
Table of Contents
- 1 ভূমিকা
- 2 হাদিসের বিবরণঃ একটি কৌতূহলোদ্দীপক গল্প
- 3 ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ইবনে সাইয়্যাদের পরিচয়ঃ পৌরাণিক গল্পের ভীতি
- 4 গোয়েন্দাগিরি ও লুকোচুরি: নবুওয়াতের সাথে বৈপরীত্য
- 5 ‘দুখাইন’ ও অসম্পূর্ণ পরীক্ষা: ঐশী জ্ঞান বনাম অতীন্দ্রিয় অসংগতি
- 6 মুহাম্মদের অনিশ্চয়তা ও ওমরের জিঘাংসা
- 7 মুহাম্মদের অনিশ্চয়তা ও ওমরের জিঘাংসাঃ ওহীর অসারতা
- 8 যৌক্তিক বিশ্লেষণ: নবুওয়াতের দাবির অসারতা ও তাত্ত্বিক সংকট
- 9 ইবনে সাইয়্যাদের যৌক্তিক পাল্টা আক্রমণঃ সাহাবীদের বিভ্রান্তি
- 10 পরবর্তী জীবন ও অন্তর্ধানঃ একটি অমীমাংসিত অধ্যায়
- 11 উপসংহারঃ একটি ধসে পড়া অলৌকিকত্বের দাবি
ভূমিকা
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে মুহাম্মদকে কেবল একজন ধর্মপ্রচারক হিসেবেই নয়, বরং ‘গায়েব’ বা অদৃশ্যের সংবাদাতা এবং জিবরাঈলের মাধ্যমে সরাসরি ঐশী জ্ঞানের অধিকারী হিসেবেও বিভিন্ন স্থানে উপস্থাপন করা হয়। দাবি করা হয়, কিয়ামত বা মহাপ্রলয়ের আগেকার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নিদর্শনগুলোও তার নখদর্পণে ছিল। তবে মদিনার ইহুদি কিশোর ইবনে সাইয়্যাদ বা ইবনে সায়েদের সাথে মুহাম্মদের মিথস্ক্রিয়ার যে বিবরণ সহীহ হাদিসগুলোতে পাওয়া যায়, তা এই তথাকথিত ‘নিশ্চিত ওহী’র দাবির মূলে এক প্রবল কুঠারাঘাত করে। এখানে আমরা এমন একজন মুহাম্মদকে দেখি, যিনি এক অলৌকিক নবুওয়াতী সত্তার পরিবর্তে একজন সাধারণ মানুষের মতো অনুমানের ওপর ভিত্তি করে চরম বিভ্রান্তি ও ভীতিতে ভুগছেন।
ইবনে সাইয়্যাদকে কেন্দ্র করে মুহাম্মদের আচরণ—কখনো গাছের আড়ালে লুকিয়ে চোরের মতো আড়ি পাতা, কখনো অসম্পূর্ণ ‘দুখ’ (ধুয়া) পরীক্ষার মাধ্যমে তার পরিচয় হাতড়ানো, আবার কখনো তাকে হত্যা করা বা না করা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা প্রকাশ করা—প্রমাণ করে যে মুহাম্মদ অন্তত সেই মুহূর্তে কোনো ঐশী তথ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন না। বরং তিনি তৎকালীন আরবের প্রচলিত লোকগাথা, কুসংস্কার এবং ইহুদিদের মাঝে প্রচলিত দাজ্জাল বা মসীহ-বিরোধী (Antichrist) ধারণার দ্বারা ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবিত ও শঙ্কিত ছিলেন। মহাবিশ্বের সবচাইতে প্রবল প্রতাপশালী ফেরেশতা জিবরাইলের সাথে যার নিয়মিত ওঠাবসা, তাকে জিজ্ঞেস না করে তিনি এসব উদ্ভট কাজকর্ম কেন করতে গেলেন, তার ব্যাখ্যা যুক্তিবাদীদের কাছে একদমই পরিষ্কার।
এই প্রবন্ধটির মূল লক্ষ্য হলো ইবনে সাইয়্যাদ সংক্রান্ত হাদিসগুলোকে একটি সমালোচনামূলক ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যবচ্ছেদ করা। আমরা দেখব, কীভাবে একজন কিশোরের অস্বাভাবিক আচরণকে মুহাম্মদ মহাজাগতিক ফিতনা হিসেবে ভুল করেছিলেন এবং কীভাবে তার এই মানবিক সীমাবদ্ধতা ও তথ্যের অসংলগ্নতা নবূয়তের দাবিকে যৌক্তিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি নিছক কোনো ধর্মীয় গল্প নয়, বরং এটি এমন এক ঐতিহাসিক দলিল যা তথাকথিত ‘ঐশী জ্ঞান’ এবং ‘মানবিক বিভ্রান্তি’র মধ্যকার সীমারেখাকে ধূলিসাৎ করে দেয়।
হাদিসের বিবরণঃ একটি কৌতূহলোদ্দীপক গল্প
ইসলামের দলিল প্রমাণ এবং ঐতিহাসিক সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, এক বালককে নবী মুহাম্মদ সহ সকল সাহাবীগণ বাঘের মত ভয় পেতো। মুহাম্মদ নিজেই ভেবেছিল, এই বালকই দজ্জাল, অর্থাৎ দজ্জালের আবির্ভাব হয়েছে [1]
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৭: ফিতনাহ
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ – ইবনু সাইয়্যাদ-এর ঘটনা
৫৫০৪-[১১] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত।এক সময় মদীনার জনৈকা মহিলা এমন একটি পুত্র সন্তান জন্ম দিল, যার এক চোখ মোছানো, মাঢ়ির দাঁতগুলো মুখের বাহির পর্যন্ত লম্বা, তাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) এই আশঙ্কা করেছিলেন যে, হয়তো সে-ই দাজ্জাল।অতঃপর একদিন তিনি (সা.) তাকে দেখলেন, সে একখানা চাদর জড়িয়ে শুয়ে গুনগুন করছে, তখন তার মা তাকে ডেকে বলল, হে ’আবদুল্লাহ! এই যে আবূল কাসিম। তখন সে চাদরের ভিতর হতে বের হলো, এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) (বিরক্তির সুরে) বললেন, এ মহিলাটির কি হলো আল্লাহ তাকে ধ্বংস করুন, যদি সে তাকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দিত, তাহলে প্রকৃত অবস্থা উদঘাটিত হয়ে যেত। অতঃপর বর্ণনাকারী জাবির ইবনু উমার (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীসের মতো বর্ণনা করেন। তখন ’উমার (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অনুমতি দিন, আমি তাকে হত্যা করে ফেলি।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, যদি সে প্রকৃত দাজ্জালই হয়, তবে তুমি তার হত্যাকারী নও, বরং তার হত্যাকারী হলেন ’ঈসা ইবনু মারইয়াম (আঃ)। আর যদি সে প্রকৃত দাজ্জালই না হয়, তাহলে এমন এক লোককে হত্যা করা তোমার অধিকার নেই, যে নিরাপত্তা চুক্তির আওতার রয়েছে। বর্ণনাকারী জাবির (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) তখন থেকে এই আশঙ্কা করতেন যে, হয়তো সে (ইবনু সাইয়্যাদ)-ই প্রকৃত দাজ্জাল। (শারহুস্ সুন্নাহ্)
হাসান: শারহুস্ সুন্নাহ ৩/৬০৮, মুসনাদে আহমাদ ১৪৯৯৮।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)
এবারে আসুন আরেকটি হাদিস পড়ি যেখানে দেখা যাচ্ছে, নবী মুহাম্মদ লুকিয়ে লুকিয়ে সেই বালকের দিকে লক্ষ্য রাখতেন। কিন্তু সেই বালককে এত ভয় পাওয়ার কারণ কী? [2] [3]
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ১৭. ইবন সায়্যাদের আলোচনা
৭০৯০। হারামালা ইবনু ইয়াহইয়া ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু হারামালা ইবনু ইমরান আত-তুজীবী (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) একদল মানুষ সহ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ইবনু সায়্যাদের নিকট গেলেন। তখন তাকে বনী মাগলার কিল্লার নিকট একদল বালকের সাথে ক্রীড়ারত অবস্থায় পেলেন। তখন ইবনু সায়্যাদ বালিগ হবার কাছাকাছি পৌছে গিয়েছিল। কিন্তু সে তা জানত না। অতঃপররাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত দ্বারা তার পৃষ্ঠে আঘাত করে বললেন, তুমি কি সাক্ষ্য দিচ্ছ যে, আমি আল্লাহর রাসুল? এ কথা শুনে ইবনু সায়্যাদ তার প্রতি তাকাল এবং বলল যে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি উম্মীদের রাসূল।অতঃপর ইবনু সায়্যাদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করল যে, আপনি কি সাক্ষ্য দেন যে, আমি আল্লাহর রাসুল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ছেড়ে দিলেন এবং (এর সরাসরি উত্তর না দিয়ে) বললেন আমি ঈমান আনয়ন করেছি আল্লাহর প্রতি ও তার রাসুলগণের প্রতি।
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তুমি কি দেখতে পাও? ইবনু সায়্যাদ বলল, আমার নিকট সত্যবাদী ও মিথ্যাবদী লোক আসে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তোমার বিষয়টি সঠিক-বেঠিক মিশ্রিত (হযবরল) হযে গিয়েছে। তোমাকে জিজ্ঞেস করার জন্য একটি কথা আমি মনে মনে গোপন রেখেছি। ইবনু সায়্যাদ বলল, তা হচ্ছে دخ (ধুয়া)। তৎপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ দূর হয়ে যা। তুই তোর পরিধি অতিক্রম করতে পারবি না। অতঃপর উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে ছেড়ে দিন। আমি এক্ষণি তার গর্দান উড়িয়ে দেই। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যদি সে দাজ্জাল হয়, তবে তো তাকে হত্যা করতে সক্ষম হবে না। আর যদি সে দাজ্জাল না হয় তবে তাকে হত্যা করার মাঝে কোন কল্যাণ নেই।
সালাম ইবন আবদুল্লাহ (রহঃ) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, পরবর্তী সময়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং উবায় ইবনু কাব (রাঃ) সেই খেজুর বাগানের দিকে চললেন, যেখানে ইবনু সায়্যাদ বসবাস করত। বাগানের মধ্যে এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃক্ষের আড়ালে আত্মগোপন করতে চেষ্টা করছিলেন, যাতে ইবনু সায়্যাদ তাঁকে দেখার পূর্বে তিনি তার কথা শুনে নেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখলেন যে, সে তার বিছানায় একটি চাঁদরে আবৃত অবস্থায় গুনগুন করে কি যেন বলছিল। এদিকে ইবনু সায়্যাদের মা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখল যে, তিনি বৃক্ষের আড়ালে আত্নগোপনের চেষ্টা করছেন। সে ততক্ষণাৎ ইবনু সায়্যাদকে বলে উঠলঃ হে সাফ! এটা ইবনু সায়্যাদের নাম। মুহাম্মাদ এসে গেছে। (এ কথা শুনতেই) ইবনু সায়্যাদ বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তার মা তাকে সাবধান না করলে সে পরিষ্কার বলে ফেলত।
সালিম (রহঃ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বলেছেন, এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের উদ্দেশ্যে একটি বক্তৃতা দিলেন। তাতে আল্লাহ তা’আলার যথাযোগ্য প্রশংসা ও গুনকীর্তনের পর দাজ্জালের কথা উল্লেখ করলেন এবং বললেনঃ আমি তোমাদেরকে দাজ্জালের ফিৎনা সম্পর্কে সতর্ক করছি যেমন প্রত্যেক নবী তাঁর সম্প্রদায়কে এ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। এমনকি নূহ (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর কাওমকে এ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তবে এ সম্পর্কে আমি তোমাদেরকে একটি বিষয় পরিস্কারভাবে বলে দিচ্ছি যা কোন নবী তার সম্প্রদায়কে বলেননি। তা হল এই যে, তোমরা জেনে রাখ, দাজ্জাল কানা হরে। আল্লাহ তাআলা কানা নন।
ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জনৈক সাহাবী তাকে অবহিত করেছেন যে, যে দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। সে দিন তিনি বলেছেন, যে তাঁর চক্ষুদ্বয়ের মাঝখানে কাফির (كافر) অথবা (ك ف ر) লেখা থাকবে। যে ব্যক্তি তার কার্যক্রম অপছন্দ করবে সে তা পাঠ করতে পারবে অথবা প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তই তা পাঠ করতে সক্ষম হবে। তিনি এও বলেছেন যে, তোমরা জেনে রাখ যে, তোমাদের কোন ব্যক্তি মৃত্যুর পূর্বে তার প্রতিপালককে দেখতে সক্ষম হবে না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)

এবারে আসুন এই হাদিসটি আরেকটি হাদিস গ্রন্থ থেকে পড়ি, [4] [5]
সুনান আত তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৬/ ফিতনা
পরিচ্ছেদঃ ইবন সায়্যাদ প্রসঙ্গে বর্ণনা।
২২৫২. ’আবদ ইবন হুমায়দ (রহঃ) ….. ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, সাহাবীগণের এক দলসহ একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবন সাইয়াদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এই দলে উমার ইবন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুও ছিলেন। বানূ মাগালায় উচুমহলের পাশে ইবন সায়্যাদ তখন কিছু বালকের সাথে খেলছিল। সেও ছিল একজন বালক। সে টের পাওয়ার আগেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গিয়ে তার পিঠে হাত-চাপড় দিলেন। পরে বললেনঃ তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আমি আল্লাহর রাসূল?
ইবন সায়্যাদ তাঁর দিকে তাকিয়ে বললঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি উম্মীদের রাসূল।
আবূ সাঈদ (রাঃ) বলেনঃ এরপর ইবন সায়্যাদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললঃ আপনি কি সাক্ষ্য দেন যে, আমি আল্লাহর রাসূল?
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের উপর ঈমান এনেছি।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ কি আসে তোমার কাছে?
ইবন সায়্যাদ বললঃ আমার কাছে সত্যও আসে মিথ্যাও আসে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ বিষয়টি তোমার কাছে মিশ্রিত হয়ে গেছে।
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি তোমার জন্য একটি বিষয় ধ্যানে লুকিয়ে রাখলাম বল তো কি? তিনি(يَوْمَ تَأْتِي السَّمَاءُ بِدُخَانٍ مُبِينٍ) আয়াতটি গোপনে পাঠ করেছিলেন।
ইবন সায়্যাদ বললঃ তা হল ’’দুখ’’
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ দূর হ, তুই কখনো তোর তাকদীর অতিক্রম করতে পারবি না।
উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ, অনুমতি দিন, আমি এর গর্দান উড়িয়ে দিই।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সে যদি সত্যই (দাজ্জাল) হয়ে থাকে তবে তো তার উপর তোমার ক্ষমতা হবে না। আর যদি (দাজ্জাল) না হয়ে থাকে তবে একে হত্যা করা তো তোমার জন্য কল্যাণকর নয়।
রাবী আবদুর রাজ্জাক (রহঃ) বলেন, শব্দটিতে দাজ্জালকে বুঝানো হয়েছে। আদাবুল মুফরাদ, বুখারি, মুসলিম, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ২২৪৯ [আল মাদানী প্রকাশনী]
(আবু ঈসা বলেন) এ হাদীসটি হাসান-সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)

এবারে আসুন আরও একটি হাদিস পড়ি, [6]
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ১৭. ইবন সায়্যাদের আলোচনা
৭০৮০। উসমান ইবনু আবূ শায়বা ও ইসহাক ইবনু ইবরাহীম (রহঃ) … আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদিন আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ছিলাম। এ সময় আমরা কতিপয় বালকের নিকট দিয়ে গেলাম। তাদের মধ্যে ইবনু সায়্যাদও বিদ্যমান ছিল। বালকেরা পালিয়ে গেল এবং ইবনু সায়্যাদ বসে রইল। এ দেথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুটা বিরক্তিবোধ করলেন। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তোমার দুই হাত ধুলায় ধুসরিত হোক। তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আমি আল্লাহর রাসুল! সে বলল, না। বরং আপনি কি সাক্ষ্য দেন যে আমি আল্লাহর রাসুল। একথা শুনে উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে ছেড়ে দিন। আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি যা মনে করছো, যদি সে সে-ই হয়, তবে তো তুমি তাকে হত্যা করতে সক্ষম হবে না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইব্ন মাসউদ (রাঃ)
এই একই বালক নবী মুহাম্মদের সাহাবীদের একদম নাকানি চুবানি খাইয়ে ছেড়ে দিতো বলে হাদিস থেকে জানা যায় [7]
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ১৭. ইবন সায়্যাদের আলোচনা
৭০৮৪। উবায়দুল্লাহ ইবনু উমার আল কাওয়ারীরী ও মুহাম্মাদ ইবনু মুসান্না (রহঃ) … আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, (মক্কা যাওয়ার পথে) ইবনু সায়্যাদ মক্কা পর্যন্ত আমার সফর সঙ্গী ছিল। পথিমধ্যে সে আমায় বলল, মানুষের কানাঘুষায় আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। তারা মনে করছে, আমিই দাজ্জাল। আপনি কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেননি যে, দাজ্জালের কোন সন্তান হবে না? তিনি বলেন, আমি বললাম, হ্যাঁ শুনেছি। তখন সে বলল, আমার তো সন্তানাদি রয়েছে। আপনি কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেননি যে, দাজ্জাল মক্কা ও মদীনা প্রবেশ করতে পারবে না? আমি বললাম, হ্যাঁ, শুনেছি। সে বলল, দেখুন, আমি তো মদীনায় জন্ম গ্রহণ করেছি এবং এখন মক্কা যাবার ইচ্ছা করছি। এ সব কথা বলার পর উপসংহারে সে বলল, আল্লাহর কসম! তবে আমি জানি, দাজ্জাল কোথায় জন্মগ্রহণ করেছে, তার বাড়ী কোথায় এবং এখন সে কোথায় আছে। আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, (এহেন কথা বলে) সে আমাকে মহা ফাঁপরে ফেলে দিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ইবনে সাইয়্যাদের পরিচয়ঃ পৌরাণিক গল্পের ভীতি
ইবনে সাইয়্যাদ (যার প্রকৃত নাম সম্ভবত আবদুল্লাহ ইবনে সায়্যিদ) ছিলেন মদিনার বনু মাগালা গোত্রের এক ইহুদি পরিবারের কিশোর। তৎকালীন মদিনার সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে তাকে ঘিরে এক ধরনের অতীন্দ্রিয় রহস্য দানা বেঁধেছিল। সমসাময়িক বিভিন্ন বর্ণনায় তাকে এমন এক কিশোর হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে, যার মধ্যে তথাকথিত ‘কাহিন’ বা গণকদের মতো কিছু অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ছিল [8]। তবে এই কিশোরের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো মুহাম্মদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা; মুহাম্মদ সেই সময় দাজ্জাল বা ‘মসীহ-বিরোধী’ শক্তির আবির্ভাব নিয়ে প্রবল উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন।
এখানে একটি গভীর তাত্ত্বিক অসংগতি পরিলক্ষিত হয়। মুহাম্মদ বিভিন্ন সময় দাজ্জালের যে সুনির্দিষ্ট শারীরিক ও অতিপ্রাকৃত বর্ণনা দিয়েছিলেন (যেমন: এক চোখ অন্ধ হওয়া, কপালে ‘কাফির’ লেখা থাকা, বিশাল দেহ ইত্যাদি), তার সাথে ইবনে সাইয়্যাদ নামক এই সাধারণ কিশোরের দৈহিক কাঠামোর কোনো নূন্যতম সাদৃশ্য ছিল না [9]। তা সত্ত্বেও মুহাম্মদ কেন এই কিশোরকে দাজ্জাল হিসেবে সন্দেহ করেছিলেন, তা গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ জাগে, নবী অনেক কথাই একদম বানিয়ে বলতেন, আর কিছু কথা পুরনো পৌরাণিক গল্পের ওপর ভিত্তি করে একটু রঙ মাখিয়ে বলতেন কিনা।
যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি স্পষ্ট যে, মুহাম্মদের এই ভীতি কোনো ওহী বা নিশ্চিত ঐশী বার্তার ওপর ভিত্তি করে ছিল না। বরং এটি ছিল তার অবচেতন মনের এক প্রকার ‘প্রজেকশন’ বা ছায়া-ভীতি। যদি তার কাছে দাজ্জাল সংক্রান্ত তথ্যাদি সত্যই কোনো অভ্রান্ত উৎস থেকে আসত, তবে একজন সাধারণ কিশোরকে দেখে তার এমন বিভ্রান্ত হওয়ার কথা নয়। ইবনে সাইয়্যাদের পরিচয় তাই কেবল একজন ইহুদি কিশোরের নয়, বরং এটি মুহাম্মদের নবুওয়াতী জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং তৎকালীন আরবের লোকজ কুসংস্কারের সংমিশ্রণে তৈরি হওয়া একটি কৃত্রিম আতঙ্কের স্মারক।
মুহাম্মদের এই সন্দেহ কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি তার অনুসারীদের মধ্যেও এই ভীতি এমনভাবে সঞ্চারিত করেছিলেন যে, উমরের মতো প্রভাবশালী সাহাবীরাও এক কিশোরকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলেন, যাকে তারা দাজ্জাল হিসেবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন [10]। এটি প্রমাণ করে যে, যৌক্তিক প্রমাণের চেয়ে ধর্মীয় নেতার ব্যক্তিগত সংশয়ই অনুসারীদের কাছে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
গোয়েন্দাগিরি ও লুকোচুরি: নবুওয়াতের সাথে বৈপরীত্য
ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে নবীদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে ‘ইসমত’ বা নির্ভুলতা এবং ওহীর মাধ্যমে অদৃশ্যের সংবাদ প্রাপ্তির যে দাবি করা হয়, ইবনে সাইয়্যাদ সংক্রান্ত এই ঘটনাটি তার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, মুহাম্মদ এবং উবায় ইবনে কাব গোপনে সেই খেজুর বাগানে গিয়েছিলেন যেখানে ইবনে সাইয়্যাদ অবস্থান করছিল। এখানে মুহাম্মদের যে রণকৌশলগত আচরণ ফুটে উঠেছে, তা কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তার বার্তার চেয়ে বরং একজন সাধারণ গোয়েন্দা বা কৌশলী মানুষের আচরণের সাথেই বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ।
হাদিসটির বিবরণ অনুযায়ী, মুহাম্মদ গাছের আড়ালে আড়ালে অত্যন্ত সন্তর্পণে এগিয়ে যাচ্ছিলেন যাতে ইবনে সাইয়্যাদ তাকে দেখার আগেই তিনি তার বিড়বিড় করা কথাগুলো শুনে তার স্বরূপ উন্মোচন করতে পারেন। এই ‘চোর-পুলিশ’ খেলার মতো পরিস্থিতিটি কয়েকটি মৌলিক দার্শনিক ও যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করে:
যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে এই লুকোচুরি খেলার দৃশ্যটি নবুওয়াতের ঐশী ভিত্তিকে চরমভাবে উপহাস করে। এটি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে যে, মুহাম্মদ তার পরিবেশের ওপর কোনো অতিপ্রাকৃত নিয়ন্ত্রণ বা আগাম জ্ঞান রাখতেন না। বরং তিনি তৎকালীন মদিনার লোককথা ও গুজবে কান দিয়ে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ভীতির বশবর্তী হয়ে সাধারণ মানুষের মতোই গোয়েন্দাবৃত্তিতে লিপ্ত হয়েছিলেন।
‘দুখাইন’ ও অসম্পূর্ণ পরীক্ষা: ঐশী জ্ঞান বনাম অতীন্দ্রিয় অসংগতি
ইবনে সাইয়্যাদকে কেন্দ্র করে মুহাম্মদের সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত ঘটনাটি হলো তথাকথিত ‘মানসিক পরীক্ষা’। এই পরীক্ষায় মুহাম্মদ তার নবূয়তী সামর্থ্যের চেয়ে বরং একজন তৎকালীন গণক বা ‘কাহিন’দের মতো আচরণ করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়। মুহাম্মদ নিজের মনে একটি বাক্য (সূরা আদ-দুখানের অংশ) কল্পনা করেন এবং ইবনে সাইয়্যাদকে জিজ্ঞেস করেন তিনি কী ভাবছেন। জবাবে কিশোরটি বলে, ‘তা হলো দুখ’ (আরবিতে যার অর্থ ধোঁয়া) [11]।
এই ঘটনাটি মুহাম্মদের নবূয়তী দাবির বিপরীতে কয়েকটি গুরুতর যৌক্তিক প্রশ্ন এবং যৌক্তিক বিশ্লেষণ সামনে নিয়ে আসে:
এই পরীক্ষাটি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে যে, ইবনে সাইয়্যাদ এবং মুহাম্মদের মধ্যকার এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই ছিল অনেকটা সমসাময়িক দুই অতীন্দ্রিয় শক্তিতে বিশ্বাসী মানুষের দ্বন্দ্বের মতো, যেখানে ওহীর কোনো কার্যকর ভূমিকা ছিল না। মুহাম্মদের এই ‘দুখাইন’ পরীক্ষাটি তার নবুওয়াতী জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের বদলে বরং তার মানবিক সীমাবদ্ধতা এবং তথাকথিত ‘শয়তানি প্ররোচনা’ ও ‘ওহী’র পার্থক্য করতে না পারার অক্ষমতাকেই নির্দেশ করে।
মুহাম্মদের অনিশ্চয়তা ও ওমরের জিঘাংসা
আপনার দেওয়া অনুচ্ছেদটিকে আরও তীক্ষ্ণ, বিশ্লেষণধর্মী এবং একটি শক্তিশালী পলেমিক প্রবন্ধের উপযোগী করে নিচে পুনর্লিখন করে দিচ্ছি। এখানে মুহাম্মদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং ওমরের চরমপন্থি অবস্থানের মধ্যকার বৈপরীত্যকে নবুওয়াতের তাত্ত্বিক সংকটের আলোকে ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে।
মুহাম্মদের অনিশ্চয়তা ও ওমরের জিঘাংসাঃ ওহীর অসারতা
ইবনে সাইয়্যাদকে কেন্দ্র করে নবুওয়াতের দাবির সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক সংকটটি তৈরি হয় মুহাম্মদ এবং ওমরের মধ্যকার কথোপকথনে। যখন ওমর ইবনুল খাত্তাব এই কিশোরকে দাজ্জাল হিসেবে নিশ্চিত ধরে নিয়ে তাকে শিরশ্ছেদ করার অনুমতি চাইলেন, তখন মুহাম্মদের উত্তরটি ছিল একজন বিভ্রান্ত এবং অনিশ্চিত মানুষের চূড়ান্ত উদাহরণ। মুহাম্মদ বলেছিলেন:
“যদি সে দাজ্জাল হয় তবে তুমি তাকে মারতে পারবে না (কারণ ঈসা তাকে মারবেন), আর যদি সে দাজ্জাল না হয় তবে তাকে হত্যা করে তোমার কোনো লাভ নেই” [12]।
এই একটি উক্তি মুহাম্মদের নবুওয়াতী জ্ঞানের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। পলেমিক বিশ্লেষণে এর গুরুত্ব অপরিসীম:
সংক্ষেপে, ইবনে সাইয়্যাদকে হত্যা করার ব্যাপারে মুহাম্মদের এই ‘পিচ্ছিল’ অবস্থান স্পষ্ট করে দেয় যে, তিনি ওহীর ওপর নয়, বরং পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করছিলেন। ওমরের জিঘাংসা এবং মুহাম্মদের দ্বিধা—উভয়ই প্রমাণ করে যে, দাজ্জাল বিষয়টি তৎকালীন ইসলামি নেতৃত্বের কাছে একটি রহস্যময় আতঙ্কের চেয়ে বেশি কিছু ছিল না, যার কোনো বাস্তব বা ঐশী ভিত্তি ছিল না।
এবারে আসুন দেখে নিই, হযরত উমরের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এই বালকই আসলে দজ্জাল। এবং নবী মুহাম্মদেরও উমরের এই বক্তব্যে সায় ছিল। হাদিসের ব্যাখ্যাকারীগণ এই বিষয়টি নিয়ে নানা ধরণের গোঁজামিল দেয়ার চেষ্টা করেছেন [15]


যৌক্তিক বিশ্লেষণ: নবুওয়াতের দাবির অসারতা ও তাত্ত্বিক সংকট
ইবনে সাইয়্যাদ সংক্রান্ত পুরো ঘটনাপ্রবাহটি বস্তুনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করলে মুহাম্মদের নবুওয়াতের দাবির বিপরীতে কয়েকটি অকাট্য যৌক্তিক সিদ্ধান্ত টানা যায়:
- যদি দাজ্জাল দ্বীপে শিকলবন্দি থাকে, তবে মদিনার রাস্তায় কিশোর হিসেবে তার ঘুরে বেড়ানো অসম্ভব।
- আর যদি মুহাম্মদ ইবনে সাইয়্যাদকে দাজ্জাল মনে করে থাকেন, তবে তামীম দাদীর গল্পটি বিশ্বাস করা মুহাম্মদের জন্য মূর্খতা ছিল।
ইবনে সাইয়্যাদের যৌক্তিক পাল্টা আক্রমণঃ সাহাবীদের বিভ্রান্তি
ইবনে সাইয়্যাদকে কেন্দ্র করে মুহাম্মদের যে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল, তা কেবল মুহাম্মদের জীবদ্দশাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মুহাম্মদের মৃত্যুর পর যখন ইবনে সাইয়্যাদ বড় হন, তখন তার সাথে সাহাবীদের বিভিন্ন মিথস্ক্রিয়া প্রমাণ করে যে, এই কিশোর মুহাম্মদের দেওয়া ‘দাজ্জাল’ তত্ত্বর অসংগতিগুলো সাহাবীদের চেয়েও ভালো বুঝতেন। আবু সাঈদ খুদরি-এর সাথে মক্কা যাওয়ার পথে ইবনে সাইয়্যাদের যে কথোপকথন হয়, তা বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে [17]।
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ১৭. ইবন সায়্যাদের আলোচনা
৭০৮৪। উবায়দুল্লাহ ইবনু উমার আল কাওয়ারীরী ও মুহাম্মাদ ইবনু মুসান্না (রহঃ) … আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, (মক্কা যাওয়ার পথে) ইবনু সায়্যাদ মক্কা পর্যন্ত আমার সফর সঙ্গী ছিল। পথিমধ্যে সে আমায় বলল, মানুষের কানাঘুষায় আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। তারা মনে করছে, আমিই দাজ্জাল। আপনি কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেননি যে, দাজ্জালের কোন সন্তান হবে না? তিনি বলেন, আমি বললাম, হ্যাঁ শুনেছি। তখন সে বলল, আমার তো সন্তানাদি রয়েছে। আপনি কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেননি যে, দাজ্জাল মক্কা ও মদীনা প্রবেশ করতে পারবে না? আমি বললাম, হ্যাঁ, শুনেছি। সে বলল, দেখুন, আমি তো মদীনায় জন্ম গ্রহণ করেছি এবং এখন মক্কা যাবার ইচ্ছা করছি। এ সব কথা বলার পর উপসংহারে সে বলল, আল্লাহর কসম! তবে আমি জানি, দাজ্জাল কোথায় জন্মগ্রহণ করেছে, তার বাড়ী কোথায় এবং এখন সে কোথায় আছে। আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, (এহেন কথা বলে) সে আমাকে মহা ফাঁপরে ফেলে দিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)
সেখানে ইবনে সাইয়্যাদ অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় তিনটি যৌক্তিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন, যা সাহাবীদের একদম ‘নাকানি চুবানি’ খাইয়ে দিয়েছিল:
যৌক্তিক বিশ্লেষণ: এই কথোপকথনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে দেখা যায় একজন সাধারণ মানুষ (যাকে দাজ্জাল সন্দেহ করা হচ্ছিল) মুহাম্মদের নিজের দেওয়া বর্ণনাগুলো ব্যবহার করেই মুহাম্মদের অনুসারীদের যৌক্তিকভাবে পরাজিত করছেন। আবু সাঈদ খুদরি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, ইবনে সাইয়্যাদের এই যুক্তিতে তিনি “মহা ফাঁপরে” বা বিভ্রান্তিতে পড়ে গিয়েছিলেন [17]। এটি প্রমাণ করে যে, মুহাম্মদের তৈরি করা ‘দাজ্জাল’ রূপকটি এতোটাই অসংলগ্ন ছিল যে সেটি দিয়ে কাউকেই সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব ছিল না।
পরবর্তী জীবন ও অন্তর্ধানঃ একটি অমীমাংসিত অধ্যায়
ইবনে সাইয়্যাদ পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে অনেক ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি মদিনার যুদ্ধে (হাররার যুদ্ধ) অংশগ্রহণ করেছিলেন বলেও উল্লেখ আছে [18]। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই যুদ্ধের পর থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিছু গোঁড়া সমর্থক দাবি করার চেষ্টা করেন যে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেছেন (যাতে তাকে দাজ্জাল হিসেবে প্রমাণের শেষ সুযোগটুকু টিকে থাকে), কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য এই যে, তিনি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই জীবন অতিবাহিত করেছেন।
উপসংহারঃ একটি ধসে পড়া অলৌকিকত্বের দাবি
ইবনে সাইয়্যাদ ও মুহাম্মদের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক মিথস্ক্রিয়া ইসলামি ধর্মতত্ত্বে মুহাম্মদের “গায়েব” সম্পর্কিত জ্ঞানের ভিত্তিকে সমূলে উৎপাটন করে দেয়। একজন সাধারণ কিশোরের সামনে একজন নবীর চরম অসহায়ত্ব, গভীর অনিশ্চয়তা এবং চোরের মতো লুকোচুরি করার কৌশল অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, এটি কোনো স্বর্গীয় বার্তার বহিঃপ্রকাশ ছিল না। বরং এটি ছিল একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক মানুষের চোখে—তৎকালীন সময়ের মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি, অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক এবং আরবের লোকজ কুসংস্কারের একটি অপরিপক্ক সংমিশ্রণ।
ইবনে সাইয়্যাদ দাজ্জাল ছিলেন কি ছিলেন না, সেটি বড় কথা নয়; বরং বড় সত্য এই যে, ইবনে সাইয়্যাদ নামক এই কিশোরটি মুহাম্মদের নবুওয়াতের দাবির সীমাবদ্ধতা ও অসারতা প্রমাণের জন্য একটি ঐতিহাসিক ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে টিকে আছেন। এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে, ওহী কোনো নিশ্চিত সত্য নয়, বরং তা ছিল তৎকালীন পারিপার্শ্বিকতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক ধরণের মানবিক নির্মান মাত্র। ইবনে সাইয়্যাদ দাজ্জাল ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন মুহাম্মদের নবূয়তের দাবির দুর্বলতা প্রকাশের একটি ঐতিহাসিক চরিত্র।
তথ্যসূত্রঃ
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৫৫০৪ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭০৯০ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪০৭ ↩︎
- সুনান আত তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২২৫২ ↩︎
- সুনান আত তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬৫ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭০৮০ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭০৮৪ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৭৩৫৫ ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৭১২৮ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৫২১৫ 1 2
- সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৩৫৪; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৫২১৫ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৫২১৫; সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৩৫৪ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৫২১৬ 1 2
- আনওয়ারুল মিশকাত শরহে মিশকাতুল মাসাবীহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ইসলামিয়া কুতুবখানা, পৃষ্ঠা ৪৯৮-৪৯৯ ↩︎
- আনওয়ারুল মিশকাত শরহে মিশকাতুল মাসাবীহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, অনুবাদ ও রচনাঃ মাওলানা আহমদ মায়মুন, ইসলামিয়া কুতুবখানা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪৯৮, ৪৯৯ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৭৩৯৭ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৭০৮৪ 1 2 3
- ফাতহুল বারী, খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৩২৮ ↩︎
