
Table of Contents
- 1 ভূমিকাঃ সামরিক আগ্রাসনের লক্ষ্য হিসেবে হিন্দুস্থান
- 2 হারিস ইবনে কালাদাঃ গ্রিক-ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে আরবের নির্ভরশীলতা
- 3 হিন্দুস্থানের চন্দনকাঠঃ আরবে ভারতীয় পণ্যের প্রভাব
- 4 গাজওয়ায়ে হিন্দঃ জান্নাতের প্রতিশ্রুতি ও সামরিক উস্কানি
- 5 সমসাময়িক প্রেক্ষাপটঃ ‘গাজওয়ায়ে হিন্দ’ ও ধর্মীয় উগ্রবাদ
- 6 উপসংহারঃ সভ্যতার সংঘাত নাকি শান্তির ভবিষ্যৎ নির্মান?
ভূমিকাঃ সামরিক আগ্রাসনের লক্ষ্য হিসেবে হিন্দুস্থান
প্রাচীন আরব উপদ্বীপে ইসলামি সাম্রাজ্যের উদ্ভবের আগে থেকেই ভারতের সাথে আরবের একটি নিবিড় বাণিজ্যিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক যোগাযোগ বিদ্যমান ছিল। মক্কার কুরাইশরা এবং তৎকালীন আরবরা ভারতকে দেখত একটি উন্নত সভ্যতা, সমৃদ্ধ অর্থনীতি এবং উচ্চতর চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে। নবম হিজরির পর যখন ইসলামি শক্তি আরবের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃতির পরিকল্পনা করে, তখন এই শান্তিপূর্ণ এবং অ-উস্কানিমূলক ভূখণ্ডটি ইসলামের যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। ঐতিহাসিকভাবে লক্ষ্য করা যায় যে, নবী মুহাম্মদ তার অনুসারীদের মধ্যে ভারতের সম্পদ ও সমৃদ্ধি সম্পর্কে কেবল একটি ইতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন না, বরং তিনি সুদূরপ্রসারী এক সামরিক পরিকল্পনার বীজ বপন করেছিলেন যা ‘গাজওয়ায়ে হিন্দ’ বা ‘হিন্দুস্থানের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো হারিস ইবনে কালাদার মতো আরবের প্রথিতযশা চিকিৎসকদের ভারতমুখী শিক্ষা এবং নবী মুহাম্মদের নির্দেশিত ‘গাজওয়ায়ে হিন্দ’-এর হাদিসগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা। এর মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হবে যে, ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সম্পদের প্রতি আরবের মানুষের গভীর আগ্রহকে শেষ পর্যন্ত একটি আগ্রাসী যুদ্ধের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছিল, যেখানে ভারত থেকে কোনো উস্কানি না থাকা সত্ত্বেও পরকালীন জান্নাতের প্রলোভন দেখিয়ে একটি স্বাধীন জনপদকে আক্রমণের উস্কানি দেওয়া হয়েছিল।
হারিস ইবনে কালাদাঃ গ্রিক-ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে আরবের নির্ভরশীলতা
নবম হিজরির প্রাক্কালে আরবে যে চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, তার একটি বড় অংশ ছিল ভারত ও গ্রিসের জ্ঞাননির্ভর। মক্কার সাক্বীফ গোত্রের প্রথিতযশা চিকিৎসক হারিস ইবনে কালাদা আল-সাক্বাফী ছিলেন এই ধারার সার্থক প্রতিনিধি। তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চতর জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে পারস্যের গুন্দেশাপুরে (জুনদিশাপুর) গমন করেছিলেন, যা তৎকালীন সময়ে ভারতীয় ও গ্রিক চিকিৎসাবিদ্যার একটি সমৃদ্ধ মিলনস্থল ছিল। আসুন উনার সম্পর্কে একটি ফতোয়া দেখি, [1]।
২১৯৯. প্রশ্ন
আমি একজন আলেমকে স্বাস্থ্য রক্ষার গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে নিম্নোক্ত হাদীসটি বলতে শুনেছি।
المعدة بيت الداء، والحمية رأس الدواء، وأعط كل بدن ما عودته
(অর্থাৎ) উদর হল সর্বরোগের কেন্দ্র। আর খাদ্য-সংযম সর্বরোগের মহৌষধ। দেহকে তা-ই দাও, যাতে তাকে অভ্যস্ত করেছ। জানার বিষয় হল, এটি কি হাদীস। হাদীস হলে তা কোন কিতাবে আছে? জানিয়ে উপকৃত করবেন।
উত্তর
প্রশ্নোক্ত কথাটি কোথাও হাদীস হিসেবে উল্লেখেতি হলেও হাদীস বিশারদগণ বলেছেন, এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস হিসেবে প্রমাণিত নয়; বরং তাআরবের প্রসিদ্ধ চিকিৎসক হারিস ইবনে কালদাহ-এর উক্তি।
অতএব তা হাদীস হিসেবে বর্ণনা করা যাবে না।
-আলমাকাসিদুল হাসানাহ পৃ. ৬১১; কাশফুল খাফা ২/৯৩; আদ্দুরারুল মুনতাছিরাহ ১৬৮; আল লাআলিল মানসুরাহ ১৪৫; আলফাওয়াইদুল মাজমূআহ ১৬৬; যাদুল মাসীর ৩/১৮৮; রুহুল মাআনী ৫/১১০; তাফসীরে কুরতুবী ৭/১৯২
হারিসের এই ভারতমুখী শিক্ষা সফর প্রমাণ করে যে, তৎকালীন মক্কার অভিজাত সমাজ জানত ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার উৎকর্ষতা সম্পর্কে। এমনকি নবীর আমলের বিভিন্ন বর্ণনায় দেখা যায়, মুহাম্মদ স্বয়ং হারিস ইবনে কালাদাকে একজন ‘অভিজ্ঞ চিকিৎসক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতেন এবং অসুস্থ সাহাবীদের তার কাছে চিকিৎসার জন্য পাঠাতেন। যেমন—সা’দ বিন আবু ওয়াক্কাস যখন হৃদরোগে আক্রান্ত হন, তখন মুহাম্মদ তাকে হারিস ইবনে কালাদার কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন। যদিও এই হাদিসগুলোকে অনেক মুহাদ্দিস ‘জইফ’ বা দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, কিন্তু এগুলো ঐতিহাসিকভাবে একটি সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে যে—আরব চিকিৎসকরা ভারতের উন্নত জ্ঞানভাণ্ডার থেকে শিক্ষিত হয়ে আসতেন এবং সেই জ্ঞান তৎকালীন মদিনার সমাজেও সমাদৃত ছিল। এমনকি ‘পাকস্থলী সকল রোগের কেন্দ্র’—হারিসের এই বৈজ্ঞানিক উক্তিটি পরবর্তীতে ভুলবশত হাদিস হিসেবেও ব্যাপক প্রচার পায়, যা প্রমাণ করে যে তার জ্ঞান অনেক ক্ষেত্রেই তৎকালীন ধর্মীয় শিক্ষার ওপর ছায়া বিস্তার করেছিল।
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব ২১: খাদ্য
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৪২২৪-[৬৬] সা‘দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সময় আমি মারাত্মকভাবে পীড়িত হয়ে পড়লাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার খোঁজ-খবর নিতে তাশরিফ আনলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের হাতখানা আমার দু’ স্তনের মাঝখানে (বুকের উপর) রাখলেন। তাতে আমি আমার কলিজায় শীতলতা অনুভব করলাম।অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তুমি একজন হৃদ-বেদনার রোগী। সুতরাং তুমি সাক্বীফ গোত্রীয় হারিস ইবনু কালদাহ্-এর নিকট যাও। সে একজন চিকিৎসক। পরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ সে যেন অবশ্যই মদীনার সাতটি ‘আজওয়াহ্ খেজুর বীচিসহ পিষে তোমার মুখের মধ্যে ঢেলে দেয়। (আবূ দাঊদ)[1]
[1] য‘ঈফ : আবূ দাঊদ ৩৮৭৫, য‘ঈফুল জামি‘উস্ সগীর ২০৩৩, আল মু‘জামুল কাবীর লিতু ত্ববারানী ৫৩৪৬, য‘ঈফুল জামি‘ ২০৩৩।
হাদীসটি য‘ঈফ হওয়ার কারণ হলো মুজাহিদ সা‘দ হতে বর্ণনা করাটা মুরসাল। আবূ যুর্‘আহ্ আর্ রাযী এমনটিই বলেছেন। বিস্তারিত দেখুন- ‘আওনুল মা‘বূদ ১০/২৫৫ পৃঃ, হাঃ ৩৮৭৫।
হাদিসের মানঃ যঈফ (Dai’f)
বর্ণনাকারীঃ সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)
সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২২/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ১২. আজওয়া খেজুর সম্পর্কে।
৩৮৩৫. ইসহাক ইবন ইসমাইল (রহঃ) …. সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একবার আমি পীড়িত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখার জন্য আসেন। এ সময় তিনি তাঁর হাত আমার বুকের উপর রাখলে আমি তাঁর শৈত্যতা আমার হৃদয়ে অনুভব করি। এরপর তিনি বলেনঃ তুমি হার্টের রুগী। কাজেই তুমি ছাকীফ গোত্রের অধিবাসী হারিছা ইবন কালদার নিকট যাও। কেননা, সে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক। আর সে যেন মদীনার আজওয়া খেজুরের সাতটা খেজুর নিয়ে, তা বীচিসহ চূর্ণ করে তোমার জন্য তা দিয়ে সাতটি বড়ি তৈরী করে দেয়।
হাদিসের মানঃ যঈফ (Dai’f)
বর্ণনাকারীঃ সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)
হিন্দুস্থানের চন্দনকাঠঃ আরবে ভারতীয় পণ্যের প্রভাব
কেবল চিকিৎসাবিদ্যায় উচ্চতর শিক্ষা নয়, বরং প্রাত্যহিক ব্যবহার্য ওষধি দ্রব্যের ক্ষেত্রেও তৎকালীন আরবে ভারতীয় পণ্য অত্যন্ত সমাদৃত, দামী এবং আভিজাত্যের প্রতীক ছিল। সহিহ হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, নবী মুহাম্মদ স্বয়ং তার অনুসারীদেরকে বিভিন্ন জটিল রোগ নিরাময়ের জন্য ‘হিন্দুস্থানী চন্দনকাঠ’ বা ‘উদে হিন্দি’ (Indian Aloeswood/Costus) ব্যবহারের জোরালো পরামর্শ দিতেন। উম্মু কায়স বিনত মিহসান (রা.) থেকে বর্ণিত একটি সহিহ হাদিসে দেখা যায়, নবী শিশুদের রোগ নিরাময়ে প্রচলিত আরবীয় পদ্ধতির সমালোচনা করে বলছেন:
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২২/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ১৩. আংগুল দিয়ে গলা দাবানো সম্পর্কে।
৩৮৩৭. মুসাদ্দাদ ও হামিদ ইবন ইয়াহইয়া (রহঃ) …. উম্মু কায়স বিনত মিহসান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমি আমার এক ছেলেকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট হাযির হই; যার গলা (অসুখের কারণে) আমি মালিশ করেছিলাম। তখন তিনি বলেনঃ তোমরা তোমাদের সন্তানদের গলার আসুখে কেন তাদের গলা মালিশ কর?বরং তোমাদের উচিত (এ রোগের জন্য) হিন্দুস্থানের চন্দনকাঠ ব্যবহার করা। কেননা, তাতে সাত ধরনের রোগ ভাল হয়, যার একটি হলো নিউমোনিয়া। গলা-ফুলা রোগে তা নাকের ছিদ্রে ব্যবহার করবে এবং নিউমোনিয়া হলে তা বড়ি বানিয়ে খাবে।
ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেনঃ চন্দন কাঠের অর্থ- তা চূর্ণ করে বড়ি বানিয়ে খাবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উম্মু কায়স বিনত মিহসান (রাঃ)
এই নির্দেশটি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে ওঠে। প্রথমত, এটি প্রমাণ করে যে সপ্তম শতাব্দীর আরবে ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদ কেবল সুগন্ধি হিসেবে নয়, বরং জীবন রক্ষাকারী অত্যাধুনিক চিকিৎসা উপকরণ হিসেবে স্বীকৃত ছিল। দ্বিতীয়ত, ভারতের প্রতি আরবদের এই যে প্রগাঢ় নির্ভরতা এবং উচ্চ ধারণা—তা থেকেই বোঝা যায় যে ভারত তাদের কাছে একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ, উন্নত ও রহস্যময় ভূখণ্ড হিসেবে পরিচিত ছিল। আরবের মরু অঞ্চলের মানুষের কাছে ভারতের এই প্রাচুর্য ও জ্ঞানতাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্ব দেশটিকে একটি অত্যন্ত লোভনীয় গন্তব্যে পরিণত করেছিল। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এটি মনে করা মোটেও অযৌক্তিক নয় যে, ভারতের এই অর্থনৈতিক ও সভ্যগত সমৃদ্ধিই পরবর্তীতে মদিনার শাসকদের নজরে এই ভূখণ্ডটিকে একটি সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। অর্থাৎ, ভারত থেকে আরবদের জন্য কোনো উস্কানি বা শত্রুতা না থাকলেও, কেবল এর সমৃদ্ধি ও ‘হিন্দুস্থানী’ পণ্যের উচ্চমূল্যই আরবদের মধ্যে এক ধরণের আধিপত্যবাদী লালসা তৈরি করেছিল।
গাজওয়ায়ে হিন্দঃ জান্নাতের প্রতিশ্রুতি ও সামরিক উস্কানি
আরবদের মধ্যে ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি যে গভীর আগ্রহ ও সম্ভ্রম ছিল, নবী মুহাম্মদের মদিনা জীবনের শেষভাগে তা একটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক রূপ পরিগ্রহ করে। কোনো প্রকার পূর্ব শত্রুতা বা উস্কানি ছাড়াই সুদূর হিন্দুস্থানকে ইসলামের সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সহিহ হাদিসের সংকলনগুলোতে ‘গাজওয়ায়ে হিন্দ’ বা ‘ভারত অভিযান’ সংক্রান্ত এমন কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়, যা সরাসরি একটি স্বাধীন ও শান্তিপূর্ণ ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক যুদ্ধ বা ‘অফেন্সিভ জিহাদ’-এর উস্কানি প্রদান করে। সুনান আন-নাসায়ীসহ বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে:
সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৫/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ৪১. হিন্দুস্থানের জিহাদ
৩১৭৮. মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ ইবন আব্দুর রহীম (রহঃ) … রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গোলাম ছাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মতের দুটি দল আল্লাহ্ তা’আলা তাদেরকে জাহান্নাম হতে পবিত্রাণ দান করবেন, একদল যারা হিন্দুস্থানের জিহাদ করবে,আর একদল যারা ঈসা ইবন মারিয়াম (আঃ) এর সঙ্গে থাকবে।
তাহক্বীকঃ সহীহ। সহীহাহ ১৯৩৪, সহীহ জামে’ আস-সগীর ৪০১২।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সাওবান (রাঃ)
এই হাদিসটির বিশ্লেষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে কোনো আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের কথা বলা হয়নি, কারণ আরবের তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারত কখনোই মদিনার জন্য সামরিক হুমকি ছিল না। বরং ভারতের প্রতি আরবদের যে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত আকর্ষণ ছিল, তাকে পরকালীন ‘জান্নাত’ এবং ‘জাহান্নাম থেকে মুক্তি’র গ্যারান্টি দিয়ে একটি আগ্রাসী যুদ্ধে রূপান্তর করা হয়েছে। ঐতিহাসিক ইবনে কাসীর তার ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থে এই ভারত অভিযানের বর্ণনা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন [2]। এমনকি নুআইম বিন হাম্মাদের ‘কিতাবুল ফিতান’-এর মতো গ্রন্থেও এই ভারত অভিযানের বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে যে প্রাথমিক ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনে ভারত ছিল একটি অত্যন্ত লোভনীয় এবং কৌশলগত ‘টার্গেট’ [3]। যে অঞ্চলের জ্ঞান ও পণ্য (যেমন চন্দনকাঠ) নবী নিজে প্রশংসা করেছিলেন, সেই অঞ্চলের মানুষের বিরুদ্ধেই এই জান্নাতের প্রতিশ্রুতি সম্বলিত সামরিক উস্কানিটি ঐতিহাসিকভাবে একটি বড় বৈপরীত্য তৈরি করে। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, ইসলামের জিহাদ কেবল ‘ডিফেন্সিভ’ বা আত্মরক্ষামূলক ছিল না, বরং তা ছিল একটি সুপরিকল্পিত সাম্রাজ্যবাদী বিস্তারবাদ।
আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে এই বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা পাওয়া যায়, [4]

একইরকম বক্তব্য বর্ণিত আছে নুআইম বিন হাম্মাদের হাদিস সংকলন গ্রন্থে। যদিও এই হাদিস গ্রন্থে অনেক সমস্যা থাকার কথা ইসলামি আলেমগণ বলে থাকেন, কিন্তু একই বক্তব্য যেহেতু অন্যান্য হাদিস গ্রন্থেও পাওয়া যায়, তাই এই হাদিসগুলোকে সঠিক হিসেবেই গণ্য করতে হয় [5]


সমসাময়িক প্রেক্ষাপটঃ ‘গাজওয়ায়ে হিন্দ’ ও ধর্মীয় উগ্রবাদ
নবী মুহাম্মদের চৌদ্দশ বছর আগের সেই ‘গাজওয়ায়ে হিন্দ’ বা ভারত অভিযানের ভবিষ্যৎবাণী কেবল প্রাচীন ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং আধুনিক যুগে এটি দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি প্রধান জ্বালানিতে পরিণত হয়েছে। এই হাদিসগুলোকে পুঁজি করে বিভিন্ন উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক শক্তি ভারতের বিরুদ্ধে একটি অন্তহীন যুদ্ধের (Endless War) বয়ান তৈরি করে। বিশেষ করে পাকিস্তানভিত্তিক অনেক উগ্রবাদী সংগঠন এই ‘গাজওয়ায়ে হিন্দ’-এর স্বপ্ন দেখিয়ে তরুণদের মগজ ধোলাই করে এবং তাদের জিহাদে উদ্বুদ্ধ করে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই যুদ্ধের প্রেরণা কোনো যৌক্তিক রাজনৈতিক পাওনা আদায়ের জন্য নয়, বরং স্রেফ পরকালীন মুক্তির প্রলোভন এবং ‘কাফির’ বা অমুসলিমদের ভূখণ্ড দখলের একটি আদিম লালসা থেকে উৎসারিত। আসুন কাফের নারীদের ভোগ করার এই উদগ্র বাসনাগুলো এই ওয়াজের বক্তব্য থেকে জেনে নেয়া যাক,
এই মানসিকতার একটি অত্যন্ত বীভৎস ও অমানবিক দিক হলো ‘মালে গনিমত’ বা যুদ্ধের লুণ্ঠিত মালের ধারণা। যুদ্ধের জয়লাভের পর পরাজিত পক্ষের সম্পদ এবং নারীদের ভোগ করার যে বিধান মধ্যযুগীয় ইসলামি আইনে ছিল, তা বর্তমানের ডিজিটাল যুগেও কিছু মানুষের চিন্তাধারায় গভীরভাবে প্রোথিত। উদাহরণস্বরূপ, সমসাময়িক বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে বা জনসভায় অনেক উগ্রপন্থীকে দেখা যায় যারা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের স্বপ্নে বিভোর এবং তারা ভারতীয় নারীদের (যেমন চলচ্চিত্র জগতের তারকাদের) ‘গনিমতের মাল’ বা দাসী হিসেবে ভোগ করার প্রকাশ্য বাসনা ব্যক্ত করে। আপনার সরবরাহকৃত ভিডিওতে জনৈক পাকিস্তানীকে যেভাবে মাধুরী দীক্ষিতের মতো তারকাকে গনিমতের মাল বানানোর ‘বুকিং’ দিতে দেখা যায়, তা মূলত মুহাম্মদের সেই ‘গাজওয়ায়ে হিন্দ’-এরই একটি বিকৃত ও আধিপত্যবাদী রূপ। এটি প্রমাণ করে যে, এই জিহাদি চেতনার আড়ালে কেবল ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদ নয়, বরং লুণ্ঠন ও ধর্ষণের মতো অপরাধগুলোকে ‘পবিত্রতা’ দেওয়ার একটি মানসিক কাঠামো বিদ্যমান। সুদূর অতীতে যে ভূখণ্ডের জ্ঞান ও সম্পদের প্রতি আরবরা শ্রদ্ধাশীল ছিল, সেই ভূখণ্ডকেই আজ কেবল লুণ্ঠনযোগ্য সম্পদ ও ‘দারুল হারব’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যা মূলত মুহাম্মদের সেই সামরিক উস্কানিমূলক হাদিসগুলোরই অনিবার্য ফসল। আসুন শুনি, একজন পাকিস্তানী মুসলিম কীভাবে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ হলে ভারতীয় নায়িকা মাধুরীকে গনিমতের মাল বানাবে, তার আগাম বুকিং দিচ্ছে তা দেখে নিই,
কাফের নারীদের গনিমতের মাল হিসেবে ভোগের যেই স্বপ্ন আজও মুসলিমরা দেখেন, আসুন তার কিছু নমুনা ব্যাংলাদেশের আলেমদের মুখ থেকে শুনে নেয়া যাক,
উপসংহারঃ সভ্যতার সংঘাত নাকি শান্তির ভবিষ্যৎ নির্মান?
উপরে আলোচিত ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় তথ্যসূত্রগুলো পর্যালোচনা করলে একটি চরম বৈপরীত্য ও পরিকল্পিত সাম্রাজ্যবাদী নকশা উন্মোচিত হয়। একদিকে আমরা দেখি আরবের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক হারিস ইবনে কালাদা ভারতের উন্নত জ্ঞানভাণ্ডার থেকে শিক্ষিত হয়েছেন এবং নবী মুহাম্মদ স্বয়ং ভারতীয় চন্দনকাঠের ওষধি গুণের ভূয়সী প্রশংসা করছেন; অন্যদিকে আমরা দেখি সেই একই নবী কোনো উস্কানি ছাড়াই ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দিচ্ছেন এবং আক্রমণকারীদের জন্য জান্নাতের ঘোষণা করছেন। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, ইসলামের প্রাথমিক বিস্তার কোনো ‘সভ্যতার সংঘাত’ (Clash of Civilizations) ছিল না, বরং এটি ছিল একটি উদীয়মান সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদী শক্তির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ভারত তখন জ্ঞান ও সম্পদে এতটাই সমৃদ্ধ ছিল যে, আরবের মরুচারী মানুষের কাছে তা ছিল এক রূপকথার দেশ। এই আকর্ষণকে যখন পরকালীন পুরস্কারের (জান্নাত) সাথে জুড়ে দেওয়া হলো, তখন তা সাধারণ অনুসারীদের জন্য একটি অপ্রতিরোধ্য প্রলোভনে পরিণত হলো।
মুহাম্মদের এই রণকৌশল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি কেবল ওমান বা পারস্যের মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, বরং সুদূর হিন্দুস্থানকেও তার সামরিক মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন—যদিও ভারতের সাথে তার কোনো ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় বিরোধ ছিল না। আধুনিক বিচারবুদ্ধিতে একে ‘অফেন্সিভ জিহাদ’ বা আক্রমণাত্মক আগ্রাসন ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। এর ফলে যে বিষাক্ত উত্তরাধিকার তৈরি হয়েছে, তা আজও দক্ষিণ এশিয়ার মাটিতে উগ্রবাদ এবং ‘গনিমতের মাল’ হিসেবে নারী ও সম্পদ লুণ্ঠনের মধ্যযুগীয় লালসাকে জিইয়ে রেখেছে। পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রগুলোতে ‘গাজওয়ায়ে হিন্দ’-এর যে উন্মাদনা আমরা দেখি, তার শেকড় মূলত এই চৌদ্দশ বছর পুরনো জান্নাতের প্রলোভন ও পররাজ্য দখলের নির্দেশে নিহিত। সুতরাং, ইসলামের ইতিহাসকে কেবল ‘শান্তির দাওয়াত’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং ওমান থেকে ভারত পর্যন্ত মুহাম্মদের প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক আধিপত্যবাদ এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর ওপর আগ বাড়িয়ে কর্তৃত্ব স্থাপনের এক আদিম উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ইতিহাসের সত্যকে আড়াল না করে বরং এই নির্মোহ বিশ্লেষণই আজকের দিনে যুক্তি ও সভ্যতার বিকাশের জন্য অপরিহার্য।
