
Table of Contents
- 1 ভূমিকা
- 2 কোরআনের দাবীঃ আল্লাহ হও বললেই তাৎক্ষণিকভাবে সব হয়ে যায়
- 3 তাফসীর থেকে এই আয়াতের ব্যাখ্যা
- 4 দাবীর বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা
- 5 ‘হও’ নির্দেশের লজিক্যাল অসংগতি
- 6 পদার্থ সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক অসম্ভবতা
- 7 সময়, ইচ্ছা এবং পরিবর্তনের দার্শনিক সমস্যা
- 8 মহাবিশ্বের জটিলতা উপেক্ষা
- 9 ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিত
- 10 তাৎক্ষণিকভাবে না হওয়ার উদাহরণ সমূহ
- 11 উপসংহার
ভূমিকা
ইসলামের ধর্মীয় গ্রন্থ কোরআনে মহাবিশ্বের সৃষ্টির এক অতি সরলীকৃত একটি বর্ণনা দেওয়া হয়েছে: “তিনিই সৃষ্টিকর্তা, যখন তিনি কিছু ইচ্ছা করেন, তখন শুধু বলেন ‘হও’, এবং তা হয়ে যায়” (সূরা ইয়াসিন ৩৬:৮২)। এই আয়াতটি ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস, যেখানে ঈশ্বরের অসীম ক্ষমতা এবং সর্বশক্তিমানতাকে তুলে ধরা হয়। কিন্তু যখন আমরা এই বক্তব্যটিকে দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করি, তখন এর ভেতরের অন্তর্নিহিত অসংগতি, মধ্যযুগের মানুষের চিন্তার সীমাবদ্ধতা এবং বেশকিছু মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি যদি কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস বা আবেগ হতো, তাহলে এ নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন হতো না। কিন্তু এটি মানুষের অস্তিত্ব, মহাবিশ্বের উদ্ভব, সময়, কার্যকারণ এবং মানব জ্ঞান সম্পর্কে কিছু বাস্তব জগতের দাবি করে। তাই এটি বিবেচনার প্রয়োজন হয় যে, এই ‘হও’ বললেই হয়ে যাওয়ার ধারণাটি আধুনিক জ্ঞানতত্ত্ব ও বিজ্ঞানের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক কিনা। এবং অনুসন্ধান করতে গেলেই দেখা যায়, এই দাবীর তাত্ত্বিক দুর্বলতা এবং সবকিছুর উদ্ভব সম্পর্কে রহস্য আরোপ করাই যে এইসব বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য, তা প্রকট হয়ে ওঠে।
কোরআনের দাবীঃ আল্লাহ হও বললেই তাৎক্ষণিকভাবে সব হয়ে যায়
ইসলাম ধর্মের আকীদা হচ্ছে, আল্লাহ হও বললে সাথে সাথেই তা হয়ে যায় [1]
মারইয়াম বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! কীভাবে আমার পুত্র হবে, অথচ আমাকে কোন মানব স্পর্শ করেনি’। তিনি বললেন, ‘এভাবেই’ আল্লাহ সৃজন করেন যা তিনি ইচ্ছে করেন, তিনি যখন কিছু স্থির করেন তখন বলেন, ‘‘হয়ে যাও’’ সুতরাং তা হয়ে যায়।
— Taisirul Quran
সে বলেছিলঃ হে আমার রাব্ব! কিরূপে আমার পুত্র হবে? কোন পুরুষ মানুষতো আমাকে স্পর্শ করেনি; তিনি বললেনঃ এরূপে আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, সৃষ্টি করে থাকেন, যখন তিনি কোন কাজের মনস্থ করেন তখন তিনি ওকে ‘হও’ বলেন, ফলতঃ তাতেই হয়ে যায়।
— Sheikh Mujibur Rahman
মারইয়াম বলল, ‘হে আমার রব, কিভাবে আমার সন্তান হবে? অথচ কোন মানুষ আমাকে স্পর্শ করেনি’! আল্লাহ বললেন, ‘এভাবেই’ আল্লাহ যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাকে শুধু বলেন, ‘হও’। ফলে তা হয়ে যায়।
— Rawai Al-bayan
সে বলল, ‘হে আমার রব! আমাকে কোনো পুরুষ স্পর্শ করেনি, এমতাবস্থায় আমার সন্তান হবে কিভাবে?’ তিনি (আল্লাহ্) বললেন, ‘এভাবেই’, আল্লাহ্ যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কিছু স্থির করেন তখন বলেন, ‘হও’, ফলে তা হয়ে যায় [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আসুন কোরআনের আরেকটি আয়াতটি পড়ে নিই, [2]
Originator of the heavens and the earth. When He decrees a matter, He only says to it, “Be,” and it is.
— Saheeh International
The Originator of the heavens and the earth! When He decreeth a thing, He saith unto it only: Be! and it is.
— M. Pickthall
আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃজনকারী, যখন কোন কাজ করতে মনস্থ করেন, তখন তার জন্য শুধু বলেন, হয়ে যাও, তক্ষুনি তা হয়ে যায়।
— Taisirul Quran
তিনি আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা এবং যখন তিনি কোন কাজ সম্পাদন করতে ইচ্ছা করেন তখন তার জন্য শুধুমাত্র ‘হও’ বলেন, আর তাতেই তা হয়ে যায়।
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা। আর যখন তিনি কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তখন কেবল বলেন ‘হও’ ফলে তা হয়ে যায়।
— Rawai Al-bayan
তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের উদ্ভাবক। আর যখন তিনি কোনো কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার জন্য শুধু বলেন, ‘হও’, ফলে তা হয়ে যায়।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তাফসীর থেকে এই আয়াতের ব্যাখ্যা
এই আয়াতের তাফসীরে তাফসীরে মাযহারী গ্রন্থে যা বলা আছে তা হচ্ছে [3]
সকল প্রকারই আল্লাহতায়ালার ক্ষমতাভূত। তিনি যদি বলেন, ‘হও’ তৎক্ষণাৎ তা হয়ে যায়। তাঁর ইচ্ছা, কেবল মাতার মাধ্যমে ঈসাকে সৃষ্টি করবেন।

এই আয়াতটির তাফসীরও একইসাথে পড়ে নেয়া জরুরি, [4]
قَوْلَهُ أَي كُفَّارَ مَكَةً : এ সূরাটি মাদানী সূরা হওয়ার পরও الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ -এর তাফসীরে كَثَرُ مَكَ বলার কারণ
কয়েকটি হতে পারে-
১. পূর্ণ সূরা মদনী কিন্তুএ আয়াতটি মক্কী। কিন্তু এ জবাবটি দূরবর্ত
২. এও হতে পারে যে, মক্কার কাফেররা রাসূল-এর কাছে মদীনার ইহুদিদের সম্পর্কে পরিচয় লাভ করেছে।
قَوْلَهُ بَدِيعُ : তিনিই যিনি কোনো অস্ত্র-যন্ত্রের মুখাপেক্ষী নন, যাঁর কোনো মাল-মসলা বা উপকরণ-সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না, যিনি স্থান-অবস্থান ও পরিস্থিতির নিগড়ে আবদ্ধ নন, যিনি সময় বন্ধনের উর্ধ্বে; যিনি কোনো নমুনা স্যাম্পল দেখে বানাবার প্রয়োজন অনুভব করেন না, যার কোনো উস্তাদ প্রশিক্ষকের দিকনির্দেশনার প্রয়োজন হয় না। তিনি সৃজনশীল প্রকৌশলী, তিনি উপকরণ সংযোজক কারিগর নন। প্রকৃত ও বাস্তব অর্থে, আক্ষরিক অর্থে যিনি স্রষ্টা, আবিষ্কারক, অস্তিত্ব বিধায়ক। কারো সহায়তা-সহযোগিতা ছাড়াই আরো কোনোরূপ অংশগ্রহণ ব্যতীতই যিনি নাস্তিজগত থেকে অস্তিত্বে নিয়ে আসেন।
بدیع শব্দের উল্লেখ সেসব মুশরিক পৌত্তলিক সম্প্রদায়ের মতবাদ খণ্ডনের জন্য হয়েছে, যারা আল্লাহকে শুধু কারিগর [ও মিস্ত্রি[
-এর মর্যাদা দিত এবং আত্মা ও মূল উপকরণকে কোনো না স্তরে তাঁর সহযোগী সহাধ্যায়ী ভাবত। অর্থাৎ যেন মূল ধাতু ও উপকরণ আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল এবং তা ছিল অনাদিও নিত্য। কিংবা আত্মা ও তার সঙ্গে সঙ্গে ছিল অনাদি ও নিত্য। আল্লাহ তা’আলার কাজ ছিল শুধু এতটুকু যে তিনি একজন সুদক্ষ কেমিষ্ট রসায়নবিদের ন্যায় বিদ্যমান উপকরণ কেবল আত্মার সংযোজন ও বিন্যাসের কাজটি সুচারুরূপে সমাধা করে নতুন নতুন রূপ ও আকৃতিতে বাজার জাত করেন। কেবল إبداع শব্দটিই মুশরিকদের কল্পিত কল্পনা খণ্ডনের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তা’আলার জন্য অন্যান্য পূর্ণাঙ্গ সাবাহকার’ গুণের অনুরূপ সত্তাগত অনাদিত্বের সাথে সাথে সময় কালগত অনাদিত্ব (১) সাব্যস্ত রয়েছে। কাল বলতে যা বোস, তিনি তার চেয়েও আদি অগ্রবর্তী। এমন একটি সময় [ও কাল] ছিল যখন [কাল বলতে কিছুই ছিল এ এবং মহাকাল নামেন সে অকালে) শুধু তিনিই ছিলেন, আর কিছুই ছিল না, প্রান্ত দিগন্ত, সত্তা অস্তিত্ব [জড় অজড়, দেহ, অদেহ] কিছুই ছিল না।
-তাফসীরে মাজেদী খ. ১. পৃ. ২১৪)
তাফসীরে জালালাইন আরবি-বাংলা, প্রথম খণ্ড পৃষ্ঠা ২৯৯
জন্য দুটি کون অথবা বলা যায় موجود واحد -এর জন্য দুটি وُجُود হওয়া লাজেম আসে। কেননা মুখাতাব হওয়ার জন্য কোনো বস্তুর বিদ্যমান থাকা জরুরি। অন্যথায় অনুপস্থিত ও অবিদ্যমান বস্তুকে সম্বোধন করা লাজেম আসবে, যা সঠিক নয়।
উত্তর: উত্তরের সারকথা হলো
শব্দটি ার্স-এর অর্থে।
কুন বলা দ্বারা শুধু এতটুকু বুঝানো উদ্দেশ্য যে, ওদিকে আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা হলো আর তৎক্ষণাৎ এদিকে কোনো মাধ্যম ও বিরতি ছাড়াই তা বাস্তবে প্রকাশমান হলো। তাফসীরে মাদারিকে আছে-
وَهَذَا مَجَازَ عَنْ سُرْعَةِ التَّكْوِينِ وَالتَّمْشِيلِ إِذْ لَا قَوْلًا ثُمَّ
অর্থ: এটি আজ্ঞা পালন ও সৃষ্টি হওয়া এর দ্রুততা বুঝাবার রূপক। কেননা সেখানে তো আর কোনো কথা [বা বলা)-র অস্তিত্ব নেই। -তাফসীরে মাদারিক।
قوله کن : অর্থাৎ নিরেট অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ববান হয়ে যাও, ‘না’ থেকে ‘হ্যাঁ’ হয়ে যাও। এর অর্থ এমন নয় যে, আল্লাহ তা’আলা আপনার আমার মতো এ দুই বর্ণের ‘কুন’ (১) হও শব্দটি উচ্চারণ করেন। কেননা বর্ণ এবং শব্দও তো সৃষ্ট )حادث( অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বপ্রাপ্ত অনিত্য। এবং আল্লাহ পাক জিহ্বা, ওষ্ঠ ও ধমনী কোষাশ্রয়ী উচ্চারণের মুখাপেক্ষীও নন। তবে তার সৃজন প্রক্রিয়াকে বান্দাদের বুঝ উপযোগী ও তাদের বোধ-এর যথাসম্ভব নিকটবর্তী বর্ণনা পদ্ধতি ও প্রকাশভঙ্গি আর
কি গ্রহণ করা যেত?
[তাকে সর্বনামটি সে বিষয়ের জন্য যা এখনও বাহ্য অস্তিত্ব লাভ করেনি, তবে আল্লাহ তা’আলার ইলমে তো তা যথারীতি বিদ্যমানই রয়েছে। আর আল্লাহ তা’আলার আদেশের অভিমুখে আদিষ্টও বিদ্যমান-এর মাঝে সময়ের বিচারে কোনো ব্যবধান নেই। যে কোনো আদিষ্ট অর্থই বিদ্যমান হওয়া এবং বিদ্যমান মানেই আদিষ্ট হওয়া।
أَمَرَهُ لِلشَّيْ بِكُنْ لَا يَتَقَدَّمُ الْوُجُودُ وَلَا يَتَآخَرُ عَنْهُ فَلَا يَكُونُ مَامُوراً بِالْوُجُودِ إِلَّا وَهُوَ مَوْجُودُ بِالْأَمْرِ وَلَا مَوْجُودًا بالأمْرِ إِلَّا وَهُوَ مَا مُورَ بِالْوُجُودِ .
অর্থাৎ কুন দ্বারা কোনো কিছুকে তাঁর আদেশ ঐ বিষয়ের অস্তিত্বের আগেও নয় অস্তিত্বের পরেও নয়। যা কিছু অস্তিত্ব লাভে আদিষ্ট তা আদেশ সংযোগে [আদেশ জগতে। বিদ্যমানই; এবং যা-ই আদেশে বিদ্যমান, তাই অস্তিত্ব লাভে আদিষ্ট। অর্থাৎ এখানে আদিষ্টও অস্তিত্ব সম্পন্ন বলে কোনো ভেদরেখা কার্যত টানা যায় না। ইবনু জারীর সূত্রে মাজেদী খ. ১, পৃ. ২১৫)
قَولَهُ كُنْ فَيَكُونَ : এখানে ১ টি সম্পূর্ণ ক্রিয়া (মتَامَّ( : অসম্পূর্ণ )نَاقِصَة( নয়। অর্থাৎ হয়ে যা, অস্তিত্বে এসো- এর সমার্থক, অমুক বিষয়রূপে হয়ে যা-এর সমার্থক নয়। এটি ২৩ জাতীয় র্থ অর্থাৎ اَحْدَثَ অস্তিত্বে আয়, হও ফলে তখনই
তা অস্তিত্ববান হয়।
قَوْلُهُ فَيَكُونُ : অর্থাৎ ব্যাস, তখনই ঐ বিষয়টি অস্তিত্বে এসে যায়। হয়ে যেতে কোনোও বিলম্ব হয় না এবং তার জন্য কারো সহায়তা, মাধ্যম হওয়া, অংশগ্রহণ করা ইত্যাদির প্রয়োজন হয় না। এ শব্দটি দ্বারা উদ্দেশ্য বিষয়বস্তুর অস্তিত্ব বিধানে আল্লাহ তা’আলার কুদরতের অতি দ্রুত বাস্তবায়ন বুঝানো-
الْمُرَادُ مِنْ هَذِهِ الكَلِمَةِ سُرْعَة نِفَاذِ قدرة الله تعالى في تكوين الاشياء . (كبير)
এ যেন মুশরিকদের প্রতিই সম্বোধন যে, আল্লাহ তা’আলার সৃজন প্রক্রিয়া তোমাদের বোধগম্য হলো কি? তাতে তো আল্লাহ তা’আলার ইরাদা ব্যতীত অন্য কোনো কিছুরই অংশ গ্রহণের অবকাশ নেই। সুতরাং এতে তোমাদের অংশীবাদের ভিত্তিই ধ্বংস যায়।
প্রশ্ন: فانّما يقول له كن فيكون দ্বারা জানা যায় যে, আল্লাহ তা’আলা কোনো অবিদ্যমান বস্তুকে অস্তিত্বে আনার ইচ্ছা করলে তাকে বলেন। ফলে সে অস্তিত্বহীন বস্তু অস্তিত্বশীল হয়ে যায়। এতে তো معدوم বস্তুকে সম্বোধন করা লাজেম আসে।
উত্তর: আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছাতেই সে অস্তিত্বহীন বস্তু অস্তিত্বশীল বস্তুর হুকুমে হয়ে যায়। সুতরাং সম্বোধন করা সঠিক আছে।
1 كُن فيكون দ্বারা তাড়াতাড়ি উদ্দেশ্য, উদ্ভাবন উদ্দেশ্য নয়।


দাবীর বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা
আল্লাহ বলতে পারতেন, মহাবিশ্বের উদ্ভব প্রক্রিয়াটি জটিল, যা মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে তোমরা বুঝবে না। সেটি না করে তিনি কিছু দাবি করেছেন, যেই দাবিগুলো বিশ্লেষণ করলে তা অসংখ্য জটিল প্রশ্নের জন্ম দেয়, যা কোরআনের দাবিকে ভালভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। যদি এগুলো মানুষের জ্ঞানের বাইরেই হয়, তাহলে আল্লাহ কোরআনে যেই কথাটি বলেছেন, সেটিই বা বললেন কেন? আল্লাহ কি চান, আমরা মানুষেরা না বুঝে, আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে এই অজুহাতে তার দাবিটি অন্ধভাবে মেনে নিই? তাহলে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব বা ওডিন, জিউস বা অন্য ধর্মের ঈশ্বরেরা কী দোষ করলো? মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার দাবি করে তারাও বা সেই ধর্মের মানুষও তো বলতে পারে, মানুষ সেসব রহস্য বুঝবে না। তাহলে তাদের কথা কেন মানবো না? যুক্তি তো সকল ঈশ্বরের ক্ষেত্রেই একইভাবে ব্যবহার করতে হবে।
আর আল্লাহ যেহেতু দাবিটি করেই ফেলেছেন, তাই সেই দাবিটিকে বিশ্লেষণ করা তো অবশ্যই জরুরি। আমরা যদি কিছুই না বুঝি, তাহলে আল্লাহর বলা এই আয়াতটি একটি অর্থহীন আয়াত হিসেবে পাঠ করার তো কোনো উপযোগ থাকতে পারে না। আল্লাহরও এরকম অবোধ্য আয়াত নাজিলের কোন যৌক্তিকতা থাকে না।
‘হও’ নির্দেশের লজিক্যাল অসংগতি
প্রথমত, ‘হও’ একটি শব্দ, একটি মৌখিক বা মানবীয় নির্দেশ। এর ভাষাগত দিক যদি আমরা বাদ দিই, শুধুমাত্র একে একটি নির্দেশনামূলক বক্তব্য ধরি, তাহলে এটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে, যেকোনো নির্দেশের কার্যকারিতা নির্ভর করে একটি প্রাপক সত্তার ওপর, যিনি সেই নির্দেশ গ্রহণ করবেন, বুঝবেন এবং কার্যকর করবেন।
আমরা যদি কোরআনের এই দাবিটিকে মহাবিশ্বের উদ্ভবের বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করি, তাহলে দুইটি ব্যাপার ঘটা সম্ভব:
- আল্লাহ নিজেই ‘হও’ বলছেন এবং নিজেই তা কার্যকর করছেন। এখানে আল্লাহই নির্দেশদাতা এবং নির্দেশ বাস্তবায়নকারী।
- আল্লাহ শুধু ‘হও’ বলছেন এবং একটি তৃতীয় পক্ষ নির্দেশটি শুনেছে, বুঝেছে এবং বাস্তবায়ন করেছে। এখানে আল্লাহ নির্দেশদাতা এবং অন্যকেউ নির্দেশ বাস্তবায়নকারী।
এই দুই সম্ভাবনাকে চিত্রিত করতে নিম্নোক্ত ডায়াগ্রামটি বিবেচনা করা যায় (যা অরিজিনাল প্রবন্ধে প্রদত্ত): বাম পাশে আল্লাহ ‘হও’ বলছেন, কিন্তু মাঝে একটি প্রশ্নচিহ্ন (কোনো গ্রাহক সত্তা নেই), এবং নিচে মহাবিশ্বের চিত্র। ডান পাশে আল্লাহ নিজেকে মেগাফোন দিয়ে ‘হও’ বলছেন এবং নিজেই গ্রহণ করে বাস্তবায়ন করছেন, নিচে মহাবিশ্ব। এটি দেখায় যে নির্দেশ গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের জন্য একটি স্বতন্ত্র সত্তা প্রয়োজন।

সমস্যাটি হচ্ছে, একটি নির্দেশ এবং তা বাস্তবায়নের জন্য স্বাভাবিকভাবেই দুটি ভিন্ন সচেতন সত্তা থাকা বাঞ্ছনীয়। যদি বলা হয় যে নির্দেশ পাওয়ার জন্য কোনো বাহ্যিক সত্তার প্রয়োজন নেই, তাহলে ‘হও’ বলার কোনো কার্যকারিতা থাকে না, বরং হও বলাটাই স্ববিরোধী। এটি ঈশ্বরকে এমন এক সত্তায় পরিণত করে, যিনি নিজেই নিজের কথা শোনেন এবং নিজেই নিজের নির্দেশে সাড়া দিয়ে তা বাস্তবায়ন করেন – যা সচেতনতা বা আত্ম-সচেতনতার ধারণার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কার্যকারণ যুক্তির পরিপন্থী। এই ব্যাখ্যা ঈশ্বরকে উদ্ভট একটি যুক্তিহীন চরিত্রে পরিণত করে, যে নিজেই নিজেকে নির্দেশ দেয় এবং নিজেই তা বাস্তবায়ন করে।
পদার্থ সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক অসম্ভবতা
দ্বিতীয়ত, কোনো কিছুর অস্তিত্ব লাভের জন্য উপাদান, শক্তি এবং সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্র অনুসারে, শূন্য থেকে পদার্থের সৃষ্টি হওয়া যুক্তি বা বিজ্ঞানের জগতের সংরক্ষণশীলতার নীতিগুলির পরিপন্থী। আধুনিক বিগ ব্যাং তত্ত্বও ‘শূন্য’ বলতে আক্ষরিক অর্থে ‘কিছু না’ বোঝায় না; বরং একটি অতি-ঘন, অতি-উষ্ণ অবস্থা (সিঙ্গুলারিটি) থেকে স্থান, সময় এবং পদার্থ-শক্তির উদ্ভব ঘটেছে বলে ব্যাখ্যা করে। এই বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপটে, কেবল ‘হও’ বললেই শূন্য থেকে জগৎ তৈরি হয়ে যাওয়া বাস্তবসম্মতভাবে তাৎপর্যহীন। এই ধারণাটি প্রাকৃতিক নিয়ম এবং কার্যকারণ সম্পর্ককে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে।
সময়, ইচ্ছা এবং পরিবর্তনের দার্শনিক সমস্যা
এছাড়াও, দর্শনের এক কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো: “কিভাবে কোনো কিছু নেই থেকে কিছু হতে পারে?” যদি বলা হয় ঈশ্বর চিরকাল বিদ্যমান, তাহলে ঈশ্বরের ইচ্ছারও একটি সময়িক (সময়-নির্ভরশীল) রূপ আছে বলে ধরে নিতে হয় — অর্থাৎ, কোনো এক নির্দিষ্ট মুহূর্তে তিনি ‘ইচ্ছা’ করলেন যে জগৎ হোক। যেই মুহূর্তে তিনি ইচ্ছাটি করলেন, তার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ইচ্ছাটি তাহলে ছিল না।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এর আগে কেন তিনি এই ইচ্ছা করলেন না? ইচ্ছা করার জন্য মানসিক পরিবর্তন প্রয়োজন, আর মানসিক পরিবর্তন মানেই সময়ের অস্তিত্ব, কারণ সময় হলো পরিবর্তনের পরিমাপ। কিন্তু ঈশ্বর যদি সময়-নিরপেক্ষ হন, তাহলে তার ইচ্ছারও পরিবর্তন হতে পারে না। ইচ্ছাটিও আদি ও অনন্ত হতে হবে। আর মহাবিশ্ব সৃষ্টির ইচ্ছাটি যদি আদি ও অনন্ত হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহর তো মহাবিশ্ব সৃষ্টি করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি তো মহাবিশ্ব সৃষ্টি করা ভিন্ন অন্য কোনো ইচ্ছা করতেই পারতেন না, যেহেতু তার ঐ ইচ্ছাটি আদি ও অনন্ত।
আবার, আল্লাহর ইচ্ছা যদি একটি সময়িক (সময়-নির্ভরশীল) ঘটনা হয়, তবে আল্লাহ সময়ের অন্তর্গত হয়ে পড়েন; আর যদি তা চিরন্তন হয়, তাহলে জগতের শুরু কেন একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে হলো? তার পূর্বে আল্লাহ কিসের অপেক্ষায় ছিলেন? এই ধারণায় একটি গভীর দার্শনিক সংকট নিহিত। যদি ঈশ্বর শূন্য থেকে সৃষ্টি করে থাকেন, তবে সৃষ্টি এবং শূন্যতার মাঝখানে এমন এক সত্তা বা প্রক্রিয়া থাকতে হয়, যা মধ্যবর্তী বা আন্তঃসম্পর্কের ধরন বোঝাতে পারে — যা আবার ঈশ্বর ছাড়াও যুক্তিবাদী কাঠামোয় অনুসন্ধানযোগ্য হওয়া দরকার। কারণ যুক্তির নিয়ম অনুসারে, প্রত্যেক কার্যের একটি কারণ থাকা চাই। ‘হও’ যদি একটি কার্য-কারণ সম্পর্কের বাহক হয়, তাহলে এটি একটি কার্যকর ‘কারণ’ হতে পারে কেবল তখনই যখন তার পরিণতি ঘটানোর প্রক্রিয়া বা মাধ্যম বিদ্যমান থাকে। অন্যথায় এটি একটি অযৌক্তিক দাবি যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কোরআনের অভ্যন্তরীণ স্ববিরোধিতাও এখানে স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। কোরআনের একাধিক আয়াতে দাবি করা হয়েছে যে, আল্লাহ আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন [5]। এখন যৌক্তিক প্রশ্ন হলো, ঈশ্বরের কেবল ‘হও’ বলাই যদি সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট হয় এবং তা নির্দেশমাত্রই তাৎক্ষণিকভাবে অস্তিত্ব লাভ করে, তবে এই ছয় দিন বা দীর্ঘ সময় ধরে পর্যায়ক্রমিক সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা কেন দেখা দিল? ‘হও’ বলার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সৃষ্টি এবং ছয় দিনে ধাপে ধাপে সৃষ্টির এই সাংঘর্ষিক অবস্থান প্রমাণ করে যে, এটি কোনো সুসংহত মহাজাগতিক নিয়ম নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন সময়ে রচিত এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত পৌরাণিক ধারণার একটি অগোছালো সংমিশ্রণ মাত্র।
মহাবিশ্বের জটিলতা উপেক্ষা
আরও একটি গুরুতর সমস্যা হলো, ‘হও’ বললেই কিছু হয়ে যায় – এমন চিন্তা মহাবিশ্বের জটিলতা এবং পরিপার্শ্বিক কার্যকারণ নীতিকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে। আজকের মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা, শক্তি, আইন এবং গঠনের পিছনে যে সুনির্দিষ্ট কাঠামো ও সম্পর্ক বিদ্যমান, তা কোনো বোধগম্য ভাষাগত নির্দেশে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। যেমন, হিগস বোসনের আবিষ্কার (যা ২০১২ সালে CERN-এ নিশ্চিত হয়েছে এবং যা কণার ভর প্রদান করে) কিংবা ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির গঠন (যা মহাবিশ্বের ৯৫% ভর-শক্তি গঠন করে কিন্তু অদৃশ্য) ব্যাখ্যার জন্য শত শত বছর গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন হয়। অথচ যদি একটি ‘হও’ বলায় সব তৈরি হয়ে যায় – তাহলে “আল্লাহর জ্ঞান অসীম” এই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তার সৃষ্টি পদ্ধতিকে একটি শিশুসুলভ জাদুকরী কাজে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়। এটি এক ধরনের জ্ঞানগত অলসতা, যা মহাবিশ্বের বিস্ময়কর জটিলতাকে অস্বীকার করে এবং মানবীয় জ্ঞানার্জনের প্রচেষ্টাকে অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য করে।
ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিত
তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব এবং প্রাচীন ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মুখের কথার বা নির্দেশের মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির এই ধারণাটি (Creation by fiat) ইসলামের নিজস্ব কোনো মৌলিক বা অভিনব দর্শন নয়। প্রাচীন মিশরের ‘মেমফাইট থিওলজি’-তে বিশ্বাস করা হতো যে, দেবতা ‘তাহ’ (Ptah) তার মনের ইচ্ছা এবং মুখের উচ্চারিত শব্দের মাধ্যমে সবকিছুর সৃষ্টি করেছেন [6]। একইভাবে, হিব্রু বাইবেলের জেনেসিস অধ্যায়েও “ঈশ্বর বললেন… আর তা হয়ে গেল” কাঠামোর বহুল ব্যবহার রয়েছে [7]। অর্থাৎ, এটি প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকেই প্রচলিত একটি অতিপরিচিত পৌরাণিক মোটিফ (Mythological motif), যা কোরআন পূর্ববর্তী ধর্ম ও লোককথা থেকে ধার করে নিজের মতো করে আত্মস্থ করেছে।
দর্শনের আলোকে এই কথাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ‘হও’ মূলত মরু আরবের অশিক্ষিত মানুষকে আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতা বোঝাবার জন্য একটি ভাষাগত দাবি মাত্র। কিন্তু যখন একে বাস্তব জগতের অস্তিত্ব বা উদ্ভবের ব্যাখ্যা হিসেবে নেওয়া হয়, তখন তা যুক্তিসঙ্গত বিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ অনির্ভরযোগ্য হয়ে পড়ে। এই ‘হও’ শব্দটির কোনো দার্শনিক বা বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব নেই, কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা এটি দেয় না, শুধুমাত্র এই দাবিকে অন্ধবিশ্বাস করতে বলে, যা জ্ঞানের পরিপন্থী। এটি কোনো বাস্তব ব্যাখ্যা আমাদের দিচ্ছে না, বরং মানব জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং মহাবিশ্বের অসীমতার ধারণা দিয়ে আমাদের অন্ধভাবে অযৌক্তিক দাবিকে মেনে নিতে উৎসাহিত করে। এটি ঈশ্বরের ক্ষমতাকে এমন এক সরলীকৃত রূপে উপস্থাপন করে, যা মানুষকে আসলে কোনো জ্ঞান না দিয়েও জ্ঞান দেয়ার ভান করে, কিন্তু এর গভীরতর অর্থ অন্বেষণ করতে গেলে আমাদের যুক্তির সীমানা প্রসারিত করা তো দূরের কথা, বরং তাকে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করতে হয়।
তাৎক্ষণিকভাবে না হওয়ার উদাহরণ সমূহ
কোরআনে একটি মৌলিক ধারণা হলো আল্লাহর ইচ্ছা বা নির্দেশের তাৎক্ষণিক কার্যকারিতা। সূরা ইয়াসিন (36:82)-এ বলা হয়েছে: “তার নির্দেশ শুধু এই যে, যখন তিনি কোনো কিছুর ইচ্ছা করেন, তখন তাকে বলেন ‘হও’—এবং তা হয়ে যায়।” এই আয়াতটি আল্লাহর অসীম ক্ষমতা এবং সর্বশক্তিমানতাকে তুলে ধরে, যা ইসলামের একটি কেন্দ্রীয় বিশ্বাস। অথচ কোরআন এবং হাদিসসমূহে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যেখানে আল্লাহর ইচ্ছা বা নির্দেশ প্রকাশিত হওয়ার পরও তা তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। যৌক্তিকভাবে প্রশ্ন ওঠে যে, যদি ‘হও’ নির্দেশটি সত্যিই তাৎক্ষণিক এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়, তাহলে কেন অনেক ক্ষেত্রে সময়, প্রক্রিয়া বা উপাদানের প্রয়োজন পড়ে? এই অসঙ্গতিগুলো সর্বশক্তিমানতার সংজ্ঞার সাথে সাংঘর্ষিক, কারণ সর্বশক্তিমান সত্তার কোনো সীমাবদ্ধতা থাকার কথা নয়—যেমন সময়ের অপেক্ষা বা বাহ্যিক উপাদানের নির্ভরতা। নীচে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো, যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে, এবং যেখানে সম্ভব সোর্স উল্লেখ করা হয়েছে। যদি কোনো দাবির জন্য সরাসরি প্রমাণ না পাওয়া যায়, তাহলে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হবে।
মহাবিশ্ব সৃষ্টিতে সময় বনাম তাৎক্ষণিক কার্যকারিতা
কোরআনে (2:117)-এ বলা হয়েছে যে, আল্লাহ কোনো কিছু সৃষ্টি করতে চাইলে শুধু ‘হও’ বলেন, এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে হয়ে যায়—সময় কোনো বাধা নয়। এটি সর্বশক্তিমানতার একটি প্রতিফলন, যেখানে সবকিছু মুহূর্তের মধ্যে অস্তিত্ব লাভ করে। কিন্তু কোরআনের অন্যান্য আয়াতে মহাবিশ্ব সৃষ্টির বর্ণনা এই ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। উদাহরণস্বরূপ, সূরা আল-আরাফ (7:54) এবং সূরা ইউনুস (10:3)-এ বলা হয়েছে যে, আল্লাহ আকাশমণ্ডল এবং পৃথিবী সৃষ্টি করতে ছয় দিন সময় নিয়েছেন [8] । এছাড়া সূরা ফুসসিলাত (41:9-12)-এ বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে: পৃথিবী সৃষ্টি করতে দুই দিন, পর্বতসমূহ এবং জীবিকার ব্যবস্থা করতে আরও চার দিন (যা মোট ছয় দিনের অন্তর্ভুক্ত), এবং আকাশমণ্ডল সাতটি স্তরে সৃষ্টি করতে আরও দুই দিন। কিছু ব্যাখ্যাকার দাবি করেন যে এখানে ওভারল্যাপ রয়েছে এবং মোট ছয় দিনই, কিন্তু যৌক্তিকভাবে যদি গণনা করা হয় (2+4+2=8), তাহলে অসঙ্গতি দেখা যায়। যদি ‘হও’ নির্দেশটি সত্যিই তাৎক্ষণিক হয়, তাহলে কেন এই সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় কয়েক দিনের সময় লাগবে? এটি প্রমাণ করে যে, ঐশ্বরিক ইচ্ছা সময়ের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত নয়, যা সর্বশক্তিমানতার সাথে সরাসরি বিপরীত। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে, মহাবিশ্বের বয়স ১৩.৮ বিলিয়ন বছর, যা ‘ছয় দিন’ ধারণার সাথে মিলে না, কিন্তু এখানে ফোকাস কোরআনের অভ্যন্তরীণ অসঙ্গতির উপর।
মানুষ সৃষ্টিতে উপাদানের প্রয়োজনীয়তা ও প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা
মানুষ বা আদম সৃষ্টির বর্ণনায় কুরআনে বলা হয়েছে যে, আদমের ক্ষেত্রেও আল্লাহর নির্দেশ ছিল কেবল ‘হও’, এবং তিনি হয়ে গেলেন [9]। অথচ একইসাথে কোরআনের একাধিক স্থানে দাবি করা হয়েছে যে, মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে কাদা মাটি, শুকনা মাটি বা পোড়ামাটির মতো উপাদান থেকে [10]। একইসাথে ইসলামের আদমকে তৈরির যেই গল্প রয়েছে, সেখানে আরও বিস্তারিতভাবে বিভিন্ন ধাপ জানা যায় [11]। যদি ‘হও’ নির্দেশটিই কোনো কিছু সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়, তবে সেখানে কাঁচামাল বা মাটির মতো প্রাকৃত উপাদানের ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা থাকার কথা নয়। উপাদানের ব্যবহার এবং একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার (মাটি থেকে মানুষে রূপান্তর) মধ্য দিয়ে যাওয়া নির্দেশ করে যে, এটি কোনো তাৎক্ষণিক অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং একটি জাগতিক নির্মাণ প্রক্রিয়ার সমতুল্য। যেখানে কোনো উপাদানের প্রয়োজন পড়ে, সেখানে স্রষ্টা সেই উপাদানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যা তার হও বললেই ‘তাৎক্ষণিক সৃষ্টি’ করার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই ফুটিয়ে তোলে।
আবু লাহাবের ধ্বংসের নির্দেশ ও বিলম্বিত বাস্তবায়ন
আল্লাহর নির্দেশের তাৎক্ষণিক কার্যকারিতার বিপরীতে আবু লাহাবের ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুসারে, মুহাম্মদ যখন সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে কুরাইশদের সতর্ক করেন, তখন আবু লাহাব তাকে অপমানজনক কথা বলে। এর প্রেক্ষিতে সূরা আল-মাসাদ নাজিল হয়, যেখানে বলা হয়— “আবু লাহাবের হাত ধ্বংস হোক এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক” [12]। লক্ষ্যণীয় যে, কুরআনের এই ভাষাটি কেবল একটি ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং এটি একটি ঐশ্বরিক ডিক্রি বা ধ্বংসের নির্দেশ হিসেবে উপস্থাপিত। যদি আল্লাহর নির্দেশ ‘হও’ বলার মতোই কার্যকর হতো, তবে এই ঘোষণার সাথে সাথেই আবু লাহাবের ধ্বংস হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য ও হাদিস অনুসারে, এই অভিশাপ বা নির্দেশের পরেও আবু লাহাব প্রায় দশ বছর জীবিত ছিলেন এবং সক্রিয়ভাবে ইসলামের বিরোধিতা করে গেছেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা একটি সরাসরি ধ্বংসের নির্দেশ বাস্তবায়িত হতে এক দশকের দীর্ঘ সময় লাগা এটিই নির্দেশ করে যে, ঐশ্বরিক ইচ্ছা বা নির্দেশ সর্বদা তৎক্ষণাৎ কার্যকর হয় না, যা ‘কুন ফায়াকুন’ ধারণার যৌক্তিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয় [13] [14]
আবূ লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক
এবং ধ্বংস হোক সে নিজে,
কোন কাজে আসেনি তার ধন-সম্পদ
ও যা সে উপার্জন করেছে।
সত্বরই সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে
এবং তার স্ত্রীও-যে ইন্ধন বহন করে,
তার গলদেশে খর্জুরের রশি নিয়ে।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৫/ কুরআন মাজীদের তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ ৬৫/২৬/২. আল্লাহ্ তা‘আলার বাণীঃ তোমার নিকট আত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দাও এবং (মু’মিনদের প্রতি) বিনয়ী হও। (সূরাহ শু‘আরা ২৬/২১৪-২১৫)
اخْفِضْ جَنَاحَكَ ’’তোমার পার্শ্ব নম্র রাখ।
৪৭৭০. ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন وَأَنْذِرْ عَشِيْرَتَكَ الْأَقْرَبِيْنَ এ আয়াত অবতীর্ণ হল, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা (পর্বতে) আরোহণ করলেন এবং আহবান জানালেন, হে বানী ফিহর! হে বানী আদী! কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রকে। অবশেষে তারা জমায়েত হল। যে নিজে আসতে পারল না, সে তার প্রতিনিধি পাঠাল, যাতে দেখতে পায়, ব্যাপার কী? সেখানে আবূ লাহাব ও কুরাইশগণও আসল। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বল তো, আমি যদি তোমাদের বলি যে, শত্রুসৈন্য উপত্যকায় চলে এসেছে, তারা তোমাদের উপর হঠাৎ আক্রমণ করতে প্রস্তুত, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে? তারা বলল, হাঁ আমরা আপনাকে সর্বদা সত্য পেয়েছি। তখন তিনি বললেন, ’’আমি তোমাদেরকে কঠিন শাস্তির ভয় প্রদর্শন করছি।’’ আবূ লাহাব [রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে] বলল, সারাদিন তোমার উপর ধ্বংস নামুক! এজন্যই কি তুমি আমাদের জমায়েত করেছ? তখন অবতীর্ণ হল, ’’ধ্বংস হোক আবূ লাহাবের হস্ত দু’টি এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও। তার ধন-সম্পদ ও তার অর্জন তার কোন উপকারে লাগেনি।’’ [১৩৯৪] (আধুনিক প্রকাশনীঃ , ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৪০৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
উপসংহার
অতএব, ‘হও’ বলে সৃষ্টি – এই বক্তব্যটি জগৎ সম্পর্কে কোনো যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয় না। বরং এটি ঈশ্বরবাদী কল্পনার একটি সরলীকৃত কাহিনি মাত্র, যা মানুষের ভাবপ্রবণতা ও অন্ধবিশ্বাসকে প্রাধান্য দিয়ে গঠিত। একটি গভীর ও বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বললে, এটি যুক্তি, প্রমাণ, প্রক্রিয়া এবং মধ্যবিন্দু সত্তার ধারণাগুলোর সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। আমাদের যদি সত্যিকার অর্থে মহাবিশ্বের সূচনা ও প্রকৃতির নিয়ম বুঝতে হয়, তাহলে ‘হও’ জাতীয় চটকদার ব্যাখ্যার পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, দার্শনিক নিরীক্ষা এবং কুসংস্কারমুক্ত চিন্তার পথেই এগোতে হবে। কারণ জ্ঞানার্জনের প্রকৃত পথ কোনো জাদুকরী মন্ত্রে নয়, বরং কঠোর যুক্তি, পরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণের মধ্যে নিহিত।
তথ্যসূত্রঃ
- সূরা আল ইমরান, আয়াত ৪৭ ↩︎
- সূরা বাকারা, আয়াত ১১৭ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০০ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৮ ↩︎
- সূরা আল-আরাফ ৭:৫৪ ↩︎
- The Intellectual Adventure of Ancient Man, H. Frankfort, 1946, pp. 64-66 ↩︎
- Genesis 1:3 ↩︎
- সর্বশক্তিমান আল্লাহর ছয়দিনে মহাবিশ্ব সৃষ্টি ↩︎
- কোরআন ৩:৫৯ ↩︎
- কোরআন ১৫:২৬, ৩২:৭ ↩︎
- ইসলামে আদমকে বানাবার গপ্পো ↩︎
- সহীহ বুখারী ৪৭৭০ ↩︎
- সূরা মাসাদ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৪৭৭০ ↩︎
