ইসলামে নাসী নিষিদ্ধকরণঃ গাণিতিক ও যৌক্তিক অসামঞ্জস্য

ভূমিকা

প্রাচীন আরবে ‘নাসী’ ছিল চাঁদ ও সূর্য বর্ষের সমন্বয়ে সাজানো একটি উন্নত ক্যালেন্ডার ব্যবস্থা, বর্তমান সময়ে যেমন লিপ ইয়ার রয়েছে। ১২ মাসের প্রচলিত পঞ্জিকা থাকার পরেও, বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ধর্মীয় উৎসবের সুবিধার্থে প্রতি দুই-তিন বছরে একবার অতিরিক্ত মাস যোগ করে বর্ষকে ঋতুর সাথে সামঞ্জস্য করে রাখা হত। এই বিধানটি কিনানা গোত্রের ‘আল কালাম্মাস’ নামে পরিচিত ব্যক্তির কাছে ছিল, যিনি নাসী প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিতেন। কিন্ত মদিনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রারম্ভেই (৯ম-১০ম হিজরী) কুরআন ৯:৩৬-৩৭ আয়াতে নাসী নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কোরআনের এই আয়াতে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ’র নিকটে মাসগুলোর সংখ্যা বারো ও সৃষ্টিকালের দিন থেকেই আল্লাহ তা নির্ধারিত রেখেছেন, এর মধ্যে চার মাস পবিত্র… তাই নিজের ওপর অন্যায় করো না। (তাঁহারা) এক বছর কিছু মাসকে হালাল করে, অন্য বছর হারাম করে নাসী প্রচলনের মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত সংখ্যাকে মেলানোর চেষ্টা করে, সুতরাং যা আল্লাহ হারাম করেছেন তা তারা হালাল করে নেয় – এটাই তাদের অবিশ্বাসের একটি বৃদ্ধি; আল্লাহ অবিশ্বাসীদের পথপ্রদর্শক হন না।” বিদায় হজের সময় (বুখারী হাদিস ৩১৯৭) নবী (সা.) বলেছেন, “সময় তার আদিকালে ফিরে এসেছে, এবং বছর আবার বারো মাস হয়েছে…”। অর্থাৎ এই সময়ে ক্যালেন্ডার সম্পূর্ণরূপে চান্দ্রবর্ষে পরিণত হয়েছে। এর ফলে ইসলামী বর্ষ সৌর বছরের প্রতি বছরে প্রায় ১১ দিন পিছিয়ে যায় (৩৩ বছরের মাথায় চক্র পূর্ণ হয়)।

এই নিষেধাজ্ঞার পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছিল। গোত্রীয় নিয়ন্ত্রণের (কিনানা গোত্র) থেকে ধর্মীয়-রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রে (মদিনায়) স্থানান্তর ঘটানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখায় অনেক ঐতিহাসিক ও গবেষক। তবে বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই যে সৃষ্টির কোনো নিরপেক্ষ ‘আদি অবস্থা’ থেকে সত্যিকারের একটি ক্যালেন্ডার শুরু হয়েছিল। বরং, সব পঞ্চিকাই মানব-নির্ধারিত; অন্য সভ্যতা যেমন হিব্রু, ভারতীয় বা চীনা প্রাচীন ক্যালেন্ডারগুলোতে ঋতুর গুরুত্ব রেখেছিল কেননা প্রকৃতি ও মানবজীবন মৌসুমভিত্তিক। ইসলামী ক্যালেন্ডারে নাসী বন্ধ করে শুধু চান্দ্রবর্ষ মেনে নেওয়াটা এই পৃথিবীর বায়োলজিক্যাল ও অর্থনৈতিক ছন্দের বিপরীতে।


নাসী (Nasī’) কী?

‘নাসী’ একটি আরবি শব্দ, যার শাব্দিক অর্থ হলো বিলম্বিত করা, স্থগিত রাখা বা পিছিয়ে দেওয়া। প্রাক-ইসলামী যুগে আরবরা মূলত চাঁদের আবর্তনের ওপর ভিত্তি করে মাস গণনা করত, যা গাণিতিকভাবে বছরে ৩৫৪ দিন (চান্দ্রবছর)। কিন্তু ঋতু পরিবর্তন এবং সূর্যের আবর্তন ভিত্তিক বছর বা সৌরবছর হলো ৩৬৫ দিন। ফলে এই দুই ধরনের বছরের মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ১১ দিনের একটি গ্যাপ বা পার্থক্য তৈরি হতো। এই পার্থক্যের কারণে হজের মতো গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলো প্রতি বছর ১১ দিন করে এগিয়ে আসত এবং ঋতু পরিবর্তন হয়ে যেত। এই অসামঞ্জস্য দূর করার জন্য আরবরা প্রতি দুই বা তিন বছর অন্তর বছরের শেষে একটি অতিরিক্ত ১৩তম মাস যোগ করত, যাতে চান্দ্রবছরটি সৌরবছরের সমান হয় এবং ঋতুগুলোর সাথে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। এই অতিরিক্ত মাস যোগ করার গাণিতিক প্রক্রিয়া এবং এর মাধ্যমে পবিত্র মাসগুলোকে নিজের সুবিধামতো পিছিয়ে দেওয়াকেই আরবে ‘নাসী’ প্রথা বলা হতো। নবী মুহাম্মদ এই নাসী প্রথাকে নিষিদ্ধ করেন এবং যার ফলাফল হিসেবে, আরবি মাসগুলোর অর্থের সাথে সেই মাসের আবহাওয়ার আর কোন সামাঞ্জস্য থাকে না।


ইসলামিক দলিল

কোরআনে এই সম্পর্কে খুব পরিষ্কার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে [1]

নিষিদ্ধ মাসকে পিছিয়ে দেয়া কুফরীর উপর আরেক কুফরী কাজ যা দ্বারা কাফিরদেরকে পথভ্রষ্ট করা হয়। এক বছর তারা একটি মাসকে হালাল করে, আরেক বছর ঐ মাসটিকে হারাম করে যাতে আল্লাহর হারাম করা মাসগুলোর সংখ্যা পূর্ণ করা যায়। এভাবে তারা আল্লাহর হারাম করা মাসগুলোকে হারাম করে নেয়। তাদের খারাপ কাজগুলো তাদের কাছে আনন্দদায়ক। আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে সঠিক পথ দেখান না।
— Taisirul Quran
নিশ্চয়ই এই (মাসগুলির) স্থানান্তর কুফরের মধ্যে আরও কুফরী বৃদ্ধি করা, যদ্বারা কাফিরদেরকে পথভ্রষ্ট করা হয়। (তা এ রূপে যে) তারা সেই হারাম মাসকে কোন বছর হালাল করে নেয় এবং কোন বছর হারাম মনে করে, আল্লাহ যে মাসগুলিকে হারাম করেছেন, যেন তারা ওগুলির সংখ্যা পূর্ণ করে নিতে পারে, অতঃপর তারা আল্লাহর নিষিদ্ধ মাসগুলিকে হালাল করে নেয়, তাদের দুস্কর্মগুলি তাদের কাছে শোভনীয় মনে হয়, আর আল্লাহ এইরূপ কাফিরদেরকে হিদায়াত (এর তাওফীক দান) করেননা।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় কোন মাসকে পিছিয়ে দেয়া কুফরী বৃদ্ধি করে, এর দ্বারা কাফিররা পথভ্রষ্ট হয়, তারা এটি এক বছর হালাল করে এবং আরেক বছর হারাম করে, যাতে তারা আল্লাহ যা হারাম করেছেন তার সংখ্যা ঠিক রাখে। ফলে আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তা তারা হালাল করে। তাদের মন্দ আমলসমূহ তাদের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে। আর আল্লাহ কাফির কওমকে হিদায়াত দেন না।
— Rawai Al-bayan
কোন মাসকে পিছিয়ে দেয়া তো শুধু কুফরীতে বৃদ্ধি সাধন করা, যা দিয়ে কাফেরদেরকে বিভ্রান্ত করা হয়। তারা এটাকে কোনো বছর বৈধ করে এবং কোনো বছর অবৈধ করে যাতে তারা, আল্লাহ্‌ যেগুলোকে নিষিদ্ধ করেছেন, সেগুলোর গণনা পূর্ণ করতে পারে, ফলে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা হালাল করে। তাদের মন্দ কাজগুলো তাদের জন্য শোভনীয় করা হয়েছে; আর আল্লাহ্‌ কাফের সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এবারে আসুন হাদিসে এই সম্পর্কে কী বলা আছে জেনে নেয়া যাক, [2]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৫৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছেদঃ ৫৯/২. সাত যমীন সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে।
৩১৯৭. আবূ বকরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ যে দিন আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, সে দিন হতে সময় যেভাবে আবর্তিত হচ্ছিল আজও তা সেভাবে আবর্তিত হচ্ছে। বারো মাসে এক বছর। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। যুল-কা‘দাহ, যূল-হিজ্জাহ ও মুহাররাম। তিনটি মাস পরস্পর রয়েছে। আর একটি মাস হলো রজব-ই-মুযারা[1] যা জুমাদা ও শা‘বান মাসের মাঝে অবস্থিত। (৬৭) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৯৫৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৯৬৭)
[1] মুযারা একটি সম্প্রদায়ের নাম। ‘আরবের অন্যান্য সম্প্রদায় হতে এ সম্প্রদায়টি রাজাব মাসের সম্মান প্রদর্শনে অতি কঠোর ছিল। তাই এ মাসটিকে তাদের দিকে সম্বন্ধ করে হাদীসে ‘‘রাজাব-মুযারা’’ বলা হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ বাকরা (রাঃ)

আসুন এই আয়াতের ব্যাখ্যা পড়ে নিই তাফসীরে মাযহারী থেকে [3]

নিষিদ্ধকাল অন্য মাসে পিছাইয়া দেওয়া কেবল সত্যপ্রত্যাখ্যানের মাত্রা বৃদ্ধি করা; যাহা দ্বারা, যাহারা সত্যপ্রত্যাখ্যান করে তাহারা উহাকে কোন বৎসর বৈধ করে এবং কোন বৎসর অবৈধ করে যাহাতে তাহারা আল্লাহ্ যেগুলিকে নিষিদ্ধ করিয়াছেন তাহা বৈধ করিতে পারে। তাহাদিগের মন্দ কাজগুলি তাহাদিগের জন্য শোভনীয় করা হইয়াছে; আল্লাহ্ সত্যপ্রত্যাখ্যানকারী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না।
‘নাসীউন’ শব্দটি এখানে ফায়িলুন শব্দের অনুসৃতিতে কর্তৃপদের অর্থবহ। যেমন সায়ীরুন, হারিকুন ইত্যাদি। অথবা শব্দটি এখানে কর্ম পদের অর্থে এসেছে। যেমন, জারিহুন এবং ক্বাতিলুন। ‘নাসীউন’ অর্থ মূলতবী রাখা, পেছনে ঠেলে দেয়া অথবা ওই বস্তু যাকে পশ্চাতে ঠেলে দেয়া হয়েছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যেতে পারে যে ‘আনশাহুল্লাহু আজালাহু (আল্লাহ্ তার আয়ুষ্কালে মন্থরতা দিয়েছেন)। নাসাআ ফিআজলিহি (তার মৃত্যুকষ্ট পিছিয়ে দিয়েছেন)।
এখানে ‘নাসীউন’ কথাটির প্রকৃত অর্থ নিষিদ্ধ মাস সমূহকে অগ্র-পশ্চাৎ করে দেয়া। মূর্খতার যুগে আরববাসীরা তাদের প্রয়োজনানুসারে কোনো নিষিদ্ধ মাসকে হালাল করে নিতো। আর ওই মাসের নিষিদ্ধতা আরোপ করতো পরবর্তী কোনো হালাল মাসে। আবু মালেক সূত্রে ইবনে জারীর লিখেছেন, মূর্খতার যুগে আরববাসীরা বছরের বারো মাসকে করে নিতো তেরো মাস (প্রতি তিন বছরে অতিরিক্ত কিছুদিন মিলিয়ে তৈরী করতো নতুন মাস)। কখনো মহররমকে বলতো সফর। মাসের হিসাবে এ রকম বিশৃংখলা সৃষ্টি করার কারণে অবতীর্ণ হয়েছে আলোচ্য আয়াতটি।

নাসী

এবারে আসুন আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া থেকে এই বিষয়ে আরেকটু বিস্তারিত জানি, [4]

নাসী 1
নাসী 3

নাম ও অর্থের বৈপরিত্য (Etymological Fallacy)

যেকোনো উন্নত সভ্যতায় মাসের নামকরণ করা হয় সেই সময়ের আবহাওয়া, প্রকৃতি বা ঋতুর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী। বাংলা ক্যালেন্ডারে যেমন ‘বৈশাখ’ শব্দটি এসেছে বিশাখা নক্ষত্র থেকে যা গ্রীষ্মের দাবদাহকে নির্দেশ করে, কিংবা ‘শ্রাবণ’ মাস বললেই আমাদের চোখে বর্ষার ছবি ভেসে ওঠে। প্রাচীন আরবরাও একইভাবে তাদের মাসের নামকরণ করেছিল। কিন্তু মদিনা আমলে নাসী (Nasī’) বা মাস যোগ করার প্রথা নিষিদ্ধ করার ফলে এই নামগুলো এখন কেবল কিছু অন্তঃসারশূন্য শব্দে পরিণত হয়েছে। নিচে বাংলা মাসের সাথে তুলনা করে এই অসংগতিগুলো তুলে ধরা হলো:

রমজানঃ ‘তপ্ত বালুর’ মাসে বরফ শীতল আবহাওয়া

‘রমজান’ শব্দটি এসেছে মূল ধাতু ‘রমদ’ (Ramad) থেকে, যার শাব্দিক অর্থ হলো প্রচণ্ড উত্তাপ, সূর্যের তাপে পাথর বা বালু পুড়ে যাওয়া। [5] নাসী প্রথা চালু থাকাকালীন রমজান মাসটি সবসময় আরবের চরম গ্রীষ্মকালে স্থির থাকত।

  • বাঙালি প্রেক্ষাপট: কল্পনা করুন, আমাদের ‘বৈশাখ’ মাসটি যদি প্রতি বছর ১১ দিন করে পিছিয়ে যেতে যেতে একসময় পৌষ বা মাঘ মাসের হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যে এসে পড়ে। তখন যদি কেউ লেপ মুড়ি দিয়ে বলে “আজ বৈশাখের প্রচণ্ড দাবদাহে আমি দগ্ধ হচ্ছি”, তবে তা যেমন হাস্যকর শোনায়, বর্তমানের ইসলামি ক্যালেন্ডার ঠিক তেমনই।
  • যৌক্তিক ত্রুটি: উত্তর গোলার্ধে যখন রমজান ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে পড়ে, তখন ‘প্রচণ্ড উত্তাপ’ নামের এই মাসটি আসলে হয় বছরের শীতলতম মাস। এটি কেবল একটি ভাষাগত ভুল নয়, বরং একটি প্রাকৃতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার নামান্তর। [6]

রবিউল আউয়াল ও সানীঃ ‘বসন্ত’ যখন বর্ষায় বা শরতে

আরবি ‘রবী’ (Rabi’) শব্দের অর্থ হলো বসন্তকাল বা সবুজায়ন। যখন আরবে নাসী প্রথা ছিল, তখন রবিউল আউয়াল ও রবিউল সানী মাস দুটি প্রকৃতির সজীবতা ও বসন্তের আগমনের সাথে মিল রেখে পালিত হতো।

  • বাঙালি প্রেক্ষাপট: এটি অনেকটা আমাদের ‘ফাল্গুন’ মাসের মতো। এখন যদি এই বিশুদ্ধ চান্দ্র ক্যালেন্ডারের নিয়মে আমাদের ‘ফাল্গুন’ মাসটি আবর্তিত হতে হতে বর্ষাকালের মাঝখানে চলে আসে, তবে নাম ‘ফাল্গুন’ (বসন্ত) হলেও চারদিকে থাকবে কাদা আর বৃষ্টি।
  • যৌক্তিক ত্রুটি: বসন্তের নামে নামকরণ করা মাস যখন ঝরনা বা বৃষ্টির মৌসুমে পড়ে, তখন সেই ক্যালেন্ডারটি তার ঐতিহাসিক ও আভিধানিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। এটি প্রমাণ করে যে, নাসী নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তটি নেওয়ার সময় ভবিষ্যৎ গাণিতিক বিচ্যুতির কথা চিন্তা করা হয়নি। [7]

জুমাদা আল-উলা ও আখিরাঃ ‘জমাটবদ্ধ শীতে’ ঘাম ঝরানো গরম

‘জুমাদা’ শব্দটি এসেছে ‘জুমদ’ (Jumad) থেকে, যার অর্থ হলো জমে যাওয়া বা স্থবির হওয়া। প্রাচীন আরবে যখন শীতকালে পানি বা কুয়াশা জমে যেত, তখন এই মাসের নাম রাখা হয়েছিল জুমাদা।

  • বাঙালি প্রেক্ষাপট: এটি আমাদের ‘পৌষ’ বা ‘মাঘ’ মাসের সমতুল্য। এখন যদি এই ক্যালেন্ডারের কারণে আমাদের ‘মাঘ’ মাসটি জুন-জুলাই মাসের ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে পড়ে, তবে ‘জমাটবদ্ধ শীত’ নামটির কোনো যৌক্তিক ভিত্তি থাকে না।
  • যৌক্তিক ত্রুটি: আরবরা ওকাজ মেলা বা বাণিজ্যের সুবিধার্থে এই মাসগুলোকে শীতকালে স্থির রাখত। নাসী নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে এখন জুমাদা মাসটি আরবের তপ্ত মরুভূমির আগুনের লু-হাওয়ার মধ্যেও আসতে পারে, যা সম্পূর্ণ একটি মানসিক বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। [8]

উপরের উদাহরণগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে: ইসলামি ক্যালেন্ডার একটি ‘বিমূর্ত গণিত’ (Abstract Mathematics) হতে পারে, কিন্তু এটি একটি ‘প্রাকৃতিক বিজ্ঞান’ (Natural Science) নয়। একটি কার্যকর ক্যালেন্ডার এবং মাসগুলোর নামকরণের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে ঋতু, কৃষি এবং আবহাওয়ার সাথে সংযুক্ত রাখা। নাসী প্রথা নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে মুহাম্মদ (সা.) সময়কে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন। ফলে:

  1. ভাষাগত বিপর্যয়: শব্দের অর্থ এক রকম, কিন্তু বাস্তবতা তার বিপরীত। এটি তথাকথিত ‘ঐশ্বরিক নিখুঁত ব্যবস্থার’ দাবির সাথে সাংঘর্ষিক।
  2. সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা: কৃষিভিত্তিক বা আবহাওয়া-নির্ভর কোনো সমাজ এই ক্যালেন্ডার ব্যবহার করতে পারে না, কারণ এটি প্রতি বছর ১১ দিন করে সরে যায়।
  3. গাণিতিক স্থবিরতা: যদি নাসী বা ইন্টারক্যালেশন পদ্ধতি ভুল হতো, তবে আধুনিক বিজ্ঞান ও বিশ্বের সমস্ত উন্নত ক্যালেন্ডার (যেমন লিপ ইয়ার) ভুল হতো। মূলত, নাসী নিষিদ্ধ করা ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যা সময়ের প্রাকৃতিক নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। [9]

ভৌগোলিক ও মানবিক বৈষম্য

ইসলাম নিজেকে একটি ‘সর্বজনীন’ (Universal) জীবনব্যবস্থা হিসেবে দাবি করলেও, নাসী (Nasī’) বা ইন্টারক্যালেশন বর্জিত বিশুদ্ধ চান্দ্র ক্যালেন্ডার এই দাবিকে গাণিতিকভাবে নাকচ করে দেয়। একটি গোলকীয় পৃথিবীর বিভিন্ন অক্ষাংশে ঋতু ও দিনের দৈর্ঘ্য যে আকাশ-পাতাল ভিন্ন হয়, ইসলামি বিধান তা আমলে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। নাসী প্রথা থাকলে রমজানকে একটি নির্দিষ্ট নাতিশীতোষ্ণ ঋতুতে স্থির রাখা সম্ভব ছিল, কিন্তু তা নিষিদ্ধ করায় সময় গণনা এখন প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

মেরু অঞ্চলের গাণিতিক দেয়াল (The Polar Paradox)

কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী, রোজা রাখতে হয় সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। [10] কিন্তু উত্তর মেরু (Arctic) এবং দক্ষিণ মেরুতে (Antarctic) ‘মিডনাইট সান’ (Midnight Sun) বা ‘পোলার নাইট’ (Polar Night) চলাকালীন এই নিয়মটি আক্ষরিকভাবেই পালন করা অসম্ভব।

  • বাস্তবতা: উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকালে নরওয়ে, সুইডেন বা আইসল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে সূর্য প্রায় ২৪ ঘণ্টাই দিগন্তের উপরে থাকে। সেখানে ‘সূর্যাস্ত’ বলতে কিছু নেই। বিপরীতভাবে, শীতকালে সেখানে সূর্যই ওঠে না।
  • যৌক্তিক সমালোচনা: যদি কোনো স্রষ্টা পুরো পৃথিবীর জন্য নিয়ম করে থাকেন, তবে তাঁর দেওয়া নিয়মে এমন গাণিতিক বিচ্যুতি কেন থাকবে যা পৃথিবীর একটি বিশাল অংশে পালন করা অসম্ভব? এটি প্রমাণ করে যে, রোজার বিধানটি কেবল আরব উপদ্বীপের ভৌগোলিক সীমারেখার (যেখানে দিনের দৈর্ঘ্যের পরিবর্তন খুব বেশি নয়) কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছিল। [11]

রোজার দৈর্ঘ্য ও চরম বৈষম্য

নাসী নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে রমজান মাসটি প্রতি বছর ১১ দিন করে পিছিয়ে যায়। এর ফলে উচ্চ অক্ষাংশের দেশগুলোতে বসবাসরত মুসলিমদের জন্য রোজা একটি চরম শারীরিক যন্ত্রণায় পরিণত হয়।

  • অসমতা: যখন রমজান উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকালে পড়ে, তখন লন্ডনে রোজা হয় প্রায় ১৯ ঘণ্টা, আর আইসল্যান্ডে প্রায় ২২ ঘণ্টা। অথচ একই সময়ে দক্ষিণ গোলার্ধে (যেমন অস্ট্রেলিয়া বা চিলিতে) রোজা হয় মাত্র ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা। [12]
  • নাসীর প্রয়োজনীয়তা: যদি নাসী ব্যবস্থা থাকত এবং রমজানকে আরবের সেই আদি ক্যালেন্ডারের মতো একটি নির্দিষ্ট সময়ে স্থির রাখা হতো, তবে এই চরম বৈষম্য অন্তত ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে স্থবির হয়ে যেত না।

শারীরিক ধকল ও জৈবিক ঘড়িকে অস্বীকার

মানুষের শরীর সূর্যের আলো এবং অন্ধকারের সাথে তাল মিলিয়ে চলে (Circadian Rhythm), চাঁদের আবর্তনের সাথে নয়। নাসী বর্জিত ক্যালেন্ডার মানুষের এই জৈবিক ছন্দের ওপর কৃত্রিম চাপ প্রয়োগ করে।

  • স্বাস্থ্যঝুঁকি: ১৮-২২ ঘণ্টা পানাহার ত্যাগ করা কোনো ইবাদত নয়, বরং চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি আত্মঘাতী। বিশেষ করে বৃদ্ধ এবং কিডনি রোগীদের জন্য এটি তীব্র ডিহাইড্রেশন (Dehydration) এবং ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালেন্স তৈরি করে। দীর্ঘ সময় পানি পান না করায় প্রস্রাবের নালীতে সংক্রমণ এবং কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যায়। [13]
  • অদূরদর্শিতা: নাসী থাকলে যদি রমজানকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ঋতুতে (যেমন বসন্ত বা শরতে) রাখা যেত, তবে এই মানবিক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হতো। একটি ‘দয়ালু’ ব্যবস্থা কখনোই তার অনুসারীদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এমন অসম যন্ত্রণার সম্মুখীন করতে পারে না।

‘অনুমানিক সময়’ এবং ফতোয়ার অসারতা

যখন কোরআন ও হাদিসের আক্ষরিক নিয়ম পালন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন আধুনিক আলেমরা মক্কা বা নিকটবর্তী শহরের সময় মেনে রোজা রাখার ‘ফতোয়া’ দেন।

  • লজিক্যাল কাউন্টার: এই ফতোয়াগুলোই প্রমাণ করে যে মূল ধর্মীয় পাঠ (Text) অসম্পূর্ণ। যদি মূল বিধানটি ‘সম্পূর্ণ এবং স্পষ্ট’ হতো, তবে কেন মানুষকে আধুনিক সময়ে এসে কৃত্রিমভাবে ‘সময়’ উদ্ভাবন করতে হবে? মূলত, ক্যালেন্ডার থেকে নাসী বাদ দেওয়া ছিল একটি গ্লোবাল যুগের কথা চিন্তা না করে নেওয়া একটি আঞ্চলিক সিদ্ধান্ত।

বৈজ্ঞানিক বিচ্ছিন্নতা: মানুষ কি সূর্যের ছন্দে চলে নাকি চাঁদের?

গাণিতিক ও বাস্তবিক যুক্তি অনুযায়ী, মানবজীবন মূলত সূর্যের ছন্দে আবর্তিত। আমাদের ফসল বোনা, খাদ্য উৎপাদন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং শারীরবৃত্তীয় কাজ সবই সৌরচক্রের ওপর নির্ভরশীল। ইসলামি ক্যালেন্ডার নাসী নিষিদ্ধ করে সময়কে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।

  • কৃষি ও অর্থনীতি: চান্দ্র ক্যালেন্ডারের কোনো কৃষিভিত্তি নেই। অথচ মানব সভ্যতার টিকে থাকা নির্ভর করে কৃষি বা সৌর ঋতুর ওপর। নাসী থাকলে কৃষি ক্যালেন্ডারের সাথে ধর্মীয় উৎসবের একটি সমন্বয় থাকত।
  • বিজ্ঞান বনাম বিশ্বাস: আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং লিপ ইয়ার (Leap Year) ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা সময়ের যে সূক্ষ্ম সমন্বয় করি, নাসী ছিল তারই একটি প্রাচীন রূপ। একে ‘কুফর’ বা অবিশ্বাস হিসেবে চিহ্নিত করা ছিল মূলত বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রাকে অস্বীকার করার শামিল। [14]

নাসী নিষিদ্ধ করার ফলে সৃষ্ট এই বৈষম্য প্রমাণ করে যে, এই ক্যালেন্ডার ব্যবস্থাটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের এবং নির্দিষ্ট এলাকার জন্য তৈরি ছিল। এর সর্বজনীনতার দাবিটি গাণিতিক এবং মানবিক উভয় দিক থেকেই ত্রুটিপূর্ণ। এটি সময়ের প্রবাহকে একটি বিশৃঙ্খল আবর্তনের মধ্যে ফেলে দিয়েছে, যা যুক্তির চেয়ে অন্ধ আবেগের ওপর বেশি নির্ভরশীল।


অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিশৃঙ্খলা

নাসীর মূল প্রয়োজনে আরবরা তাদের কৃষি-অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক চক্রকে সমন্বিত রাখতেন। হজ এবং বার্ষিক ওকায মেলা কৃষি ফসল উঠার পর এবং আবহাওয়া অনুকূলে সময়ে আয়োজন হতো। আল-বীরুনীর মতে, নাসী ব্যবস্থার মাধ্যমে বার্ষিক পুণ্যসপ্তাহ-পর্ব ও ব্যবসায়িক মৌসুমের সময়সূচিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা হতো। কিন্তু নাসী নিষিদ্ধ হওয়ার পরে হজের দিন প্রতিবার সূর্য বর্ষের তুলনায় প্রায় ১১ দিন আগে চলে আসে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে প্রাচীন আরবের কৃষিজীবী অর্থনীতি এবং তৎসংক্রান্ত মেলার ধারা বিঘ্নিত হয়েছে।

  • ফসলের মৌসুম: নাসী ব্যবস্থায় হজ সেই সময় হত, যখন জমির ফসল ঘরে উঠত এবং আবহাওয়া শীতল থাকত। এতে চাষাবাদ ও বাণিজ্য-পর্যটনের সুবিধা পেত। এখন হজের সময় নির্দিষ্ট নয়; এর ফলে আগে কৃষকেরা উপযুক্ত মৌসুমে আয়োজিত পুণ্যসপ্তাহ ব্যবসা অব্যাহত রাখতে পারছেন না। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের হজের সময় মক্কায় তাপমাত্রা ৫০°C ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যার ফলে ৫ দিনের মধ্যে অন্তত ১,৩০১ জন পাইলগ্রিমের মৃত্যু হয়। শীতকালে এ ধরনের ঝুঁকি কম হলেও গ্রীষ্মে তীব্র তাপদাহে জনসাধারণের জীবন বিপন্ন হয়।
  • যাকাতের হিসেবে গরমিল: ইসলামী নীতিতে যাকাত দেওয়ার শর্ত হচ্ছে সম্পদ এক বছর পর্যন্ত রাখলে ২.৫% প্রদান। কিন্তু সৌর বর্ষ (৩৬৫ দিন) ও চান্দ্রবর্ষ (৩৫৪ দিন) এ সময়ের পার্থক্যে প্রতি ৩৩ বছরে একবার অতিরিক্ত আয় করতে হয়। অর্থাৎ ক্রমাগত চাঁদমাস হিসেবের কারণে ৩৩ বছরের পর সৌরবর্ষের তুলনায় একজন মুসলিমকে একবার অতিরিক্ত যাকাত দিতে হয়। এটিও সম্পদের অসম বণ্টনের উদাহরণ।

দশ হিজরীর ‘রিসেট’ তত্ত্বের অসারতা

মুহাম্মদের একটি বক্তব্যে বলা হয়েছে— “সময় তার আদিস্থানে ফিরে এসেছে; জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবে আসমান-জমিন সৃষ্টির সময় যেমন ছিল।” কথাটি শুনতে গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ মনে হলেও এর পক্ষে কোনো স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া যায় না। মহাবিশ্বের ইতিহাসে এমন কোনো নির্দিষ্ট “আদি বিন্দু” নেই, যেখানে সময় ঘড়ির কাঁটার মতো ঘুরে আবার ঠিক আগের অবস্থানে ফিরে আসে।

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুযায়ী মহাবিশ্ব ক্রমবিকাশমান; এটি কোনো চক্রাকার ঘূর্ণনে পূর্বের নির্দিষ্ট তারিখ বা অবস্থায় হুবহু ফিরে আসে— এমন ধারণার সমর্থনে প্রমাণ নেই। ফলে “আদি অবস্থায় প্রত্যাবর্তন” ধারণাটি বৈজ্ঞানিক বর্ণনার চেয়ে বেশি প্রতীকী বা অলঙ্কারধর্মী বলেই প্রতীয়মান হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখলে, বক্তব্যটি সম্ভবত ক্যালেন্ডারসংক্রান্ত বিশৃঙ্খলা বা সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ন্ত্রণের একটি ঘোষণামূলক ভাষ্য ছিল। মানবসভ্যতার সময়গণনা পদ্ধতি মূলত চুক্তিনির্ভর ও আপেক্ষিক— এটি প্রকৃতির নিজস্ব কোনো অপরিবর্তনীয় সূচক নয়। তাই মানুষের নির্ধারিত একটি সূচনাবিন্দুকে “মহাজাগতিক আদিস্থান” হিসেবে উপস্থাপন করা যুক্তিগতভাবে টেকসই নয়।


নাসী নিষিদ্ধের কারণে সমস্যার ক্ষেত্রসমূহ

নিচে নাসী ব্যবস্থাপনা বন্ধের ফলে উদ্ভূত প্রধান সমস্যাগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

রমজান ও রোজা

ঋতুবিরোধী এ ক্যালেন্ডারের কারণে মাসের নামের অর্থের সঙ্গে মেল নেই এবং ভৌগোলিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে রোজার দৈর্ঘ্য ব্যাপকভাবে ভিন্ন হয়। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ একে অপরের চেয়ে অনেক বেশি বা কম সময় রোজা রাখতে বাধ্য হন।

হজ (পুণ্যযাত্রা)

নাসী থাকলে হজ নির্দিষ্ট ঋতুতে স্থির থাকত। বর্তমানে তীব্র গরমে হাজির শারীরিক ঝুঁকি বাড়ে। যেমন ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে মক্কায় ৫১.৮°C তাপমাত্রায় ১,৩০১ জন হাজির মৃত্যু এটিই প্রমাণ করে যে সূর্যের প্রভাবে মানবদেহের সুরক্ষার গুরুত্ব কতটা।

যাকাত (জাকাত)

চান্দ্রবর্ষ সৌরবর্ষের চেয়ে ছোট হওয়ায় প্রতি ৩৩ বছরে একবার অতিরিক্ত যাকাত দিতে হয়। এর ফলে ধর্মীয় নীতি ও জনসাধারণের সম্পদের প্রকৃত গাণিতিক হিসাবের মধ্যে একটি বড় ধরণের অসামঞ্জস্য ও গরমিল দেখা দেয়।

কৃষি ক্যালেন্ডার

ফসল চাষ এবং মৌসুম নির্ধারণের ক্ষেত্রে চান্দ্র-ক্যালেন্ডার সম্পূর্ণ অসঙ্গত। ঋতু পরিবর্তনের সাথে মাসের মিল না থাকায় বর্তমান এই পঞ্চিকা ব্যবহার করে কৃষি কাজ বা আবহাওয়ার কোনো সঠিক পূর্বাভাস তৈরি করা অসম্ভব।

ঐতিহাসিক তারিখ নির্ধারণ

হিজরীর ১০ সালের আগের ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর সঠিক সৌর তারিখ নির্ধারণ করা অত্যন্ত জটিল। মাস ও দিনের অবিচ্ছিন্ন সরে যাওয়ার কারণে গ্রিক-রোম বা পারস্যের সমসাময়িক ঐতিহাসিক তারিখের সঙ্গে মিল রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।


উপসংহার

নাসী বন্ধের আদেশটি মূলত একটি কৌশলগত উদ্যোগ ছিল, যার ফলে গোত্রীয় আদিপ্রথা দুর্বল করে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। তবে এর ফলাফল হলো একটি ঋতুবিচ্ছিন্ন ক্যালেন্ডার ব্যবস্থা, যা মানবজীবনের মৌলিক ছন্দের পরিপন্থী। পৃথিবীর অধিকাংশ প্রাচীন সভ্যতা যেমন সূর্যের ছন্দময় সৌর-চন্দ্র যুগপত ক্যালেন্ডার ব্যবহৃত করেছে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে উন্নত প্রমাণিত। বিশুদ্ধ চান্দ্রবর্ষ কেবল সহজ-নজরদারি হয়, কিন্তু বাস্তবসম্মত নয়। এই বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় যে নাসী নিষেধের ফলে গড়ে উঠা বর্তমান পঞ্জিকা বৈজ্ঞানিক যুক্তি কিংবা নিরপেক্ষ প্রমাণের উপর ভিত্তি করে নয়, বরং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের রাজনৈতিক প্রয়োজনে গড়ে উঠেছিল। গ্লোবালাইজড বিশ্বে এর অসঙ্গতি আরও প্রকট: আসলে মানবজীবন কি চাঁদের ছন্দে চলেছে, নাকি সূর্যের ছন্দে? যুক্তি বলে পরেরটিই।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সূরা তওবা, আয়াত ৩৭ ↩︎
  2. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৩১৯৭ ↩︎
  3. তাফসীরে মাযহারী, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩১ ↩︎
  4. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২য় খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৩৯১, ৩৯২ ↩︎
  5. Lane’s Lexicon, ‘Ramad’ entry ↩︎
  6. Abu Rayhan al-Biruni, ‘The Chronology of Ancient Nations’ ↩︎
  7. M.H. Panhwar, ‘Chronology of Islamic Calendar’, 1999 ↩︎
  8. Al-Masudi, ‘Muruj adh-Dhahab’ ↩︎
  9. Edward Gibbon, ‘The Decline and Fall of the Roman Empire’, Chapter 50 ↩︎
  10. কোরআন, ২:১৮৭ ↩︎
  11. Dr. Muhammad Hamidullah, ‘The Emergence of Islam’ ↩︎
  12. Physiological effects of fasting during the Midnight Sun, 2014 ↩︎
  13. Journal of Renal Nutrition, ‘Effects of Ramadan Fasting on Health’ ↩︎
  14. Edward Gibbon, ‘The History of the Decline and Fall of the Roman Empire’ ↩︎