
Table of Contents
- 1 ভূমিকাঃ পর্দার রাজনীতি ও দাসীদের সামাজিক অবমাননা
- 2 শারীরিক বর্ণনা ও ‘তাদরিবু ছাদিয়্যাহুন্না’র প্রকৃত অর্থঃ পণ্য বনাম মানুষ
- 3 উমরের কঠোর শাসন: পর্দা করার অপরাধে দাসীকে প্রহার
- 4 প্রখ্যাত আলেমদের বক্তব্যঃ উমর দাসীদের পেটাতেন
- 5 দাসীর সতর ও আউরাঃ পশুর ন্যায় আইনি অবস্থান
- 6 উপসংহার: ছদ্ম-পর্দা ও ধর্মীয় বৈষম্যের এক নিষ্ঠুর দলিল
ভূমিকাঃ পর্দার রাজনীতি ও দাসীদের সামাজিক অবমাননা
ইসলামি শরিয়তে পর্দার বিধানকে সাধারণত ‘শালীনতা’ বা ‘নারীর সুরক্ষা’র প্রতীক হিসেবে প্রচার করা হলেও, ইতিহাসের দালিলিক প্রমাণ বলছে এটি মূলত একটি চরম বৈষম্যমূলক সামাজিক বিভাজন বা ‘শ্রেণি প্রতীক’ (Class Marker) হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এর সবচেয়ে প্রকট উদাহরণ পাওয়া যায় ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবের আমলে। সমকালীন নির্ভরযোগ্য দলিলগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুসলিম সমাজে ‘মুক্ত নারী’ ও ‘ক্রীতদাসী’র মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখার জন্য দাসীদের ইচ্ছাকৃতভাবে প্রায় নগ্ন বা অর্ধনগ্ন অবস্থায় রাখা হতো। এই বিষয়টির বৈধতা স্বয়ং নবী মুহাম্মদের কর্মকাণ্ড থেকেই মূলত আসে, তবে খলিফা উমরের বিষয়টিকে আইনি বৈধতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। ইসলাম ধর্মের আরেক প্রখ্যাত খলিফা মুয়াবিয়ার দরবারেও নগ্ন দাসীদের উপস্থিতির বর্ণনা ইসলামিক গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায়।
প্রখ্যাত হাদিস সংকলক ইমাম বায়হাকীর ‘কিতাব আল সুনান আল কুবরা’ থেকে জানা যায়, খলিফা উমরের ঘরে দাসীরা যখন মেহমানদের সেবা করতেন, তখন তাদের চুল উন্মুক্ত থাকতো এবং তাদের শারীরিক সজ্জা ছিল আধুনিক যেকোনো সভ্যতার বিচারে চরম অবমাননাকর।। আধুনিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী এই বর্ণনাটিকে হাসান বা বিশুদ্ধ হিসেবে সত্যায়ন করেছেন। যা ‘এই হাদিসটি মিথ্যা’—এরূপ এপোলোজেটিক দাবিগুলোকে সম্পূর্ণরূপে খণ্ডন করে।
হাদিসের বর্ণনায় এসেছে যে, আনাস বিন মালিক বলছেন— উমরের দাসীগণ যখন আগত অতিথিদের খাবার বা পানীয় পরিবেশন করতেন, তখন তাদের মাথার চুল খোলা থাকতো এবং তাদের স্তনগুলো নড়াচড়া করতো অথবা লম্বা চুলগুলো তাদের উন্মুক্ত স্তনের ওপর বারবার আছড়ে পড়তো। এখানে ব্যবহৃত আরবি শব্দবন্ধ ‘تضرب ثديهن’ (তাদরিবু ছাদিয়্যাহুন্না) দ্বারা সরাসরি খোলা বা উন্মুক্ত স্তনের দৃশ্যমানতা এবং নড়াচড়াকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। এই ঐতিহাসিক সত্যটি প্রমাণ করে যে, ইসলামের তথাকথিত ‘স্বর্ণযুগে’ও দাসীদের শরীরের ওপর তাদের নিজস্ব কোনো অধিকার ছিল না; বরং মালিকের সামাজিক আভিজাত্য প্রকাশের জন্য তাদের দেহের অংশবিশেষ জনসম্মুখে উন্মুক্ত রাখা হতো। এই প্রবন্ধে আমরা উমরের দাসী প্রহার এবং উন্মুক্ত স্তনে খাদ্য পরিবেশনের ইসলামিক দলিলগুলো আলোচনা করবো। উল্লেখ্য, ইসলামে ক্রীতদাসীর সতর বা পর্দা হচ্ছে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত। এই বিষয়ে এই প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে বিধায় এই প্রবন্ধে সেই সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে না। আগ্রহীগণ এই বিষয়ের ওপর বিস্তারিত প্রবন্ধটি পড়ুন।
শারীরিক বর্ণনা ও ‘তাদরিবু ছাদিয়্যাহুন্না’র প্রকৃত অর্থঃ পণ্য বনাম মানুষ
ইসলামি খিলাফতের স্বর্ণযুগে ক্রীতদাসীদের সামাজিক ও আইনি অবস্থান বুঝতে হলে আমাদের ওপরের হাদিসটির শব্দচয়ন এবং তার গভীর বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। হাদিসটিতে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ও স্পর্শকাতর শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে— “تضرب ثديهن” (তাদরিবু ছাদিয়্যাহুন্না)। এর শাব্দিক অর্থ হলো “তাদের স্তনে আঘাত করছিল” বা “তাদের স্তনগুলো দুলছিল”। আনাস বিন মালিকের (রা.) বর্ণনা অনুযায়ী, খলিফা উমরের দাসীরা যখন আগত মেহমানদের সেবা করতো, তখন তাদের খোলা চুলগুলো তাদের উন্মুক্ত স্তনের ওপর বারবার আছড়ে পড়তো অথবা চলাফেরার সময় তাদের স্তনগুলো দৃশ্যমানভাবে আন্দোলিত হতো।
এই হাদিসটি প্রখ্যাত ফতোয়া ও হাদিস বিষয়ক ওয়েবসাইট ইসলাম ওয়েব ডট নেট থেকে সংগৃহীত। মূল হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে ইমাম বায়হাকীর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাব আল সুনান আল কুবরা’-তে। [1]। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী তাঁর ‘ইরওয়াউল গালীল’ গ্রন্থে এই বর্ণনাটির তাহক্বীক বা বিশুদ্ধতা যাচাই করেছেন এবং একে ‘হাসান’ (Good) বা শক্তিশালী হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। [2]। উল্লেখ্য, একটি হাদিস ঐতিহাসিকভাবে কতটুকু নির্ভরযোগ্য তা নির্ণয়ের পদ্ধতিকেই বলা হয় তাহক্বীক। বায়হাকীর ‘সুনান আল কুবরা’-র মূল বর্ণনাটি নিচে দেওয়া হলো [3]
كتاب السنن الكبرى » كتاب الصلاة » جماع أبواب لبس المصلي » باب عورة الأمة
بحث في نص الكتاب معلومات عن الكتاب كتاب السنن الكبرى
2جزءالتالي صفحة
227
السابق
3127 ( وأخبرنا ) أبو القاسم عبد الرحمن بن عبيد الله الحرفي ببغداد ، أنبأ علي بن محمد بن الزبير الكوفي ، ثنا الحسن بن علي بن عفان ، ثنا زيد بن الحباب عن حماد بن سلمة ، قال : حدثني ثمامة بن عبد الله بن أنس عن جده أنس بن مالك قال : كن إماء عمر – رضي الله عنه – يخدمننا كاشفات عن شعورهن ، تضرب ثديهن .
قال الشيخ : والآثار عن عمر بن الخطاب – رضي الله عنه – في ذلك صحيحة ، وإنها تدل على أن رأسها ورقبتها وما يظهر منها في حال المهنة ليس بعورة ، فأما حديث عمرو بن شعيب فقد اختلف في متنه ؛ فلا ينبغي أن يعتمد عليه في عورة الأمة ، وإن كان يصلح الاستدلال به وبسائر ما يأتي عليه معه في عورة الرجل . وبالله التوفيق
হাদিসের ইংরেজি অনুবাদ:
Thumama bin Abdullah bin Anas told me on the authority of his grandfather Anas bin Malik who said: They were the slave girls of Umar (may God be pleased with him) who served us, revealing their hair, hitting their breasts.
এই বর্ণনায় ব্যবহৃত “تضرب ثديهن” (তাদরিবু ছাদিয়্যাহুন্না) অংশটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর শাব্দিক অর্থ হলো “চুলগুলো তাদের স্তনে আঘাত করছিল।” আরব্য ভাষাবিদ এবং হাদিস বিশারদদের মতে, এই বর্ণনার মূল উদ্দেশ্য হলো এটি বোঝানো যে, দাসীদের বক্ষদেশ বা স্তন উন্মুক্ত ছিল বলেই দীর্ঘ চুলগুলো সরাসরি সেখানে গিয়ে আঘাত করছিল। যদি তাদের শরীর আবৃত থাকতো, তবে স্তনের ওপর চুল দুলছে বা আঘাত করছে—এমন দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার কোনো সুযোগ থাকতো না।
এই বিষয়ে আমাদের লাইভ আলোচনায় আমরা একজন আরবি ভাষাভাষী বিশেষজ্ঞকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তিনি স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেছেন যে, আরবের তৎকালীন প্রেক্ষাপটে এবং ব্যাকরণ অনুযায়ী এই বাক্যের অর্থ হচ্ছে—দাসীদের স্তন উন্মুক্ত বা খোলা ছিল। উল্লেখ্য যে, ইমাম বায়হাকী নিজেও এই হাদিসটির নিচে টীকায় লিখেছেন যে, এটিই প্রমাণ করে যে দাসীর মাথা, ঘাড় বা কাজের সময় যা প্রকাশ পায় (বক্ষদেশ), তা পর্দার অন্তর্ভুক্ত বা ‘আউরা’ নয়। [4]। আল্লামা আলবানীও এই আমলটিকে উমরের যুগের একটি প্রতিষ্ঠিত সুন্নাহ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। [5]।
যৌক্তিক বিশ্লেষণেও বোঝা যায়, যদি এই দাসীদের শরীরের ঊর্ধ্বাংশ আবৃত থাকতো, তবে স্তনের ওপর চুল আঘাত করার মতো দৃশ্য তৈরি হওয়ার কোনো অবকাশ থাকতো না। আরবের প্রচণ্ড গরমে এবং কাজের সুবিধার্থে দাসীদের ঊর্ধ্বাংশ অনাবৃত রাখা ছিল তৎকালীন দাসপ্রথার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এই বর্ণনাটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি খিলাফতের প্রধানতম ব্যক্তিত্বদের বাড়িতেও দাসীদের স্রেফ একটি ‘পণ্য’ হিসেবে দেখা হতো, যাদের লজ্জা বা শালীনতার অধিকার স্বাধীন মুসলিম নারীদের মতো ছিল না। নাসিরুদ্দীন আলবানী এই হাদিসটির সনদকে ‘হাসান’ বা শক্তিশালী বলে সত্যায়ন করেছেন, যা এর ঐতিহাসিক সত্যতাকে আরও দৃঢ় করে।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, যেখানে স্বাধীন মুসলিম নারীদের জন্য পর্দার বিধানকে ‘শালীনতা’ ও ‘নিরাপত্তা’র দোহাই দিয়ে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, সেখানে একই সমাজে বসবাসকারী দাসীদের কেন প্রায় নগ্ন অবস্থায় জনসম্মুখে কাজ করতে বাধ্য করা হতো? এর একমাত্র উত্তর হলো— পর্দার উদ্দেশ্য আসলে নৈতিকতা বা শালীনতা রক্ষা ছিল না, বরং এটি ছিল এক ধরণের ‘শ্রেণি বিভাজন’ (Class Distinction)। অর্থাৎ, স্বাধীন সম্ভ্রান্ত নারীকে যেন চেনা যায় এবং দাসী থেকে আলাদা করা যায়, কেবল সেজন্যই হিজাব বা পর্দার বিধান ছিল। দাসীদের দেহকে উন্মুক্ত রেখে দেওয়া হতো কারণ তাদের কোনো সামাজিক মর্যাদা বা সম্মান ইসলামি আইনে স্বীকৃত ছিল না।
উমরের কঠোর শাসন: পর্দা করার অপরাধে দাসীকে প্রহার
খলিফা উমর কেবল তাঁর বাড়িতেই দাসীদের নগ্ন মস্তকে বা উন্মুক্ত অবস্থায় রাখতেন না, বরং তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে এটি নিশ্চিত করতেন যে কোনো দাসী যেন ভুলেও মুক্ত বা স্বাধীনা নারীদের মতো ওড়না বা চাদর (খিমার/জিলবাব) পরিধান না করে। সমকালীন ঐতিহাসিক দলিলগুলো সাক্ষ্য দেয় যে, কোনো দাসী নিজেকে আবৃত করতে চাইলে উমর তাকে কঠোরভাবে প্রহার করতেন। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি পর্দার মূল উদ্দেশ্য ‘শালীনতা’ রক্ষা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার যার মাধ্যমে স্বাধীন ও দাসীর মধ্যে শ্রেণিবৈষম্য বজায় রাখা হতো। নিচের হাদিসগুলো থেকে স্পষ্ট হয়, দাসীর সতর বা আউরা আসলে কতটুকু।[6] [7]
সুনান আদ-দারাকুতনী
৩. নামায
পরিচ্ছেদঃ ৩. নামাযসমূহের তালিম দেওয়া এবং এজন্য প্রহার করার নির্দেশ এবং সতরের সীমা যা ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক
৮৬৩(২). মুহাম্মাদ ইবনে মাখলাদ (রহঃ) … আমর ইবনে শুআইব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা তোমাদের শিশুদের সাত বছর বয়সে নামাযের (পড়ার) নির্দেশ দাও। তারা দশ বছর বয়সে পদার্পণ করলে নামাযের জন্য (তা না পড়লে) তাদের দৈহিক শাস্তি দাও এবং তাদের বিছানা পথক করে দাও। আর তোমাদের কেউ নিজের দাসকে বা নিজের শ্রমিককে তার দাসীর সঙ্গে বিবাহ দিলে সে যেন তার নাভির নিচ থেকে হাঁটুর উপর পর্যন্ত অঙ্গের প্রতি না তাকায়। কারণ নাভির নিচ থেকে হাঁটু পর্যন্ত সতর (অবশ্য আবরণীর অঙ্গ)।
হাদিসের মানঃ তাহকীক অপেক্ষমাণ
বর্ণনাকারীঃ আমর ইবনু শু‘আয়ব (রহঃ)
সুনান আদ-দারাকুতনী
৩. নামায
পরিচ্ছেদঃ ৩. নামাযসমূহের তালিম দেওয়া এবং এজন্য প্রহার করার নির্দেশ এবং সতরের সীমা যা ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক
৮৬৪(৩). ইউসুফ ইবনে ইয়াকূব ইবনে ইসহাক ইবনে বাহলুল (রহঃ) … আমর ইবনে শুআইব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা তোমাদের শিশুদের সাত বছর বয়সে (পৌছলে) নামায পড়ার নির্দেশ দাও। তারা দশ বছর বয়সে পদার্পণ করলে (নামায পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য) তাদের দৈহিক শাস্তি দাও এবং তাদের বিছানা (তোমাদের থেকে) পৃথক করে দাও। আর তোমাদের কেউ তার দাসকে বা শ্রমিককে বিবাহ করালে সে যেন তার (স্ত্রীর) হাঁটু ও নাভির মধ্যবর্তী অঙ্গ না দেখে। কারণ নাভি ও হাঁটুর মধ্যবর্তী অঙ্গ লজ্জাস্থানের অন্তর্ভুক্ত।
হাদিসের মানঃ তাহকীক অপেক্ষমাণ
বর্ণনাকারীঃ আমর ইবনু শু‘আয়ব (রহঃ)
এবারে আসুন আশরাফুল হিদায়া গ্রন্থটি থেকে দেখে নিই, [8]
কিতাবুল কারাহিয়াহ
৬১৫
قَالَ : وَيَنْظُرُ الرَّجُلُ مِنْ مَمْلُوكَةٍ غَيْرِه إِلى مَا يَجُوزُ أَن يَنظُرَ إِلَيْهِ مِن ذَوَاتِ مَحَارِمِهِ لِأَنَّهَا تَخْرُجُ لِحَوَائِجِ مَوْلَاهَا وَتَخْدِمُ أَضْيَافَهُ وَهِيَ فِي ثِيَابِ مَهْنَتِهَا فَصَارَ حَالُهَا خَارِجَ الْبَيْتِ فِي حَقِّ الْأَجَانِبِ كَحَالِ الْمَرْأَةِ دَاخِلَهُ فِي حَقِّ مَحَارِمِ الْأَقَارِبِ وَكَانَ عُمَرُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ إِذَا رَأَى جَارِيَةً مُتَقَنَّعَةً عَلَاهَا بِالدِّرَّةِ وَقَالَ القِ عَنْكِ الْخِمَارَ يَا دِفَارُ اتَتَشَبَّهِينَ بِالْحَرَائِرِ .
অনুবাদ: ইমাম কুদূরী (র.) বলেন, পর পুরষের জন্য অন্যের দাসীর দেহের এতটুকু অংশই দেখা জায়েজ যতটুকু তার মাহরাম মহিলার মধ্যে জায়েজ। কেননা দাসীকে কাজের পোশাক পরিধান করে তার নিজ মনিবের প্রয়োজনে বাহিরে যেতে হয় এবং তার মেহমানের সেবা করতে হয়। সুতরাং ঘরের ভিতর নিকটাত্মীয় মাহরাম পুরুষের সামনে মহিলার যে অবস্থা ঘরের বাইরে পরপুরুষের সামনে দাসীর সেই অবস্থাই হলো। হযরত ওমর (রা.) কোনো দাসীকে [দেহ ও মাথা] আবৃত অবস্থায় দেখলে দুররা মারতেন এবং বলতেন, হে দাফার! তোমরা ওড়না ফেল, তুমি কি স্বাধীনা মেয়েদের মতো হতে চাও?
প্রাসঙ্গিক আলোচনা
تَرْلُ قَالَ : وَيَنْظُرُ الرَّجُلُ مِنْ الحَ: আলোচ্য ইবারতে অন্যের মালিকানাধীন দাসীর দেহের কতটুকু অংশ দেখা যাবে তা বর্ণনা করা হয়েছে। ইমাম কুদূরী (র.) বলেন, পুরুষের জন্য তার মাহরাম মহিলার শরীরের যতটুকু অংশ দেখা জায়েজ অন্যের মালিকানাধীন দাসীর এতটুকু অংশ দেখা জায়েজ।
উল্লেখ্য যে, মাহরাম মহিলার হাত, পা, বাহু, পায়ের নলা, বুক, চুল, গলা দেখা জায়েজ। ইতঃপূর্বে এ সংক্রান্ত মাসআলা আলোচনা করা হয়েছে। কারণ দাসীদেরকে কাজের পোশাক পরিহিত অবস্থায় মনিবের প্রয়োজন সারতে ঘরের বাহিরে যেতে হয়। মনিবের মেহমানদের খেদমত করতে তাদের সামনে উপস্থিত হতে হয়। ফলে ঘরের বাইরে পরপুরুষের সামনে দাসীর অবস্থা এমন হলো যেমন একজন মহিলার অবস্থা হয় তার মাহরাম পুরুষের সামনে ঘরের ভিতরে। ইতঃপূর্বে বলা হয়েছিল যে, মাহরাম মহিলার কাছে পুরুষেরা অবাধে যাতায়াত করে, আর মহিলারা তখন কাজের পোশাকে থাকে তাই মাহরাম মহিলার বাহু, বুক, গলা ইত্যাদি দেখা জায়েজ। তদ্রূপ দাসীরা যেহেতু কাজের পোশাকে বাইরে যায় এবং তাদের মনিবের কাজ করে তাই তাদেরও সেসব অঙ্গ দেখা জায়েজ বলে সাব্যস্ত হবে।
দ্বিতীয় দলিল হলো হযরত ওমর (রা.)-এর আমল। হযরত ওমর (রা.) রাস্তা-ঘাটে কোনো দাসীকে দেহ মাথা ঢাকা অবস্থায় দেখলে ধমকাতেন ও দুররা মারতেন এবং বলতেন- الْقِ عَنْكِ الْخِمَارَ يَا دِفَارُ أَتَتَشَبَّهِبْنَ بالعرائر
অর্থাৎ ‘হে দাফার! তোমার ওড়না ফেল, তুমি কি স্বাধীনা মেয়েদের সাদৃশ্য অবলম্বন করছ?’
فار শব্দটি نزال -এর ওযনে এ থেকে নির্গত। অর্থ- দুর্গন্ধ। ৩১ অর্থ- দুর্গন্ধযুক্তা মহিলা। এখানে দাসী উদ্দেশ্য। و كَانَ عُمَرُ إِذا رَأَى جَارِيَةً مُتَقَنَّعَةٌ عَلَاهَا بِالدَّرَةِ وَقَالَ الَى عَنْكِ الْجَمَارَ يَا دِفَارُ اتَتَشَهِينَ بِالْحَرَائِرِ) (SIC হাদীস সম্পর্কে আল্লামা যায়লাঈ (র.) বলেন, এরূপ শব্দে হাদীসটি প্রমাণিত নয়। অবশ্য ইমাম বায়হাকী (র.) এর কাছাকাছি
শব্দে একটি হাদীস বর্ণনা করেন, হাদীসটি নিম্নরূপ-
عَنْ نَافِعٍ أَنَّ صَفِيَّةَ بِنْتِ أَبِي عُبَيْدٍ حَدَّثَنَهُ قَالَتْ خَرَجَتْ إمرأة مُحْتَمَرَةٌ مُتَجَلِّيبَةٌ فَقَالَ عُمَرُ مَنْ هَذِهِ الْمَرْأَةُ : أن تخَمِّرِي هَذِهِ الْآمَةَ وَتَجَلْبَهَا فَقِيلَ لَهُ جَارَبَةٌ لِفُلَانٍ – رَجُلٌ مِنْ بَيْتِهِ فَأَرْسَلَ إِلَى حَفْصَهُ فَقَالَ مَا حَمَلَكَ عَلَى أَن تُخَمري . حَتَّى هَمَمْتُ أَنْ أَفَعَ بِهَا لَا أَحْسِبُهَا إِلَّا مِنَ الْمُحْصَنَاتِ وَلَا تَشَبُّهُوا الإِمَاءَ بِالْمُحْصَنَاتِ نَصْبُ الرَّابَةِ) .
হাদীসটির সনদ সম্পর্কে হাফেজ যাহাবী (র.) বলেন, এর সনদ শক্তিশালী। বিনায়া)
মোটকথা কিতাবে উল্লিখিত শব্দে হাদীসটি যদিও প্রমাণিত নয় কিন্তু এর বক্তব্য বায়হাকীর এ বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয়।

তাফসীরে মাজহারীতেও এই হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে, [9]
শেষে বলা হয়েছে- ‘আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। একথার অর্থ-অসতর্কতা ও পার্থক্য নির্দেশক পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান না করার কারণে ইতোপূর্বে যে সকল অঘটন ঘটেছে, সে সকল কিছু সম্পর্কে আল্লাহ্ কাউকে অভিযুক্ত করবেন না। অর্থাৎ অতীতের অসুন্দর আচরণসমূহকে আল্লাহ্ ক্ষমা করে দিয়েছেন। কারণ তিনি মহাক্ষমাপরবশ ও পরম দয়ার্দ্র।
হজরত আনাস বর্ণনা করেছেন, একবার এক ক্রীতদাসী স্বাধীনাগণের মতো পর্দা করে হজরত ওমরের পাশ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলো। হজরত ওমর তার পর্দা উন্মোচন করলেন। বললেন, হতভাগিনী! মুক্ত রমণীদের মতো পর্দা করেছো কেনো? একথা বলে তিনি তার আবরণী ছুঁড়ে ফেলে দিলেন দূরে।

প্রখ্যাত আলেমদের বক্তব্যঃ উমর দাসীদের পেটাতেন
আধুনিক যুগে অনেক ইসলামি প্রচারক এই ইতিহাসগুলো আড়াল করতে চাইলেও, কট্টরপন্থী এবং জ্ঞানবান আলেমগণ সত্যটি স্বীকার করেন। আবদুল্লাহ ইবনে আবদুর রাজ্জাক এবং মুফতি ইব্রাহীমের মতো আলেমদের আলোচনায় এটি স্পষ্ট যে, দাসীদের পর্দা ফরজ নয়—এটি ইসলামের একটি অকাট্য বিধান। তারা একে ‘কাজের সুবিধার্থে ছাড়’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু একজন নারীর নিজের শরীর ঢেকে রাখার অধিকার কেড়ে নেওয়াকে তারা মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে দেখেন না।
দাসীর সতর ও আউরাঃ পশুর ন্যায় আইনি অবস্থান
ইসলামি ফিকহশাস্ত্রে দাসের অবস্থান যে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের চেয়ে গবাদি পশুর কাছাকাছি ছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো দাসীর ‘সতর’ বা আউরা সংক্রান্ত বিধান। সাধারণ মুক্ত মুসলিম নারীর জন্য যেখানে মুখমণ্ডল ও দুই হাতের কব্জি বাদে পুরো শরীর ঢাকা ফরজ, সেখানে পরপুরুষের সামনে দাসীর সতরের সীমা ছিল অবিশ্বাস্য রকমের শিথিল। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে এই আইনি অবস্থানটি অত্যন্ত অমানবিক। এর অর্থ দাঁড়ায়, একজন পরপুরুষ বা আগন্তুক মেহমান রাস্তাঘাটে বা মালিকের বাড়িতে অন্য কোনো ব্যক্তির দাসীর উন্মুক্ত স্তন, চুল, গলা বা উরুর দিকে তাকালে তা ইসলামি শরীয়তে কোনো গুনাহ বা অপরাধ নয়। ইমাম কুদূরী (র.) এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যেহেতু দাসীকে কাজের জন্য বাইরে যেতে হয় এবং মেহমানদের সেবা করতে হয়, তাই তার বুক ও চুল খোলা রাখা ‘জায়েজ’ করা হয়েছে। অর্থাৎ, মালিকের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সুবিধার জন্য দাসীর ন্যূনতম লজ্জা ও আব্রুর অধিকারকেও বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। এই বিধানটিই প্রমাণ করে যে, দাসীদের স্রেফ রক্ত-মাংসের ‘ওয়ার্কিং টুল’ বা যন্ত্র হিসেবে গণ্য করা হতো, যাদের কোনো মানবিক মর্যাদা ইসলামি আইনে স্বীকৃত ছিল না।
উপসংহার: ছদ্ম-পর্দা ও ধর্মীয় বৈষম্যের এক নিষ্ঠুর দলিল
ইসলামি শরীয়তের তথাকথিত ‘মানবিক’ দাসপ্রথার দাবিগুলো যখন ঐতিহাসিক ও আইনি দলিলের মুখোমুখি হয়, তখন এক চরম বৈষম্যমূলক ও অমানবিক চিত্র ফুটে ওঠে। উমর ইবনুল খাত্তাবের আমলের এই বর্ণনাগুলো এবং পরবর্তী ফিকহী গ্রন্থগুলোর বিশদ ব্যাখ্যা প্রমাণ করে যে, হিজাব বা পর্দার উদ্দেশ্য কখনোই কেবল ‘শালীনতা’ বা ‘নারীর নিরাপত্তা’ ছিল না। যদি পর্দা সত্যিই সুরক্ষার জন্য হতো, তবে সমাজের সবচেয়ে অসহায় ও নিরাপত্তাহীন নারী—অর্থাৎ ক্রীতদাসীদের কেন সেই সুরক্ষা থেকে আইনিভাবে বঞ্চিত করা হলো? কেন তাদের জোরপূর্বক জনসম্মুখে প্রায় অনাবৃত রাখতে বাধ্য করা হতো?
যৌক্তিক বিচারে, এটি ছিল কেবল একটি ‘শ্রেণি বিভাজন’ (Social Hierarchy) বজায় রাখার কৌশল। সম্ভ্রান্ত ও স্বাধীন মুসলিম নারীদের থেকে নিচু শ্রেণির দাসীদের আলাদা করার জন্য তাদের দেহের ন্যূনতম আব্রু হরণ করা হয়েছিল। খলিফা উমরের সেই দুররা বা লাঠি, যা কোনো ক্রীতদাসী পর্দা করলে তার ওপর নেমে আসতো, তা আসলে ইসলামি লিঙ্গ-রাজনীতির এক নিষ্ঠুর প্রতীক।
পরিশেষে, আশরাফুল হিদায়া বা সুনান আল-কুবরার মতো নির্ভরযোগ্য কিতাবগুলো যখন ঘোষণা করে যে, পরপুরুষের সামনে পরকীয় দাসীর উন্মুক্ত স্তন, চুল বা পিঠ দেখা ‘জায়েজ’ বা বৈধ, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে ইসলামি আইনে দাসী কোনো সম্মানজনক মানুষ ছিল না; বরং সে ছিল স্রেফ একটি ব্যবহার্য পণ্য। আধুনিক যুগে যারা ইসলামের এই দাসপ্রথাকে শ্রেষ্ঠ ও মানবিক বলে প্রচার করেন, তারা আসলে ইতিহাসের এই রূঢ় ও নগ্ন সত্যগুলোকে সুকৌশলে এড়িয়ে যান। কিন্তু প্রামাণিক হাদিস ও ফিকহের পাতায় খলিফার ঘরের সেই দাসীদের বর্ণনা আজও এক অমোঘ সাক্ষ্য হিসেবে টিকে আছে যে, ইসলামি খিলাফতে নারীর মর্যাদা নির্ধারিত হতো তার মালিকানা ও সামাজিক শ্রেণির ভিত্তিতে, তার মানবিক পরিচয়ে নয়।
তথ্যসূত্রঃ
- কিতাব আল সুনান আল কুবরা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৭, হাদিস নম্বর: ৩১২৭ ↩︎
- ইরওয়াউল গালীল, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২০০, হাদিস নম্বর: ১৭৮২ ↩︎
- كتاب السنن الكبرى » كتاب الصلاة » جماع أبواب لبس المصلي » باب عورة الأمة ↩︎
- সুনান আল কুবরা, বায়হাকী, ৩১২৭ ↩︎
- ইরওয়াউল গালীল, ১৭৮২ ↩︎
- সুনান আদ-দারাকুতনী, হাদিসঃ ৮৬৩ ↩︎
- সুনান আদ-দারাকুতনী, হাদিসঃ ৮৬৪ ↩︎
- আশরাফুল হিদায়া, ইসলামিয়া কুতুবখানা, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১৫ ↩︎
- তাফসীরে মাজহারী, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬৭ ↩︎
