সর্বজ্ঞানী কলমঃ ইসলামে গায়েব জানা আল্লাহ কয়জন?

ভূমিকা

ইসলামী ধর্মতত্ত্বের সবচেয়ে মৌলিক দাবিগুলির অন্যতম হলো আল্লাহর একচ্ছত্র গায়েবজ্ঞান। এই দাবি অনুসারে, আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই অদৃশ্য বা ভবিষ্যতের জ্ঞান রাখে না। কোরআনের সূরা আন-নামল ২৭:৬৫-এ এটি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয়েছে: “বলো, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানে না।” এই আয়াত অনুসারে আল্লাহ একমাত্র সর্বজ্ঞানী সত্তা, যিনি অতীত, বর্তমান ও অনন্ত ভবিষ্যতের প্রতিটি ঘটনা সম্পূর্ণরূপে জানেন—কোনো সৃষ্টির সাহায্য বা মাধ্যম ছাড়াই।

কিন্তু একই ইসলামী গ্রন্থে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বর্ণনা বিদ্যমান। সুনান আত-তিরমিযী ৩৩১৯ (আলবানী অনুসারে সহিহ), সুনান আবু দাউদ ৪৭০০ এবং অন্যান্য সংকলনে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ প্রথমে একটি কলম সৃষ্টি করেন। তিনি কলমকে আদেশ দেন, “লেখো।” কলমটি অলৌকিকভাবে চেতনাপ্রাপ্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করে, “হে আমার প্রভু, আমি কী লিখব?” আল্লাহ উত্তর দেন, “যা ঘটেছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত যা ঘটবে, সব লিখে দাও।” কলম তৎক্ষণাৎ সবকিছু লিখে ফেলে। এই বর্ণনায় কলমকে একটি স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে এমন সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাকে ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ জ্ঞান রয়েছে কিংবা সেই জ্ঞান তাকে প্রদান করা হয়েছে।

যুক্তি ও দার্শনিক বিশ্লেষণের আলোকে এই দুটি বক্তব্যের মধ্যে গুরুতর অসঙ্গতি স্পষ্ট। একদিকে কোরআন দাবি করে যে গায়েবের জ্ঞান একান্তভাবে আল্লাহর, অন্যদিকে একটি সৃষ্ট কলমকে সেই একই জ্ঞানের পূর্ণ অধিকারী করা হয়েছে—যা মূল দাবিকে সরাসরি খণ্ডন করে। এছাড়া এই বিবরণ একজন সর্বজ্ঞানী ও সর্বশক্তিমান সত্তার জন্য বস্তুগত লেখনী ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে, যা ঈশ্বরের অ্যানথ্রোপোমরফিক (মানবীয়করণ) চিত্রায়ণের স্পষ্ট উদাহরণ। একটি অসীম জ্ঞানের অধিকারী সত্তার কেন কোনো কলম বা ফলকের প্রয়োজন হবে? লেখার উদ্দেশ্য তো স্মৃতিভ্রম রোধ করা বা ভুল সংশোধন—যা সর্বজ্ঞানীর সংজ্ঞার সাথে সাংঘর্ষিক।

আরও গভীর সমস্যা হলো মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি (free will) ও ন্যায়বিচারের ধারণা। যদি কলম দিয়ে সৃষ্টির শুরুতেই কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি মানুষের প্রতিটি কর্ম, সিদ্ধান্ত ও পরিণতি লিখে ফেলা হয়, তাহলে মানুষের কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত থাকে না—মানুষ কেবল একটি পূর্বনির্ধারিত স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করে, যা একটি স্বাধীন ও চিন্তাশীল সত্তা সেই কলম দ্বারা লিখিত ও নির্ধারিত। এমতাবস্থায় শেষ বিচারের দিনে তার কর্মের জন্য শাস্তি বা পুরস্কার দেওয়া যৌক্তিকভাবে অবিচার। এই দুটি ধারণা—পূর্বনির্ধারণ এবং মানুষের দায়বদ্ধতা—একসাথে সত্য হতে পারে না।

এই প্রবন্ধে আমরা কোনো ধর্মীয় অনুভূতি, প্রচলিত মতামত বা অন্ধবিশ্বাসের প্রভাব ছাড়াই, শুধুমাত্র বিশুদ্ধ যুক্তি, লজিক্যাল ফ্যালাসি বিশ্লেষণ, দার্শনিক পরীক্ষা এবং প্রামাণ্য সূত্রের ভিত্তিতে এই অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্য উন্মোচন করবো। উদ্দেশ্য একটিই—সত্যের অনুসন্ধান, যুক্তির আলোকে।


সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি এবং আল্লাহর নির্দেশ

কোরআনে খুব পরিষ্কারভাবেই বলা আছে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ অদৃশ্য বিষয় বা গায়েবের বিষয় জানে না [1]

বল,আকাশ ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা কেউই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না আল্লাহ ছাড়া,আর তারা জানে না কখন তাদেরকে জীবিত ক’রে উঠানো হবে।
— Taisirul Quran
বলঃ আল্লাহ ব্যতীত আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে কেহই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখেনা এবং তারা জানেনা তারা কখন পুনরুত্থিত হবে।
— Sheikh Mujibur Rahman
বল, ‘আল্লাহ ছাড়া আসমানসমূহে ও যমীনে যারা আছে তারা গায়েব জানে না।আর কখন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে তা তারা অনুভব করতে পারে না’।
— Rawai Al-bayan
বলুন, ‘আল্লাহ্‌ ব্যতীত আসমান ও যমীনে কেউই গায়েব জানে না [১] এবং তারা উপলব্ধিও করেনা কখন উত্থিত হবে [২]।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এবারে আসুন দেখে নিই, আল্লাহ সকল বিষয় কিতাবে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন [2]

পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের উপর এমন কোন মুসীবত আসে না যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখি না। এটা (করা) আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।
— Taisirul Quran
পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করার পূর্বেই তা লিপিবদ্ধ থাকে, আল্লাহর পক্ষে এটা খুবই সহজ।
— Sheikh Mujibur Rahman
যমীনে এবং তোমাদের নিজদের মধ্যে এমন কোন মুসীবত আপতিত হয় না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখি না। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে খুবই সহজ।
— Rawai Al-bayan
যমীনে বা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যে বিপর্যয়ই আসে তা সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই আমরা তা কিতাবে লিপিবদ্ধ রেখেছি [১]। নিশ্চয় আল্লাহর পক্ষে এটা খুব সহজ।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এবারে আসুন দেখি, ঐ কিতাবে কীভাবে আসলে সেগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়েছে তা দেখে নিই। হাদিসে বলা হয়েছে [3]

সূনান তিরমিজী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৫/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই।
২১৫৮. ইয়াহইয়া ইবন মূসা (রহঃ) ….. আবদুল ওয়াহিদ ইবন সালিম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার মক্কায় এলাম। সেখানে আতা ইবন আবু রাবাহ (রহঃ) এর সঙ্গে দেখা করলাম।তাঁকে বললামঃ হে আবূ মুহাম্মদ, বাসরাবাসরীরা তো তাকদীরের অস্বীকৃতিমূলক কথা বলে। তিনি বললেনঃ প্রিয় বৎস, তুমি কি কুরআন তিলাওয়াত কর? আমি বললামঃ হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ সূরা আয-যুখরুখ তিলাওয়াত কর তো। আমি তিলাওয়াত করলামঃ
হা-মীম, কসম সুস্পষ্ট কিতাবের, আমি তা অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় কুরআন রূপে, যাতে তোমরা বুঝতে পার। তা রয়েছে আমার কাছে উম্মূল কিতাবে, এ তো মহান, জ্ঞান গর্ভ (৪৩ঃ ১, ২, ৩, ৪)।
তিনি বললেনঃ উম্মূল কিতাব কি তা জান? আমি বললামঃ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ এ হল একটি মহাগ্রন্থ, আকাশ সৃষ্টিরও পূর্বে এবং যমীন সৃষ্টিরও পূর্বে আল্লাহ তাআলা তা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। এতে আছে ফির‘আওন জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত, এতে আছে তাব্বাত ইয়াদা আবী লাহাবীও ওয়া তাব্বা ‏(‏تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ‏) আবূ লাহাবের দুটি হাত ধ্বংস হয়েছে আর ধ্বংস হয়েছে সে নিজেও।
আতা (রহঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্যতম সাহাবী উবাদা ইবন সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পুত্র ওয়ালীদ (রহঃ)-এর সঙ্গে আমি সাক্ষাত করেছিলাম। তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলামঃ মৃত্যুর সময় তোমার পিতা কি ওয়াসীয়ত করেছিলেন?
তিনি বললেনঃ তিনি আমাকে কাছে ডাকলেন। বললেনঃ হে প্রিয় বৎস, আল্লাহকে ভয় করবে। যেনে রাখবে যতক্ষণ না আল্লাহর উপর ঈমান আনবে এবং তাকদীরের সব কিছুর ভাল-মন্দের উপর ঈমান আনবে ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি কখনো আল্লাহর ভয় অর্জন করতে পারবে না। তা ছাড়া অন্য কোন অবস্থায় যদি তোমার মৃত্যু হয় তবে জাহান্নামে দাখেল হতে হবে। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ আল্লাহ তাআলা সর্ব প্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। এরপর একে নির্দেশ দিলেন, লিখ, সে বললঃ কি লিখব? তিনি বললেনঃ যা হয়েছে এবং অনন্ত কাল পর্যন্ত যা হবে সব তাকদীর লিখ। সহীহ, সহিহহ ১৩৩, তাখরিজুত তহাবিয়া ২৩২, মিশকাত ৯৪, আযযিলাল ১০২, ১০৫, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ২১৫৫ (আল মাদানী প্রকাশনী)
(আবু ঈসা বলেন) এ হাদীসটি এ সূত্রে গারীব।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

তিরমিযী শরীফ বইটি থেকেও সরাসরি দেখে নিই [4]

তাকদীর বিষয়ক হাদিস তিরমীজী শরিফ
গায়েব

লিখে রাখার প্রয়োজনীয়তা: স্মৃতি, ভুল ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা

মানুষের ইতিহাসে “লিখে রাখা” একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। যেহেতু মানুষের স্মৃতি সীমিত, মানুষ সহজেই ভুলে যায়, তাই ভাষা আবিষ্কারের পর যখন জ্ঞান, আইন, ইতিহাস, ধর্মীয় নিয়ম, কিংবা চুক্তিপত্র সংরক্ষণের প্রয়োজন হলো, তখনই লেখা শুরু হয়। লিখে রাখার মূল উদ্দেশ্য হলো ভুলে না যাওয়া, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানানো এবং ভুল ব্যাখ্যা ঠেকানো। উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি সমাজে আইন কেবল মৌখিকভাবে প্রচারিত হতো, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কেউ না কেউ ভুলভাবে তা ব্যাখ্যা করত, কেউ হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে বদলাতে পারে। কিন্তু লিখিত আইন পরিবর্তন করা কঠিন, এবং এটি একটি নির্ভরযোগ্য দলিল হয়ে দাঁড়ায়। যেকোন সময়ে অন্য কেউ কোন কিছু নিয়ে প্রশ্ন তুললেই যেন সহজেই লিখা রাখা দলিল থেকে তা দেখিয়ে প্রমাণ করা যায়। তাই লিখে রাখা মানুষের জন্য জরুরি, কারণ মানুষ শুধুমাত্র একটি সীমাবদ্ধ প্রাণী। যার স্মৃতি নষ্ট হতে পারে, যে ভুলে যেতে পারে, যে ভুল করতে পারে। কিন্তু আল্লাহর তো এইসব সীমাবদ্ধতা নেই।

তাহলে আল্লাহর ক্ষেত্রে লিখা কেন? এখানে একটি গভীর প্রশ্ন দাঁড়ায়: যদি ইসলাম ধর্মমতে আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সর্বজ্ঞানী হন—যার কাছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবই সমানভাবে স্পষ্ট—তাহলে কেন তাকে ‘লাওহে মাহফুজ’-এ সব কিছু লিখে রাখতে হয়? কেন তাকে আদম সৃষ্টি করার আগেই “কলম” সৃষ্টি করে লিখিয়ে নিতে হয়? আরও প্রশ্ন আসে, সর্বজ্ঞ আল্লাহ কি নিজেই ভুলে যেতে পারেন? ভবিষ্যৎ মনে রাখার জন্যই এই “লিখিত সংরক্ষণ” প্রয়োজন ছিল? সর্বজ্ঞানী এবং সর্বশক্তিমান সত্তার লিখে রাখার তো কোন প্রয়োজন থাকার কথা না, কারণ তার তো মানবিক সীমাবদ্ধতা নেই। বা কাউকে জবাবদিহি করার প্রয়োজনও নেই।


কলম কী একটি চিন্তাশীল সচেতন সত্তা?

সহীহ মুসলিম এবং তিরমিযীর হাদিসে বর্ণিত,

“আল্লাহ প্রথমে কলম সৃষ্টি করেন। তিনি তাকে বলেন, লিখো। কলম বলল, আমি কী লিখব? আল্লাহ বলেন, যা কিছু কিয়ামত পর্যন্ত ঘটবে তা-ই লিখে নাও।” [5] [6]

প্রথমত, প্রশ্ন উঠে—‘কলম’ কী? এটি কি একটি সচেতন সত্তা, নাকি নিছক একটি জড় বস্তু? যদি এটি জড় বস্তু হয়, তবে সে কিভাবে কথা বলে? কিভাবে প্রশ্ন করে? আর যদি সে চিন্তাশীল, সিদ্ধান্তগ্রহণক্ষম সত্তা হয়—তবে সে কেবল একটি বস্তু নয়, বরং এক স্বাধীন সত্তা, যার রয়েছে ভাষা, বুদ্ধি, এবং জ্ঞান। তখন ইসলামি তাওহীদের ভিত্তিতেই ধাক্কা লাগে—এক আল্লাহর অধীনে আরেক জ্ঞানসত্তা যে গায়েব জানে?

ইসলামের মৌলিক আকীদা এইখানেই ভেঙে পড়ে। কারণ একটি জ্ঞানবান, স্বাধীন প্রতিক্রিয়াক্ষম সত্তা যদি গায়েব জেনে থাকে, ভবিষ্যতে কী কী হবে সব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানে, তাহলে তাকেও সংজ্ঞানুসারে আল্লাহ বলতে হয়। এখানে প্রশ্ন তৈরি হয়, আল্লাহ কী আরেকটি গায়েব জানা সত্তা বা আল্লাহ সৃষ্টি করতে সক্ষম?

গায়েব 2

গায়েবের জ্ঞানের শরীকানা কলমের?

কোরআনে খুব পরিষ্কারভাবেই বলা হয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর গায়েব, ভুত ভবিষ্যৎ সব একমাত্র আল্লাহই জানেন। এই আয়াত অনুসারে গায়েব একচেটিয়াভাবে আল্লাহর বিষয়। কিন্তু হাদিস অনুযায়ী, কলমও আল্লাহর সাথে সেই গায়েব জানে। কারণ হাদিসটি খেয়াল করে পড়ুন। আল্লাহকে সে জিজ্ঞেস করলো কী লিখবে। এরপরে আল্লাহর নির্দেশ ছিল ভবিষ্যতে যা হবে সব লিখো। এরপরে কলমটি সেগুলো লিখে ফেলে। এর অর্থ সেই কলমটিও ভবিষ্যতে কী হবে সেগুলো জানে। না জানলে লিখবে কীভাবে? এমন যদি হয় যে, আল্লাহ সেই সময়েই এক এক করে সেসব সরাসরি বলে দিয়ে থাকেন, তাহলেও সেইসব তথ্য কলম জানে—অর্থাৎ সে জানে ভবিষ্যৎ কী ঘটবে। এখানেই ইসলামি আকিদা ভেঙে পড়ে—কারণ যে গায়েব জানে, সেই আল্লাহ—এটাই ইসলামের একটি মৌলিক দাবী [7]

এ অবস্থায় কলম দুই অবস্থা সৃষ্টি করে:

  1. সে হয় ঈশ্বরের অংশবিশেষ (যা শিরক)
  2. অথবা ঈশ্বরের সমকক্ষ আরেক জ্ঞানসত্তা (যা দ্বৈতবাদ)

দুই অবস্থাতেই ইসলামের একেশ্বরবাদ বা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব তাত্ত্বিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ে। আসুন এবারে আর্গুমেন্টটি দেখে নিই,

প্রথম প্রেমিস (Premise): কোরআনের সুস্পষ্ট দাবি অনুযায়ী, আকাশ ও পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই গায়েব বা অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না [8]
দ্বিতীয় প্রেমিস (Premise): সহিহ হাদিসের বিবরণ অনুযায়ী, আল্লাহ সর্বপ্রথম ‘কলম’ সৃষ্টি করে তাকে কেয়ামত পর্যন্ত যা ঘটবে তার তাকদির লিখতে নির্দেশ দেন। তখন কলমটি প্রশ্ন করে, “আমি কী লিখব?” এবং আল্লাহর নির্দেশে সে সব ভবিষ্যৎ লিখে ফেলে [9]
যৌক্তিক উপসংহার (Logical Conclusion): যদি কলম ভবিষ্যৎ ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করে এবং আল্লাহর সাথে কথোপকথন করতে সক্ষম হয়, তবে কলম স্পষ্টতই একটি সচেতন সত্তা এবং সে ভবিষ্যৎ বা গায়েব সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত। সুতরাং, “কেবলমাত্র আল্লাহই গায়েব জানেন”—এই পরম দাবিটি যৌক্তিকভাবে বাতিল হয়ে যায়।
যৌক্তিক মূল্যায়ন (Logical Evaluation): প্রবন্ধের এই যুক্তিটি দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ বৈধ (Valid) এবং সুগঠিত (Sound)। এটি যুক্তিবিদ্যার ‘Law of Non-Contradiction’ অনুসরণ করে। একই সাথে “শুধুমাত্র ‘ক’ ভবিষ্যৎ জানে” এবং ” ‘ক’ এবং ‘খ’ উভয়েই ভবিষ্যৎ জানে”—এই দুটি বাক্য কখনোই একসাথে সত্য হতে পারে না। যুক্তির নিরিখে প্রবন্ধটির অবস্থান ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও স্পষ্ট।

ইসলামী আকীদাঃ স্রষ্টা এবং সৃষ্টি আলাদা

ইসলামী তাওহীদের মূল দাবি হলো, স্রষ্টা (আল্লাহ) এবং তাঁর সৃষ্টি সম্পূর্ণ পৃথক ও অভিন্ন নয়। কোরআনের সূরা আল-ইখলাস (১১২:১-৪)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: “বলো, তিনি আল্লাহ, এক, অদ্বিতীয়। তিনি না জন্ম দিয়েছেন, না জন্মগ্রহণ করেছেন। এবং কেউ তাঁর সমকক্ষ নয়।” এই তাওহীদের তৃতীয় শাখা—তাওহীদুল আসমা ওয়াস-সিফাত—আরও জোর দিয়ে বলে যে আল্লাহর নাম ও গুণাবলি (সিফাত) তাঁর সত্তার সাথে অবিচ্ছেদ্য, কিন্তু কোনো সৃষ্ট বস্তু বা সত্তা সেই সিফাত ধারণ করতে পারে না। সৃষ্টি আল্লাহর সত্তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, কোনো অংশ বা প্রকাশ নয়। এই দাবি ইসলামী আকীদার কেন্দ্রবিন্দু, যা কোনো ধরনের অভিন্নতা বা অংশীদারিত্বকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে।

হিন্দু ধর্ম বা সর্বপ্রাণবাদী দর্শনে (প্যানথেইজম) সৃষ্টি ও স্রষ্টা একাকার—ব্রহ্মই সবকিছু, সবকিছুই ব্রহ্মের অংশ বা প্রকাশ। অদ্বৈত বেদান্তে আত্মা ও ব্রহ্ম অভিন্ন। ইসলাম এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে দাবি করে যে সৃষ্টি কখনো স্রষ্টার অংশ বা সত্তার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে না। একইভাবে খ্রিস্টধর্মে যীশুকে ঈশ্বরের অবতার বা ত্রিত্বের অংশ (ইনকারনেশন) হিসেবে দেখা হয়, যেখানে ঈশ্বর মানবরূপ ধারণ করেন। ইসলামী তাওহীদ এই ধারণাকে শিরক বলে প্রত্যাখ্যান করে—আল্লাহর সত্তা কোনো সৃষ্টিতে প্রবেশ বা অবতীর্ণ হতে পারে না। এই পার্থক্যকে ইসলামী স্কলাররা ‘তানজিহ’ (ঈশ্বরকে সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ উর্ধ্বে রাখা) বলে ব্যাখ্যা করেন।

কিন্তু যখন এই নীতি কলমের (আল-কালাম) ধারণায় প্রয়োগ করা হয়, তখন স্পষ্ট অসঙ্গতি দেখা দেয়। হাদিস অনুসারে, আল্লাহ প্রথমে কলম সৃষ্টি করেন এবং কলম সব ভবিষ্যৎ লিখে ফেলে। এই বর্ণনায় কলমকে একটি স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে এমন সৃষ্ট সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাকে ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ জ্ঞান (গায়েব) প্রদান করা হয়েছে। অথচ কোরআন (সূরা নামল ২৭:৬৫) বলে, “আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানে না।”

ইসলামী আকীদা অনুসারে কলম একটি ‘মাখলুক’ (সৃষ্টি), আল্লাহর কোনো ‘সিফাত’ (গুণ) নয়। শুধুমাত্র কোরআনকে আল্লাহর অনন্ত বাণী হিসেবে অসৃষ্ট (uncreated) বলে গণ্য করা হয় সুন্নি অর্থোডক্সিতে। কোরআনকে ‘মাখলুক’ বলার কারণে খলিফা আল-মামুনের শাসনামলে (৮৩৩ খ্রি.) ‘মিহনা’ নামক ধর্মীয় দমনপীড়ন চালানো হয়। মু’তাজিলা মতবাদ অনুসারে কোরআন সৃষ্ট বলে দাবি করে আলেমদের জেল, চাবুক মারা এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এই নির্যাতন চলেছিল ৮৪৮ খ্রি. পর্যন্ত, যখন খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল এটি বাতিল করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ইসলামী আকীদায় কোনো সৃষ্টিকে আল্লাহর সিফাতের অংশ বলে মেনে নেওয়া কতটা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল—এমনকি রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে।

তাহলে যুক্তির দৃষ্টিতে সমস্যাটি স্পষ্ট: যদি কলম একটি সৃষ্টি হয় এবং আল্লাহর সত্তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়, তাহলে এর পক্ষে গায়েবের জ্ঞান ধারণ করা অসম্ভব। সৃষ্টির কোনো বৈশিষ্ট্য আল্লাহর সিফাতের অংশ হতে পারে না—এটাই তাওহীদের মূল দাবি। অথচ হাদিস কলমকে সেই জ্ঞান দিয়ে দেয়, যা কোরআন আল্লাহর জন্য একচ্ছত্রভাবে সংরক্ষিত রাখে। এই বৈপরীত্য ঢাকার কোনো যুক্তিগত ভিত্তি নেই; এটি শুধুমাত্র পরবর্তীকালীন স্কলারদের অ্যাড-হক ব্যাখ্যা (যেমন ‘প্রদত্ত জ্ঞান’ vs ‘নিজস্ব জ্ঞান’)। প্রমাণ ও যুক্তির বিচারে এটি একটি স্পেশাল প্লিডিং ফ্যালাসি—ধর্মগ্রন্থের সুস্পষ্ট দাবিকে রক্ষা করার জন্য নিয়মের ব্যতিক্রম তৈরি করা। কারণ সেই কলমকে যদি ভবিষ্যতে যা যা ঘটবে সব জ্ঞান দিয়েও দেয়া হয়, তাহলেও তো কলমটি সেই গায়েবী জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েই গেল। মানে একটি সৃষ্টি আল্লাহর একটি সিফাৎ বা বৈশিষ্ট্য অর্জন করে ফেললো।


প্রতীকী বা রূপক অর্থের সমস্যা

অনেক ইসলামি পণ্ডিত অনেক হাদিসকে প্রতীকী ভাষা বা রূপক হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই যুক্তি কি কেবল এই হাদিসের এই অংশটুকুর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য? আল্লাহর অস্তিত্ব, ইসলামের মৌলিক ভিত্তিগুলো, নামাজ রোজা হজ্ব যাকাত এমনকি পরকাল, সবই কী তাহলে আমরা রূপক অর্থে নিতে পারি না? তাহলে কেন মিরাজ, বুরাক, জান্নাতের হুর, কিংবা ফেরেশতা-শয়তানের অস্তিত্বকে আক্ষরিকভাবে বিশ্বাস করতে হয়? যদি এই হাদিস প্রতীক হয়, তাহলে একই সূত্র প্রযোজ্য হবে সকল অলৌকিক বিষয়ের ওপর। নাকি, ইসলামিস্টগণ শুধুমাত্র বিপদের দিনে এই যুক্তি দিয়ে ইসলামকে রক্ষা করতে চান?


তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইসলামী কাহিনীর প্রাচীন উৎসসমূহ

প্রাচীন ধর্মীয় কাহিনীগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মানুষের ভাগ্য বা নিয়তির ধারণা প্রায়শই একটি ‘লিখিত দলিল’ বা ‘বোনা সুতো’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, যা দেবতাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং মানুষের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে। ইসলামের ‘তাকদির’ (পূর্বনির্ধারিত নিয়তি), ‘লাওহে মাহফুজ’ (সংরক্ষিত ফলক) এবং প্রথম সৃষ্টি হিসেবে ‘কলম’-এর ধারণার সাথে এই প্রাচীন মিথলজিগুলোর সাদৃশ্য এতই প্রবল যে, একে অলৌকিক ঐশী জ্ঞান বলার কোনো যৌক্তিক অবকাশ থাকে না। বরং এটি স্পষ্টতই প্রাচীন মানব সভ্যতার মিথলজিক্যাল ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের (Cultural syncretism) সরাসরি ফসল। ইতিহাস ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের আলোকে নিচে কিছু প্রাচীন ধর্মের উদাহরণ দেওয়া হলো, যা প্রমাণিত ঐতিহাসিক টেক্সট থেকে সংগৃহীত:

মেসোপটেমিয়ান মিথলজি (ভাগ্যের ফলক): প্রাচীন মেসোপটেমীয় (সুমেরিয়ান এবং আক্কাদিয়ান) পুরাণে “ট্যাবলেট অব ডেসটিনিজ” (সুমেরিয়ান: dub namtarra; আক্কাদিয়ান: ṭup šīmātu) নামক একটি সিলিন্ডার সিল চিহ্নিত মাটির ফলকের কথা উল্লেখ আছে। ‘এনুমা এলিশ’ (Enuma Elish) মহাকাব্যে বর্ণিত আছে, দেবতা এনলিলের হাতে থাকা এই ফলকটি মহাবিশ্বের নিয়তি নির্ধারণ করে এবং যে এটি ধারণ করে, সে-ই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হয়। পরবর্তীতে এটি কিংগুর হাতে দেওয়া হয় এবং সেখান থেকে দেবতা মারডুক তা ছিনিয়ে নেন। এই ‘ভাগ্যের ফলক’-এর ধারণাই যে ইসলামী ‘লাওহে মাহফুজ’ বা সংরক্ষিত ট্যাবলেটের মূল আদি উৎস, তা ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে সহজেই অনুমেয়। এটি কোনো আসমানি ধারণা নয়, বরং প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার লিখিত আইন ব্যবস্থার ধর্মীয় রূপান্তর মাত্র।
মিশরীয় মিথলজি (দেবতা থোথ এবং ঐশী লিপিকার): প্রাচীন মিশরে ‘থোথ’ (Thoth) ছিলেন লেখা, জ্ঞান এবং চাঁদের দেবতা। তিনি হায়ারোগ্লিফিক্স আবিষ্কার করেন এবং দেবতাদের লিপিকার (Scribe) হিসেবে কাজ করতেন। মানুষের মৃত্যুর পর ‘হার্ট-ওয়েইং’ (Heart-weighing) বা পাপ-পুণ্য মাপার অনুষ্ঠানে তিনি মানুষের জীবনের সমস্ত কর্ম এবং দিন গণনা করে রেকর্ড রাখতেন। ইসলামী ধর্মে ‘কলম’ যেমন ভবিষ্যৎ লেখে এবং ফেরেশতারা যেমন পাপ-পুণ্য রেকর্ড করে, এটি প্রাচীন মিশরীয় সেই ঐশী লিপিকার ধারণারই অবিকল প্রতিফলন।
গ্রিক মিথলজি (ময়রাই বা ভাগ্যের দেবী): গ্রিক ধর্মে নিয়তি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ছিল ‘ময়রাই’ (Moirae বা Fates) নামক তিন দেবী—ক্লোথো (যিনি জীবনের সুতো কাটেন), ল্যাচেসিস (যিনি ভাগ্যের সুতো মাপেন) এবং অ্যাট্রোপোস (যিনি সুতো কেটে মৃত্যু নির্ধারণ করেন)। হেসিওডের ‘থিওগনি’ (Theogony) অনুসারে, এই নিয়তি এতটাই শক্তিশালী ও অপরিবর্তনীয় যে স্বয়ং দেবতারাও এর অধীন। মানুষের জীবনের এই পূর্বনির্ধারিত ছকের ধারণা ইসলামী কাদর বা অপরিবর্তনীয় নিয়তির সাথে গভীরভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
নর্স মিথলজি (নর্নস এবং বিশ্ববৃক্ষ): নর্স ধর্মে ‘নর্নস’ (Norns) নামক তিন দেবী—উর্দ (অতীত), ভার্দান্দি (বর্তমান) এবং স্কুলদ (ভবিষ্যৎ)—বিশ্ববৃক্ষ ‘ইগড্রাসিল’-এর নিচে বসে মানুষের ভাগ্যের সুতো বুনতেন। ‘ভোলুস্পা’ (Völuspá) কবিতায় দেখা যায়, তারা দেবতাদের ভাগ্যও নিয়ন্ত্রণ করেন। সুতো বুনে নিয়তি নির্ধারণ করার এই প্রাচীন ধারণা ইসলামী কলম দিয়ে নিয়তি লেখার ধারণারই সমান্তরাল একটি মিথ।
হিন্দু ধর্ম (ব্রহ্মার লিখন এবং কর্মফল): হিন্দু পুরাণসমূহে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা মানুষের ভবিষ্যৎ লিখে রাখেন বলে উল্লেখ আছে। তবে এখানে একটি বড় দার্শনিক পার্থক্য রয়েছে—এই লিখিত ভাগ্য মানুষের ‘কর্মফল’, ‘প্রায়শ্চিত্ত’ ও ‘সাধনা’র মাধ্যমে পরিবর্তনযোগ্য। অর্থাৎ, ‘কর্ম’, ‘ফল’ ও ‘পুনর্জন্ম’-এর মাধ্যমে সেখানে একটি ন্যায়সঙ্গত ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে। তাছাড়া, ব্রহ্মা হিন্দুধর্মে চূড়ান্ত বা সর্বশক্তিমান ঈশ্বর নন, তার ঊর্ধ্বে নিরাকার পরম ব্রহ্মের অবস্থান।

প্রাচীন মিথলজিতে ভাগ্য পরিবর্তনযোগ্য বা অন্তত দেবতাদের মধ্যে তা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ থাকলেও, ইসলামে “তাকদির” বা কাদর একটি একবারে লেখা, চূড়ান্ত এবং চরম অপরিবর্তনীয় ভাগ্যব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপিত [10]। মূলধারার ইসলামী আকিদা অনুসারে, এটি আল্লাহর নির্দেশে লাওহে মাহফুজে একবারই লিখিত হয়েছে এবং তা কোনোভাবেই বদলানো সম্ভব নয়।

এই অনড়, একরৈখিক নিয়তি শুধু ধর্মতাত্ত্বিক অসামঞ্জস্যই তৈরি করে না, বরং এক ভয়াবহ দার্শনিক শূন্যতা সৃষ্টি করে। যদি সবকিছু পূর্বলিখিত এবং অপরিবর্তনীয় স্ক্রিপ্ট অনুযায়ীই ঘটে, তবে মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক মর্যাদা বলে কিছু থাকে না। মানুষের পছন্দের (Choice) কোনো মূল্য না থাকলে, শেষ বিচারের দিনে তাকে শাস্তির সম্মুখীন করা যৌক্তিকভাবে চরম অবিচার। এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, ভাগ্য বা নিয়তির ইসলামী ধারণাটি কোনো নিখুঁত অলৌকিক সত্য নয়, বরং প্রাচীন মেসোপটেমীয় ও অন্যান্য মিথগুলোর একটি অপরিমার্জিত ও অনমনীয় অভিযোজন মাত্র, যা যুক্তি দিয়ে সহজেই খণ্ডনযোগ্য।


মানবীয় ঈশ্বর, স্বাধীন ইচ্ছা এবং ন্যায়বিচারের সংকট

কলম দিয়ে ভাগ্য লেখার ধারণাটি ঈশ্বরের মানবীয়করণ বা অ্যানথ্রোপোমরফিজম (Anthropomorphism)-এর একটি চরম উদাহরণ, যা ইসলামী ধর্মতত্ত্বে একটি বড় সমস্যা। প্রাচীনকালের রাজা-বাদশাহরা যেমন তাদের কেরানি বা লিপিকারদের দিয়ে রাজকীয় ফরমান, আইন বা ইতিহাস লিখিয়ে সংরক্ষণ করতেন, ঠিক তেমনি ইসলামী ধারণায় আল্লাহর কলম এবং লাওহে মাহফুজ ৭ম শতাব্দীর আরবীয় রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি মাত্র। এই অ্যানথ্রোপোমরফিজম ইসলামী ধর্মতত্ত্বে বিতর্কিত, কারণ কোরআনে আল্লাহকে হাত, মুখ, পা ইত্যাদি দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে [10], যা কিছু স্কলাররা আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেন এবং অন্যরা অপ্রত্যক্ষভাবে ব্যাখ্যা করেন। তবে যুক্তির দৃষ্টিতে, একজন সর্বজ্ঞানী (Omniscient) এবং সর্বশক্তিমান (Omnipotent) সত্তার কোনো তথ্য মনে রাখতে বা সংরক্ষণ করতে বস্তুগত খাতা-কলম বা ফলকের প্রয়োজন হওয়া অসম্ভব। লিখে রাখার মূল উদ্দেশ্যই হলো স্মৃতিভ্রম থেকে রক্ষা পাওয়া, প্রমাণ সংরক্ষণ করা বা ভুল এড়ানো—যা একজন ত্রুটিহীন, অসীম ক্ষমতাবান ঈশ্বরের সংজ্ঞার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। যদি আল্লাহ সত্যিই সর্বজ্ঞানী হন, তাহলে কেন একটি সৃষ্ট ফলকের উপর নির্ভর করবেন?

সর্বোপরি, এই কলম যদি মহাবিশ্ব সৃষ্টির শুরুতেই কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মানুষের পুঙ্খানুপুঙ্খ কাজ, পাপ-পুণ্য, সিদ্ধান্ত এবং পরিণতি লিখে ফেলে, তাহলে মানুষের ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ বা ফ্রি উইল (Free Will) একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ধারণায় পরিণত হয়। কোরআনে একদিকে ফ্রি উইলের ইঙ্গিত আছে, যেমন সূরা আল-কাহফ ১৮:২৯-এ: “যে চায় সে বিশ্বাস করুক, যে চায় সে অবিশ্বাস করুক”। কিন্তু অন্যদিকে প্রিডেস্টিনেশনের দাবি, যেমন সূরা আল-ইনসান ৭৬:৩০-এ: “তোমরা চাইবে না যতক্ষণ না আল্লাহ চান”। এই দুটি ধারণা যুক্তিগতভাবে সাংঘর্ষিক, কারণ যদি সবকিছু পূর্বনির্ধারিত হয়, তাহলে মানুষের সিদ্ধান্তগুলো কেবলমাত্র একটি পূর্বলিখিত স্ক্রিপ্টের অংশ মাত্র, যেখানে তারা পুতুলের মতো কাজ করে। এমতাবস্থায়, নিজের কাজের জন্য শেষ বিচারের দিনে শাস্তি বা পুরস্কার দেওয়া যৌক্তিকভাবে চরম অবিচার। এটি ইসলামী ধারণায় আল্লাহর ন্যায়বিচারকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং প্রমাণ করে যে পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য (কাদর) এবং পরকালীন জবাবদিহিতা (আখিরাত) একসাথে সত্য হতে পারে না, যেমনটি কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে দেখা যায় (যেমন সূরা আল-হাদিদ ৫৭:২২-এ পূর্বনির্ধারিত ঘটনার উল্লেখ)। এই সংকটকে সমাধানের চেষ্টায় স্কলাররা বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেন, কিন্তু যুক্তির দৃষ্টিতে এগুলো অসঙ্গতিপূর্ণ।


উপসংহার: ইসলামি ঈশ্বরতত্ত্বের অন্তঃসারশূন্যতা

কলম, গায়েবের জ্ঞান, পূর্বনির্ধারণ (কাদর) এবং স্বাধীন ইচ্ছা (free will) সংক্রান্ত কোরআন ও হাদিসের বর্ণনাগুলো ইসলামী ধর্মতত্ত্বের মূল ভিত্তিগুলো—যেমন একেশ্বরবাদ (তাওহীদ), ঈশ্বরের সর্বজ্ঞতা এবং মানুষের নৈতিক দায়বদ্ধতা—কে যৌক্তিকভাবে খণ্ডন করে। কোরআনের স্পষ্ট দাবি যে গায়েব শুধুমাত্র আল্লাহ জানেন (সূরা আন-নামল ২৭:৬৫), কিন্তু হাদিসে একটি সৃষ্ট কলমকে ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ জ্ঞান প্রদান করা হয় (তিরমিজী ৩৩১৯, মুসলিম ২৬৫৩), যা লজিকের non-contradiction নীতির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই অসঙ্গতি শুধুমাত্র ধর্মীয় টেক্সটের অভ্যন্তরীণ ত্রুটি নয়, বরং প্রমাণ করে যে এই ধারণাগুলো ৭ম শতাব্দীর আরব সমাজের মানবীয় কল্পনা এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব থেকে উদ্ভূত, কোনো অতিপ্রাকৃত উৎস থেকে নয়।

পূর্বনির্ধারণ এবং স্বাধীন ইচ্ছার মধ্যে সংকট আরও গভীর। যদি সবকিছু পূর্বলিখিত হয় (কোরআন ৫৭:২২), তাহলে মানুষের সিদ্ধান্তগুলো কোনো সত্যিকারের স্বাধীনতা নয়, বরং একটি ইল্যুশন মাত্র। এটি ইসলামী ন্যায়বিচারের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, কারণ পূর্বনির্ধারিত কর্মের জন্য শাস্তি দেওয়া যৌক্তিকভাবে অবিচার। দার্শনিকভাবে এটি “problem of free will and determinism” এর সাথে মিলে যায়, যা ইসলামী স্কলাররা (যেমন আভিসেনা, গাজালি, ইবন আরাবি) কম্প্রোমাইজ করে সমাধানের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু যুক্তির দৃষ্টিতে এগুলো অসঙ্গতিপূর্ণ। ইমাম গাজ্জালি তার গ্রন্থে নিজেই এটি স্বীকার করেছেন যে, বিশুদ্ধ দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা দিয়ে ইসলামের এই বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, তাই এসব বিষয়ের ওপর যুক্তি, ব্যাখ্যা ও প্রমাণ ছাড়াই ঈমান আনতে হবে। কোনো বৈজ্ঞানিক বা যৌক্তিক প্রমাণ নেই যে পূর্বনির্ধারণ বাস্তব; এটি মানবীয় সামাজিক নিয়ন্ত্রণের একটি টুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা ঐতিহাসিকভাবে অন্যান্য ধর্মে (যেমন খ্রিস্টান ক্যালভিনিজম) দেখা যায়।

কলমের ধারণা ঈশ্বরের মানবীয়করণ (anthropomorphism) প্রমাণ করে, যা তাওহীদের সাথে সাংঘর্ষিক। স্রষ্টা এবং সৃষ্টির পার্থক্য দাবি করা হয় (সূরা আল-ইখলাস ১১২:১-৪), কিন্তু কলমকে গায়েবের জ্ঞান দিয়ে সেই পার্থক্য ভেঙে পড়ে। এটি স্পেশাল প্লিডিং ফ্যালাসির উদাহরণ, যেখানে নিয়ম থেকে ব্যতিক্রম তৈরি করা হয় কোনো প্রমাণ ছাড়াই। অ্যাকাডেমিক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে এই অসঙ্গতিগুলো ইসলামী চিন্তায় সেক্টারিয়ান বিভাজন সৃষ্টি করেছে (যেমন কাদারাইটস vs জাবারাইটস), যা প্রমাণ করে যে এগুলো মানবীয় বিতর্ক থেকে উদ্ভূত, না অতিপ্রাকৃত সত্য থেকে।

যারা এই অসঙ্গতিগুলোকে “মানুষের জ্ঞানের বাইরে” বলে এড়িয়ে যান, তারা শুধুমাত্র একটি কপ-আউট ব্যবহার করেন, যা যুক্তির দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য। এটি অন্ধবিশ্বাসকে প্রোমোট করে, কিন্তু কোনো প্রমাণ দিয়ে সমর্থন করে না। বাস্তবে, এই ধারণাগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক বা যৌক্তিক প্রমাণ নেই; এগুলো ঐতিহাসিক টেক্সট, যা মানবীয় ত্রুটি এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবে পূর্ণ। যুক্তির আলোকে, এই অন্তঃসারশূন্যতা প্রমাণ করে যে ইসলামী ধর্মতত্ত্ব মানবীয় কল্পনার উপজাত, যা যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করা যায়।



তথ্যসূত্রঃ
  1. কোরআন ২৭ঃ৬৫ ↩︎
  2. কোরআন ৫৭ঃ২২ ↩︎
  3. সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২১৫৮ ↩︎
  4. সহীহ আত-তিরমিযী, ৪র্থ খণ্ড, তাহক্বীকঃ মোহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী, হোসেইন আল মাদানী প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২৫০-২৫২ ↩︎
  5. Sahih Muslim 2653 ↩︎
  6. Jami at-Tirmidhi 3319 ↩︎
  7. Al-Ghazali, Tahafut al-Falasifa ↩︎
  8. কোরআন ২৭:৬৫ ↩︎
  9. সুনান আত-তিরমিযী ২১৫৫ ↩︎
  10. ইসলামের অন্যতম ভিত্তি তাকদীর প্রসঙ্গে 1 2