Hud

হুদ: 77

11:77
টেক্সট কপি

মূল আরবি

وَلَمَّا جَآءَتْ رُسُلُنَا لُوطًا سِىٓءَ بِهِمْ وَضَاقَ بِهِمْ ذَرْعًا وَقَالَ هَـٰذَا يَوْمٌ عَصِيبٌ

English Translations

Sahih International

And when Our messengers, [the angels], came to Lot, he was anguished for them and felt for them great discomfort and said, "This is a trying day."

Muhsin Khan

And when Our Messengers came to Lout (Lot), he was grieved on their account and felt himself straitened for them (lest the town people should approach them to commit sodomy with them). He said: "This is a distressful day."

Taqi Usmani

When Our emissaries (angels) came to LūT, he was saddened because of them, and his heart felt uneasy for their sake, and He said, “This is a very hard day.”

Abul Ala Maududi

And when Our messengers came to Lot, he was perturbed by their coming and felt troubled on their account, and said: 'This is a distressing day.

Pickthall

And when Our messengers came unto Lot, he was distressed and knew not how to protect them. He said: This is a distressful day.

Yusuf Ali

When Our messengers came to Lut, he was grieved on their account and felt himself powerless (to protect) them. He said: "This is a distressful day."

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

আমার প্রেরিত বার্তাবাহকগণ যখন লূতের কাছে আসলো, তাদের আগমনে সে ঘাবড়ে গেল। (তাদেরকে রক্ষায়) নিজেকে অসমর্থ মনে করল, আর বলল, ‘আজ বড়ই বিপদের দিন।

রাওয়াই আল-বায়ান

আর যখন লূতের কাছে আমার ফেরেশতা আসল, তখন তাদের (আগমনের) কারণে তার অস্বস্তিবোধ হল এবং তার অন্তর খুব সঙ্কুচিত হয়ে গেল। আর সে বলল, ‘এ তো কঠিন দিন’।

শাইখ মুজিবুর রহমান

আর যখন আমার ঐ মালাইকাগণ লূতের নিকট উপস্থিত হল তখন সে তাদের জন্য চিন্তিত হয়ে পড়ল এবং সেই কারণে অন্তর সংকুচিত হল, আর বললঃ আজকের দিনটি অতি কঠিন।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আর যখন আমাদের প্রেরিত ফিরিশতাগণ লূতের কাছে আসল তখন তাদের আগমনে তিনি বিষণ্ণ হলেন এবং নিজেকে তাদের রক্ষায় অসমর্থ মনে করলেন এবং বললেন, ‘এটা বড়ই বিপদের দিন।’

ফাতহুল মাজীদ

এবং যখন আমার প্রেরিত ফেরেশ্তাগণ লূতের নিকট আসল তখন তাদের আগমনে সে বিষণত্ন হল এবং নিজকে তাদের রক্ষায় অসমর্থ মনে করল এবং বলল: ‘এটা বিপদের দিন!’

মুখতাসার

৭৭. ফিরিশতাগণ যখন লূত (আলাইহিস-সালাম) এর নিকট পুরুষদের আকৃতিতে আসলেন তখন তাঁদের আগমন তাঁর নিকট খারাপ লাগল এবং তাঁদের উপর তাঁর জাতির পক্ষ থেকে ভয় পাওয়ার দরুন তাঁর অন্তরটি সংকীর্ণ হয়ে গেল। যেহেতু তারা এমন এক জাতি যারা নারীদেরকে বাদ দিয়ে প্রবৃত্তিবশতঃ পুরুষদের সাথে সমকামিতায় লিপ্ত হতো। এরপর লূত (আলাইহিস-সালাম) বললেন: এটি তো একটি নিদারুণ দিন। তিনি মনে করলেন, তাঁর স্বজাতিরা তাঁর ও তাঁর মেহমানদের উপর চড়াও হবে।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

৭৭-৭৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা সংবাদ দিচ্ছেন যে, এই ফেরেশতারা হযরত ইবরাহীমের (আঃ) কাছে তাঁদের আগমনের উদ্দেশ্য প্রকাশ করে সেখান থেকে বিদায় গ্রহণ করেন এবং হযরত লূতের (আঃ) বাসভূমিতে বা তার বাড়িতে পৌঁছেন। তাঁরা সুদর্শন যুবকদের রূপ ধারণ করেছিলেন, যেন হযরত লূতের (আঃ) কওমের পূর্ণ পরীক্ষা হয়ে যায়। হযরত লূত (আঃ) ঐ মেহমানদেরকে দেখে স্বীয় কওমের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করে অত্যন্ত চিন্তান্বিত হয়ে পড়েন এবং মনে মনে ঘোর পেঁচ খেতে থাকেন। তিনি মনে মনে বলেনঃ “যদি আমি এদেরকে মেহমান হিসেবে রেখে দেই, তবে খুব সম্ভব আমার কওমের লোকেরা সংবাদ পেয়ে (তাদের সাথে দুস্কার্য করার উদ্দেশ্যে) দৌড়িয়ে আসবে।

আর যদি অতিথি হিসেবে আমার বাড়িতে না রাখি তবে এরা তাদেরই হাতে পড়ে যাবে।” তাঁর মুখ দিয়েও বেরিয়ে গেলঃ- আজকের দিনটি খুবই কঠিন ও ভয়াবহ দিন। আমার কওম তাদের দুষ্কার্য থেকে বিরত থাকবে না, এতে কোন সন্দেহ নেই। আর তাদের সাথে মুকাবিলা করারও আমার শক্তি নেই। সুতরাং কিবা ঘটবে!”হযরত কাতাদা’ (রঃ) বলেন যে, এই ফেরেশতাগুলি মানুষের আকারে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ঐ সময় হযরত লূত (আঃ) তাঁর বাসভূমিতে অবস্থান করছিলেন এমতাবস্থায় তাঁরা তাঁর মেহমান হন। লজ্জা বশতঃ তিনি তাঁদেরকে মেহমান হিসেবে গ্রহণ করতে সরাসরি অস্বীকার করতে পারছিলেন না এবং বাড়িতে নিয়ে যেতেও সাহস করছিলেন না।

তিনি তাঁদের আগে আগে চলছিলেন তাঁরা যেন ফিরে যান শুধু এই উদ্দেশ্যে পথিমধ্যে তাদেরকে বলছিলেনঃ “আল্লাহর শপথ! এখানকার মত খারাপ ও দুশ্চরিত্র লোক আমি আর কোথাও দেখি নাই।” কিছু দূর গিয়ে আবার এ কথাই বলেন। মোট কথা, বাড়ি পৌছা পর্যন্ত এ কথা তিনি চারবার উচ্চারণ করেন। ফেরেশতাদেরকে এই নির্দেশই দেয়া হয়েছিল যে, যে পর্যন্ত না তাদেরকে নবী তাদের মন্দ কার্যের বর্ণনা দেন, সেই পর্যন্ত যেন তাদেরকে ধ্বংস করা না হয়। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হযরত ইবরাহীমের (আঃ) নিকট থেকে বিদায় হয়ে ফেরেশতারা দুপুরের সময় নাহরে সুদূমে পৌঁছেন। সেখানে হযরত লূতের (আঃ) কন্যা পানি নিতে আসলে তাদের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে।

তাঁকে তাঁরা জিজ্ঞেস করেনঃ “এখানে আমরা কোথায় অবস্থান করতে পারি?” হযরত লূতের (আঃ) কন্যা উত্তরে বলেনঃ “আপনারা এখানে থাকুন, আমি ফিরে এসে উত্তর দিচ্ছি।” তিনি ভয় পেলেন যে, কওমের লোকেরা যদি এদেরকে পেয়ে যায় তবে তো এরা খুবই অপদস্থ হবেন। তাই তিনি বাড়ি গিয়ে তাঁর পিতাকে বলেনঃ “শহরের দরজার উপর কয়েকজন বিদেশী যুবককে আমি দেখে এলাম, যাদের মত সুদর্শন লোক আমি জীবনে দেখি নাই। যান, তঁদেরকে নিয়ে আসুন, নতূবা আপনার কওম তাঁদের প্রতি যুলুম করবে।” ঐ গ্রামের লোকেরা হযরত লূতকে (আঃ) বলে রেখেছিলঃ “কোন বিদেশী লোক এখানে আসলে তুমি তাকে তোমার কাছে রাখবে না।

আমরাই সব কিছু করবো।” কন্যার মুখে খবর শুনে তিনি গিয়ে গোপনীয়ভাবে তাঁদেরকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসলেন। কেউই এ খবর জানতে পারলো না। কিন্তু তারই মাধ্যমে এ খবর প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এ সংবাদ শোনা মাত্রই তাঁর কওম আনন্দে আত্মহারা হয়ে তাঁর বাড়িতে ছুটে আসে। পুরুষ লোকদের সাথে দুষ্কার্য করা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। ঐ সময় আল্লাহর নবী হযরত লূত (আঃ) তাদেরকে উপদেশ দিতে লাগলেন। তিনি বললেনঃ “তোমরা তোমাদের এই অভ্যাস পরিত্যাগ কর।” স্ত্রীলোকদের দ্বারা তোমাদের কাম প্রবৃত্তি পূর্ণ কর।” (আরবি) অর্থাৎ ‘আমার কন্যাগুলি’ একথা তিনি এ কারণেই বলেন যে, প্রত্যেক নবী তাঁর উম্মতের যেন পিতা।

কুরআন কারীমের অন্য আয়াতে রয়েছেঃ “তারা বলেছিল ? আমরা তো তোমাকে নিষেধ করেছিলাম যে, তোমার কাছে কাউকেও রাখবে না।” অর্থাৎ কোন পুরুষ লোককে তোমার বাড়িতে মেহমান হিসেবে স্থান দেবে না। হযরত লূত (আঃ) তাদেরকে বুঝাতে থাকেন এবং দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ সম্পর্কে তাদেরকে উপদেশ দেন। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে যে, তিনি তাদেরকে বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমরা কি বিশ্ববাসীদের মধ্য হতে পুরুষদের সাথে অপকর্ম করছো? আর তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে যেই স্ত্রীসমূহ সৃষ্টি করেছেন তাদেরকে বর্জন করছো? বরং তোমরা সীমা লংঘনকারী লোক।” (২৬: ১৬৫-১৬৬)হযরত লূত (আঃ) তাঁর কওমকে বললেনঃ স্ত্রী লোকেরাই এ কাজের যোগ্য; সুতরাং তোমরা তাদেরকে বিয়ে করে তোমাদের কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ কর, এটাই হবে পবিত্র কাজ।' হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ একথা আমাদের অনুধাবন করা দরকার যে, হযরত লূত (আঃ) তাঁর কওমকে তার নিজের কন্যাদের সম্পর্কে এটা বলেন নাই।

বরং নবী তাঁর সমস্ত উম্মতের পিতা স্বরূপ। হযরত কাতাদা’ (রঃ) প্রভৃতি গুরুজনও একথাই বলেন। ইমাম ইবনু জুরাইজ (রঃ) বলেনঃ এটা আমাদের মনে করা উচিত নয় যে, হযরত লূত (আঃ) স্ত্রীলোকদেরকে বিয়ে না করেই তাদের সাথে মেলা মেশা করতে বা সহবাস করতে বলেছেন; তাঁর উদ্দেশ্য এটা ছিল না, বরং তিনি স্ত্রী লোকদেরকে বিয়ে করে তাদের সাথে সহবাস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি তার কওমকে বলেনঃ “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, স্ত্রীলোকদের প্রতি আগ্রহান্বিত হও, তাদেরকে বিয়ে করে কাম বাসনা পূর্ণ কর। আর এ উদ্দেশ্যে পুরুষ লোকদের কাছে যেয়ো না। বিশেষ করে এরা তো আমার মেহমান।

তোমরা আমার মর্যাদার দিকে খেয়াল কর। তোমাদের মধ্যে কি সুবুদ্ধি সম্পন্ন একজন লোকও নেই? একজনও কি ভাল লোক নেই?” তাঁর এ কথার জবাবে দুবৃত্তেরা বলেছিলঃ তোমার কন্যাদের সাথে আমাদের কোনই সম্পর্ক নেই।” এখানেও (আরবি) অর্থাৎ তোমার কন্যাগণ দ্বারা কওমের স্ত্রীলোকদেরকেই বুঝানো হয়েছে। তারা আরও বললো: “আমরা কি চাই তা তুমি অবশ্যই জানো।” অর্থাৎ আমাদের মনের বাসনা হচ্ছে যুবকদের সাথে মিলিত হওয়া এবং তাদের দ্বারা কাম বাসনা মেটানো। সুতরাং আমাদের সাথে তর্কবিতর্ক ও আমাদেরকে উপদেশ দান বৃথা।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

আর যখন আমাদের প্রেরিত ফিরিশতাগণ লূতের কাছে আসল তখন তাদের আগমনে তিনি বিষণ্ণ হলেন এবং নিজেকে তাদের রক্ষায় অসমর্থ মনে করলেন এবং বললেন ‘এটা বড়ই বিপদের দিন [১]।’

[১] আলোচ্য আয়াতসমূহে লূত আলাইহিসসালাম ও তার দেশবাসীর অবস্থা ও দেশবাসীর উপর কঠিন আযাবের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। লুত আলাইহিসসালামের কাওম একে তো কাফের ছিল অধিকন্তু এমন এক জঘন্য অপকর্ম ও লজ্জাকর অনাচারে লিপ্ত ছিল যা পূর্বে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে পাওয়া যায়নি, বন্য পশুরাও যা ঘৃনা করে। অর্থাৎ পুরুষ কর্তৃক অন্য পুরুষের মৈথুন করা। ব্যাভিচারের চেয়েও ইহা জঘন্য অপরাধ। এ জন্যই তাদের উপর এমন কঠিন আযাব নাযিল হয়েছে যা অন্য কোন অপকর্মকারীদের উপর কখনো নাযিল হয়নি। লূত আলাইহিসসালামের ঘটনা যা আলোচ্য আয়াতসমূহে বর্ণিত হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈল আলাইহিসসালাম সহ কতিপয় ফেরেশতাকে কওমে লূতের উপর আযাব নাযিল করার জন্য প্রেরণ করেন।

যাত্রাপথে তারা ফিলিস্তীনে প্রথমে ইবরাহীম আলাইহিসসালামের সমীপে উপস্থিত হন। আল্লাহ তা'আলা যখন কোন জাতিকে আযাব দ্বারা ধ্বংস করেন তখন তাদের কার্যকলাপের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আযাবই নাযিল করে থাকেন। এ ক্ষেত্রেও ফেরেশতাগণকে নওজোয়ানরূপে প্রেরণ করেন। লুত আলাইহিসসালাম ও তাদেরকে মানুষ মনে করে তাদের নিরাপত্তার জন্য উদ্বিগ্ন হলেন। কারণ মেহমানের আতিথেয়তা নবীর নৈতিক দায়িত্ব। পক্ষান্তরে দেশবাসীর কু-স্বভাব তার অজানা ছিল না। উভয় সংকটে পড়ে তিনি স্বগতোক্তি করলেন “আজেকের দিনটি বড় সংকটময়"। লূত আলাইহিসসালামের স্ত্রী নবীর বিরুদ্ধাচারন করে কাফেরদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করত।

সম্মানিত ফেরেশতাগণ সুদৰ্শন নওজোয়ান আকৃতিতে যখন লূত আলাইহিসসালামের গৃহে উপনীত হলেন তখন তার স্ত্রী সমাজের দুষ্ট লোকদের খবর দিল যে আজ আমাদের গৃহে এরূপ মেহমান আগমন করেছেন। [কুরতুবী]

তাফসীর আল-কুরতুবী

[সূরা হুদ (১১): আয়াত ৭৭ থেকে ৮৩] পূর্ণ পৃষ্ঠা

"বারাআত" (সূরা তাওবা)-এ (১) "নিশ্চয়ই সে অতি কোমল হৃদয়ের অধিকারী ও পরম সহনশীল" এর অর্থ ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। আর 'মুনীব' অর্থ প্রত্যাবর্তনকারী; বলা হয়: 'আনা-বা' যখন সে প্রত্যাবর্তন করে। আর ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) তাঁর সকল বিষয়ে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী ছিলেন। এবং বলা হয়েছে: 'আওয়াহ' দ্বারা এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে যিনি লুত (আলাইহিস সালাম)-এর কওমের ঈমান থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে আফসোসে বিলাপকারী বা ব্যথিত ছিলেন। মহান আল্লাহর বাণী: (হে ইব্রাহিম! তুমি এ থেকে নিবৃত্ত হও) অর্থাৎ লুত (আলাইহিস সালাম)-এর কওম সম্পর্কে এ বিতর্ক বর্জন করো।

(নিশ্চয়ই তোমার রবের নির্দেশ এসে পড়েছে) অর্থাৎ তাদের জন্য তাঁর আযাব বা শাস্তি নির্ধারিত হয়ে গেছে। (আর নিশ্চয়ই তাদের নিকট আসবে) অর্থাৎ তাদের ওপর অবতীর্ণ হবে, (এমন শাস্তি যা অপ্রতিরোধ্য) অর্থাৎ যা তাদের থেকে সরিয়ে দেওয়া বা প্রতিহত করা সম্ভব নয়। ‌‌[সূরা হুদ (১১): আয়াত ৭৭ থেকে ৮৩]আর যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা লুতের নিকট পৌঁছাল, তখন তাদের আগমনে সে বিষণ্ণ হলো এবং তাদের কারণে তার মন সংকুচিত হয়ে পড়ল; সে বলতে লাগল, "এটি এক অত্যন্ত কঠিন দিন।" (৭৭) আর তার কওম তার নিকট দৌড়ে আসতে লাগল; এবং আগে থেকেই তারা মন্দ কাজে লিপ্ত ছিল। সে বলল, "হে আমার কওম!

এরা আমার কন্যা, এরা তোমাদের জন্য অধিক পবিত্র; সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার মেহমানদের ব্যাপারে আমাকে লজ্জিত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কোনো সুবোধ ব্যক্তি নেই?" (৭৮) তারা বলল, "তুমি তো জানোই যে তোমার কন্যাদের ওপর আমাদের কোনো অধিকার নেই, আর আমরা কী চাই তা তো তুমি ভালো করেই জানো।" (৭৯) সে বলল, "হায়! তোমাদের বিরুদ্ধে যদি আমার কোনো শক্তি থাকত অথবা আমি যদি কোনো শক্তিশালী স্তম্ভের আশ্রয় নিতে পারতাম!" (৮০) তারা বলল, "হে লুত! আমরা তোমার রবের প্রেরিত দূত; তারা কখনোই তোমার নিকট পৌঁছাতে পারবে না। সুতরাং তুমি রাতের কোনো এক ভাগে তোমার পরিবারবর্গসহ বেরিয়ে পড়ো এবং তোমাদের মধ্যে কেউ যেন পেছনে ফিরে না তাকায়; তবে তোমার স্ত্রী ব্যতীত, নিশ্চয়ই তাদের ওপর যা আপতিত হবে তার ওপরও তা আপতিত হবে।

অবশ্যই প্রভাতকাল তাদের জন্য নির্ধারিত সময়। প্রভাত কি অতি নিকটে নয়?" (৮১)অতঃপর যখন আমার নির্দেশ আসল, তখন আমি সেই জনপদকে উল্টিয়ে দিলাম—তার উপরের অংশকে নিচে করে দিলাম এবং তার ওপর স্তরে স্তরে পোড়া মাটির পাথর বর্ষণ করলাম, (৮২) যা তোমার রবের নিকট চিহ্নিত ছিল; আর তা জালিমদের থেকে দূরে নয়। (৮৩)মহান আল্লাহর বাণী: (আর যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা লুতের নিকট পৌঁছাল, তখন সে তাদের আগমনে বিষণ্ণ হলো) যখন ফেরেশতারা ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট থেকে বের হলেন—আর ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) ও লুত (আলাইহিস সালাম)-এর জনপদের মাঝে চার ফারসাখ ব্যবধান ছিল—তখন লুত (আলাইহিস সালাম)-এর দুই কন্যা—যারা পানি সংগ্রহ করছিল—তারা ফেরেশতাদের দেখতে পেল।(১) দ্রষ্টব্য: ৮ম খণ্ড, ২৭৪ পৃষ্ঠা।

তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর

পূর্ণ পৃষ্ঠা

আবদুল্লাহ ইবনে আহমাদ ‘যাওয়ায়েদুয যুহদ’ গ্রন্থে কাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট সংবাদ পৌঁছেছে যে, ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) সডোম নগরের দিকে লক্ষ্য করে বলতেন: "হে সডোম, তোমার বিচারের দিনে তোমার দুর্ভোগ অনিবার্য।" অতঃপর তিনি পাঠ করলেন: এবং অবশ্যই আমার প্রেরিত ফেরেশতারা ইব্রাহিমের নিকট সুসংবাদ নিয়ে এসেছিল। তারা বলল, ‘সালাম’। তিনিও বললেন, ‘সালাম’। অতঃপর তিনি বিলম্বে একটি ভুনা করা বাছুর নিয়ে আসলেন অর্থাৎ সুপক্ক মাংস; তখন তিনি তাদেরকে মেহমান মনে করেছিলেন। {অতঃপর যখন তিনি দেখলেন যে, তাদের হাত সেটির দিকে প্রসারিত হচ্ছে না, তখন তিনি তাদের প্রতি সন্দিহান হলেন এবং মনে মনে তাদের থেকে কিছুটা ভয় অনুভব করলেন।

তারা বলল, ‘ভয় পাবেন না, আমরা লুত সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি’। তখন তাঁর স্ত্রী দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং তিনি হেসে ফেললেন। অতঃপর আমি তাঁকে ইসহাকের এবং ইসহাকের পরবর্তী ইয়াকুবের সুসংবাদ দিলাম।} তিনি বলেন: পরবর্তী বলতে সন্তানের সন্তান বা নাতি বোঝানো হয়েছে। তিনি বললেন, ‘হায় কপাল! আমি কি সন্তান প্রসব করব অথচ আমি বৃদ্ধা, আর আমার এই স্বামীও অতি বৃদ্ধ? নিশ্চয়ই এটি এক বিস্ময়কর ব্যাপার’। তখন জিবরাঈল তাঁকে বললেন: আপনি কি আল্লাহর কাজে বিস্ময় প্রকাশ করছেন? হে আহলে বায়াত (নবী-পরিবার)! আপনাদের প্রতি আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক; নিশ্চয়ই তিনি অতি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত। আর ইব্রাহিম তাদের সাথে লুত সম্প্রদায়ের ব্যাপারে আলোচনা করতে লাগলেন, যেহেতু ইব্রাহিম তাদের মধ্যেই ছিলেন।

তারা বলল: (হে ইব্রাহিম! এ আলোচনা ত্যাগ করো) (সূরা হুদ, আয়াত: ৭৬) আল্লাহর এই বাণী পর্যন্ত: (এবং যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা লুতের কাছে আসলো, তখন সে তাদের আগমনে বিষণ্ণ হলো) (সূরা হুদ, আয়াত: ৭৭)। তিনি বলেন: তাদের সৌন্দর্য দেখে লুত তাদের আগমনে কষ্ট পেলেন এবং তাদের কারণে সংকীর্ণতা অনুভব করলেন এবং বললেন, ‘আজ বড়ই কঠিন দিন’। তিনি বললেন: এর অর্থ হলো, আমার সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে আজ এক অমঙ্গলজনক দিন। অতঃপর তিনি তাদের নিয়ে নিজ গৃহে গেলেন, আর তাঁর স্ত্রী তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে সংবাদ দিতে গেল। (অতঃপর তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা হন্যে হয়ে তাঁর কাছে ছুটে আসলো এবং আগে থেকেই তারা কুকর্ম করত।

লুত বললেন: হে আমার সম্প্রদায়! এই যে আমার কন্যারা, তারা তোমাদের জন্য অধিক পবিত্র) (সূরা হুদ, আয়াত: ৭৮); অর্থাৎ তোমরা তাদের বিবাহ করো। (তোমাদের মধ্যে কি কোনো সুস্থ বিবেকের মানুষ নেই? তারা বলল: তুমি তো জানোই যে, তোমার কন্যাদের প্রতি আমাদের কোনো আগ্রহ নেই; আর আমরা যা চাই, তা তো তুমি অবশ্যই জানো) (সূরা হুদ, আয়াত: ৭৯)। তিনি মেহমানদের ঘরের ভেতরে রেখে দরজায় গিয়ে বসলেন। (তিনি বললেন: হায়! যদি তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো শক্তি থাকত অথবা আমি কোনো শক্তিশালী স্তম্ভের আশ্রয় নিতে পারতাম!) (সূরা হুদ, আয়াত: ৮০)। তিনি বললেন: এর অর্থ হলো এমন কোনো গোত্র যারা আমাকে রক্ষা করত।

আমার নিকট সংবাদ পৌঁছেছে যে, লুত (আলাইহিস সালাম)-এর পর আল্লাহ এমন কোনো রাসূল পাঠাননি যিনি তাঁর সম্প্রদায়ের মধ্যে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ছিলেন না। যখন ফেরেশতারা দেখলেন যে লুত তাদের কারণে কষ্টে আছেন, তখন তারা বলল: হে লুত! আমরা আপনার প্রতিপালকের প্রেরিত দূত অর্থাৎ আমরা ফেরেশতা; তারা কখনো আপনার নিকট পৌঁছাতে পারবে না। সুতরাং আপনি রাতের একাংশে আপনার পরিবারবর্গসহ বেরিয়ে পড়ুন এবং আপনাদের মধ্যে কেউ যেন পিছনের দিকে না তাকায়; তবে আপনার স্ত্রী ব্যতীত আল্লাহর এই বাণী পর্যন্ত: (প্রভাত কি সন্নিকটে নয়?) (সূরা হুদ, আয়াত: ৮১)।অতঃপর জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) তাদের সামনে বের হয়ে আসলেন এবং তাঁর ডানার এক ঝাপটায় তাদের মুখে আঘাত করলেন, ফলে তাদের চোখগুলো অন্ধ হয়ে গেল; 'তামস' অর্থ হলো চোখের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়া।

অতঃপর জিবরাঈল তাদের ভূমিখণ্ডকে তুলে ধরলেন, এমনকি আসমানের বাসিন্দারা তাদের কুকুরের ডাক এবং মোরগের আওয়াজ শুনতে পেল। এরপর তিনি তা তাদের ওপর উল্টে দিলেন এবং আমি তাদের ওপর সিজ্জিল (পাথর) বর্ষণ করলাম। তিনি বলেন: অর্থাৎ তাদের মরুপ্রান্তরের অধিবাসী, তাদের রাখাল এবং মুসাফিরদের ওপর; ফলে তাদের কেউই অবশিষ্ট রইল না।