
Table of Contents
ভূমিকা
আব্রাহামিক ধর্মসমূহ—ইহুদীধর্ম, খ্রিস্টধর্ম এবং ইসলাম—যুগ যুগ ধরে একটি বিষাক্ত ধারণা প্রচার করে আসছে: নারীই মানবজাতির সকল দুর্দশা, পাপ এবং অধঃপতনের মূল কারণ। এই ধারণা কোনো দৈবিক সত্য নয়, বরং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটি সুপরিকল্পিত প্রপাগান্ডা, যা নারীকে নিয়ন্ত্রণ, নিপীড়ন এবং ডিহিউম্যানাইজ করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। ইতিহাসে দেখা যায় যে, কোনো জনগোষ্ঠীকে নির্যাতন করার আগে তাদেরকে সমস্যার উৎস হিসেবে চিত্রিত করা হয়। আব্রাহামিক ধর্মগ্রন্থগুলোতেও আদম-হাওয়ার কাহিনী দিয়ে নারীকে চিরকালীন অপরাধী হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে, যা কোনো প্রমাণিত ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং একটি মিথ যা পুরুষের আধিপত্যকে বৈধতা দেয়। এই প্রবন্ধে আমরা এই মিথের সমালোচনা করব, ইসলামিক দলিল প্রমাণ সহকারে বিশ্লেষণের মাধ্যমে—যুক্তি এবং প্রমাণের ভিত্তিতে। এই ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জ না করলে, আধুনিক সমাজেও নারী নিপীড়ন অব্যাহত থাকবে।
হাদিসের বর্ণনা এবং আধুনিক প্রপাগান্ডা
ইসলাম ধর্ম অন্য অনেক ধর্মের মতই নারীকেই সমস্ত সমস্যার মূল মনে করে এবং নারীকে দমন করার উদ্দেশ্যেই খুব পরিকল্পিত উপায়ে এই কাজটি করে। এই ধারণা কোনো আধ্যাত্মিক সত্য নয়, বরং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের একটি মেকানিজম, যা হাদিসের মাধ্যমে প্রচারিত হয়। আসুন প্রাসঙ্গিক হাদিসটি পড়ি,
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৬০/ আম্বিয়া কিরাম (‘আঃ)
পরিচ্ছদঃ ৬০/১ক. আল্লাহ তা‘আলার বাণী।
৩৩৩০. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে একইভাবে বর্ণিত আছে। অর্থাৎ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বনী ইসরাঈল যদি না হত তবে গোশত দুর্গন্ধময় হতো না। আর যদি হাওয়া (আঃ) না হতেন তাহলে কোন নারীই স্বামীর খিয়ানত করত না।
* (৫১৮৪, ৫১৮৬) (মুসলিম ১৭/১৯ হাঃ ১৪৭০, আহমাদ ৮০৩৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩০৮৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩০৯২)
* বনী ইসরাঈল আল্লাহ তা’আলার নিকট থেকে সালওয়া নামক পাখীর গোশত খাওয়ার জন্য অবারিতভাবে পেত। তা সত্ত্বেও তা জমা করে রাখার ফলে গোশত পচনের সূচনা হয়। আর মাতা হাওয়া নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণে আদম (‘আঃ)-কে প্রভাবিত করেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে নারীকে বিশ্বাসঘাতকতার জেনেটিক উৎস হিসেবে চিত্রিত করে, যা কোনো বৈজ্ঞানিক বা যৌক্তিক প্রমাণ ছাড়াই। ইসলামী এপোলোজিস্টরা এটিকে ব্যাখ্যা করে বলেন যে, এটি রূপক বা অ্যালেগরিকাল, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি নারীকে অপরাধী করে পুরুষের দায় এড়ানোর একটি উপায়। এই ধরনের বর্ণনা আজও বাংলাদেশের মতো দেশে নারীবিরোধী সংস্কৃতিকে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করে। সামগ্রিকভাবে, এই হাদিসগুলোর প্রভাব নারীকে দমন করার জন্যই ব্যবহৃত হয়। আসুন বাংলাদেশের প্রখ্যাত মুফতি ইব্রাহিমের বক্তব্য শুনে নিই, যেখানে তিনি হাদিসের ব্যাখ্যায় নারীকে মাংস পচনের সাথে তুলনা করে নারীর অপরাধী হওয়ার পৌরাণিক তত্ত্ব প্রচার করেন:
আসুন আরও একটি ওয়াজ শুনি,
নারীকে অপরাধী সাব্যস্তকরণ: ডিহিউম্যানাইজেশন
পৃথিবীর ইতিহাসে প্রতিটি নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর ওপর চরম নির্যাতন বা অধিকার হরণের আগে শাসক বা শক্তিশালী অংশটি যে কাজটি প্রথম করে থাকে, সেটি হচ্ছে সেই গোষ্ঠীকে জনসমক্ষে অপরাধী বা সকল সমস্যার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা। এটিই নিপীড়নের জন্য পথ প্রস্তুত করার সবচেয়ে কার্যকর এবং চিরায়ত কৌশল। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনী ইহুদিদেরকে জার্মান সমাজের সকল দুঃখ-দুর্দশার জন্য দায়ী করে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসী, বিশেষ করে মুসলিম ও মেক্সিকানদের, আমেরিকার সব সমস্যার জন্য দোষারোপ করেছিলেন। এই কৌশল তাই শুধুমাত্র অতীতের বিষয় নয়; বর্তমান সময়েও এটি চলে আসছে—নিপীড়িতকে অপরাধী বানিয়ে তার বিরুদ্ধে সহিংসতা বৈধ করার একটি কৌশল।
একই কৌশল লক্ষ করা যায় ধর্মীয় বর্ণনায়। বিশেষ করে আব্রাহামিক ধর্মগুলো—ইহুদী, খ্রিস্টান ও ইসলাম—নারীর প্রতি ব্যবহৃত হয়েছে এই একই অপবাদ নির্মাণের অস্ত্র। এদের ধর্মগ্রন্থগুলোতে নারীকেই মানবজাতির সকল দুর্দশা ও অধঃপতনের মূল হোতা হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। আদম-হাওয়ার কাহিনী তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। সেখানে আদমের নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার পেছনে হাওয়াকে দায়ী করা হয়—যে কিনা শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে আদমকে প্ররোচিত করেছিল। অথচ গল্পের কাহিনীকাঠামোতে পুরুষ এবং নারী দু’জনই সমভাবে উপস্থিত থাকার পরও অপরাধের দায় নারীর ওপর সুনির্দিষ্টভাবে চাপানো হয়। এই কাহিনী বাইবেলের জেনেসিস অধ্যায় ৩-এ বর্ণিত, যেখানে ইভ (হাওয়া) সাপের (শয়তান) কথায় প্রলুব্ধ হয়ে ফল খায় এবং আদমকে দেয়। কুরআনে সুরা আল-আরাফ ৭:১৯-২৩-এ অনুরূপ বর্ণনা, যদিও কুরআনে দু’জনকেই সমানভাবে দায়ী করা হয়েছে, কিন্তু এই আয়াতের ব্যাখ্যাতে প্রখ্যাত সাহাবী ইবনে আবাস বলেছেন, এই কাজের জন্য হাওয়াই দায়ী [1] । পরবর্তী হাদিসগুলোতেও নারীকে বিশেষভাবে অপরাধী করা হয়। এই মিথগুলো কোনো প্রমাণিত ঘটনা নয়, বরং প্রাচীন সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতিফলন, যা নারীকে দোষী করে পুরুষের নিয়ন্ত্রণকে ন্যায়সঙ্গত করে।

আদম-হাওয়ার গপ্পোঃ পুরুষতান্ত্রিক প্রপাগান্ডার ভিত্তি
আব্রাহামিক ধর্মের নৈতিক কাঠামোর গভীরে এই কেচ্ছাটি খুব কৌশলেই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর সেই কারণেই নারী হয়ে ওঠে ‘প্রথম পাপের কারণ’, ‘প্রথম অপরাধী’। এর ফলে নারীর শরীর, তার আকাঙ্ক্ষা, তার স্বাধীনতা—সবই প্রশ্নবিদ্ধ ও অপরাধের প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এর মাধ্যমে ডিহিউম্যানাইজেশনের (মানবিকতা হরণ) এক সুদূরপ্রসারী প্রক্রিয়া শুরু হয়, যার ভিত্তিতে নারীকে পুরুষের অধীনস্থ রাখা, নিয়ন্ত্রণ করা, তার ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনকে ধর্মীয় বৈধতা প্রদান করা হয়। এই প্রক্রিয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি ইচ্ছাকৃত, যা সমাজকে নারীর বিরুদ্ধে একত্রিত করে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রপাগান্ডা নয়। এটি পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত। পুরুষতান্ত্রিক ধর্মব্যবস্থায় যখন নারীকে ‘সমস্যার মূল কারণ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তখন নারী নিপীড়নের বিপরীতে জনমতের প্রতিরোধ শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ তখন সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, ‘নারীর কারণে আমাদের সকল সমস্যা’, ‘নারীই শয়তানের মাধ্যম’। ঠিক যেভাবে নাৎসি জার্মানিতে ইহুদিদের বিরুদ্ধে প্রচার করা হয়েছিল: ‘তাদের কারণেই আমাদের সমস্যাগুলো হচ্ছে।’ এই ধারণা আজও জীবিত, যেমন ইসলামী সমাজে নারীকে ‘সর্বোচ্চ ফিতনা’ (প্রলোভন) বলে চিত্রিত করা হয়, যা কুরআন বা হাদিসের ব্যাখ্যায় বারবার আসে, নবীর মুখের বানী হিসেবে প্রচারিত হয় প্রকৃতপক্ষে পুরুষের আধিপত্য আরও বেশি বিস্তারের উদ্দেশ্যে।
নবী মুহাম্মদ এই চিরাচরিত পুরুষতান্ত্রিক কৌশলগুলো খুব ভালভাবেই তার ধর্মে ব্যবহার করেছেন, আত্মীকরণ করেছেন। ইসলামিক হাদিস ও ইতিহাসের বিবরণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি বারবার নারীকে পৃথিবীর দুঃখ-কষ্টের মূল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। বিভিন্ন হাদিসে নারীকে ‘অবাধ্য প্রাণী’, ‘দোজখের অধিকাংশ অধিবাসী’ এবং পুরুষের ‘নিয়ন্ত্রণাধীন রাখার বস্তু’ বলা হয়েছে। হাওয়ার অপরাধের কথা বলে বর্তমান নারীকে অপরাধী সাব্যস্ত করার এই ধারণা নারীর প্রতি সর্বোচ্চ অন্যায়ের একটি ভিত্তি। মূলত, আব্রাহামিক ধর্মের এই পৌরাণিক গল্প তর্কের খাতিরে মেনে নিলেও অতীতের একজন নারীর কথিত অপরাধের দায় বর্তমান নারীজাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নারী নিপীড়নকে স্বাভাবিক ও বৈধ করার একটি কৌশল অবশ্যই অন্যায্য। এই হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায়, যেমন সহীহ বুখারীতে বর্ণিত, এগুলো কোনো ঐশ্বরিক বানী নয় বরং মধ্যযুগীয় সমাজের সামাজিক নিয়ন্ত্রণের টুল এবং সেই সময়ের সংস্কৃতি ও ধ্যান ধারণার প্রতিফলন।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, প্রাচীন ধর্মীয় কাহিনীগুলোকে প্রশ্নহীনভাবে বিশ্বাস করতে বাধ্য করার ফলে আজকের আধুনিক যুগেও এই প্রপাগান্ডার প্রভাব থেকে সমাজ মুক্ত হতে পারেনি। নারীর স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বারবার ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে দমন করার চেষ্টা হয়, আর তার পেছনে লুকিয়ে থাকে আদিম সেই গল্প—‘হাওয়া নারী বলেই আমাদের দুর্দশা শুরু’। সুতরাং, মানবজাতির ইতিহাসে নারী নিপীড়নের শুরু ও ধারাবাহিকতার পেছনে রয়েছে এক সুপরিকল্পিত দোষারোপের গল্প—যা শুধু গল্প নয়, বরং বৈধতা দানের একটি কৌশল। এটিই বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও নৃশংসতম প্রপাগান্ডা, যা লক্ষ লক্ষ নারীর জীবনকে ধ্বংস করেছে।
উপসংহার
আব্রাহামিক মিথ যে নারীই সমস্ত দুর্দশার কারণ, এটি একটি প্রাচীন প্রপাগান্ডা যা যুক্তি, বিজ্ঞান বা প্রমাণের ভিত্তিতে টিকতে পারে না। এটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটি টুল, যা নারীকে ডিহিউম্যানাইজ করে নিপীড়নকে বৈধ করে। ফ্যাক্ট চেক করে দেখা যায় যে, এই কাহিনীগুলো মিথমাত্র—কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই যে হাওয়া বা ইভের অস্তিত্ব ছিল, বরং এগুলো প্রাচীন লোককথা থেকে উদ্ভূত। আধুনিক সমাজে এই ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে, যুক্তি-ভিত্তিক চিন্তা দিয়ে—কোনো ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসকে সম্মান না করে। শুধুমাত্র তাহলেই নারী-পুরুষ সমতা অর্জন সম্ভব হবে, এবং এই বিষাক্ত মিথগুলোকে ইতিহাসের আবর্জনায় ফেলে দেওয়া যাবে। যদি কোনো দাবির প্রমাণ না পাওয়া যায়, তাহলে তা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করতে হবে, না যে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে হবে।
তথ্যসূত্রঃ
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৪র্থ খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ১৫৬, ১৫৭ ↩︎
