Table of Contents
ভূমিকা
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে কোরআনকে একটি ‘লওহে মাহফুজ’ বা সংরক্ষিত ফলক থেকে অবতীর্ণ শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয় ঐশ্বরিক বাণী হিসেবে দাবি করা হয়। তবে ঐতিহাসিক পাঠ এবং আদি ইসলামি উৎসগুলো (হাদিস ও সীরাত) বিশ্লেষণ করলে এই দাবির বিপরীতে একটি ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। বিশেষ করে মদ্যপান নিষিদ্ধকরণের পর্যায়ক্রমিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তথাকথিত ‘আসমানী ওহী’ মূলত তৎকালীন আরবের সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং সাহাবীদের ব্যক্তিগত আচরণের ওপর ভিত্তি করে গৃহীত একটি ‘রিঅ্যাক্টিভ’ বা প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা মাত্র। এই প্রবন্ধে ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলী ইবনে আবী তালিবের মদ্যপ অবস্থায় নামাজ পড়ানোর ঐতিহাসিক ঘটনা এবং তার প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ আয়াতের বিশ্লেষণ করা হবে।
আদি ইসলামে মদ্যপানের সংস্কৃতি ও ‘সেরা প্রজন্ম’
ইসলামের ইতিহাসে মুহাম্মদের সাহাবীদের ‘সর্বোত্তম প্রজন্ম’ এবং আধ্যাত্মিক ও চারিত্রিক দিক থেকে অতিমানবিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তবে ঐতিহাসিক নির্মোহ বিশ্লেষণে দেখা যায়, মদীনা জীবনের অধিকাংশ সময় জুড়েই সাহাবীদের মধ্যে মদ্যপান ছিল একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমনকি নবী মুহাম্মদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং প্রভাবশালী সাহাবীরাও নিয়মিত মদের মজলিস বসাতেন। এখানে মূল সমস্যাটি মদ্যপান ছিল না, বরং ছিল সাহাবীদের অসংযমী এবং কাণ্ডজ্ঞানহীন মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান, যা তাদের বিচারবুদ্ধি ও ধর্মীয় আচারের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল।
এটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন ইসলামি অনুশাসনে তথাকথিত ‘তাকওয়া’ বা চারিত্রিক দৃঢ়তার কোনো ধ্রুব মানদণ্ড ছিল না। যে সাহাবীদের ‘মূর্তিময় কুরআন’ হিসেবে দাবি করা হয়, তারা মদের নেশায় এতটাই বুঁদ হয়ে থাকতেন যে নামাজের মতো সংবেদনশীল মুহূর্তেও শিরক বা মূর্তিপূজার সমার্থক কথা বলতে দ্বিধা করেননি। এই নিয়ন্ত্রণহীন মদ্যপান ও তার ফলে সৃষ্ট বিভ্রাটগুলোই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ইসলামি নৈতিকতা কোনো শাশ্বত ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা থেকে আসেনি; বরং সাহাবীদের ব্যক্তিগত জীবনের বিশৃঙ্খলা ও মাতলামি সামাল দিতেই বারবার ‘ওহী’র পরিবর্তন ও পরিমার্জন করতে হয়েছে। মূলত, এটি ছিল তৎকালীন আরবের জাহেলী সংস্কৃতিরই একটি অবিন্যস্ত রূপ, যা সামাল দিতে মুহাম্মদকে হিমশিম খেতে হয়েছিল।
আলীর মদ্যপান এবং ভুল সূরা পাঠ
হাদিস গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত আছে, নবীর চাচাতো ভাই, একইসাথে মেয়ের জামাই, ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী একবার প্রচণ্ড মাতাল অবস্থায় ভুলভাবে সূরা পাঠ করে নামাজ আদায় করেন, যা ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত। আসুন সেই হাদিসটি পড়ি, যেখানে আলী মদ খেয়ে প্রচণ্ড মাতাল অবস্থায় ভুল সূরা পড়ে নামাজ আদায় করার ঘটনাটি রয়েছে। তবে শুরুতে একটি ওয়াজ শুনে নিই,
সূনান তিরমিজী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫০/ কোরআন তাফসীর
পরিচ্ছদঃ সূরা আন-নিসা
৩০২৬. আবদ হুমায়দ (রহঃ) ……. আলী ইবন আবূ তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আবদুর রহমান ইবন আওফ একবার আমাদের জন্য আহারের আয়োজন করেন এবং আমাদের দাওয়াত করলেন। সেখানে আমাদের মদ পান করান (তখনও মদ হারাম হয়নি)। আমাদেরকে মদের নেশায় ধরে। ইতোমধ্যে সালাতের ওয়াক্ত এসে পড়ে। এমতাবস্থায় লোকেরা আমাকেই ইমামত করতে এগিয়ে দেন। আমি (সালাতে) কিরআত করলামঃ (قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ لاَ أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ وَنَحْنُ نَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ) এবং (وَلَا أَنْتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ) এর স্থলে পড়ে পড়লাম (وَنَحْنُ نَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ) তোমরা যাদের ইবাদত কর আমরাও তাদের ইবাদত করি। তখন আল্লাহ্ তা’আলা এই আয়াত নাযিল করেনঃ
হে মুমিনগণ! মদ্যপানোম্মত্ত অবস্থায় তোমরা সালাতের নিকটবর্তী হবে না যতক্ষণ না তোমরা বল তা বুঝতে পার। (৪ঃ ৪৩)। (আবু ঈসা বলেন) হাদীসটি হাসান-গারীব-সহীহ।
সহীহ, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৩০২৬ (আল মাদানী প্রকাশনী)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
পাবলিশারঃ আল্লামা আলবানী একাডেমী
অধ্যায়ঃ ২১/ পানীয় দ্রব্য
পরিচ্ছদঃ ১. মদ হারাম হওয়ার বর্ণনা
৩৬৭১। আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। একদা আনসার গোত্রের এক লোক তাকে ও আব্দুর রাহমান ইবনু আওফ (রাঃ)-কে দা‘ওয়াত করে উভয়কে মদ পান করালেন তা হারাম হওয়ার পূর্বে। অতঃপর মাগরিবের সালাতে আলী (রাঃ) তাদের ইমামতি করলেন। তিনি সূরা ‘‘কুল ইয়া আয়্যুহাল কাফিরূন’’ পাঠ করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। অতঃপর এ আয়াত অবতীর্ণ হলোঃ ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন মাতাল অবস্থায় থাকো তখন সালাতের কাছেও যেও না। সালাত তখনই পড়বে, যখন তোমরা কি বলছো তা সঠিকরূাপ বুঝতে পারো।’’ (সূরা আন-নিসাঃ ৪৩)(1)
সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
ওহী নাকি তাৎক্ষণিক ম্যানেজমেন্ট
যুক্তিবাদী দৃষ্টিতে এই ঘটনাটি পর্যালোচনা করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে:
- ঐশ্বরিক প্রজ্ঞার অভাব: যদি ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হয় এবং মদ্যপান যদি ক্ষতিকরই হয়ে থাকে, তবে কেন ‘সর্বজ্ঞ’ ঈশ্বর তা শুরুতেই নিষিদ্ধ করলেন না? কেন একজন প্রভাবশালী সাহাবীকে নামাজে মূর্তিপূজার সমার্থক কথা বলা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো? এটি ইঙ্গিত দেয় যে, কোরআন কোনো পূর্বপরিকল্পিত ঐশ্বরিক গ্রন্থ নয়, বরং পরিস্থিতি সামাল দিতে মুহাম্মদের তাৎক্ষণিক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিক্রিয়া।
- তৌহিদের বিকৃতি: খলিফা আলীর মতো একজন ব্যক্তি, যাকে ‘আসাদুল্লাহ’ বা আল্লাহর সিংহ বলা হয়, তিনি মদ্যপ অবস্থায় নামাজের মধ্যে একেশ্বরবাদ বা তৌহিদের মূল বাণী সূরা কাফিরূনকে বিকৃত করে বহুত্ববাদী (Polytheistic) বক্তব্য প্রচার করেছিলেন। এটি তৎকালীন সাহাবীদের আধ্যাত্মিক গভীরতা এবং সচেতনতার দৈন্য দশাকেই উন্মোচিত করে।
- সুবিধাবাদী নিষিদ্ধকরণ: আধুনিক অপোলজিস্টরা দাবি করেন মদ্যপান ‘ধীরে ধীরে’ নিষিদ্ধ করা হয়েছে মানুষের অভ্যাসের কথা চিন্তা করে। কিন্তু যুক্তিনিষ্ঠভাবে দেখলে, নামাজের মতো একটি পবিত্র ক্রুশিয়াল স্তম্ভে যখন শিরক (অংশীবাদ) ঢুকে পড়ছে (যা নাকি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধ), তখনও পূর্ণ নিষিদ্ধ না করে শুধু ‘নেশা অবস্থায় নামাজে না আসা’র বিধান দেওয়া এক ধরণের আপোষকামী নীতি।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, সাহাবীদের মদ্যপানের ইতিহাস এবং আলীর ভুল নামাজ পড়ানোর ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগটি কোনো স্বর্গীয় মাহাত্ম্যে ঘেরা ছিল না, বরং এটি ছিল দোষ-ত্রুটি যুক্ত সাধারণ মানুষের একটি গোষ্ঠী। কোরআনের আয়াতগুলো কোনো শাশ্বত নৈতিক অবস্থান থেকে আসেনি, বরং সাহাবীদের মাতলামি এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলার প্রেক্ষিতে সৃষ্ট বিব্রতকর পরিস্থিতি ঢাকা দেওয়ার জন্য ‘ওহী’র মোড়কে রাজনৈতিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক সত্যগুলো স্বীকার করা একজন যুক্তিবাদী মানুষের জন্য অপরিহার্য, যা ইসলামি অলৌকিকত্বের মিথকে চূর্ণ করে দেয়।
