ইসলামে উটের প্রস্রাব হালাল ও পবিত্র

ভূমিকাঃ ধর্মীয় বিধানের নামে অস্বাস্থ্যকর চর্চা

মানব সভ্যতার ইতিহাসে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিবর্তন ঘটেছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে। কিন্তু মধ্যযুগীয় ধর্মীয় কাঠামোতে অনেক সময়ই মানুষের বর্জ্য বা প্রাণীর রেচন পদার্থকে ‘অলৌকিক ঔষধ’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। ইসলামি ধর্মতত্ত্বে উটের মূত্র পানের বিষয়টি তেমনই একটি বিতর্কিত ও অবৈজ্ঞানিক বিধান, যা আজ একুশ শতকের আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগেও একদল মানুষের কাছে ‘সুন্নাহ’ বা পবিত্র চিকিৎসা হিসেবে সমাদৃত। এই ধারণাটি কেবল হাস্যকরই নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে, নবী মুহাম্মদ উকল ও উরায়না গোত্রের অসুস্থ লোকদের, যারা মুহাম্মদের কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, সেই মুসলিমদের সুস্থতার জন্য উটের দুধের সাথে উটের মূত্র মিশিয়ে পান করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই একটি ঐতিহাসিক বর্ণনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীকালে ফকিহ এবং আলেমগণ এক অদ্ভুত তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন যে—যেসব পশুর মাংস খাওয়া হালাল, তাদের মল-মূত্রও পবিত্র এবং ঔষধ হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যেখানে মূত্র হলো শরীরের অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকারক টক্সিন বা বর্জ্য নিষ্কাশনের মাধ্যম, সেখানে ধর্মীয় আবেগের দোহাই দিয়ে একে ‘শিফা’ বা আরোগ্য হিসেবে প্রচার করা মূলত মানব বুদ্ধিবৃত্তির চরম পরাজয়। এই প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করব কীভাবে এই ধরনের অবৈজ্ঞানিক বিধানগুলো আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক এবং কেন এগুলোকে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা উচিত।


উটের দুধ ও মূত্রঃ নববী চিকিৎসা পদ্ধতি

আসুন এই সম্পর্কিত হাদিসগুলো পড়ে নেয়া যাক [1] [2] [3]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৬ঃ কিসাস (প্রতিশোধ)
পরিচ্ছেদঃ ৪. প্রথম অনুচ্ছেদ – মুরতাদ এবং গোলযোগ সৃষ্টিকারীকে হত্যা করা প্রসঙ্গে
৩৫৩৯-(৭) আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ‘উকল সম্প্রদায়ের কিছু লোক উপস্থিত হলো। অতঃপর তারা ইসলাম গ্রহণ করল। কিন্তু মাদীনার আবহাওয়া তাদের জন্য অনুপযোগী হলো। অতএব তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে সাদাকার উটনীর নিকট গিয়ে তার দুধ ও প্রস্রাব পানের নির্দেশ দিলেন। ফলে তারা নির্দেশ পালনার্থে সুস্থ হয়ে উঠল। কিন্তু তারা সুস্থ হয়ে মুরতাদ হয়ে গেল এবং তারা রাখালদেরকে হত্যা করে উটগুলো হাঁকিয়ে নিল। তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এ সংবাদ শুনে) তাদের পেছনে লোক পাঠালেন। অতঃপর তাদেরকে ধরে আনা হলে তাদের দু’ হাত ও দু’ পা কেটে ফেললেন এবং তাদের চোখ ফুঁড়ে দিলেন, তারপর তাদের রক্তক্ষরণস্থলে দাগালেন না, যাতে তারা মৃত্যুবরণ করে।
অপর বর্ণনাতে রয়েছে, লোকেরা তাদের চোখে লৌহ শলাকা দিয়ে মুছে দিল। অন্য বর্ণনাতে আছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) লৌহ শলাকা আনার হুকুম করলেন, যাকে গরম করা হলো এবং তাদের চোখের উপর মুছে দেয়া হলো। অতঃপর তাদেরকে উত্তপ্ত মাটিতে ফেলে রাখলেন। তারা পানি চাইল কিন্তু তাদেরকে পানি পান করানো হয়নি। পরিশেষে তারা এ করুণ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল। (বুখারী ও মুসলিম)(1)
(1) সহীহ : বুখারী ৩০১৮, ৬৮০২, মুসলিম ১৬৭১, আবূ দাঊদ ৪৩৬৪, নাসায়ী ৪০২৫, ইবনু মাজাহ ২৫৭৮, আহমাদ ১২৬৩৯।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২৯/ ‘কাসামা’-(খুনের ব্যাপারে বিশেষ ধরনের হলফ করা), ‘মুহারিবীন’ (শত্রু সৈন্য), ‘কিসাস’ (খুনের বদলা) এবং ‘দিয়াত’ (খুনের শাস্তি স্বরূপ অর্থদন্ড)
পরিচ্ছেদঃ ২. শত্রু সৈন্য এবং মুরতাদের বিচার
৪২০৭। আবূ জাফর মুহাম্মাদ ইবনু সাব্বাহ ও আবূ বাকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, “উকল” গোত্রের আট জনের একটি দল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আগমন করল। অতঃপর তারা ইসলামের ওপর বাইআত গ্রহণ করল। কিন্তু সেখানকার আবহাওয়া তাদের অনুকুলে না হওয়ায় তাদের শরীর অসুস্থ হায় গেল। তখন তারা এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আভিযোগ করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কি আমাদের রাখালের সাথে-গমন করে উটের মূত্র ব্যবহার এবং দুধ পান করতে পারবে? তখন তারা বলল, জী হ্যাঁ। এরপর বের হয়ে গেল এবং তার মূত্র ব্যবহার ও দুধ পান করল। এতে তারা সুস্থ হয়ে গেল।
অতঃপর তারা রাখালকে হত্যা করল এবং উটগুলো তাড়িয়ে নিয়ে গেল। এই সংবাদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পৌঁছল। তিনি তাদের পিছনে লোক পাঠালেন। তাঁরা ধরা পড়ল এবং তাদেরকে নিয়ে আসা হল। তাদের প্রতি আদেশ জারি করা হল এবং তাদের হাত-পা কর্তন করা হল এবং তপ্ত লৌহ শলাকা চোখে প্রবেশ করানো হলো। এরপর তাদেরকে রৌদ্রে নিক্ষেপ করা হলো। অবশেষে তারা মারা গেল।
ইবন সাব্বাহ (রহঃ) … এর বর্ণনা وَطَرَدُوا الإِبِل এর স্থলে وَاطَّرَدُوا النَّعَمَ উল্লেখ রয়েছে এবং তার বর্ণনায় وَسُمِّرَتْ أَعْيُنُهُمْ রয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ২৯। কাসামাহ্ (খুন অস্বীকার করলে হলফ নেয়া), মুহারিবীন (লড়াই), কিসাস (খুনের বদলা) এবং দিয়াত (খুনের শাস্তি স্বরূপ জরিমানা)
৪২৪৬-(১০/…) আবূ জাফার মুহাম্মাদ ইবনু সাব্বাহ ও আবূ বাকর ইবনু আবূ শাইবাহ (রহঃ) ….. আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, “উকল” গোত্রের আটজনের একটি দল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলো। তারা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ইসলামের উপর বাই’আত করল। অতঃপর মাদীনার আবহাওয়া তাদের প্রতিকূল হওয়ায় তারা অসুস্থ হয়ে পড়লে এ ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট অভিযোগ করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কি আমাদের রাখালের সাথে গমন করে উটের মূত্র এবং দুগ্ধ পান করতে পারবে? তখন তারা বলল, জী- হ্যাঁ। এরপর তারা বের হয়ে গেলে এবং এর (উটের) মূত্র ও দুগ্ধ পান করল। এতে তারা সুস্থ হয়ে গেল্‌ অতঃপর তারা রাখালকে হত্যা করে উটগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে গেলে। এ সংবাদ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পৌছল। তিনি তাদের পিছনে লোক পাঠালেন। তারা তাদেরকে পাকড়াও করে নিয়ে এল। তাদের প্রতি নির্দেশ জারি করা হল। তখন তাদের হাত-পা কৰ্তন করা হল এবং তপ্ত লৌহ শলাকা চোখে প্রবেশ করানো হলা। এরপর তাদেরকে রৌদ্রে নিক্ষেপ করা হলো। অবশেষে তারা মারা গেল।
ইবনু সাব্বাহ (রহঃ) … বর্ণনা وَطَرَدُوا الإِبِلَ এর স্থলে وَاطَّرَدُوا النَّعَمَ উল্লেখ রয়েছে। রাবী বলেন, অতঃপর তাদের চোখগুলো উপড়ে ফেলা হল। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪২০৭, ইসলামিক সেন্টার ৪২০৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)


যাদুল মা’আদঃ যে পশুর গোশত হালাল সে পশুর পেশাব পবিত্র

এবারে আসুন আল্লামা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রচিত মুখতাসার যাদুল মা’আদ গ্রন্থ থেকে এই বিষয়ক ইসলামিক বিধানটি জেনে নেয়া যাক [4]

উরায়নার ঘটনা
আনাস বিন মালিক বলেন- একদা উরায়না কিংবা উল গোত্রের কিছু লোক নাবী এর কাছে আগমণ করল। মদীনার আবহাওয়া তাদের স্বাস্থের অনুকুল না হওয়ার কারণে তারা অসুস্থ হয়ে গেল। নাবী তাদেরকে দুগ্ধবতী উটের কাছে যেতে আদেশ করলেন এবং বললেন- তোমরা উটের দুধ এবং পেশাব পান কর। তারা তথায় চলে গেল। কিছু দিন পর সুস্থ হয়ে তারা নাবী এর রাখালকে হত্যা করল এবং পশুগুলো নিয়ে পালিয়ে যেতে লাগল। দিবসের প্রথম ভাগে যখন নাবী এর নিকট এ সংবাদ আসল, তিনি তাদেরকে পাকড়াও করার জন্য একদল সাহাবীকে প্রেরণ করলেন। দ্বিপ্রহরের সময় তাদেরকে পাকড়াও করে রসূল এর দরবারে নিয়ে আসা হল। নাবী এর আদেশে তাদের হাত-পা কেটে দেয়া হল এবং লোহার কাঠি গরম করে তাদের চক্ষুগুলো ছুঁড়ে দেয়া হল । তারপর তাদেরকে উত্তপ্ত বালুর উপর ফেলে রাখা হল। তারা পানির পিপাসায় কাতর হয়ে পানি চাইলেও তাদেরকে পানি দেয়া হল না।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন- এই ঘটনা থেকে জানা গেল, (১) উটের পেশাব পান করা জায়েয।
(২) যে সমস্ত পশুর গোশত খাওয়া হালাল সে সমস্ত পশুর পেশাব পবিত্র।
(৩) আরও জানা গেল, যারা সন্ত্রাসী তাদেরকে হাত-পা কর্তন করসূহ হত্যা করা জায়েয।
(৪) সন্ত্রাসী কোন মানুষকে যেভাবে হত্যা করবে, তাকে সেভাবেই হত্যা করতে হবে। তারা নাবী এর রাখালের চোখে গরম কাঠি ঢুকিয়ে দিয়েছিল। তাই কিসাস স্বরূপ তাদেরকে সেভাবেই শাস্তি দেয়া হয়েছে। এই ঘটনা থেকে একটি স্বতন্ত্র বিধান সাব্যস্ত হয়েছে। আর এই ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল হুদুদ তথা দন্ডবিধির হুকুম-আহকাম নাযিল হওয়ার পূর্বে। তবে হুদুদের আহকাম নাযিল হওয়ার পর এই বিধান রহিত হয়ে যায়নি; বরং তাকে বহাল রেখেছে।

প্রস্রাব

আধুনিক যুগের ফতোয়াঃ ইসলামওয়েব

এবারে আসুন আরেকটি বিখ্যাত ইসলামিক ফতোয়া ওয়েবসাইট থেকে একটি ফতোয়া দেখে নেয়া যাক [5]

The urine of camels as medicine
Fatwa No: 93051
The Prophetic narration which you mentioned in the question is authentic and is reported by Al-Bukhari, Muslim and others may Allaah have mercy upon them.
The narration is proves the permissibility of drinking the urine of camels and that it is a beneficial medicine. Moreover, some doctors stated this fact as well, like Ibn Seenaa may Allaah have mercy upon him in his book entitled ”Al-Qaanoon (The Law (of medicine))”.
The urine of camels and that of cows is pure; and this is the view of the majority of the scholars may Allaah have mercy upon them.
Similarly, the urine and dung of animals which we are allowed to eat their meat, is pure as stated by the scholars
may Allaah have mercy upon them.

আসুন ফতোয়াটির বাংলা অনুবাদ পড়ি,

উটের প্রস্রাব চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহারের বিষয়ে ফতোয়া
ফতোয়া নং: ৯৩০৫১
প্রশ্নে উল্লিখিত নবীজির হাদীসটি সহীহ (বিশুদ্ধ), এবং এটি ইমাম আল-বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য বিশিষ্ট মুহাদ্দিসগণ (আল্লাহ তাঁদের প্রতি দয়া করুন) বর্ণনা করেছেন।
এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে উটের প্রস্রাব পান করা বৈধ, এবং এটি চিকিৎসার জন্য একটি উপকারী ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। আরও বলা হয়েছে, কিছু প্রখ্যাত চিকিৎসকও এই বিষয়ের সত্যতা স্বীকার করেছেন; যেমন—ইবনু সিনা (আল্লাহ তাঁর প্রতি দয়া করুন) তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-কানুন ফিৎ তিব্ব (চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিধান)-এ এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন।
ইসলামী শরীয়াহ অনুসারে উট ও গরুর প্রস্রাব পবিত্র (তাহির), এবং এ বিষয়ে অধিকাংশ আলেমের (আল্লাহ তাঁদের প্রতি দয়া করুন) মত একমত।
এছাড়াও, যেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া হালাল, সেসব প্রাণীর মল-মূত্রও পবিত্র—এমনই অভিমত দিয়েছেন বহু ইসলামি আলেম (আল্লাহ তাঁদের প্রতি দয়া করুন)।


আলেমদের বক্তব্যঃ উটের প্রস্রাব হালাল ও পবিত্র

এবারে আসুন উটের মূত্রপান সম্পর্কে ড আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার দুইটি বক্তব্য শুনে নিই,

এবারে আসুন জাকির নায়েকের মুখ থেকে শুনি,


উটের মূত্রের ‘পবিত্রকরণ’ – একটি ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

ইসলামি শরিয়াহর বিধানে উটের মূত্র পানের বিষয়টি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি সরাসরি নবী মুহাম্মদের নির্দেশিত একটি ‘চিকিৎসা’ হিসেবে স্বীকৃত। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের একাধিক বর্ণনা অনুসারে, ‘উকল’ ও ‘উরায়না’ গোত্রের একদল লোক মদিনায় আসার পর সেখানকার আবহাওয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে নবী তাদের সদকার উটের পালের কাছে গিয়ে উটের দুধ ও মূত্র পান করার নির্দেশ দেন। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই পানীয় সেবনের ফলে তারা সুস্থ হয়ে উঠেছিল। এই একটি ঐতিহাসিক বর্ণনাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীকালে ইসলামি ফকিহ ও আলেমগণ এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম তার ‘জাদুল মাআদ’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এই ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে উটের পেশাব পান করা কেবল জায়েজই নয়, বরং যে সমস্ত পশুর গোশত খাওয়া হালাল, তাদের পেশাব ও গোবরও ইসলামি দৃষ্টিতে ‘পবিত্র’। এই তথাকথিত ‘পবিত্রতা’র ধারণা আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। মূত্র হলো প্রাণিদেহের বিপাকীয় বর্জ্য, যার মাধ্যমে শরীর থেকে অপ্রয়োজনীয় ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন এবং বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেওয়া হয়। অথচ ইসলামি ফতোয়া ওয়েবসাইট ‘IslamWeb’ আজও প্রচার করে যে, উট বা গরুর প্রস্রাব পবিত্র এবং এটি একটি উপকারী ঔষধ।

বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় ইসলামি প্রচারক ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া বা জাকির নায়েকের মতো ব্যক্তিরাও এই প্রাচীন ও অবৈজ্ঞানিক প্রথাকে আধুনিক যুগেও ডিফেন্ড করার চেষ্টা করেন। তারা দাবি করেন যে, যেহেতু এটি সহীহ হাদিসে আছে, তাই এতে অবশ্যই কোনো ‘শিফা’ বা আরোগ্য রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, যে রেচন পদার্থ শরীর নিজে থেকেই ক্ষতিকর মনে করে বের করে দেয়, তাকে ‘পবিত্র’ বা ‘হালাল পানীয়’ হিসেবে গণ্য করা কি অন্ধবিশ্বাসের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ নয়? ধর্মের দোহাই দিয়ে বর্জ্য পদার্থকে পবিত্র করার এই তাত্ত্বিক প্রচেষ্টা মূলত অনুসারীদের যুক্তিবোধকে স্থবির করে দেওয়ার একটি কৌশল মাত্র।


উটের মূত্রঃ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বর্জ্য পদার্থ সেবনের ভয়াবহতা

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক নীতি হলো—শরীর থেকে নির্গত যে কোনো বর্জ্য পদার্থ মূলত বিষাক্ত বা অপ্রয়োজনীয় উপাদান। মূত্র হলো বৃক্ক বা কিডনি দ্বারা ফিল্টার করা এমন এক তরল, যার মাধ্যমে দেহ থেকে ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড, ক্রিয়েটিনিন এবং অতিরিক্ত সোডিয়াম বের করে দেওয়া হয়। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এই বর্জ্য পুনরায় গ্রহণ করা কেবল অর্থহীন নয়, বরং শরীরের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে উটের মূত্রে উচ্চমাত্রার পটাশিয়াম এবং নাইট্রোজেনাস যৌগ থাকে, যা মানুষের পরিপাকতন্ত্র এবং কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে [6]

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো জুনোটিক (Zoonotic) রোগের সংক্রমণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বারবার সতর্ক করেছে যে, উটের সংস্পর্শ এবং বিশেষ করে উটের কাঁচা দুধ বা প্রস্রাব পান করার মাধ্যমে মার্স-কোভি (MERS-CoV) বা ‘মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম’ নামক প্রাণঘাতী ভাইরাস ছড়াতে পারে [7]। যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান উটের মূত্র থেকে দূরে থাকার এবং এটি সেবন না করার কঠোর পরামর্শ দিচ্ছে, সেখানে ইসলামি স্কলাররা এবং ‘IslamQA’-এর মতো ওয়েবসাইটগুলো বছরের পর বছর ধরে একে ‘শিফা’ বা আরোগ্য হিসেবে প্রচার করে এসেছে। যদিও প্রবল বৈজ্ঞানিক সমালোচনার মুখে ‘IslamQA’ তাদের বিতর্কিত প্রবন্ধটি সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে, তবুও আর্কাইভড রেকর্ডগুলো প্রমাণ করে যে, তারা বিজ্ঞানের চেয়ে অন্ধবিশ্বাসকেই প্রাধান্য দিয়েছিল [8]

যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সপ্তম শতকে আরবের মরুভূমিতে কোনো উন্নত চিকিৎসা বা ঔষধের অভাব ছিল। সেই সময়কার একটি লোকজ প্রতিকারকে যখন ‘ঐশ্বরিক বিধান’ হিসেবে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়া হয়, তখন তা একুশ শতকের উন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগে একটি হাস্যকর ও বিপজ্জনক অপবিশ্বাসে পরিণত হয়। জাকির নায়েক বা ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার মতো ব্যক্তিবর্গ যখন আধুনিক গবেষণাগারের পরিবর্তে হাজার বছরের পুরনো হাদিসের ওপর ভিত্তি করে মূত্র পানের সাফাই গান, তখন তারা মূলত সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেন। কোনো পবিত্রতা বা ধর্মীয় আবেগের দোহাই দিয়ে মূত্রের মতো একটি টক্সিক বর্জ্যকে ঔষধ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া কেবল অবৈজ্ঞানিকই নয়, বরং এটি একটি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড।


উপসংহারঃ অন্ধবিশ্বাস বনাম আধুনিক বিচারবুদ্ধির লড়াই

সার্বিক আলোচনার প্রেক্ষিতে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, ইসলামি ধর্মতত্ত্বে উটের মূত্রকে ‘পবিত্র ঔষধ’ হিসেবে গণ্য করার ধারণাটি সম্পূর্ণভাবে একটি মধ্যযুগীয় কুসংস্কার। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই যুগে, যেখানে মানবদেহের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের ধারণা অত্যন্ত স্বচ্ছ, সেখানে শরীর থেকে নির্গত বিষাক্ত বর্জ্য বা টক্সিনকে ‘শিফা’ বা আরোগ্য হিসেবে প্রচার করা কেবল হাস্যকরই নয়, বরং চরম বিপজ্জনক। উটের মূত্র পানের এই বিধানটি প্রমাণ করে যে, অনেক ধর্মীয় ‘ঐশ্বরিক জ্ঞান’ আসলে সমকালীন আরবের লোকজ বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, যার কোনো চিরন্তন বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

ধর্মীয় স্কলাররা, যেমন জাকির নায়েক বা ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া, যখন তথাকথিত ‘উটের মূত্র’ পানের সপক্ষে আধুনিক গবেষণাগারের পরিবর্তে হাজার বছরের পুরনো হাদিসের সাফাই গান, তখন তারা মূলত অনুসারীদের যুক্তিবোধকে অন্ধত্বের চাদরে ঢেকে দেন। উটের মূত্র পানের ফলে আধুনিক বিশ্বে ‘মার্স-কোভি’ (MERS-CoV)-এর মতো প্রাণঘাতী ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসের ভয়াবহ পরিণতির এক জ্বলন্ত উদাহরণ। একুশ শতকে এসেও যদি কেউ বর্জ্য পদার্থকে ‘হালাল পানীয়’ হিসেবে গ্রহণ করে, তবে বুঝতে হবে সে যুগের তুলনায় পিছিয়ে নেই, বরং সে স্বেচ্ছায় আধুনিক সভ্যতার আলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, অন্ধবিশ্বাস এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি মানুষের বিচারবুদ্ধিকে এতটাই আচ্ছন্ন করতে পারে যে, সে বর্জ্য এবং বিষের মধ্যেও পবিত্রতা খুঁজে পায়। সুস্থ ও আধুনিক সমাজ বিনির্মাণে এ ধরনের অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক ধর্মীয় বিধানগুলোকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা প্রয়োজন। বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় আদিম কুসংস্কারের কোনো স্থান নেই। জীবন বাঁচাতে হলে আমাদের হাদিসের প্রাচীন চিকিৎসা নয়, বরং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রামাণ্য তথ্যের ওপরই নির্ভর করতে হবে। মানুষের স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের কাছে এমন হাস্যকর ও নোংরা বিধানগুলো শেষ পর্যন্ত পরাজিত হতে বাধ্য।


তথ্যসূত্রঃ
  1. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৩৫৩৯ ↩︎
  2. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪২০৭ ↩︎
  3. সহীহ মুসলিম, হাঃ একাডেমী, হাদিসঃ ৪২৪৬ ↩︎
  4. মুখতাসার যাদুল মা’আদ, আল্লামা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম, ওয়াহীদিয়া ইসলামিয়া লাইব্রেরী, পৃষ্ঠা ৩০৩, ৩০৪ ↩︎
  5. The urine of camels as medicine ↩︎
  6. Are There Health Benefits to Drinking Urine?, WebMD ↩︎
  7. WHO Fact Sheet: Middle East respiratory syndrome coronavirus ↩︎
  8. The benefits of drinking camel urine, Archive.org / IslamQA ↩︎