সুশাসনের স্বর্ণযুগের মিথঃ খলিফা উমরের ছুরিকাহত হয়ে মৃত্যু, কারণ, প্রতিশোধ ও বিচারপ্রক্রিয়া

ভূমিকাঃ ধর্মীয় মিথ বনাম সাম্রাজ্যবাদী বাস্তবতা

ইসলামী ইতিহাসের প্রচলিত পাঠ্যসূচিতে উমর ইবনুল খাত্তাবকে কেবলমাত্র একজন ‘ন্যায়পরায়ণ’ শাসক হিসেবে চিত্রিত করা হলেও, যুক্তিবাদী ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার শাসনকাল এক জটিল এবং বিতর্কিত অধ্যায়। উমরের দশ বছরের শাসনকাল ছিল মূলত একটি ক্রমবর্ধমান আরব সাম্রাজ্যের উত্থানপর্ব, যা কেবল ধর্মীয় প্রচারের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং সামরিক আগ্রাসন, আক্রমণাত্মক জিহাদ এবং বিজিত অঞ্চলের অমুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর কাঠামোগত বৈষম্য আরোপের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল। ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তার নেতৃত্বে বাইজেন্টাইন ও পারস্য সাম্রাজ্যের পতন এবং ইসলামী সাম্রাজ্যের অভূতপূর্ব বিস্তার ছিল মূলত একটি গনিমতের মাল ও লুণ্ঠনমূলক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সম্প্রসারণ নীতির ফল। এই বিস্তারকে ইসলামিক এপোলোজিস্টদের পক্ষ থেকে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হিসেবে দাবি করা হলেও, সমসাময়িক রেকর্ড ও পরবর্তীকালের ঘটনাবলী প্রমাণ করে যে, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত আক্রমণাত্মক অভিযান যা পার্শ্ববর্তী সভ্যতাসমূহের সার্বভৌমত্ব খর্ব করেছিল। ইসলামিক এপোলোজিস্টগণ একদিকে গর্বের সাথে বলেন, উমর ছিল অর্ধেক পৃথিবীর শাসক, অন্যদিকে যখন বলেন যে, উমরের যুদ্ধগুলো ছিল প্রতিরক্ষামূলক, তখন আসলে এসব বক্তব্য নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়।

এই সাম্রাজ্যবাদী কাঠামোর অন্যতম স্তম্ভ ছিল ‘জিম্মি’ প্রথা এবং অমুসলিমদের ওপর আরোপিত ‘জিজিয়া’ কর। যৌক্তিক বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, জিজিয়া কেবল একটি নিরাপত্তা কর ছিল না, বরং এটি ছিল অমুসলিমদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার, লাঞ্ছিল ও অপমানিত করার এবং তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি হাতিয়ার। এই ব্যবস্থায় ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’ হিসেবে গণ্য করা হতো, যা আধুনিক মানবাধিকার ও সমতার মানদণ্ডে স্পষ্টতই বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক। উমরের শাসনকালকে তাই কেবলমাত্র ‘ইনসাফের স্বর্ণযুগ’ হিসেবে না দেখে, শোষিত ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিকোণ থেকে একটি দমনমূলক ব্যবস্থা হিসেবে পুনঃমূল্যায়ন করা প্রয়োজন [1]। এই প্রবন্ধের পরবর্তী অংশগুলোতে আমরা উমরের অর্থনৈতিক নীতি, দাসপ্রথার নির্দয় ব্যবহার এবং তার হত্যাকাণ্ডের পেছনের আর্থ-সামাজিক কারণগুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করবো। আসুন এই নিয়ে আলোচনার শুরুতেই একটি ভিডিও দেখি, যেখানে আরবের একজন ইসলামিক আলেম শেখাচ্ছেন, কীভাবে একটি শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রে অমুসলিমদের প্রতি পদে পদে অপমান অপদস্ত করতে হবে, যেন তারা বাধ্য হয় ইসলাম গ্রহণ করতে,


সামরিক আগ্রাসন ও জিজিয়া করের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

খলিফা উমরের শাসনকালে ইসলামী সাম্রাজ্যের যে ভৌগোলিক বিস্তার ঘটেছিল, তাকে অনেক রক্ষণশীল ঐতিহাসিক ‘প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ’ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্যের নির্মোহ ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ এই দাবিকে নস্যাৎ করে দেয়। উমরের নেতৃত্বে পরিচালিত বাইজেন্টাইন ও পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধগুলো কোনো তাৎক্ষণিক হুমকির মুখে নেওয়া প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না, বরং তা ছিল একটি সুসংগঠিত আক্রমণাত্মক সাম্রাজ্যবাদী নীতি (Offensive Expansionism)। এই অভিযানের মূল চালিকাশক্তি ছিল নতুন ভূখণ্ড দখল এবং সেই অঞ্চলের সম্পদ ও জনশক্তিকে মদিনাকেন্দ্রিক খিলাফতের অনুগত করা। বিজিত অঞ্চলের জনগণের ওপর জিজিয়া করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কেবল আর্থিক প্রয়োজনে ছিল না, বরং এটি ছিল একটি মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক হাতিয়ার। জিজিয়া আদায়ের প্রক্রিয়াটি ছিল মূলত বৈষম্যমূলক ও অবমাননাকর, যার লক্ষ্য ছিল অমুসলিম বা ‘জিম্মি’দের এটি বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, তারা ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনস্থ এবং হীনবল একটি গোষ্ঠী [2]। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ‘সুরক্ষিত’ হিসেবে তকমা দেওয়া হলেও, বাস্তবে তাদের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা হয়েছিল এবং তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই জিজিয়া ব্যবস্থাকে একটি ‘প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। উমরের শাসনামলে জিজিয়া প্রদানের ক্ষেত্রে যে কঠোরতা প্রদর্শন করা হতো, তা মূলত অমুসলিমদের ওপর একটি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করত, যাতে তারা চাপের মুখে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হয় অথবা অন্ততপক্ষে মুসলিম আধিপত্যকে নিঃশর্তভাবে মেনে নেয়। ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, উমর জিজিয়া কর ধার্যের ক্ষেত্রে বিজিত অঞ্চলের সামর্থ্যের চেয়ে রাষ্ট্রের প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। এমনকি ইরাক ও সিরিয়ার মতো উর্বর অঞ্চলের ওপর তিনি যে ভূমি কর (খারাজ) ও জিজিয়া আরোপ করেছিলেন, তা ছিল অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। যদিও বুখারীর বর্ণনায় দেখা যায় উমর করের বোঝা সম্পর্কে প্রশ্ন করছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সম্পদ সাম্রাজ্যের সামরিক ব্যয় মেটাতেই ব্যবহৃত হতো [3]। এই ব্যবস্থার ফলে বিজিত অঞ্চলের আদিবাসীদের মধ্যে এক ধরনের সুপ্ত ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতাবোধ দানা বেঁধেছিল। সামরিক শক্তির মাধ্যমে এই ক্ষোভকে সাময়িকভাবে দমন করা সম্ভব হলেও, এটি যে একটি নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা ছিল তা অস্বীকার করার উপায় নেই। উমরের শাসনামলকে তাই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একটি ‘মিলিটারি এরিস্টোক্রেসি’ বা সামরিক আভিজাত্যবাদ হিসেবে অভিহিত করা যায়, যেখানে বিজয়ী মুসলিমরা ছিল শাসক শ্রেণি এবং বিজিত অমুসলিমরা ছিল করদ ও অধিকারবঞ্চিত প্রজা।


দাসপ্রথা ও আবু লুলুর হত্যাকাণ্ডঃ ব্যক্তিগত ক্ষোভ নাকি শোষিত শ্রেণির বিদ্রোহ?

উমর ইবনুল খাত্তাবের শাসনামলে ইসলামী সাম্রাজ্যের যে বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তার চরম শিকার ছিল যুদ্ধবন্দী ও ক্রীতদাস গোষ্ঠী। এই প্রেক্ষাপটে পারস্য বংশোদ্ভূত ক্রীতদাস আবু লুলু (ফিরোজ) কর্তৃক খলিফার হত্যাকাণ্ডকে কেবল একটি ‘বিচ্ছিন্ন অপরাধ’ বা ‘ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা’ হিসেবে দেখা ঐতিহাসিক ভুল হবে; বরং এটি ছিল এক চরম শোষিত ও অধিকারবঞ্চিত শ্রেণির পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। আবু লুলু ছিলেন একজন অত্যন্ত দক্ষ কারিগর—কাঠমিস্ত্রি, খোদাইকার এবং কামার হিসেবে তার বিশেষ খ্যাতি ছিল। তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী, এই দক্ষতাকে পুঁজি করে তার মনিব মুগীরা ইবনে শুবা তার ওপর প্রতিদিন দুই দিরহাম অর্থাৎ মাসে ৬০ দিরহাম কর (খারাজ) ধার্য করেছিলেন। যখন আবু লুলু খলিফার কাছে এই উচ্চ হারের কর হ্রাসের আবেদন জানান, তখন উমর তার দক্ষতা বিবেচনা করে কর কমানোর পরিবর্তে বরং তা বাড়িয়ে মাসে ১০০ দিরহামে উন্নীত করার নির্দেশ দেন। এই সিদ্ধান্তটি ছিল একজন পরম ক্ষমতাবান শাসকের চরম অসংবেদনশীলতা এবং শ্রম শোষণের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। খলিফা উমর যখন তাকে বলেন যে, “তোমার দক্ষতা অনুযায়ী এই কর বেশি নয়,” তখন তিনি মূলত একজন দক্ষ শ্রমিকের মানবিক আর্তিকে উপেক্ষা করে তাকে কেবল একটি ‘উৎপাদনশীল যন্ত্র’ হিসেবে গণ্য করেছিলেন [4]

এই ঘটনাটি ইসলামী সাম্রাজ্যের অন্তর্গত দাসপ্রথার নির্দয় রূপটি উন্মোচিত করে। আবু লুলুর ওপর আরোপিত এই অতিরিক্ত কর ছিল মূলত একটি কাঠামোগত জুলুম, যা তাকে খলিফার বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধ নিতে প্ররোচিত করে। উমর এবং আবু লুলুর মধ্যকার সেই বিখ্যাত কথোপকথন, যেখানে উমর তাকে একটি বায়ুচালিত চাকা (উইন্ডমিল) তৈরি করে দিতে বলেন এবং আবু লুলু তার উত্তরে একটি প্রতীকি হুমকি দেন, তা স্পষ্ট করে দেয় যে শোষিত এই কারিগর তখন মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী, এই ঘাতক আবু লুলু কেবল একজন ‘অগ্নিপূজক’ ছিলেন না, বরং তিনি মুসলিমদের মতোই কিবলামুখী হয়ে নামাজ পড়তেন এবং হজও পালন করতেন [3]। এটি নির্দেশ করে যে, তৎকালীন সাম্রাজ্যে এমনকি ধর্মীয়ভাবে একীভূত হওয়ার ভান করার পরেও একজন অনারব বা পারসিককে চূড়ান্তভাবে ‘অপর’ বা দ্বিতীয় শ্রেণির দাস হিসেবেই থাকতে হতো। উমরের মৃত্যুর পর তার মন্তব্য—“আল্লাহর প্রশংসা যিনি আমার মৃত্যু এমন লোকের হাতে করাননি যে নিজেকে মুসলিম দাবি করে”—তৎকালীন আরবীয় আভিজাত্যবাদ এবং অনারবদের প্রতি ঘৃণা ও অবিশ্বাসের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। ফলে এই হত্যাকাণ্ডটি ছিল মূলত একটি সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একজন নির্যাতিত শ্রমিকের একক বিদ্রোহ, যা প্রমাণ করে যে ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচারের বুলি আউড়ালেও উমরের শাসন কাঠামোতে প্রান্তিক মানুষের কোনো সুরক্ষা ছিল না।


ইসলামি ঐতিহাসিকদের বর্ণনা

আসুন এই বিষয়ে আল্লামা ইবনে কাসীরের আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া থেকে জেনে নেয়া যাক, [5]

রোম নিবাসী অগ্নিপূজক বংশোদ্ভূত আবূ লুলু ফীরোয নামক একটি গোলাম তাঁকে দুইদিকে ধারাল খঞ্জর দ্বারা হঠাৎ আঘাত করে। তিনি তখন মসজিদের মিহরাবে ফজরের সালাত আদায় করছিলেন। দিনটি ছিল বুধবার। বছরের যুলহাজ্জাহ্ মাসের বাকি ছিল মাত্র চারদিন। তাঁকে সে তিনটি আঘাত করেছিল। কেউ কেউ বলেন, ‘ছয়টি আঘাত করেছিল, তন্মধ্যে একটি ছিল নাভীর নিচে। তাতে উদরের আবরক ঝিল্লি কেটে যায় ও তিনি দণ্ডায়মান অবস্থা থেকে নিচে ঢলে পড়লেন।’ আবদুর রহমান ইব্‌ন আউফ (রা) ইমামতির জন্যে তাঁর স্থলে দাঁড়ালেন । কাফিরটি তার খঞ্জরসহ প্রত্যাবর্তন করল ও যাকে সামনে পেল তাকেই আঘাত করল। এভাবে সে ১৩ জনকে আঘাত করল। তন্মধ্যে ৬ জন মারা গেল। আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আউফ (রা) তার উপর বুনুস (আরব ও মূরদের পরিধেয় মস্তকাবরণ যুক্ত ঢিলেঢালা পরিচ্ছদ) নিক্ষেপ করেন, তাতে সে আটকা পড়ে যায় এবং সে নিজেকে হত্যা করে। উমর (রা)-কে তাঁর বাড়িতে নেওয়া হয়। তার জখমী থেকে রক্ত ঝরছিল। আর এ ঘটনাটি ছিল সূর্যোদয়ের পূর্বের। একবার তিনি চেতনা পান আবার অচেতন হয়ে যান ।
উপস্থিত লোকেরা তাঁকে সালাতের কথা স্মরণ করিয়েছেন তখন তিনি চেতনা ফিরে পান এবং বলেন, হ্যাঁ, যে এ সালাতকে ছেড়ে দেবে তার ইসলামে কোন অংশ নেই। তারপর সময়ের মধ্যে তিনি সালাত আদায় করেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, কে তাকে হত্যা করেছে। উপস্থিত জনতা বললেন, সে ছিল আবূ লুলু, মুগীরা ইব্‌ন শুবাহ (রা)-এর গোলাম । একথা শুনে তিনি বললেন, “আল্লাহ্র সমস্ত প্রশংসা যিনি আমার মৃত্যু এমন লোকের মাধ্যমে করান নি যে ঈমানের দাবি করে অথচ আল্লাহ্র দরবারে একটি সিজদাও করে না।” তারপর তিনি বলেন, “আল্লাহ্ তাকে কুৎসিত করুন। আমরা তাকে সৎকাজের পরামর্শ দিয়েছিলাম। মুগীরা (রা) তার উপর প্রত্যহ দুই দিরহাম কর ধার্য করেছিলেন। তারপর তিনি উমর (রা)-এর কাছে আবেদন করেছিলেন যেন তিনি তার উপর আরোপিত কর বৃদ্ধি করে দেন। কেননা, সে ছিল কাঠমিস্ত্রি, খোদাইকার ও কামার ।
কাজেই হযরত উমর (রা) প্রতিমাসে একশ’ দিরহাম পর্যন্ত তার প্রতি আরোপিত কর বৃদ্ধি করলেন। তিনি তাকে আরো বলেন, “আমি জানতে পেরেছি তুমি নাকি এমন চাকা তৈরি করতে পার যা বায়ু দ্বারা চলে।” আবূ লুলু বলল, আল্লাহ্র শপথ! আমি তোমার জন্যে এমন এক চাকা তৈরি করব যা নিয়ে লোকজন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে আলোচনামুখর থাকবে।’ তখন সময় ছিল মঙ্গলবার বিকাল বেলা। আর সে তাঁকে আঘাত করেছিল বুধবার ভোরে, যুল-হাজ্জাহ্ মাসের ২৬ তারিখ। হযরত উমর (রা) ওসীয়ত করলেন যেন তার মৃত্যুর পর খিলাফতের নির্বাচনের বিষয়টি ছয় সদস্য বিশিষ্ট একটি পরামর্শ সভার উপর ন্যস্ত করা হয়। এ ছয়জনের প্রতি রাসূলুল্লাহ্ তাঁর জীবদ্দশায় সন্তুষ্ট ছিলেন। তাঁরা হলেন :

মৃত্যু

হযরত উমরকে যিনি হত্যা করেন, সেই পৌত্তলিক কাফের মুসলিমদের মতই কেবলামুখি হয়ে নামাজ পড়তো, এবং হজ্জ্বও করতো, যা সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে [6] [7]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ২০৮৭. উসমান ইবন আফফান (রাঃ) এর প্রতি বায়’আত ও তার উপর (জনগনের) ঐক্যমত হওয়ার ঘটনা এবং এতে উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) এর শাহাদাতের বর্ণনা
৩৪৩৫। মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) … আমর ইবনু মায়মূন (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) কে আহত হওয়ার কিছুদিন পূর্বে মদিনায় দেখেছি যে তিনি হুযায়ফা ইবনু ইয়ামান (রাঃ) ও উসমান ইবনু হুনায়ফ এর নিকট দাঁড়িয়ে তাঁদেরকে লক্ষ্য করে বলেছেন, (ইরাক বাসীর উপর কর ধার্যের ব্যাপারে) তোমরা এটা কী করলে? তোমরা কী আশঙ্কা করছ যে তোমরা ইরাক ভূমির উপর যে কর ধার্য করেছ তা বহনে ঐ ভূখন্ড অক্ষম? তারা বললেন, আমরা যে পরিমাণ কর ধার্য করেছি, ঐ ভূখন্ড তা বহনে সক্ষম। এতে অতিরিক্ত কোন বোঝা চাপান হয়নি। তখন উমর (রাঃ) বললেন, তোমরা পুনঃচিন্তা করে দেখ যে তোমরা এ ভূখন্ডের উপর যে কর আরোপ করেছ তা বহনে সক্ষম নয়? বর্ণনাকারী বলেন, তাঁরা বললেন, না (সাধ্যাতীত কর আরোপ করা হয় নি) এরপর উমর (রাঃ) বললেন, আল্লাহ যদি আমাকে সুস্থ রাখেন তবে ইরাকের বিধবাগণকে এমন অবস্থায় রেখে যাব যে তারা আমার পরে কখনো অন্য কারো মুখাপেক্ষী না হয়।
বর্ণনাকারী বলেন, এরপর চতুর্থ দিন তিনি (ঘাতকের আঘাতে) আহত হলেন। যেদিন প্রত্যুষে তিনি আহত হন, আমি তাঁর কাছে দাঁড়িয়েছিলাম এবং তাঁর ও আমার মাঝে আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) ব্যতীত অন্য কেউ ছিল না। উমর (রাঃ) (সালাত (নামায/নামাজ) শুরু করার প্রাক্কালে) দু’কাতারের মধ্যে দিয়ে চলার সময় বলতেন, কাতার সোজা করে নাও। যখন দেখতেন কাতারে কোন ত্রুটি নেই তখন তাকবীর বলতেন। তিনি অধিকাংশ সময় সূরা ইউসূফ, সূরা নাহল অথবা এ ধরনের (দীর্ঘ) সূরা (ফজরের) প্রথম রাক’আতে তিলাওয়াত করতেন, যেন অধিক পরিমাণে লোক প্রথম রাকআতে শরীক হতে পারেন। (সেদিন) তাকবীর বলার পরেই আমি তাঁকে বলতে শুনলাম, একটি কুকুর আমাকে আঘাত করেছে অথবা বললেন, আমাকে আক্রমণ করেছে। ঘাতক “ইলজ” দ্রুত পলায়নের সময় দু’ধারী খঞ্জর দিয়ে ডানে বামে আঘাত করে চলছে। এভাবে তেরো জনকে আহত করল। এদের মধ্যে সাতজন শহীদ হলেন।
এ অবস্থা দৃষ্টে এক মুসলিম তার লম্বা চাঁদরটি ঘাতকের উপর ফেলে দিলেন। ঘাতক যখন বুঝতে পারল সে ধরা পড়ে যাবে তখন সে আত্মহত্যা করল। উমর (রাঃ) আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) এর হাত ধরে আগে এগিয়ে দিলেন। উমর (রাঃ) এর নিকটবর্তী যারা ছিল শুধুমাত্র তারাই ব্যপারটি দেখতে পেল। আর মসজিদের প্রান্তে যারা ছিল তারা ব্যাপারটি এর বেশী বুঝতে পারল না যে উমর (রাঃ) এর কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে না। তাই তারা ‘সুবহানাল্লাহ সুবহানাল্লাহ’ বলতে লাগলেন। আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) তাঁদেরকে নিয়ে সংক্ষেপে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। যখন মুসল্লীগণ চলে গেলেন, তখন উমর (রাঃ) বললেন, হে ইবনু আব্বাস (রাঃ) দেখ তো কে আমাকে আঘাত করল। তিনি কিছুক্ষণ অনুসন্ধান করে এসে বললেন, মুগীরা ইবনু শো’বা (রাঃ) এর গোলাম (আবূ লুলু)। উমর (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, ঐ কারীগর গোলামটি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। উমর (রাঃ) বললেন, আল্লাহ তার সর্বনাশ করুন। আমি তার সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমার মৃত্যু ইসলামের দাবীদার কোন ব্যাক্তির হাতে ঘটান নি। হে ইবনু আব্বাস (রাঃ) তুমি এবং তোমার পিতা মদিনায় কাফির গোলামের সংখ্যা বৃদ্ধি পছন্দ করতে। আব্বাস (রাঃ) এর নিকট অনেক অমুসলিম গোলাম ছিল।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বললেন, যদি আপনি চান তবে আমি কাজ করে ফেলি অর্থাৎ আমি তাদেরকে হত্যা করে ফেলি। উমর (রাঃ) বললেন, তুমি ভুল বলছ। (তুমি তা করতে পার না) কেননা তারা তোমাদের ভাষায় কথা বলে তোমাদের কেবলামুখী হয়ে সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করে, তোমাদের ন্যায় হাজ্জ (হজ্জ) করে।
তারপর তাঁকে তাঁর ঘরে নেয়া হল। আমরা তাঁর সাথে চললাম। মানুষের অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছিল, ইতিপূর্বে তাদের উপর এতবড় মুসীবত আর আসেনি। কেউ কেউ বলছিলেন, ভয়ের কিছু নেই। আবার কেউ বলছিলেন, আমি তাঁর সম্পর্কে আশংকাবোধ করছি। তারপর খেজুরের শরবত আনা হল তিনি তা পান করলেন। কিন্তু তা তার পেট থেকে বেরিয়ে পড়ল। এরপর দুধ আনা হল, তিনি তা পান করলেন; তাও তার পেট থেকে বেরিয়ে পড়ল। তখন সকলই বুঝতে পারলেন, মৃত্যু তাঁর অবশ্যম্ভাবী। আমরা তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। অন্যান্য লোকজনও আসতে শুরু করল। সকলেই তার প্রশংসা করতে লাগল।
তখন যুবক বয়সী একটি লোক এসে বলল, হে আমীরুল মু’মিনীন। আপনার জন্য আল্লাহর সু-সংবাদ রয়েছে; আপনি তা গ্রহণ করুন। আপনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহচর্য গ্রহণ করেছেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগেই আপনি তা গ্রহণ করেছেন, যে সম্পর্কে আপনি নিজেই অবগত আছেন তারপর আপনি খলীফা হয়ে ন্যায বিচার করেছেন। তারপর আপনি শাহাদাত লাভ করেছেন। উমর (রাঃ) বললেন, আমি পছন্দ করি যে তা আমার জন্য ক্ষতিকর বা লাভজনক না হয়ে সমান হয়ে যাক। যখন যুবকটি চলে যেতে উদ্যত হল তখন তার (পরিহিত) লঙ্গিটি মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছিল। (এ দেখে) উমর (রাঃ) বললেন, যুবকটিকে আমার নিকট ডেকে আন। (ছেলেটি আসল) তিনি বললেন- হে ভাতিজা, তোমার কাপড়টি উঠিয়ে নাও। এটা তোমার কাপড়ের পরিচ্ছিন্নতার উপর এবং তোমার রবের নিকটও পছন্দনীয়।
(তারপর তিনি বললেন) হে আবদুল্লাহ ইবনু উমর তুমি হিসাব করে দেখ আমার ঋণের পরিমাণ কত। তাঁরা হিসাব করে দেখতে পেলেন ছিয়াশি হাজার (দিরহাম) বা এর কাছাকাছি। তিনি বললেন, যদি উমরের পরিবার পরিজনের মাল দ্বারা তা পরিশোধ হয়ে যায়, তবে তা দিয়ে পরিশোধ করে দাও। অন্যথায় আদি ইবনু কা’ব এর বংশধরদের নিকট থেকে সাহায্য গ্রহণ কর। তাদের মাল দিয়েও যদি ঋণ পরিশোধ না হয় তবে কুরাইশ কবিলা থেকে সাহায্য গ্রহণ করবে এর বাহিরে কারো সাহায্য গ্রহণ করবে না। আমার পক্ষ থেকে তাড়াতাড়ি ঋণ আদায় করে দাও। উম্মূল মু’মিনীন আয়িশা (রাঃ) এর খেদমতে তুমি যাও এবং বল উমর আপনাকে সালাম পাঠিয়েছে। আমীরুল মু’মিনীন, শব্দটি বলবে না। কেননা এখন আমি মু’মিনগণের আমীর নই। তাঁকে বল উমর ইবনু খাত্তাব তাঁর সাথীদ্বয়ের পাশে দাফন হওয়ার অনুমতি চাচ্ছেন।
ইবনু উমর (রাঃ) আয়িশা (রাঃ) এর খেদমতে গিয়ে সালাম জানিয়ে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনি বললেন, প্রবেশ কর, তিনি দেখলেন, আয়িশা (রাঃ) বসে বসে কাঁদছেন। তিনি গিয়ে বললেন, উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন এবং তাঁর সাথীদ্বয়ের পাশে দাফন হওয়ার অনুমতি চেয়েছেন। আয়িশা (রাঃ) বললেন, তা আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু আজ আমি এ ব্যপারে আমার উপরে তাঁকে অগ্রাধিকার প্রদান করছি। আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) যখন ফিরে আসছেন তখন বলা হল- এই যে আবদুল্লাহ ফিরে আসছে। তিনি বললেন আমাকে উঠিয়ে বসাও। তখন এক ব্যাক্তি তাকে ঠেস দিয়ে বসিয়ে ধরে রাখলেন। উমর (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, কি সংবাদ? তিনি বললেন, আমীরুল মু’মিনীন, আপনি যা আকাঙ্ক্ষা করেছেন, তাই হয়েছে, তিনি অনুমতি দিয়েছেন। উমর (রাঃ) বললেন, আলহামদুল্লিাহ। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় আমার নিকট ছিল না। যখন আমার ওফাত হয়ে যাবে তখন আমাকে উঠিয়ে নিয়ে, তাঁকে (আয়িশা (রাঃ) আমার সালাম জানিয়ে বলবে, উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) আপনার অনুমতি চাচ্ছেন। যদি তিনি অনুমতি দেন, তবে আমাকে প্রবেশ করাবে আর যদি তিনি অনুমতি না দেন তবে আমাকে সাধারণ মুসলিমদের গোরস্থানে নিয়ে যাবে।
এ সময় উম্মূল মু’মিনীন হাফসা (রাঃ) কে কতিপয় মহিলাসহ আসতে দেখে আমরা উঠে পড়লাম। হাফসা (রাঃ) তাঁর কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদলেন। তারপর পুরুষগণ এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলে, তিনি ঘরের ভিতর চলে (গেলেন) ঘরের ভেতর হতেও আমরা তাঁর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। তাঁরা (সাহাবীগণ) বললেন, হে আমীরুল মু’মিনীন, আপনি ওয়াসিয়াত করুন এবং খলীফা মনোনীত করুন। উমর (রাঃ) বললেন, খিলাফতের জন্য এ কয়েকজন ব্যতীত অন্য কাউকে আমি যোগ্য পাচ্ছিনা, যাঁদের প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ইন্তেকালের সময় রাযী ও খুশী ছিলেন। তারপর তিনি তাদের নাম বললেন, আলী, উসমান, যুবায়র, তালহা, সা’স ও আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) এবং বললেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) তোমাদের সাথে থাকবে। কিন্তু সে খিলাফত লাভ করতে পারবে না। তা ছিল শুধু সান্তনা হিসাবে।
যদি খিলাফতের দায়িত্ব সা’দের (রাঃ) উপর ন্যাস্ত করা হয় তবে তিনি এর জন্য যোগ্যতম ব্যাক্তি। এর যদি তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ খলীফা নির্বাচিত হন তবে তিনি যেন সর্ব বিষয়ে সা‘দের সাহায্য ও পরামর্শ গ্রহণ করেন। আমি তাঁকে (কুফার গভর্নরের পদ থেকে) অযোগ্যতা বা খিয়ানতের কারণে অপসারণ করি না। আমার পরে (নির্বাচিত) খলীফাকে আমি ওয়াসিয়াত করছি, তিনি যেন প্রথম যুগের মুহাজিরগণের হক সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাদের মান-সম্মান রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন। এবং আমি তাঁকে আনসার সাহাবীগণের যাঁরা মুহাজিরগণের আগমনের পূর্বে এই নগরীতে (মদিনায়) বসবাস করে আসছিলেন এবং ঈমান এনেছেন, তাঁদের প্রতি সদ্ব্যবহার করার ওয়াসিয়াত করছি যে তাঁদের মধ্যে নেককারগণের ওযর আপত্তি যেন গ্রহণ করা হয় এবং তাঁদের মধ্যে কারোর ভুলত্রুটি হলে তা যেন ক্ষমা করে দেয়া হয়।
আমি তাঁকে এ ওয়াসিয়াতও করছি যে, তিনি যেন রাজ্যের বিভিন্ন শহরের আধিবাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করেন। কেননা তাঁরাও ইসলামের হেফাযতকারী। এবং তারাই ধন-সম্পদের যোগানদাতা। তারাই শত্রুদের চোখের কাঁটা। তাদের থেকে তাদের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে কেবলমাত্র তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ যাকাত আদায় করা হয়। আমি তাঁকে পল্লীবাসীদের সহিত সদ্ব্যবহার করারও ওসিয়ত করছি। কেননা তাঁরাই আরবের ভিত্তি এবং ইসলামের মূল শক্তি। তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ এনে তাদের দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া হয়। আমি তাঁকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জিম্মীদের (অর্থাৎ সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়) বিষয়ে ওয়াসিয়াত করছি যে, তাদের সাথে কৃত অঙ্গীকার যেন পুরা করা হয়। (তারা কোন শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে) তাদের পক্ষাবিলম্বে যেন যুদ্ধ করা হয়, তাদের শক্তি সামর্থ্যের অধিক জিযিয়া (কর) যেন চাপানো না হয়।
উমর (রাঃ) এর ইন্তেকাল হয়ে গেলে আমরা তাঁর লাশ নিয়ে পায়ে হেঁটে চললাম। আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) আয়িশা (রাঃ) কে সালাম করলেন এবং বললেন, উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) অনুমতি চাচ্ছেন। তিনি (আয়িশা (রাঃ) বললেন, তাকে প্রবেশ করাও। এরপর তাঁকে প্রবেশ করান হল এবং তার সঙ্গীদ্বয়ের পার্শ্বে দাফন করা হল। যখন তাঁর দাফন সম্পন্ন হল, তখন ঐ ব্যাক্তিবর্গ একত্রিত হলেন। তখন আবদুর রহমান (রাঃ) বললেন, তোমরা তোমাদের বিষয়টি তোমাদের মধ্য থেকে তিনজনের উপর ছেড়ে দাও। তখন যুবায়র (রাঃ) বললেন, আমি, আমরা বিষয়টি আলী (রাঃ) এর উপর অর্পণ করলাম। তালহা (রাঃ) বললেন, আমার বিষয়টি উসমান (রাঃ) এর উপর ন্যাস্ত করলাম। সা‘দ (রাঃ) বললেন, আমার বিষয়টি আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) এর উপর ন্যাস্ত করলাম। তারপর আবদুর রহমান (রাঃ), উসমান ও আলী (রাঃ) কে বললেন, আপনাদের দু’জনের মধ্য থেকে কে এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেতে ইচ্ছা করেন? (একজন অব্যাহতি দিলে) এ দায়িত্ব অপর জনের উপর অর্পণ করব। আল্লাহ ও ইসলামের হক আদায় করা তাঁর অন্যতম দায়িত্ব হবে। কে অধিকতর যোগ্য সে সম্পর্কে দু’জনেরই চিন্তা করা উচিৎ। ব্যাক্তিদ্বয় [উসমান ও আলী (রাঃ)] নীরব থাকলেন।
তখন আবদুর রাহমান (রাঃ) নিজেই বললেন, আপনারা এ দায়িত্ব আমার উপর ন্যাস্ত করতে পরেন কি? আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আপনাদের মধ্যকার যোগ্যতম ব্যাক্তিকে নির্বাচিত করতে একটুও ত্রুটি করব না। তাঁরা উভয়ে বললেন, হ্যাঁ। তাদের একজনের [আলী (রাঃ) এর] হাত ধরে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে আপনার যে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ত এবং ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামীতা রয়েছে আপনিও ভালভাবে জানেন। আল্লাহর ওয়াস্তে এটা আপনার জন্য জরুরী হবে যে যদি আপনাকে খলীফা মনোনীত করি তাহলে আপনি ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। আর যদি উসমান (রাঃ) কে মনোনিত করি তবে আপনি তাঁর কথা শুনবেন এবং তাঁর প্রতি অনুগত থাকবেন। তারপর তিনি অপরজনের [উসমানের (রাঃ)] সঙ্গে একান্তে অনুরূপ কথা বললেন। এভাবে অঙ্গীকার গ্রহণ করে, তিনি বললেন, হে উসমান (রাঃ) আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। তিনি [আবদুর রহমান (রাঃ)], তাঁর হাতে বায়’আত করলেন। তারপর আলী (রাঃ) তাঁর [উসমান (রাঃ) এর বায়’আত করলেন)। এরপর মদিনাবাসীগণ অগ্রসর হয়ে সকলেই বায়’আত করলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আমর ইবনু মায়মূন (রহঃ)

মৃত্যু 1

আইনহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজিঃ শাসকের মর্জিনির্ভর কর ব্যবস্থা

উমর ইবনুল খাত্তাবের শাসনব্যবস্থায় কর নির্ধারণের যে প্রক্রিয়াটি পরিলক্ষিত হয়, তা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইনি কাঠামোর দৃষ্টিতে চরম বিশৃঙ্খল এবং স্বৈরতান্ত্রিক। একটি সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রে কর ধার্যের নির্দিষ্ট আইনি নীতিমালা, হার এবং সীমা থাকে, যা নাগরিক বা প্রজাদের রক্ষা করে। কিন্তু উমরের আমলে জিজিয়া বা ব্যক্তিগত কর (খারাজ) ধার্যের বিষয়টি ছিল মূলত শাসকের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ও মর্জির ওপর নির্ভরশীল। আবু লুলুর ক্ষেত্রে যা ঘটেছিল, তা ছিল কোনো বিধিবদ্ধ নিয়মের তোয়াক্কা না করে সরাসরি ‘প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজি’ (Institutionalized Extortion)। মুগীরা ইবনে শুবা যখন তার দাসের ওপর দৈনিক দুই দিরহাম কর ধার্য করেন, তখন খলিফা হিসেবে উমরের দায়িত্ব ছিল সেই শোষণের প্রতিকার করা। অথচ তিনি উল্টো সেই ক্রীতদাসের দক্ষতা—কাঠমিস্ত্রি, খোদাইকার ও কামার হিসেবে তার বিশেষ পারদর্শিতাকে—অধিক শোষণের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেন। কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি যৌক্তিকতা ছাড়াই তিনি করের পরিমাণ ৬০ দিরহাম থেকে বাড়িয়ে ১০০ দিরহামে উন্নীত করেন।

এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন ইসলামী খিলাফতে কোনো ‘রুল অব ল’ বা আইনের শাসন ছিল না, বরং ছিল ‘উইল অব দ্য সোভারেইন’ বা শাসকের নিরঙ্কুশ ইচ্ছা। যখন একজন শাসক কেবল কাউকে ‘দক্ষ’ মনে করায় তার ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেন, তখন তা আর রাষ্ট্রীয় কর থাকে না, বরং তা প্রভাবশালী কর্তৃক দুর্বলের ওপর চালানো এক ধরণের লুণ্ঠন বা চাঁদাবাজিতে রূপ নেয়। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে অন্ধকার দিক হলো, এখানে ভুক্তভোগীর আপিল করার কোনো স্বাধীন জায়গা ছিল না—যেখানে খলিফা নিজেই শোষকের ভূমিকা নেন। সহীহ বুখারীর বর্ণনায় দেখা যায়, ইরাকবাসীদের ওপর কর ধার্যের ক্ষেত্রেও উমর তার কর্মকর্তাদের জিজ্ঞেস করছেন তারা অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়েছে কি না, কিন্তু সেখানেও কোনো নির্দিষ্ট সিলিং বা সর্বোচ্চ সীমার অনুপস্থিতি স্পষ্ট [8]। শাসকের এই ব্যক্তিগত ‘রেট’ নির্ধারণের ক্ষমতা মূলত একটি অস্থিতিশীল ও বৈষম্যমূলক সমাজ তৈরি করেছিল, যেখানে অমুসলিম এবং নিম্নবর্গের মানুষের জীবন ও সম্পদ ছিল শাসকের ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির ওপর নির্ভরশীল। এই ধরণের কর ব্যবস্থা কোনোভাবেই ন্যায়বিচারের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হতে পারে না, বরং এটি ছিল একটি সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্রের সম্পদ সংগ্রহের আদিম ও বর্বর পদ্ধতি।


মেধাসম্পদ ও উদ্ভাবনের অবমাননাঃ একজন প্রকৌশলীকে হন্তারকে রূপান্তর

ঐতিহাসিক বিবরণগুলোর গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আবু লুলু কেবল একজন সাধারণ শ্রমজীবী দাস ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন তৎকালীন সময়ের এক বিরল মেধাসম্পন্ন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী। তার বহুমুখী দক্ষতা—কাঠমিস্ত্রি, ধাতব খোদাইকার এবং কামার হিসেবে তার পারদর্শিতা—নির্দেশ করে যে তিনি বস্তুর গঠন ও যান্ত্রিক কৌশল সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতেন। বিশেষ করে খলিফা উমরের সাথে তার সেই বিখ্যাত কথোপকথন, যেখানে উমর তাকে ‘বায়ুচালিত চাকা’ বা উইন্ডমিল তৈরির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করেন, তা প্রমাণ করে যে আবু লুলু সেই যুগে দাঁড়িয়েও নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের মতো এক উন্নত বৈজ্ঞানিক ধারণা পোষণ করতেন। একজন উদ্ভাবক বা প্রকৌশলী যখন তার সৃজনশীলতার স্বীকৃতি না পেয়ে বরং শাসকের শোষণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন, তখন তার সেই মেধা ও ক্ষোভ এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। উমর যখন আবু লুলুর এই দুর্লভ কারিগরি জ্ঞানকে তাকে নিষ্কৃতি দেওয়ার উসিলা হিসেবে ব্যবহার না করে বরং তার ওপর করের বোঝা বাড়িয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলেন, তখন তিনি মূলত একজন মেধাবীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিপীড়ন করার পথ বেছে নিয়েছিলেন।

এই হত্যাকাণ্ডের দায়ভার তাই কেবল একজন ক্ষুব্ধ ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঐতিহাসিক বিচারে অসম্পূর্ণ; বরং এই পরিণতির প্রাথমিক দায় খলিফা উমরের শাসনতান্ত্রিক দর্শনের ওপরই বর্তায়। একজন প্রকৃত দূরদর্শী শাসক যেখানে মেধা ও উদ্ভাবনকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে রাষ্ট্রের উন্নতিতে কাজে লাগাতেন, উমর সেখানে আবু লুলুর বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতাকে কেবল দিরহাম সংগ্রহের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেছিলেন। আবু লুলুর সেই প্রতিজ্ঞাসূচক উত্তর—“আমি তোমার জন্য এমন এক চাকা তৈরি করবো যা নিয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে আলোচনা হবে”—ছিল মূলত একজন শোষিত বিজ্ঞানীর বৌদ্ধিক হাহাকার ও প্রতিশোধের ঘোষণা। যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি একজন সৃজনশীল মানুষের ন্যূনতম মানবিক অধিকার (যৌক্তিক কর কাঠামো) কেড়ে নেন এবং তাকে ক্রমাগত শোষণের চক্রে পিষ্ট করেন, তখন সেই মেধা ধ্বংসাত্মক পথে পরিচালিত হওয়া একটি মনস্তাত্ত্বিক অনিবার্যতায় পরিণত হয়। আবু লুলুর খঞ্জর তাই কেবল ব্যক্তিগত আক্রোশের অস্ত্র ছিল না, বরং তা ছিল একজন শোষিত উদ্ভাবকের পক্ষ থেকে সেই জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শেষ প্রতিবাদ, যা মানুষের মেধাকে মর্যাদা দেওয়ার পরিবর্তে তাকে দাসত্বের নিগড়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখতে চেয়েছিল। উমরের এই করদ ব্যবস্থা এবং অসংবেদনশীলতা শেষ পর্যন্ত তাকে একজন দক্ষ প্রকৌশলীর মেধার সুফল পাওয়ার বদলে সেই মেধারই নিষ্ঠুর শিকার বানিয়ে ছাড়ে।


বিচারের কাঠগড়ায় ‘সোনালী যুগ’: উমর হত্যাকাণ্ড পরবর্তী বিচারহীনতা ও কাঠামোগত অবিচার

ইসলামী ইতিহাসের প্রচলিত ভাষ্যে প্রথম চার খলিফার শাসনামলকে একটি নিখুঁত ও ‘সোনালী যুগ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে সাম্য ও ন্যায়বিচারের চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। তবে খলিফা উমরের হত্যাকাণ্ড পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া এবং খলিফা উসমানের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে এই দাবির অন্তঃসারশূন্যতা এবং তৎকালীন বিচারব্যবস্থার চরম পক্ষপাতদুষ্ট রূপটি উন্মোচিত হয়। উমরের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে তার পুত্র উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর যে উন্মত্ততা প্রদর্শন করেছিলেন, তা কেবল আইনি লঙ্ঘন ছিল না, বরং তা ছিল একটি বর্বর ও নিরপরাধ হত্যাকাণ্ড। উবাইদুল্লাহ কেবল মূল ঘাতক আবু লুলুকেই নয়, বরং তার নাবালিকা কন্যা, পারস্যের প্রাক্তন সেনাপতি হরমুজান এবং জুফাইনাহ নামক এক খ্রিস্টানকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, আবু লুলুর কিশোরী কন্যাটির এই হত্যাকাণ্ডের সাথে কোনো সংশ্রব ছিল না; তার একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল সে উমরের ঘাতকের সন্তান। একজন নিরপরাধ শিশুকে হত্যার এই ঘটনাটি তৎকালীন আরবে প্রচলিত প্রাক-ইসলামী ‘জাহেলি’ গোত্রীয় প্রতিহিংসারই এক নগ্ন প্রতিফলন, যা তথাকথিত সোনালী যুগেও অম্লান ছিল। ফিকহে ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু গ্রন্থ থেকে উসমানের শাসনামলের এই ঘটনা জেনে নিই [9]

[ঘ] উত্তেজিত অবস্থায় কোনো অপরাধ করে বসলে এ ব্যাপারে হযরত ওসমান (রা)-এর অভিমত হচ্ছে-উত্তেজিত অবস্থায় কেউ কোনো অপরাধ করে বসলে তার হুকুম জিনাইয়াতুল খাতা বা ভুলে কৃত অপরাধের মত। এ ক্ষেত্রে কিসাসের পরিবর্তে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ প্রদান করা অপরিহার্য হবে। যেমন-আবদুর রহমান ইবনু আবু বকর (রা) বর্ণনা করেছেন-যখন হযরত ওমর (রা)-কে শহীদ করা হলো, তখন আমি হরমুজান, জুফাইনাহ এবং আবু লুলুর সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম। তারা মদীনার একটি মহল্লায় বসবাস করতো। আমাকে দেখেই তারা পালাতে শুরু করলো। আমিও তাদের পিছু নিলাম। দৌড়ানোর এক পর্যায়ে তাদের হাত থেকে একটি খঞ্জর (বড়ো আকারের ছুরি) পড়ে গেলো, যা দুদিকেই ধারালো ছিলো। আমি দেখেই (আমার সাথীদেরকে) বললাম- দেখো, এটি সেই খঞ্জর যা দিয়ে ওমর (রা)-কে শহীদ করা হয়েছে। লোকজন গিয়ে খঞ্জর দেখে তাঁর কথার সত্যতা স্বীকার করলেন। যখন উবাইদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা) সেই খঞ্জর দেখলেন, তখন তরবারী নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন এবং হরমুজান, জুফাইনাহকে হত্যা করলেন, আর আবু লুলুর কিশোরী কন্যাকে পেয়ে তাকেও হত্যা করে ফেললেন। তারপর তলোয়ার উচিয়ে বলতে লাগলেন-আল্লাহর কসম! আজ মদীনার কোনো গোলাম বা বাঁদী আমার তরবারী থেকে রেহাই পাবে না। এদেরকে ছাড়া আরো কিছু লোককেও হত্যা করতে হবে। আরো কিছু লোক বলতে তিনি কতিপয় মুহাজির সাহাবার দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন। লোকজন তাকে তলোয়ার ফেলে দেয়ার জন্য চাপ দিলেন। তারা কাছে যেতে সাহস পাচ্ছিলেন না। এমন সময় সেখানে হযরত আমর ইবনুল আস (রা) এলেন। তিনি খুব নরম ও স্নেহের স্বরে বললেন- ‘ভাতিজা। তরবারীটি আমার কাছে দিয়ে দাও।’ তিনি তরবারী দিয়ে দিলেন।
হযরত ওসমান (রা) মজলিসে শূরার অধিবেশন আহ্বান করে তাদেরকে বললেন-আপনারা উবাইদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা)-এর ব্যাপারে আমাকে পরামর্শ দিন। মতামত দিতে গিয়ে শূরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেলো। কতিপয় মুহাজির সাহাবা পরামর্শ দিলেন-তাকে কিসাস স্বরূপ হত্যা করা হোক। অন্যেরা বললেন-কী আশ্চর্য! কাল তার পিতাকে শহীদ করা হয়েছে আর আজ তাকে হত্যা করা হবে? আল্লাহ হরমুজান ও জুফাইনাহকে ধ্বংস করুন। হযরত ওসমান (রা) চিন্তার গভীরে হারিয়ে গেলেন। পরে সিদ্ধান্তে পৌছুলেন উবাইদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা) এমন অবস্থায় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, যখন সে স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলো না। সে এমন কথা বলছে এবং এমন কাজ করছে তা স্বাভাবিক অবস্থায় একজন মানুষ করতে পারে না। তার মানসিক অবস্থা এমন ছিলো, যা কিসাস মুলতবী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। সন্দেহের কারণে হদ এর মত কিসাসও মুলতবী হয়ে যায়।
হরমুজান এবং আবু লুলুর কন্যার কোনো উত্তরাধিকারী ছিলো না। এমতাবস্থায় রাষ্ট্র তাদের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করছিলো। অন্য কথায় হযরত ওসমান (রা) তাদের অভিভাবক ছিলেন। তিনি চাচ্ছিলেন কিভাবে এ সমস্যার ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান করা যায়। তাই যারা উৰাউদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা)-কে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পক্ষে অভিমত দিয়েছিলেন তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন-আপনারা বলনুতো হরমুজানের অভিভাবক কে? ‘আমীরুল মুমিনীন! তার অভিভাবক তো এখন আপনি।’- তারা উত্তর দিলেন। এ জবাব শুনে তিনি বললেন-‘যদি তাই হয় তাহলে আমি উবাউদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা)-কে মাফ করে দিলাম। ‘৬ যখন নিহত ব্যক্তির অভিভাবক হত্যাকারীকে মাফ করে দেন তখন কিসাসের পরিবর্তে দিয়াত (রক্তপণ) ওয়াজিব হয়ে যায়। তাই হযরত ওসমান (রা) বাইতুলমাল থেকে দিয়াত আদায় করে দেবার নির্দেশ দেন। রইলো জুফাইনার ব্যাপারটি। সে খৃষ্টান ছিলো। কোনো অমুসলিম কোনো মুসলমানের হাতে নিহত হলে সেজন্য মুসলমানকে হত্যা করা যায় না। তাই তিনি উবাইদুল্লাহর পক্ষ থেকে তার দিয়াতও আদায় করে দেন।

আর যদি ভুলে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়, তাহলে দিয়াত প্রদান ওয়াজিব (বাধ্যতামূলক)।
[খ.১] মুসলিম কর্তৃক কোনো অমুসলিমের ক্ষতি সাধন: কোনো মুসলমানের হাতে যদি
কোনো অমুসলিম (সে যিম্মি হোক কিংবা না হোক) নিহত হয়, সে জন্য মুসলিম থেকে কিসাস গ্রহণ করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে দিয়াত গ্রহণ করতে হবে। এজন্য হযরত ওসমান (রা) কোনো মুশরিককে হত্যা করার কারণে কোনো মুসলমান থেকে কিসাস গ্রহণ করতেন না। তার সময়ে একজন মুসলমান এক যিম্মীকে ইচ্ছে করে হত্যা করেন। সে জন্য তিনি কিসাস গ্রহণ করেননি বরং দিয়াতু মুগাল্লাযা (অর্থাৎ পুরো দিয়াত) প্রদানের নির্দেশ দেন। যদি কোনো মুসলমান অমুসলিমকে হত্যা না করে হত্যার চেয়ে কম ক্ষতি সাধন করেন, সে ক্ষেত্রে কিভাবে কিসাস গ্রহণ করা যাবে? এ সম্পর্কে আমরা হযরত ওসমান (রা)-এর অভিমত সংক্রান্ত কোনো বর্ণনা পাইনি। অবশ্য এ ক্ষেত্রে হযরত ওমর (রা) কিসাস গ্রহণ করতেন না, তবে দিয়াতের পরিমাণ

মৃত্যু 3
মৃত্যু 5
মৃত্যু 7

এই সংকটের সময় নতুন খলিফা হিসেবে উসমানের ভূমিকা ন্যায়বিচারের আধুনিক বা ধ্রুপদী কোনো মানদণ্ডেই গ্রহণযোগ্য নয়। উসমান এই হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে গিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার চেয়ে রাজনৈতিক ও আবেগীয় স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মজলিসে শূরার সদস্যদের একাংশ যখন উবাইদুল্লাহর মৃত্যুদণ্ড (কিসাস) দাবি করেন, তখন অন্য অংশ যুক্তি দেখান যে, “গতকাল তার পিতাকে হত্যা করা হয়েছে, আর আজ তাকে (পুত্রকে) হত্যা করা হবে—এটি হতে পারে না।” এই যুক্তিটি কোনো আইনি দলিল নয়, বরং এটি ছিল একটি আবেগতাড়িত রাজনৈতিক আপোষ। উসমান এই পরিস্থিতিতে নিজেকে নিহতদের ‘অভিভাবক’ হিসেবে ঘোষণা করেন—যেহেতু হরমুজান বা আবু লুলুর কন্যার কোনো উত্তরাধিকারী মদিনায় ছিল না—এবং সেই সুযোগে তিনি খুনি উবাইদুল্লাহকে ক্ষমা করে দেন। একজন রাষ্ট্রপ্রধান যখন নিজেই বিচারক এবং নিজেই ভিকটিমের অভিভাবক সেজে অপরাধীকে ক্ষমা করেন, তখন সেখানে ন্যায়বিচারের ন্যূনতম কাঠামো অবশিষ্ট থাকে না। এটি ছিল ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে একটি অপরাধকে বৈধতা দেওয়ার নামান্তর [10]

হযরত উসমান (রা)-এর খিলাফতের প্রথম মামলাটি হলো উবাইদুল্লাহ ইবন উমর (রা)-এর মামলা। যে মামলার রায় দিলেন খোদ আমীরুল মু’মিনীন হযরত উসমান (রা)। হযরত উমর (রা)-এর আহত হবার পরদিন সকালে উবাইদুল্লাহ ইবন উমর (রা), উমর (রা)-এর হত্যাকারী আবু লুলুর কন্যার কাছে গমন করেন এবং তাকে হত্যা করেন। জুফাইনাহ নামক একজন খ্রিস্টানকে তিনি তলোয়ার দিয়ে আঘাত করেন ও এভাবে তাকে হত্যা করেন। তাসতুরের শাসক আল-হুরমুযানকে তিনি আঘাত করেন ও তাকে হত্যা করেন। অভিযোগ করা হয়েছে যে, তারা এ দুইজন উমর (রা)-কে হত্যার ব্যাপারে আবু লুলুকে সাহায্য করেছিল।
ইতোমধ্যে উমর (রা) তাকে বন্দী করার হুকুম দিয়েছিলেন। যাতে তার পরে যে খলীফা হবেন তিনি তাঁর বিচার করতে পারেন। যখন হযরত উসমান (রা) খলীফা হলেন এবং জনগণের সমস্যা সমাধানে বসলেন, তখন প্রথম মামলাটি ছিল উবাইদুল্লাহ ইবন উমর (রা) সম্পর্কে, যেটাতে উসমান (রা)-কে রায় দিতে হবে। আলী (রা) বলেন, “ন্যায় বিচারকে ছেড়ে দেওয়া বিচারের অন্তর্ভুক্ত নয়। তিনি হত্যার নির্দেশ প্রদান করলেন, কিছু সংখ্যক মুহাজির। বলেন, ‘গতকাল তাঁর পিতা শহীদ হন, আর আজকে তাকে হত্যা করা হবে, এটা কেমন দেখায়? আমর ইবন ‘আস (রা) বলেন, হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনাকে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন এটা থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন। এ মামলাটি আপনার যুগে সংঘটিত হয় নাই। কাজেই, আপনি আপনার পক্ষ থেকে এটা ছেড়ে দিতে পারেন। তখন হযরত উসমান (রা) এ তিনটি হত্যাকাণ্ডের খেসারত নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে আদায় করে দেন। কেননা, তাদের বিষয়গুলোর সিদ্ধান্ত খলীফার উপরই বর্তায়। বায়তুলমাল ব্যতীত তাদের কোন উত্তরাধিকারীই ছিল না। আর খলীফা এ ব্যাপারে যা ভাল মনে করেন তা-ই করতে পারেন। হযরত উসমান (রা) এভাবে উবাইদুল্লাহ ইবন উমর (রা)-কে দায়মুক্ত করে দিলেন।

মৃত্যু 9

তদুপরি, এই বিচারিক প্রহসনের গভীরে নিহিত ছিল একটি পদ্ধতিগত সাম্প্রদায়িক ও শ্রেণিবিদ্বেষী আইন। উসমানের শাসনামলে এই নীতিটি প্রতিষ্ঠিত হয় যে, “কোনো মুসলমান যদি কোনো অমুসলিমকে (জিম্মি বা অন্যথা) হত্যা করে, তবে তার জন্য মুসলমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে না।” জুফাইনাহ নামক খ্রিস্টান ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে উবাইদুল্লাহকে শাস্তি না দেওয়ার পেছনে এই বৈষম্যমূলক আইনটি ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, খিলাফতের আইনি কাঠামোতে মানুষের প্রাণের মূল্য নির্ধারিত হতো তার ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে, যা আধুনিক মানবাধিকারের পরিপন্থী [11]। উসমান এই হত্যাকাণ্ডের ‘দিয়াত’ বা রক্তপণ বায়তুলমাল বা নিজের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে পরিশোধ করে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন শাসনব্যবস্থা ছিল মূলত প্রভাবশালী কুরাইশ ও শাসক পরিবারের স্বার্থরক্ষার একটি হাতিয়ার। ন্যায়বিচার যেখানে ব্যক্তিগত প্রভাব, ধর্মীয় পরিচয় এবং রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কাছে নতি স্বীকার করে, সেই যুগকে ‘সোনালী যুগ’ হিসেবে অভিহিত করা কেবল একটি ঐতিহাসিক মিথ ছাড়া আর কিছুই নয়। উমরের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই পরবর্তীতে খিলাফতের অভ্যন্তরে চরম অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধের বীজ বপন করেছিল।


উপসংহারঃ উমরের উত্তরাধিকার ও একটি সমালোচনামূলক মূল্যায়ন

খলিফা উমরের শাসনকাল এবং তার মর্মান্তিক পরিণতি বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, তার প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রকাঠামো ছিল মূলত শক্তি ও শোষণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক বিশাল ইমারত। যদিও প্রথাগত ইতিহাসে তাকে ‘ফারুক’ বা ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যকারী হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়, কিন্তু তার শাসননীতির নির্মোহ বিশ্লেষণ ভিন্ন চিত্র অঙ্কন করে। তার প্রবর্তিত জিজিয়া ব্যবস্থা এবং অনারব দাসদের প্রতি কঠোরতা শেষ পর্যন্ত তারই জীবননাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উমরের মৃত্যু মুসলিম খিলাফতের মধ্যে যে রাজনৈতিক ফাটল তৈরি করেছিল, তা পরবর্তীতে উসমানের শাসনকাল এবং দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে। তার শাসনামলে অমুসলিমদের ওপর যে বৈষম্যমূলক আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতেও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

যৌক্তিক দৃষ্টিতে দেখলে, উমরের শাসন ছিল একটি সম্প্রসারণবাদী ধর্মরাষ্ট্রের মডেল, যেখানে সামরিক বিজয়কে ‘ঐশ্বরিক সমর্থন’ হিসেবে প্রচার করা হতো, কিন্তু এর নেপথ্যে কাজ করত সাধারণ জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন ও শ্রমের শোষণ। আবু লুলুর খঞ্জর কেবল একজন ব্যক্তিকে আঘাত করেনি, বরং তা ছিল মদিনার কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে বিজিত পারস্য ও লাঞ্ছিত মানবতার একটি রক্তাক্ত প্রতিবাদ। উমরের মৃত্যু কেবল একজন খলিফার মৃত্যু ছিল না, বরং তা ছিল একটি কঠোর ও এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থার অনিবার্য সংঘর্ষের ফল। ঐতিহাসিক সত্য কোনো ধর্মীয় সেন্টিমেন্টের ধার ধারে না; উমরের শাসনকাল তাই বীরত্বগাঁথার চেয়েও বেশি এক বৈষম্যমূলক ও সাম্রাজ্যবাদী দম্ভের ইতিহাস হিসেবেই চিহ্নিত হওয়া উচিত, যা শোষিত ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর রক্ত ও অশ্রুর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।


তথ্যসূত্রঃ
  1. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫০, ২৫১ ↩︎
  2. কাফেরদের অপমান ও লাঞ্ছিত করার জন্য অবমাননাকর জিজিয়া বা জিযিয়া ↩︎
  3. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নং ৩৪৩৫ 1 2
  4. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫০ ↩︎
  5. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫০, ২৫১ ↩︎
  6. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৩৫ ↩︎
  7. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৬, ২৯৭ ↩︎
  8. সহীহ বুখারী, ৩৪৩৫ ↩︎
  9. ফিকহে ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু, ড মুহাম্মদ রাওয়াস কালা’জী, ভাষান্তর ও সম্পাদনাঃ মুহাম্মদ খলিলুল রহমান মুমিন, আধুনিক প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ১৫২, ১৫৩, ১৫৪ ↩︎
  10. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ২৬৯ ↩︎
  11. ইসলামী শরীয়তে কাফের হত্যা করলে মুসলিমের কোন মৃত্যুদণ্ড নেই ↩︎