Hud
হুদ: 118
11 হুদ Hud · 123 আয়াত هود
মূল আরবি
وَلَوْ شَآءَ رَبُّكَ لَجَعَلَ ٱلنَّاسَ أُمَّةً وَٰحِدَةً ۖ وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ
English Translations
And if your Lord had willed, He could have made mankind one community; but they will not cease to differ,
And if your Lord had so willed, He could surely have made mankind one Ummah [nation or community (following one religion only i.e. Islam)], but they will not cease to disagree,
Had your Lord willed, He would have made all the people a single community. But, they will continue in their differences,
Had your Lord so willed, He would surely have made mankind one community. But as things stand, now they will not cease to differ among themselves and to follow erroneous ways
And if thy Lord had willed, He verily would have made mankind one nation, yet they cease not differing,
If thy Lord had so willed, He could have made mankind one people: but they will not cease to dispute.
বাংলা অনুবাদ
তোমার প্রতিপালক চাইলে মানুষকে অবশ্যই এক জাতি করতে পারতেন, কিন্তু তারা মতভেদ করতেই থাকবে।
যদি তোমার রব চাইতেন, তবে সকল মানুষকে এক উম্মতে পরিণত করতেন, কিন্তু তারা পরস্পর মতবিরোধকারী রয়ে গেছে,
এবং যদি তোমার রবের ইচ্ছা হত তাহলে তিনি সকল মানুষকে একই মতাবলম্বী করে দিতেন, কিন্তু তারা মতভেদ করতেই থাকবে,
আর আপনার রব ইচ্ছে করলে সমস্ত মানুষকে এক জাতি করতে পারতেন, কিন্তু তারা পরস্পর মতবিরোধকারীই রয়ে গেছে।
তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে সমস্ত মানুষকে এক জাতি করতে পারতেন, কিন্তু তারা মতভেদ করতেই থাকবে
১১৮. ওহে রাসূল! আপনার রব যদি ইচ্ছা করতেন যে, সব মানুষকে তিনি হকের উপর একত্রিত করে এক জাতিসত্তায় পরিণত করবেন তবে অবশ্যই তিনি তা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা চাননি। ফলে তারা প্রবৃত্তির অনুসরণ ও সীমালঙ্ঘনের কারণে তাতে মতভেদ করেই চলেছে।
তাফসীর
১১৮-১১৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, তাঁর ক্ষমতা কোন কাজ থেকে অপারগ নয়। তিনি ইচ্ছা করলে সবকেই ইসলামের উপর বা কুফরীর উপর একত্রিত করতে পারতেন। কিন্তু মানুষের মত, দ্বীন, মাযহাব সব সময় যে পৃথক পৃথক ও ভিন্ন ভিন্ন হবে এতে তাঁর বড়ই নিপূণতা রয়েছে। তাদের পন্থা হবে ভিন্ন এবং আর্থিক অবস্থাও হবে পৃথক পৃথক। এক অপরের অধীনে থাকবে। এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্বীন ও মাযহাবের বিভিন্নতা। হা, তবে যাদের উপর আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ হয়, তারা সব সময় রাসূলদের অনুসরণ ও আল্লাহ তাআ’লার হুকুম পালনের কার্যে লেগে থাকে। এখন তারা শেষ নবীর (সঃ) অনুগত।
এরাই হচ্ছে মুক্তিপ্রাপ্ত ও সফলকাম। মুসনাদ ও সুনানে হাদীস রয়েছে, যার প্রতিটি সনদ অন্য সনদকে শক্তিশালী করে থাকে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইয়াহুদীদের একাত্তরটি দল হয়েছে এবং খৃষ্টানরা বাহাত্তরটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আর আমার উম্মতের তেহাত্তরটি দল হয়ে যাবে। একটি দল ছাড়া সব দলই জাহান্নামী। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ একটি দল কারা?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “তারা হচ্ছে ওরাই যারা ওরই উপর রয়েছে যার উপর আমি রয়েছি এবং আমার সাহাবীগণ রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম হাকিম (রঃ) তার মুসতাদরাক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)আতা’র (রঃ) উক্তি অনুযায়ী দ্বারা (আরবি) এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে ইয়াহুদী, খৃষ্টান ও মাজুসী।
আর আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত দল দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে একনিষ্ঠ ধর্ম ইসলামের অনুগত লোকেরা। কাতাদা’ (রঃ) বলেন যে, এই দলই হচ্ছে আল্লাহ তাআ’লার রহমত প্রাপ্ত ও সংঘবদ্ধ দল, যদিও তাদের দেশ ও দেহ পৃথক। আর অবাধ্য লোকেরাই হচ্ছে বিচ্ছিন্ন দল, যদিও তাদের দেশ ও দেহ এক হয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই তাদের জন্য এ জন্যেই হয়েছে। দুর্ভাগা ও ভাগ্যবান এ দু'টো হচ্ছে আদি কালের বন্টন। হযরত তাউসের (রাঃ) নিকট দু’জন লোক তাদের ঝগড়া নিয়ে হাযির হয়। তারা তাদের পারস্পরিক মতানৈক্যে খুবই বেড়ে যায়। তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা খুবই ঝগড়া করলে এবং তোমাদের পারস্পরিক মতানৈক্য অত্যন্ত বেড়ে গেছে।” তখন তাদের একজন বললো: “আমাদেরকে এ জন্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে।” তার এ কথা শুনে তিনি বললেনঃ “তুমি ভুল কথা বললে।” লোকটি তার উক্তির অনুকূলে এই আয়াতটিই পাঠ করলো।
তখন হযরত আতা’ (রাঃ) বললেনঃ “তোমাদেরকে এজন্যে সৃষ্টি করা হয় নাই যে, তোমরা পরস্পর মতভেদ সৃষ্টি করবে। বরং তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে দলবদ্ধভাবে ও একমতে থাকার জন্যে এবং রহমত লাভ করার উদ্দেশ্যে।” যেমন হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রহমতের জন্যে তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আযাবের জন্যে নয়। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি দানব ও মানবকে আমার ইবাদতের জন্যেই সৃষ্টি করেছি।” (৫১ :৫৬) তৃতীয় উক্তি এ-ও আছে যে, তাদের রহমত ও মতভেদের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। যেমন মা’লিক (রঃ) এর তাফসীরে বলেন যে, একটিদল জান্নাতী এবং একটি দল জাহান্নামী।
এদেরকে রহমত লাভ করার জন্যে এবং ওদেরকে মতভেদ সৃষ্টি করার জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে।আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার প্রতিপালকের এই ফায়সালা হয়ে আছে যে, তাঁর সৃষ্টির মধ্যে এই দু’প্রকারের লোক থাকবে এবং এই দু’প্রকারের লোক দ্বারা জান্নাত ও জাহান্নাম পূর্ণ করা হবে। এর পূর্ণ হিকমত একমাত্র তিনিই জানেন।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যে একবার তর্ক বিতর্ক হয়। জান্নাত বলে, আমার মধ্যে তো শুধুমাত্র দুর্বল লোকেরাই প্রবেশ করে থাকে। আর জাহান্নাম বলেঃ “আমাকে অহংকারী লোকদের জন্যে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।” তখন মহা মহিমান্বিত আল্লাহ জান্নাতকে বলেনঃ “তুমি আমার রহমত বা করুণা।
আমি যাদেরকে ইচ্ছা করবো তোমার দ্বারা আরাম ও শান্তি দান করবো।” আর জাহান্নামকে বলেনঃ “তুমি আমার শাস্তি। আমি যাদেরকে চাইবো তোমার শাস্তি দ্বারা প্রতিশোধ গ্রহণ করবো। তোমরা উভয়েই পূর্ণ হয়ে যাবে।” বরাবরই বেহেশতে অতিরিক্ত জায়গা থাকবে। শেষ পর্যন্ত ওর জন্যে আল্লাহ তাআ’লা নতুন মাখলুক সৃষ্টি করবেন এবং তাদেরকে ওর মধ্যে বসিয়ে দিবেন। জাহান্নামও সদা সর্বদা তার মধ্যে অতিরিক্ত কিছু চাইতে থাকবে। তখন আল্লাহ তাআ’লা ওর মধ্যে নিজের পা রেখে দিবেন। তখন সে বলে উঠবেঃ “আপনার মর্যাদার কসম! যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে”।
আর আপনার রব ইচ্ছে করলে সমস্ত মানুষকে এক জাতি করতে পারতেন, কিন্তু তারা পরস্পর মতবিরোধকারীই রয়ে গেছে [১]।
[১] এর অর্থ তারা তাদের ধর্ম-বিশ্বাসে বিভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত হবেই। [ইবন কাসীর] তবে যাদেরকে আপনার প্রভু রহমত করেছেন তাদের ব্যাপারটি ভিন্ন। তারা হচ্ছেন রাসূলের প্রকৃত অনুসারী। যারা রাসূলের নির্দেশ অনুসারে দ্বীনকে আঁকড়ে ধরে ছিল, রাসূল যা জানিয়েছেন সেটা অনুসারে তারা চলেছে। তারপর যখন তাদের কাছে সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগমন করলেন, তখন তার অনুসরণ করেছে, তাকে সত্য বলে মেনেছে, তাকে সাহায্য করেছে। এভাবে তারা দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা লাভ করেছে। আর তারাই হচ্ছে মুক্তিপ্রাপ্ত দল। [ইবন কাসীর]
[سورة هود (11): الآيات 117 الى 119] পূর্ণ পৃষ্ঠা
[সুরা হুদ (১১): আয়াত ১১৭ থেকে ১১৯]আর আপনার পালনকর্তা এমন নন যে, তিনি জনপদসমূহকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস করবেন অথচ তার অধিবাসীরা সংশোধনকামী। (১১৭) আর আপনার প্রতিপালক যদি চাইতেন তবে অবশ্যই সমস্ত মানুষকে এক জাতিতে পরিণত করতেন, কিন্তু তারা সর্বদা মতভেদ করতেই থাকবে। (১১৮) তবে তারা ব্যতীত যাদের প্রতি আপনার প্রতিপালক দয়া করেছেন এবং এজন্যই তিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন; আর আপনার প্রতিপালকের এই কথাটি পূর্ণ হয়েছে যে, ‘আমি অবশ্যই জাহান্নামকে জিন ও মানুষ—উভয় দ্বারা পরিপূর্ণ করব’। (১১৯)আল্লাহ তাআলার বাণী: (আর আপনার পালনকর্তা এমন নন যে, তিনি জনপদসমূহকে ধ্বংস করবেন) অর্থাৎ জনপদবাসীদের।
(অন্যায়ভাবে) অর্থাৎ শিরক ও কুফরির কারণে। (অথচ তার অধিবাসীরা সংশোধনকামী) অর্থাৎ তারা নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক লেনদেন ও অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে সংশোধনকামী; এর অর্থ হলো—তিনি কেবল কুফরির কারণেই তাদের ধ্বংস করতেন না যতক্ষণ না তার সাথে পাপাচার ও বিপর্যয় যুক্ত হয়। যেমন তিনি শুআইব (আ.)-এর কওমকে মাপে ও ওজনে কম দেওয়ার কারণে এবং লুত (আ.)-এর কওমকে সমকামিতার কারণে ধ্বংস করেছিলেন। এটি একথার প্রমাণ বহন করে যে, শিরকের তুলনায় পাপাচার ও অবাধ্যতা দুনিয়াতে সমূলে বিনাশকারী আজাবের অধিক নিকটবর্তী, যদিও আখেরাতে শিরকের আজাব অধিক কঠিন। সহিহ তিরমিজিতে আবু বকর সিদ্দীক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, তিনি বলেন: আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি: "নিশ্চয়ই মানুষ যখন কোনো জালেমকে দেখেও তাকে বাধা দেয় না, তখন অতি শীঘ্রই আল্লাহ তাদের সকলকে তাঁর পক্ষ থেকে ব্যাপক শাস্তির অন্তর্ভুক্ত করবেন।" এটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
আবার বলা হয়েছে: এর অর্থ হলো—আপনার পালনকর্তা জনপদসমূহকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস করেন না যখন তারা মুসলিম থাকে; কারণ সেটি তাদের প্রতি জুলুম এবং তাদের প্রাপ্য হরণ করা হতো। অর্থাৎ তিনি কোনো সম্প্রদায়কে ওজর পেশের সুযোগ ও সতর্কবার্তা প্রদান ব্যতিরেকে ধ্বংস করেন না। যাজ্জাজ বলেন: এর অর্থ এমন হওয়াও সম্ভব যে—আপনার প্রতিপালক কাউকে তার প্রতি জুলুম করে ধ্বংস করেন না, যদিও সে পরম সৎকর্মশীল হয়; কারণ সৃষ্টিজগত তাঁর মালিকানাধীন, তিনি যা ইচ্ছা তা-ই করেন। এর দলিল হলো মহান আল্লাহর বাণী: "নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করেন না" [ইউনুস: ৪৪]।
আবার কেউ কেউ বলেন: এর অর্থ হলো—আল্লাহ তাদের পাপের কারণে ধ্বংস করবেন না যতক্ষণ তারা সংশোধনকামী, অর্থাৎ ঈমানে একনিষ্ঠ থাকবে। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী 'জুলুম' অর্থ হলো পাপাচার। আল্লাহ তাআলার বাণী: (আর আপনার প্রতিপালক যদি চাইতেন তবে অবশ্যই সমস্ত মানুষকে এক জাতিতে পরিণত করতেন) সাঈদ ইবনে জুবায়ের বলেন: কেবল ইসলাম ধর্মের ওপর। যাহহাক বলেন: সবাই এক ধর্মের অনুসারী হতো, চাই তারা হেদায়েতের ওপর হোক বা ভ্রষ্টতার ওপর। (কিন্তু তারা সর্বদা মতভেদ করতেই থাকবে) অর্থাৎ তারা বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী হয়েই থাকবে; এটি মুজাহিদ ও কাতাদাহর উক্তি। (তবে তারা ব্যতীত যাদের প্রতি আপনার প্রতিপালক দয়া করেছেন) এটি একটি বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম (ইস্তিসনা মুনকাতি); অর্থাৎ কিন্তু যাদের প্রতি আপনার প্রতিপালক ঈমান ও হেদায়েতের মাধ্যমে দয়া করেছেন, তারা মতভেদ করে না।
কেউ কেউ বলেন: তারা জীবিকার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন হয়, আর এটি...(১). দেখুন ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪২ এবং পরবর্তী অংশ।(২). দেখুন ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৬।
