Hud
হুদ: 17
11 হুদ Hud · 123 আয়াত هود
আরবি
أَفَمَن كَانَ عَلَىٰ بَيِّنَةٍ مِّن رَّبِّهِۦ وَيَتْلُوهُ شَاهِدٌ مِّنْهُ وَمِن قَبْلِهِۦ كِتَـٰبُ مُوسَىٰٓ إِمَامًا وَرَحْمَةً ۚ أُو۟لَـٰٓئِكَ يُؤْمِنُونَ بِهِۦ ۚ وَمَن يَكْفُرْ بِهِۦ مِنَ ٱلْأَحْزَابِ فَٱلنَّارُ مَوْعِدُهُۥ ۚ فَلَا تَكُ فِى مِرْيَةٍ مِّنْهُ ۚ إِنَّهُ ٱلْحَقُّ مِن رَّبِّكَ وَلَـٰكِنَّ أَكْثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يُؤْمِنُونَ
English Translations
So is one who [stands] upon a clear evidence from his Lord [like the aforementioned]? And a witness from Him follows it, and before it was the Scripture of Moses to lead and as mercy. Those [believers in the former revelations] believe in it [i.e., the Qur’ān]. But whoever disbelieves in it from the [various] factions - the Fire is his promised destination. So be not in doubt about it. Indeed, it is the truth from your Lord, but most of the people do not believe.
Can they (Muslims) who rely on a clear proof (the Quran) from their Lord, and whom a witness [Prophet Muhammad SAW through Jibrael (Gabriel)] from Him follows it (can they be equal with the disbelievers); and before it, came the Book of Musa (Moses), a guidance and a mercy, they believe therein, but those of the sects (Jews, Christians and all the other non-Muslim nations) that reject it (the Quran), the Fire will be their promised meeting-place. So be not in doubt about it (i.e. those who denied Prophet Muhammad SAW and also denied all that which he brought from Allah, surely, they will enter Hell). Verily, it is the truth from your Lord, but most of the mankind believe not.
Then, can such people be equal to the one who has a clear proof from his Lord, followed by an evidence from within, and before which there was the Book of Mūsā, a guide and a mercy? Such people believe in it; and whoever of the groups denies its veracity, his promised place is the Fire. So, do not be in doubt about it. Surely, it is the truth from your Lord, but most of people do not believe.
Can it happen that he who takes his stand on a clear evidence from his Lord, subsequently followed by a witness from Him (in his support), and prior to that the Book of Moses was revealed as a guide and a mercy, (would even he deny the truth in the manner of those who adore the life of this world)? Rather, such men are bound to believe in it. The Fire shall be the promised resort of the groups that disbelieve. So be in no doubt about it for this indeed is the truth from your Lord although most people do not believe.
Is he (to be counted equal with them) who relieth on a clear proof from his Lord, and a witness from Him reciteth it, and before it was the Book of Moses, an example and a mercy? Such believe therein, and whoso disbelieveth therein of the clans, the Fire is his appointed place. So be not thou in doubt concerning it. Lo! it is the Truth from thy Lord; but most of mankind believe not.
Can they be (like) those who accept a Clear (Sign) from their Lord, and whom a witness from Himself doth teach, as did the Book of Moses before it,- a guide and a mercy? They believe therein; but those of the Sects that reject it,- the Fire will be their promised meeting-place. Be not then in doubt thereon: for it is the truth from thy Lord: yet many among men do not believe!
বাংলা অনুবাদ
তাহলে যে লোক তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণের উপর আছে এবং তাঁর পক্ষ হতে এক সাক্ষী ওটা পড়ে শোনাচ্ছে (সে কি অবিশ্বাসীদের সমান হতে পারে?) আর তার পূর্বে পথ প্রদর্শক ও রহমত স্বরূপ এসেছিল মূসার কিতাব। ওরাই তাতে (অর্থাৎ কুরআনে) বিশ্বাসী। যারাই এটাকে অস্বীকার করবে, জাহান্নামই হল তাদের প্রতিশ্রুত স্থান। কাজেই এ সম্পর্কে তুমি কোন প্রকার সন্দেহে নিপতিত হয়ো না। এটা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আগত প্রকৃত সত্য, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করে না।
যারা তার রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং অনুসরণ করে তাঁর পক্ষ থেকে একজন সাক্ষী* এবং যার পূর্বে রয়েছে মূসার কিতাব পথপ্রদর্শক ও রহমতস্বরূপ,(তারা কি ঐ লোকদের মত, যারা দুনিয়া ও তার জৌলুস কামনায় বিভোর?) এরাই তার প্রতি ঈমান পোষণ করে। আর যে সকল দল তা অস্বীকার করে, আগুনই হবে তাদের প্রতিশ্রুত স্থান। সুতরাং তুমি এতে মোটেও সন্দেহের মধ্যে থেকো না, নিশ্চয় তা তোমার রবের পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ঈমান আনে না। * সাক্ষী দ্বারা মুহাম্মাদ সা. কে বুঝানো হয়েছে।
তারা কি এমন ব্যক্তিদের সমান হতে পারে যারা কায়েম আছে তাদের রবের পক্ষ হতে প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণের উপর এবং যার কাছে তাঁর প্রেরিত এক সাক্ষী আবৃত্তি করে; এবং তাদের কাছে মূসার কিতাব রয়েছে, যা পথনির্দেশ ও রাহমাত স্বরূপ? এমন লোকেরাই এর প্রতি ঈমান রাখে। আর অন্যান্য সম্প্রদায়ের যে ইহা (কুরআন) অমান্য করবে, জাহান্নাম হবে তার প্রতিশ্রুত স্থান। অতএব তুমি কুরআন সম্পর্কে সন্দেহে পতিত হয়োনা, নিঃসন্দেহে এটি সত্য কিতাব তোমার রবের সন্নিধান হতে। কিন্তু অধিকাংশ লোক ঈমান আনেনা।
তারা কি তার সমতুল্য যে তার রব প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং যারা অনুসরণ করে তাঁর প্রেরিত সাক্ষী এবং যার আগে ছিল মূসার কিতাব আদর্শ ও অনুগ্রহস্বরূপ? তারাই এটাতে ঈমান রাখে। অন্যান্য দলের যারা তাতে কুফরী করে, আগুনই তাদের প্রতিশ্রুত স্থান। কাজেই আপনি এতে সন্দ্বিগ্ন হবেন না। এটা তো আপনার রবের প্রেরিত সত্য, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ঈমান আনে না।
তারা কি তাদের সমতুল্য যারা প্রতিষ্ঠিত তাদের প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণের ওপর, যার অনুসরণ করে তাঁর প্রেরিত সাক্ষী এবং যার পূর্বে ছিল মূসার কিতাব আদর্শ ও অনুগ্রহস্বরূপ? তারাই এতে বিশ্বাসী। অন্যান্য দলের যারা একে অস্বীকার করে, অগ্নিই তাদের প্রতিশ্র“ত স্থান। সুতরাং তুমি এতে সন্দেহে নিপতিত হয়ো না। এটা তো তোমার প্রতিপালক প্রেরিত সত্য, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করে না।
১৭. নবী মুহাম্মাদের সমান আর কে হবে? যাঁর নিকট রয়েছে তাঁর রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণ এবং তাঁর রবের পক্ষ থেকে এমন এক সাক্ষী তার অনুসরণ করে যিনি হলেন জিবরীল। আর ইতোপূর্ব তার নবুওয়্যতের সাক্ষ্য দিয়েছে তাওরাত, যা মূসার প্রতি মানুষের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ ও রহমত স্বরূপ অবতীর্ণ হয়েছিল। বস্তুতঃ তিনি ও তাঁর ঈমানদার সাথী এবং গুমরাহীতে আচ্ছন্ন ওই কাফেররা এক হতে পারে না। ওরা কুরআনের উপর এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপরও ঈমান এনেছে, যাঁর উপর কুর‘আন অবতীর্ণ হয়েছে। মূলতঃ যে সব জাতি তাঁর প্রতি কুফরী করবে কিয়ামতের দিন জাহান্নামই হবে তাদের প্রতিশ্রুত ঠিকানা। অতএব ওহে রাসূল! আপনি কুর‘আন ও তাদের প্রতিশ্রুত ঠিকানার ব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহে পতিত হবেন না, বরং এটি সেই হক যার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। তবুও অধিকাংশ মানুষ স্পষ্ট দলীল এবং অকাট্য প্রমাণ সত্ত্বেও তার প্রতি ঈমান আনে না।
তাফসীর
এখানে আল্লাহ তাআ’লা ঐ মু’মিনদের অবস্থার সংবাদ দিচ্ছেন যারা তাঁর সেই প্রকৃতির উপর রয়েছে যার উপর তিনি তাঁর বান্দাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। যারা তাঁর একত্ববাদকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে অর্থাৎ যারা স্বীকার করে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউই উপাস্য নেই। যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “তুমি তোমার মুখমন্ডলকে একনিষ্ট ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত কর, এটা হচ্ছে আল্লাহর প্রকৃতি যার উপর তিনি মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন।” সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেকটি সন্তান (ইসলামী) প্রকৃতির উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে। অতঃপর তার পিতামাতা তাকে ইয়াহুদী, খৃস্টান ও মাজূস বানিয়ে দেয়। যেমন পশুর বাচ্চা নিখুঁত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিশিষ্ট হয়েই ভূমিষ্ঠ হয়ে থাকে। তোমরা কি ওকে কান কাটা অবস্থায় দেখতে পাও (অর্থাৎ জন্মের সময় ওর কান কাটা থাকে না, বরং পরে মানুষই তার কান কেটে থাকে)?”সহীহ মুসলিমে হযরত আইয়ায ইবনু হাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “আমি আমার বান্দাদেরকে একত্ববাদীরূপেই সৃষ্টি করেছি। কিন্তু শয়তান তাদেরকে তাদের দ্বীন হতে বিভ্রান্ত করেছে এবং তাদের উপর আমি যা হালাল করিছে তা হারাম করেছে। আর তাদেরকে আদেশ করেছে যে, তারা যেন আমার সাথে এমন কিছুকে শরীক করে, আমি যার কোন দলীল প্রমাণ অবতীর্ণ করি নাই।”মুসনাদ ও সুনানে রয়েছেঃ “প্রতিটি সন্তান এই মিল্লাতের উপরই জন্মগ্রহণ করে। অবশেষে তার বাকশক্তি খুলে দেয়া হয়।” সুতরাং মু'মিন এই ফিতরাতের উপরই বাকি থেকে যায়। অতএব, একদিকে তো তার ফিতরাত বা প্রকৃতি সঠিক ও নিখুঁত হয়, অপর দিকে তার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে স্বাক্ষী এসে থাকে। তা হচ্ছে মহান শরীয়ত, যা তিনি নবীদেরকে দিয়েছেন এবং এসব শরীয়ত হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর শরীয়তের উপর শেষ হয়ে গেছে। এ জন্যেই হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত আবু আলিয়া (রঃ), হযরত যহ্হাক (রঃ), হযরত ইবরাহীম নাখয়ী (রঃ), হযরত সুদ্দী (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন (আরবি) সম্পর্কে বলেন যে, এই সাক্ষী হচ্ছেন হযরত জিব্রাইল (আঃ)। আর হযরত আলী (রাঃ), হযরত হাসান (রাঃ) এবং হযরত কাতাদা’ (রঃ) বলেন যে, এই সাক্ষী হচ্ছেন হযরত মুহাম্মদ (সঃ)। অর্থের দিক দিয়ে এ দুটো প্রায় সমান। কেননা হযরত জিব্রাইল (আঃ) ও হযরত মুহাম্মদ (সঃ) উভয়েই আল্লাহ তাআ’লার রিসালত প্রচার করেছেন। হযরত জিব্রাঈল (আঃ) পৌঁছিয়ে দিয়েছেন হযরত মুহাম্মদের (সঃ) কাছে এবং হযরত মুহাম্মদ (সঃ) পৌঁছিয়ে দিয়েছেন তাঁর উম্মতের কাছে। আবার বলা হয়েছে যে, এই সাক্ষী হচ্ছেন হযরত আলী (রাঃ) কিন্তু এটা দুর্বল উক্তি। এর কোন উক্তিকারী সাব্যস্ত হয় নাই। প্রথম ও দ্বিতীয় উক্তিই সত্য।সুতরাং মু’মিনের ফিতরাত বা প্রকৃতি আল্লাহর ওয়াহীর সাথে মিলে যায়। সংক্ষিপ্তভাবে ওর বিশ্বাস প্রথম থেকেই থাকে। অতঃপর ওটা শরীয়তের বিস্তারিত ব্যাখ্যাকে মেনে নেয়। তার ফিতরাত বা প্রকৃতি এক একটি মাস্আলার সত্যতা স্বীকার করতে থাকে। অতঃপর সঠিক ও নিখুঁত ফিতরাতের সাথে মিলিত হয় পবিত্র কুরআনের শিক্ষা, যা হযরত জিব্রাঈল (আঃ) আল্লাহর নবীর (সঃ) কাছে পৌঁছিয়ে দেন এবং নবী (সঃ) পৌঁছিয়ে দেন তার উম্মতের কাছে। আল্লাহ পাকের উক্তি (আরবি) অর্থাৎ কুরআনের পূর্বে মূসার (আঃ) কিতাব বিদ্যমান ছিল এবং তা হচ্ছে তাওরাত। এই কিতাবকে আল্লাহ তাআ’লা ঐ যুগের উম্মতের জন্যে পরিচালকরূপে পাঠিয়েছিলেন এবং ওটা ছিল তাঁর পক্ষ থেকে করুণা স্বরূপ। এই কিতাবের উপর যার পূর্ণ ঈমান রয়েছে সে অবশ্যই এই নবী (সঃ) এবং এই কিতাব অর্থাৎ কুরআনে কারীমের উপরও ঈমান আনবে। কেননা, ঐ কিতাব এই কিতাবের উপর ঈমান আনয়নের ব্যাপারে পথ প্রদর্শক স্বরূপ।এরপর আল্লাহ তাআ’লা পূর্ণ কুরআন বা কুরআনের কিছু অংশ অমান্যকারীদের শাস্তির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন যে, জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে দুনিয়ার যে কোন জামাআত বা দলের কাছে কুরআনের অমীয় বাণী পৌঁছলো, অথচ তারা ওর উপর ঈমান আনলো না তারা নিঃসন্দেহে জাহান্নামী। যেমন আল্লাহ রাব্বল আলামীন স্বীয় পাক কালামের মধ্যে স্বীয় নবীর (সঃ) উক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যেন আমি তোমাদেরকে এর মাধ্যমে ভয় প্রদর্শন করি এবং তাদেরকেও ভয় প্রদর্শন করি যাদের কাছে এটা পৌঁছে গেছে।” (৬: ১৯) অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে জনমন্ডলী! নিশ্চয় আমি তোমাদের সবারই নিকট আল্লাহর রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছি।” (৭: ১৫৮) আল্লাহ তাআ’লা আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “দলসমূহের যে কেউ এটাকে অমান্য করবে তাদের প্রতিশ্রুত স্থান হচ্ছে জাহান্নাম।” হযরত আবু মুসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে সত্ত্বার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! এই উম্মতের মধ্য হতে যে ইয়াহুদী বা খৃস্টান আমার কথা শুনলো অথচ ওর উপর ঈমান আনলো না সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন) হযরত সাঈদ ইবনু জুবাইর (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি যে বিশুদ্ধ হাদীসই শুনতাম, ওর সত্যতার সমর্থন আল্লাহর কিতাবে অবশ্যই পেতাম। উপরোল্লিখিত হাদীসটি শুনে কুরআন কারীমের কোন্ আয়াতে এর সত্যতার সমর্থন মিলে তা আমি অনুসন্ধান করতে লাগলাম। তখন আমি এই আয়াতটি পেলাম। সুতরাং এর দ্বারা সমস্ত দ্বীনের লোকই উদ্দেশ্য।মহান আল্লাহর উক্তিঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ) এই পবিত্র কুরআন সরাসরি তোমার প্রতিপালক আল্লাহর পক্ষ হতে আসার ব্যাপারে তোমার মোটেই সন্দেহ পোষণ করা উচিত নয়। যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আলিফ, লাম, মীম। এ কিতাবটি (আল কুরআন) বিশ্ব প্রতিপালকের পক্ষ হতে অবতারিত হওয়ার ব্যাপারে কোনই সন্দেহ নেই।” (৩২: ১-২) আল্লাহ পাক আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আলিফ, লাম, মীম। এই কিতাবে (কুরআনে) কোনই সংশয় ও সন্দেহ নেই।” (২: ১-২)। আল্লাহ পাকের (আরবি) (কিন্তু অধিকাংশ লোকই ঈমান আনয়ন করে না) এই উক্তিটি তাঁর নিম্নের উক্তির মতইঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি আকাক্ষা করলেও অধিকাংশ লোকই ঈমানদার নয়।” (১২: ১০৩) এক জায়গায় আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ) তুমি যদি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের অনুসরণ কর তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে ফেলবে। (৬: ১১৬) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “ইবলীস (শয়তান) তাদের উপর নিজের ধারণাকে সত্য রূপে দেখিয়েছে, সুতরাং মু’মিনদের একটি দল ছাড়া সবাই তার অনুসরণ করেছে। (৩৪:২০)
তারা [১] কি তার সমতুল্য যে তার রব প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত [২] এবং যারা অনুসরণ করে তাঁর প্রেরিত সাক্ষী [৩] এবং যার আগে ছিল মূসার কিতাব আদর্শ ও অনুগ্রহস্বরূপ? তারাই এটাতে [৪] ঈমান রাখে। অন্যান্য দলের যারা তাতে [৫] কুফরী করে, আগুনই তাদের প্রতিশ্রুত স্থান [৬]। কাজেই আপনি এতে [৭] সন্দ্বিগ্ন হবেন না। এটা তো আপনার রবের প্রেরিত সত্য, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ঈমান আনে না [৮]।
[১] অর্থাৎ পূর্ব ১৫ ও ১৬ নং আয়াতে বর্ণিত কাফেরগণ কি এ আয়াতে আগত লোকদের সমতুল্য [মুয়াসসার] অথবা যারা তাদের রবের প্রেরিত প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত তারা কি তাদের মত যারা তাদের রব প্রেরিত প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়? [জালালাইন]
[২] বলা হয়েছে, যে তার রবের পক্ষ থেকে আগত প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিটি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অথবা ঈমানদারগণ সবাই। [জালালাইন] আর স্পষ্ট প্রমাণ’ বলতে কি বোঝানো হয়েছে এ ব্যাপারে কয়েকটি মত রয়েছে।
এক. এখানে ‘বাইয়েনাহ' বা স্পষ্ট প্রমাণ বলে ফিতরাত তথা স্বভাবগত বিশ্বাসকে বুঝানো হয়েছে। মূলতঃ প্রত্যেক মানুষই ফিতরাত তথা স্বভাবগতভাবে দ্বীন-ইসলামের উপর জন্ম গ্রহণ করে থাকে। [ইবন কাসীর] পারিপার্শ্বিক অবস্থা, সঙ্গদোষ, শয়তান, গাফিলতি ইত্যাদি তাদেরকে সে স্বভাবজাত দ্বীন-ইসলামে প্রতিষ্ঠিত থাকতে দেয় না। সে হিসেবে আয়াতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সত্যিকারের মুমিনদের অবস্থা ঐসব লোকদের মোকাবেলায় তুলে ধরা হয়েছে- যাদের চরম ও পরম লক্ষ্য হচ্ছে শুধু দুনিয়া হাসিল করা। যেন দুনিয়ার মানুষ বুঝতে পারে যে, এই দুটি শ্রেণী কখনো সমকক্ষ হতে পারে না।
দুই. অথবা আয়াতে ‘বাইয়েনাহ' বা স্পষ্ট প্রমাণ বলে কুরআনকে উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। [জালালাইন] তখন আয়াতের অর্থ হবে, যিনি বা যারা অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা মুমিনগণ স্পষ্ট প্রমাণ কুরআনের উপর প্রতিষ্ঠিত। আর তার অনুসরণ করে একজন সাক্ষী তিনি হচ্ছেন জিবরীল। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্যের উপর সাক্ষী। তাছাড়া দ্বিতীয় আরেকটি সাক্ষ্যও রয়েছে আর তা হচ্ছে এ কুরআনের পূর্বে আগত কিতাব তাওরাত যা মূসা আলাইহিসসালামের উপর নাযিল হয়েছে। সে কিতাবও সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্য। [জালালাইন]
তিন. অথবা আয়াতে বর্ণিত বাইয়্যেনাহ বা স্পষ্ট প্রমাণ বলে কুরআনকে বোঝানো হয়েছে। এ কুরআনই নিজেই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্যতার উপর প্রথম সাক্ষী। তার দ্বিতীয় সাক্ষী হচ্ছে জিবরীল অথবা স্বয়ং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আর তৃতীয় সাক্ষী হচ্ছে পূর্বে মূসা আলাইহিস সালামের উপর নাযিলকৃত কিতাব তাওরাত। যিনি এ তিন সাক্ষী-প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত তিনি কি দুনিয়া পুজারীদের মত? [মুয়াসসার]
[৩] এ আয়াতে (شاهد) শব্দের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারক ইমামগণের কয়েকটি অভিমত রয়েছেঃ
১) কোন কোন মুফাসসির বলেন, এখানে শাহেদ অর্থ পবিত্র কুরআনের (إعجاز) এ’জায বা মানুষের সাধ্যাতীত হওয়া যা কুরআনের প্রতিটি আয়াতের সাথে বর্তমান রয়েছে। সুতরাং আয়াতের মর্ম হচ্ছে, কুরআন অমান্যকারী কি এমন ব্যক্তির সমকক্ষ হতে পারে যে কুরআনের উপর কায়েম রয়েছে? আর কুরআনের সত্যতার একটি সাক্ষী তো কুরআনের সাথেই বর্তমান রয়েছে। অর্থাৎ এর বিস্ময়করতা এবং মানুষের সাধ্যাতীত হওয়া এবং দ্বিতীয় সাক্ষী ইতোপূর্বে তাওরাতরূপে এসেছে, যা মুসা আলাইহিসসালাম আল্লাহ তা'আলার রহমতস্বরূপ দুনিয়াবাসীর অনুসরণের জন্য নিয়ে এসেছিলেন। কেননা, কুরআন যে আল্লাহ তা'আলার সত্য কিতাব এ সাক্ষ্য তাওরাতে সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণিত ছিল।
২) কোন কোন মুফাসসিরের মতে এখানে (شاهد) বলতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই বুঝানো হয়েছে। [মুয়াসসার]।
৩) কোন কোন মুফাসসিরের মতে এখানে (شاهد) বলতে (فطرة) বা বুদ্ধিবৃত্তিক সাক্ষ্যকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ কুরআন এসে এ প্রকৃতিগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক সাক্ষ্যের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করলো এবং তাকে জানালো তুমি বিশ্বপ্রকৃতিতে ও জীবন ক্ষেত্রে যার নিদর্শন ও পূর্বাভাস পেয়েছো প্রকৃতপক্ষে তাই সত্য। [ইবন কাসীর]
৪) ইমাম ইবনে জারীর তাবার রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ এখানে (شاهد) বলতে জিবরাইল আলাইহিসসালামকে বুঝানো হয়েছে; কেননা এর পরে বলা হয়েছে, “যার আগে ছিল মূসার কিতাব আদর্শ ও অনুগ্রহস্বরূপ" আর এটা নিঃসন্দেহ যে, মুহাম্মাদ এর আগে কখনো মূসা আলাইহিসসালামের গ্রন্থ তেলাওয়াত করেননি। তাই এখানে সাক্ষ্য বলে জিবরাইল আলাইহিসসালাম হওয়াই যুক্তিযুক্ত; কেননা তিনি মূসা আলাইহিসসালামের গ্রন্থও নিয়ে এসেছিলেন। [তাবারী]
[৪] অর্থাৎ এ কুরআনে ঈমান রাখে এবং এর নির্দেশ অনুসারে চলে। [মুয়াসসার]।
[৫] অর্থাৎ অন্যান্য যাবতীয় লোকেরা যারা কুরআনের উপর ঈমান রাখে না এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও রাসূল হিসেবে মানে না তাদের স্থান হচ্ছে জাহান্নাম।
[৬] ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “এ জাতি এবং ইয়াহুদী বা নাসারা যে জাতিই হোক না কেন তাদের কেউ যদি আমার কথা শোনার পরও আমার উপর ঈমান না আনবে তারা অবশ্যই জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করবে”। [মুসলিম: ১৫৩] ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ আমি এ কথার সত্যায়নে আল্লাহ্র কিতাব থেকে প্রমাণাদি খুজছিলাম, শেষ পর্যন্ত এ আয়াত পেলাম "অন্যান্য দলের যারা এটাকে অস্বীকার করে, আগুনই তাদের প্রতিশ্রুত স্থান”। তারপর ইবনে আব্বাস বললেনঃ এখানে (الأحزاب) বলে যাবতীয় দল ও গোষ্ঠীকে বুঝানো হয়েছে। [মুস্তাদরাকে হাকিমঃ ২/৩৪২]
[৭] অর্থাৎ এ কুরআনের সত্যতার উপর আপনি সন্দেহে থাকবেন না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনও সন্দেহে নেই। এখানে উম্মতকে সাধারণভাবে পথ নির্দেশ দেয়াই উদ্দেশ্য। [মুয়াসসার] শানকীতী বলেন, কুরআনের অন্যত্রও এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেখানেও এ কুরআনকে সন্দেহমুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন, সূরা আল-বাকারাহ: ২; সূরা সাজদাহ ২। [আদওয়াউল বায়ান]
[৮] মূলত: ঈমান আনার জন্য সোজা মন ও আল্লাহর তাওফীক থাকতে হয়। সুতরাং নবী ইচ্ছা করলেই বা কুরআনের সত্যতা স্পষ্ট হলেই অধিকাংশ মানুষ ঈমান নিয়ে আসবে ব্যাপারটি এরকম নয়। অনুরূপভাবে কোন ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষের মতামতই যে সঠিক সিদ্ধান্ত হবে এমন কথাও ঠিক নয়। [এ ব্যাপারে আরো দেখুনঃ সূরা আলআনআমঃ ১১৬, ইউসুফঃ ১০৩, আর-রাদঃ ১, আল-ইসরাঃ ৮৯, আল-ফুরকানঃ ৫০, আস-সাফফাতঃ ৭১, গাফিরঃ ৫৯. আল-বাকারাহঃ ১০০. আশ-শু'আরাঃ ৮, ৬৭, ১০৩, ১২১, ১৩৯, ১৫৮, ১৭৪, ১৯০]
