Hud
হুদ: 88
11 হুদ Hud · 123 আয়াত هود
মূল আরবি
قَالَ يَـٰقَوْمِ أَرَءَيْتُمْ إِن كُنتُ عَلَىٰ بَيِّنَةٍ مِّن رَّبِّى وَرَزَقَنِى مِنْهُ رِزْقًا حَسَنًا ۚ وَمَآ أُرِيدُ أَنْ أُخَالِفَكُمْ إِلَىٰ مَآ أَنْهَىٰكُمْ عَنْهُ ۚ إِنْ أُرِيدُ إِلَّا ٱلْإِصْلَـٰحَ مَا ٱسْتَطَعْتُ ۚ وَمَا تَوْفِيقِىٓ إِلَّا بِٱللَّهِ ۚ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ
English Translations
He said, "O my people, have you considered: if I am upon clear evidence from my Lord and He has provided me with a good provision from Him...? And I do not intend to differ from you in that which I have forbidden you; I only intend reform as much as I am able. And my success is not but through Allāh. Upon Him I have relied, and to Him I return.
He said: "O my people! Tell me, if I have a clear evidence from my Lord, and He has given me a good sustenance from Himself (shall I corrupt it by mixing it with the unlawfully earned money). I wish not, in contradiction to you, to do that which I forbid you. I only desire reform so far as I am able, to the best of my power. And my guidance cannot come except from Allah, in Him I trust and unto Him I repent.
He said, “O my people, tell me, if I am on a clear path from my Lord and He has provided me with a good provision from Himself, (should I still leave you unguided?) I do not want to do in your absence what I forbid you from. I want nothing but to set things right as far as I can. My ability to do any thing comes from none but Allah. In Him alone I have placed my trust and to Him alone I turn in humbleness.
Shu'ayb said: 'My people! What do you think? If I stand on clear evidence from my Lord, and He has also provided me a handsome provision from Himself -(should I be ungrateful to Him and share your error and iniquity?) Nor do I desire to act contrary to what I admonish you. I desire nothing but to set things right as far as I can. My succour is only with Allah. In Him have I put my trust, and to Him do I always turn.
He said: O my people! Bethink you: if I am (acting) on a clear proof from my Lord and He sustaineth me with fair sustenance from Him (how can I concede aught to you)? I desire not to do behind your backs that which I ask you not to do. I desire naught save reform so far as I am able. My welfare is only in Allah. In Him I trust and unto Him I turn (repentant).
He said: "O my people! see ye whether I have a Clear (Sign) from my Lord, and He hath given me sustenance (pure and) good as from Himself? I wish not, in opposition to you, to do that which I forbid you to do. I only desire (your) betterment to the best of my power; and my success (in my task) can only come from Allah. In Him I trust, and unto Him I look.
বাংলা অনুবাদ
সে বলল, ‘হে আমার জাতির লোকেরা! তোমরা কি ভেবে দেখেছ যদি আমি আমার প্রতিপালকের স্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি আর তিনি আমাকে তাঁর পক্ষ থেকে উত্তম রিযক দিয়ে থাকেন (তাহলে আমি কীভাবে তোমাদের অন্যায় কাজের সঙ্গী হতে পারি?), আমি তোমাদেরকে যে কাজ করতে নিষেধ করি সেটা তোমাদের প্রতি বিরুদ্ধাচরণ করার ইচ্ছায় নয়, আমি তো সাধ্যমত সংশোধন করতে চাই, আমার কাজের সাফল্য তো আল্লাহরই পক্ষ হতে, আমি তাঁর উপরই নির্ভর করি, আর তাঁর দিকেই মুখ করি।
সে বলল, ‘হে আমার কওম, তোমরা কী মনে কর, আমি যদি আমার রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণের উপর থাকি এবং তিনি আমাকে তাঁর পক্ষ থেকে উত্তম রিয্ক দান করে থাকেন (তাহলে কী করে আমি আমার দায়িত্ব পরিত্যাগ করব)! যে কাজ থেকে আমি তোমাদেরকে নিষেধ করছি, তোমাদের বিরোধিতা করে সে কাজটি আমি করতে চাই না। আমি আমার সাধ্যমত সংশোধন চাই। আল্লাহর সহায়তা ছাড়া আমার কোন তওফীক নেই। আমি তাঁরই উপর তাওয়াক্কুল করেছি এবং তাঁরই কাছে ফিরে যাই’।
সে বললঃ হে আমার কাওম! আচ্ছা বলত, যদি আমি আমার রবের পক্ষ হতে প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকি এবং তিনি আমাকে নিজ সন্নিধান হতে একটি উত্তম সম্পদ (নবুওয়াত) দান করেন, তাহলে আমি কি রূপে প্রচার না করে পারি? আর আমি এটা চাইনা যে, আমি তোমাদের বিপরীত সেই সব কাজ করি যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করছি; আমিতো সংশোধন করে দিতে চাচ্ছি, যে পর্যন্ত আমার সাধ্যে হয়, আর আমার যা কিছু প্রচেষ্টা তা শুধু আল্লাহরই সাহায্যে হয়ে থাকে; আমি তাঁরই উপর ভরসা রাখি এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করি।
তিনি বললেন, ‘হে আমার সম্প্রদায় ! তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আমি যদি আমার রব প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি এবং তিনি যদি তাঁর কাছ থেকে আমাকে উৎকৃষ্ট রিযক দান করে থাকেন (তবে কি করে আমি আমার কর্তব্য হতে বিরত থাকব?) আর আমি তোমাদেরকে যা নিষেধ করি আমি নিজে তার বিপরীত করতে ইচ্ছে করি না। আমি তো আমার সাধ্যমত সংস্কারই করতে চাই। আমার কার্যসাধন তো আল্লাহরই সাহায্যে; আমি তাঁরই উপর নির্ভর করি এবং তাঁরই অভিমুখী।
সে বলল: ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আমি যদি আমার প্রতিপালক প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি এবং তিনি যদি তাঁর নিকট হতে আমাকে উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করে থাকেন তবে কি করে আমি আমার কর্তব্য হতে বিরত থাকব? আমি তোমাদেরকে যা নিষেধ করি আমি নিজে তা করতে ইচ্ছা করি না। আমি আমার সাধ্যমত সংস্কার করতে চাই। আমার কার্যসাধন আল্লাহরই সাহায্যে; আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী।
৮৮. শুআইব (আলাইহিস-সালাম) তাঁর স্বজাতিকে বললেন: ওহে আমার জাতি! আমাকে তোমাদের অবস্থা সম্পর্কে জানাও। আমি যদি আমার রবের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ ও সঠিক বুদ্ধিমত্তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকি আর তিনি আমাকে তাঁর পক্ষ থেকে হালাল রিযিক প্রদান করেন ও নবুওয়াত দিয়ে থাকেন। আমি তোমাদেরকে এমন কোন কিছু হতে নিষেধ করতে চাই না যা করে আমি আবার তোমাদের বিরোধিতা করব। বরং আমি আমার সাধ্যানুযায়ী তোমাদের রবের তাওহীদ ও আনুগত্যের দিকে দাওয়াতের মাধ্যমে একমাত্র তোমাদেরই সংশোধন কামনা করি। আর তা অর্জন করা আল্লাহ তাআলার তাওফীক ব্যতীত সম্ভব নয়। আমার যাবতীয় কর্মে একমাত্র তাঁর উপরেই আমার ভরসা এবং তাঁর দিকেই আমি প্রত্যাবর্তন করব।
তাফসীর
হযরত শুআ’ইব (আঃ) স্বীয় কওমকে বলতে লাগলেনঃ “দেখো, আমি আমার প্রতিপালকের তরফ হতে দলীল প্রমাণের উপর প্রতিষ্টিত রয়েছি। এবং সেই দিকেই তোমাদেরকে আহবান করছি। আমার প্রতিপালক আমাকে অনুগ্রহ পূর্বক উত্তম রিযক দান করেছেন।” কেউ কেউ বলেছেন যে, এখানে উত্তম রিয্ক দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে নুবওয়াত। আবার কেউ কেউ হালাল জীবিকা অর্থ নিয়েছেন। দু’টোই হতে পারে। তিনি বলেনঃ হে আমার কওম! তোমরা আমার নীতি এরূপ পাবে না যে, আমি তোমাদেরকে ভাল কাজের হুকুম করব এবং নিজে গোপনে এর বিপরীত কাজ করবো। আমার তো একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আমার সাধ্য অনুযায়ী সংশোধন করা।
হা, তবে আমার উদ্দেশ্যের সফলতা আল্লাহ তাআ’লার হাতেই রয়েছে। তারই উপর আমি ভরসা রাখি এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করি ও ঝুঁকে পড়ি।হাকীম ইবনু মুআ’বিয়া তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর (মুআ’বিয়ার) ভাই মালিক তাঁকে বলেনঃ “হে মুআ’বিয়া! রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার প্রতিবেশীদেরকে বন্দী করে রেখেছেন। তুমি তাঁর নিকট গমন কর। তাঁর সাথে তোমার আলাপ আলোচনা হয়ে থাকে এবং তিনি তোমাকে চিনেন।” (মুআ’বিয়া বলেনঃ) আমি তখন তার সাথে গমন করলাম। সে (মালিক) বললো: “আমার প্রতিবেশীদেরকে ছেড়ে দিন। তারা মুসলমান হয়েছিল। তার এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুখ ফিরিয়ে নেন।
সে তখন রাগান্বিত হয়ে উঠে দাঁড়ায় এবং বলেঃ “আল্লাহর কসম! যদি আপনি এটা করেন তবে লোকেরা বলাবলি করবেঃ আপনি আমাদেরকে কোন কাজের আদেশ করেন, অথচ নিজে ওর বিপরীত কাজ করে থাকেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তুমি কি বলছো?” সে উত্তরে বললো: আল্লাহর কসম! যদি আপনি এটা করেন তবে অবশ্যই লোকেরা ধারণা করবে যে, আপনি কোন কাজের আদেশ করেন, আর নিজেই ওটার বিপরীত কাজ করে থাকেন।” বর্ণনাকারী বলেন যে, তার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “লোকেরা কি এ কথা সত্যিই বলেছে? অবশ্যই যদি আমি এরূপ করি তবে নিশ্চয় এর শাস্তি আমাকেই ভোগ করতে হবে, তাদেরকে নয়।
তোমরা তার প্রতিবেশীদেরকে ছেড়ে দাও। (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)বাহায ইবনু হাকীম হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে, তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি (তাঁর দাদা) বলেনঃ “আমার কওমের কতকগুলি লোককে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সন্দেহ বশতঃ পাকড়াও করে বন্দী করেন। তখন আমার কওমের একজন লোক আল্লাহর রাসূলের (সঃ) নিকট আগমন করে। ঐ সময় তিনি খুৎবা দিচ্ছিলেন। লোকটি ঐ অবস্থাতেই তাঁকে বললো: “হে মুহাম্মদ (সঃ)! আমার প্রতিবেশীদেরকে আপনি কি কারণে বন্দী করেছেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) নীরব থাকেন। তখন সে বলে, নিশ্চয় লোকেরা বলাবলি করছে, আপনি কোন কিছু থেকে নিষেধ করছেন, অথচ নিজেই তা করছেন।
তার এ কথা শুনে নবী (সঃ) বলেনঃ “তুমি কি বলছো?” বর্ণনাকারী বলেনঃ আমি মাঝখানে বলতে শুরু করলামঃ এ কথা শুনার আপনার কোনই প্রয়োজন নেই, আমি এই ভয়েই একথা বললাম যে, যদি তিনি এটা শুনতে পান, অতঃপর আমার কওমের উপর বদ দুআ’ করেন তবে এর পরে কখনো তারা মুক্তি পাবে না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) বরাবর এর পিছনে লেগেই থাকলেন এবং শেষে তার কথা বুঝেই ফেললেন।অতঃপর তিনি বললেনঃ “তাদের কেউ এ কথা মুখ দিয়ে বের করেছে? আল্লাহর শপথ! আমি যদি এরূপ করি তবে এর পাপের বোঝা আমাকেই বহন করতে হবে, তাদেরকে নয়। তার প্রতিবেশীদেরকে ছেড়ে দাও। (এ হাদীসটিও ইমাম আহমদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এই প্রসঙ্গেই আবু হুমায়েদ (রাঃ) ও আবু উসায়েদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা আমার পক্ষ থেকে এমন কোন হাদীস শুনবে যা তোমাদের অন্তর অস্বীকার করে এবং তোমাদের দেহ ও চুল তার থেকে পৃথক থাকে এবং তোমরা পার যে, তোমরা ওর থেকে দূরে রয়েছে, তখন জানবে যে, তোমাদের চেয়ে এটা হতে আমি আরো বহু দূরে রয়েছি।” (ইমাম আহমদই (রঃ) এ হাদীসটিকেও স্বীয় হাদীস গ্রন্থ ‘মুসনাদ’ এ বর্ণনা করেছেন।
এর সনদ বিশুদ্ধ)ইমাম মুসলিম (রঃ) এই সনদে নিম্নের হাদীসটি তাখরীজ করেছেনঃ “যখন তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করবে তখন যেন সে বলেঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ্! আপনি আমার জন্যে আপনার রহমতের দরজাগুলি খুলে দিন।‘ আর যখন বের হবে তখন যেন বলেঃ (আরবি) অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ্! আমি আপনার অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি।‘ এর অর্থ হচ্ছে (আল্লাহ তাআ’লাই খুব ভাল জানেন): যখনই আমার পক্ষ হতে তোমাদের কাছে কোন ভাল কথা পৌঁছে তখন জেনে রাখবে আমি তোমাদের অপেক্ষা ওর বেশী নিকটবতী। আর যখনই তোমাদের কাছে কোন খারাপ কথা পৌঁছবে তখন জানবে যে, আমি তোমাদের অপেক্ষা এর থেকে বহু দূরে।”হযরত মাসরূফ (রাঃ) বলেন যে, একজন স্ত্রীলোক হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের (রাঃ) নিকট এসে বলেঃ “আপনি কি চুলে চুল মিলাতে নিষেধ করে থাকেন?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হা।” তখন মহিলাটি তাঁকে বলেঃ “আপনার বাড়ীর স্ত্রীলোকদের কেউ কেউ এটা করে থাকে।” একথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “যদি তা-ই হয় তবে তো আমি সৎ বান্দার অসিয়তের হিফাযত করি নাই।
আমি চাই না যে, তোমাদেরকে আমি যা থেকে নিষেধ করি তা নিজেই করি।”হযরত আবু সুলাইমান (রঃ) বলেনঃ “আমাদের কাছে হযরত উমার ইবনু আবদিল আযীযের (রঃ) নিকট থেকে চিঠিপত্র আসতো, যাতে হুকুম আহ্কাম এবং নিষেধাজ্ঞা থাকতো। শেষে তিনি লিখতেনঃ “আমি ঐ কথাই বলছি, যে কথা সৎ বান্দা বলেছিলেন। তা হচ্ছেঃ আমার যা কিছু তাওফীক হয় তা শুধু আল্লাহরই সাহায্যে হয়ে থাকে। আমি তাঁরই উপর ভরসা রাখি এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করি।”
তিনি বললেন, ‘হে আমার সম্প্রদায় ! তোমরা ভেবে দেখেছ কি , আমি যদি আমার রব প্রেরিত স্পষ্ট প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি এবং তিনি যদি তাঁর কাছ থেকে আমাকে উৎকৃষ্ট রিযক [১] দান করে থাকেন ( তবে কি করে আমি আমার কর্তব্য হতে বিরত থাকব? ) আর আমি তোমাদেরকে যা নিষেধ করি আমি নিজে তার বিপরীত করতে ইচ্ছে করি না [২] আমি তো আমার সাধ্যমত সংস্কারই করতে চাই। আমার কার্যসাধন তো আল্লাহরই সাহায্যে ; আমি তাঁরই উপর নির্ভর করি এবং তাঁরই অভিমুখী।
[১] রিযক শব্দটি এখানে দ্বিবিধ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এর একটি অর্থ হচ্ছে, সত্যসঠিক জ্ঞান, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে, আর দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে এ শব্দটি থেকে সাধারণত যে অর্থ বুঝা যায় সেটি অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে জীবন যাপন করার জন্য যে জীবন সামগ্ৰী দান করে থাকেন। প্রথম অর্থটির প্রেক্ষিতে এর অর্থ হচ্ছে নবুওয়াত ও রিসালত। [ইবন কাসীর] আর দ্বিতীয় অর্থের প্রেক্ষিতে এর অর্থ হবে, হালাল রিযক। [ইবন কাসীর] অর্থাৎ শু'আইব আলাইহিস সালাম বলছেন যে, আমার আল্লাহ যদি আমাকে হালাল রিযিক দিয়ে থাকেন তাহলে তোমাদের নিন্দাবাদের কারণে এ অনুগ্রহ কি করে বিগ্রহে পরিণত হবে? আল্লাহ যখন আমার প্রতি মেহেরবানী করেছেন তখন তোমাদের ভ্রষ্টতা ও হারাম খাওয়াকে আমি সত্য ও হালাল গণ্য করে তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ হই কেমন করে?
[২] অর্থাৎ একথা থেকেই তোমরা আমার সত্যতা আন্দাজ করে নিতে পারো যে, অন্যদের আমি যা কিছু বলি আমি নিজেও তা করি। এমন নয় যে, তোমাদেরকে যা থেকে নিষেধ করছি আমি নিজে তার বিরোধিতা করে তা গোপনে করে যাচ্ছি। [ইবন কাসীর] অর্থাৎ যদি আমি তোমাদের আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহর পূজা বেদীতে যেতে নিষেধ করতাম এবং নিজে কোন বেদীর সেবক হয়ে বসতাম তাহলে নিঃসন্দেহে তোমরা আমার কথার বাইরে চলার মত দলীল-প্রমাণাদি পেয়ে যেতে। যদি আমি তোমাদের হারাম জিনিস খেতে নিষেধ করতাম এবং নিজের কারবারে বেঈমানী করতে থাকতাম তাহলে তোমরা অবশ্যি এ সন্দেহ পোষণ করতে পারতে যে, আমি নিজের সুনাম প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ঈমান্দারীর দাবী করছি।
কিন্তু তোমরা দেখছো, যেসব অসৎকাজ থেকে আমি তোমাদের নিষেধ করছি। আমি নিজেও সেগুলো থেকে দূরে থাকছি। যেসব কলংক থেকে আমি তোমাদের মুক্ত দেখতে চাচ্ছি আমার নিজের জীবনও তা থেকে মুক্ত। তোমাদের আমি যে পথের দিকে আহবান জানাচ্ছি আমার নিজের জন্যও আমি সেই পথটিই পছন্দ করেছি। এসব জিনিস একথা প্রমাণ করে যে, আমি যে দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছি সে ব্যাপারে আমি সত্যবাদী ও একনিষ্ঠ।
[سورة هود (11): الآيات 84 الى 95] পূর্ণ পৃষ্ঠা
তার (রাসূলুল্লাহর) পক্ষ থেকে বর্ণিত এক রেওয়ায়েতে আছে: "দিন ও রাত ততক্ষণ পর্যন্ত শেষ হবে না যতক্ষণ না এই উম্মত পুরুষদের পশ্চাৎপথকে (মৈথুনের জন্য) বৈধ মনে করবে, যেমন তারা নারীদের পশ্চাৎপথকে বৈধ মনে করেছে; ফলে এই উম্মতের বিভিন্ন দলের ওপর আপনার রবের পক্ষ থেকে পাথর বর্ষিত হবে।" এবং বলা হয়েছে: এর অর্থ হলো এই জনপদসমূহ জালেমদের থেকে দূরে নয়, আর এগুলো সিরিয়া ও মদিনার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। আর "দূরে" শব্দটি পুরুষবাচক রূপে এসেছে ‘একটি দূরবর্তী স্থান’ অর্থটি বুঝাতে। আর যে পাথরগুলো বর্ষিত হয়েছিল সে সম্পর্কে দুটি বক্তব্য রয়েছে: প্রথমটি— জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) যখন শহরগুলোকে উপরে উঠিয়েছিলেন, তখন সেগুলোর ওপর পাথর বর্ষিত হয়েছিল।
দ্বিতীয়টি— শহরবাসীদের মধ্যে যারা সে সময় শহরের ভেতরে ছিল না বরং বাইরে অবস্থান করছিল, তাদের ওপর পাথর বর্ষিত হয়েছিল। [সুরা হুদ (১১): আয়াত ৮৪ থেকে ৯৫]এবং মাদইয়ানবাসীদের নিকট তাদের ভাই শুয়াইবকে (প্রেরণ করেছি), সে বলল: হে আমার জাতি, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই। আর তোমরা মাপ ও ওজনে কম দিও না। আমি তোমাদেরকে সচ্ছল অবস্থায় দেখছি, কিন্তু আমি তোমাদের ওপর এক পরিবেষ্টনকারী দিনের আজাবের ভয় করছি। (৮৪) আর হে আমার জাতি, তোমরা ইনসাফের সাথে মাপ ও ওজন পূর্ণ করো এবং মানুষকে তাদের প্রাপ্য জিনিস কম দিও না, আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী হয়ে ফাসাদ করে বেড়িয়ো না।
(৮৫) আল্লাহর দেওয়া উদ্বৃত্ত অংশই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা মুমিন হও। আর আমি তোমাদের ওপর কোনো পাহারাদার নই। (৮৬) তারা বলল: হে শুয়াইব, আপনার সালাত কি আপনাকে এই নির্দেশ দেয় যে, আমাদের পিতৃপুরুষরা যার ইবাদত করত আমাদের তা ছেড়ে দিতে হবে, অথবা আমাদের ধন-সম্পদে আমরা ইচ্ছামতো যা করি তা বর্জন করতে হবে? আপনি তো অত্যন্ত সহনশীল ও সুপথপ্রাপ্ত! (৮৭) সে বলল: হে আমার জাতি, তোমরা কি ভেবে দেখেছ, আমি যদি আমার রবের পক্ষ থেকে এক সুস্পষ্ট প্রমাণের ওপর থাকি এবং তিনি যদি আমাকে তাঁর পক্ষ থেকে উত্তম রিজিক দান করেন (তবে আমি কি সত্য থেকে বিমুখ হতে পারি)?
আর আমি তোমাদের যা থেকে নিষেধ করছি, আমি তার বিরুদ্ধাচরণ করে নিজেই তা করতে চাই না। আমি কেবল সাধ্যমতো সংশোধন করতে চাই। আর আমার সফলতা তো কেবল আল্লাহর সাহায্যেই সম্ভব। আমি তাঁর ওপরই ভরসা করেছি এবং তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করি। (৮৮)আর হে আমার জাতি, আমার সাথে তোমাদের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে এমন পাপে লিপ্ত না করে যার ফলে তোমাদের ওপর সেরূপ বিপদ আসে যেরূপ নূহের জাতির ওপর অথবা হূদের জাতির ওপর কিংবা সালিহের জাতির ওপর এসেছিল। আর লূতের জাতি তো তোমাদের থেকে দূরে নয়। (৮৯) আর তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তাঁর দিকে ফিরে আসো।
নিশ্চয়ই আমার রব পরম দয়ালু ও অত্যন্ত প্রেমময়। (৯০) তারা বলল: হে শুয়াইব, আপনি যা বলছেন তার অনেক কিছুই আমরা বুঝি না। আর আমরা তো আমাদের মধ্যে আপনাকে দুর্বল হিসেবে দেখছি। আর আপনার পরিবার-পরিজন না থাকলে আমরা অবশ্যই আপনাকে পাথর ছুড়ে মারতাম।
যে ব্যক্তি মানুষকে জ্ঞান শিক্ষা দেয় অথচ নিজের কথা ভুলে যায়, তার উদাহরণ হলো সেই সলতের মতো যা মানুষকে আলো দেয় কিন্তু নিজেকে পুড়িয়ে ফেলে।ইবনে কানি’ তার ‘মু’জাম’ গ্রন্থে এবং খতিব ‘আল-ইকতিদা’ গ্রন্থে সুলাইক থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “যখন কোনো আলেম জ্ঞান লাভ করে কিন্তু তদনুযায়ী আমল করে না, সে ঐ প্রদীপের মতো যা মানুষকে আলো দেয় এবং নিজেকে পুড়িয়ে ফেলে।”আসবাহানী ‘আত-তারগীব’ গ্রন্থে দুর্বল সূত্রে আবু উমামা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কিয়ামতের দিন মন্দ আলেমকে নিয়ে আসা হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
অতঃপর সে তার নাড়িভুঁড়ি নিয়ে সেভাবে ঘুরতে থাকবে—আমি জিজ্ঞেস করলাম: ‘কাসাব’ কী? তিনি বললেন: তার অন্ত্র বা নাড়িভুঁড়ি—যেভাবে গাধা যাঁতাকল নিয়ে ঘোরে। তখন তাকে বলা হবে: হায় দুর্ভোগ তোমার! কেন তোমার এই দশা হলো, অথচ আমরা তো তোমার মাধ্যমেই সঠিক পথ পেয়েছিলাম? সে বলবে: আমি তোমাদের যা করতে নিষেধ করতাম, আমি নিজেই তা করতাম।”তাবারানী দুর্বল সূত্রে ইবনে ওমর থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি মানুষকে কোনো কথা বা কাজের দিকে আহ্বান জানায় অথচ নিজে তা পালন করে না, সে আল্লাহর ক্রোধের ছায়ায় অবস্থান করতে থাকে যতক্ষণ না সে তা থেকে বিরত হয় অথবা যা বলেছে ও যার দিকে আহ্বান জানিয়েছে সেই অনুযায়ী আমল করে।”ইবনে মারদুওয়াইহ, বায়হাকী ‘শুয়াবুল ঈমান’ গ্রন্থে এবং ইবনে আসাকির ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন—এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বললেন: হে ইবনে আব্বাস!
আমি সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে চাই।তিনি বললেন: তুমি কি সেই স্তরে পৌঁছেছ? সে বলল: আমি আশা করি।তিনি বললেন: যদি আল্লাহর কিতাবের তিনটি আয়াতের মাধ্যমে লজ্জিত হওয়ার ভয় না করো, তবে তা করো।সে বলল: সেগুলো কী? তিনি বললেন: মহান আল্লাহর বাণী— তোমরা কি মানুষকে সৎ কাজের নির্দেশ দাও এবং নিজেদের কথা ভুলে যাও?
। তুমি কি এই আয়াতটি পূর্ণরূপে পালন করেছ? সে বলল: না।তিনি বললেন: তবে দ্বিতীয় বিষয়টি হলো আল্লাহর বাণী— তোমরা যা করো না, তা কেন বলো? তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর নিকট অত্যন্ত ক্রোধের বিষয়
(সূরা আস-সাফ, আয়াত ৩)। তুমি কি এই আয়াতটি যথাযথভাবে পালন করেছ?
সে বলল: না।তিনি বললেন: তবে তৃতীয় বিষয়টি হলো নেককার বান্দা শুয়াইবের উক্তি— আমি তোমাদের যে বিষয়ে নিষেধ করি, আমি তার উল্টো করতে চাই না
(সূরা হুদ, আয়াত ৮৮)। তুমি কি এই আয়াতটি দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছ? সে বলল: না।তিনি বললেন: তাহলে নিজের নফস থেকেই শুরু করো।ইবনুল মুবারক ‘আজ-জুহদ’ গ্রন্থে এবং বায়হাকী ‘শুয়াবুল ঈমান’ গ্রন্থে শা’বী থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: পৃথিবীতে এমন কোনো খতিব নেই যে খুতবা দিয়েছে, অথচ আল্লাহ তার সামনে তার সেই খুতবা পেশ করবেন না যে, এর দ্বারা সে কী উদ্দেশ্য করেছিল।ইবনে সা’দ, ইবনে আবু শায়বাহ এবং আহমদ ‘আজ-জুহদ’ গ্রন্থে আবু দারদা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ধ্বংস তার জন্য যে জানে না—একবার, আর আল্লাহ চাইলে তাকে জ্ঞান দান করতে পারতেন; এবং ধ্বংস তার জন্য যে জানে অথচ আমল করে না—সাতবার।আহমদ ‘আজ-জুহদ’ গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ধ্বংস তার জন্য যে জানে না, আর আল্লাহ চাইলে তাকে শেখাতে পারতেন; এবং ধ্বংস তার জন্য যে জানে অথচ আমল করে না—সাতবার।
