
Table of Contents
ভূমিকা
মানুষের আবেগীয় জগতের অন্যতম একটি বহিঃপ্রকাশ হলো রাগ, যা মূলত কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বা অপূর্ণ ইচ্ছার কারণে উদ্ভূত একটি জৈব-রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রাগ স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করলেও, পরম সত্তার ক্ষেত্রে এই মানবিক আবেগের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে দার্শনিক ও যৌক্তিক প্রশ্ন বিদ্যমান। বিশেষ করে ইসলামি ধর্মতত্ত্বে যেখানে আল্লাহকে ‘সর্বজ্ঞ’ এবং ‘সর্বশক্তিমান’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, সেখানে কিয়ামতের ময়দানে তাঁর তীব্র রাগান্বিত হওয়ার বিষয়টি এক ধরনের তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। যদি মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনা পূর্বনির্ধারিত হয় এবং স্রষ্টা নিজেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন, তবে নিজের তৈরি নকশা অনুযায়ী ঘটা কোনো ঘটনায় তাঁর ক্ষুব্ধ হওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়েই এই প্রবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।
রাগ কাকে বলে?
প্রথমেই জেনে নেয়া প্রয়োজন যে, রাগ কাকে বলে। রাগ এক ধরণের জৈব রাসায়নিক অনুভূতি যা নানা ধরনের শারীরিক হরমোন, শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া এবং মানুষের মস্তিষ্কের ওপর নির্ভর করে। সাধারণভাবে একজন মানুষ সপ্তাহে গড়ে তিন-চারবার রেগে যান। প্রাণীদের ওপর রাগের অনুভূতির প্রভাব বিষয়ে নানা ধরণের গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণার কারণ যেগুলো বোঝা গেছে তা হচ্ছে, কোন মানুষ বা প্রাণী যখন কোন কিছু কামনা করে কিন্তু সেটি পায় না, বা তার ইচ্ছা অনুসারে যখন কিছু হয় না, যা তার জন্য অবাক হওয়ার মত, যা সে জানতো না যে এমনটি হবে, এরকম ক্ষেত্রে একটি প্রাণী সাধারণত রেগে যায়। উচ্চ রক্তচাপ কিংবা কিছু শারীরিক অসুস্থতা রাগ বাড়িয়ে দিতে পারে। প্রাণীরা রাগ প্রকাশ করে যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো, কারণ এতে মস্তিষ্কে তৈরি হওয়া স্ট্রেস কমে যায়। এটি ব্রেন স্ট্রোক প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু অতিরিক্ত রাগ প্রকাশ করলে তা শরীরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সবজান্তা আল্লাহ কেন রাগ করবেন?
ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে, মহাবিশ্বের অতীত এবং ভবিষ্যৎ সব কিছুই যিনি জানেন এবং যিনি নিজেই প্রতিটি জিনিস লিখে রেখেছেন, একইসাথে তিনিই নিজেই সবকিছু সবাইকে দিয়ে করিয়ে নেন, তিনি কেয়ামতের ময়দানে খুব রেগে থাকবেন। আসুন হাদিসটি পড়ি,
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১। ঈমান [বিশ্বাস]
পরিচ্ছেদঃ ৮৪. নিম্ন জান্নাতী, তথায় তার মর্যাদা।
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৩৬৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৯৪
৩৬৮-(৩২৭/১৯৪) আবূ বকর ইবনু আবূ শাইবাহ ও মুহাম্মদ ইবনু ’আবদুল্লাহ ইবনু নুমায়র (রহঃ) ….. আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট কিছু মাংস আনা হলো। তার নিকট রানের মাংস পেশ করা হলো যা তার নিকট খুবই পছন্দনীয় ছিল। এরপর তিনি তা থেকে এক কামড় গ্রহণ করলেন। তারপর বললেন, কিয়ামত দিবসে আমিই হবো সকল মানুষের সর্দার। তা কিভাবে তোমরা কি জানো? কিয়ামত দিবসে যখন আল্লাহ তা’আলা শুরু থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত সকল মানুষকে একই মাঠে এমনভাবে জমায়েত করবেন যে, একজনের আহবান সকলে শুনতে পাবে, একজনের দৃষ্টি সকলকে দেখতে পাবে। সূর্য নিকটবর্তী হবে। মানুষ অসহনীয় ও চরম দুঃখ-কষ্ট ও পেরেশানীতে নিপতিত হবে। নিজেরা পরস্পর বলাবলি করবে কী দুর্দশায় তোমরা আছ, দেখছ না? কী অবস্থায় তোমরা পৌছেছে তা উপলব্ধি করছ না? এমন কাউকে দেখছ না যিনি তোমাদের পরওয়ারদিগারের নিকট তোমাদের জন্য সুপারিশ করবেন?
তারপর একজন আরেকজনকে বলবে, তোমরা আদমের কাছে যাও। সুতরাং তারা আদমের কাছে আসবে এবং বলবে, হে আদম! আপনি মানবকুলের পিতা, আল্লাহ স্বহস্তে আপনাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আপনার দেহে রূহ ফুঁকে দিয়েছেন। আপনাকে সিজদা করার জন্য ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন; তারা আপনাকে সিজদা করেছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার প্রতিপালকের নিকট শাফা’আত করুন। আপনি দেখছেন না, আমরা যে কি কষ্টে আছি? আপনি দেখছেন না আমরা কষ্টের কোন সীমায় পৌছেছি? আদম (আঃ) উত্তরে বলবেন, আজ আমার পরওয়ারদিগার এতবেশী রাগ করেছেন, যা পূর্বে কখনো করেননি, আর পরেও কখনো এরূপ রাগ করবেন না? তিনি আমাকে একটি বৃক্ষের (ফল খেতে) নিষেধ করেছিলেন আর আমি সে নিষেধ লঙ্ঘন করে ফেলেছি, নাফসী, নাফসী’ (আজ আমার চিন্তায় আমি পেরেশান)। তোমরা অন্য কারোর নিকট গিয়ে চেষ্টা করো, তোমরা নূহের নিকট যাও।
তখন তারা নূহ (আঃ)-এর নিকট আসবে, বলবে, হে নূহ আপনি পৃথিবীর প্রথম রাসূল। আল্লাহ আপনাকে “চির কৃতজ্ঞ বান্দা” বলে উপাধি দিয়েছেন। আপনার পরওয়ারদিগারের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। দেখছেন না, আমরা কোন অবস্থায় আছি? আমাদের অবস্থা কোন পর্যায়ে পৌছেছে? নূহ (আঃ) বলবেন, আজ আমার পরওয়ারদিগার এত রাগ করেছেন যে, এমন রাগ পূর্বেও কখনো করেননি আর পরেও কখনো করবেন না। আমাকে তিনি একটি দু’আ কবুলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আর তা আমি আমার জাতির বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে ফেলেছি। নাফসী, নাফসী (আজ আমার চিন্তায় আমি পেরেশান)। তোমরা ইবরাহীম (আঃ) এর নিকট যাও।
তখন তারা ইবরাহীম (আঃ) এর নিকট আসবে। বলবে, হে ইবরাহীম! আপনি আল্লাহর নবী, পৃথিবীবাসীদের মধ্য থেকে আপনি আল্লাহর খলীল ও অন্তরঙ্গ বন্ধু। আপনি আপনার পরওয়ারদিগারের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। দেখছেন না, আমরা কোন অবস্থায় আছি এবং আমাদের অবস্থা কোন পর্যায়ে পৌছেছে? ইবরাহীম (আঃ) তাদেরকে বলবেন, আল্লাহ আজ এতই রাগ করে আছেন যে, পূর্বে এমন কখনো করেননি আর পরেও কখনো করবেন না। তিনি তার কিছু অসত্য (বাহ্যত) কথনের বিষয় উল্লেখ করবেন। বলবেন, নাফসী, নাফসী’ (আজ আমার চিন্তায় আমি পেরেশান)। তোমরা অন্য কারো নিকট যাও। মূসার নিকট যাও।
তারা মূসা (আঃ) এর নিকট আসবে, বলবে, হে মূসা। আপনি আল্লাহর রাসূল, আপনাকে তিনি তার রিসালাত ও কালাম দিয়ে মানুষের উপর মর্যাদা দিয়েছেন। আপনার পরওয়ারদিগারের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। দেখছেন না, আমরা কোন অবস্থায় আছি এবং আমাদের অবস্থা কোন পর্যায়ে পৌছেছে? মূসা (আঃ) তাদের বলবেনঃ আজ আল্লাহ এতই রাগ করে আছেন যে, পূর্বে এমন রাগ কখনো করেননি, আর এমন রাগ পরেও কখনো করবেন না। আমি তার হুকুমের পূর্বেই এক ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলেছিলাম। নাফসী, নাফসী (আজ আমার চিন্তায় আমি পেরেশান)। তোমরা ঈসা (আঃ)-এর নিকট যাও।
তারা ঈসা (আঃ) এর নিকট আসবে এবং বলবে, হে ঈসা। আপনি আল্লাহর রাসূল, দোলনায় অবস্থানকালেই আপনি মানুষের সাথে বাক্যালাপ করেছেন, আপনি আল্লাহর দেয়া বাণী, যা তিনি মারইয়ামের মধ্যে নিক্ষেপ করে দিয়েছিলেন, আপনি তার দেয়া আত্মা! সুতরাং আপনার পরওয়ারদিগারের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। দেখছেন না, আমরা কোন অবস্থায় আছি এবং আমাদের অবস্থা কোন পর্যায়ে পৌছেছে? ঈসা (আঃ) তাদের বলবেন, আজ আল্লাহ তা’আলা এতই রাগ করে আছেন যে, এরূপ রাগ না পূর্বে কখনো করেছেন আর না পরে কখনো করবেন, তিনি কোন অপরাধের কথা উল্লেখ করবেন না। তিনি বললেন, নাফসী, নাফসী’ (আজ আমার চিন্তায় আমি পেরেশান)। তোমরা অন্য কারো নিকট যাও। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট যাও।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তখন তারা আমার নিকট আসবে এবং বলবে, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহর রাসূল, শেষ নবী, আল্লাহ আপনার পূর্বাপর সকল ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনি আপনার পরওয়ারদিগারের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। দেখছেন না, আমরা কোন অবস্থায় আছি এবং আমাদের অবস্থা কোন পর্যায়ে পৌছেছে? তখন আমি সুপারিশের জন্য যাব এবং আরশের নীচে এসে পরওয়ারদিগারের উদ্দেশে সিজদাবনত হব। আল্লাহ আমার অন্তরকে খুলে দিবেন এবং সর্বোত্তম প্রশংসা ও হামদ জ্ঞাপনের শিক্ষা গ্রহণ করবেন, যা ইতোপূর্বে আর কাউকে খুলে দেননি।
এরপর আল্লাহ বলবেন, হে মুহাম্মাদ! মাথা উত্তোলন করুন, প্রার্থনা করুন, আপনার প্রার্থনা কবুল করা হবে। সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। অনন্তর আমি মাথা তুলব। বলব, হে পরওয়ারদিগার! উম্মাতী, উম্মতী’ (আমার উম্মত, আমার উম্মত’) (এদেরকে মুক্তি দান করুন) তারপর বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! আপনার উম্মতের যাদের উপর কোন হিসাব নেই তাদেরকে জান্নাতের দরজার ডান দিক দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিন। তারা এছাড়াও অন্য দরজায় মানুষের সঙ্গে শারীক হবে। কসম ঐ সত্ত্বার যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, নিশ্চয় জান্নাতের দু’ চৌকাঠের মধ্যকার দূরত্ব মক্কা ও হাজরের (বাহরাইনের একটি জনপদের) দূরত্বের মতো। অথবা বর্ণনাকারী বলেন, মক্কা ও বাসরার দূরত্বেরে ন্যায়। (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৭৬, ইসলামিক সেন্টারঃ ৩৮৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান সত্তার রাগের দার্শনিক অসংগতি
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে, একজন ‘সর্বজ্ঞ’ (Omniscient) এবং ‘সর্বশক্তিমান’ (Omnipotent) ঈশ্বরের রাগ প্রদর্শনের বিষয়টি গভীর যৌক্তিক সংকটের সৃষ্টি করে। রাগের প্রাথমিক শর্ত হলো—কোনো কিছু নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া বা প্রত্যাশিত ফলাফলের বিপরীতে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটা। কিন্তু যে সত্তা মহাবিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণুর গতিবিধি এবং মানুষের প্রতিটি কর্ম সৃষ্টির কোটি বছর আগেই জানতেন, তাঁর কাছে কোনো কিছুই ‘নতুন’ বা ‘অপ্রত্যাশিত’ হতে পারে না।
যুক্তি অনুসারে, যদি ঈশ্বর জানেন যে একজন মানুষ পাপ করবে এবং সেই জানা অনুযায়ীই ঘটনাটি ঘটে, তবে সেখানে রাগের কোনো অবকাশ থাকে না; কারণ বিষয়টি তাঁর জানা তথ্যেরই বাস্তবায়ন মাত্র। দ্বিতীয়ত, রাগ হলো একটি আবেগীয় প্রতিক্রিয়া যা সাধারণত কোনো অভাব বা অতৃপ্তি থেকে জন্ম নেয়। একজন ‘পরিপূর্ণ’ ও ‘অমুখাপেক্ষী’ সত্তার যদি মানুষের কর্মে মেজাজ পরিবর্তন হয় বা তিনি ক্ষুব্ধ হন, তবে তা তাঁর অপরিবর্তনীয় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বৈশিষ্ট্যের পরিপন্থী। সুতরাং, বিচার দিবসে স্রষ্টার প্রচণ্ড রাগান্বিত হওয়ার ধর্মীয় বর্ণনাটি মূলত একটি ‘অ্যানথ্রোপোমোরফিজম’ বা ঈশ্বরকে মানুষের গুণাবলি দিয়ে সংজ্ঞায়িত করার প্রচেষ্টা মাত্র, যা বিশুদ্ধ যুক্তির বিচারে একটি বড় ধরনের ‘লজিক্যাল ফ্যালাসি’ বা যুক্তি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়।
আল্লাহ সময়ের অধীন নাকি সময়ের উর্ধ্বে?
উপরে বর্ণিত হাদিসের বক্তব্য অনুযায়ী কিয়ামতের দিনে আদম, নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা-এর মতো নবী-রাসূলগণ স্পষ্টভাবে বলছেন যে “আজ আমার প্রভু এত রাগ করেছেন যা পূর্বে কখনো করেননি এবং পরেও কখনো করবেন না”। এখানে ‘আজ’ শব্দটি একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তকে চিহ্নিত করে, যেখানে অতীত (পূর্বে কখনো নয়), বর্তমান (আজ) এবং ভবিষ্যৎ (পরেও নয়) — এই তিনটি সময়ের ধারা অত্যন্ত স্পষ্ট ও রৈখিক।
যৌক্তিক বিশ্লেষণ: এই সময়রেখাটি নির্দেশ করে যে, আল্লাহর ক্রোধ কোনো চিরন্তন বা অপরিবর্তনীয় গুণ নয়, বরং এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘটে যাওয়া মানসিক অবস্থার পরিবর্তন (State Change)। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট দিবসে এমন ক্রোধের প্রকাশ যা পূর্বে ছিল না, প্রমাণ করে যে স্রষ্টা সময়ের একটি রৈখিক ধারায় (Linear Timeline) অবস্থান করছেন। যদি কোনো সত্তার অবস্থা সময়ের সাপেক্ষে পরিবর্তিত হয়—অর্থাৎ এক সময় তিনি শান্ত এবং অন্য সময়ে রাগান্বিত হন—তবে তিনি সময়ের ঊর্ধ্বে নন, বরং সময়ের একটি নির্দিষ্ট ফ্রেমে আবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণাধীন। সময়ের ঊর্ধ্বে থাকা সত্তার কোনো ‘আগে’ বা ‘পরে’ থাকতে পারে না, কারণ তাঁর সমস্ত অবস্থা সর্বদা এক ও অপরিবর্তনীয় থাকার কথা।
যদি আল্লাহ সত্যিকার অর্থে সময়ের ঊর্ধ্বে (timeless) বা চিরন্তন (eternal) হতেন, তাহলে তাঁর কাছে কোনো ‘আগে-পরে’ বা ‘আজ’ বলে আলাদা মুহূর্তের অস্তিত্ব থাকত না। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে, সময় হলো পরিবর্তনের পরিমাপ (Aristotle-এর মতে time is the measure of change)। যদি কোনো সত্তার আবেগ বা অবস্থা (যেমন রাগের মাত্রা) সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়, তাহলে সেই সত্তা নিজেই সময়ের অধীন — অর্থাৎ তিনি মহাবিশ্বের ঘটনাক্রম (sequence of events) পর্যবেক্ষণ করে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। এটি তাঁকে স্রষ্টা নয়, বরং সৃষ্টির একটি অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে। এই হাদিসটিকে রূপক (metaphorical) হিসেবে বর্ণনা করার সুযোগ নেই— কারণ ইসলামি সোর্সে (সহীহ মুসলিম) এটি আক্ষরিকভাবে বর্ণিত, এবং কোনো ধর্মীয় ব্যাখ্যাও এই স্পষ্ট টাইমলাইনকে অস্বীকার করতে পারে না।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা যেতে পারে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব (special & general relativity) অনুসারে সময় কোনো স্বাধীন, নিরপেক্ষ সত্তা নয় — এটি মহাবিশ্বের স্পেসটাইমের অংশ, যেখানে ঘটনার ক্রম (causality) নির্ভর করে আলোর গতি ও মহাকর্ষের উপর। যদি আল্লাহর ‘রাগের মাত্রা’ কিয়ামতের দিনে (যা মহাবিশ্বের একটি ভবিষ্যৎ ঘটনা) বৃদ্ধি পায় এবং তারপর কমে যায়, তাহলে তিনি সেই একই স্পেসটাইমের ফ্রেমে আবদ্ধ। একজন সময়-স্রষ্টা (creator of time) বা সময়ের নিয়ন্ত্রক হলে তাঁর কাছে পুরো মহাবিশ্বের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ একই সাথে উপস্থিত থাকত (Boethius-এর ধারণা অনুসারে ‘eternal now’) — কোনো পরিবর্তনশীল প্রতিক্রিয়ার সুযোগ থাকতো না। কিন্তু হাদিসটি তাঁকে একটি পরিবর্তনশীল, প্রতিক্রিয়াশীল সত্তায় পরিণত করে, যা মানুষের মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা-নির্ভর রাগের মতোই জৈব-রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া (stress response) ছাড়া আর কিছু নয়।
সারকথা: এই বর্ণনা কোনো অসীম, অপরিবর্তনীয় স্রষ্টার ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। এটি শুধু অ্যানথ্রোপোমোর্ফিজম (মানুষের গুণ আরোপ) নয়, বরং লজিক্যাল কনট্রাডিকশন — যেখানে বহু ইসলামিক দলিলে আল্লাহকে সময়ের স্রষ্টা বলা হয় অথচ দলিগুলো পরীক্ষা করলে তাঁকে সময়ের অধীন বলে বোঝা যায়। কোনো প্রমাণ বা যুক্তি নেই যে এই অসংগতি মিটে যায়; বরং এটি প্রমাণ করে যে ইসলামি ধর্মতত্ত্বে আল্লাহর বর্ণনা মানবিক প্রজেকশন ছাড়া আর কিছু নয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, রাগের যে সংজ্ঞা আমরা জানি তা মূলত সীমাবদ্ধ এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তৈরি হওয়া একটি মানবিক বৈশিষ্ট্য। ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, কিয়ামতের দিনে নবী-রাসূলগণ আল্লাহর যে প্রচণ্ড রাগের বর্ণনা দিয়েছেন, তা একজন সর্বজ্ঞ এবং সর্বনিয়ন্তা সত্তার চিরাচরিত ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ, যিনি ভবিষ্যতের প্রতিটি খুঁটিনাটি আগে থেকেই জানেন এবং যার ইচ্ছার বাইরে কিছুই ঘটে না, তাঁর কাছে কোনো কিছুই ‘হঠাৎ ঘটে যাওয়া’ বা ‘অবাক করা’ বিষয় নয়। ফলে, যুক্তি অনুসারে, পরম সত্তার ওপর মানবিক আবেগের এই আরোপ মূলত ধর্মগ্রন্থের বর্ণনায় সৃষ্ট একটি যৌক্তিক অসংগতিকেই নির্দেশ করে, যেখানে স্রষ্টাকে অসীম শক্তির অধিকারী দাবি করা হলেও তাঁর আচরণে মানবিক সীমাবদ্ধতা এবং আবেগের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়।
