
Table of Contents
- 1 ভূমিকা
- 2 ইসলামের আকীদাঃ নিজস্ব মত বা দৃষ্টান্ত
- 3 ‘গীলা’ বিধানের উৎসঃ নবীর ইচ্ছা এবং পরিবর্তনের কারণ
- 4 হাদিসের শরহঃ ইসলামী ব্যাখ্যাকারদের দৃষ্টিভঙ্গি
- 5 ঐশ্বরিক প্রজ্ঞার অভাব ও ব্যক্তিগত ধারণার আধিপত্য
- 6 রোম ও পারস্যের অভিজ্ঞতাঃ ‘মানুষের জ্ঞান’ ওহীকে ছাপিয়ে যায়
- 7 যুক্তি ও তর্কের সংকটে ওহীর সংজ্ঞায়ন
- 8 উপসংহার
ভূমিকা
ইসলামী ধর্মতত্ত্বে মুহাম্মদকে এমন এক অভ্রান্ত, অলৌকিক সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয় যিনি নিজের খেয়াল-খুশি, ব্যক্তিগত মতামত বা সাধারণ মানবিক বিচারবুদ্ধির ভিত্তিতে কখনো কোনো বিধান দেন না। বরং তাঁর প্রতিটি হুকুম, প্রতিটি নিষেধাজ্ঞা নাকি সরাসরি সর্বজ্ঞানী আল্লাহর ঐশ্বরিক ওহীর প্রতিফলন। সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনা অনুসারে, মুহাম্মদ উম্মতকে কেবল তাই শেখাতেন যা আল্লাহ তাঁকে শিখিয়েছেন—কোনো ব্যক্তিগত দৃষ্টান্ত বা নিজস্ব মতামতের উপর ভিত্তি করে নয়। কিন্তু যখন আমরা ‘গীলা’ অর্থাৎ স্তন্যদানকারী স্ত্রীর সাথে সহবাসের বিধান সংক্রান্ত হাদিসগুলো যুক্তি ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের আলোয় খতিয়ে দেখি, তখন এই ‘ঐশ্বরিক অভ্রান্ততা’র দাবিটি একেবারে চরমভাবে হোঁচট খায় এবং নগ্ন হয়ে পড়ে। প্রকাশিত হয় যে, মুহাম্মদের বিধানগুলো আসলে তৎকালীন আরবের লৌকিক অভিজ্ঞতা, সাধারণ পর্যবেক্ষণ, কুসংস্কার এবং বাইরের মানুষের জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল একটি সম্পূর্ণ মানবিক, ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়া ছিল। এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে, যে ধর্মকে ‘আসমানি’ ও ‘অভ্রান্ত’ বলে দাবি করা হয়, তার অনেক বিধানই ছিল নবীর নিজস্ব স্বল্পজ্ঞান ও পরিবেশগত তথ্যের ফসল। এই প্রবন্ধে আমরা সম্পূর্ণ যুক্তিনির্ভর, সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই অসঙ্গতি, বৈপরীত্য ও মানবিক সীমাবদ্ধতাগুলোকে একে একে উন্মোচিত করব।
ইসলামের আকীদাঃ নিজস্ব মত বা দৃষ্টান্ত
ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস অনুসারে, নবী মুহাম্মদ নিজে থেকে কোনো কথা বলেন না বা কোনো বিধান জারি করেন না। তিনি যা কিছু হুকুম দেন বা যে বিধান প্রচার করেন, তা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে আসে। এই বিষয়ে অসংখ্য হাদিসে উল্লেখ আছে যে, নবী নিজের ইচ্ছা বা স্বাধীন বিচারবুদ্ধি দিয়ে কিছু করেন না—সবকিছুই আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে। আল্লাহ যেভাবে হালাল-হারাম নির্ধারণ করেন, নবী ঠিক সেভাবেই তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। এসব ক্ষেত্রে তাঁর ব্যক্তিগত মতামত বা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের দৃষ্টান্ত কোনো প্রভাব ফেলে না। আসুন সহীহ বুখারী এবং সহজ নসরুল বারী থেকে এর প্রমাণ দেখি। [1] [2]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৯৬/ কুরআন ও সুন্নাহকে শক্তভাবে ধরে থাকা
পরিচ্ছেদঃ ৯৬/৯. নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) উম্মাতের পুরুষ ও নারীদেরকে সে বিষয়েরই শিক্ষা দিতেন, যা আল্লাহ্ তাঁকে শিখিয়ে দিতেন,নিজস্ব মতামত বা দৃষ্টান্তের উপর ভিত্তি করে নয়।
৭৩১০. আবূ সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার হাদীস তো কেবল পুরুষেরা শুনতে পায়। সুতরাং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একটি দিন নির্দিষ্ট করে দিন, যে দিন আমরা আপনার কাছে আসব, আল্লাহ্ আপনাকে যা কিছু শিখিয়েছেন তাত্থেকে আপনি আমাদের শিখাবেন। তিনি বললেনঃ তোমরা অমুক অমুক দিন অমুক অমুক জায়গায় একত্রিত হবে। সে মোতাবেক তারা একত্রিত হলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে এলেন এবং আল্লাহ্ তাঁকে যা কিছু শিখিয়েছেন তা থেকে তাদের শিক্ষা দিলেন। এবং বললেনঃ তোমাদের কেউ যদি সন্তানদের থেকে তিনটি সন্তান আগে পাঠিয়ে দেয় (মৃত্যুবরণ করে) তাহলে এ সন্তানরা তার জন্য জাহান্নাম থেকে পর্দা যাবে। তাদের মাঝ থেকে একজন মহিলা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! যদি দু’জন হয়? বর্ণনাকারী বলেন, মহিলা কথাটি দু’ দু’বার জিজ্ঞেস করলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ দু’জন হলেও, দু’জন হলেও, দু’জন হলেও। [মুসলিম ৪৫/৪৭, হাঃ ২৬৩৩, আহমাদ ১১২৯৬] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৮০০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৮১২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)

‘গীলা’ বিধানের উৎসঃ নবীর ইচ্ছা এবং পরিবর্তনের কারণ
এবার নিচের হাদিসগুলো লক্ষ করুন। নবী মুহাম্মদের জীবনে এ ধরনের আরও ঘটনা ঘটেছে। একবার তিনি স্তন্যদানরত স্ত্রীর সাথে সহবাস (‘গীলা’) নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বা নিষেধাজ্ঞা জারি করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। প্রশ্ন উঠছে, এই সিদ্ধান্ত কি তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিগত বিচারবুদ্ধি বা সীমিত জ্ঞানের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল, নাকি এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি ওহীর মাধ্যমে এসেছিল? কিন্তু পরবর্তীতে কয়েকজন সাহাবীর মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে, রোম ও পারস্যের লোকেরা এই কাজ নিয়মিত করে এবং তাদের সন্তানদের কোনো ক্ষতি হয় না। অর্থাৎ এ বিষয়ে তাঁর পূর্ব জ্ঞান ছিল না। তাহলে কি তিনি অজ্ঞতার ভিত্তিতে নিজের খেয়ালখুশি মতো একটি বিধান প্রণয়নের চেষ্টা করেছিলেন? পরে সাহাবীদের কাছ থেকে এই তথ্য পাওয়ার পর তিনি সেই নিষেধাজ্ঞার ইচ্ছা ত্যাগ করেন এবং কাজটিকে বৈধ বলে ঘোষণা করেন। ফলে বহিরাগত দৃষ্টান্ত ও মানুষের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নবীর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয়। এখানে প্রশ্ন জাগে—আল্লাহ কেন নবীকে এই সঠিক তথ্য আগে থেকে জানাননি? কেন ‘কাফের’ রোম ও পারস্যের অভিজ্ঞতা ইসলামী বিধান নির্ধারণে প্রভাব ফেলল? কি করে সাধারণ মানুষের পর্যবেক্ষণ আল্লাহর জ্ঞানের চেয়ে অগ্রগামী হয়ে উঠল? [3] [4] [5]
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ২৪. ‘গীলা’ অর্থাৎ স্তন্যদায়িনি স্ত্রীর সাথে সঙ্গমের বৈধতা এবং আযল মাকরূহ হওয়া প্রসঙ্গ
৩৪৩৪। উবায়দুল্লাহ ইবনু সাঈদ ও মুহাম্মদ ইবনু আবূ উমর (রহঃ) … সাঈদ ইবনে আবু আয়্যুব (রহঃ) আসওয়াদ থেকে তিনি উরওয়া থেকে তিনি আয়শা (রাঃ) এবং তিনি উকাশার ভগ্নি জুদামা বিনত ওয়াহব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একদিন কিছু সংখ্যক লোকের সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে হাযির হলাম। তিনি তখন বলছিলেন, আমি স্তন্যদায়িনী মহিলার সাথে সঙ্গম করা নিষেধ করার ইচ্ছা করলাম, এমতাবস্থায় আমি রোম ও পারস্যবাসী লোকদের অবস্থার কথা বিবেচনা করে অবগত হলাম যে, তারা গীলা করে থাকে, কিন্তু তা তাদের সন্তান সন্ততির কোনরূপ ক্ষতি করে না। তারপর লোকেরা তাকে আযল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তা হল গোপন হত্যা।
রাবী উবায়দুল্লাহ তার বর্ণনায় সুত্রে আয়াতটুকুও উল্লেখ করেছেন অর্থাৎ ’যখন জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে’ (৮১ঃ ৮- ৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৭/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ২৪. ‘গীলা’ অর্থাৎ স্তন্যদায়িনি স্ত্রীর সাথে সঙ্গমের বৈধতা এবং আযল মাকরূহ হওয়া প্রসঙ্গ
৩৪৩৩। খালফ ইবনু হিশাম ও ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) … জুদামা বিনত ওয়াহাব আসাদিয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন, আমি গীলা (স্তন্যদায়িনী স্ত্রীর সাথে সঙ্গম) নিষিদ্ধ ঘোষণা করার ইচ্ছে করলাম। এরপর আমার নিকট আলোচনা করা হল যে, রোম ও পারস্যবাসী লোকেরাও তা করে থাকে, অথচ তাতে তাদের সন্তানদের কোন ক্ষতি হয় না। খালফ তার সনদ বর্ণনায় বলেছেন যে, জুযামা আসদিয়া থেকে বর্ণিত। ইমাম মুসলিম (রহঃ) বলেন, বিশুদ্ধ হল ’জুদামা’ যা ইয়াইয়া তার বর্ণনায় বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৭। বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ২৪. ‘গীলাহ’ অর্থাৎ স্তন্যদায়িনী স্ত্রীর সাথে সঙ্গমের বৈধতা এবং ‘আযল মাকরূহ হওয়া প্রসঙ্গে
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৩৪৫৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৪৪২
৩৪৫৬-(১৪০/১৪৪২) খালাফ ইবনু হিশাম ও ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহিমাহুমাল্লাহ) ….. জুদামাহ বিনতু ওয়াহব আল আসাদিয়্যাহ্ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন, আমি স্তন্যদায়িনী স্ত্রীর সাথে সঙ্গম নিষিদ্ধ ঘোষণা করার ইচ্ছে করলাম। এরপর আমার নিকট আলোচনা করা হল যে, রোম ও পারস্যবাসী লোকেরাও তা করে থাকে, অথচ তাতে তাদের সন্তানদের কোন ক্ষতি হয় না।
ইমাম মুসলিম (রহঃ) বলেন, খালাফ তার সানাদ বর্ণনায় “জুদামাহ্ আল আসাদিয়্যাহ্” উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ইয়াহইয়া বর্ণিত ’জুযামাহ’ শব্দটিই সঠিক ও নির্ভুল। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৪২৯, ইসলামীক সেন্টার ৩৪২৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জুদামা বিনত ওয়াহব আসাদিয়া (রাঃ)
হাদিসের শরহঃ ইসলামী ব্যাখ্যাকারদের দৃষ্টিভঙ্গি
এই বিষয়ে হাদিসের শরহ গ্রন্থগুলোতে কী বলা হয়েছে তা দেখা যাক। [6]
এই কাজে সমাবৃত হয় তাহা সে এই লা’নতসহ কবরে প্রবেশ করিবে। এমনকি ইহা তাহাকে জাহান্নামে পৌঁছাইয়া দিবে। (ফতহুল মুলহিম ৩ঃ৫১৭) يَدْخُلُ مَعَهُ قَبْرَهُ )লা’তসহ সে কবরে প্রবেশ করে)। অর্থাৎ يوصله الى جهنم )তাহাকে জাহান্নামে পৌঁছাইয়া দিবে)। আল্লাহ তা’আলার কাছে ইহা হইতে আশ্রয় প্রার্থনা করি।(ফতহুল মুলহিম ৩ঃ৫১৭)
كَيْفَ يُوَزِثُهُ وَهُوَلَا يَحِلُّ )কিভাবে সে তাহাকে (দাসীর গর্ভস্থ সন্তানকে) ওয়ারিছ বানাইবে অথচ তাহা তাহার
জন্য বৈধ নহে)। শারেহ নওয়াভী (রহ.) বলেন, গর্ভবতী যুদ্ধ বন্দিনী মহিলার সহিত সহবাস করা হারাম। কেননা, এই মহিলা যদি ছয় মাসের পূর্বে সন্তান প্রসব করে তাহা হইলে এই সন্দেহ সৃষ্টি হইবে যে, এই সন্তান কি কয়েদকারী মুসলিম ব্যক্তির না কি সেই কাফির ব্যক্তির যাহার কাছে এই মহিলা কয়েদের পূর্বে ছিল। কাজেই উক্ত সন্তান যদি মুসলমানের হয় তাহা হইলে একে অপরের ওয়ারিছ হইবে। আর যদি কাফির ব্যক্তির হয় একে অপরের ওয়ারিছ হইবে না এবং তাহার সহিত রক্ত সম্পর্কীয় সম্বন্ধও প্রতিষ্ঠিত হইবে না। ফলে অন্যান্য দাসের মত তাহার নিকট হইতেও দাস হিসাবে খেদমত নেওয়া বৈধ হইবে। এই পদ্ধতিতে যদি সে উক্ত সন্তানকে নিজের গণ্য করে এবং ওয়ারিছ বানায় তাহা হইলে অপরের সন্তানকে নিজে ওয়ারিছ বানাইল আর যদি প্রথম পদ্ধতি হিসাবে গোলাম বানায় এবং মীরাছ হইতে মাহরুম করে তাহা হইলে নিজের সন্তানকে ওয়ারিছ হইতে বঞ্চিত করিল এবং দাস বানাইল। সুতরাং এই মন্দ হইতে বাঁচিবার জন্য সন্তান প্রসবের উপর গর্ভবতী যুদ্ধ বন্দিনীর সহিত সঙ্গম করা হারাম। যাহাতে একজনের সন্তান অন্য জনের সহিত সংমিশ্রণ না হয়।-(ঐ)
(982) وحَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةً حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ – وَحَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ حَدَّثَنَا أَبُو دَاوُدَ جَمِيعًا عَنْ شُعْبَةً فِي هَذَا الْإِسْنَادِ.
(৩৪৫২) হাদীছ (ইমাম মুসলিম (রহ.) বলেন) আর আমাদের নিকট হাদীছ বর্ণনা করেন আবু বকর বিন আবু শায়বা (রহ.) তিনি … (সূত্র পরিবর্তন) এবং মুহাম্মদ বিন বাশার (রহ.) তাহারা … শু’বা (রহ.) হইতে এই সনদে অনুরূপ রিওয়ায়ত করেন।
بَابُ جَوَارِ الْغِيلَةِ وَهِيَ وَطْءُ الْمُرْضِعِ وَكَرَاهَةِ الْعَزْلِ
অনুচ্ছেদ: গীলা তথা স্তন্য দায়িনী স্ত্রীর সহিত সহবাস করা বৈধ আযল করা মাকরূহ-এর বিবরণ
(980) وَحَدَّثَنَا خَلَفُ بْنُ هِشَامٍ حَدَّثَنَا مَالِكُ بْنُ أَنَسٍ ، وَحَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى وَاللَّفْظُ لَهُ قَالَ قَرَأْتُ عَلَى مَالِكٍ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ نَوْفَلٍ عَنْ عُرْوَةَ عَنْ عَائِشَةَ عَنْ جُدَامَةً بِنْتِ وَهْبِ الْأَسَدِيَّةِ أَنَّهَا سَمِعَتْ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ لَقَدْ هَمَمْتُ أَنْ أَنْهَى عَنْ الْغِيلَةِ حَتَّى ذَكَرْتُ أَنَّ الرُّومَ وَفَارِسَ يَصْنَعُونَ ذَلِكَ فَلَا يَضُرُّ أَوْلَادَهُمْ قَالَ مُسْلِم وَأَمَّا خَلَفٌ فَقَالَ عَنْ جُذَامَةً الْأَسَدِيَّةِ وَالصَّحِيحُ مَا قَالَهُ يَحْيَى بِالدَّالِ .
(৩৪৫৩) হাদীছ (ইমাম মুসলিম (রহ.) বলেন) আর আমাদের নিকট হাদীছ বর্ণনা করেন খালীফ বিন হিশাম (রহ.) তিনি … (সূত্র পরিবর্তন) এবং ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া (রহ.) তাহারা … জুদামা বিন ওহাব আল আসাদিয়া (রাযিঃ) হইতে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইরশাদ করিতে শ্রবণ করিয়াছেন, আমি স্তন্যদায়িনী স্ত্রীর সহিত সহবাস করিতে নিষেধ করার ইচ্ছা করিয়াছিলাম। এমতাবস্থায় আমার কাছে উল্লেখ করা হইল যে, রোম ও পারস্যবাসী লোকরা অনুরূপ করে। অথচ উহাতে তাহাদের সন্তানদের কোন ক্ষতি হয় না।
রাবী খালাফ (বিন হিশাম রহ.) তাহার বর্ণিত সনদে (জুদামা বিন ওহাব আল আসাদিয়া-এর স্থলে) “জুযামা আল ……
কাযী ইয়ায (রহ.) বলেন, আলোচ্য হাদীছ দ্বারা বুঝা যায় যে, স্তন্যদায়িনী স্ত্রীর সহিত সহবাস করা জায়িয।
কেননা, তিনি ইহা হইতে নিষেধ করেন নাই। জমহুরে উলামার মতে ইহা দ্বারা দুগ্ধের কোন ক্ষতি করে না আর যদি করে উহা যৎসামান্য। অধিকন্তু হাদীছের শেষাংশ “তথা যদি উহা ক্ষতিকারক হইত তাহা হইলে পারস্য ও রোমবাসীর সন্তানদের ক্ষতি হইত” দ্বারাও জায়িয হওয়ার বিষয়টি গ্রহণ করা যায়। আল্লামা উবাই (রহ.) বলেন, ইহা দ্বারা মাসয়ালা উদ্ভাবনের দিক হইতেছে যে, তাহারা যখন দেখিলেন পারস্য এবং রোমবাসী সন্তানদের কোন ক্ষতি হয় না তখন আরবীগণেরও ক্ষতি হইবে না। কেননা, আরববাসীগণ আকৃতি-প্রকৃতি ও সৃষ্টিগত দিক দিয়া তাহাদের সহিত শরীক রহিয়াছেন। ফলে আরববাসীদের সন্তানেরও কোন ক্ষতি হইবে না। আল্লাহ সুবহানাহু
তা’আলা সর্বজ্ঞ।-(ফতহুল মুলহিম ৩৪৫১৭)


এই ব্যাখ্যাগুলোতে দেখা যায় যে, ইসলামী আলেমরা হাদিসের ভিত্তিতে ‘গীলা’কে জায়েজ বলে মেনে নিয়েছেন, কারণ নবী শেষ পর্যন্ত এটি নিষিদ্ধ করেননি এবং রোম-পারস্যের দৃষ্টান্তকে যুক্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তবে এই ব্যাখ্যা নিজেই প্রশ্ন তোলে—কেন সর্বজ্ঞ আল্লাহর ওহীর পরিবর্তে বিজাতীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণকে বিধান নির্ধারণের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হলো?
ঐশ্বরিক প্রজ্ঞার অভাব ও ব্যক্তিগত ধারণার আধিপত্য
ইসলামী আকীদা অনুসারে, আল্লাহ যা ক্ষতিকর তা নিষিদ্ধ করেন এবং যা উপকারী তা অনুমোদন করেন। কিন্তু সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় দেখা যায় যে, মুহাম্মদ নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি ‘গীলা’ অর্থাৎ স্তন্যদানরত স্ত্রীর সাথে সহবাস নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন [3]। এখানে প্রশ্ন উঠছে—এই সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী ছিল? যদি এটি ওহীর মাধ্যমে আসত, তাহলে সর্বজ্ঞ আল্লাহ কেন নবীকে একটি অপ্রয়োজনীয় বা ভুল নিষেধাজ্ঞার দিকে নিয়ে যেতেন? আর যদি এটি নবীর নিজস্ব ধারণা বা ব্যক্তিগত বিচার হয়, তাহলে এটি সরাসরি ইসলামের মৌলিক দাবির সাথে সাংঘর্ষিক যে, “নবী নিজ থেকে কোনো কথা বলেন না”।
এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, মুহাম্মদ তৎকালীন আরব সমাজের প্রচলিত কুসংস্কার বা তাঁর নিজস্ব সীমিত চিকিৎসা-জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে একটি ধর্মীয় বিধান প্রণয়নের চেষ্টা করেছিলেন।
রোম ও পারস্যের অভিজ্ঞতাঃ ‘মানুষের জ্ঞান’ ওহীকে ছাপিয়ে যায়
মুহাম্মদের এই বিধানে চূড়ান্ত পরিবর্তন ঘটে যখন তিনি জানতে পারেন যে রোম ও পারস্যের লোকেরা এই কাজ করে এবং তাদের সন্তানদের কোনো ক্ষতি হয় না [7]। এই ঘটনা নবীত্ব ও ওহীর ধারণাকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে:
যুক্তি ও তর্কের সংকটে ওহীর সংজ্ঞায়ন
ইসলামী ব্যাখ্যাকাররা প্রায়ই বলেন যে নবীর ভুলগুলো আল্লাহ সংশোধন করে দিতেন। কিন্তু ‘গীলা’র ক্ষেত্রে সংশোধন এসেছে আল্লাহর ওহী থেকে নয়, বরং রোম-পারস্যের অমুসলিমদের জীবনযাত্রা ও অভিজ্ঞতা থেকে। যদি সাহাবীরা সেই তথ্য না দিতেন, তাহলে সম্ভবত স্তন্যদানকালীন সহবাস ইসলামে স্থায়ীভাবে হারাম হয়ে যেত।
এটি একটি যৌক্তিক অসঙ্গতি: যদি নবীর ব্যক্তিগত ভুল ধারণা ওহী হিসেবে গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং সংশোধনের জন্য মানুষের অভিজ্ঞতা লাগে, তাহলে সেই বিধানকে ‘ঐশ্বরিক’ বলার যৌক্তিক ভিত্তি আর থাকে না। সহীহ মুসলিমের এই বর্ণনাগুলো প্রমাণ করে যে ইসলামী শরিয়ত কোনো আসমানি অভ্রান্ত ফর্মুলা নয়, বরং সমকালীন ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও অভিজ্ঞতামূলক তথ্যের একটি সংকলন [4]।
উপসংহার
‘গীলা’ সংক্রান্ত এই হাদিস-ঘটনা একটি স্পষ্ট ও শক্তিশালী প্রমাণ যে, মুহাম্মদের প্রদত্ত বিধানসমূহ কোনো অতিপ্রাকৃত বা ঐশ্বরিক উৎস থেকে উদ্ভূত নয়। বরং এগুলো তৎকালীন আরব সমাজের সাধারণ পর্যবেক্ষণ, সীমিত ব্যক্তিগত জ্ঞান, প্রচলিত কুসংস্কার এবং বহিরাগত মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে সংগৃহীত একটি সম্পূর্ণ মানবিক প্রক্রিয়ার ফসল। যে নবী একটি সাধারণ শারীরিক ক্রিয়া (স্তন্যদানকালীন সহবাস)-এর প্রভাব বোঝার জন্য রোম ও পারস্যের অমুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার উপর নির্ভর করেন, তাঁর দাবিকৃত সার্বজনীন, শাশ্বত ও অভ্রান্ত বিধান প্রণয়নের ক্ষমতা যৌক্তিকভাবে অসম্ভব বলে প্রতীয়মান হয়।
এই একটি ঘটনাই যথেষ্ট প্রমাণ করে যে, যে ধর্মকে ‘আসমানি’ ও ‘অভ্রান্ত’ বলে উপস্থাপন করা হয়, তার অনেক বিধান আসলে নবীর নিজস্ব স্বল্পজ্ঞান, পরিবেশগত প্রভাব এবং সমকালীন তথ্য-উৎসের উপর নির্ভরশীল ছিল। এর ফলে ‘ওহী’র ধারণা, নবীর অভ্রান্ততা এবং ইসলামের ঐশ্বরিক উৎসের দাবি গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
তথ্যসূত্রঃ
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৭৩১০ ↩︎
- সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী, আরবি-বাংলা, সহজ তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, হযরত মাওলানা উসমান গনী, আল কাউসার প্রকাশনী, ১৩তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৭ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৩৪ 1 2
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৩৩ 1 2
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৪৫৬ ↩︎
- সহিহ মুসলিম শরীফ (প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাসহ বঙ্গানুবাদ), আল হাদীছ প্রকাশনী, ১৩তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২০, ২২১ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমি, হাদিসঃ ৩৪৫৬ ↩︎
