা যাবে না। এই আয়াত প্রমাণ করে যে কোরআনের প্রণেতা পৃথিবীকে সমতল, সূর্যকে ভূ-কেন্দ্রিক (geocentric) এবং দিন-রাত্রিকে সর্বত্র একই রকম ধরে নিয়েছিলেন। এটি কোনো ‘ঐশ্বরিক অলৌকিকতা’ নয়; বরং একজন সপ্তম শতকের আরব যোদ্ধা ও দাস ব্যবসায়ীর সীমিত জ্ঞানের স্পষ্ট ছাপ।


ভৌগোলিক অবস্থানভেদে দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য

আসুন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে রাত দিনের একটি তুলনামূলক হিসেব দেখি,

অঞ্চল অক্ষাংশ দীর্ঘতম দিন (গ্রীষ্ম) ক্ষুদ্রতম দিন (শীত) ইসলামি বিধানের অবস্থা
মক্কা, সৌদি আরব ২১.৪° উত্তর ~১৩ ঘণ্টা ৩০ মিনিট ~১০ ঘণ্টা ৩০ মিনিট আদর্শ (সহজসাধ্য)
লন্ডন, যুক্তরাজ্য ৫১.৫° উত্তর ~১৬ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট ~৭ ঘণ্টা ৫০ মিনিট কঠিন ও ভারসাম্যহীন
অসলো, নরওয়ে ৫৯.৯° উত্তর ~১৮ ঘণ্টা ৫০ মিনিট ~৫ ঘণ্টা ৫০ মিনিট চরম ও অবৈজ্ঞানিক
ট্রোমসো, নরওয়ে ৬৯.৬° উত্তর ২৪ ঘণ্টা (সূর্য ডোবে না) ০ ঘণ্টা (সূর্য ওঠে না) অচল (বিধান অকার্যকর)
উত্তর মেরু ৯০° উত্তর ৬ মাস দিন ৬ মাস রাত অসম্ভব (শারীরিক মৃত্যু)
ভৌগোলিক পক্ষপাতিত্ব (Geographical Bias)
মক্কায় দিন-রাতের দৈর্ঘ্যের পার্থক্য মাত্র ৩ ঘণ্টার মতো। সপ্তম শতকের একজন মানুষের পক্ষে এটা ভাবা স্বাভাবিক ছিল যে, সারা পৃথিবী এই ৩ ঘণ্টার বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু মেরু অঞ্চলে এই পার্থক্য যখন ২৪ ঘণ্টায় পৌঁছায়, তখন সেই ‘ঐশ্বরিক’ বিধান কেবল অকেজোই নয়, বরং হাস্যকর হয়ে পড়ে।[1]
অক্ষীয় ঝুঁকির বিস্মৃতি (Axial Tilt)
পৃথিবী তার অক্ষের ওপর 23.5^\circ হেলে থাকার কারণে মেরু অঞ্চলে দিন-রাতের এই চরম পরিবর্তন ঘটে। যদি মহাবিশ্বের স্রষ্টা কোরআন নাজিল করতেন, তবে তিনি বিধানটি সূর্যের অবস্থানের বদলে ‘সময়’ বা ‘ঘণ্টার’ এককে দিতেন, যাতে তা মেরু অঞ্চলের মানুষের জন্যও সমানভাবে পালনীয় হতো।[2]
জীবতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা (Biological Limits)
মানুষের শরীর টানা ১৮-২০ ঘণ্টার বেশি উপবাস করলে ডিহাইড্রেশন এবং বিপাকীয় বৈকল্যের শিকার হয়। স্রষ্টা যদি মক্কার মানুষের জন্য ১৩ ঘণ্টার সহজ বিধান দেন এবং নরওয়ের মানুষের জন্য ২২ ঘণ্টার জীবনঘাতী বিধান দেন, তবে সেই স্রষ্টা আর যা-ই হোক ‘ন্যায়বিচারক’ নন।[3]

‘আঞ্চলিক পরম দয়ালু’র ভৌগোলিক মরণফাঁদ

ইসলামি শরিয়াহর তথাকথিত ‘সার্বজনীন’ ও ‘কালজয়ী’ হওয়ার দাবিটি উত্তর মেরুর দিন-রাত্রির ভৌগোলিক বাস্তবতার সামনে এসে এক চরম তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক সংকটে পড়ে যায়। কোরআনে রোজার সময়সীমা নির্ধারণ করতে গিয়ে বলা হয়েছে, সাদা ও কালো সুতার পার্থক্য স্পষ্ট হওয়া থেকে রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করতে। এই নির্দেশটি পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, এর রচয়িতা পৃথিবীকে একটি সমতল ও স্থিতিশীল ক্ষেত্র হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, যেখানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত সব জায়গায় একইভাবে ঘটে। অথচ আধুনিক ভূগোল ও জ্যোতির্বিজ্ঞান আমাদের শেখায় যে, পৃথিবীর অক্ষীয় ঝুঁকি বা Axial Tilt (23.5^\circ) এর কারণে মেরু অঞ্চলের দেশগুলোতে গ্রীষ্মকালে সূর্য দিগন্তের নিচে নামেই না (Mid-night Sun) এবং শীতকালে মাসের পর মাস উদিত হয় না। যদি এই বিধান সত্যিই মহাবিশ্বের স্রষ্টার কাছ থেকে আসত, তবে তিনি অবশ্যই জানতেন যে তার সৃষ্টি করা পৃথিবীতে এমন স্থানও আছে যেখানে “সাদা ও কালো সুতা” পৃথক করার কোনো প্রাকৃতিক সুযোগই নেই। এই মৌলিক ত্রুটি প্রমাণ করে যে, মুহাম্মদের জ্ঞান কেবল সপ্তম শতকের আরবের দিগন্তরেখা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল এবং তিনি মেরু অঞ্চলের অস্তিত্ব বা পৃথিবীর গোলকীয় গঠন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন।

মানবিক ও জীবতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিধানটি চরম অসংলগ্ন ও বৈষম্যমূলক। মক্কার একজন মুসলিম যখন গড়ে ১৩ ঘণ্টা রোজা রেখে স্বাভাবিক জীবনযাপন করে, তখন নরওয়ে বা সুইডেনের একজন মুসলিমকে প্রায় ২৩ ঘণ্টা পর্যন্ত উপবাস করতে বাধ্য করা হয়, যা মানবদেহের বিপাকীয় প্রক্রিয়ার (Metabolism) জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদী এই উপবাসে শরীরে মারাত্মক ডিহাইড্রেশন, ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা (Na^+, K^+ এর আধিক্য বা ঘাটতি) এবং হাইপোগ্লাইসেমিয়ার মতো জীবনঘাতী সমস্যা তৈরি হয় [3]। কোরআনে দাবি করা হয়েছে যে, আল্লাহ কারো ওপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপান না [4], কিন্তু মেরু অঞ্চলের বাস্তবতা এই দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত। একজন ‘ন্যায়বিচারক’ ও ‘দয়ালু’ স্রষ্টা কি কেবল ভৌগোলিক অক্ষাংশের (Latitude) ওপর ভিত্তি করে কারো জন্য বিধানকে সহজ আর কারো জন্য জীবনঘাতী করে তুলবেন? এই ‘ভৌগোলিক লটারি’র মতো অসম বিধান নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামি শরিয়াহ কোনো মহাজাগতিক সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং এটি আরবের তপ্ত মরুভূমির জলবায়ু ও ভূগোলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি আঞ্চলিক প্রথা যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।


দাজ্জালের হাদিসঃ রেট্রোফিটেড, অ্যাড-হক ‘সমাধান’

যখন মুসলিমরা উত্তর দিকে বিস্তার লাভ করল এবং বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হল, তখন কোরআনের এই আয়াতটি অনেক অঞ্চলেই আর পালন করা সম্ভব ছিল না। আল্লাহ পাকের সরাসরি এবং খুব পরিষ্কার নির্দেশনা সত্ত্বেও মুসলিমরা বুঝতে পারলো, আল্লাহ পাকের এই নির্ধারিত বিধানটি আর মানা সম্ভব নয়। ইসলামের আকীদা হচ্ছে, কোরআনে যেই বিষয়টি স্পষ্ট এবং মানসুখ হয়নি, এরকম অবস্থায় কোরআনই হবে একমাত্র বিধান। কোরআনে কোন কিছু পাওয়া না গেলে কিংবা অস্পষ্টতা থাকলে সেই ক্ষেত্রে সহিহ হাদিস থেকে শরীয়তের নীতিমালা আসবে। কিন্তু যেখানে কোরআনই স্পষ্ট, এবং মানসুখ হয়নি, সেই ক্ষেত্রে কোরআনই হবে একমাত্র বিধান। কিন্তু কোরআনের এই বিধানটি তৈ আর মানা সম্ভব নয়! তাহলে উপায় কী? কোনো সমাধান না পেয়ে আলেমরা কোরআনেকে টপকে হাদিসের দিকে ছুটলেন। সহীহ মুসলিম ২৯৩৭-এ দাজ্জাল প্রসঙ্গে একটি হাদিস আছে:

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫৪। বিভিন্ন ফিতনাহ ও কিয়ামতের লক্ষনসমূহ
পরিচ্ছেদঃ ২০. দাজ্জাল এর বর্ণনা, তার পরিচয় এবং তার সাথে যা থাকবে
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৭২৬৩ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৯৩৭
৭২৬৩-(১১০/২৯৩৭) আবু খাইসামাহ, যুহায়র ইবনু হারব, মুহাম্মাদ ইবনু মিহরান আর রাযী (রহঃ) ….. নাওওয়াস ইবনু সাম’আন (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা সকালে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করলেন। আলোচনার সময় তিনি তার ব্যক্তিত্বকে তুচ্ছ করে তুলে ধরেন। পরে অনেক গুরুত্ব সহকারে উপস্থিত করেন যাতে তাকে আমরা ঐ বৃক্ষরাজির নির্দিষ্ট এলাকায় (আবাসস্থল সম্পর্কে) ধারণা করতে লাগলাম। এরপর আমরা সন্ধ্যায় আবার তার কাছে গেলাম। তিনি আমাদের মধ্যে এর প্রভাব দেখতে পেয়ে বললেন, তোমাদের ব্যাপার কি? আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনি সকালে দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং এতে আপনি কখনো ব্যক্তিত্বকে তুচ্ছ করে তুলে ধরেছেন, আবার কখনো তার ব্যক্তিত্বকে বড় করে তুলে ধরেছেন। ফলে আমরা মনে করেছি যে, দাজ্জাল বুঝি এ বাগার মধ্যেই বিদ্যমান। এ কথা শুনে তিনি বললেন, দাজ্জাল নয়, বরং তোমাদের ব্যাপারে অন্য কিছুর আমি অধিক ভয় করছি। তবে শোন, আমি তোমাদের) মধ্যে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় যদি দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ হয় তবে আমি নিজেই তাকে প্রতিহত করব। তোমাদের প্রয়োজন হবে না। আর যদি আমি তোমাদের মাঝে না থাকাবস্থায় দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ হয়, তবে প্রত্যেক মুমিন লোক নিজের পক্ষ হতে তাকে প্রতিহত করবে। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আল্লাহ তা’আলাই হলেন আমার পক্ষ হতে তত্ত্বাবধানকারী।
দাজ্জাল যুবক এবং ঘন চুল বিশিষ্ট হবে, চোখ আঙ্গুরের ন্যায় হবে। আমি তাকে কাফির ’আবদুল উয্যা ইবনু কাতান এর মতো মনে করছি। তোমাদের যে কেউ দাজ্জালের সময়কাল পাবে সে যেন সূরা আল-কাহফ-এর প্রথমোক্ত আয়াতসমূহ পাঠ করে। সে ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যপথ হতে আবির্ভূত হবে। সে ডানে-বামে দুর্যোগ সৃষ্টি করবে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা অটল থাকবে। আমরা প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! সে পৃথিবীতে কয়দিন অবস্থান করবে? উত্তরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, চল্লিশদিন পর্যন্ত। এর প্রথম দিনটি এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিন এক মাসের সমান এবং তৃতীয় দিন এক সপ্তাহের সমান হবে। অবশিষ্ট দিনগুলো তোমাদের দিনসমূহের মতই হবে।
আমরা প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! যেদিন এক বছরের সমান হবে, সেটাতে এক দিনের সালাতই কি আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে? উত্তরে তিনি বললেন, না, বরং তোমরা এদিন হিসাব করে তোমাদের দিনের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে নিবে।
আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! দুনিয়াতে দাজ্জালের অগ্রসরতা কি রকম বৃদ্ধি পাবে? তিনি বললেন, বাতাসের প্রবাহ মেঘমালাকে যে রকম হাকিয়ে নিয়ে যায়। সে এক কাওমের কাছে এসে তাদেরকে কুফুরীর দিকে ডাকবে। তারা তার উপর ঈমান আনবে এবং তার আহ্বানে সাড়া দিবে। অতঃপর সে আকাশমণ্ডলীকে আদেশ করবে। আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করবে এবং ভূমিকে নির্দেশ দিবে, ফলে ভূমি গাছ-পালা ও শস্য উৎপন্ন করবে। তারপর সন্ধ্যায় তাদের গবাদি পশুগুলো পূর্বের চেয়ে বেশি লম্বা কুজ, প্রশস্ত স্তন এবং পেটভর্তি অবস্থায় তাদের কাছে ফিরে আসবে।
তারপর দাজ্জাল অপর এক কাওমেরর কাছে আসবে এবং তাদেরকে কুফুরীর প্রতি ডাকবে। তারা তার কথাকে উপেক্ষা করবে। ফলে সে তাদের নিকট হতে প্রত্যাবর্তন করবে। আমনি তাদের মধ্যে দুর্ভিক্ষ ও পানির অনটন দেখা দিবে এবং তাদের হাতে তাদের ধন-সম্পদ কিছুই থাকবে না। তখন দাজ্জাল এক পতিত স্থান অতিক্রমকালে সেটাকে সম্বোধন করে বলবে, তুমি তোমার গুপ্তধন বের করে দাও। তখন জমিনের ধন-ভাণ্ডার বের হয়ে তার চতুষ্পার্শে একত্রিত হতে থাকবে, যেমন মধু মক্ষিকা তাদের সর্দারের চারপাশে সমবেত হয়।
অতঃপর দাজ্জাল এক যুবক ব্যক্তিকে ডেকে আনবে এবং তাকে তরবারি দ্বারা আঘাত করে তীরের লক্ষ্যস্থলের ন্যায় দুটুকরো করে ফেলবে। তারপর সে আবার তাকে আহবান করবে। যুবক আলোকময় হাস্যোজ্জল চেহারায় তার সম্মুখে এগিয়ে আসবে। এ সময় আল্লাহ রববুল আলামীন ঈসা ইবনু মারইয়াম (আঃ) কে প্রেরণ করবেন। তিনি দু’ ফেরেশতার কাঁধের উপর ভর করে ওয়ারস ও জাফরান রং এর জোড়া কাপড় পরিহিত অবস্থায় দামেশক নগরীর পূর্ব দিকের উজ্জ্বল মিনারে অবতরণ করবেন। যখন তিনি তার মাথা ঝুঁকবেন তখন ফোটা ফোটা ঘাম তার শরীর থেকে গড়িয়ে পড়বে। তিনি যে কোন কফিরের কাছে যাবেন সে তার শ্বাসের বাতাসে ধ্বংস হয়ে যাবে। তার দৃষ্টি যতদূর পর্যন্ত যাবে তাঁর শ্বাসও ততদূর পর্যন্ত পৌছবে। তিনি দাজ্জালকে সন্ধান করতে থাকবেন। অবশেষে তাকে বাবে লুদ নামক স্থানে গিয়ে পাকড়াও করবেন এবং তাকে হত্যা করবেন।
অতঃপর ঈসা (আঃ) ঐ সম্প্রদায়ের নিকট যাবেন, যাদেরকে আল্লাহ তা’আলা দাজ্জালের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছেন। ঈসা (আঃ) তাদের কাছে গিয়ে তাদের চেহারায় হাত বুলিয়ে জান্নাতে তাদের স্থানসমূহের ব্যাপারে খবর দিবেন। এমন সময় আল্লাহ তা’আলা ঈসা (আঃ) এর প্রতি এ মর্মে ওয়াহী অবতীর্ণ করবেন যে, আমি আমার এমন বান্দাদের আবির্ভাব ঘটেয়েছি, যাদের সঙ্গে কারোই যুদ্ধ করার ক্ষমতা নেই। অতঃপর তুমি আমার মুমিন বান্দাদেরকে নিয়ে তুর পাহাড়ে চলে যাও। তখন আল্লাহ তা’আলা ইয়াজুজ-মাজুজ কাওমকে পাঠাবেন। তারা ছাড়া পেয়ে পৃথিবীর সব প্রান্তে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। তাদের প্রথম দলটি “বুহাইরায়ে তাবরিয়া”র (ভূমধ্যসাগর) উপকূলে এসে এর সমুদয় পানি পান করে নিঃশেষ করে দিবে। তারপর তাদের সর্বশেষ দলটি এ স্থান দিয়ে যাত্রাকালে বলবে, এ সমুদ্রে কোন সময় পানি ছিল কি?
তারা আল্লাহর নবী ঈসা (আঃ) এবং তার সাথীদেরকে অবরোধ করে রাখবে। ফলে তাদের নিকট একটি বলদের মাথা বর্তমানে তোমাদের নিকট একশ দীনারের মূল্যের চেয়েও অধিক মূল্যবান প্রতিপন্ন হবে। তখন আল্লাহর নবী ঈসা (আঃ) এবং তার সঙ্গীগণ আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। ফলে আল্লাহ তা’আলা ইয়া’জুজ-মা’জুজ সম্প্রদায়ের প্রতি আযাব পাঠাবেন। তাদের ঘাড়ে এক প্রকার পোকা হবে। এতে একজন মানুষের মৃত্যুর মতো তারাও সবাই মরে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তারপর ঈসা (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীগণ পাহাড় হতে জমিনে বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু তারা অর্ধ হাত জায়গাও এমন পাবেন না যথায় তাদের পচা লাশ ও লাশের দুর্গন্ধ নেই। অতঃপর ’ঈসা (আঃ) এবং তার সঙ্গীগণ পুনরায় আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। তখন আল্লাহ তা’আলা উটের ঘাড়ের মতো লম্বা এক ধরনের পাখি পাঠাবেন। তারা তাদেরকে বহন করে আল্লাহর ইচ্ছানুসারে কোন স্থানে নিয়ে ফেলবে।
এরপর আল্লাহ এমন মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যার ফলে কাঁচা-পাকা কোন গৃহই আর অবশিষ্ট থাকবে না। এতে জমিন বিধৌত হয়ে উদ্ভিদ শূন্য মৃত্তিকায় পরিণত হবে। অতঃপর পুনরায় জমিনকে এ মর্মে নির্দেশ দেয়া হবে যে, হে জমিন! তুমি আবার শস্য উৎপন্ন করো এবং তোমার বারাকাত ফিরিয়ে দাও। সেদিন একদল মানুষ একটি ডালিম ভক্ষণ করবে এবং এর বাকলের নীচে লোকেরা ছায়া গ্রহণ করবে। দুধের মধ্যে বারাকাত হবে। ফলে দুগ্ধবতী একটি উটই একদল মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে, দুগ্ধবতী একটি গাভী একগোত্রীয় মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে এবং যথেষ্ট হবে দুগ্ধবতী একটি বকরী এক দাদার সন্তানদের (একটি ছোট গোত্রের) জন্য। এ সময় আল্লাহ তা’আলা অত্যন্ত আরামদায়ক একটি বায়ু প্রেরণ করবেন। এ বায়ু সকল মুমিন লোকদের বগলে গিয়ে লাগবে এবং সমস্ত মুমিন মুসলিমদের রূহ কবয করে নিয়ে যাবে। তখন একমাত্র মন্দ লোকেরাই এ পৃথিবীতে বাকী থাকবে। তারা গাধার ন্যায় পরস্পর একে অন্যের সাথে প্রকাশ্যে ব্যভিচারে লিপ্ত হবে। এদের উপরই কিয়ামত সংঘটিত হবে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৭১০৬. ইসলামিক সেন্টার ৭১৬০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

লক্ষ্য করুন, এই হাদিসের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন—এটি কেয়ামতের আলামত এবং দাজ্জালের অলৌকিক সময়-বিকৃতি নিয়ে। মুহাম্মদ এটি কোনো ভৌগোলিক বাস্তবতার সমাধান হিসেবে বলেননি; নবী মুহাম্মদ জানতেনই না যে পৃথিবীতে এমন স্থান বাস্তবে আছে। আধুনিক আলেমরা এই কিয়ামতের সময়কালে যা প্রযোজ্য সেই হাদিসকে জোর করে টেনে নরওয়ে-সুইডেনের মুসলিমদের ওপর চাপিয়ে দেন—যা একটি সুস্পষ্ট ‘তালি মারা’ (retrofitted) প্রচেষ্টা। যদি মুহাম্মদ সত্যিই সর্বজ্ঞানী ঈশ্বরের দূত হতেন, তাহলে তিনি দাজ্জালের রূপকথার অপেক্ষা না করে সরাসরি বলে যেতেন: “মেরু অঞ্চলে এইভাবে রোজা রাখবে।” এই নীরবতা তাঁর অজ্ঞতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।


আধুনিক ফতোয়া ও তাদের বিশৃঙ্খল প্যাচওয়ার্ক

আজকের ইসলামি ফিকহশাস্ত্র এই সংকটের মুখে একেবারে বিপর্যস্ত। বিভিন্ন ফতোয়া সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন ‘সমাধান’ দিয়েছে, কিন্তু কোনোটিই কোরআন-হাদিসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়:

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফতোয়া অ্যান্ড রিসার্চ (ECFR)
বিধান: যে অঞ্চলে দিন বা রাত অত্যন্ত দীর্ঘ হয়ে যায়, সেখানে মুসলিমরা সময় নির্ধারণের জন্য অনুমান (taqdir) করতে পারে অথবা মক্কার সময় অনুসরণ করতে পারে।

সূত্র:
Prayer in Polar Areas
European Council for Fatwa and Research
যৌক্তিক অসংগতি: কোরআনে রোজার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দ্বারা (“সাদা সুতা কালো সুতার থেকে পৃথক হওয়া পর্যন্ত”)। কিন্তু এখানে স্থানীয় সূর্যকে বাদ দিয়ে অন্য স্থানের সময় অনুসরণ করতে বলা হচ্ছে। অর্থাৎ স্থানীয় প্রকৃতির সাথে কোরআনের নির্দেশনা সরাসরি খাপ খায় না।
Assembly of Muslim Jurists of America (AMJA)
বিধান: যদি কোনো অঞ্চলে দিন অত্যন্ত দীর্ঘ হয়, তাহলে কাছাকাছি এমন একটি দেশের সময় অনুসরণ করা যেতে পারে যেখানে দিন-রাত্রির দৈর্ঘ্য স্বাভাবিক।

সূত্র:
Amja
যৌক্তিক অসংগতি: “নিকটবর্তী স্বাভাবিক দেশ” নির্ধারণের কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড নেই। ফলে বাস্তবে এটি একটি অনুমাননির্ভর সমাধান, যেখানে এক দেশের মানুষকে অন্য দেশের সূর্যঘড়ি অনুসরণ করতে বলা হয়।
সৌদি আলেম ইবনে বায ও ইসলামি ফিকহ মতবাদ
বিধান: যতক্ষণ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সূর্য উদয়-অস্ত ঘটে, ততক্ষণ স্থানীয় সময় অনুযায়ী রোজা পালন করতে হবে, যদিও দিন ২০-২৩ ঘণ্টা দীর্ঘ হয়।

সূত্র:
Majmoo’al-Fatawa of late Scholar Ibn Bazz (R)
যৌক্তিক অসংগতি: উত্তর ইউরোপ বা আর্কটিক অঞ্চলে গ্রীষ্মে রোজা ২০-২৩ ঘণ্টা পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। ফলে এই বিধান বাস্তবে মানুষের শারীরিক সহনশীলতার সীমার সাথে সংঘর্ষ তৈরি করে।
বিকল্প মত: পরে কাজা আদায়
বিধান: যদি দীর্ঘ দিনের কারণে রোজা রাখা অত্যন্ত কষ্টকর হয়, তবে পরে ছোট দিনের সময় সেই রোজাগুলো কাজা করা যেতে পারে।

সূত্র:
Should Muslims in the North Fast 20 Hours a Day?
যৌক্তিক অসংগতি: এতে রমজান মাসের নির্দিষ্ট সময়ের বাধ্যবাধকতা কার্যত পরিবর্তিত হয়ে যায়। ফলে বাস্তবে কেউ রমজানে না রেখে বছরের অন্য সময় রোজা রাখতে পারে।

এই সব ‘সমাধান’ একটি জিনিসই প্রমাণ করে—কোরআনের “সাদা সুতা-কালো সুতা”র সরাসরি নির্দেশ অচল। যে ধর্ম নিজেকে ‘পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান’ বলে, তার প্রধান স্তম্ভ পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অংশে (মেরু অঞ্চল) অকেজো হয়ে যায়। আলেমরা যে “অনুমান” (estimation) করতে বলেন, তা আসলে মুহাম্মদের অজ্ঞতাকে ঢাকার মরিয়া চেষ্টা।


সূর্যের সিজদার রূপকথাঃ অজ্ঞতার চূড়ান্ত দলিল

এই প্রসঙ্গে একটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি, সেটি হচ্ছে নবী মুহাম্মদের দুইটি হাদিস যেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ প্রত্যেক রাতের একটি নির্দিষ্ট সময়ে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন, বান্দাদের দোয়া শোনার জন্য [5]। যদি মেরু অঞ্চলে ছয় মাস রাত থাকে, তবে কি ‘রহমান’ সেই ছয় মাস ধরে নিকটবর্তী আসমানেই বসে থাকেন? আর ছয় মাস দিনের সময় কি তিনি আরশ ছেড়ে নিচে নামার সুযোগই পান না? এই ধারণাটি প্রমাণ করে যে, এই ‘নিকটবর্তী আসমানে আল্লাহর অবতরণ’ গল্পগুলো কেবল এমন এক পৃথিবীর জন্য কল্পনা করা হয়েছিল যেখানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিয়মিত দিন-রাত হয়। আরেকটি হচ্ছে, সূর্য প্রতিদিন রাতের বেলা আল্লাহর আরশের নিচে গিয়ে সিজদা অবনত থাকে, সকাল হওয়া পর্যন্ত। সত্যিকার অর্থে সূর্যের তথাকথিত ‘সিজদা’ ও ভূ-কেন্দ্রিক ভ্রান্ত ধারণা মুহাম্মদের মহাজাগতিক অজ্ঞতাকে চূড়ান্তভাবে উন্মোচিত করে। হাদিসে কুদসি সহ বহু হাদিসে মুহাম্মদ দাবি করেছেন যে, সূর্য প্রতিদিন সূর্যাস্তের পর আল্লাহর আরশের নিচে গিয়ে সিজদা করে এবং পুনরায় উদয়ের অনুমতি প্রার্থনা করে [6]। এই দাবিটি কেবল বৈজ্ঞানিকভাবেই হাস্যকর নয়, বরং এটি একটি মারাত্মক ভৌগোলিক অসংগতি তৈরি করে। মেরু অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে যখন সূর্য মাসের পর মাস দিগন্তের নিচে নামে না (Midnight Sun), তখন এই তথাকথিত ‘আরশের নিচে সিজদা’ দেওয়ার নাটকটি কোথায় মঞ্চস্থ হয়? যদি সূর্য অস্তই না যায়, তবে সে সিজদা দিতে যাওয়ার অনুমতি চাইবে কখন? এই আদিম গালগল্পটি সরাসরি প্রমাণ করে যে, কোরআন ও হাদিসের রচয়িতা জানতেনই না যে সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে না এবং পৃথিবী গোলকীয় হওয়ার কারণে সব জায়গায় সূর্যাস্ত ঘটে না। এটি মূলত একটি সমতল ভূ-কেন্দ্রিক (Geocentric) বিশ্বাসের প্রতিফলন, যেখানে সূর্যকে একটি ক্ষুদ্র আলোর গোলক মনে করা হতো যা প্রতিদিন এক দিগন্ত থেকে অন্য দিগন্তে যাতায়াত করে।

একইভাবে, নামাজের ওয়াক্ত নির্ধারণের পদ্ধতিটিও প্রমাণ করে যে ইসলাম একটি আঞ্চলিক ‘মক্কাকেন্দ্রিক’ ধর্ম ছাড়া আর কিছুই নয়। ইসলামের পাঁচটি নামাজের ওয়াক্ত পুরোপুরি সূর্যের অবস্থানের (যেমন: ঢলে পড়া, ছায়ার দৈর্ঘ্য, লালিমা অদৃশ্য হওয়া) ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু মেরু অঞ্চলে যখন ছয় মাস দিন থাকে, তখন সেখানে ‘মাগরিব’ বা ‘এশা’র কোনো অস্তিত্বই থাকে না; আবার ছয় মাস রাতের সময় ‘জোহর’ বা ‘আসর’ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। যদি ইসলাম সত্যিই একটি বৈশ্বিক ও কালজয়ী ধর্ম হতো, তবে এর ইবাদতগুলো সূর্যের অবস্থানের মতো পরিবর্তনশীল ও আঞ্চলিক বিষয়ের ওপর নির্ভর না করে ‘ধ্রুবক সময়’ বা ‘ঘণ্টার’ এককে নির্ধারিত হতো। একজন তথাকথিত ‘সর্বজ্ঞানী স্রষ্টা’ কেন সময় বোঝাতে ‘সাদা সুতা ও কালো সুতা’র মতো আদিম দৃশ্যমান চিহ্ন (Visual markers) ব্যবহার করবেন যা কেবল নিরক্ষরেখার নিকটবর্তী নির্দিষ্ট অক্ষাংশেই কাজ করে? এই ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন প্রমাণ করে যে, এই বিধানগুলো কোনো মহাজাগতিক স্রষ্টার নয়, বরং এমন এক ব্যক্তির মস্তিষ্কপ্রসূত যার জ্ঞান তার মরুভূমির দিগন্তরেখার ওপারে পৌঁছাতে পারেনি।

পরিশেষে, এই ‘সার্বজনীন সময় এককের’ অভাব এবং ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ইসলামের ঐশ্বরিক দাবির মুখে একটি বড় চপেটাঘাত। একজন প্রকৃত স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টির জ্যামিতিক ও অক্ষীয় ঝুঁকির (axial tilt ≈ 23.5 ডিগ্রি) বিষয়ে সম্যক অবগত থাকতেন এবং এমন একটি নিয়ম দিতেন যা ট্রোমসো থেকে টোকিও—সব জায়গার মানুষের জন্য সমানভাবে কার্যকর হতো। কিন্তু আমরা দেখছি, ইসলামের বিধানগুলো মেরু অঞ্চলের মানুষের জন্য হয় অসম্ভব (৬ মাস উপবাস), না হয় জীবনঘাতী (২৩ ঘণ্টা রোজা), না হয় সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। মক্কার একজন মুসলিম যখন গড়ে ১৩ ঘণ্টা রোজা রেখে আরাম করে ইবাদত করে, তখন একই স্রষ্টার অন্য এক বান্দাকে কেবল উত্তর গোলার্ধে জন্মানোর অপরাধে কেন ২৩ ঘণ্টা তৃষ্ণার্ত থাকতে হবে? এই চরম বৈষম্য ও ‘ভৌগোলিক লটারি’ প্রমাণ করে যে, ইসলাম কোনো ন্যায়বিচারক স্রষ্টার বাণী নয়, বরং এটি একটি ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতাপূর্ণ মতবাদ যা আধুনিক বিজ্ঞানের আলোতে এসে নিজের আদিমতা ও অসারতা লুকিয়ে রাখার জন্য এখন ‘অ্যাড-হক’ ফতোয়ার আশ্রয় নিচ্ছে।


উপসংহার: ইসলামের ঐশ্বরিক দাবির চূড়ান্ত পতন

ইসলামি ফিকহের এই জটিলতা ও অসংগতি একটি সহজ সত্য প্রকাশ করে: ইসলাম কোনো মহাজাগতিক বা বৈজ্ঞানিক সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। এটি সপ্তম শতকের আরব মরুভূমির একটি আঞ্চলিক ধর্ম, যার প্রণেতার জ্ঞান তাঁর চারপাশের দিগন্তের বাইরে যায়নি। যদি মুহাম্মদ সত্যিই গোলাকার পৃথিবী, অক্ষীয় ঝুঁকি এবং মেরু অঞ্চল সম্পর্কে অবগত থাকতেন, তাহলে রোজার বিধান “সূর্যের অবস্থান” নয়, “নির্দিষ্ট ঘণ্টা” (যেমন ১২-১৮ ঘণ্টা) এর ওপর ভিত্তি করে দিতেন।

আজকের আলেমদের যে প্যাচওয়ার্ক ফতোয়া, তা আসলে মুহাম্মদের অজ্ঞতাকে ঢাকার ব্যর্থ প্রয়াস। যে ধর্ম নিজেকে “পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান” দাবি করে, অথচ পৃথিবীর অর্ধেক অংশে তার প্রধান স্তম্ভগুলো পালন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, সেই ধর্মের ‘ঐশ্বরিক’ দাবি একটি মিথ্যা প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। এই একটি বিষয়ই যথেষ্ট—ইসলাম কোনো সর্বজ্ঞানী স্রষ্টার বাণী নয়; এটি মানুষের তৈরি, সীমাবদ্ধ এবং ভুলে ভরা একটি আঞ্চলিক আদর্শ। যৌক্তিক মানুষের উচিত এই সত্যকে স্বীকার করে এগিয়ে যাওয়া।


তথ্যসূত্রঃ
  1. Mecca Solar Trajectory Report ↩︎
  2. Earth’s Axial Tilt and Seasons ↩︎
  3. Effects of Long-term Fasting on Human Physiology 1 2
  4. আল-বাকারাহ ২:২৮৬ ↩︎
  5. আল্লাহর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ ↩︎
  6. ইসলাম অনুসারে সূর্য রাতের বেলা কই যায়? ↩︎