উদ্ভট ইসলামি বিশ্বাসঃ মৃত সোলায়মানের একবছর দাঁড়িয়ে ছিল

ভূমিকা

কোরআনের সূরা সাবা’র ১৪ নম্বর আয়াতে বর্ণিত সুলাইমানের মৃত্যুর বিবরণটি কেবল ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের কাছে পবিত্র ধর্মীয় বিশ্বাস হলেও, যুক্তি তথ্য ও প্রমাণের সাপেক্ষে বিচার বিশ্লেষণ করলে এটি প্রাচীনকালের একটি লোককথা বা উপকথা বলেও গণ্য করতে হয়, যা ডালপালা মেলে একসময় এই অলৌকিক রূপ নিয়েছে। [1] এই আয়াতে দাবি করা হয়েছে যে, সুলাইমান তার লাঠির ওপর ভর দিয়ে দীর্ঘ এক বছর (মতান্তরে দীর্ঘ সময়) মৃত অবস্থায় দণ্ডায়মান ছিলেন এবং তার লাঠিটি ঘুণে পোকা বা উইপোকা দ্বারা সম্পূর্ণ ভক্ষিত হয়ে ভেঙে না পড়া পর্যন্ত সেখানে উপস্থিত জ্বিনেরা তার মৃত্যু সম্পর্কে বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারেনি। একজন মানুষের প্রাণহীন দেহ দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যাকর্ষণ বলের বিরুদ্ধে খাড়া অবস্থায় টিকে থাকা এবং পচন প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতিপথকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত হতে পারে না। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো ফরেনসিক ট্যাপোনমি (Forensic Taphonomy), মানব শারীরতত্ত্ব এবং পদার্থবিদ্যার সূত্রসমূহ ব্যবহার করে এই বর্ণনার বৈজ্ঞানিক অসারতা প্রমাণ করা। আমরা দেখব যে, মৃত্যুর পর মুহূর্তেই দেহের ভেতরে যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ও পচন শুরু হয়, তা কোনো লাঠির ভারসাম্যের ওপর ভর করে এক বছর তো দূরে থাক, কয়েক দিনও দেহকে খাড়া রাখতে সক্ষম নয়। সুতরাং, এই বর্ণনাটি কেবল একটি আদিম ও অলৌকিক কল্পকাহিনি যা যুক্তি এবং প্রমাণের কষ্টিপাথরে বিচার করলে সম্পূর্ণরূপে ধোপে টেকে না।


ইসলামিক রেফারেন্স সমূহ

আসুন কোরআনের আয়াতটি পড়ে নিই, [2]

অতঃপর আমি যখন সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম, তখন ঘুণে পোকাই জ্বিনদেরকে তার মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করল, তারা (ধীরে ধীরে) সুলাইমানের লাঠি খেয়ে যাচ্ছিল। যখন সে পড়ে গেল তখন জ্বিনেরা বুঝতে পারল যে, তারা (নিজেরা) যদি অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অবগত থাকত তাহলে তাদেরকে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তির মধ্যে পড়ে থাকতে হত না।
— Taisirul Quran
যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম তখন জিনদেরকে তার মৃত্যু বিষয় জানালো শুধু মাটির পোকা যা সুলাইমানের লাঠি খাচ্ছিল। যখন সুলাইমান পড়ে গেল তখন জিনেরা বুঝতে পারল যে, তারা যদি অদৃশ্য বিষয় অবগত থাকত তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতে আবদ্ধ থাকতনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
তারপর যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যুর ফয়সালা করলাম তখন মাটির পোকা জিনদেরকে তার মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করল, যা তার লাঠি খাচ্ছিল। অতঃপর যখন সে পড়ে গেল তখন জিনরা বুঝতে পারল যে, তারা যদি গায়েব জানত তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক আযাবে থাকত না।
— Rawai Al-bayan
অতঃপর যখন আমরা সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম, তখন জিনদেরকে তার মৃত্যুর খবর জানাল শুধু মাটির পোকা, যা তার লাঠি খাচ্ছিল। অতঃপর যখন তিনি পড়ে গেলেন তখন জিনরা -বুঝতে পারল যে, যদি তারা গায়েব জানত, তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতে আবদ্ধ থাকত না [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

আসুন একটি ওয়াজ শুনে নিই,

আসুন এই আয়াতের তাফসীর পড়ে নিই তাফসীরে মাযহারী থেকে, [3]

দোয়া শেষ করে হজরত সুলায়মান প্রবেশ করলেন তাঁর নির্জন প্রকোষ্ঠে। লাঠিতে ভর দিয়ে শুরু করলেন নামাজ। নামাজরত অবস্থাতেই মহাপ্রস্থান ঘটলো তাঁর। মানুষ ও জ্বিনেরা একথা বুঝতেও পারলো না। তারা মাঝে মাঝে উঁকি মেরে দেখতো, হজরত সুলায়মান গভীরভাবে নামাজে মগ্ন। দীর্ঘকাল ধরে এভাবে নামাজে মগ্ন থাকা ছিলো হজরত সুলায়মানের অভ্যাস। তাই তিনি যে আর নেই, সেকথা তাদের মনে উদয়ও হলো না। তাঁর ভয়ে আগের মতোই তারা করে যেতো শ্রমসাধ্য কাজ। এভাবে কেটে গেলো পুরো একটি বৎসর। তার লাঠিতে ধরেছিলো ঘুণ অথবা উইপোকা। ফলে লাঠিটি একসময় ভেঙে পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নিষ্প্রাণ শরীর লুটিয়ে পড়লো মাটিতে।
উইপোকার বদৌলতে জ্বিনেরা মুক্তি পেয়েছিলো কঠিন শ্রম থেকে। তাই তারা উইপোকার উদ্দেশ্যে জানায় কৃতজ্ঞতা। হজরত ইবনে আব্বাস এরকম বলেছেন। ইবনে ইয়াজিদ সূত্রে ইবনে আবী হাতেম বলেছেন, হজরত সুলায়মান মৃত্যুদূতকে বলে রেখেছিলেন, আমার বিদায়ের সময় অত্যাসন্ন হলে জানাবেন। ওইদিন মৃত্যুদূত জানালেন, চিরবিদায়ের ক্ষণ সমুপস্থিত। প্রস্তুত হোন। হজরত সুলায়মান তাঁর প্রকোষ্ঠমধ্যে নির্মাণ করালেন আর একটি কাঁচের ঘর। তারপর ওই ঘরে প্রবেশ করে লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়ালেন। ওই অবস্থাতেই শুরু করলেন নামাজ। কিছুক্ষণ পর ওই অবস্থাতেই পরলোকগমন করলেন তিনি। কিন্তু লাঠিকে অবলম্বন করে তাঁর শরীর দাঁড়িয়ে রইলো আগের মতোই। মানুষ ও জ্বিনেরা মনে করলো তিনি নামাজ পাঠ করে চলেছেন গভীর মনোযোগের সঙ্গে। এদিকে তাঁর লাঠিতে ধরলো ঘুণেপোকা। ফলে দীর্ঘ এক বৎসর পর লাঠিটি ভেঙে পড়লো। তিনি লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে। জনতা তখন কাঁচের ঘর ভেঙে তাঁর দেহ বের করে আনলো। সৎকার করলো যথারীতি। তারা হিসেব করে দেখলো, বৎসরখানেক আগেই সম্পন্ন হয়েছে তাঁর পরকালযাত্রা।
এখানকার ‘দাব্বাতুল আরদ্বি’ অর্থ মাটির পোকা বা ঘুণে পোকা। এই পোকা ভক্ষণ করে শুকনো কাঠ। কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ কাঠখেকো পোকা, ঘুণে পোকা জাতীয় কোনো পোকা।

মৃত

রাসায়নিক ও জৈবিক বিবর্তনঃ রিগর মর্টিস ও পচন প্রক্রিয়া

একজন মানুষের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার দেহে রিগর মর্টিস (Rigor Mortis) বা পেশীর কাঠিন্য পরিলক্ষিত হয়, যা মূলত কোষে এটিপি (ATP) বা শক্তির অভাবের কারণে ঘটে থাকে। [4] এই প্রক্রিয়াটি বড়জোর ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, যার পর এনজাইমেটিক প্রতিক্রিয়ায় পেশীগুলো আবার শিথিল হতে শুরু করে। কোরআনের বর্ণনায় দাবি করা হয়েছে যে, সুলাইমান দীর্ঘ এক বছর সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, যা শারীরতাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব; কারণ রিগর মর্টিস শেষ হওয়ার পরপরই দেহটি তার পেশী ও হাড়ের সংযোগস্থলের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতো। এরপরই শুরু হয় অটোলাইসিস (Autolysis) বা কোষীয় স্ব-পচন এবং পুট্রিফেকশন (Putrefaction) বা ব্যাকটেরিয়াজনিত পচন। এই পর্যায়ে দেহের অভ্যন্তরীণ গ্যাস নির্গমনের ফলে শরীর ফুলে ওঠে (Bloating), যা দেহের ভারসাম্যের কেন্দ্র বা ‘Center of Gravity’ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। [5] ফলে, সুলাইমানের মৃতদেহটি যদি কোনো অলৌকিক কৌশলে ভারসাম্য বজায় রেখে দাঁড়িয়েও থাকতো, পচনের এই প্রাথমিক ধাপেই তা ভারসাম্য হারিয়ে লুটিয়ে পড়ার কথা। দীর্ঘ এক বছরের প্রক্রিয়ায় দেহের লিগামেন্ট ও টেন্ডনগুলো—যা হাড়কে ধরে রাখে—সম্পূর্ণ পচে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা, যার ফলে কঙ্কালটিও আর অটুট থাকতে পারে না। বৈজ্ঞানিক বাস্তবতায় পচনশীল একটি জৈব কাঠামো কোনো আলম্ব বা লাঠির ওপর এক বছর ধরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেবল অযৌক্তিক নয়, বরং প্রকৃতির মৌলিক জৈব-রাসায়নিক সূত্রের পরিপন্থী।


গাঠনিক ভারসাম্য ও মধ্যাকর্ষণজনিত সীমাবদ্ধতা

পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোনো বস্তুর স্থির সাম্যাবস্থা (Static Equilibrium) বজায় রাখার জন্য তার ভরকেন্দ্র (Center of Gravity) সর্বদা তার স্থিতিশীল ভিত্তির সীমানার মধ্যে থাকতে হয়। [6] একজন জীবিত মানুষ যখন লাঠির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ায়, তখন তার স্নায়ুতন্ত্র এবং পেশীগুলো নিরন্তর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমন্বয়ের মাধ্যমে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু মৃতদেহের ক্ষেত্রে এই সক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকে। সুলাইমানের মৃতদেহটি যদি কেবল একটি কাঠের লাঠির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে পচন প্রক্রিয়ার ফলে শরীরের অভ্যন্তরীণ তরল ও গ্যাসের চলন (Fluid shift) এবং টিস্যুর ক্ষয় শরীরের ভরকেন্দ্রকে প্রতিনিয়ত স্থানান্তরিত করবে। [7]। বিশেষ করে, নিম্নের কারণগুলো এই অবস্থাকে অসম্ভব করে তোলে:

কাঠামোগত পতন: বিজ্ঞান কী বলে?
জীববিদ্যা, প্রকৌশল ও পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মৃতদেহ দাঁড়িয়ে থাকার অসারতা
🦴
১. পেশী ও লিগামেন্টের শিথিলতা
মৃত্যুর কয়েক দিনের মধ্যেই সংযোগকারী কলা বা লিগামেন্টগুলো পচনের ফলে শক্তি হারায়। ফলে হাঁটু, কোমর এবং মেরুদণ্ডের হাড়গুলো আর নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকতে পারে না। একটি ভারসাম্যহীন মৃতদেহ শুধুমাত্র একটি লাঠির ভরের ওপর ভর করে সোজা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
🐛
২. ঘুণ পোকার প্রভাব ও প্রকৌশল
কোরআনের দাবি অনুযায়ী ঘুণ পোকা লাঠিটি খেয়ে ফেলছিল। কাঠামোগত প্রকৌশল (Structural Engineering) অনুযায়ী, একটি ভারবহনকারী লাঠির অভ্যন্তরীণ অংশ যদি পোকা দ্বারা আক্রান্ত হয়, তবে তার ‘Buckling Strength’ বা ভার বহন ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পায় এবং তা ভেঙে পড়তে বাধ্য। [8]
📉
৩. ঘর্ষণ হ্রাস ও অনিবার্য পতন
শরীরের পচনশীল ভরের ভারসাম্যহীনতা এবং লাঠির ক্ষয়িষ্ণু গঠন—এই দুইয়ের সমন্বয়ে একটি মৃতদেহ দীর্ঘ এক বছর দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব। পচনজনিত তরল চুইয়ে পড়ার (Purge fluid) ফলে লাঠি ও মেঝের ঘর্ষণ গুণাঙ্ক (Coefficient of Friction) হ্রাস পেয়ে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দেহটি পিছলে পড়ে যাওয়ার কথা।

সুতরাং, প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী যে কাঠামোটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ধসে পড়ার কথা, তা অলৌকিক কোনো কারণ ছাড়া এক বছর অটুট থাকা কেবল অবাস্তবই নয়, বরং মহাকর্ষীয় ও যান্ত্রিক সূত্রের সরাসরি লঙ্ঘন।


জ্ঞানতাত্ত্বিক অসঙ্গতিঃ জ্বিনদের ‘অদৃশ্য জ্ঞান’ ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা

কোরআনের এই উপাখ্যানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো এটি প্রমাণ করা যে, জ্বিনেরা ‘গায়েব’ বা অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অবগত নয়। [1] তবে এই দাবিটি প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে বর্ণনার মধ্যে এমন কিছু যৌক্তিক ও পর্যবেক্ষণমূলক অসঙ্গতি তৈরি করা হয়েছে যা জ্বিনদের তথাকথিত ‘উন্নত সত্তা’ হওয়ার ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। যদি জ্বিনেরা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং মানুষের অসাধ্য কাজ করতে সক্ষম হয়, তবে দীর্ঘ এক বছর ধরে একটি মৃতদেহের পচনজনিত দৃশ্যমান ও ঘ্রাণজ পরিবর্তনগুলো তাদের চোখে না পড়া কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। এই প্রসঙ্গের যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক অসম্পূর্ণতাগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

বাস্তবতা বনাম রূপকথা
জীববিজ্ঞান, শারীরবিদ্যা এবং সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের আলোকে ৩টি যৌক্তিক প্রশ্ন
💨
১. তীব্র দুর্গন্ধ ও গ্যাস নির্গমন
মানবদেহ মৃত্যুর পর পচনের ফলে পুট্রেসিন (Putrescine) এবং ক্যাডাভারিন (Cadaverine)-এর মতো উদ্বায়ী জৈব যৌগ নির্গত করে, যা অত্যন্ত তীব্র এবং কটু দুর্গন্ধযুক্ত। এক বছর ধরে একটি বদ্ধ বা খোলা স্থানে পচনশীল দেহের উপস্থিতি কোনোভাবেই অলক্ষিত থাকা সম্ভব নয়। [9]
👁️
২. শারীরিক ক্রিয়ার অনুপস্থিতি
একজন জীবিত মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস, চোখের পলক ফেলা, এবং শরীরের সূক্ষ্ম নড়াচড়া সর্বদা বজায় থাকে। এক বছর ধরে একজন মানুষ খাদ্য গ্রহণ করছে না, পানি পান করছে না—এমন একটি সম্পূর্ণ নিশ্চল মূর্তিকে দেখেও সন্দেহ না জাগা বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বকেই নির্দেশ করে।[10]
🧠
৩. গায়েব বনাম চাক্ষুষ বাস্তবতা
আয়াতটি দাবি করে যে, জ্বিনেরা গায়েব জানত না। কিন্তু সুলাইমানের মৃত্যু কোনো ‘গায়েব’ বা অদৃশ্য বিষয় ছিল না, বরং তা ছিল একটি ‘শাহাদাত’ বা চাক্ষুষ ভৌত বাস্তবতা। একটি মৃতদেহ সামনে থাকা সত্ত্বেও তা বুঝতে না পারা কোনো আধ্যাত্মিক সীমাবদ্ধতা নয়, সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের অভাব। [11]

সুতরাং, এই আখ্যানটি জ্বিনদের অদৃশ্য জ্ঞানের অভাব প্রমাণ করতে গিয়ে তাদের এতটাই সংবেদনহীন ও কাণ্ডজ্ঞানহীন হিসেবে চিত্রায়িত করেছে যে, পুরো ঘটনাটি একটি বাস্তববিবর্জিত রূপকথা হিসেবে প্রতিভাত হয়। এটি স্পষ্ট করে যে, গল্পের রচয়িতা পচন প্রক্রিয়ার গতি ও জৈবিক বাস্তবতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলেন এবং কেবল অলৌকিকত্বের মোড়ক দিয়ে একটি অতিলৌকিক বার্তাকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।


ঐতিহাসিক ও মিথলজিক্যাল উৎসঃ ইহুদি মিদ্রাশ ও লোকগাঁথা

কোরআনে বর্ণিত সুলাইমানের এই মৃত্যু আখ্যানটি কোনো আকস্মিক ঐশ্বরিক প্রকাশ নয়, বরং এর মূল নিহিত রয়েছে তৎকালীন আরবে প্রচলিত ইহুদি লোককথা এবং মিদ্রাশিক ঐতিহ্যের মধ্যে। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের (Comparative Religion) বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, সুলাইমান (বা সলোমন) সম্পর্কিত অনেক অলৌকিক কাহিনী ব্যাবিলনীয় তালমুদ (Babylonian Talmud) এবং পরবর্তীকালের ইহুদি উপকথা ‘হ্যাগাদাহ’ (Aggadah) থেকে গৃহীত। [12] বিশেষ করে, রাজা সলোমনের আংটি, জ্বিন বা দানবদের (Asmodeus) ওপর তার নিয়ন্ত্রণ এবং তার মৃত্যুর পর একটি লাঠির মাধ্যমে সত্য গোপনের বিষয়টি প্রাচীন সেমেটিক লোকগাঁথায় বিভিন্নভাবে বিদ্যমান ছিল। ইহুদি ও খ্রিস্টান ঐতিহ্যের সমান্তরাল উপাদানগুলো নিম্নরূপ:

ঐশ্বরিক বাণী নাকি লোকজ রূপকথা?
তালমুদ, মিদ্রাশ এবং প্রাচীন লোকগাঁথা থেকে গল্পের বিবর্তনের ৩টি উৎস
📚
১. তালমুদীয় প্রভাব
ব্যাবিলনীয় তালমুদের ‘গিটিন ৬৮এ-বি’ (Gittin 68a-b) অংশে সলোমন এবং আশমেদাই নামক দানবের এক দীর্ঘ কাহিনী বর্ণিত আছে, যেখানে সলোমনকে সিংহাসনচ্যুত করার এবং অলৌকিক শক্তির ছদ্মবেশ ধারণের উল্লেখ পাওয়া যায়। মৃত্যু কাহিনী হুবহু না থাকলেও, জ্বিনদের ধোঁকা দেওয়া এবং লাঠির গুরুত্ব সেখানে সুস্পষ্ট। [13]
🏺
২. সিরিয়াক ও ইহুদি মিদ্রাশ
সুলাইমানের মৃত্যু এবং পোকা দিয়ে লাঠি খাওয়ার নির্দিষ্ট মোটিফটি মূলত সমসাময়িক ইহুদি কিংবদন্তিগুলোর সাথে মিলে যায়। গবেষকদের মতে, এই ধরণের গল্পগুলো নীতিশিক্ষামূলক রূপকথা (Parable) হিসেবে প্রচলিত ছিল, যা পরবর্তীতে ঐতিহাসিক সত্য বা ঐশ্বরিক বাণী হিসেবে কুরানিয় টেক্সটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।[14]
🎭
৩. লোকগাঁথার বিবর্তন
লোককাহিনীর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো অতিশয়োক্তি (Hyperbole)। একজন প্রতাপশালী রাজা মারা যাওয়ার পরও তার ভয়ে প্রজারা কাজ করে যাচ্ছে—এটি রাজকীয় ক্ষমতার দাপট বোঝাতে একটি শক্তিশালী অলঙ্কার। কিন্তু এই আলঙ্কারিক রূপকথাকে আক্ষরিক অর্থে ধর্মগ্রন্থে স্থান দেওয়ায় তা প্রাকৃতিক নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। [15]

সুলাইমানের এই কাহিনীটি আসলে প্রাচীন নিকট প্রাচ্যের (Near East) প্রচলিত মিথলজির একটি আরবিক সংস্করণ মাত্র। বৈজ্ঞানিক বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে এই ধরণের রূপকথাকে গ্রহণ করা এটাই প্রমাণ করে যে, টেক্সটটি সমকালীন জ্ঞান ও প্রচলিত লোকবিশ্বাসের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারেনি। বরং এটি সেই সময়ের মানুষের কল্পনাপ্রসূত আখ্যানকেই প্রতিফলিত করে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের আলোয় বিচার করলে কোনো ভিত্তি খুঁজে পায় না।


উপসংহারঃ আধুনিক যুক্তিবাদ ও বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা

সমগ্র আলোচনার প্রেক্ষিতে এটি সুষ্পষ্ট যে, সূরা সাবা’র ১৪ নম্বর আয়াতে বর্ণিত সুলাইমানের মৃত্যুর আখ্যানটি কোনোভাবেই একটি ভৌত বা ঐতিহাসিক বাস্তব ঘটনা হতে পারে না। বায়োলজিক্যাল ডিকম্পোজিশন বা পচন প্রক্রিয়ার অমোঘ নিয়ম, মহাকর্ষীয় স্থিতিশীলতার পদার্থবৈজ্ঞানিক সূত্র এবং ফরেনসিক ট্যাপোনমির কোনো মানদণ্ডেই একটি মৃতদেহ এক বছর লাঠির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। [5] বরং ঐতিহাসিক ও টেক্সচুয়াল বিশ্লেষণে এটিই প্রমাণিত হয় যে, এই বর্ণনাটি প্রাচীন সেমেটিক লোকগাঁথা ও ইহুদি মিদ্রাশিক ঐতিহ্যের একটি অবৈজ্ঞানিক সংস্করণ মাত্র, যা তৎকালীন আরবের প্রচলিত লোকবিশ্বাসকে প্রতিফলিত করে। [14] ২১শ শতাব্দীর জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোয় দাঁড়িয়ে এই ধরণের অলৌকিক দাবিকে আক্ষরিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা কেবল বৌদ্ধিক পশ্চাদপদতা নয়, বরং তা মানবজাতির অর্জিত বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির প্রতি একটি চরম অবমাননা। যখন কোনো বিবরণ জৈবিক ও ভৌত উভয় নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে, তখন তাকে ‘অলৌকিকতা’র দোহাই দিয়ে জায়েজ করার চেষ্টা মূলত যুক্তির কাছে পরাজয় স্বীকার করারই নামান্তর। সত্য কোনো অন্ধ বিশ্বাস বা শাস্ত্রীয় দাবি নয়, বরং তা অভিজ্ঞতা এবং অকাট্য প্রমাণনির্ভর হতে বাধ্য। [16] সুতরাং, সুলাইমানের এই কাহিনীটি প্রাচীন সাহিত্যের একটি চমৎকার রূপক বা নীতিকথা হতে পারে, কিন্তু একে একটি বাস্তব বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে উপস্থাপনের যে কোনো প্রচেষ্টা আধুনিক যুক্তিবাদের আলোকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত এবং অসার।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সূরা সাবা, আয়াত ১৪ 1 2
  2. সূরা সাবা, আয়াত ১৪ ↩︎
  3. তাফসীরে মাযহারী, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬০৪, ৬০৫ ↩︎
  4. DiMaio, D., & DiMaio, V. J. (2001). Forensic Pathology ↩︎
  5. Vass, A. A. (2001). Beyond the grave: understanding human decomposition 1 2
  6. Halliday, D., Resnick, R., & Walker, J. (2014). Fundamentals of Physics ↩︎
  7. Goff, M. L. (2009). A Fly for the Prosecution: How Insect Evidence Helps Solve Crimes ↩︎
  8. Green, D. W., & Kretschmann, D. E. (1994). Properties of Wood and Structural Wood Products ↩︎
  9. Vass, A. A., et al. (2002). Decomposition chemistry of human remains ↩︎
  10. Shier, D., Butler, J., & Lewis, R. (2018). Hole’s Human Anatomy & Physiology ↩︎
  11. Lane, E. W. (1863). Arabic-English Lexicon ↩︎
  12. Ginzberg, L. (1909). The Legends of the Jews ↩︎
  13. The Babylonian Talmud, Tractate Gittin ↩︎
  14. Reynolds, G. S. (2010). The Qur’an and Its Biblical Subtext 1 2
  15. Newby, G. D. (1988). The Making of the Last Prophet ↩︎
  16. Hitchens, C. (2007). God Is Not Great ↩︎