ইসলামে পঙ্গপাল খাওয়া হালাল

ভূমিকা

ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী পঙ্গপাল একটি বিশেষ প্রাণী যাকে জবাই করার প্রয়োজন নেই এবং এটি মৃত অবস্থায় পাওয়া গেলেও হালাল। ইবনে মাজাহ (৩৩১৪) এবং মুসনাদে আহমাদে (৪৪৬৪) বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে যে, মাছ ও পঙ্গপাল—এই দুটি মৃত প্রাণী মানুষের জন্য বৈধ। কিন্তু আধুনিক অণুজীববিজ্ঞান, বিষক্রিয়াবিদ্যা এবং বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের আলোকে এই বিধানটি পর্যালোচনা করলে এর ভেতরে থাকা গভীর অসংগতি ও বৈজ্ঞানিক ত্রুটিগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


হাদিসের বিবরণ

ইসলামে পঙ্গপাল বা টিড্ডি বা এক ধরণের পতঙ্গ খাওয়া সম্পূর্ণ হালাল।

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
২২/ খাদ্যদ্রব্য
পরিচ্ছেদঃ ৩৫. পঙ্গপাল খাওয়া সম্পর্কে
৩৮১২। আবূ ইয়া’ফূর (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু আবূ আওফা (রাঃ)-এর নিকট শুনেছি, আমি তাকে টিড্ডি খাওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছয়-সাতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। আমরা তাঁর সঙ্গে একত্রে টিড্ডি খেয়েছি।[1]
সহীহ।
[1]. বুখারী, মুসলিম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবু ইয়া’ফুর (রহঃ)

সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
২৩/ আহার ও খাদ্যদ্রব্য
পরিচ্ছেদঃ ২২. ফড়িং (এক প্রকার পতঙ্গ) খাওয়া প্রসঙ্গে
১৮২১। আবদুল্লাহ ইবনু আবী আওফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, ফড়িং (খাওয়া) প্রসঙ্গে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমি ছয়টি যুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অংশগ্রহণ করেছি। আমরা ফড়িং খেয়েছি।
সহীহ, নাসা-ঈ
আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি আবূ ইয়াফুর (রহঃ)-এর সূত্রে সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা (রহঃ) একইরকম বর্ণনা করেছেন এবং ছয়টি যুদ্ধের কথা সেখানে উল্লেখ করেছেন। এই হাদীসটি আবূ ইয়াফুর (রহঃ)-এর সূত্রে সুফিয়ান সাওরী প্রমুখ বর্ণনা করেছেন এবং সেখানে সাতটি যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ)

রিয়াযুস স্বা-লিহীন (রিয়াদুস সালেহীন)
১৮/ বিবিধ চিত্তকর্ষী হাদিসসমূহ
পরিচ্ছেদঃ ৩৭০ : দাজ্জাল ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী সম্পর্কে
তাওহীদ পাবলিকেশন নাম্বারঃ ১৮৪২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৮৩৩
২৬/১৮৪২। আব্দুল্লাহ ইবনে আবু আওফা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ’আমরা আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে থেকে সাতটি যুদ্ধ করেছি, তাতে আমরা পঙ্গপাল খেয়েছি।’
অন্য বর্ণনায় আছে, ’আমরা তাঁর সাথে পঙ্গপাল খেয়েছি।’
(বুখারী-মুসলিম)[1]
* [অর্থাৎ পঙ্গপাল খাওয়া হালাল এবং তা মাছের মত মৃতও হালাল।]
[1] সহীহুল বুখারী ৫৪৯৫, মুসলিম ১৯৫২, তিরমিযী ১৮২১, ১৮২২, নাসায়ী ৪৩৫৬, ৪৩৫৭, আবূ দাউদ ৩৮১২, আহমাদ ১৮৬৩৩, ১৮৬৬৯, ১৮৯০৮, দারেমী ২০১০
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ)


পচনপ্রক্রিয়া ও অণুজীববিজ্ঞান (Microbiology)

ইসলামি আইন অনুসারে কোনো গবাদি পশু (যেমন গরু বা ছাগল) জবাই ছাড়া মারা গেলে তার রক্ত শরীরের ভেতর থেকে যায় বলে তা অপবিত্র ও ক্ষতিকর। কিন্তু বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পচনপ্রক্রিয়া কেবল বড় প্রাণীর জন্য সীমাবদ্ধ নয়।

ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ: একটি পঙ্গপাল মারা যাওয়ার সাথে সাথেই তার শরীরের জৈবিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ক্ষুদ্র শরীর হওয়ার কারণে এতে পচন (Decomposition) অত্যন্ত দ্রুত শুরু হয়। মৃত পঙ্গপালের শরীরে Salmonella, Escherichia coli এবং বিভিন্ন ছত্রাক (Fungi) দ্রুত বংশবিস্তার করে।
সমস্যাসমূহ: যদি মৃত গরুর মাংস ব্যাকটেরিয়ার কারণে ক্ষতিকর হয়, তবে মৃত পঙ্গপাল কেন ক্ষতিকর হবে না? জীববিজ্ঞানের কোনো সূত্রই বলে না যে পতঙ্গের প্রোটিন মৃত অবস্থায় পচে না বা তা রোগজীবাণু ছড়ায় না। মৃত পঙ্গপাল খাওয়ার অনুমতি দেওয়া মূলত একটি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি।

হেমোলিম্ফ এবং ‘রক্তহীনতা’র ভ্রান্তি

পঙ্গপালকে জবাই না করার একটি প্রচলিত ধর্মীয় যুক্তি হলো এদের শরীরে ‘প্রবাহিত রক্ত’ নেই। কিন্তু এটি এটি একটি অপবিজ্ঞান।

মুক্ত সংবহনতন্ত্র: পতঙ্গদের শরীরে মানুষের মতো ক্লোজড সার্কুলেটরি সিস্টেম না থাকলেও তাদের হেমোলিম্ফ (Hemolymph) নামক এক ধরণের তরল থাকে যা সারা শরীরে পুষ্টি এবং হরমোন প্রবাহিত করে। যখন একটি পঙ্গপাল মারা যায়, এই হেমোলিম্ফই পচনশীল অণুজীবদের জন্য উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে।
যৌক্তিক অসংগতি: রক্ত নেই—এই অজুহাতে একটি মৃত পতঙ্গকে খাওয়ার বৈধতা দেওয়া আধুনিক ফিজিওলজির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। রক্ত থাক বা না থাক, জৈব টিস্যুর পচন রোধ করার ক্ষমতা কোনো মৃত প্রাণীর নেই।

বিষক্রিয়াবিদ্যা (Toxicology) ও আধুনিক বাস্তবতা

সপ্তম শতাব্দীতে কীটনাশকের অস্তিত্ব ছিল না, কিন্তু বর্তমানে পঙ্গপাল দমনে বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত শক্তিশালী নিউরোটক্সিন এবং কেমিক্যাল স্প্রে ব্যবহার করা হয়।

বায়ো-অ্যাকুমুলেশন: পঙ্গপাল যখন মাইলের পর মাইল ফসল খেয়ে বেড়ায়, তখন তাদের শরীরে বিপুল পরিমাণ কীটনাশক (যেমন: Organophosphates) জমা হয়। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, কীটনাশক আক্রান্ত পঙ্গপাল খাওয়া মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে এবং এটি প্রাণঘাতী হতে পারে।
বিধানের সীমাবদ্ধতা: ধর্মীয় বিধানে ‘মৃত পঙ্গপাল হালাল’—এই ঢালাও ঘোষণাটি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটি কোনোভাবেই একটি ‘সর্বজ্ঞ’ সত্তার বিধান হতে পারে না, কারণ এতে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে উদ্ভূত ঝুঁকির কোনো সতর্কতা নেই।

শ্রেণিবিন্যাসগত বৈষম্য (Taxonomic Inconsistency)

ইসলামি বিধান অনুযায়ী পঙ্গপাল বাদে অধিকাংশ কীটপতঙ্গ খাওয়া ‘মাকরূহ’ বা ‘হারাম’ (খাবাইস বা নোংরা হওয়ার কারণে)।

বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন: পঙ্গপাল মূলত এক ধরণের ঘাসফড়িং (Grasshopper)। জৈবিকভাবে ঘাসফড়িং, ঝিঁঝিঁ পোকা (Cricket) বা সিল্কওয়ার্মের পুষ্টিগুণ ও শারীরিক গঠন পঙ্গপালের মতোই। যদি পঙ্গপাল ‘পবিত্র’ ও ‘হালাল’ হয়, তবে সমগোত্রীয় অন্য পতঙ্গগুলো কেন ‘নোংরা’ হিসেবে বিবেচিত হবে?
যুক্তি: এই বিভাজনটি কোনো জৈবিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং তৎকালীন আরবের মরুচারী মানুষের ব্যক্তিগত রুচি এবং অভাবের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি কোনো শাশ্বত স্বাস্থ্যবিধি নয়।

ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট

পঙ্গপালকে হালাল করার পেছনে কোনো অলৌকিক বিজ্ঞান নেই, বরং আছে তৎকালীন আরবের চরম খাদ্য সংকট ও দারিদ্র্যের ইতিহাস। মরুভূমিতে যখন পঙ্গপালের ঝাঁক আসত, তখন সেটি ছিল প্রোটিনের একটি সহজলভ্য উৎস। মানুষ ক্ষুধা নিবারণের জন্য সেগুলোকে সংগ্রহ করত। এই লোকজ খাদ্যাভ্যাসকেই পরবর্তীতে ঐশ্বরিক মোড়ক দিয়ে একটি ধর্মীয় বিধানে রূপান্তর করা হয়েছে।


উপসংহার

পঙ্গপাল খাওয়ার ইসলামি বিধানটি আধুনিক বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে বিচার করলে দেখা যায়:

মৃত প্রাণী খাওয়ার অনুমতি সরাসরি স্বাস্থ্যবিদ্যার (Hygiene) পরিপন্থী।
কীটনাশকের ঝুঁকি এই বিধানকে আধুনিক যুগে অকেজো ও বিপজ্জনক করে তুলেছে।
রক্ত সংক্রান্ত ধারণাটি সেকেলে ও অপবিজ্ঞানসম্মত।

সুতরাং, পঙ্গপাল খাওয়ার এই বিধানটি কোনো সর্বজনীন বৈজ্ঞানিক ভাল বিষয় নয়, বরং এটি একটি মধ্যযুগীয় কুসংস্কার, যা বর্তমান সময়ে বিপদজনক।