
Table of Contents
- 1 ভূমিকা: নৈতিকতার উৎস ও আস্তিক্যবাদী দাবির ব্যবচ্ছেদ
- 2 ইউথিফ্রো ডাইলেমা: ঐশ্বরিক নৈতিকতার দ্বন্দ্ব
- 3 ঈশ্বরের নৈতিকতা এবং অনন্ত পশ্চাদপসরণ
- 4 বৃত্তাকার যুক্তি এবং নৈতিক বিচারের স্বাধীনতা
- 5 নৈতিকতার সেকুলার ধারণা: বিবর্তন, যুক্তি ও সমাজ
- 6 ইসলামের ঈশ্বর আল্লাহ কী নৈতিক চরিত্র?
- 7 উপসংহারঃ স্বায়ত্তশাসিত নৈতিকতার অনিবার্যতা
ভূমিকা: নৈতিকতার উৎস ও আস্তিক্যবাদী দাবির ব্যবচ্ছেদ
আধুনিক দর্শন এবং নীতিবিদ্যার (Ethics) আলোচনায় একটি মৌলিক ও চিরন্তন প্রশ্ন হলো: নৈতিকতার কি কোনো বস্তুনিষ্ঠ (objective) ভিত্তি আছে? আস্তিকতা প্রচারক বা আস্তিক্যবাদী চিন্তাবিদগণ, বিশেষ করে যারা ‘ডিভাইন কমান্ড থিওরি’ (Divine Command Theory) সমর্থন করেন, তারা দৃঢ়ভাবে দাবি করেন যে নৈতিকতার অস্তিত্বের জন্য একজন পরম ঈশ্বর বা অলৌকিক উৎসের উপস্থিতি অপরিহার্য। তাদের যুক্তি অনুযায়ী, ঈশ্বর ছাড়া ‘ভালো-মন্দ’-এর কোনো সার্বজনীন বা ধ্রুবক মানদণ্ড থাকতে পারে না এবং নৈতিকতা শেষ পর্যন্ত ঐশ্বরিক আদেশের ওপরই নির্ভরশীল [1]। এই অবস্থান থেকে দাবি করা হয় যে, যদি কোনো উচ্চতর বিচারক না থাকেন, তবে নৈতিকতা কেবল ব্যক্তিগত রুচি বা অস্থায়ী সামাজিক রীতির বিষয়ে পরিণত হয়।
তবে এই আস্তিক্যবাদী অবস্থানটি প্রাচীনকাল থেকেই গুরুতর যৌক্তিক এবং দার্শনিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। যদি নৈতিকতা কেবল ঈশ্বরের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে, তবে তা একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব বা ‘ডাইলেমা’ তৈরি করে, যা নৈতিকতার স্থায়িত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। বর্তমান প্রবন্ধে আমরা প্লেটোর ‘ইউথিফ্রো ডাইলেমা’ থেকে শুরু করে বার্ট্রান্ড রাসেল, জন স্টুয়ার্ট মিল এবং রিচার্ড ডকিন্সের আধুনিক সমালোচনা পর্যন্ত বিশ্লেষণ করবো। আমাদের আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো এটি দেখানো যে, ঈশ্বর-নির্ভর নৈতিকতার যুক্তিগুলো অভ্যন্তরীণভাবে অসংগতিপূর্ণ এবং তা প্রায়শই অনন্ত পশ্চাদপসরণ (Infinite Regress) অথবা বৃত্তাকার যুক্তির (Tautology) জালে আটকা পড়ে। কারণ তখন প্রশ্ন ওঠে, উচ্চতর বিচারক বা নৈতিক বিধানদাতা ছাড়া ঈশ্বর কি তাহলে নৈতিক কিনা, সেই বিবেচনা।
একইসাথে, এই প্রবন্ধে আমরা নৈতিকতার বিকল্প এবং অধিকতর শক্তিশালী ভিত্তিগুলো অন্বেষণ করবো। আমরা দেখব কীভাবে:
বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সহমর্মিতা (Empathy) এবং সহযোগিতা কোনো অতিপ্রাকৃত দান নয়, বরং এটি আমাদের টিকে থাকার লড়াইয়ে এক জৈবিক প্রয়োজনীয়তা। আদিম যুগে দলবদ্ধভাবে বসবাসের ফলে যারা একে অপরকে সাহায্য করত, তাদের বেঁচে থাকার এবং বংশবৃদ্ধির সম্ভাবনা বেশি ছিল। রিচার্ড ডকিন্স তাঁর ‘The Selfish Gene’ বইয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে পরার্থপরতা বা Altruism বিবর্তনীয়ভাবে জিনের টিকে থাকার স্বার্থেই বিকশিত হয়েছে।
সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে পারস্পরিক শান্তি ও সুবিধার জন্য মানুষ নিজেরা কিছু নৈতিক নিয়ম তৈরি করে নিয়েছে। এই ‘সামাজিক চুক্তি’ অনুযায়ী, অন্যের ক্ষতি না করার বিনিময়ে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। নৈতিকতা এখানে কোনো আসমানি বিধান নয়, বরং সুষ্ঠু সমাজ পরিচালনার এক অপরিহার্য কাঠামো। থমাস হবস ও জন লক তাদের দর্শনে দেখিয়েছেন যে সমাজবদ্ধ মানুষের পারস্পরিক সমঝোতাই হলো নৈতিকতা ও আইনের মূল ভিত্তি।
কোনো অলৌকিক সত্তার ভয় বা পুরস্কারের আশা ছাড়াই স্রেফ যুক্তি ও বুদ্ধিবাদ ব্যবহার করে ভালো-মন্দের বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড নির্ধারণ করা সম্ভব। মানুষের দুঃখ লাঘব এবং সামগ্রিক কল্যাণকে ভিত্তি ধরলে যুক্তি দিয়ে বোঝা যায় কেন চুরি বা হত্যা অনৈতিক। অর্থাৎ নৈতিকতার জন্য ধর্মের প্রয়োজন নেই, বরং কাণ্ডজ্ঞানই যথেষ্ট। ইমানুয়েল কান্টের ‘Categorical Imperative’ তত্ত্ব অনুযায়ী যুক্তি দিয়েই বিশ্বজনীন নৈতিক নিয়ম তৈরি করা সম্ভব।
এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট করা হবে যে, নৈতিকতা কোনো ঐশ্বরিক ডিক্রি বা আসমানি কিতাবের মুখাপেক্ষী নয়; বরং এটি মানুষের বিবর্তন, বুদ্ধিবৃত্তি এবং সামাজিক কাঠামোর এক অনিবার্য ও যৌক্তিক ফলাফল।
ইউথিফ্রো ডাইলেমা: ঐশ্বরিক নৈতিকতার দ্বন্দ্ব
প্লেটোর ‘ইউথিফ্রো’ (Euthyphro) সংলাপে বর্ণিত সক্রেটিসের সেই অমর প্রশ্নটি আজও আস্তিক্যবাদী নৈতিকতার ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দেয়। সক্রেটিস প্রশ্ন করেছিলেন: “কোনো কাজ কি ‘ভালো’ বলেই ঈশ্বর সেটি পছন্দ করেন, নাকি ঈশ্বর সেটি পছন্দ করেন বলেই তা ‘ভালো’?” [2]। এই একটি প্রশ্ন ঐশ্বরিক নৈতিকতাকে একটি দ্বিমুখী সংকটে বা ‘ডাইলেমা’-তে ফেলে দেয়, যার কোনো সমাধান ডিভাইন কমান্ড থিওরির সমর্থকদের কাছে নেই।
ডাইলেমার প্রথম শাখা: নৈতিকতা ঈশ্বরের ঊর্ধ্বে
যদি আমরা প্রথম শাখাটি গ্রহণ করি—অর্থাৎ কোনো কাজ ‘ভালো’ বলেই ঈশ্বর তা পছন্দ করেন—তবে স্বীকার করে নিতে হয় যে ‘ভালো-মন্দের’ একটি স্বতন্ত্র এবং বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড আগে থেকেই বিদ্যমান। ঈশ্বর কেবল সেই মানদণ্ডটি চিনে নিয়ে আমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। এর অর্থ হলো, নৈতিকতা ঈশ্বরের ওপর নির্ভর করে না; বরং ঈশ্বরই নৈতিকতার সেই স্বাধীন নিয়মের অনুসারী। এক্ষেত্রে ঈশ্বর আর নৈতিকতার ‘স্রষ্টা’ থাকেন না, বড়জোর একজন ‘বার্তা বাহক’ বা ‘প্রশাসক’ হিসেবে গণ্য হন। অর্থাৎ তিনি নৈতিকতার নিয়ম ঠিকভাবে পালন করা হচ্ছে কিনা, সেটি দেখভালের দায়িত্ব আছেন মাত্র, তিনি নিজেও সেই নৈতিক নিয়মাবলী মেনে চলেন। ফলে নৈতিকতার যৌক্তিক ব্যাখ্যার জন্য ঈশ্বরের অস্তিত্ব আর অপরিহার্য থাকে না।
ডাইলেমার দ্বিতীয় শাখা: নৈতিকতা ঈশ্বরের খেয়ালখুশি
যদি দ্বিতীয় শাখাটি গ্রহণ করা হয়—অর্থাৎ ঈশ্বর পছন্দ করেন বলেই কোনো কিছু ‘ভালো’ হয়—তবে নৈতিকতা সম্পূর্ণ স্বৈরাচারী (arbitrary) হয়ে পড়ে। কারণ, ঈশ্বর যদি ন্যায়-অন্যায়ের ঊর্ধ্বে থেকে স্রেফ তার ইচ্ছানুসারে আদেশের মাধ্যমে তা নির্ধারণ করেন, তবে নৈতিকতার পেছনে কোনো যৌক্তিক ভিত্তি থাকে না। ঈশ্বর যদি কাল আদেশ দিতেন যে “নিরপরাধ শিশুকে হত্যা করা পুণ্য,” তবে ডিভাইন কমান্ড থিওরি অনুযায়ী সেটিই ‘ভালো’ হিসেবে গণ্য হতো। অর্থাৎ, ভালো-মন্দের সংজ্ঞা তখন স্রেফ ঈশ্বরের ক্ষমতার দাপটে নির্ধারিত হয়, যুক্তির ভিত্তিতে নয় [1]।
‘ঈশ্বরের প্রকৃতি’ সংক্রান্ত আত্মপক্ষ সমর্থনের অসারতা
ইউথিফ্রো ডাইলেমার মুখে অনেক আধুনিক ধর্মতাত্ত্বিক (যেমন রবার্ট মেরিহিউ অ্যাডামস) দাবি করেন যে, ঈশ্বরের আদেশ খামখেয়ালি বা স্বৈরাচারী নয়, কারণ তাঁর ‘প্রকৃতি’ (Nature) বা স্বভাবই হলো মঙ্গলময় [3]। তবে এই যুক্তি আসলে সমস্যাটি সমাধান করার বদলে তাকে স্রেফ এক ধাপ পিছিয়ে দেয় মাত্র। একে দর্শনের ভাষায় বলা হয় ‘সেমান্টিক শাফলিং’ বা শব্দের মারপ্যাঁচ। মূল প্রশ্নটি তখন দাঁড়ায়: ঈশ্বরের প্রকৃতি কি ‘মঙ্গলময়’ কারণ তিনি মঙ্গলের একটি স্বাধীন মানদণ্ড পূরণ করেন? নাকি ‘মঙ্গল’ মানেই হলো ঈশ্বরের প্রকৃতি যা-ই হোক না কেন তা-ই?
প্রথমত, ঈশ্বর যে স্বভাবগতভাবেই মঙ্গলময়, তার সপক্ষে প্রমাণ কী? যুক্তি কী? প্রমাণ বা যুক্তি ছাড়া আমরা কীভাবে তা অন্ধভাবে বিশ্বাস করে নিবো? দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, ঈশ্বর যদি মঙ্গলময় স্বভাবের দোহাই দিয়ে একটি খারাপ কাজ করতে বলেন, তখন সেই কাজটি খারাপ তা প্রমাণ করার উপায় কোথায়? সেটি তো আনফলসিফায়েবল বা প্রমাণ-অযোগ্য হয়ে যাবে। একটি উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কার করা যাক। ধরুন, একজন রাজা দাবি করলেন যে তাঁর প্রতিটি আদেশই ন্যায়সঙ্গত, কারণ তাঁর ‘চরিত্র’ বা ‘স্বভাব’ জন্মগতভাবেই ন্যায়পরায়ণ। এখন রাজা যদি কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যার আদেশ দেন, তবে কি আমরা স্রেফ তাঁর ‘স্বভাবের’ দোহাই দিয়ে সেই হত্যাকে ‘ন্যায়বিচার’ বলে মেনে নেব? যদি আমরা বলি—‘রাজা যা-ই করবেন তা-ই ন্যায়’, তবে ন্যায়ের আর কোনো আলাদা অর্থ থাকে না; এটি স্রেফ রাজার ক্ষমতার নামান্তর হয়ে পড়ে। আর যদি আমরা বলি—‘না, এই হত্যা অন্যায় কারণ এটি ন্যায়ের আদর্শ বিরোধী’, তবে আমরা পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিচ্ছি যে ‘ন্যায়’ বা ‘ভালো’-র একটি মানদণ্ড রাজার ঊর্ধ্বে বা বাইরে বিদ্যমান [4]।
একইভাবে, যদি ‘মঙ্গল’ মানেই হয় স্রেফ ‘ঈশ্বরের প্রকৃতি’, তবে ‘ঈশ্বর মঙ্গলময়’—এই বাক্যটি একটি অন্তঃসারশূন্য পুনরুক্তি (Tautology)-তে পরিণত হয়, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘ঈশ্বর ঈশ্বরের মতো’। এখানে আসলে শব্দের মারপ্যাঁচ খেলে মূল বিষয়টি আড়াল করা হচ্ছে।
যেমন ধরুন, -করিমের বাড়ি কোথায়? -রহিমের বাড়ির সামনে। -রহিমের বাড়ি কোথায়? -করিমের বাড়ির পেছনে। -তাহলে দুইজনার বাড়ি কোথায়? -সামনে পেছনে। এভাবে বাড়ির ঠিকানা দিলে সেটির কোন আলাদা অর্থই তৈরি হয় না।
ঈশ্বরের স্বভাবী মঙ্গলময় বললে ‘মঙ্গল’ শব্দটির নিজস্ব কোনো নৈতিক গুরুত্ব থাকে না। তর্কের খাতিরে, যদি ঈশ্বরের প্রকৃতি নিষ্ঠুর হতো এবং তিনি মিথ্যা বলা বা প্রতারণা করা পছন্দ করতেন, তবে কি আমরা সেই নিষ্ঠুরতাকেই ‘মঙ্গল’ বলতাম? যদি উত্তর হয় ‘না’, তবে এটিই প্রমাণ করে যে আমরা ঈশ্বর-নিরপেক্ষ একটি স্বাধীন ও যুক্তিনির্ভর মানদণ্ড দিয়েই কোনো কিছুকে ‘ভালো’ বা ‘মন্দ’ হিসেবে বিচার করি।
সুতরাং, নৈতিকতাকে যদি যৌক্তিক এবং অর্থবহ হতে হয়, তবে তাকে অবশ্যই কোনো অলৌকিক সত্তার ‘প্রকৃতি’ বা ‘আদেশের’ ঊর্ধ্বে একটি স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে হবে [1]। ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে নৈতিকতাকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা তাই শেষ পর্যন্ত একটি লজিক্যাল লুপ বা চক্রাকার যুক্তিতে আটকে পড়ে।
ঈশ্বরের নৈতিকতা এবং অনন্ত পশ্চাদপসরণ
যদি দাবি করা হয় যে নৈতিকতা বা ‘মঙ্গলময়তা’ বজায় রাখার জন্য কোনো উচ্চতর কর্তৃপক্ষের আদেশ বা নৈতিক নির্দেশিকা (Moral Code) অপরিহার্য, তবে প্রশ্ন জাগে: ঈশ্বর নিজে কীভাবে ‘সর্বমঙ্গলময়’ হলেন? ঈশ্বর যদি কোনো উচ্চতর ‘সুপার-ঈশ্বর’ বা বাহ্যিক নৈতিক রেফারেন্স ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মঙ্গলময় হতে পারেন, তবে এটিই প্রমাণিত হয় যে—নৈতিকতা কোনো বাহ্যিক উৎসের ওপর আবশ্যিকভাবে নির্ভরশীল নয়। অর্থাৎ, নৈতিকতা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ধারণা হতে পারে যা কোনো আদেশদাতার মুখাপেক্ষী নয়।
বার্ট্রান্ড রাসেল তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘Why I Am Not a Christian’ এ যুক্তি দিয়েছেন যে, ঈশ্বর যদি কোনো উচ্চতর নৈতিক বিধান ছাড়াই ‘ভালো’ হতে পারেন, তবে মানুষের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। যদি কোনো উৎস ছাড়াই ঈশ্বরের পক্ষে নৈতিক হওয়া সম্ভব হয়, তবে মানুষের নৈতিক হওয়ার জন্যও কোনো অতিপ্রাকৃত উৎসের প্রয়োজন নেই [5]। এর বিপরীতে, যদি কেউ দাবি করেন যে নৈতিক হওয়ার জন্য অবশ্যই একজন ‘উচ্চতর সত্তা’ লাগবে, তবে ঈশ্বরকেও নৈতিক হতে হলে তাঁর চেয়েও বড় একজন ‘সুপার-গড’-এর প্রয়োজন পড়বে। সেই সুপার-গডকে নৈতিক হতে হলে তাঁরও একজন উর্ধ্বতন গাইড লাগবে—এভাবে একটি অনন্ত পশ্চাদপসরণ (Infinite Regress) তৈরি হয় যা যুক্তির খাতিরে গ্রহণযোগ্য নয়।
এই লজিক্যাল লুপ বা চক্রটি এটিই নির্দেশ করে যে, নৈতিকতার অস্তিত্বের জন্য কোনো অলৌকিক সত্তার উপস্থিতি যৌক্তিকভাবে বাধ্যতামূলক বা অনিবার্য নয়। যদি ঈশ্বরের ক্ষেত্রে কোনো ‘গাইডবুক’ বা ‘সুপার-কমান্ডার’ ছাড়াই নৈতিক হওয়া সম্ভব হয়, তবে মানুষের ক্ষেত্রেও বিবর্তনীয় বিকাশ, সামাজিক চুক্তি এবং বিশুদ্ধ যুক্তিবাদ ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী ও বস্তুনিষ্ঠ নৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব [6]। সুতরাং, নৈতিকতার জন্য ঈশ্বরের প্রয়োজনীয়তা কেবল একটি দাবি মাত্র, যা যুক্তির নিক্তিতে টেকে না।
বৃত্তাকার যুক্তি এবং নৈতিক বিচারের স্বাধীনতা
যদি নৈতিকতার কোনো স্বাধীন মানদণ্ড না থাকে এবং ‘ভালো’ বা ‘মঙ্গল’ শব্দটির অর্থ কেবল “ঈশ্বরের ইচ্ছা” হয়, তবে “ঈশ্বর মঙ্গলময়” বলার অর্থ দাঁড়ায় “ঈশ্বর যা ইচ্ছা করেন, তা-ই করেন” অথবা “ঈশ্বর ঈশ্বরের মতো” [4]। এখানে ‘মঙ্গল’ শব্দটির কোনো স্বতন্ত্র নৈতিক গুণ বা তাৎপর্য অবশিষ্ট থাকে না। জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর ‘Three Essays on Religion’ গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছেন যে, আমরা যদি ঈশ্বরকে ‘ভালো’ বলে প্রশংসা করি, তবে অবশ্যই ‘ভালো’ শব্দটির এমন একটি অর্থ থাকতে হবে যা ঈশ্বরের ঊর্ধ্বে বা ঈশ্বর থেকে স্বতন্ত্র। অন্যথায়, ঈশ্বরের প্রশংসা করা স্রেফ একটি অর্থহীন চাটুকারিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
বাস্তবতা হলো, মানুষ যখন কোনো ধর্মগ্রন্থ পড়ে বা ঈশ্বরের কোনো কাজের বর্ণনা শোনে, তখন সে অবচেতনভাবেই একটি স্বাধীন যুক্তিবাদী মানদণ্ড প্রয়োগ করে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ধর্মগ্রন্থে যদি নৈতিকতার নামে নিরপরাধ হত্যা বা দাসপ্রথাকে সমর্থন করা হয়, তবে আধুনিক মানুষ তার নিজস্ব বিবেক ও যুক্তি দিয়ে তাকে ‘অন্যায্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করে। এই যে বিচার করার ক্ষমতা—যা দিয়ে আমরা নির্ধারণ করি ঈশ্বরের কোন আদেশটি ‘ভালো’ আর কোনটি ‘মন্দ’—তা-ই প্রমাণ করে যে নৈতিকতার মূল উৎস ঈশ্বরের আদেশের বাইরে মানুষের যুক্তি ও বিবেকের মধ্যে নিহিত।
সুতরাং, নৈতিকতা কোনো আসমানি আদেশ নয় যা অন্ধভাবে মেনে নিতে হয়। বরং, এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া। যদি আমাদের নৈতিকতা পুরোপুরি ঈশ্বরের ওপর নির্ভরশীল হতো, তবে আমাদের পক্ষে ঈশ্বরের কোনো কাজকে ‘ভালো’ বা ‘ন্যায়সঙ্গত’ বলে মূল্যায়ন করা অসম্ভব হতো। কারণ, মূল্যায়ন করার জন্য যে তুলনামূলক মানদণ্ড প্রয়োজন, তা তখন আমাদের কাছে থাকত না। এই বিচারক্ষমতাই প্রমাণ করে যে, নৈতিকতা একটি স্বায়ত্তশাসিত ক্ষেত্র যা কোনো অলৌকিক সত্তার মুখাপেক্ষী নয় [6]।
নৈতিকতার সেকুলার ধারণা: বিবর্তন, যুক্তি ও সমাজ
রিচার্ড ডকিন্স তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The God Delusion’—এ একটি অকাট্য যুক্তি তুলে ধরেছেন: যদি ঈশ্বরের নিজের নৈতিক হওয়ার জন্য কোনো উচ্চতর ঈশ্বর বা ‘গাইডবুক’-এর প্রয়োজন না হয়, তবে মানুষের ক্ষেত্রে কেন ধর্মগ্রন্থকে অপরিহার্য বলা হবে? এটি একটি দ্বিচারিতা। ডকিন্স দেখিয়েছেন যে, নৈতিকতা আসলে আমাদের জিনের মধ্যে প্রোথিত একটি বিবর্তনীয় কৌশল। ডারউইনীয় বিবর্তনবাদ অনুযায়ী, যেসব আদিম মানুষ একে অপরের সাথে সহযোগিতা করত এবং সহমর্মিতা প্রদর্শন করত, তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা ছিল বেশি। অর্থাৎ, পরার্থপরতা বা অন্যের মঙ্গল করা কোনো আধ্যাত্মিক গুণ নয়, বরং এটি প্রজাতির অস্তিত্ব রক্ষার একটি জৈবিক প্রয়োজনীয়তা [7]।
জীববিজ্ঞানী রবার্ট ট্রিভার্সের ‘পারস্পরিক আলট্রুইজম’ (Reciprocal Altruism) তত্ত্ব এই বিষয়টিকে আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ বুঝতে পেরেছে যে, “আমি যদি অন্যের ক্ষতি না করি, তবে অন্যরাও আমার ক্ষতি করবে না”—এই সহজ গাণিতিক ও যৌক্তিক বোধ থেকেই আদিম নৈতিকতার জন্ম হয়েছে [8]। এটি কোনো আসমানি কিতাব থেকে আসেনি, বরং লক্ষ লক্ষ বছরের সামাজিক মিথস্ক্রিয়া থেকে অর্জিত হয়েছে।
অন্যদিকে, আধুনিক রাজনৈতিক ও নৈতিক দর্শনে জন রলসের ‘ভেইল অব ইগনোর্যান্স’ (Veil of Ignorance) মডেলটি দেখায় যে কীভাবে কোনো ঈশ্বর ছাড়াই সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ এবং নিরপেক্ষ নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। রলস যুক্তি দেন যে, যদি আমরা এমন এক কাল্পনিক অবস্থায় থাকি যেখানে আমরা জানি না যে সমাজে আমাদের অবস্থান কী হবে (ধনী না দরিদ্র, সবল না দুর্বল), তবে আমরা অবশ্যই এমন নিয়ম তৈরি করব যা সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে [9]। এই যে ‘ন্যায্যতা’ বা ‘ফেয়ারনেস’-এর বোধ, এটি সম্পূর্ণ যুক্তিনির্ভর এবং ঈশ্বর-নিরপেক্ষ।
পরিশেষে, নৈতিকতা কোনো অলৌকিক ডিক্রি নয়। এটি মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে:
সহমর্মিতা হলো আমাদের বিবর্তনীয়ভাবে প্রাপ্ত একটি মৌলিক জৈবিক বৈশিষ্ট্য। এটি কোনো অলৌকিক উৎস থেকে আসেনি, বরং প্রজাতি হিসেবে টিকে থাকার প্রয়োজনে আমাদের মস্তিষ্কের মিরর নিউরনের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে। ফ্রান্স ডি ওয়াল তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে মানুষের পাশাপাশি অন্যান্য উচ্চতর প্রাণীদের মধ্যেও এই সহজাত সহমর্মিতা বিদ্যমান রয়েছে।
যুক্তি হলো সেই হাতিয়ার যা দিয়ে আমরা আমাদের প্রতিটি কাজের ফলাফল বা পরিণাম বিচার করি। নৈতিকতা কোনো অন্ধ আদেশ নয়, বরং এটি একটি যুক্তিনির্ভর প্রক্রিয়া যেখানে আমরা বোঝার চেষ্টা করি কোন কাজটি সার্বিক মঙ্গলের জন্য সহায়ক এবং কোনটি ক্ষতিকর। ইউটিলিটারিয়ানিজম বা উপযোগবাদ অনুযায়ী আমরা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি দিয়েই ভালো-মন্দের বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড নির্ধারণ করতে পারি।
সামাজিক চুক্তি সমাজবদ্ধভাবে শান্তিতে বসবাসের একটি অলিখিত গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা। যখন ব্যক্তি স্বীকার করে যে সে অন্যের ক্ষতি করবে না যাতে অন্যরাও তার ক্ষতি না করে, তখনই একটি সুশৃঙ্খল নৈতিক সমাজ গঠিত হয়। জঁ-জাক রুসো এবং জন লকের মতে, এই পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমেই মানুষ প্রাকৃতিক বিশৃঙ্খলা থেকে বেরিয়ে একটি আধুনিক ও নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলেছে।
সুতরাং, নৈতিক হওয়ার জন্য কোনো অদৃশ্য বিচারকের ভয় বা কোনো পবিত্র গ্রন্থের নির্দেশের প্রয়োজন নেই; বরং উন্নত মানব সমাজ গঠনের জন্য স্বাধীন চিন্তা ও সহমর্মিতাই যথেষ্ট।
ইসলামের ঈশ্বর আল্লাহ কী নৈতিক চরিত্র?
এই প্রসঙ্গে একটি হাদিস পড়তে হবে, এবং এই বিষয়ে ইসলামের বিশ্বাস আসলে কী তা পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য। এই হাদিসটিতে বলা হচ্ছে, আল্লাহ যদি কোন কারণ ছাড়াই অনর্থক সকল মানুষকে জাহান্নামে প্রেরণ করে দিতেন, অর্থাৎ চরম অনৈতিক একটি কাজ করতেন, তখনও আল্লাহ যালিম সাব্যস্ত হতেন না। তখনো তিনি ন্যায় বিচারক এবং নৈতিকই থাকতেন। এই কথাটির অর্থ কি বলুন তো? [10] –
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. তৃতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাকদীরের প্রতি ঈমান
১১৫-(৩৭) ইবনু আদ্ দায়লামী (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)-এর নিকট পৌঁছে আমি তাকে বললাম, তাক্বদীর সম্পর্কে আমার মনে একটি সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। তাই আপনি আমাকে কিছু হাদীস শুনান যাতে আল্লাহর মেহেরবানীতে আমার মন থেকে (তাক্বদীর সম্পর্কে) এসব সন্দেহ-সংশয় দূরীভূত হয়। তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা যদি সমস্ত আকাশবাসী ও দুনিয়াবাসীকে শাস্তি দিতে ইচ্ছা করেন, তবে তা দিতে পারেন। এতে আল্লাহ যালিম বলে সাব্যস্ত হবেন না। পক্ষান্তরে তিনি যদি তাঁর সৃষ্টজীবের সকলের প্রতিই রহমত করেন, তবে তাঁর এ রহমত তাদের জন্য সকল ‘আমল হতে উত্তম হবে। সুতরাং তুমি যদি উহুদ পাহাড়সম স্বর্ণও আল্লাহর পথে দান কর, তোমার থেকে তিনি তা গ্রহণ করবেন না, যে পর্যন্ত তুমি তাক্বদীরে বিশ্বাস না করবে এবং যা তোমার ভাগ্যে ঘটেছে তা তোমার কাছ থেকে কক্ষনো দূরে চলে যাবে না- এ কথাও তুমি বিশ্বাস না করবে, আর যা এড়িয়ে গেছে তা কক্ষনো তোমার নিকট আর আসবে না- এ বিশ্বাস স্থাপন করা ব্যতীত যদি তোমার মৃত্যু হয় তবে অবশ্যই তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
ইবনু আদ্ দায়লামী বলেন, উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)-এর এ বর্ণনা শুনে আমি সাহাবী ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস্‘ঊদ (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনিও আমাকে এ কথাই প্রত্যুত্তর করলেন। তিনি বলেন, তারপর হুযায়ফাহ্ ইবনু ইয়ামান (রাঃ)-এর নিকট যেয়েও জিজ্ঞেস করলাম। তিনিও আমাকে একই প্রত্যুত্তর করলেন। এরপর যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ)-এর কাছে আসলাম। তিনি স্বয়ং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম করেই আমাকে একই ধরনের কথা বললেন। (আহমাদ, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্)(1)
(1) সহীহ : আহমাদ ২১১৪৪, আবূ দাঊদ ৪৬৯৯, ইবনু মাজাহ্ ৭৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
ইসলামী ধর্মতত্ত্বে নৈতিকতার ভিত্তি কী, তা বোঝার জন্য এই মিশকাতুল মাসাবীহ-র ১১৫ নম্বর হাদিসটি একটি অকাট্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। এই হাদিসে দেখা যাচ্ছে, সাহাবী উবাই ইবনু কা‘ব এবং পরবর্তীতে জায়দ ইবনু সাবিত স্বয়ং নবীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলছেন যে, “আল্লাহ তা‘আলা যদি সমস্ত আকাশবাসী ও দুনিয়াবাসীকে শাস্তি দিতে ইচ্ছা করেন, তবে তা দিতে পারেন। এতে আল্লাহ যালিম বলে সাব্যস্ত হবেন না”। এই বক্তব্যটি নৈতিকতার একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ও শক্তিশালী দিক উন্মোচন করে। সাধারণ মানবিক যুক্তিতে, কোনো কারণ ছাড়াই নিরপরাধ মানুষকে শাস্তি দেওয়া চরম অনৈতিকতা এবং ‘জুলুম’ হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু এই হাদিস অনুযায়ী, আল্লাহর ক্ষেত্রে ‘জুলুম’ বা ‘অন্যায়ের’ সংজ্ঞা সাধারণ যুক্তির তোয়াক্কা করে না।
এই বিশ্বাসের মূলে রয়েছে ইসলামের ‘আশারী’ (Ash’arite) ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান, যেখানে মনে করা হয় যে—কোনো কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘ভালো’ বা ‘মন্দ’ নয়। বরং আল্লাহ যা আদেশ করেন তা-ই ‘ভালো’ এবং তিনি যা নিষেধ করেন তা-ই ‘মন্দ’। এখানে নৈতিকতা কোনো স্বাধীন যৌক্তিক মানদণ্ড নয়, বরং তা স্রেফ ঈশ্বরের ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। যদি আল্লাহ সকল মুমিন বা নেককার মানুষকে কোনো কারণ ছাড়াই জাহান্নামে পাঠান, তবে ইসলামের এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী আল্লাহ তবুও ‘ন্যায়বিচারক’ থাকবেন। কারণ, ইসলামী পরিভাষায় ‘জুলুম’ মানে হলো অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা। যেহেতু মহাবিশ্বের সবকিছুই আল্লাহর নিরঙ্কুশ মালিকানাধীন, তাই তিনি তাঁর সৃষ্টির সাথে যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন—সেটি মানুষের চোখে যতই নিষ্ঠুর মনে হোক না কেন, তাতে তাঁর মালিকানা বা ন্যায়বিচারের কোনো হানি ঘটে না [11]।
এই ধারণাটি ‘ইউথিফ্রো ডাইলেমা’-র দ্বিতীয় শাখাকেই (ঈশ্বর পছন্দ করেন বলেই তা ভালো) চূড়ান্ত রূপ দান করে। যদি নৈতিকতা কেবল আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে এবং তিনি যদি অনর্থক শাস্তি দিয়েও ‘যালিম’ না হন, তবে নৈতিকতা হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ স্বৈরাচারী বা খামখেয়ালি (Arbitrary)। এর ফলে ‘আল্লাহ ন্যায়বিচারক’—এই প্রশংসাসূচক বাক্যটি তার নৈতিক তাৎপর্য হারিয়ে ফেলে। কারণ, ন্যায়বিচার বা মঙ্গলের যদি কোনো স্বাধীন ও ধ্রুবক মানদণ্ড না থাকে, তবে আল্লাহ যা-ই করুন না কেন তাকেই ‘ন্যায়বিচার’ বলতে আমরা বাধ্য হই। এটি নৈতিকতাকে একটি ‘Might is Right’ বা ‘যার ক্ষমতা আছে তার কথাই আইন’—এই দর্শনে পরিণত করে।
সুতরাং, এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, ইসলামের ঈশ্বর কোনো স্বাধীন নৈতিক মানদণ্ড দ্বারা পরিচালিত হন না; বরং কথিত আল্লাহর ইচ্ছাই নৈতিকতার মানদণ্ড তৈরি করে। কিন্তু পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদগুলোতে আমরা যেমন দেখেছি, নৈতিকতা যদি কেবল ক্ষমতার দাপটে বা কোনো ইচ্ছার ওপর নির্ধারিত হয়, তবে তা আর ‘বস্তুনিষ্ঠ নৈতিকতা’ থাকে না। ঈশ্বরের নিজের যদি কোনো স্বাধীন ‘ভালো-মন্দের’ বিধান মেনে চলার বাধ্যবাধকতা না থাকে, তবে সেই ঈশ্বরকে ‘সর্বমঙ্গলময়’ বলা কেবল একটি অর্থহীন আনুগত্য প্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি পুনরায় প্রমাণ করে যে, নৈতিকতাকে অর্থবহ হতে হলে তাকে অবশ্যই কোনো ঐশ্বরিক ইচ্ছা বা অলৌকিক আদেশের ঊর্ধ্বে একটি স্বাধীন যৌক্তিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
উপসংহারঃ স্বায়ত্তশাসিত নৈতিকতার অনিবার্যতা
এই সম্পূর্ণ আলোচনা এবং দার্শনিক ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে, “নৈতিকতার বস্তুনিষ্ঠ ভিত্তির জন্য উর্ধতন সত্তা বা ঈশ্বর অপরিহার্য”—আস্তিক্যবাদীদের এই চিরাচরিত দাবিটি যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক কোনো কষ্টিপাথরেই টিকে থাকে না। ইউথিফ্রো ডাইলেমা অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রমাণ করে যে, নৈতিকতা হয় ঈশ্বরের ঊর্ধ্বে কোনো স্বাধীন মানদণ্ড, অথবা এটি ঈশ্বরের একটি খামখেয়ালি আদেশ। উভয় ক্ষেত্রেই নৈতিকতার উৎস হিসেবে ঈশ্বরের একক কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ণ হয়। অন্যদিকে, অনন্ত পশ্চাদপসরণ এবং বৃত্তাকার যুক্তির অসারতা নির্দেশ করে যে, ঈশ্বরকে নৈতিকতার ভিত্তি হিসেবে ধরা কেবল একটি যৌক্তিক ভ্রান্তি নয়, বরং এটি নৈতিকতাকে সংজ্ঞাহীন করে ফেলে।
যদি ঈশ্বরের নিজের মঙ্গলময় হওয়ার জন্য কোনো উচ্চতর কর্তৃপক্ষ বা ঐশ্বরিক নির্দেশিকার প্রয়োজন না হয়, তবে একই যুক্তি মানুষের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। নৈতিকতা কোনো অতিপ্রাকৃত দান নয়; বরং এটি আমাদের বিবর্তনীয় উত্তরাধিকার এবং লব্ধ বুদ্ধিবৃত্তির এক সম্মিলিত ফসল। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান, সমাজতাত্ত্বিক চুক্তি এবং রলসের ন্যায়বিচার তত্ত্বের মতো সেকুলার মডেলগুলো প্রমাণ করে যে, কোনো অলৌকিক সত্তার উপস্থিতি বা নরকের ভয় ছাড়াই একটি শক্তিশালী, বস্তুনিষ্ঠ এবং মানবিক নৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব [7]।
পরিশেষে বলা যায়, নৈতিকতাকে ধর্ম বা ঈশ্বরের কারাগার থেকে মুক্ত করা কেবল একটি দার্শনিক বিজয় নয়, বরং এটি মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বিশ্বজনীন নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য। যখন আমরা বুঝতে শিখি যে নৈতিকতার ভিত্তি কোনো ‘আসমানি হুকুম’ নয়, বরং পারস্পরিক সহমর্মিতা ও যুক্তি—তখনই আমরা প্রকৃত অর্থে একটি দায়িত্বশীল এবং প্রগতিশীল সমাজ গঠনের পথে এগিয়ে যেতে পারি। নৈতিকতা ঈশ্বরের মুখাপেক্ষী নয়, বরং এটি মানুষের বিবেক ও যুক্তিবোধের এক স্বায়ত্তশাসিত মহিমা। এই স্বায়ত্তশাসিত নৈতিকতাই আজকের মানবাধিকার, পরিবেশ ন্যায়বিচার এবং বৈশ্বিক নৈতিকতার একমাত্র নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।
তথ্যসূত্রঃ
- Alston, W. P. Divine Nature and Human Language 1 2 3
- Plato, Euthyphro, 10a ↩︎
- Adams, R. M. Finite and Infinite Goods ↩︎
- Mill, J. S. Three Essays on Religion 1 2
- Russell, B. Why I Am Not a Christian ↩︎
- Nielsen, K. Ethics Without God 1 2
- Dawkins, R. The God Delusion 1 2
- Trivers, R. The Evolution of Reciprocal Altruism ↩︎
- Rawls, J. A Theory of Justice ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ১১৫ ↩︎
- Al-Ghazali, The Incoherence of the Philosophers ↩︎
