ইসলামে কি আসলেই অন্য উপাস্যদের গালি দেয়া নিষেধ?

ভূমিকাঃ অন্য উপাস্যদের গালি দেয়া হারাম?

ইসলামী প্রচারণায় প্রায়শই দাবি করা হয় যে, কোরআনের একটি বিশেষ আয়াত [1] অন্য ধর্মের উপাস্যদের গালি দিতে নিষেধ করে ইসলামের পরমতসহিষ্ণুতা ও উদার নৈতিকতার পরিচয় দেয়। আধুনিক মুসলিম দাঈগণ এই আয়াতটিকে ইসলামের ‘অসাম্প্রদায়িক’ চেতনার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেও, ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে আড়াল করে করা এই দাবিটি একটি খণ্ডিত সত্য ও একপাক্ষিক প্রোপাগান্ডা মাত্র। ইসলামের প্রাথমিক উৎসসমূহ এবং নির্ভরযোগ্য তাফসীর গ্রন্থগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই নিষেধাজ্ঞাটি কোনো শাশ্বত নৈতিকতা বা অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে আসেনি; বরং এটি ছিল মক্কার তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে মুহাম্মদের একপ্রকার কৌশলগত পশ্চাদপসরণ।

ইসলামের ইতিহাসের প্রাথমিক পর্যায়ে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা মক্কার কুরাইশদের দেবদেবীকে অবমাননা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন [2]। কিন্তু যখন মক্কার মুশরিকরা পাল্টা হুঁশিয়ারি দিল যে, দেবদেবীর অবমাননা বন্ধ না হলে তারাও মুহাম্মদের আল্লাহকে প্রকাশ্যে গালি দেবে, তখনই পরিস্থিতির চাপে এই আয়াতটি নাজিল হয়। অর্থাৎ, এটি অন্য ধর্মের প্রতি উদারতা নয়, বরং নিজ উপাস্য বা ‘আল্লাহ’কে গালিগালাজ থেকে রক্ষা করার একটি আত্মরক্ষামূলক কৌশল ছিল মাত্র। এই নিবন্ধে আমরা বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করব কীভাবে মক্কায় সংখ্যালঘিষ্ঠ থাকাকালীন মুহাম্মদ এই কৌশল গ্রহণ করেছিলেন এবং মদিনায় নিরঙ্কুশ ক্ষমতা লাভের পর কীভাবে তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ সেই ‘সহিষ্ণুতার’ খোলস ছেড়ে মূর্তি ও মন্দির ধ্বংসের নেশায় মত্ত হয়েছিলেন [3] [4]। এই আলোচনার মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হবে যে, কথিত এই সহিষ্ণুতা ছিল কেবল সাময়িক দুর্বলতার ফসল, যা পরবর্তীকালে ইসলামী শাসনের শক্তি বিস্তারের সাথে সাথে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়।


প্রেক্ষাপটঃ আল্লাহকে গালি দেয়া থেকে রক্ষা

ইসলামের প্রচারকরা প্রায়ই সূরা আন’আমের ১০৮ নম্বর আয়াতটি উদ্ধৃত করে দাবি করেন যে, ইসলাম অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপাস্যদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। আয়াতটিতে বলা হয়েছে, “তোমরা তাদের (অন্য ধর্মাবলম্বীদের) মিথ্যা উপাস্যদের গালি দিয়ো না, যাতে তারা সীমালঙ্ঘন করে অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালি না দেয়।” বাহ্যিকভাবে এটি সহিষ্ণুতার বাণী মনে হলেও, এর পেছনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল মূলত পরিস্থিতির চাপে নেওয়া একটি আত্মরক্ষামূলক সিদ্ধান্ত।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে মক্কায় থাকাকালীন মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা নিয়মিতভাবে কুরাইশদের দেবদেবীকে গালিগালাজ করতেন, তাদের উপাস্যদের ‘জাহান্নামের ইন্ধন’ বলে অভিহিত করতেন এবং মূর্তিপূজাকে চরমভাবে বিদ্রূপ ও অবমাননা করতেন [5] [6]। মুহাম্মদের এই উস্কানিমূলক আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে মক্কার পৌত্তলিকরা শেষ পর্যন্ত কঠোর অবস্থান নেয়। তারা সাফ জানিয়ে দেয় যে, মুহাম্মদ যদি তাদের দেবতাদের অপমান করা বন্ধ না করেন, তবে তারাও এর প্রতিশোধ হিসেবে মুহাম্মদের উপাস্য ‘আল্লাহ’কে গালি দেবে এবং গালমন্দ করবে।

এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে মুহাম্মদ উপলব্ধি করেন যে, তাঁর ক্রমাগত অবমাননার ফলে কুরাইশরা পাল্টা আঘাত করলে তাঁর নিজের আল্লাহর সম্মান আর অবশিষ্ট থাকবে না। নিজের উপাস্যকে অবমাননার হাত থেকে বাঁচাতে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিতেই তিনি কৌশলগতভাবে এই আয়াতটি নিয়ে আসেন, যেখানে মুসলিমদের সাময়িকভাবে অন্যের উপাস্যদের গালি দিতে নিষেধ করা হয় [7]। সুতরাং, এই নিষেধাজ্ঞাটি কোনো নৈতিক উদারতা বা ধর্মীয় সম্প্রীতির কারণে নয়, বরং মক্কায় মুসলিমরা তখন সংখ্যালঘু ও দুর্বল ছিল বলেই এই ‘যুদ্ধবিরতি’ বা কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল।


তাফসীরে মাযহারীঃ আল্লাহ ও তার রসুলকে গালমন্দ থেকে রক্ষা

আসুন সেই প্রেক্ষাপটটি জেনে নিই শায়খুল মুফাসসিরীন, ফক্বীহুল উম্মত আল্লামা ছানাউল্লাহ পানীপথীর তাফসীরে মাযহারী থেকে [8]

হজরত ইবনে আব্বাস থেকে বাগবী বর্ণনা করেছেন, যখন এই আয়াত “ইন্নাকুম ওয়ামা তা’বুদুনা মিন্দুনিল্লাহি হাসবু জাহান্নাম’ (নিশ্চয় তোমরা এবং আল্লাহকে ছেড়ে তোমরা যাদের উপাসনা করো— সকলে জাহান্নামের ইন্ধন) অবতীর্ণ হলো, তখন মুশরিকেরা বললো, হে মোহাম্মদ! আমাদের প্রভু প্রতিমাগুলোর দোষ বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকো। নইলে আমরাও তোমার প্রভুর দোষ বর্ণনা করবো। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে এই আয়াতটি। আয়াতের প্রথমেই বলা হয়েছে—‘আল্লাহকে ছেড়ে যাদেরকে তারা ডাকে তাদেরকে তোমরা গালি দিও না। কেননা, তারা সীমালংঘন করে অজ্ঞানতাবশতঃ আল্লাহকেও গালি দিবে।’
আল্লামা সুদ্দী বর্ণনা করেছেন, মৃত্যুর প্রাক্কালে আবু তালেবের নিকট উপস্থিত হলো কুরায়েশ নেতৃবৃন্দ। বললো, আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রকে আমাদের সঙ্গে বিবাদ করতে নিষেধ করে দিন। ভাবতে লজ্জা হয়, আপনার মৃত্যুর পর আমরা যদি মোহাম্মদকে হত্যা করি তবে লোকে বলবে তার চাচাই তাকে নিরাপদে রাখতো। এখন চাচা নেই বলে কাপুরুষেরা তাকে হত্যা করেছে। ওই নেতাদের দলে ছিলো আবু সুফিয়ান, আবু জেহেল, নজর বিন হারেস, উমাইয়া বিন খাল্‌ফ, উবাই বিন খাল্‌ফ, উকবা বিন আবী মুয়ীত, আমর ইবনে আস এবং আসওয়াদ বিন আবুল বুখতারী। তারা আরো বললো, আপনি আমাদের প্রিয় নেতা। কিন্তু মোহাম্মদ আমাদেরকে ও আমাদের পূজনীয় প্রতিমাগুলোকে কষ্ট দিচ্ছে। যদি আপনি পছন্দ করেন, তবে মোহাম্মদকে এ কাজ থেকে বিরত রাখুন। সে যেনো আমাদের দেবদেবীর বিরুদ্ধে কিছু না বলে। আমরাও তার আল্লাহ্ সম্পর্কে কিছু বলবো না ।
আবু তালেব রসুল স. কে ডেকে বললেন, তোমার সম্প্রদায়ের লোকদের ইচ্ছা— তুমি আমাদের ও আমাদের প্রভুদের সম্পর্কে আপত্তিকর কিছু বলবে না। আমরাও তোমার প্রভু সম্পর্কে কোনো অন্যায় মন্তব্য করবো না। আর এরা তো ন্যায্য কথাই বলছে। সুতরাং প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্র আমার! তুমি এদের কথা মেনে নাও।
রসুল স. বললেন, তোমরা শুধু আমার একটি কথা মেনে নাও। মানলে তোমরা লাভ করবে সমগ্র আরবের কর্তৃত্ব। অনারবেরাও হয়ে যাবে তোমাদের নেতৃত্বের অধীন।। আবু জেহেল বললো, তোমার পিতার কসম! এরূপ একটি কথা কেনো দশটি কথা মানতে আমরা রাজী। রসুল স. বললেন, তোমরা কেবল বলো ‘লা
ইলাহা ইল্লাল্লহ্’। কিন্তু কুরায়েশ নেতারা এই পবিত্র কলেমা উচ্চারণ করতে অস্বীকৃত হলো এবং তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করলো সেখান থেকে। আবু তালেব বললেন, বৎস! তুমি এছাড়া অন্য কথা বলো— যা তারা মানতে পারে । রসুল স. বললেন, আমার এক হাতে সূর্য এনে দিলেও আমি এ কথা বলা থেকে বিরত
তাফসীরে মাযহারী/২৭৯

থাকবো না। কুরায়েশ নেতারা নতুন করে প্রস্তাব দিলো, তুমি আমাদের প্রতিমাগুলোকে গালমন্দ করা থেকে বিরত থাকো। না হলে আমরা তোমাকে ও তোমার নির্দেশদাতাকে গালি দিবো। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হলো— আল্লাহকে ছেড়ে যাদেরকে তারা ডাকে, তাদেরকে তোমরা গালি দিও না, কেননা, তারা সীমালংঘন করে অজ্ঞানতাবশতঃ আল্লাহকেও গালি দিবে।
এই আয়াতে প্রকাশ্যতঃ অংশীবাদীদের দেবদেবীদেরকে মন্দ বলতে নিষেধ করা হয়েছে। এ রকম নির্দেশ দেয়া হয়েছে কেবল আল্লাহ্ ও তাঁর রসুলকে গালমন্দ থেকে রক্ষা করার জন্য। কারণ অজ্ঞ ও অবাধ্যরা এতে করে আল্লাহ্ ও তাঁর রসুলকে গালাগাল করবে। আয়াতের বর্ণনাদৃষ্টে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, চূড়ান্ত পর্যায়ের অবাধ্যদেরকে পরিত্যাগ করা অত্যাবশ্যক। তাদেরকে কিছু না বলাই উত্তম। সত্য মিথ্যার ন্যূনতমবোধও তাদের নেই ।
তাফসীরে মাযহারী/২৮০

গালি
গালি 1

তাফসীরে ইবনে কাসীরঃ “উপকার থাকা সত্ত্বেও” অন্য উপাস্যদের গালি দেয়া থেকে বিরত থাকা

এবারে এই আয়াতের তাফসীর দেখে নিই ইবনে কাসীরের তাফসীর থেকে [9] । ইবনে কাসীরের তাফসির থেকেও যা জানা যায় তা হচ্ছে, মুসলিমরাই আগে পৌত্তলিকদের প্রতিমাগুলোকে গালাগালি শুরু করে। তখন বাধ্য হয়ে পৌত্তলিক কোরাইশরা মুহাম্মদের চাচা আবু তালিবের কাছে বিচার দেয়, এবং তাদের দেবদেবীকে গালি দিতে নিষেধ করে। সেই সাথে এটিও হুমকি দেয়, মুহাম্মদ তাদের দেবদেবীকে গালি দিলে তারাও মুহাম্মদের আল্লাহকে গালি দিবে। তখন নিতান্তই বাধ্য হয়ে, তাফসীরের ভাষ্য অনুসারে “উপকার থাকা সত্ত্বেও” কাফেরদের প্রতিমাগুলোকে গালি দেয়া থেকে বিরত থাকার আয়াত নাজিল হয়, যেহেতু সেই সময়ে মুসলিমরা সংখ্যালঘু ছিল!

গালি 3
গালি 5

উপাস্যদের সমালোচক মুহাম্মদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ

সূরা আনআ’ম (৬:১০৮) এবং সূরা কাফিরুনের (১০৯:৬) মতো ‘সহিষ্ণু’ বলে প্রচারিত আয়াতগুলোর গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এগুলো মুহাম্মদের কোনো আধ্যাত্মিক উদারতা বা নৈতিক উচ্চমন্যতার পরিচয় দেয় না। বরং এগুলো ছিল মক্কার প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপের ফলাফল। মুহাম্মদের প্রধান লক্ষ্য ছিল কুরাইশদের হাত থেকে নিজের উপাস্য ‘আল্লাহ’র সম্মান রক্ষা করা, অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নয়।

যদি মুহাম্মদের মনে সত্যিই অন্য ধর্মের উপাস্যদের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ থাকত, তবে তিনি নবুয়তের শুরু থেকেই মক্কার দেবদেবীকে ‘জাহান্নামের জ্বালানি’ বলা বা তাদের তুচ্ছজ্ঞান করা থেকে বিরত থাকতেন [10]। কিন্তু তিনি তা করেননি। যখন মক্কার পৌত্তলিকরা তাঁর এই ক্রমাগত অবমাননায় অতিষ্ঠ হয়ে পাল্টা আল্লাহর কুৎসা রটানোর হুমকি দিল, তখনই মুহাম্মদ উপলব্ধি করেন যে—এই মুহূর্তে আক্রমণ চালিয়ে যাওয়া তাঁর নিজের ধর্মের জন্য মানহানিকর হতে পারে। অর্থাৎ, এই তথাকথিত সহিষ্ণুতা ছিল মূলত একটি ‘কৌশলগত পিছু হঠা’ বা ট্যাকটিক্যাল রিট্রিট। মুহাম্মদের এই নির্দেশের উদ্দেশ্য ছিল কেবল মক্কার পৌত্তলিকদের ক্ষোভ প্রশমিত করা, যাতে তারা পাল্টা তাঁর আল্লাহকে গালি না দেয়।

এই দাবির সত্যতা আরও জোরালো হয় যখন আমরা মদিনার হিজরত-পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি। যখন মুসলিমরা আর সংখ্যালঘু ছিল না এবং তাদের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছিল, তখন মুহাম্মদের উপস্থিতিতেই তাঁর প্রধান সহচর আবু বকর মক্কার উপাস্য লাত দেবীকে নিয়ে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও অশালীন গালাগালি করেন [3]। মুহাম্মদ তখন তাঁকে থামাননি বা সূরা আনআ’মের সেই ‘সহিষ্ণুতার নীতি’ স্মরণ করিয়ে দেননি। বরং তাঁর নীরব সম্মতি প্রমাণ করে যে, মক্কার সেই নিষেধাজ্ঞা ছিল কেবল সাময়িক ও পরিস্থিতিগত দুর্বলতার ফল। যখনই পাল্টা আঘাতের ভয় চলে গিয়েছে, তখনই সেই ‘সহিষ্ণুতা’র আড়াল ভেঙে ইসলামের আসল রূপটি সামনে এসেছে—যা অন্য ধর্মের অস্তিত্ব ও সম্মানের প্রতি চরমভাবে অসহিষ্ণু।


লাত দেবীকে নিয়ে আবু বকরের অশ্রাব্য গালাগালি

আসুন সেই বিষয়টি এবারে পড়ে নেয়া যাক। নিচের হাদিস পড়ুন, যেই হাদিসটির সময়কাল হচ্ছে মক্কা থেকে হিজরতের পরে। অর্থাৎ সূরা আনআ’ম এর ওই আয়াতটি নাজিলের অনেক পরের ঘটনা। হাদিস থেকে জানা যায়, নবী মুহাম্মদের সম্মুখেই আবু বকর কাফেরদের দেবদেবী নিয়ে অত্যন্ত অশালীন এবং কুরুচিপূর্ণ গালাগালি করতেন। নবীরও সেখানে নিরব সম্মতি ছিল, নইলে নবী আবু বকরকে তখনই থামাতেন। ফাতহুল বারী গ্রন্থের লেখক ইবনু হাজার আসকালানি এই হাদিসের ব্যাখ্যাতে বলেন, নবী সেই সময়ে আবু বকরের এই কাজে নিরব সম্মতি জানিয়েছিলেন [11]। এই হাদিসটি অত্যন্ত দীর্ঘ বিধায় কিছু অংশ এখানে দেয়া হচ্ছে, আগ্রহী পাঠকগণ বাদবাকি অংশ মূল বই থেকে পড়ে নিতে পারেন। কাফেরদের সাথে যত শত্রুতাই থাকুক না কেন, যত যুদ্ধই হোক না কেন, কাফেরদের দেবদেবী বা ধর্ম নিয়ে এরকম অবমাননাকর, নোংরা এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য কোন সভ্য মানুষ কীভাবে বলতে পারে? [12] [13]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৬/ শর্তাবলী
পরিচ্ছেদঃ ১৭০১. যুদ্ধরত কাফিরদের সাথে জিহাদ ও সন্ধির ব্যাপারে শর্তারোপ এবং লোকদের সাথে কৃত মৌখিক শর্ত লিপিবদ্ধ করা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ২৫৪৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৭৩১ – ২৭৩৩
২৫৪৭। …
তখন আবূ বকর (রাঃ) তাকে বললেন, তুমি লাত দেবীর লজ্জাস্থান চেটে খাও। আমরা কি তাঁকে ছেড়ে পালিয়ে যাব?

হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মারওয়ান ইবনু হাকাম (রহঃ)

গালি 7

ক্ষমতা পাওয়ার পর মুহাম্মদের অবস্থান

প্রাথমিক অবস্থায়, যখন মুহাম্মদ এবং তার অনুসারীরা মক্কায় দুর্বল অবস্থানে ছিলেন, তখন তিনি কৌশলগতভাবে সহিষ্ণুতার বার্তা দিয়েছেন। কিন্তু যখন তিনি মক্কা বিজয় করেন এবং তাঁর হাতে পূর্ণ ক্ষমতা আসে, তখন তাঁর অবস্থান সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। সহিষ্ণুতা ও সম্মান প্রদর্শনের সেই মিথ্যা আড়াল মুহূর্তেই ভেঙে যায়। তিনি মক্কার সমস্ত মূর্তি ও দেবদেবীর মন্দির ধ্বংস করেন এবং সেইসব ধর্মীয় উপাস্যদের প্রতি কোনো সম্মান দেখাননি। তার আদেশে মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলা হয় এবং উপাস্য মন্দিরগুলোকে ধ্বংস করে ইসলামের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এতে পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান হয় যে, প্রাথমিক অবস্থায় এই আয়াতটি ছিল শুধুমাত্র কৌশলগত এক পদক্ষেপ, যা মূলত শক্তি অর্জনের পরপরই বাতিল হয়ে যায়।

মক্কাবিজয়ের পরে অর্থাৎ ক্ষমতাপ্রাপ্ত হওয়ার পরে মুহাম্মদ দলবল পাঠিয়ে কোন পূর্ব শত্রুতা ছাড়াই অসংখ্য দেবদেবীর মুর্তি এবং উপাসনালয় ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছেন, এরকম উদাহরণ অনেকগুলোই আছে। আসুন আর-রাহীকুল মাখতূম থেকে পড়ি, সেখানে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে সৈন্য পাঠিয়ে নবী মূর্তি, উপাসনালয় এবং সেই সব মূর্তির পুজা কারী মানুষদের সমূলে নিশ্চিহ্ন করতেন। এমনকি মহিলাদেরও বাদ দিতেন না। অবস্থা এমন খারাপ হয়েছিল যে, নবী নিজেই খালিদ বিন ওয়ালিদের ওপর এত হত্যাকাণ্ড দেখে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। তাহলে অন্য উপাস্যদের গালি দেয়া যাবে না, এরকম কথা কতটুকু অর্থবহন করে? যারা বলেন, অন্য উপাস্যদের ইসলামে গালি দিতে নিষেধ করা হয়েছে, তারা কী বলতে চান, গালি দেয়া নিষেধ তবে সেইসব মূর্তি ভাঙ্গা জায়েজ? [14]

বিভিন্ন অভিযান ও প্রতিনিধি প্রেরণ (السَّرَايَا وَالْبُعُوْثِ):
১. মক্কা বিজয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কাজকর্ম সুসম্পন্ন করার পর যখন তিনি কিছুটা অবকাশ লাভ করলেন তখন ৮ম হিজরীর ২৫ রমযান উযযা নামক দেব মূর্তি বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে একটি ছোট সৈন্যদল প্রেরণ করলেন। উযযা মূর্তির মন্দিরটি ছিল নাখলা নামক স্থানে। এটি ভেঙ্গে ফেলে খালিদ (রাঃ) প্রত্যাবর্তন করলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন,‏ (‏هَلْ رَأَيْتَ شَيْئًا‏؟‏‏)‏‘তুমি কি কিছু দেখেছিলে?’ খালিদ (রাঃ) বললেন, ‘না’ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, ‏(‏فَإِنَّكَ لَمْ تَهْدِمْهَا فَارْجِعْ إِلَيْهَا فَاهْدِمْهَا‏)‏ ‘তাহলে প্রকৃতপক্ষে তুমি তা ভাঙ্গ নি। পুনরায় যাও এবং তা ভেঙ্গে দাও।’ উত্তেজিত খালিদ (রাঃ) কোষমুক্ত তরবারি হস্তে পনুরায় সেখানে গমন করলেন। এবারে বিক্ষিপ্ত ও বিস্ত্রস্ত চুলবিশিষ্ট এক মহিলা তাঁদের দিকে বের হয়ে এল। মন্দির প্রহরী তাকে চিৎকার করে ডাকতে লাগল। কিন্তু এমন সময় খালিদ (রাঃ) তরবারি দ্বারা তাকে এতই জোরে আঘাত করলেন যে, তার দেহ দ্বিখন্ডিত হয়ে গেল। এরপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে তিনি এ সংবাদ অবগত করালে তিনি বললেন, ‏(‏نَعَمْ، تِلْكَ الْعُزّٰى، وَقَدْ أَيِسَتْ أَنْ تَعْبُدَ فِيْ بِلَادِكُمْ أَبَدًا‏) ‘হ্যাঁ’, সেটাই ছিল উযযা। এখন তোমাদের দেশে তার পূজা অর্চনার ব্যাপারে সে নিরাশ হয়ে পড়েছে (অর্থাৎ কোন দিন তার আর পূজা অর্চনা হবে না)।
২. এরপর নাবী কারীম (সাঃ) সে মাসেই ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ)-কে ‘সুওয়া’ নামক দেবমূর্তি ভাঙ্গার জন্য প্রেরণ করেন। এ মূর্তিটি ছিল মক্কা হতে তিন মাইল দূরত্বে ‘রিহাত’ নামক স্থানে বনু হুযাইলের একটি দেবমূর্তি। ‘আমর যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছেন তখন প্রহরী জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা কী চাও?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর নাবী (সাঃ) এ মূর্তি ভেঙ্গে ফেলার জন্য আমাদের নির্দেশ প্রদান করেছেন।’
সে বলল, ‘তোমরা এ মূর্তি ভেঙ্গে ফেলতে পারবে না।’
‘আমর (রাঃ) বললেন, ‘কেন?’
সে বলল, ‘প্রাকৃতিক নিয়মেই তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হবে।’
‘আমর (রাঃ) বললেন, ‘তোমরা এখনও বাতিলের উপর রয়েছ? তোমাদের উপর দুঃখ, এই মূর্তিটি কি দেখে কিংবা শোনে?’
অতঃপর
মূর্তিটির নিকট গিয়ে তিনি তা ভেঙ্গে ফেললেন এবং সঙ্গীসাথীদের নির্দেশ প্রদান করলেন ধন ভান্ডার গৃহটি ভেঙ্গে ফেলতে। কিন্তু ধন-ভান্ডার থেকে কিছুই পাওয়া গেল না। অতঃপর তিনি প্রহরীকে বললেন, ‘বল, কেমন হল?’
সে বলল, ‘আল্লাহর দ্বীন ইসলাম আমি গ্রহণ করলাম।’
৩. এ মাসেই সা‘দ বিন যায়দ আশহালী (রাঃ)-এর নেতৃত্বে বিশ জন ঘোড়সওয়ার সৈন্য প্রেরণ করেন মানাত দেবমূর্তি ধ্বংসের উদ্দেশ্যে। কুদাইদের নিকট মুশাল্লাল নামক স্থানে আওস, খাযরাজ, গাসসান এবং অন্যান্য গোত্রের উপাস্য ছিল এ ‘মানত’ মূর্তি। সা‘দ (রাঃ)-এর বাহিনী যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছেন তখন মন্দিরের প্রহরী বলল, ‘তোমরা কী চাও?’
তাঁরা বললেন,
‘মানাত দেবমূর্তি ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে আমরা এখানে এসেছি।’
সে বলল, ‘তোমরা জান এবং তোমাদের কার্য জানে।’
সা‘দ মানাত মূর্তির দিকে অগ্রসর হতে গিয়ে
একজন উলঙ্গ কালো ও বিক্ষিপ্ত চুল বিশিষ্ট মহিলাকে বেরিয়ে আসতে দেখতে পেলেন। সে আপন বক্ষদেশ চাপড়াতে চাপড়াতে হায়! রব উচ্চারণ করছিল।
প্রহরী তাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘মানাত! তুমি এ অবাধ্যদের ধ্বংস কর।’
কিন্তু
এমন সময় সা‘দ তরবারির আঘাতে তাকে হত্যা করলেন। অতঃপর মূর্তিটি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিলেন। ধন-ভান্ডারে ধন-দৌলত কিছুই পাওয়া যায় নি।
৪. উযযা নামক দেবমূর্তিটি ভেঙ্গে ফেলার পর খালিদ বিন ওয়ালীদ (সাঃ) প্রত্যাবর্তন করলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ৮ম হিজরী শাওয়াল মাসেই বনু জাযামাহ গোত্রের নিকট তাঁকে প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল আক্রমণ না করে ইসলাম প্রচার। খালিদ (রাঃ) মুহাজির, আনসার এবং বনু সুলাইম গোত্রের সাড়ে তিনশ লোকজনসহ বনু জাযীমাহর নিকট গিয়ে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। তারা (ইসলাম গ্রহণ করেছি) বলার পরিবর্তে (আমরা স্বধর্ম ত্যাগ করেছি, আমরা স্বধর্ম ত্যাগ করেছি) বলল। এ কারণে খালিদ (রাঃ) তাদের হত্যা এবং বন্দী করতে আদেশ দিলেন। তিনি সঙ্গী সাথীদের এক একজনের হস্তে এক এক জন বন্দীকে সমর্পণ করলেন। অতঃপর এ বলে নির্দেশ প্রদান করলেন যে, ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তাঁর নিকটে সমর্পিত বন্দীকে হত্যা করবে। কিন্তু ইবনু উমার এবং তাঁর সঙ্গীগণ এ নির্দেশ পালনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলেন। অতঃপর যখন নাবী কারীম (সাঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলেন তখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলেন। তিনি দু’ হাত উত্তোলন করে দু’বার বললেন, ‏(‏اللهم إِنِّيْ أَبْرَأُ إِلَيْكَ مِمَّا صَنَعَ خَالِدًا) ‘হে আল্লাহ! খালিদ যা করেছে আমি তা হতে তোমার নিকটে নিজেকে পবিত্র বলে ঘোষণা করছি।’(1)
এ পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র বনু সুলাইম গোত্রের লোকজনই নিজ বন্দীদের হত্যা করেছিল। আনসার ও মহাজিরীনগণ হত্যা করেন নি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আলী (রাঃ)-কে প্রেরণ করে তাদের নিহত ব্যক্তিদের শোণিত খেসারত এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান করেন। এ ব্যাপারটিকে কেন্দ্র করে খালিদ (রাঃ) ও আব্দুর রহমান বিন আওফ (রাঃ)-এর মাঝে কিছু উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় এবং সম্পর্কের অবণতি হয়েছিল। এ সংবাদ অবগত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন,
‏(‏مَهَلًّا يَا خَالِدُ، دَعْ عَنْكَ أَصْحَابِيْ، فَوَاللهِ لَوْ كَانَ أَحَدٌ ذَهَبًا، ثُمَّ أَنْفَقَتْهُ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ مَا أَدْرَكَتْ غُدْوَةَ رَجُلٍ مِّنْ أَصْحَابِيْ وَلَا رَوْحَتَهُ‏)‏‏
‘খালিদ থেমে যাও, আমার সহচরদের কিছু বলা হতে বিরত থাক। আল্লাহর কসম! যদি উহুদ পাহাড় সোনা হয়ে যায় এবং তার সমস্তই তোমরা আল্লাহর পথে খরচ করে দাও তবুও আমার সাহাবাদের মধ্য হতে কোন এক জনেরও এক সকাল কিংবা এক সন্ধ্যার ইবাদতের নেকী অর্জন করতে পারবে না।(2)

নবীর মূর্তি ধংস
নবীর বর্বরতা

শুধু এইটুকুতেই শেষ নয়। আলীর প্রতি এবং পরবর্তীদের প্রতি নবীর নির্দেশও আমরা দেখে নিই [15]

সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১০/ কাফন-দাফন
পরিচ্ছেদঃ কবর সমান করে দেওয়া।
১০৪৯. মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার (রহঃ) ….. আবূ ওয়াইল (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু আবূল- হায়্যাজ আল-আসা’দী (রহঃ) কে বলেছিলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে যে দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন, আমি তোমাকেও সেই দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করছি। তা হলো, কোন উঁচু কবরকে (মাটি) সমান করা ব্যতীত ছাড়বেনা, আর কোন প্রতিকৃতি বিধ্বংস করা ব্যতীত ছাড়বে না। – আল আহকাম ২০৭, ইরওয়া ৭৫৯, তাহযীরুস সাজিদ ১৩০, মুসলিম, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ১০৪৯ [আল মাদানী প্রকাশনী]
এই বিষয়ে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও হাদীস বর্ণিত রয়েছে। ইমাম আবূ ঈসা (রহঃ) বলেন, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসটি হাসান। কোন কোন আলিম এতদনুসারে আমল করেছেন। তারা যমীনের উপর কবর উচূঁ করে বাঁধা অপছন্দনীয় বলে মনে করেন। ইমাম শাফিঈ (রহঃ) বলেন, যতটুকু উঁচু করলে এটিকে কবর বলে চিনা যায় তদপেক্ষা কবরকে উঁচু করা আমি পছন্দ করি না। তবে চি‎হ্নস্বরূপ কিছু উঁচু করার দরকার এই জন্য যে, এটিকে যেন কেউ পদদলিত না করে বা এর উপর যেন কেউ না বসে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ ওয়াইল (রহঃ)

এবারে আসুন তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে আরও কিছু মূর্তি ও উপাসনালয় ভাঙচুরের ঘটনাবলী পড়ে নেয়া যাক, [16]

ইবন ইসহাক (র) তাঁর সীরাত গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন যে, আরববাসীরা কা’বার পাশাপাশি আরো কতগুলি তীর্থ স্থান বানাইয়া লইয়াছিল। সেইগুলিকে তাহারা গিলাফ দ্বারা ঢাকিয়া রাখিত, কা’বার ন্যায় সম্মান করিত; তথায় কুরবানীর পশু প্রেরণ করিত উহার নিকট পশু যবাহ করিত এবং কা’বার ন্যায় সেইগুলি তাওয়াফ করা হইত। অথচ তাহারা কা’বার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা স্বীকার করিত এবং উহাকে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর নির্মিত মসজিদ বলিয়া সম্মান ও শ্রদ্ধা করিত। ইবন ইসহাক (র) আরো বলেন যে, কুরাইশ ও বনূ কিনানাহ নাখলায় অবস্থিত উয্যার পূজারী ছিল। কবীলা আলীমের শাখা গোত্র বন্ শারবান উহার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করিত। মক্কা বিজয়ের পর এই মূর্তিটি ভাঙ্গিয়া ফেলার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) হযরত খালিদ ইব্‌ন ওলীদ (রা)-কে প্রেরণ করিয়াছিলেন। খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা) মূর্তিটি ভাঙ্গিয়া চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিয়া বলিতেছিলেন : انی رایت اللَّهَ قَدَاهَائِكَ অর্থাৎ ওহে উযযা! আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করি না- তোমাকে অস্বীকার করি। আমার বিশ্বাস আল্লাহ্ তোমাকে লাঞ্ছিত করিয়াছেন। يا عزى كَفَرَأَنَّكَ سُبْحَانَكَ
ইমাম নাসায়ী (র)……. আবূ তুফায়ল (রা) হইতে বর্ণনা করেন। আবূ তুফায়ল (রা) বলেন, মক্কা বিজয়ের পর উযযার অবসান ঘটাইবার জন্য রাসূল (সা) হযরত খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা)-কে নাখলায় প্রেরণ করেন। তিনটি বাবুল বৃক্ষের উপর এই মূর্তিটি স্থাপন করা হইয়াছিল। হযরত খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা) বৃক্ষগুলি কাটিয়া ফেলিলেন এবং ঘরটি মাটির সহিত মিশাইয়া দেন। অতঃপর নবী করীম (সা)-এর নিকট ফিরিয়া আসিয়া সংবাদ দেন। রাসূল (সা) শুনিয়া বলিলেন, “তুমি আবার যাও। কারণ আসল কাজ তুমি এখনও করিতে পার নাই।” অগত্যা খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা) পুনরায় নাখলায় পৌছান। নাখলায় পৌছিবার পর তথাকার প্রহরীরা খালিদ ইবন ওয়ালীদকে দেখিয়া ইয়া উয্যা! ইয়া উয্যা! বলিয়া তাকবীর ধ্বনি দিয়া উঠিল। খালিদ ইন্ন ওয়ালীদ (রা) আরো নিকটে আসিয়া দেখিতে পাইলেন যে, এক উলঙ্গ রমণী এলোমেলো রুক্ষ চুল মাথায় ধুলা মাখিতেছে। দেখিয়াই খালিদ ইবন ওয়ালীদ (রা) তরবারীর এক আঘাতে তাহাকে দ্বিখণ্ডিত করিয়া ফেলিলেন। অতঃপর ফিরিয়া আসিয়া রাসূল (সা)-কে সংবাদ শুনাইলেন। শুনিয়া রাসূল (সা) বলিলেন, উহাই উয্যা।”
ইন্ন ইসহাক (র) বলেন, ছাকীফ গোত্রের মূর্তির নাম ছিল লাত। তায়েফে ছিল উহার অবস্থান। বন্ মুআত্তেব উহার রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখাশুনা করিত। উহার অবসান ঘটাইবার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) মুগীরা ইব্‌ন শু’বা ও আবু সুফিয়ান ছাত্র ইবন হারব (রা)-কে প্রেরণ করেন। ইহারা দুইজন তায়েফ গিয়া মূর্তিটি ভাঙ্গিয়া মাটির সহিত মিশাইয়া দিয়া তথায় একটি মসজিদ স্থাপন করেন।

মানাত আউস্ খাযরাজ এবং তাহাদের সমমনা লোকদের উপাস্য ছিল। মুশাল্লাল যাওয়ার পথে সমুদ্রের তীরে কুদাইদ নামক স্থানে ছিল ইহার অবস্থান। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশে আবু সুফিয়ান (রা) এই মূর্তিটিও ভাঙ্গিয়া টুকরা টুকরা করিয়া ফেলেন। কাহারে। কাহারো ধারণা যে, হযরত আলী (রা)-এর হাতে এই স্থানটি ধ্বংস হয়। যুলখালছাহ নামক স্থানটি ছিল দাউস, খাছআম ও বাজীলা গোত্রের দেবতালয়। ইবন কাসীর (র) বলেন, তাবাকায় অবস্থিত এই স্থানটিকে ইহারা ইয়ামানী কা’বা নামে আখ্যায়িত করিত। আর মক্কার কা’বাকে বলিত শামী কা’বা। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নির্দেশে জারীর ইব্‌ন আব্দুল্লাহ বাজালী (রা)-এর হাতে এই স্থানটি ধ্বংস প্রাপ্ত হয়।
কাল্স নামক বুতখানাটি ছিল কবীলা তাই ও উহার পার্শ্ববর্তী আরবীদের। তাই পাহাড়ে সালমা ও সাজা স্থানের মাঝে ছিল ইহার অবস্থান। ইন্ন হিশাম বলেন? রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশে হযরত আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) এই স্থানটি ধ্বংস করেন। এবং তথা হইতে রসূল মহাররম নামক দুইটি তরবারী উদ্ধার করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এই তরবারী দুইটি হযরত আলী (রা)-কে দান করেন।
ইন্ন ইসহাক (র) বলেন: ছানআয় অবস্থিত রিয়াম নামক বুতখানাটি ছিল হিমইয়ার গোত্র ও ইয়ামানবাসীর তীর্থ স্থান। কথিত আছে যে, তথায় একটি কালো কুকুর ছিল। তুব্বার সহিত আগত দুইজন হিমইয়ারী সর্দার কুকুরটিকে হত্যা করে এবং মূর্তিখানা ধ্বংস করিয়া ফেলে।
ইবন ইসহাক (র) বলেন: বনূ রবীয়া ইন্ন কা’ব ইবন সা’দ এর তীর্থস্থান ছিল রিযা নামক স্থান। মুস্তাওগির ইন্ন রবীয়া ইবন সা’দ ইসলাম গ্রহণের পর এই স্থানটি ধ্বংস করিয়া ফেলেন। ইবন হিশাম (র) বলেন, উল্লেখ্য যে, এই লোকটি তিনশত তিরিশ বছর বাঁচিয়া ছিলেন। 1

গালি 11
গালি 13

ধর্মীয় বিধানের যৌক্তিক অসঙ্গতি ও বৈপরীত্য

ইসলামিক দাবি ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার মধ্যে এক গভীর যৌক্তিক বৈপরীত্য বিদ্যমান। যদি অন্য ধর্মের উপাস্যদের অবমাননা না করার নীতিটি কোনো সর্বজনীন নৈতিকতা বা উচ্চতর আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতো, তবে মুহাম্মদের ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে সেই নীতির পরিবর্তন ঘটতো না। সত্য এবং নৈতিকতা কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার মুখাপেক্ষী নয়। কিন্তু মুহাম্মদের আচরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মক্কায় সংখ্যালঘু থাকাকালীন তাঁর যে ‘সহিষ্ণুতা’ প্রকাশ পেয়েছিল, মক্কা বিজয়ের পর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা লাভ করতেই তা চরম অসহিষ্ণুতায় রূপ নেয়।

যে মুহাম্মদ মক্কায় ‘অন্যের উপাস্যকে গালি দিয়ো না’ বলে নীতি প্রচার করেছিলেন, মক্কা বিজয়ের পর সেই মুহাম্মদই অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে কুরাইশদের শতাব্দী প্রাচীন দেবদেবীর মূর্তি ও মন্দির ধ্বংসের নির্দেশ দেন [4]। তিনি খালিদ বিন ওয়ালিদকে পাঠিয়ে উযযা মূর্তি ও তার মন্দির ধ্বংস করেন এবং এমনকি সেখানে উপস্থিত এক নারীকে হত্যার ঘটনাতেও তাঁর সমর্থন ছিল [17]। এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে, পূর্বের ‘সহিষ্ণুতা’ ছিল কেবল প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার একটি ছদ্মবেশ। যদি অন্যের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রকৃতই থাকতো, তবে তিনি মন্দিরগুলোকে ধ্বংস না করে সেগুলোর অস্তিত্ব বজায় রাখার অনুমতি দিতেন। ক্ষমতার শীর্ষে থাকাকালীন মুহাম্মদের এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড তাঁর পূর্বতন তথাকথিত ‘সহিষ্ণুতা’র দাবির যৌক্তিক ভিত্তিকে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে দেয়।


আল্লাহ ও নবীর সম্মান রক্ষাঃ ধর্মীয় স্বার্থরক্ষার কৌশল

মুহাম্মদের প্রাথমিক নির্দেশনাগুলো বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সেগুলো কোনো নৈতিক আদর্শ নয় বরং ‘কৌশলগত সুবিধাবাদ’ (Strategic Opportunism)-এর ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছিল। যখন মুসলমানরা দুর্বল ছিল, তখন অন্যের দেবদেবীকে গালি দেওয়া বন্ধ করা হয়েছিল কেবল নিজেদের উপাস্য ‘আল্লাহ’কে পাল্টা গালাগালি থেকে রক্ষা করার জন্য। এটি ছিল একটি রাজনৈতিক কৌশল, যার উদ্দেশ্য ছিল মুহাম্মদের নবপ্রতিষ্ঠিত ধর্মের মানহানি রোধ করা এবং কুরাইশদের সাথে সরাসরি সংঘাত এড়ানো, যা সেই সময়ে মুসলিমদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে পারতো [2]

পরবর্তীতে যখন মুসলিম বাহিনী সমরশক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠে, তখন আর এই ‘নিষেধাজ্ঞা’র প্রয়োজন থাকেনি। হিজরত-পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদের উপস্থিতিতেই আবু বকরের মতো শীর্ষস্থানীয় সাহাবীর অশালীন গালাগালি এবং মুহাম্মদের নীরবতা প্রমাণ করে যে, অন্যের ধর্মকে শ্রদ্ধা করা কখনোই ইসলামের উদ্দেশ্য ছিল না [3]। বরং শক্তি অর্জনের পর অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপাস্যদের অস্তিত্ব চিরতরে বিলীন করে দেওয়াই ছিল মূল লক্ষ্য। সুতরাং, ইসলামের ‘সহিষ্ণুতার বাণী’ আসলে পরিস্থিতির চাপে নেওয়া একটি অস্থায়ী রণকৌশল মাত্র, যা কেবল মুসলিমদের স্বার্থরক্ষার জন্যই প্রণীত হয়েছিল।


উপসংহার

পরিশেষে, সূরা আনআ’মের ১০৮ নম্বর আয়াতটি ইসলামের সহিষ্ণুতা বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কোনো উজ্জ্বল উদাহরণ নয়, বরং এটি ক্ষমতা ও কৌশলের এক জটিল রসায়ন। আয়াতের প্রেক্ষাপট এবং পরবর্তী ঐতিহাসিক ঘটনাবলী প্রমাণ করে যে, এটি ছিল পরিস্থিতির চাপে আত্মসমর্পণমূলক এক সিদ্ধান্ত। মুহাম্মদের এই নীতি ততক্ষণ পর্যন্ত কার্যকর ছিল, যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলিমরা সংখ্যায় অল্প এবং শক্তিতে দুর্বল ছিল। ক্ষমতা লাভের পর মুহাম্মদের নির্দেশে গণহারে মূর্তি ও মন্দির ধ্বংস করার যে চিত্র সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থে পাওয়া যায়, তা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট যে ইসলামে ‘পরমতসহিষ্ণুতা’ বিষয়টি কেবল তাত্ত্বিক প্রচারণা এবং কৌশলগত ধোঁকাবাজি মাত্র। অন্য উপাস্যদের গালি না দেওয়ার নির্দেশটি ছিল মূলত নিজ উপাস্যের সম্মান রক্ষার বর্ম, যা ক্ষমতার দাপটে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সুতরাং, এই ঘটনাটিকে ইসলামের সহিষ্ণুতার প্রমাণ হিসেবে পেশ করা ঐতিহাসিক সত্যের অপলাপ এবং একপাক্ষিক মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। নিচের ডায়াগ্রামটি দিয়ে আসুন পুরো বিষয়টি সহজভাবে বুঝি,

ইসলামি সহিষ্ণুতার বিবর্তন: রণকৌশল বনাম বাস্তবতা
🛡️ প্রাথমিক পর্যায় (মক্কা)
  • অবস্থান: সংখ্যালঘু ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল।
  • আচরণ: মূর্তিপূজারীদের প্রতি তীব্র অবমাননা ও বিদ্রূপ।
  • সংকট: কুরাইশদের পাল্টা হুমকির মুখে আল্লাহর সম্মান বিপন্ন।
  • কৌশল: সূরা আনআ’ম ১০৮ নাজিল (গালি দেওয়া নিষিদ্ধ)।
⚔️ চূড়ান্ত পর্যায় (বিজয়)
  • অবস্থান: নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব।
  • আচরণ: আবু বকরের অশালীন গালাগালিতে নবীর মৌন সম্মতি।
  • পদক্ষেপ: উযযা, মানাত ও লাতসহ সকল মন্দির ও মূর্তি সমূলে ধ্বংস।
  • বাস্তবতা: শক্তি অর্জনের পর ‘সহিষ্ণুতা’র প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়া।
যৌক্তিক সিদ্ধান্ত
কোরআনের তথাকথিত ‘সহিষ্ণুতা’ কোনো শাশ্বত নৈতিকতা নয়; এটি ছিল মক্কায় নিজের উপাস্যকে রক্ষা করার একটি সাময়িক কৌশলগত বর্ম, যা ক্ষমতা লাভের পর ছুড়ে ফেলা হয়েছে।

তথ্যসূত্রঃ
  1. সূরা আনআ’ম, আয়াত ১০৮ ↩︎
  2. তাফসীরে মাযহারী, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৮-২৮০ 1 2
  3. সহীহ বুখারী, হাদিসঃ ২৫৪৭ 1 2 3
  4. আর-রাহীকুল মাখতূম, পৃষ্ঠা ৪৬৬-৪৬৭ 1 2
  5. তাফসীরে মাযহারী, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৮, ২৭৯ ↩︎
  6. ধর্ম অবমাননা, সাম্প্রদায়িকতা এবং মূর্তি ভাঙ্গার সুন্নত  ↩︎
  7. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৬৬-৮৬৭ ↩︎
  8. তাফসীরে মাযহারী, হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া প্রকাশনী, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৮, ২৭৯, ২৮০ ↩︎
  9. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৬৬, ৮৬৭ ↩︎
  10. তাফসীরে মাযহারী, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৯ ↩︎
  11. Fath Al Bari 5/340 ↩︎
  12. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৫৪৭ ↩︎
  13. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৪, হাদিসঃ ২৫৪৭ ↩︎
  14. আর-রাহীকুল মাখতূম, আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহঃ), তাওহীদ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা ৪৬৬, ৪৬৭ ↩︎
  15. সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), হাদিস নম্বরঃ ১০৪৯ ↩︎
  16. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ১০ম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৫২৬, ৫২৭ ↩︎
  17. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫২৬ ↩︎