বিবর্তন তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রকে লংঘন করে?

ভূমিকা

তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র এবং বিবর্তন তত্ত্ব, এই দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রায়ই ভুল ব্যাখ্যা এবং অযৌক্তিক বিতর্ক দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন যে, বিবর্তন তত্ত্ব তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের সাথে সাংঘর্ষিক। কিন্তু বাস্তবতা হল, এই দুটি তত্ত্ব একে অপরের বিরোধী নয় বরং পরস্পর সম্পূরক। এই প্রবন্ধে আমরা তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র এবং বিবর্তন তত্ত্বের মধ্যকার সম্পর্ককে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করব।


তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র

তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র প্রকৃতির একটি মৌলিক সত্য। সূত্রটির বিভিন্ন রূপ রয়েছে, কিন্তু মূল ধারণা হল: একটি বিচ্ছিন্ন সিস্টেমে এনট্রপি সর্বদা বৃদ্ধি পায় বা সর্বোচ্চ মানে স্থির থাকে। এনট্রপিকে সরলভাবে কোনো সিস্টেমের বিশৃঙ্খলার মাত্রা বলা যায়। তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী, সিস্টেম স্বতঃস্ফূর্তভাবে কম বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে বেশি বিশৃঙ্খল অবস্থায় চলে যায়। আরও পরিষ্কারভাবে বললে, দ্বিতীয় সূত্রটি বলছে : ‘তাপ কখনও নিজে থেকে শীতল বস্তু হতে গরম বস্তুতে যেতে পারে না।’  সূত্রটিকে অনেক সময় এভাবেও বলা হয় : ‘একটি বদ্ধ সিস্টেমে এনট্রপি কখনও কমতে পারে না।’


রেফ্রিজারেটরের উদাহরণ

এখানে একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক। একটি রেফ্রিজারেটরের ভিতরে তাপমাত্রা বাইরের তাপমাত্রার চেয়ে কম। অর্থাৎ, রেফ্রিজারেটরের ভিতরে তাপ শীতল অংশ থেকে গরম অংশে প্রবাহিত হচ্ছে, যা প্রথম দৃষ্টিতে তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের সাথে সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হল, রেফ্রিজারেটর একটি বিচ্ছিন্ন সিস্টেম নয়। রেফ্রিজারেটরকে চালানোর জন্য বাইরে থেকে শক্তি সরবরাহ করতে হয়। এই শক্তি সরবরাহের ফলে রেফ্রিজারেটরের বাইরের পরিবেশে এনট্রপি বৃদ্ধি পায়। যদি রেফ্রিজারেটর এবং এর পরিবেশকে একত্রে একটি সিস্টেম হিসেবে ধরা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে, সামগ্রিকভাবে এনট্রপি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।


বিবর্তন এবং এনট্রপি

বিবর্তন তত্ত্ব অনুযায়ী, জীবেরা কালের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে এবং জটিল জীবের উদ্ভব হয়েছে। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, জীবের জটিলতা বৃদ্ধি পাওয়া তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের সাথে সাংঘর্ষিক। কিন্তু বাস্তবতা হল, বিবর্তনের প্রক্রিয়ায়ও সামগ্রিকভাবে এনট্রপি বৃদ্ধি পায়।

সূর্যের শক্তি ও মহাজাগতিক এনট্রপি

পৃথিবীর জীবমণ্ডল সূর্যের শক্তির ওপর নির্ভরশীল। সূর্যের কেন্দ্রে নিউক্লীয় ফিউশন প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়। এই প্রক্রিয়ায় সূর্যে এনট্রপি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায় এবং সেই শক্তির একটি ক্ষুদ্র অংশ পৃথিবীতে এসে প্রাণের স্পন্দন বজায় রাখে।

বিশ্লেষণ: সূর্য থেকে প্রাপ্ত এই শক্তিই পৃথিবীতে জীবনের জটিল কাঠামো তৈরির প্রাথমিক জ্বালানি।
জীবের মৃত্যু ও উপাদানের বিশ্লেষণ

জীবের জন্ম, বৃদ্ধি এবং মৃত্যু একটি অবিচ্ছিন্ন চক্র। জীব যখন মারা যায়, তখন তার সুসংগঠিত শরীর বিভিন্ন উপাদানে বিশ্লেষিত হয়ে পরিবেশে মিশে যায়। এই পচন বা বিশ্লেষণের মাধ্যমে জৈব অণুর শৃঙ্খলা নষ্ট হয়, যা সামগ্রিকভাবে এনট্রপি বৃদ্ধির একটি বাস্তব উদাহরণ।

বিশ্লেষণ: মৃত্যু হলো সুশৃঙ্খল জৈব শক্তি থেকে বিশৃঙ্খল পরিবেশে রূপান্তরের একটি ধাপ।
জটিলতায় উত্তরণ ও তাপগতিবিদ্যার সূত্র

প্রকৃতি সবসময় সরল অবস্থা থেকে জটিল অবস্থার দিকে এগিয়ে চলে। এই ঘটনাটি তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের বিরোধী নয়। কারণ, সামগ্রিকভাবে পুরো সিস্টেমের (মহাবিশ্ব) এনট্রপি বাড়লেও, বাইরের শক্তির প্রভাবে সিস্টেমের কোনো একটি অংশে (যেমন: পৃথিবীতে প্রাণের বিবর্তন) স্থানীয়ভাবে এনট্রপি সাময়িকভাবে কমতে পারে।

বিশ্লেষণ: প্রাণের জটিলতা তাপগতিবিদ্যার সূত্রের লঙ্ঘন নয়, বরং এটি শক্তির এক বিশেষ ব্যবহারের ফলাফল।

তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী, কোনো সিস্টেম স্বতঃস্ফূর্তভাবে কম বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে বেশি বিশৃঙ্খল অবস্থায় চলে যায়। কিন্তু এটি মানে এই নয় যে, সিস্টেম কখনোই জটিল হতে পারবে না। বরং এর মানে হল, কোনো সিস্টেম জটিল হতে চাইলে বাইরে থেকে শক্তি সরবরাহ করতে হবে।


উপসংহার

তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র এবং বিবর্তন তত্ত্ব একে অপরের বিরোধী নয়। বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় জীবের জটিলতা বৃদ্ধি পেলেও, সামগ্রিকভাবে এনট্রপি বৃদ্ধি পায়। রেফ্রিজারেটরের মতো, বিবর্তনের প্রক্রিয়ায়ও বাইরে থেকে শক্তি সরবরাহ করা হয়, যা সামগ্রিকভাবে এনট্রপি বৃদ্ধির কারণ হয়।