মুহাম্মদের নিষ্ঠুর বর্বরতা এবং শারীরিক নির্যাতন

ভূমিকা

সভ্যতার বিবর্তনের সাথে সাথে অপরাধ ও দণ্ডবিধি সম্পর্কে মানুষের ধারণা আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। আধুনিক বিচারব্যবস্থায় দণ্ড প্রদানের মূল দর্শন কেবল প্রতিশোধ গ্রহণ নয়, বরং অপরাধীর সংশোধন এবং পুনর্বাসন। সমকালীন বিশ্বে মানবাধিকার ও নৈতিকতার মানদণ্ড অনুযায়ী, অপরাধী যত বড় অপরাধই করুক না কেন, তার মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শারীরিক নির্যাতন বা অঙ্গহানি বর্তমানে একটি বর্বরোচিত প্রথা হিসেবে স্বীকৃত এবং আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা নিষিদ্ধ। তবে এই আধুনিক চেতনার বিপরীতে যখন আমরা সপ্তম শতাব্দীর আরব উপদ্বীপের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দণ্ডবিধি পর্যালোচনা করি, তখন সেখানে চরম বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে ইসলামের প্রবর্তক নবী মুহাম্মদের সময়ে প্রদত্ত কিছু শাস্তির ধরণ আধুনিক নৈতিকতা ও মানবাধিকারের মৌলিক ধারণাকে তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। সেইসাথে আরও বড় সমস্যা দেখা দেয়, নবী মুহাম্মদের জীবনের এইসব ঘটনাবলী যখন কেয়ামত পর্যন্ত সকল মুসলিমের নৈতিকতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে গণ্য হয়, একইসাথে ইসলামী স্মরিয়া আইনের উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই এইসব ঘটনাবলী খতিয়ে দেখা জরুরি যে, এগুলো আধুনিক সভ্য জগতের আইনগুলোর সাথে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ।


আধুনিক নৈতিকতা ও মানবাধিকারের মানদণ্ড

বর্তমান বিশ্বে ‘Universal Declaration of Human Rights’ (UDHR) বা সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর শাস্তি প্রদান করা যাবে না। আধুনিক আইনশাস্ত্রের মূল ভিত্তি হলো:

সংশোধনমূলক বিচার:

অপরাধীকে সুযোগ দেওয়া যাতে সে সমাজের মূলধারায় ফিরতে পারে।

নির্যাতন নিষিদ্ধকরণ:

শারীরিক আঘাত বা অঙ্গহানিকে অনৈতিক বলে গণ্য করা হয়।

মর্যাদা রক্ষা:

অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হওয়ার পরও তার বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় অধিকার (যেমন খাদ্য ও পানি) নিশ্চিত করা।


দণ্ডবিধি হিসেবে ‘ত্রাস’ ও ‘ভীতি’ সঞ্চার

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় শাসনব্যবস্থায় দণ্ডবিধির একটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল জনগণের মধ্যে তীব্র ভীতি বা ত্রাস সঞ্চার করা। তৎকালীন রাজতন্ত্র বা একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ‘ন্যায়বিচার’ অপেক্ষা ‘কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখা’ এবং ‘বিদ্রোহ দমন’ করাকেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া হতো। অপরাধীকে জনসম্মুখে বীভৎসভাবে নির্যাতন করে হত্যা করার মাধ্যমে মূলত সাধারণ মানুষকে এই বার্তা দেওয়া হতো যে, শাসকের অবাধ্যতা বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিণতি হবে অসহনীয়। এই পদ্ধতিকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘Spectacular Punishment’ বা ‘প্রদর্শিণীমূলক শাস্তি’ বলা হয়, যেখানে অপরাধীর দেহকে ক্ষমতার মহড়া প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ইসলামের দণ্ডবিধিতেও এই একই ধরণের ‘ত্রাস সৃষ্টি’র কৌশল প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হয়। উকল ও উরাইনাহ গোত্রের ক্ষেত্রে যে দণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল, তার ধরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি কেবল একটি খুনের বিচার ছিল না; বরং এটি ছিল ধর্মত্যাগী এবং রাষ্ট্রদ্রোহীদের জন্য একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। হাত-পা কেটে ফেলা এবং উত্তপ্ত লৌহ শলাকা দিয়ে চোখ অন্ধ করে দেওয়ার মতো চরম নিষ্ঠুরতা কোনো সংশোধনমূলক ব্যবস্থার অংশ হতে পারে না; এটি বিশুদ্ধভাবে একটি ‘ত্রাসসৃষ্টিকারী দণ্ডবিধি’ (Punitive Terror), যা মানুষের মনে গভীর ত্রাস সঞ্চার করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।

ইসলামি ধর্মতত্ত্বে ‘হিরাবাহ’ বা আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের যে শাস্তির বিধান রয়েছে [1], সেখানেও হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা বা শূলে চড়ানোর মতো বিধানগুলো প্রাচীন জমানার নিষ্ঠুরতম রাজকীয় দণ্ডবিধিরই প্রতিফলন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এই নিষ্ঠুরতা সমসাময়িক অন্য অনেক সম্রাজ্যের চেয়েও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। যখন একজন সাধারণ শাসক ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিদ্রোহ দমন করেন, তখন তা রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে গণ্য হয়; কিন্তু যখন একজন স্বঘোষিত ‘মহামানব’ বা ‘নবী’ একই ধরণের বর্বর পদ্ধতি ব্যবহার করেন, তখন তা নৈতিকতার সকল সীমা অতিক্রম করে। দয়া বা ক্ষমার চেয়ে বীভৎসতাকে প্রাধান্য দিয়ে ভীতি সৃষ্টির এই নীতি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় ধর্ম কেবল আধ্যাত্মিক বিষয় ছিল না, বরং তা ছিল একটি কঠোর রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি, যা ত্রাসের মাধ্যমেই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। সত্য ও ন্যায়ের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত কোনো আদর্শের প্রচারের জন্য যদি এমন বর্বরোচিত ভীতির প্রয়োজন হয়, তবে সেই আদর্শের নৈতিক ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তোলা যৌক্তিক হয়ে দাঁড়ায়।


ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও উকল-উরাইনাহর ঘটনা

ইসলামি ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য উৎসগুলোতে ‘উকল’ বা ‘উরাইনাহ’ গোত্রের একটি ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়, যা তৎকালীন শাস্তির ভয়াবহতাকে চিত্রিত করে। বর্ণিত আছে যে, কিছু লোক মদিনায় আসার পর অসুস্থ হয়ে পড়লে নবী মুহাম্মদ তাদের চিকিৎসার জন্য মুসলিমদের উটের দুধ ও প্রস্রাব পানের পরামর্শ দেন। তারা সুস্থ হওয়ার পর নবীর রাখালকে হত্যা করে এবং উটগুলো নিয়ে পালিয়ে যায়। এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল, তা আধুনিক নৈতিকতার বিচারে অত্যন্ত কঠোর ও অমানবিক হিসেবে প্রতীয়মান হয়।

বর্ণনামতে, নবী মুহাম্মদের উপস্থিতিতে এবং প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে অভিযুক্তদের ধরে আনার পর তাদের হাত ও পা কেটে দেওয়া হয়েছিল এবং উত্তপ্ত লোহার শলাকা দিয়ে তাদের চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছিল। অধিকন্তু, মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের পানি পান করতে দেওয়া হয়নি এবং মরুভূমির উত্তপ্ত বালিতে তাদের ফেলে রাখা হয়েছিল। আনাস বর্ণিত এই ঘটনায় দেখা যায়, অপরাধীরা যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মাটি কামড়াচ্ছিল, কিন্তু তাদের প্রতি ন্যূনতম দয়া প্রদর্শন করা হয়নি।


নবী নিজেই হাতপা কেটে চোখ উপড়ে ফেলেন

যদিও প্রাচীন যুগে অনেক শাসকই এরকম নির্মমতা প্রদর্শন করেছেন, তারা কখনোই সর্বকালের আদর্শ মহামানব হিসেবে বিবেচিত হননি। কিন্তু ইসলামে নবী মুহাম্মদকে সর্বোচ্চ নৈতিক আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা তার বর্বরতা ও অত্যাচারের ইতিহাসের সাথে সাংঘর্ষিক। এজন্য, এই ধরনের শাস্তি প্রথা ও নির্যাতনকে আধুনিক সমাজে নৈতিকতার মানদণ্ডে বিচার করলে তা এক ধরনের বর্বরতার উদাহরণ হিসেবেই প্রতীয়মান হয় [2] [3] [4] [5]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৬/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ৭৬/৫. উটের দুধের সাহায্যে চিকিৎসা।
৫৬৮৫. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। কতক লোক রোগে আক্রান্ত হয়েছিল, তারা বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের আশ্রয় দিন এবং আমাদের খাদ্য দিন। অতঃপর যখন তারা সুস্থ হল, তখন তারা বললঃ মদিনা’র বায়ু ও আবহাওয়া অনুকূল নয়। তখন তিনি তাদেরকে তাঁর কতগুলো উট নিয়ে ’হাররা’ নামক জায়গায় থাকতে দিলেন। এরপর তিনি বললেনঃ তোমরা এগুলোর দুধ পান কর। যখন তারা আরোগ্য হল তখন তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর রাখালকে হত্যা করে ফেলল এবং তাঁর উটগুলোকে হাঁকিয়ে নিয়ে চলল। তিনি তাদের পশ্চাতে ধাওয়াকারীদের পাঠালেন।এরপর তিনি তাদের হাত পা কেটে দেন এবং তাদের চক্ষুগুলোকে ফুঁড়ে দেন। বর্ণনাকারী বলেনঃ আমি তাদের এক ব্যক্তিকে দেখেছি। সে নিজের জিভ দিয়ে মাটি কামড়াতে থাকে, অবশেষে মারা যায়। [২৩৩]
বর্ণনাকারী সাল্লাম বলেনঃ আমার নিকট সংবাদ পৌঁছেছে যে, হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ আনাস (রাঃ)-কে বলেছিলেন, আপনি আমাকে সবচেয়ে কঠোর শাস্তি সম্পর্কে বলুন, যেটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছিলেন। তখন তিনি এ হাদীসটি বর্ণনা করেন। এ খবর হাসান বসরীর কাছে পৌঁছলে তিনি বলেছিলেনঃ
যদি তিনি এ হাদীস বর্ণনা না করতেন তবে আমার মতে সেটাই ভাল ছিল।(আধুনিক প্রকাশনী- ৫২৭৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫১৭০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৬ঃ কিসাস (প্রতিশোধ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ – মুরতাদ এবং গোলযোগ সৃষ্টিকারীকে হত্যা করা প্রসঙ্গে
৩৫৩৯-(৭) আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ‘উকল সম্প্রদায়ের কিছু লোক উপস্থিত হলো। অতঃপর তারা ইসলাম গ্রহণ করল। কিন্তু মাদীনার আবহাওয়া তাদের জন্য অনুপযোগী হলো। অতএব তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে সাদাকার উটনীর নিকট গিয়ে তার দুধ ও প্রস্রাব পানের নির্দেশ দিলেন। ফলে তারা নির্দেশ পালনার্থে সুস্থ হয়ে উঠল। কিন্তু তারা সুস্থ হয়ে মুরতাদ হয়ে গেল এবং তারা রাখালদেরকে হত্যা করে উটগুলো হাঁকিয়ে নিল। তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এ সংবাদ শুনে) তাদের পেছনে লোক পাঠালেন। অতঃপর তাদেরকে ধরে আনা হলে তাদের দু’ হাত ও দু’ পা কেটে ফেললেন এবং তাদের চোখ ফুঁড়ে দিলেন, তারপর তাদের রক্তক্ষরণস্থলে দাগালেন না, যাতে তারা মৃত্যুবরণ করে।
অপর বর্ণনাতে রয়েছে, লোকেরা তাদের চোখে লৌহ শলাকা দিয়ে মুছে দিল। অন্য বর্ণনাতে আছে,
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) লৌহ শলাকা আনার হুকুম করলেন, যাকে গরম করা হলো এবং তাদের চোখের উপর মুছে দেয়া হলো। অতঃপর তাদেরকে উত্তপ্ত মাটিতে ফেলে রাখলেন। তারা পানি চাইল কিন্তু তাদেরকে পানি পান করানো হয়নি। পরিশেষে তারা এ করুণ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল। (বুখারী ও মুসলিম)(1)
(1) সহীহ : বুখারী ৩০১৮, ৬৮০২, মুসলিম ১৬৭১, আবূ দাঊদ ৪৩৬৪, নাসায়ী ৪০২৫, ইবনু মাজাহ ২৫৭৮, আহমাদ ১২৬৩৯।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২৯/ ‘কাসামা’-(খুনের ব্যাপারে বিশেষ ধরনের হলফ করা), ‘মুহারিবীন’ (শত্রু সৈন্য), ‘কিসাস’ (খুনের বদলা) এবং ‘দিয়াত’ (খুনের শাস্তি স্বরূপ অর্থদন্ড)
পরিচ্ছেদঃ ২. শত্রু সৈন্য এবং মুরতাদের বিচার
৪২০৭। আবূ জাফর মুহাম্মাদ ইবনু সাব্বাহ ও আবূ বাকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, “উকল” গোত্রের আট জনের একটি দল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আগমন করল। অতঃপর তারা ইসলামের ওপর বাইআত গ্রহণ করল। কিন্তু সেখানকার আবহাওয়া তাদের অনুকুলে না হওয়ায় তাদের শরীর অসুস্থ হায় গেল। তখন তারা এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আভিযোগ করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কি আমাদের রাখালের সাথে-গমন করে উটের মূত্র ব্যবহার এবং দুধ পান করতে পারবে? তখন তারা বলল, জী হ্যাঁ। এরপর বের হয়ে গেল এবং তার মূত্র ব্যবহার ও দুধ পান করল। এতে তারা সুস্থ হয়ে গেল।
অতঃপর তারা রাখালকে হত্যা করল এবং উটগুলো তাড়িয়ে নিয়ে গেল। এই সংবাদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পৌঁছল। তিনি তাদের পিছনে লোক পাঠালেন। তাঁরা ধরা পড়ল এবং তাদেরকে নিয়ে আসা হল। তাদের প্রতি আদেশ জারি করা হল এবং তাদের হাত-পা কর্তন করা হল এবং তপ্ত লৌহ শলাকা চোখে প্রবেশ করানো হলো। এরপর তাদেরকে রৌদ্রে নিক্ষেপ করা হলো। অবশেষে তারা মারা গেল।
ইবন সাব্বাহ (রহঃ) … এর বর্ণনা وَطَرَدُوا الإِبِل এর স্থলে وَاطَّرَدُوا النَّعَمَ উল্লেখ রয়েছে এবং তার বর্ণনায় وَسُمِّرَتْ أَعْيُنُهُمْ রয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ২৯। কাসামাহ্ (খুন অস্বীকার করলে হলফ নেয়া), মুহারিবীন (লড়াই), কিসাস (খুনের বদলা) এবং দিয়াত (খুনের শাস্তি স্বরূপ জরিমানা)
৪২৪৬-(১০/…) আবূ জাফার মুহাম্মাদ ইবনু সাব্বাহ ও আবূ বাকর ইবনু আবূ শাইবাহ (রহঃ) ….. আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, “উকল” গোত্রের আটজনের একটি দল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলো। তারা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ইসলামের উপর বাই’আত করল। অতঃপর মাদীনার আবহাওয়া তাদের প্রতিকূল হওয়ায় তারা অসুস্থ হয়ে পড়লে এ ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট অভিযোগ করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কি আমাদের রাখালের সাথে গমন করে উটের মূত্র এবং দুগ্ধ পান করতে পারবে? তখন তারা বলল, জী- হ্যাঁ। এরপর তারা বের হয়ে গেলে এবং এর (উটের) মূত্র ও দুগ্ধ পান করল। এতে তারা সুস্থ হয়ে গেল্‌ অতঃপর তারা রাখালকে হত্যা করে উটগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে গেলে। এ সংবাদ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পৌছল। তিনি তাদের পিছনে লোক পাঠালেন। তারা তাদেরকে পাকড়াও করে নিয়ে এল। তাদের প্রতি নির্দেশ জারি করা হল। তখন তাদের হাত-পা কৰ্তন করা হল এবং তপ্ত লৌহ শলাকা চোখে প্রবেশ করানো হলা। এরপর তাদেরকে রৌদ্রে নিক্ষেপ করা হলো। অবশেষে তারা মারা গেল।
ইবনু সাব্বাহ (রহঃ) … বর্ণনা وَطَرَدُوا الإِبِلَ এর স্থলে وَاطَّرَدُوا النَّعَمَ উল্লেখ রয়েছে। রাবী বলেন, অতঃপর তাদের চোখগুলো উপড়ে ফেলা হল। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪২০৭, ইসলামিক সেন্টার ৪২০৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)


যাদুল মা’আদঃ এই বিধান এখনো বহাল

এবারে আসুন আল্লামা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রচিত মুখতাসার যাদুল মা’আদ গ্রন্থ থেকে এই বিষয়ক ইসলামিক বিধানটি জেনে নেয়া যাক [6]

শারীরিক

নির্মম শাস্তির কারণ ছিল মুরতাদ হওয়া

এবারে আসুন তাদেরকে কেন হত্যা করা হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট কারণটি জেনে নিই, [7]

সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ পবিত্রতা
পরিচ্ছেদঃ ১৯১/ হালাল পশুর প্রস্রাব প্রসঙ্গে
৩০৭। মুহাম্মদ ইবনু ওহাব (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ উরায়নাহ গোত্রের কয়েকজন বেদুঈন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে ইসলাম কবুল করল। মদিনায় বসবাস তাঁদের জন্য উপযোগী হল না। এমনকি তাঁদের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে গেল এবং পেট ফুলে গেল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের স্বীয় দুগ্ধবতী উটের পালের দিকে পালিয়ে দিলেন। আর তাঁদেরকে উহা (দুধ ও প্রস্রাব) পান করার আদেশ দিলেন। এতে তারা সুস্থ হয়ে পড়ল এবং উটের রাখালকে মেরে উটগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে গেল। এর পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের খুঁজে আনার জন্য লোক পাঠালেন। তাঁদের ধরে আনা হল তাঁদের হাত পা কেটে দেয়া হল এবং তাঁদের চোখে গরম শলকা ঢুকিয়ে দেয়া হল।
আমিরুল মু’মিনীন আব্দুল মালিক আনাস (রাঃ) এর কাছে এ হাদিস শুনে তার কাছে প্রশ্ন করলেন, এ শাস্তি কি কুফুরের জন্য না পাপের জন্য? তিনি বললেন কুফুরের জন্য। আবূ আবদুর রহমান (ইমাম নাসারী) বলেন, তালহাহ ব্যতীত অন্য কেউ এ হাদিসের সানাদে ইয়াহিয়া আনাস হতে এ কথা উল্লেখ করেছে বলে আমাদের জানা নেই। সঠিক কথা হল, আল্লাহই ভাল জানেন- ইয়াহইয়া সা’ইদ ইবনুল মুসাইয়্যাব হতে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)


নৈতিক আদর্শ ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা: একটি যৌক্তিক দ্বন্দ্ব

ইসলামি ধর্মতত্ত্বে নবী মুহাম্মদকে ‘উসওয়াতুন হাসানা’ বা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নৈতিক আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে তার অনুসৃত এই দণ্ডবিধি আধুনিক মানবাধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক। প্রাচীন যুগের অনেক শাসকই এমন নৃশংসতা প্রদর্শন করেছেন, কিন্তু সেসব বাতিল করে বর্তমানে আমরা আধুনিক সভ্য সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখি। সমস্যাটি তৈরি হয় তখন, যখন এই ধরনের ঐতিহাসিক নিষ্ঠুরতাকে একটি চিরন্তন ‘ঐশ্বরিক’ বা ‘আদর্শ’ ন্যায়বিচার হিসেবে প্রচার করা হয়। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম তার ‘যাদুল মা’আদ’ গ্রন্থে এই শাস্তির প্রক্রিয়াকে ইসলামি বিধানের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

১. শাস্তির নিষ্ঠুরতা: চোখ উপড়ে ফেলা বা তপ্ত শলাকা দিয়ে চোখ অন্ধ করে দেওয়া শারীরিক নির্যাতনের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ, যা কোনো সভ্য সমাজের নৈতিকতায় গ্রহণযোগ্য নয়।
২. মানবিক অধিকার লঙ্ঘন: মুমূর্ষু অবস্থায় পানি পান করতে না দেওয়া মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়।
৩. শাস্তির কারণ: ইমাম নাসায়ীর বর্ণনা অনুযায়ী, তৎকালীন শাসক আব্দুল মালিক যখন আনাস-কে জিজ্ঞেস করেন যে এই শাস্তি কি পাপের জন্য নাকি কুফরির (ধর্মত্যাগ) জন্য ছিল, তখন তিনি একে ‘কুফরি’ বা ধর্মত্যাগের শাস্তি হিসেবে অভিহিত করেন। আধুনিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বাসের কারণে বা ধর্মত্যাগের জন্য এমন শারীরিক নির্যাতন কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না।

উপসংহার

পরিশেষে এটি স্পষ্ট যে, উকল ও উরাইনাহ গোত্রের বন্দীদের ওপর যে বীভৎসতা চালানো হয়েছিল, তা কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া নয় বরং চরম প্রতিশোধস্পৃহার এক অমানবিক বহিঃপ্রকাশ। মধ্যযুগীয় আরবের দোহাই দিয়ে এই জাতীয় নৃশংসতাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা আধুনিক জ্ঞানতাত্ত্বিক এবং নৈতিক বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে একটি যৌক্তিক দেউলিয়াপনা মাত্র। চোখ উপড়ে ফেলা, হাত-পা কর্তন করা এবং মৃত্যুর আগমুহূর্তে পানি না দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো কেবল ‘বর্বরতা’ নয়, বরং তা মানুষের মৌলিক অধিকারের ওপর চরম আঘাত।

যেখানে আধুনিক মানবাধিকার কোনো অপরাধীর ক্ষেত্রেই শারীরিক নির্যাতনকে সমর্থন করে না, সেখানে সপ্তম শতাব্দীর এই আদিম দণ্ডবিধিকে ‘ঐশ্বরিক’ বা ‘শাশ্বত’ হিসেবে প্রচার করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এমনকি তৎকালীন সময়ের মানদণ্ডেও এই ধরণের অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা ন্যায়বিচারের সংজ্ঞায় পড়ে না। ফলে, যে ব্যক্তি নিজেকে ‘সমগ্র জগতের জন্য রহমত’ বা সর্বকালের সর্বোচ্চ নৈতিক আদর্শ হিসেবে দাবি করেন, তার দ্বারা এই ধরণের পাশবিক আদেশ প্রদান একটি অমোচনীয় নৈতিক বৈপরীত্য (Contradiction) তৈরি করে। সত্য এবং যুক্তির নিক্তিতে বিচার করলে, এই ধরণের নিষ্ঠুর ইতিহাস ও ‘মহামানব’সুলভ ভাবমূর্তি একে অপরের পরিপন্থী; যা প্রমাণ করে যে এই দণ্ডবিধিগুলো আধুনিক সভ্যতার অর্জিত মানবিক মূল্যবোধের জন্য কেবল হুমকিস্বরূপ নয়, বরং এক চরম অবমাননা।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৩৩ ↩︎
  2. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৫৬৮৫ ↩︎
  3. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৩৫৩৯ ↩︎
  4. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪২০৭ ↩︎
  5. সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ৪২৪৬ ↩︎
  6. মুখতাসার যাদুল মা’আদ, আল্লামা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম, ওয়াহীদিয়া ইসলামিয়া লাইব্রেরী, পৃষ্ঠা ৩০৩, ৩০৪ ↩︎
  7. সুনান আন-নাসায়ী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩০৭ ↩︎