Hud
হুদ: 7
11 হুদ Hud · 123 আয়াত هود
আরবি
وَهُوَ ٱلَّذِى خَلَقَ ٱلسَّمَـٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضَ فِى سِتَّةِ أَيَّامٍ وَكَانَ عَرْشُهُۥ عَلَى ٱلْمَآءِ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا ۗ وَلَئِن قُلْتَ إِنَّكُم مَّبْعُوثُونَ مِنۢ بَعْدِ ٱلْمَوْتِ لَيَقُولَنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُوٓا۟ إِنْ هَـٰذَآ إِلَّا سِحْرٌ مُّبِينٌ
English Translations
And it is He who created the heavens and the earth in six days - and His Throne had been upon water - that He might test you as to which of you is best in deed. But if you say, "Indeed, you are resurrected after death," those who disbelieve will surely say, "This is not but obvious magic."
And He it is Who has created the heavens and the earth in six Days and His Throne was on the water, that He might try you, which of you is the best in deeds. But if you were to say to them: "You shall indeed be raised up after death," those who disbelieve would be sure to say, "This is nothing but obvious magic."
He is the One who created the heavens and the earth in six days, while His throne was on water, so that He might test you as to who among you is better in deed. And if you say, “You shall be raised after death,” the disbelievers will surely say, “This is nothing but sheer magic.”
And He it is Who created the heavens and the earth in six days - and [before that] His Throne was upon the water that He may test you, who of you is better in conduct If you were to say (O Muhammad): 'All of you will surely be raised after death', then those who disbelieve will certainly say: 'This is nothing but plain sorcery.
And He it is Who created the heavens and the earth in six Days - and His Throne was upon the water - that He might try you, which of you is best in conduct. Yet if thou (O Muhammad) sayest: Lo! ye will be raised again after death! those who disbelieve will surely say: This is naught but mere magic.
He it is Who created the heavens and the earth in six Days - and His Throne was over the waters - that He might try you, which of you is best in conduct. But if thou wert to say to them, "Ye shall indeed be raised up after death", the Unbelievers would be sure to say, "This is nothing but obvious sorcery!"
বাংলা অনুবাদ
আর তিনিই আসমানসমূহ আর যমীনকে ছ’দিনে সৃষ্টি করেছেন। ইতোপূর্বে তাঁর আরশ ছিল পানির উপর। (সৃষ্টি করেছেন) তোমাদেরকে পরীক্ষা করার উদ্দেশে যে, তোমাদের মধ্যে ‘আমালের ক্ষেত্রে কারা শ্রেষ্ঠ। তুমি যদি বল, ‘‘মৃত্যুর পর তোমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই আবার উঠানো হবে, তাহলে কাফিররা অবশ্যই বলবে যে, এতো সুস্পষ্ট যাদু।
আর তিনিই আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে, আর তাঁর আরশ ছিল পানির উপর, যাতে তিনি পরীক্ষা করেন, কে তোমাদের মধ্যে আমলে সর্বোত্তম। আর তুমি যদি বল, ‘মৃত্যুর পর নিশ্চয় তোমাদেরকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে’, তবে কাফিররা অবশ্যই বলবে, ‘এতো শুধুই স্পষ্ট যাদু’।
আর তিনি এমন, যিনি সমস্ত আসমান ও যমীনকে সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে এবং সেই সময় তাঁর আরশ পানির উপর ছিল, যেন তোমাদেরকে পরীক্ষা করে নেন যে, তোমাদের মধ্যে উত্তম ‘আমলকারী কে? আর যদি তুমি বলঃ নিশ্চয়ই তোমাদেরকে মৃত্যুর পর জীবিত করা হবে, তখন যে সব লোক কাফির তারা বলেঃ এটাতো নিছক স্পষ্ট যাদু।
আর তিনিই আসমানসমূহ ও যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেন, আর তাঁর ‘আর্শ ছিল পানির উপর, তোমাদের মধ্যে কে আমলে শ্রেষ্ঠ তা পরীক্ষা করার জন্য। আর আপনি যদি বলেন, ‘নিশ্চয় মৃত্যুর পর তোমাদেরকে উত্থিত করা হবে’, তবে কাফেররা অবশ্যই বলবে, ‘এ তো সুস্পষ্ট জাদু।’
আর তিনিই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেন, তখন তাঁর ‘র্আশ ছিল পানির ওপর, (সৃষ্টি করেছেন) তোমাদের মধ্যে কে কার্যে শ্রেষ্ঠ তা পরীক্ষা করার জন্য। তুমি যদি বল: ‘মৃত্যুর পর তোমরা অবশ্যই উত্থিত হবে’, কাফিরগণ নিশ্চয়ই বলবে, ‘এটা তো সুস্পষ্ট জাদু।’
৭. সেই পূত-পবিত্র আল্লাহ, যিনি আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং সাত দিনে সৃষ্টি করেছেন এতদুভয়ের মাঝের সব কিছু। এদু’টি সৃষ্টির পূর্বে তাঁর আরশ ছিল পানির উপর। ওহে মানবজাতি! তোমাদেরকে তিনি এ মর্মে পরীক্ষা করবেন যে, তোমাদের মাঝে কে এমন সর্বোত্তম আমলকারী, যার দ্বারা সে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে পারে, পক্ষান্তরে কে এমন সর্বাধিক মন্দআমলকারী, যার দ্বারা সে তাঁকে অসন্তুষ্ট করবে। যার ফলে তিনি তাদের প্রত্যেককে তাদের প্রাপ্য প্রতিদান দিবেন। ওহে রাসূল! যদি আপনি বলেন, ওহে মানবজাতি! নিশ্চয়ই তোমরা মৃত্যুর পর হিসাবের জন্য পুনরুত্থিত হবে। ওরা অবশ্যই বলবে, যারা আল্লাহর সাথে কুফরী করে ও পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে: এ কুরআন স্পষ্ট যাদু ছাড়া আর কিছুই নয়, যা তুমি তেলাওয়াত কর, যা বাতিল ও স্পষ্ট ভ্রান্তিই বটে।
তাফসীর
৭-৮ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, প্রত্যেক জিনিষেরই উপর তাঁর ক্ষমতা রয়েছে, আসমানসমূহ ও যমীনকে তিনি ছ'দিনে সৃষ্টি করেছেন এবং এর পূর্বে তাঁর আর্শ পানির উপর ছিল। যেমন হযরত ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হে বানু তামীম (গোত্র)! তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর।” তারা বললো: “আপনি আমাদের সুসংবাদ তো প্রদান করলেন, সুতরাং আমাদেরকে তা দিয়ে দিন” তিনি (পুনরায়) বললেনঃ “হে ইয়ামনবাসী! তোমরা শুভ সংবাদ গ্রহণ কর।” তারা বললো: “আমরা গ্রহণ করলাম। সুতরাং সৃষ্টির সূচনা কি ভাবে হয়েছে তা আমাদেরকে শুনিয়ে দিন!” তিনি বললেনঃ “সর্ব প্রথম আল্লাহই ছিলেন এবং তার আর্শ ছিল পানির উপর। তিনি লাওহে মাহফূযে সব জিনিষের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন।” হাদীসের বর্ণনাকারী ইমরান (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ পর্যন্ত বলেছেন এমন সময় আমার কাছে এক আগন্তুক এসে বলেঃ “হে ইমরান (রাঃ)! আপনার উষ্ট্রিটি দড়ি ছিঁড়ে পালিয়ে গেছে। আমি তখন ওর খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। সুতরাং আমার চলে যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) কি বলেছিলেন তা আমার জানা নেই।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীদ মুসলিমেও ছিল না। আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, তাঁর সাথে কিছুই ছিল না এবং তার আর্শটি পানির উপর ছিল।হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা আসমান ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সমস্ত সৃষ্ট জীবের ভাগ্য লিখে রাখেন এবং তার আর্শটি পানির উপর ছিল।” (এ হাদীসটি সহীহ্ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে) এ হাদীসের তাফসীরে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (হে বান্দা)! তুমি (আমার পথে) খরচ কর, আমি তোমাকে তার প্রতিদান প্রদান করবো।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহর হাত পরিপূর্ণ রয়েছে। রাত দিনের খরচ তার কিছুই কমাতে পারে না। তোমরা কি দেখ না যে, আসমান যমীনের সৃষ্টি থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত কি পরিমাণ খরচ করে আসছেন? অথচ তাঁর দক্ষিণ হস্তে যা ছিল তার এতটুকুও কমে নাই। তার আর্শটি ছিল পানির উপর তাঁর হাতে মীযান (দাড়িপাল্লা) রয়েছে যা তিনি কখনো উঁচু করছেন এবং কখনো নীচু করছেন।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর ‘সহীহ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছে) আবু রাযীন লাকীত ইবনু আ’মির ইবনু মুনফিক আল আকলী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- “আমি জিজ্ঞেস করলাম- হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! মাখলুক সৃষ্টি করার পূর্বে আমাদের প্রতিপালক কোথায় ছিলেন?' উত্তরে তিনি বলেনঃ“তিনি আমা’তে ছিলেন যার নীচেও বাতাস এবং উপরেও বাতাস। এরপর তিনি আর্শ সৃষ্টি করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)এ রিওয়াইয়াতটি জামে’ তিরমিযীর কিতাবুত তাফসীরেও আছে এবং সুনানে ইবনু মাজাহ্তেও রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন। মুজাহিদের (রঃ) উক্তি এই যে, কোন কিছু সৃষ্টি করার পূর্বে আল্লাহ তাআ’লার আর্শটি পানির উপর ছিল। অহাব (রঃ), যমরা’ (রঃ) কাতাদা’ (রঃ), ইবনু জারীর (রঃ) প্রভৃতি গুরুজনও এ কথাই বলেন।(আরবি) আল্লাহ পাকের এ উক্তি সম্পর্কে হযরত কাতাদা’ (রঃ) বলেনঃ ‘আসমান ও যমীন সৃষ্টির পূর্বে মাখলুকের সূচনা কিরূপ ছিল, আল্লাহ তাআ’লা তোমাদেরকে তা জানিয়ে দিচ্ছেন।রাবী’ ইবনু আনাস (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লার আর্শ পানির উপর ছিল। অতঃপর যখন তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করলেন তখন ঐ পানিকে দু'ভাগে বিভক্ত করলেন। এক ভাগকে তিনি আর্শের নীচে রাখলেন এবং ওটাই হচ্ছে ‘বাহরে মাসজুর’। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ)। বলেন যে, উচ্চতার কারণেই আর্শকে আর্শ বলা হয়। সা’দ তাঈ (রঃ) বলেন যে, আর্শ হচ্ছে লাল ইয়াকূতেরই তৈরি। মুহাম্মদ ইবনু ইহসাক (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআ’লা ঐরূপই ছিলেন যেইরূপ তিনি স্বীয় পবিত্র ও মহান নফসের বর্ণনা দিয়েছেন। অর্থাৎ পানি ছাড়া আর কিছুই ছিল না এবং তাঁর আর্শ পানির উপর ছিল। আর্শের উপর ছিলেন মহত্ত্ব, দয়া, মর্যাদা, সাম্রাজ্য, রাজত্ব, ক্ষমতা, জ্ঞান, সহিষ্ণুতা, করুণা ও নিয়ামতের অধিপতি আল্লাহ। যিনি যা ইচ্ছা তা-ই করে থাকেন।হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, (আরবি) আল্লাহ পাকের এই উক্তির ব্যাপারে হযরত ইবনু আব্বাসকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “পানি কিসের উপর ছিল?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “বাতাসের পিঠের উপর।” আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবি) অর্থাৎ “যেন তোমাদেরকে পরীক্ষা করে নেন যে, তোমাদের মধ্যে উত্তম আমলকারী কে? আসমান ও যমীনের সৃষ্টি তোমাদেরই উপকারের জন্যে। তোমাদেরকে তিনি এ কারণেই সৃষ্টি করেছেন যে, তোমরা শুধু তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে অন্য কাউকেও শরীক করবে না। তিনি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেন নাই। যেমন তিনি বলেনঃ “আমি আসমান, যমীন ও এতোদুভয়ের মধ্যস্থিত বস্তুকে অনর্থক সৃষ্টি করি নাই, এটা হচ্ছে কাফিরদের ধারণা, আর কাফিরদেরকে জাহান্নামের দুর্ভোগ পোহাতেই হবে।” আল্লাহ তাআ’লা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তবে কি তোমরা এই ধারণা করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি। আর এটাও (ধারণা করেছিলে) যে, তোমাদেরকে আমার কাছে আসতে হবে না? অতএব আল্লাহ অতি উচ্চ মর্যাদাবান, যিনি প্রকৃত বাদশাহ তিনি ছাড়া কেউই ইবাদতের যোগ্য নেই, তিনি সম্মানিত আর্শের মা’লিক।” (২৩: ১১৫) আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি দানব ও মানবকে আমার ইবাদতের জন্যেই সৃষ্টি করেছি।” (৫১: ৫৬) আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘যেন তোমাদেরকে তিনি পরীক্ষা করেন যে, তোমাদের মধ্যে উত্তম আমলকারী কে?’ মহান আল্লাহ উত্তম আমলকারী বলেছেন, অধিক আমলকারী বলেন নাই। কেননা উত্তম আমল হচ্ছে ওটাই যেটার মধ্যে থাকে আন্তরিয্কতা এবং যেটা প্রতিষ্ঠিত হয় রাসূলুল্লাহর (সঃ) শরীয়তের উপর। এ দুটোর মধ্যে একটা না থাকলেই সেই আমল হবে বৃথা ও মূল্যহীন।এরপর আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি যদি এই মুশরিকদেরকে খবর দাও যে, আল্লাহ তাদেরকে তাদের মৃত্যুর পর পুনরায় উথিত করবেন তবে তারা স্পষ্টভাবে বলবে- আমরা এটা মানি না। অথচ তারা জানে যে, যমীন ও আসমানের সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন আল্লাহ। যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর যে, তাদেরকে কে সৃষ্টি করেছেন? তবে অবশ্যই তারা উত্তরে বলবে আল্লাহ। (৪৩: ৮৭) আর যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর আসমানসমূহ ও যমীনকে কে সৃষ্টি করেছেন এবং কে সূর্য ও চন্দ্রকে (মানুষের সেবার) কাজে নিয়োজিত রেখেছেন? তবে উত্তরে অবশ্যই তারা বলবে- আল্লাহ।” (২৯: ৬১) এতদ্সত্ত্বেও তারা পুনরুত্থানকে অস্বীকার করছে! এটা তো স্পষ্ট কথা যে, প্রথমবার সৃষ্টি করা যাঁর পক্ষে কঠিন হয় নাই, দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করাও তাঁর পক্ষে কঠিন হবে না। বরং প্রথমবারের তুলনায় দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা তো আরো সহজ। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তিনি এমন যে, তিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই পুনর্বার সৃষ্টি করবেন, আর এটা তাঁর কাছে অতি সহজ।” (৩০: ২৭) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমাদেরকে সৃষ্টি করা এবং পুনরুত্থিত করা একটি প্রাণ সৃষ্টি করার মতই (সহজ)।” (৩১: ২৮) তাদের উক্তিঃ (আরবি) অর্থাৎ মুশরিকরা অস্বীকার ও বিরোধীতা বশতঃ বলেঃ হে মুহাম্মদ (সঃ) আপনি যে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার কথা বলছেন, আমরা আপনার এ কথা বিশ্বাস করি না। এটা স্পষ্ট যাদু ছাড়া আর কিছুই নয়।আল্লাহ তাআ’লার উক্তিঃ (আরবি)অর্থাৎ যদি আমি কিছু দিনের জন্যে তাদের থেকে শাস্তিকে মূলতবী করে রাখি তবে তারা ঐ শাস্তি আসবে না মনে করে বলে- এই শাস্তিকে কিসে আটকিয়ে রাখছে? তাদের অন্তরে কুফরী ও শির্ক এমনভাবে বদ্ধমূল হয়েছে যে, তাদের অন্তর থেকে কোন ক্রমেই তা দূর হচ্ছে না।কুরআন ও হাদীসে (আরবি) শব্দটি কয়েকটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কোন কোন সময় এই শব্দ দ্বারা সময় বা সময়ের দৈর্ঘ্য বুঝানো হয়েছে। যেমন (আরবি) এই স্থলে এবং সূরায়ে ইউসুফের (আরবি) এই আয়াতে। অর্থাৎ “বন্দীদ্বয়ের মধ্যে যেই ব্যক্তি মুক্তি পেয়েছিল এবং বহুদিন পর তার স্মরণ হলো, সে বললো....।” (১২: ৪৫) অনুসরণীয় ইমামের অর্থেও (আরবি) শব্দ ব্যবহৃত হয়। যেমন হযরত ইবরাহীমের (আঃ) ব্যাপারে (আরবি) এসেছে। ‘মিল্লাত’ ও ‘দ্বীন’ অর্থেও এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তাআ’লা মুশরিকদের ব্যাপারে খবর দিতে গিয়ে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “নিশ্চয় আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকে একটা দ্বীনের উপর পেয়েছি এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণকারী।” (৪৩: ২৩) এ শব্দটি জামাআত বা দল অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যেমন আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবি)অর্থাৎ “যখন সে (মূসা আঃ) মাদইয়ানের পানির (কূপের) নিকট পৌঁছলো, তখন তথায় একদল লোককে দেখতে পেলো, যারা নিজেদের পশুগুলিকে পানি পান করাচ্ছিল। (২৮: ২৩) আরো মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক দলের মধ্যে (এ কথা বলার জন্যে) রাসূল পাঠিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহরই ইবাদত করবে এবং তাগূত বা শয়তান থেকে দূরে থাকবে।” (১৬: ৩৬) আল্লাহ তাআ’লা আরো বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “প্রত্যেক দলের জন্যে একজন রাসূল রয়েছে, সুতরাং যখন তাদের রাসূল এসে পড়ে তখন সে তাদের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করে এবং তারা অত্যাচারিত হয় না।” (১০: ৪৭) যেমন সহীহ মুসলিমে রয়েছে (রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন) “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এই উম্মতের যে ইয়াহুদী ও খৃষ্টান আমার নাম শুনলো অথচ ঈমান আনলো না সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” তবে অনুগত দল ওটাই যারা রাসূলদের সত্যতা স্বীকার করে। যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা উত্তম সম্প্রদায়, যে সম্প্রদায়কে প্রকাশ করা হয়েছে মানবমন্ডলীর জন্যে।” (৩: ১১০) সহীহ হাদীসে রয়েছে (যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন) “আমি বলবো- আমার উম্মত! আমার উম্মত!” (আরবি) শব্দটি শ্ৰেণী বা গোষ্ঠী অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যেমন আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবি)অর্থাৎ “মূসার (আঃ) কওমের মধ্যে এমন শ্রেণীর লোকও রয়েছে যারা সত্যের পথে চলে এবং ওর মাধ্যমেই ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে।” (৭: ১৫৯) আল্লাহ তাআ’লা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি)… অর্থাৎ “আহলে কিতাবদের মধ্যে এক শ্রেণী তারাও যারা (সত্য ধর্মে) সুপ্রতিষ্ঠিত।
আর তিনিই আসমানসমূহ ও যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেন, আর তাঁর ‘আর্শ ছিল পানির উপর [১], তোমাদের মধ্যে কে আমলে শ্রেষ্ঠ [২] তা পরীক্ষা করার জন্য [৩]। আর আপনি যদি বলেন, ‘নিশ্চয় মৃত্যুর পর তোমাদেরকে উত্থিত করা হবে’, তবে কাফেররা অবশ্যই বলবে, ‘এ তো সুস্পষ্ট জাদু [৪]।’
[১] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহর ডান হাত পরিপূর্ণ, দিন-রাত খরচ করলেও তা কমে না। তোমরা কি দেখ না যে, আসমান ও যমীনের সৃষ্টি সময় থেকে আজ পর্যন্ত তিনি কত বিপুল পরিমাণে খরচ করেছেন? তবুও তার ডান হাতের কিছুই কমেনি। আর তার আরশ পানির উপর অবস্থিত ছিল। তাঁর অন্য হাতে রয়েছে ইনসাফের দাঁড়িপাল্লা, সে অনুসারে বৃদ্ধি-ঘাটতি বা উন্নতি অবনতি ঘটান।[বুখারীঃ ৭৪১৯] অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ইমরান ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ "শুধু আল্লাহ্ই ছিলেন, তাঁর পূর্বে কেউ ছিল না। আর তাঁর আরশ ছিল পানির উপর এবং তিনি যিকর বা ভাগ্যফলে সবকিছু লিখে নেন এবং আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেন। [বুখারীঃ ৩১৯১] অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,"আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সমস্ত সৃষ্টি জগতের তাকদীর লিখে রেখেছেন। আর তাঁর আরশ ছিল পানির উপর"। [মুসলিমঃ ২৬৫৩]
মোট কথা, কুরআনের ২১টি আয়াতে আরশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অনুরূপভাবে সহীহ হাদীসেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরশের বিভিন্ন বর্ণনা দিয়েছেন। সে সমস্ত হাদীস মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌছেগেছে। মূলতঃ আরশ হলো আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি। সেটা প্রকাণ্ড ও সর্ববৃহৎ সৃষ্টি। আরশের সামনে কুরসী একটি রিং এর মতো, যেমনিভাবে আসমান ও যমীন কুরসীর সামনে রিং এর মতো। আরশের গঠন গম্বুজের মত। যা সমস্ত সৃষ্টি জগতের উপরে রয়েছে। এমনকি জান্নাতুল ফেরদাউসও আরশের নীচে অবস্থিত। আরশের কয়েকটি পা রয়েছে। মূসা আলাইহিসসালাম হাশরের মাঠে তার একটি ধরে থাকবেন। এ আরশের বহনকারী কিছু ফিরিশতা রয়েছেন। তাদের ব্যাপারে পবিত্র কুরআন ঘোষণা দিচ্ছেন যে, কিয়ামতের দিন তারা হবেন আট। [সূরা আল-হাক্কাহঃ ১৭] তবে এ ব্যাপারে ভিন্ন মত রয়েছে যে, আরশের বহনকারী ফিরিশতাগণ কি আট জন নাকি আট শ্রেণী নাকি আট কাতার। এ আয়াতে বর্ণিত পানির উপর আরশ থাকার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ্ তা'আলার আরশ কোন কিছু সৃষ্টি করার আগে পানির উপর ছিল। এর দ্বারা পানি আগে সৃষ্টি করা বুঝায় না। তবে এখানে পানি দ্বারা দুনিয়ার কোন সমুদ্রের পানি বুঝানো হয়নি। কেননা, তা আরো অনেক পরে সৃষ্ট। বরং এখানে আল্লাহর সৃষ্ট সুনিদিষ্ট কোন পানি উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। [এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, ইবনে কাসীর প্রণীত আল- বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ১ম খণ্ড]।
[২] লক্ষ্য করুন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “কে কাজে শ্রেষ্ঠ” তা তিনি পরীক্ষা করবেন। তিনি ‘কে বেশী কাজ করেছে পরীক্ষা করবেন তা কিন্তু বলেননি। কেননা, আল্লাহ্র দরবারে পরিমানের চেয়ে মান-সম্মত হওয়াই গ্রহণযোগ্য। আর আল্লাহ্র দরবারে কোন কাজ মান-সম্মত সে সময়ই হতে পারে যখন তা আল্লাহর নির্দেশ মত এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদর্শিত পস্থায় হবে। নতুবা তা গ্রহণযোগ্যতাই হারাবে।
[৩] এ বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে, মহান আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবী এজন্য সৃষ্টি করেছেন যা মূলত তোমাদের (অর্থাৎ মানুষ) সৃষ্টি করাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। অর্থাৎ এর মাধ্যমে সৃষ্টিকুলকে পরীক্ষা করা। তিনি সেটাকে অকারণে বা অনাহুত তৈরী করেন নি। তিনি নিজেকে এ ধরনের অনাহুত ও বেহুদা সৃষ্টি করা থেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন। তাছাড়া এটাও বলেছেন যে, কাফেররাই শুধু আসমান ও যমীনকে বেহুদা সৃষ্টি করেছেন বলে মনে করে থাকে। তাদের এ ধারণার জন্য তিনি তাদের উপর কঠোর সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, “আমি আকাশ, পৃথিবী এবং এ দুয়ের মধ্যবর্তী কোন কিছুই অনর্থক সৃষ্টি করিনি। অনর্থক সৃষ্টি করার ধারণা তাদের যারা কাফির, কাজেই কাফিরদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের দুর্ভোগ। [সূরা সোয়াদঃ ২৭] আরো বলেনঃ “তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না? মহিমান্বিত আল্লাহ্ যিনি প্রকৃত মালিক, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই; সম্মানিত আৱশের তিনি অধিপতি। [সূরা আল-মুমিনূনঃ ১১৫-১১৬] তিনি আরো বলেনঃ “আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা একমাত্র আমারই ‘ইবাদাত করবে। [সূরা আয-যারিয়াতঃ ৫৬] হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ বলেন, তুমি ব্যয় কর, তোমার উপর ব্যয় করা হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, আল্লাহ্র হাত পরিপূর্ণ। কোন প্রকার ব্যয় তাতে কোন কিছুর ঘাটতি করে না। দিন-রাত তা প্রচুর পরিমানে দান করে। তোমরা আমাকে জানাও, আসমান ও যমীনের সৃষ্টিলগ্ন থেকে যত কিছু ব্যয় হয়েছে সেসব কিছু তার হাতে যা আছে তাতে সামান্যও ঘাটতি করে না। আর তার আরশ হচ্ছে পানির উপর এবং তার হাতেই রয়েছে মীযান, তিনি সেটাকে উপর-নীচু করেন।’ [বুখারী ৪৬৮৪; মুসলিম: ৩৭] অন্য হাদীসে ইমরান ইবন হুসাইন বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে প্রবেশ করলাম আর আমার উটটি দরজার কাছে বেঁধে রাখলাম। তখন তার কাছে বনু তামীম প্রবেশ করলে তিনি বললেন, বনু তামীম তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। তারা বলল, সুসংবাদ তো দিলেন, এবার আমাদেরকে কিছু দিন (সম্পদ)। এটা তারা দু’বার বললেন। তখন রাসূলের কাছে ইয়ামেনের কিছু লোক প্রবেশ করল। তিনি বললেন, হে ইয়ামেনবাসী তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর, যখন বনু তামীম সেটা গ্রহণ করল না। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তা গ্রহণ করলাম। তারা আরও বলল, আমরা এ বিষয়ে প্রথম কি তা জানতে চাই। তিনি বললেন, আল্লাহ্ই ছিলেন, তিনি ছাড়া আর কিছু ছিল না। আর তাঁর আরশ ছিল পানির উপর। আর তিনি সবকিছু যিকর (লাওহে মাহফুযে) লিখে রেখেছিলেন। আর তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেন। বর্ণনাকার ইমরান ইবন হুসাইন বলেন, তখন একজন আহবানকারী ডেকে বলল, হে ইবনুল হুসাইন! তোমার উষ্ট্রীটি চলে গেছে। তখন আমি বেরিয়ে পড়ে দেখলাম, উটটি এতদুর চলে গেছে যে, যেদিকে তাকাই শুধু মরিচিকা দেখতে পাই। আল্লাহর শপথ আমার ইচ্ছা হচ্ছিল আমি যেন সেটাকে একেবারেই ছেড়ে দেই ( অর্থাৎ রাসূলের মাজলিস থেকে বের হতে তার ইচ্ছা হচ্ছিল না )" [বুখারী: ৩১৯১]
[৪] অর্থাৎ যখন আপনি তাদেরকে পুনরুত্থানের কথা বুঝাতে থাকেন তখন তারা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে এবং আপনাকে এ বলে বিদ্রুপ করতে থাকে যে, আপনি তো জাদুকরের মতো কথা বলছেন। এভাবে তারা আখেরাতের দাবী ও যৌক্তিকতাকে বুঝা সত্বেও মেনে নিতে পারেনি। অথচ যিনি একবার সৃষ্টি করেছেন তারপক্ষে পূনর্বার সৃষ্টি করা কোন ব্যাপারই নয়। আল্লাহ্ বলেনঃ “আর তিনিই সৃষ্টিজগতকে প্রথম সৃষ্টি করেছেন তারপর তিনিই তা পূনর্বার করবেন, এটা তার জন্য অত্যন্ত সহজ।" [সূরা আর রূমঃ ২৭] আল্লাহ আরো বলেনঃ “তোমাদের সৃষ্টি ও পূনঃসৃষ্টি তো একজনের মতই” [সূরা লুকমানঃ ২৮]
