শিক্ষিত ওহী লেখকের ধর্মত্যাগ এবং নবীর বিরুদ্ধে তার অভিযোগ

ভূমিকাঃ ওহী লিখন এবং অলৌকিকত্বের মনস্তত্ত্ব

ইসলামি ইতিহাসের প্রাথমিক যুগে ওহী বা ঐশ্বরিক বাণী সংকলনের প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই প্রক্রিয়ায় যারা লিপিবিশারদ হিসেবে জড়িত ছিলেন, তাদের সততা ও বিশ্বস্ততা ছিল নবুয়তের প্রামাণিকতার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। তবে সহিহ হাদিসের পাতায় এমন কিছু ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়, যা ওহীর বিশুদ্ধতা এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর গভীর সংশয়ের ছায়া ফেলে। বিশেষ করে একজন শিক্ষিত খ্রিস্টান ওহী লেখকের ইসলাম ত্যাগ এবং পরবর্তীতে তার মৃতদেহ কবর থেকে বারবার নিক্ষিপ্ত হওয়ার ঘটনাটি কেবল একটি ধর্মতাত্ত্বিক ‘অলৌকিক’ কাহিনী নয়; বরং এটি নবীর জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং তথাকথিত অলৌকিকত্বের আড়ালে মানবিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে।

এই প্রবন্ধে আমরা সেই ব্যক্তির করা চাঞ্চল্যকর দাবি—যেখানে তিনি ওহীর উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন—এবং তার মৃত্যুর পর সংঘটিত ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা বিশ্লেষণ করব। একইসাথে, নবীর নৈশকালীন গতিবিধি এবং সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে কোনো সম্ভাব্য যোগসূত্র আছে কি না, তাও একটি যৌক্তিক দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করা হবে।


ওহী লেখকের চ্যালেঞ্জঃ ঐশ্বরিক জ্ঞান বনাম মানবিক শ্রুতিলিপি

ওহী সংকলনের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি হলো সেই শিক্ষিত খ্রিস্টান ব্যক্তির ঘটনা, যিনি ইসলাম গ্রহণ করে সূরা বাকারাহ ও সূরা আলে-ইমরান শিক্ষা করেছিলেন এবং মুহাম্মদের জন্য ওহী লিখতেন। সহিহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী, এই ব্যক্তি পরবর্তীতে ধর্মত্যাগ করেন এবং পুনরায় খ্রিস্টধর্মে ফিরে যান। তবে তার প্রস্থানের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার করা দাবিটি। তিনি জনসমক্ষে প্রচার করতে থাকেন যে, “আমি মুহাম্মাদকে যা লিখে দিতাম, তার চেয়ে বেশি কিছু তিনি জানেন না” [1]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬১/ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য
পরিচ্ছেদঃ ৬১/২৫. ইসলামে নুবুওয়াতের নিদর্শনাবলী।
৩৬১৭. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক খ্রিস্টান ব্যক্তি মুসলিম হল এবং সূরা বাকারাহ ও সূরা আলে-ইমরান শিখে নিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য সে ওহী লিখত। অতঃপর সে আবার খ্রিস্টান হয়ে গেল। সে বলতে লাগল, আমি মুহাম্মাদ -কে যা লিখে দিতাম তার চেয়ে বেশি কিছু তিনি জানেন না। (নাউজুবিল্লাহ) কিছুদিন পর আল্লাহ্ তাকে মৃত্যু দিলেন। খ্রিস্টানরা তাকে দাফন করল। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, কবরের মাটি তাকে বাইরে নিক্ষেপ করে দিয়েছে। এটা দেখে খ্রিস্টানরা বলতে লাগল- এটা মুহাম্মাদ এবং তাঁর সাহাবীদেরই কাজ। যেহেতু আমাদের এ সাথী তাদের হতে পালিয়ে এসেছিল। এ জন্যই তারা আমাদের সাথীকে কবর হতে উঠিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে। তাই যতদূর পারা যায় গভীর করে কবর খুঁড়ে তাকে আবার দাফন করল। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, কবরের মাটি তাকে আবার বাইরে ফেলে দিয়েছে। এবারও তারা বলল, এটা মুহাম্মাদ ও তাঁর সাহাবীদের কান্ড। তাদের নিকট হতে পালিয়ে আসার কারণে তারা আমাদের সাথীকে কবর হতে উঠিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে। এবার আরো গভীর করে কবর খনন করে দাফন করল। পরদিন ভোরে দেখা গেল কবরের মাটি এবারও তাকে বাইরে নিক্ষেপ করেছে। তখন তারাও বুঝল, এটা মানুষের কাজ নয়। কাজেই তারা লাশটি ফেলে রাখল। (মুসলিম ৫০/৫০ হাঃ ২৭৮১, আহমাদ ১৩৩২৩) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৩৪৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৩৫৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

ওহী

এই দাবিটি অত্যন্ত গুরুতর, কারণ এটি সরাসরি ওহীর ঐশ্বরিক উৎসকে চ্যালেঞ্জ করে। যদি মুহাম্মদ কেবল তা-ই জানতেন যা লেখক লিখে দিচ্ছেন, তবে ওহী কি আসলে ঈশ্বরের বাণী ছিল, নাকি এটি একটি যৌথ সাহিত্যিক প্রচেষ্টার ফসল—এই প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই একজন যুক্তিবাদীর মনে উদয় হয়। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, ইমাম মুসলিম এই হাদিসটি তার সংকলনে গ্রহণ করলেও ওই ব্যক্তির করা সুনির্দিষ্ট এই অভিযোগটি (যে নবী তার লেখার বাইরে কিছু জানতেন না) এড়িয়ে গেছেন, যা তথ্যের ‘সিলেক্টিভ এডিটিং’ বা বিব্রতকর তথ্য গোপনের একটি প্রয়াস হতে পারে। একজন ওহী লেখকের এই ইনসাইডার দৃষ্টিভঙ্গি ইঙ্গিত দেয় যে, তৎকালীন শিক্ষিত সমাজে ওহী প্রাপ্তির প্রক্রিয়াটি নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ বিদ্যমান ছিল।[2]

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫১। মুনাফিকদের বিবরণ ও তাদের বিধানাবলী
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৬৯৩৩ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৭৮১
৬৯৩৩-(১৪/২৭৮১) মুহাম্মাদ ইবনু রাফি (রহঃ) ….. আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানী নাজ্জার এর এক লোক আমাদের সাথে ছিল। সে সূরাহ্ আল-বাকারাহ এবং সূরাহ্ আ-লি ইমরান তিলাওয়াত করেছিল। সে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে কাতিবে ওয়াহীর দায়িত্ব পালন করত। পরে পালিয়ে গিয়ে সে কিতাবীদের সাথে মিলে যায়। রাবী বলেন, তারা তাকে খুব সমাদর করল এবং বলল, এ ব্যক্তিটি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাতিব ছিল। এতে তারা খুবই আনন্দিত হলো। এরপর বেশি দেরী হয়নি, আল্লাহ তা’আলা তাদের মাঝেই তাকে ধ্বংস করে দিলেন। তারপর তারা তার জন্য গর্ত করে তাকে ঢেকে দিলো। সকালে দেখা গেল যে, জমিন তার লাশ বের করে উপরে ফেলে দিয়েছে। তারপর আবার তারা গর্ত করে তাকে পুতে দিলো। সকালে দেখা গেল যে, জমিন তার লাশটি বের করে উপরে ফেলে দিয়েছে। তারপর পুনরায় তারা তার জন্য গর্ত করে তাকে তাতে পুঁতে বালু সকলে দেখা গেল, এবারও জমিন তার লাশ বের করে মাটির উপর ফেলে দিয়েছে। কাজেই তারা তাকে নিক্ষিপ্ত অবস্থায় পরিত্যাগ করলো। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৭৮৩, ইসলামিক সেন্টার ৬৮৩৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)


অলৌকিকত্বের ব্যবচ্ছেদঃ কবরের মাটি বনাম মানবিক হস্তক্ষেপ

ওহী লেখকের ধর্মত্যাগ এবং তার মৃত্যুর পর কবরের মাটি তাকে গ্রহণ না করার এই অলৌকিক দাবিটি বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। প্রথমত, বুখারি শরীফের বর্ণনায় ওই ব্যক্তি যে দাবিটি করেছিলেন—অর্থাৎ ওহীর সীমাবদ্ধতা এবং নবীর জ্ঞানের উৎস নিয়ে যে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন—তা তৎকালীন ওহী সংকলন প্রক্রিয়ার বিশুদ্ধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

দ্বিতীয়ত, কবরের মাটি তাকে নিক্ষেপ করার অলৌকিক দাবিটি কেবল এই একটি ক্ষেত্রেই কেন সীমিত থাকল? যদি ধর্মত্যাগ বা নবীর সমালোচনা করাই মাটির লাশ প্রত্যাখ্যানের কারণ হয়, তবে ইতিহাসের পরবর্তী হাজার বছরে এমন লক্ষ লক্ষ সমালোচক ও ধর্মত্যাগীদের ক্ষেত্রে কেন একই ঘটনা দেখা যায় না? বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পচনশীল জৈব দেহকে মাটির বাইরে নিক্ষেপ করা কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম নয়।

এই প্রেক্ষিতে একটি ক্রিটিকাল সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হাদিস থেকেই আমরা জানি, নবী মাঝেমধ্যেই গভীর রাতে একা একা ঘর থেকে বের হয়ে জান্নাতুল বাকী বা অন্য নির্জন স্থানে যেতেন। এমনকি তার স্ত্রী আয়িশা যখন তার পিছু নিয়েছিলেন, তখন তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে আঘাতও করেছিলেন [3]। এই নৈশকালীন গোপন গতিবিধির সাথে কি সেই ব্যক্তির লাশ কবর থেকে বের করার কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে? যেহেতু খ্রিস্টানরা অভিযোগ করেছিল যে এটি ‘মুহাম্মাদ ও তাঁর সাহাবীদের কাজ’, সেহেতু এটি অসম্ভব নয় যে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং ওহীর বিশুদ্ধতা নিয়ে ওই ব্যক্তির তোলা অভিযোগের প্রভাব কমাতে কোনো মানবিক কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল। অলৌকিকত্বের এই কাহিনী মূলত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জকে অলৌকিক ভীতির মাধ্যমে চাপা দেওয়ার প্রয়াস হিসেবে দেখা যেতে পারে।


আয়িশার সাক্ষ্যঃ নবীর নৈশকালীন গতিবিধি এবং গোপনীয়তা

সেই ওহী লেখকের লাশ কবর থেকে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর খ্রিস্টানরা সরাসরি অভিযোগ করেছিল যে, এটি মুহাম্মদ ও তার অনুসারীদের কাজ। এই অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নবীর সমসাময়িক ব্যক্তিগত জীবন এবং তার নৈশকালীন গতিবিধি বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি। সহিহ হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, মুহাম্মদ মাঝেমধ্যেই গভীর রাতে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে ঘর থেকে বের হতেন। এমন একটি ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় আয়িশার বর্ণনায়।

আয়িশা জানান, এক রাতে মুহাম্মদ অত্যন্ত সন্তর্পণে বিছানা ত্যাগ করেন, যেন আয়িশা টের না পান। কিন্তু আয়িশা সন্দেহবশত তার পিছু নেন এবং দেখতে পান তিনি জান্নাতুল বাকী গোরস্তানে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে দোয়া করছেন। আয়িশা যখন দ্রুত ফিরে এসে শুয়ে পড়লেন, মুহাম্মদ তাকে হাঁপাতে দেখে চিনে ফেলেন যে তিনিই সেই ‘ছায়ামূর্তি’ যা তিনি বাইরে দেখেছিলেন। এই ঘটনার পর মুহাম্মদ আয়িশাকে যে প্রতিক্রিয়া দেখান, তা লক্ষ্য করার মতো। আসুন হাদিসটি পড়ি। হযরত আয়শা হতে বর্ণিত, রাতের অন্ধকারে ঘর থেকে বের হয়ে গেলে, আয়িশা পিছু নেয়ার কারণে তিনি (মুহাম্মদ) আমাকে বুকের ওপর আঘাত করলেন যা আমাকে ব্যথা দিল [4] [5]

সূনান নাসাঈ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৭/ স্ত্রীর সাথে ব্যবহার
পরিচ্ছেদঃ ৪. আত্মাভিমান
৩৯৬৫. সুলায়মান ইবন দাউদ (রহঃ) … মুহাম্মদ ইবন কায়স (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়েশা (রাঃ) থেকে শুনেছি, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আমার ব্যাপারে কি তোমাদেরকে বর্ণনা করব না? আমরা বললাম, কেন করবেন না? তিনি বললেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামআমার পালার রাতে (ইশার সালাত আদায়ের পর) ফিরে আসলেন। তারপর তার জুতা পায়ের দিকে রাখলেন, তাঁর চাদর রেখে দিলেন এবং তাঁর একটি লুঙ্গি বিছানার উপর বিছালেন।
তারপর তিনি মাত্র এতটুকু সময় অবস্থান করলেন যতক্ষণে তাঁর ধারণা হল যে, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। তারপর উঠে আস্তে করে জুতা পরলেন এবং আস্তে করে তার চাদর নিলেন। তারপর আস্তে করে দরজা খুললেন এবং বের হয়ে আস্তে দরজা চাপিয়ে দিলেন। আর আমি মাথার উপর দিয়ে কামিজটি পরিধান করলাম, ওড়না পরলাম এবংচাদরটি গায়ে আবৃত করলাম ও তার পিছনে চললাম, তিনি বাকীতে আসলেন এবং তিনবার হাত উঠালেন ও বহুক্ষণ দাঁড়ালেন, তারপর ফিরে আসছিলেন। আমিও ফিরে আসছিলাম। তিনি একটু তীব্রগতিতে চললেন, আমিও তীব্রগতিতে চললাম, তিনি দৌড়ালেন, আমিও দৌড়ালাম। তিনি পৌছে গেলেন, তবে আমি তার আগে পৌছে গেলাম।
ঘরে প্রবেশ করেই শুয়ে পড়লাম। তিনিও প্রবেশ করলেন এবং বললেনঃ হে আয়েশা! কি হয়েছে তোমার পেট যে ফুলে গেছে।
বর্ণনাকারী সুলায়মান বলেন, ইবন ওয়াহাব (رابية) এর পরিবর্তে (حشيا) দ্রুত চলার কারণে হাঁপিয়ে ওঠা শব্দটি বলেছেন বলে ধারণা করছি। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঘটনা কি বল, নচেৎ আল্লাহ্ যিনি সূক্ষ্মদর্শী ও সম্যক পরিজ্ঞাত, তিনিই আমাকে খবর দিবেন।
আমি বললাম, আমার পিতামাতা আপনার প্রতি উৎসর্গ হোক এবং ঘটনাটির বর্ণনা দিলাম। রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে তুমিই সেই (ছায়ামূর্তি) যা আমি আমার সামনে দেখছিলাম? আমি বললাম, হ্যাঁ। আয়েশা (রাঃ) বললেন, এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বক্ষে একটি মুষ্ঠাঘাত করলেন যা আমাকে ব্যথা দিল। তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি কি ধারণা করেছ আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল তোমার উপর যুলুম করবে? আয়েশ্ম (রাঃ) বললেন, লোক যতই গোপন করুক না কেন, আল্লাহ্ তা নিশ্চিত জানেন।
রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ নিশ্চয়ই তুমি যখন আমাকে দেখছিলে তখন জিবরীল (আঃ) আমার কাছে এসেছিলেন। তুমি যে (শুয়ে যাওয়ায়) কাপড় খুলে ফেলেছ। তাই জিবরীল (আঃ) প্রবেশ করেননি। তোমার থেকে গোপন করে আমাকে ডাকলেন, আমিও তোমার থেকে গোপন করে উত্তর দিলাম। মনে করলাম, তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ। তোমাকে জাগিয়ে দেওয়াটা পছন্দ করলাম না এবং এ ভয়ও ছিল যে, (আমি চলে যাওয়ার কারণে) তুমি নিঃসঙ্গতা বােধ করবে। জিবরীল (আঃ) আমাকে নির্দেশ দিলে বাকীতে অবস্থানকারীদের কাছে যাই এবং তাদের রব্বের কাছে তাদের জন্য ক্ষমা চাই।
তাহক্বীকঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মুহাম্মদ ইবন কায়স (রহঃ)

ওহী 1
ওহী 3

মুহাম্মদের এই শারীরিক প্রতিক্রিয়া এবং গভীর রাতে অত্যন্ত গোপনে ঘর থেকে বের হওয়ার প্রবণতাটি যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। যদি একজন নবীকে কেবল জান্নাতুল বাকীতে দোয়া করার জন্য অতটা গোপনীয়তা অবলম্বন করতে হয় যে, নিজ স্ত্রীর কাছ থেকেও তা লুকিয়ে রাখতে হয়, তবে সেই ‘গোপনীয়তা’ অন্য কোনো রাজনৈতিক বা কৌশলগত উদ্দেশ্যের দিকেও ইঙ্গিত করতে পারে। খ্রিস্টানদের সেই অভিযোগ—যে নবী নিজেই রাতের আঁধারে লাশটি কবর থেকে বের করে এনেছেন—এই প্রেক্ষাপটে একেবারে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, নবীর একাকী নৈশভ্রমণের অভ্যাস এবং তার গোপনীয়তা রক্ষার কঠোর মানসিকতা (আয়িশার সাথে আচরণের মাধ্যমে যা প্রকাশিত) এটি প্রমাণ করে যে, লোকচক্ষুর অন্তরালে কোনো কাজ করার সক্ষমতা ও সুযোগ তার ছিল।


উপসংহারঃ অলৌকিকত্ব বনাম সংজ্ঞায়িত বাস্তবতা

ওহী লেখকের ধর্মত্যাগ এবং তার পরবর্তী পরিণতির এই পুরো উপাখ্যানটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে ‘ঐশ্বরিক শাস্তি’র চেয়েও ‘মানবিক কৌশলে’র প্রভাব বেশি স্পষ্ট। একজন উচ্চপদস্থ ওহী লেখক যখন নবীর জ্ঞানের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলে খ্রিস্টানদের সাথে যোগ দেন, তখন সেটি তৎকালীন ইসলামের অস্তিত্ব ও বিশ্বাসের ওপর এক বিরাট বুদ্ধিবৃত্তিক আঘাত ছিল। সেই ব্যক্তিকে মৃত্যুর পর ‘কবর গ্রহণ করছে না’—এমন একটি অলৌকিক বয়ান তৈরি করা ছিল ওই ব্যক্তির তোলা অভিযোগগুলোকে মিথ্যা প্রমাণ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

যদি সত্যিই মাটি তাকে প্রত্যাখ্যান করত, তবে তা ইতিহাসের একটি ধ্রুব সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতো এবং পরবর্তীকালের সকল সমালোচকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতো। কিন্তু বাস্তবিকে আমরা দেখি, এমন ঘটনা কেবল সেই সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংকটের মুহূর্তেই ঘটেছে। আয়িশার বর্ণনায় পাওয়া নবীর রহস্যময় নৈশকালীন গতিবিধি এবং গোপনীয়তা রক্ষার জন্য পেশীশক্তির ব্যবহার এটিই ইঙ্গিত দেয় যে, অলৌকিকত্বের মোড়কে আসলে এক গভীর রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো হয়েছিল। ওহীর বিশুদ্ধতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নকে অলৌকিক ভীতির মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়ার এই প্রক্রিয়াটি তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় অত্যন্ত সফল হলেও, আধুনিক যৌক্তিক বিশ্লেষণে এটি নবীর মানবিক ও রাজনৈতিক কৌশলের একটি উদাহরণ হিসেবেই চিহ্নিত হয়।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৩৬১৭ ↩︎
  2. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৬৯৩৩ ↩︎
  3. সূনান নাসাঈ, হাদিসঃ ৩৯৬৫ ↩︎
  4. সূনান নাসাঈ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৯৬৫ ↩︎
  5. সহিহ মুসলিম, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, তৃতীয় খণ্ড, হাদিসঃ ২১২৮ ↩︎