কুমতলব বা খারাপ উদ্দেশ্য কুযুক্তি | Appeal to motive

ভূমিকা

‘Appeal to Motive’ বা উদ্দেশ্যমূলক আক্রমণ হলো যুক্তিবিদ্যার এমন একটি হেত্বাভাস, যেখানে কোনো দাবির সত্যতা বা যৌক্তিকতা বিচার না করে, সেই দাবি উত্থাপনকারীর সম্ভাব্য ব্যক্তিগত স্বার্থ, লাভ বা গোপন কোনো অভিসন্ধিকে সামনে এনে পুরো দাবিটিকে খারিজ করে দেওয়া হয়। এটি আসলে বিখ্যাত Ad Hominem Circumstantial বা ব্যক্তি আক্রমণেরই একটি বিশেষ রূপ, যেখানে যুক্তির চেয়ে ব্যক্তির ‘উদ্দেশ্য’ বড় হয়ে দাঁড়ায় [1]

এই কুযুক্তির মূল কৌশল হলো বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু থেকে নজর সরিয়ে বক্তার চরিত্রের ওপর আলোকপাত করা। এখানে ধরে নেওয়া হয় যে, যদি কোনো ব্যক্তির একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে থাকার পেছনে তার কোনো ব্যক্তিগত লাভ থাকে, তবে তার দেওয়া যুক্তিটি অবশ্যই ভুল। অথচ যুক্তিবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী, বক্তার অভিসন্ধি বা স্বার্থ থাকলেই তার পেশ করা তথ্য বা যুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিথ্যা হয়ে যায় না [2]। সত্যতা যাচাই করার সঠিক পদ্ধতি হলো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠ বিচার করা, বক্তার মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করা নয়।


বাস্তব উদাহরণঃ উদ্দেশ্যমূলক আক্রমণ বা Appeal to Motive

Appeal to motive is a pattern of argument which consists in challenging a thesis by calling into question the motives of its proposer. It can be considered as a special case of the ad hominem circumstantial argument.
অর্থাৎ কোন যুক্তির পেছনে যুক্তিদানকারীর স্বার্থ রয়েছে এমনটা দেখিয়ে যুক্তি বা দাবীকে ভুল বললে বা নাকোচ করলে এই হেত্বাভাসটি সংঘটিত হয়। এখানে যুক্তির বিপক্ষে যুক্তি নয়, যুক্তিদানকারী কী উদ্দেশ্যে যুক্তি দিচ্ছে, সেই নিয়েই আলোচনা চলে। উদাহরণঃ

💰
১. উদ্দেশ্য ও অর্থায়ন নিয়ে আক্রমণ
ধরা যাক, ইসলামে শিশু বিবাহ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। একজন বললো, “আপনি ইসলামের বিরুদ্ধে যুক্তি দিচ্ছেন, নিশ্চয়ই আপনি ইহুদিদের থেকে টাকা পয়সা নিচ্ছেন।”
এখানে শিশু বিবাহের ভালো-খারাপ নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা না করে, কী উদ্দেশ্যে কেউ যুক্তি দিচ্ছে বা কার থেকে টাকা পাচ্ছে, তার দিকে নির্দেশ করা হয়েছে। কল্পিত ইহুদিদের থেকে কেউ টাকা নিলেও, তার দেওয়া যুক্তিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভুল প্রমাণিত হয় না
🚗
২. ব্যবসায়িক স্বার্থের অজুহাত
ডিলার: “আমাদের এই গাড়িটির মাইলেজ অন্য গাড়ির চেয়ে ভালো।”
ক্রেতা: “এর সত্যতা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে, বিক্রির জন্য তুমি তো এটাই বলবে, এটাই তোমাদের ব্যবসা।”
এখানে ক্রেতা গাড়ির যন্ত্রাংশ নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা না করে বিক্রেতার ব্যবসায়িক স্বার্থের দিকে নির্দেশ করছেন। বিক্রেতার গাড়ি বিক্রির ইন্টারেস্ট থাকলেও তার বক্তব্যে সেটির নেতিবাচক প্রভাব নাও পড়তে পারে এবং তথ্যটি সত্যও হতে পারে।
⚖️
৩. উদ্দেশ্য প্রণোদিত অপবাদ
১ম ব্যক্তি: “মব যদি উত্তেজিত হয়ে ধর্ষককেও গণপিটুনি দেয় তা সঠিক হবে না, তাকে পুলিশে দেয়া প্রয়োজন।”
২য় ব্যক্তি: “তুমি ধর্ষককে সমর্থন করছ, তোমার ইন্টেনশনই হলো ধর্ষকদের পক্ষ নেওয়া।”
মব জাস্টিসের বা বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরোধিতা করা মানে অপরাধীকে সমর্থন করা নয়। এখানে মূল যৌক্তিক প্রসঙ্গ এড়িয়ে বক্তার উদ্দেশ্য বা ইনটেনশন নিয়ে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তার যৌক্তিক অবস্থানকে খারিজ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

উপসংহারঃ যুক্তি বনাম অভিসন্ধি

পরিশেষে বলা যায়, ‘Appeal to Motive’ বা উদ্দেশ্যমূলক আক্রমণ সুস্থ ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনার পথে একটি বড় বাধা। কোনো ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে বা স্বার্থে একটি কথা বলছেন—এটি প্রমাণ করা গেলেও তার কথাটি যে ভুল, তা প্রমাণিত হয় না। সত্য একটি স্বাধীন সত্তা, যা বক্তার ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা বা স্বার্থের ওপর নির্ভর করে না [3]। উদাহরণস্বরূপ, একজন চিকিৎসক কোনো নির্দিষ্ট ওষুধের গুণগান করলে তার পেছনে ব্যবসায়িক স্বার্থ থাকতে পারে, কিন্তু সেই স্বার্থ থাকা মানেই ওষুধটি কাজ করবে না—এমন দাবি করা যৌক্তিকভাবে ভুল।

যুক্তি-তর্কের ক্ষেত্রে আমাদের সবসময় ‘কেন বলা হচ্ছে’ (Why) তার চেয়ে ‘কী বলা হচ্ছে’ (What) এবং তার সপক্ষে ‘প্রমাণ কী’ (Evidence), সেদিকেই প্রধান নজর দিতে হবে। বক্তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা কেবল তখনই প্রাসঙ্গিক হতে পারে যখন দাবির স্বপক্ষে কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ থাকে না। নতুবা, প্রমাণের বদলে কেবল উদ্দেশ্যকে আক্রমণ করা এক ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক ফাঁকিবাজি বা পলায়নপরতা ছাড়া আর কিছুই নয়।


তথ্যসূত্রঃ
  1. Copi, I. M., Cohen, C., & McMahon, K. (2014). Introduction to Logic ↩︎
  2. Walton, D. (2008). Informal Logic: A Pragmatic Approach ↩︎
  3. Hansen, H. (2020). Fallacies. Stanford Encyclopedia of Philosophy ↩︎