
Table of Contents
ভূমিকা
উল্কাপাত বা “শুটিং স্টার” রাতের আকাশে একটি সাধারণ দৃশ্য, যা মানুষকে বিস্মিত করে। প্রাচীনকাল থেকে এই ঘটনাকে নানা পৌরাণিক বা ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যেমন ইসলামী গ্রন্থে এটিকে শয়তান তাড়ানোর অস্ত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তবে আধুনিক বিজ্ঞান এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মাবলী অনুসারে ব্যাখ্যা করে, যা কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির সাথে যুক্ত নয়। এই প্রবন্ধে আমরা উল্কাপাতের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করবো, ইসলামী সোর্স থেকে প্রাপ্ত ধারণা ও বিশ্বাসসমূহ উল্লেখ করবো, এবং যুক্তি-প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা বিশ্লেষণ করব। এই প্রবন্ধের মূল প্রস্তাবনাটি হচ্ছে, ইসলামী ধারণাটি প্রাচীনকালের অজ্ঞতা-জনিত কুসংস্কারের প্রতিফলন, যা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দিয়ে খণ্ডিত হয়।
প্রাচীন সভ্যতায় উল্কাপাতের ধারণা: কুসংস্কারের উদ্ভব
প্রাচীনকাল থেকে মানুষ আকাশে উল্কাপাত (মিটিওর বা শুটিং স্টার) দেখে আসছে, কিন্তু তাদের সীমিত জ্ঞান এবং পর্যবেক্ষণের অভাবে এই ঘটনাকে নানা কল্পিত কাহিনী এবং কুসংস্কারের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিভিন্ন সভ্যতায় এই ধারণাগুলোর বৈচিত্র্য লক্ষণীয়, যা মূলত অজ্ঞতা এবং প্রকৃতির প্রতি ভয়-মিশ্রিত বিস্ময় থেকে উদ্ভূত। উদাহরণস্বরূপ, প্রাচীন গ্রিক এবং রোমান সভ্যতায় উল্কাপাতকে দেবতাদের সংকেত বা ওমেন মনে করা হত, যা ভালো বা খারাপ ঘটনার পূর্বাভাস দিত। গ্রিকরা বিশ্বাস করত যে উল্কাপাত হলো দেবতাদের যুদ্ধের ফল, যেখানে তারকা বা মহাকাশীয় বস্তুকে দেবতাদের অস্ত্র বলে কল্পনা করা হত। রোমান ইতিহাসবিদ ক্যাসিয়াস ডিও ৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে “কমেট স্টার্স” উল্লেখ করেছেন, যা ক্লিওপ্যাট্রার মৃত্যুর সাথে যুক্ত করে ওমেন হিসেবে দেখা হয়েছে। পার্সিড উল্কাবৃষ্টিকে গ্রিক মিথে পার্সিয়াস এবং অ্যান্ড্রোমেডার গল্পের সাথে যুক্ত করা হত, যা প্রতি বছর আগস্টে দেখা যায়।
প্রাচীন ইজিপশিয়ানরা উল্কাপাতকে আরও গভীরভাবে সেলেস্টিয়াল ঘটনা হিসেবে দেখত, বিশেষ করে আয়রন-সমৃদ্ধ মিটিওরাইটকে। পিরামিড টেক্সটে (প্রায় ৪,৪০০ বছর পুরনো) লেখা আছে: “কিং ইউনিস স্কাইকে সিজ করে এবং তার আয়রন স্প্লিট করে”, যা ইঙ্গিত করে যে তারা আয়রন মিটিওরাইটের মহাকাশীয় উৎস বুঝত। বেনবেন স্টোন, যা হেলিওপলিসের সান টেম্পলে পূজিত হত, সম্ভবত একটি মিটিওরাইট যা সৃষ্টির গল্পে যুক্ত—আতুম দেবতা আকাশ থেকে পড়ে বা ওঠে। মেসোপটেমিয়ান এপিক অফ গিলগামেশে গিলগামেশ একটি মিটিওরের স্বপ্ন দেখে, যা তার যাত্রার প্রফেটিক অর্থ বহন করে।
অন্যান্য সভ্যতায়ও অনুরূপ কুসংস্কার দেখা যায়। উত্তর আমেরিকার প্লেইন্স এবং উডল্যান্ড ইন্ডিয়ানরা উল্কাপাতকে গুড লাকের চিহ্ন বা ডিসেন্ডিং সোলস মনে করত, যা কোনো আত্মার পৃথিবীতে জন্ম বা মৃত্যুর সাথে যুক্ত। গ্রিকো-রোমান ফিলোসফাররা যেমন অ্যারিস্টটল, প্লুটার্ক এবং প্লিনি দ্য এল্ডার প্রথম রেকর্ড করেন আকাশ থেকে পাথর পড়া, কিন্তু এগুলোকে স্যাক্রেড বা সুপারন্যাচারাল পাওয়ার যুক্ত বলে পূজা করা হত। বেটাইলস (স্যাক্রেড স্টোনস) হিসেবে মিটিওরাইটকে মধ্যপ্রাচ্য এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পূজা করা হত, যেমন কাবার ব্ল্যাক স্টোন, যা আদম-ইভের সময় আকাশ থেকে পড়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। খ্রিস্টান ট্র্যাডিশনে পার্সিড উল্কাবৃষ্টিকে সেন্ট লরেন্সের (২৫৮ খ্রিস্টাব্দে মার্টার্ড) অশ্রুর সাথে যুক্ত করা হয়, যা আগস্টে ঘটে।
এইসব পৌরাণিক গল্প এবং বিশ্বাসের উদ্ভব মূলত প্রাচীন মানুষের জ্ঞানের স্বল্পতা থেকে, যারা বায়ুমণ্ডল, মহাকাশীয় বস্তু এবং তাদের আচরণ সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত ধারণা ছাড়াই এগুলোকে অতিপ্রাকৃত শক্তির সাথে যুক্ত করত। কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়াই এই ধারণাগুলো ছড়িয়ে পড়ে, যা আজকের দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ ভ্রান্তি এবং কুসংস্কারের প্রতিফলন। আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে আমরা উল্কাপাতের প্রকৃত কারণ বুঝতে পারি: এটি মহাকাশীয় ধ্বংসাবশেষ যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে ঘর্ষণে জ্বলে ওঠে, যা সম্পূর্ণরূপে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মাবলী অনুসরণ করে। গবেষণা এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এই প্রাকৃতিক ঘটনার কারণগুলো স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, যা কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে মেলে না—যেমন ইসলামী ধারণায় উল্কাপাতকে শয়তান তাড়ানোর অস্ত্র বলা হয়, যার কোনো প্রমাণিত ভিত্তি নেই।
আধুনিক যুগে এইসব প্রাচীন বিশ্বাস পরিত্যাগ করে বাস্তব এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবী এবং মহাকাশের ঘটনাবলী সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা অপরিহার্য। এটি শুধু বিজ্ঞানের জন্য নয়, মানুষের মানসিকতা এবং জ্ঞানভিত্তিক উন্নতির জন্যও জরুরি। যুক্তি, প্রমাণ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উপর নির্ভর করে আমরা কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে পারি, যাতে অজ্ঞতা-জনিত ভয় বা অন্ধবিশ্বাসের কোনো স্থান না থাকে।
উল্কাপাতের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
উল্কাপাত, যা মিটিওর বা শুটিং স্টার নামে পরিচিত, হলো মহাকাশে ভাসমান ছোট পাথর, ধাতু বা ধূলিকণার অংশ যা গ্রহাণু বা ধূমকেতু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। এই বস্তু, যাকে মিটিওরয়েড বলা হয়, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে উচ্চ গতিতে (সাধারণত ১১ থেকে ৭২ কিলোমিটার/সেকেন্ড) বায়ুর সাথে ঘর্ষণের ফলে উত্তপ্ত হয়ে জ্বলে ওঠে, যা উজ্জ্বল আলোকরেখা সৃষ্টি করে। এই প্রক্রিয়া, যাকে অ্যাবলেশন বলা হয়, বস্তুটিকে প্রায়শই সম্পূর্ণরূপে বাষ্পীভূত করে দেয়, এবং এটি পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছায় না।[1] [2]
বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরে নাইট্রোজেন, অক্সিজেন এবং অন্যান্য গ্যাসের সাথে এই সংঘর্ষে তাপমাত্রা ২,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়, যা আলো সৃষ্টি করে। এটি কোনো ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যে ঘটে না, বরং এটি মহাকাশের পদার্থবিজ্ঞানের একটি সাধারণ ঘটনা। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে প্রতিদিন প্রায় ৪৮.৫ টন মিটিওরিক উপাদান পৃথিবীতে পড়ে, এবং এটি বায়ুমণ্ডলকে রক্ষা করে বড় গ্রহাণুর আঘাত থেকে। [3] [4]
ইসলামে উল্কাপাতের বর্ণনা
আসুন দেখি, ইসলাম এই বিষয়ে কী বলে। এইসব উল্কাপাতের ঘটনাকে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করা হয়, এটি আসলে হচ্ছে শয়তান তাড়াবার উদ্দেশ্যে আল্লাহর ক্ষেপনাস্ত্র। উল্কা যদিও বায়ুমণ্ডলের বাইরে থেকেই আসে, তবে উল্কাপাত বলে আমরা যা আসলে দেখি, অর্থাৎ একটি উজ্জ্বল আলোর বিন্দু নেমে আসছে, তা নিতান্তই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সাথে সম্পর্কিত ঘটনা [5], বায়ুমণ্ডলের বাইরের কোন ঘটনা নয়।
আমি নিকটবর্তী আসমানকে তারকারাজির সৌন্দর্য দ্বারা সুশোভিত করেছি,
— Taisirul Quran
আমি নিকটবর্তী আকাশকে নক্ষত্ররাজির সুষমা দ্বারা সুশোভিত করেছি।
— Sheikh Mujibur Rahman
নিশ্চয় আমি কাছের আসমানকে তারকারাজির সৌন্দর্যে সুশোভিত করেছি।
— Rawai Al-bayan
নিশ্চয় আমরা কাছের আসমানকে নক্ষত্ররাজির সুষমা দ্বারা সুশোভিত করেছি [১]
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আর (এটা করেছি) প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়ত্বান থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে।
— Taisirul Quran
এবং রক্ষা করেছি প্রত্যেক বিদ্রোহী শাইতান হতে।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তান থেকে হিফাযত করেছি।
— Rawai Al-bayan
এবং রক্ষা করেছি প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তান থেকে [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
যার ফলে তারা উচ্চতর জগতের কিছু শুনতে পারে না, চতুর্দিক থেকে তাদের প্রতি নিক্ষেপ করা হয় (উল্কাপিন্ড)
— Taisirul Quran
ফলে তারা উর্ধ্ব জগতের কিছু শ্রবণ করতে পারেনা এবং তাদের প্রতি উল্কা নিক্ষিপ্ত হয় সকল দিক হতে –
— Sheikh Mujibur Rahman
তারা ঊর্ধ্বজগতের কিছু শুনতে পারে না, কারণ প্রত্যেক দিক থেকে তাদের দিকে নিক্ষেপ করা হয় (উল্কাপিন্ড)।
— Rawai Al-bayan
ফলে তারা ঊর্ধ্ব জগতের কিছু শুনতে পারে না [১]। আর তাদের প্রতি নিক্ষিপ্ত হয় সব দিক থেকে—
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
(তাদেরকে) তাড়ানোর জন্য। তাদের জন্য আছে বিরামহীন শাস্তি।
— Taisirul Quran
বিতাড়নের জন্য এবং তাদের জন্য রয়েছে অবিরাম শাস্তি।
— Sheikh Mujibur Rahman
তাড়ানোর জন্য, আর তাদের জন্য আছে অব্যাহত আযাব।
— Rawai Al-bayan
বিতাড়নের জন্য [১] এবং তাদের জন্য আছে অবিরাম শাস্তি।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আর বলা আছে, [6]
আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দিয়ে সুসজ্জিত করেছি আর শয়ত্বানকে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য, এবং প্রস্তুত করে রেখেছি জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি।
— Taisirul Quran
আমি নিকটবর্তী আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দ্বারা এবং ওগুলিকে করেছি শাইতানের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি।
— Sheikh Mujibur Rahman
আমি নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপপুঞ্জ দ্বারা সুশোভিত করেছি এবং সেগুলোকে শয়তানদের প্রতি নিক্ষেপের বস্তু বানিয়েছি। আর তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছি জ্বলন্ত আগুনের আযাব।
— Rawai Al-bayan
আর অবশ্যই আমরা নিকটবর্তী আসমানকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দ্বারা [১] এবং সেগুলোকে করেছি শয়তানের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তাফসীরে জালালাইনঃ আয়াতের ব্যাখ্যা
আসুন তাফসীরে জালালাইন থেকে এই আয়াতের তাফসীর পড়ে নিই, [7]
وَحِفْظًا مِّنْ كُلِّ شَيْطَنٍ مَّارِدٍ -এর তাফসীর : উল্লিখিত আয়াতসমূহে শোভা ও সাজসজ্জা ছাড়া তারকারাজির আরও একটি উপকারিতা বর্ণনা করা হয়েছে যে, এগুলোর সাহায্যে দুষ্ট প্রকৃতির শয়তানদেরকে ঊর্ধ্ব জগতের কথাবার্তা শোনা থেকে বিরত রাখা হয় । শয়তান গায়বি সংবাদ শোনার জন্য আকাশের কাছাকাছি গিয়ে উপস্থিত হয়। কিন্তু তাদেরকে ফেরেশতাদের কথাবার্তা শোনার সুযোগ দেওয়া হয় না। কোনো শয়তান যৎসামান্য শুনে পালালে তাকে শিখায়িত উল্কাপিণ্ডের আঘাতে ধ্বংস করে দেওয়া হয়, যাতে সে পৃথিবীতে পৌঁছে ভক্ত অতীন্দ্রিয়বাদী ও জ্যোতিষীদেরকে কিছু বলতে না পারে। এ জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ডকে এ বলা হয়েছে ।

হাদিসের বিবরণঃ জ্বীন শয়তান তাড়াবার ক্ষেপণাস্ত্র
এবারে আসুন দেখি এই বিষয়ে হাদিসে কী বলা আছে [8] –
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪০/ সালাম
পরিচ্ছেদঃ ৩৪. জ্যোতিষী কর্ম ও জ্যোতিষীর কাছে গমনাগমন হারাম
৫৬২৫। হাসান ইবনু আলী হুলওয়ানী (রহঃ) ও আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীগণের মাঝে আনসারদের এক ব্যক্তি আমাকে (হাদীস) অবহিত করেছেন যে, তাঁরা এক রাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলেন। এমন সময় একটি তারকা নিক্ষিপ্ত হল, এবং তা জ্বলে উঠল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, এ ধরণের (তারকা) নিক্ষিপ্ত হলে জাহেলী যুগে তোমরা কি বলতে? তারা বলল, আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলই সমধিক অবগত। আমরা বলতাম, আজ রাতে কোন মহান ব্যক্তির জন্ম হল (এবং কোন মহান ব্যক্তি মারা গেলেন)।
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তবে জেনে রাখ যে, তা কারো মৃত্যু কিংবা কারো জন্মের কারণে নিক্ষিপ্ত হয় না; বরকতময় ও মহান নামের অধিকারী আমাদের রব যখন কোন বিষয়ের ফায়সালা দেন, তখন আরশ বহনকারী ফিরিশতারা তাসবীহ পাঠ করে। তারপর তাসবীহ পাঠ করে সে অহসমানের ফিরিশতারা, যারা তাদের নিকটবর্তী; অবশেষে তাসবীহ পাঠ এ নিকটবর্তী (দুনিয়ার) আসমানের বাসিন্দাদের পর্যন্ত পৌছে। তারপর আরশ বহনকারী (ফিরিশতা)-দের নিকটবর্তী যারা তারা আরশ বহনকারীদের বলে, তোমাদের প্রতিপালক কি ইরশাদ করলেন? তখন তিনি তাদের যা বলেছেন, তারা সে খবর সরবরাহ করে।
(রাবী বলেন) বললেন, পরে আসমানসমূহের বাসিন্দারা একে অপরকে খবর আদান প্রদান করে। অবশেষে এই নিকটবর্তী আসমানে খবর পৌছে। তখন জ্বীনেরা অতর্কিতে (গোপন সংবাদটি) শুনে নেয় এবং তাদের দোসর জ্যোতিষীদের কাছে পৌছিয়ে দেয়, আর তার সঙ্গে বাড়িয়ে দেয়। ফলে যা তারা যথাযথভাবে নিয়ে আসতে পারে, তাই ঠিক হয়; কিন্তু তারা তাতে সংমিশ্রিত ও সংযোজিত করে (যা সঠিক হয় না)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
এর ইংরেজি অনুবাদটি দেখুন, তাহলে বুঝবেন এর বাঙলা অনুবাদে কীরকম চালাকির আশ্রয় নেয়া হয়েছে,
‘Abdullah. Ibn ‘Abbas reported:
A person from the Ansar who was amongst the Companions of Allah’s Messenger (ﷺ) reported to me: As we were sitting during the night with Allah’s Messenger (ﷺ), a meteor shot gave a dazzling light. Allah’s Messenger (ﷺ) said: What did you say in the pre-Islamic days when there was such a shot (of meteor)? They said: Allah and His Messenger know best (the actual position), but we, however, used to say that that very night a great man had been born and a great man had died, whereupon Allah’s Messenger (ﷺ) said: (These meteors) are shot neither at the death of anyone nor on the birth of anyone. Allah, the Exalted and Glorious, issues Command when He decides to do a thing. Then (the Angels) supporting the Throne sing His glory, then sing the dwellers of heaven who are near to them until this glory of God reaches them who are in the heaven of this world. Then those who are near the supporters of the Throne ask these supporters of the Throne: What your Lord has said? And they accordingly inform them what He says. Then the dwellers of heaven seek information from them until this information reaches the heaven of the world. In this process of transmission (the jinn snatches) what he manages to overhear and he carries it to his friends. And when the Angels see the jinn they attack them with meteors. If they narrate only which they manage to snatch that is correct but they alloy it with lies and make additions to it.
আরো একটি হাদিস পড়ি [9] –
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৪০। সালাম
পরিচ্ছেদঃ ৩৫. জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষীর কাছে গমনাগমন নিষিদ্ধ
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৫৭১২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২২২৯
৫৭১২-(১২৪/২২২৯) হাসান ইবনু ’আলী আল হুলওয়ানী (রহঃ) ও আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) …… আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীগণের মধ্যে আনসারদের জনৈক ব্যক্তি আমাকে সংবাদ দিয়েছে যে, তারা এক রাত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে বসা ছিলেন। সে সময় একটি নক্ষত্র পতিত হলো, যার দরুন আলোকিত হয়ে উঠল। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, এ ধরর (তারকা) পতিত হলে অজ্ঞতার যুগে তোমরা কি বলতে? তারা বলল, আল্লাহ এবং তার রসূলই অধিক ভাল জানেন। আমরা বলতাম, আজ রাতে মনে হয় কোন মহান লোকের ভূমিষ্ঠ হয়েছে অথবা কোন মহান লোক মৃত্যুবরণ করেছেন।
তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ জেনে রাখো যে, তা কারো মৃত্যু কিংবা কারো জন্মের কারণে পতিত হয় না; কল্যাণময় ও মহান নামের অধিকারীআমাদের প্রতিপালক যখন কোন বিষয়ের সমাধান দেন, তখন আরশ বহনকারী ফেরেশতারা তাসবীহ পাঠ করে। অতঃপর তাসবীহ পাঠ করে সে আকাশের ফেরেশতারা, যারা তাদের পার্শ্ববর্তী পরিশষে তাসবীহ পাঠ এ নিকটবর্তী (পৃথিবীর) আসমানের অধিবাসীদের পর্যন্ত পৌছে।
অতঃপর আরশ বহনকারীদের (ফেরেশতা) পার্শ্ববর্তী যারা তারা আরশ বহনকারীদের বলে তোমাদের প্রতিপালক কি বললেন? সে সময় তিনি তাদের যা কিছু বলেছেন, তারা সে সংবাদ বর্ণনা করে। বর্ণনাকারী বলেন, পরে আসমানসমূহের অধিবাসীরা একে অপরকে সংবাদ আদান-প্রদান করে। পরিশেষে এ নিকটবর্তী আকাশে সংবাদ পৌছে। সে সময় জিনেরা অতর্কিতে গোপন খবরটি শুনে নেয় এবং তাদের দোসর জ্যোতিষীদের নিকট পৌছিয়ে দেয়, আর সাথে অতিরিক্ত কিছু জুড়ে দেয়। ফলে যা তারা ঠিকঠাকভাবে নিয়ে আসতে পারে, তাই ঠিক হয়; তবে তারা তাতে (কথামালা) সুবিন্যস্ত ও সংযোজন করে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫৬২৫, ইসলামিক সেন্টার ৫৬৫৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
এই হাদিসটির ইংরেজি অনুবাদও দেখে নিই, তাতে বোঝা যাবে লজ্জিত অনুবাদকগণ কীভাবে হাদিস অনুবাদে চালাকির আশ্রয় নিয়েছেন। লক্ষ্য করুন, লাল ও হলুদ করে দেয়া লাইনটির কোন অনুবাদই বাঙলা অনুবাদগুলোতে নেই।
‘Abdullah. Ibn ‘Abbas reported: A person from the Ansar who was amongst the Companions of Allah’s Messenger (ﷺ) reported to me: As we were sitting during the night with Allah’s Messenger (ﷺ), a meteor shot gave a dazzling light. Allah’s Messenger (ﷺ) said: What did you say in the pre-Islamic days when there was such a shot (of meteor)? They said: Allah and His Messenger know best (the actual position), but we, however, used to say that that very night a great man had been born and a great man had died, whereupon Allah’s Messenger (ﷺ) said: (These meteors) are shot neither at the death of anyone nor on the birth of anyone. Allah, the Exalted and Glorious, issues Command when He decides to do a thing. Then (the Angels) supporting the Throne sing His glory, then sing the dwellers of heaven who are near to them until this glory of God reaches them who are in the heaven of this world. Then those who are near the supporters of the Throne ask these supporters of the Throne: What your Lord has said? And they accordingly inform them what He says. Then the dwellers of heaven seek information from them until this information reaches the heaven of the world. In this process of transmission (the jinn snatches) what he manages to overhear and he carries it to his friends. And when the Angels see the jinn they attack them with meteors. If they narrate only which they manage to snatch that is correct but they alloy it with lies and make additions to it.
এবারে আসুন আরেকটি হাদিস পড়ি, যেখানে খুব সরাসরিই পুরো বিষয়টি বলা আছে [10] –
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৩: চিকিৎসা ও ঝাড়-ফুঁক
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ – জ্যোতিষীর গণনা
৪৬০০-[৯] আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃআল্লাহ তা’আলা আকাশমণ্ডলীতে যখন কোন ফায়সালা করেন, তখন সে নির্দেশে মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় তাদের পাখাসমূহ নাড়াতে থাকেন। আল্লাহ তা’আলার সে নির্দেশটির আওয়াজ সে শিকলের শব্দের মতো যা কোন একটি সমতল পাথরের উপরে টেনে নেয়া হলে শোনা যায়। অতঃপর যখন মালায়িকাহ্ অন্তর হতে সে ভীতি দূর হয়ে যায়, তখন সাধারণ মালাক (ফেরেশতা) আল্লাহর নিকটতম মালাক-কে জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের রব্ কি নির্দেশ দিয়েছেন? তাঁরা বলেন, আমাদের প্রভু যা বলেছেন, তা সম্পূর্ণ সঠিকই বলেছেন। (এবং সে নির্দেশটি কি তা জানিয়ে দেন,) এরপর বলেন, আল্লাহ তা’আলা হলেন সুমহান ও মর্যাদাসম্পন্ন।
আল্লাহর নবী আরো বলেছেনঃআল্লাহর ফায়সালাকৃত বিধান সম্পর্কে ফেরেশতাদের মধ্যে যেসব আলোচনা হয়, জীন-শায়ত্বনেরা চোরা পথে একজন আরেকজনের উপরে দাঁড়িয়ে শোনার চেষ্টা করে। বর্ণনাকারী সুফ্ইয়ান নিজের হাতের অঙ্গুলিগুলো ফাঁক করে শয়তানরা কিভাবে একজন আরেকজন হতে কিছুটা ফাঁক করে কিভাবে একজন আরেকজন হতে কাছাকাছি দাঁড়ায় তা অনুশীলন করে দেখিয়েছেন।অতঃপর যে শয়তান প্রথমে নিকট হতে শুনতে পায় সে তা তার নিচের শয়তানকে বলে দেয় এবং সে তার নিচের জনকে, এভাবে কথাটি জাদুকর ও গণকের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়।
অনেক সময় এমন হয় যে, ঐ কথাটি পৌঁছার পূর্বেই আগুনের ফুলকি তাদের ওপর নিক্ষেপ করা হয় (ফলে আর তা গণকদের পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না)। আবার কখনো তারকা নিক্ষেপ হওয়ার পূর্বেই তা তাদের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়। অতঃপর তারা ঊর্ধ্বজগতে শুনা সে (সত্য) কথাটির সাথে (নিজেদের মনগড়া) শত শত মিথ্যার মিশ্রণ ঘটিয়ে মানুষের কাছে বলে। আর যখন তাকে বলা হয় যে, অমুক দিন তুমি আমাদেরকে এই এই কথা বলেছিলে, (তা তো মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।) তখন ঐ একটি কথা দ্বারা তার সত্যতা প্রমাণ করা হয়, যা ঊর্ধ্বজগৎ হতে শ্রুত হয়েছিল। (বুখারী)[1]
[1] সহীহ : বুখারী ৪৭০১, ইবনু মাজাহ ১৯৪, আল জামি‘উস্ সগীর ৭৩৬, সহীহুল জামি‘ ৭৩৪, সহীহ ইবনু হিব্বান ৩৬, তিরমিযী ৩২২৩।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
বিজ্ঞান এবং ইসলামের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ইসলামী গ্রন্থে উল্কাপাতকে শয়তান বা জিনদের বিরুদ্ধে আল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞতা-জনিত কুসংস্কার এবং বৈজ্ঞানিকভাবে ভিত্তিহীন নির্বুদ্ধিতা। এই ধারণা কোনো প্রমাণিত সত্য নয়, বরং প্রাচীনকালের মানুষের অন্ধবিশ্বাসের প্রতিফলন, যা কোরআন, হাদিস ও তাফসীর গ্রন্থগুলোতে পরিষ্কারভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে উল্কাপাত বা মিটিওর হলো মহাকাশে ভাসমান ছোট ধাতু বা পাথরের অংশ, যা গ্রহাণু বা ধূমকেতু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। এই প্রবেশের সময় বায়ুর সাথে উচ্চ গতির ঘর্ষণে (১১-৭২ কিমি/সেকেন্ড) এটি উত্তপ্ত হয়ে জ্বলে ওঠে, উজ্জ্বল আলোকরেখা সৃষ্টি করে—যা আমরা “শুটিং স্টার” হিসেবে দেখি। এটি কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি বা ধর্মীয় অস্ত্র নয়, বরং পদার্থবিজ্ঞানের একটি সাধারণ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা বায়ুমণ্ডলের গ্যাস (নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, আর্গন) সাথে সংঘর্ষে ঘটে। ইসলামী দাবি যে এটি শয়তান তাড়ানোর জন্য আল্লাহর নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র, তা শুধুমাত্র প্রাচীন অজ্ঞতার প্রমাণ—কোনো যুক্তি বা প্রমাণ ছাড়াই এমন অন্ধবিশ্বাসকে “নাজিল হওয়া ওহী” বলে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
উল্কা বা মিটিওরয়েড হলো মহাকাশের ছোট পাথর, ধূলিকণা বা ধাতুর অংশ, যা বড় বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। এগুলো সাধারণত ১০ মিটারের ছোট, এবং প্রতিদিন হাজার হাজার এমন ঘটনা ঘটে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যায়, এদের গতি অত্যন্ত দ্রুত হওয়ায় বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণে এগুলো জ্বলে উঠে এবং প্রায়শই সম্পূর্ণ বাষ্পীভূত হয়ে যায়—কোনো অতিপ্রাকৃত হস্তক্ষেপ ছাড়াই। এই প্রক্রিয়া পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক নিয়মাবলী অনুসরণ করে, যা আধুনিক মহাকাশ গবেষকরা (যেমন NASA) স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন। বাস্তবে, এই বায়ুমণ্ডলীয় ধ্বংস প্রক্রিয়া পৃথিবীকে রক্ষা করে বড় গ্রহাণুর আঘাত থেকে—যেমন জুপিটারের মতো গ্রহও সাহায্য করে। কিন্তু ইসলামী ধারণায় এটিকে শয়তান তাড়ানোর অস্ত্র বলা হয়, যা কোরআনের সূরা ৩৭:৬-১০ এবং ৬৭:৫-এ বর্ণিত—যেখানে “তারকা” (stars) কে মিসাইল বলা হয়েছে। এটি একটি স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ভুল। তারকা হলো বিশাল গ্যাসীয় গোলক (যেমন সূর্য), যা হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরে এবং নিউক্লিয়ার ফিউশন দিয়ে জ্বলে—কোনো “অগ্নিশিখা” বা মিসাইল নয়। মিটিওর তারকা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা—এগুলো ছোট পাথর বা ধাতু, যা কোনো আলোক উৎস নয়। ইসলামী অ্যাপলোজেটিক্স দাবি করে যে “তারকা” মানে মিটিওর বা মেটাফর, কিন্তু প্রাচীন তাফসির (যেমন ইবন কাথির) স্পষ্টভাবে বলে যে এগুলো আসল তারকা, যা শয়তানের বিরুদ্ধে নিক্ষিপ্ত। এই ধারণা প্রাচীনকালের ভুল ধারণা থেকে উদ্ভূত, যেখানে মানুষ তারকা এবং মিটিওরকে একই মনে করত—কোরআন এই অজ্ঞতাকে “আল্লাহর জ্ঞান” হিসেবে স্থায়ী করে দিয়েছে। যা আসলে ইসলামের সত্যটাকে মারাত্মকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। কারণ সর্বজ্ঞানী আল্লাহর তো এসব তথ্য জানার কথা।
হাদিসেও এই ভুল প্রতিফলিত পাওয়া যায়। সহীহ মুসলিমে নবী একটি উল্কা দেখে বলেন যে এটি জিনদের বিরুদ্ধে ফেরেশতাদের অস্ত্র। এটি কোনো যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যা নয়, বরং ৭ম শতাব্দীর অজ্ঞানতার প্রমাণ—যেখানে জিন বা শয়তানের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ নেই, এবং উল্কাপাত র্যান্ডম প্রাকৃতিক ঘটনা। কোরআনের এই দাবিতে অন্তত সাতটি বৈজ্ঞানিক ভুল রয়েছে: তারকা মিসাইল নয়, মিটিওর তারকা নয়, এগুলো শয়তানের বিরুদ্ধে নয় ইত্যাদি। ইসলামী ধারণা যে এটি জিনদের শোনা বাধা দেয়, তা কোনো প্রমাণ ছাড়া অন্ধবিশ্বাস—যা আধুনিক যুগে পরিত্যাগ করা উচিত, কারণ এটি মানুষের জ্ঞান প্রসারকে বাধা দেয়। বায়ুমণ্ডলের গ্যাস সংঘর্ষে উল্কার জ্বলা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক, কোনো আধ্যাত্মিক কারণ নয়—ইসলামী দাবি এটিকে ধর্মীয় করে তোলে, যা অজ্ঞতা-জনিত প্রতারণা। এমন অন্ধবিশ্বাসকে “সত্য” বলে মেনে নেওয়া মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির অপমান, এবং এটি খণ্ডন করে যুক্তি-ভিত্তিক চিন্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কোরআন (৩৭:৬-১০) ও হাদিসে বিশাল গ্যাসীয় নক্ষত্র (Stars) এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুড়তে থাকা ছোট উল্কাকে (Meteors) একই বস্তু হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বিজ্ঞান জানে নক্ষত্র বিলিয়ন মাইল দূরে, আর উল্কা আমাদের বায়ুমণ্ডলের একটি সাধারণ ঘটনা।
ইসলামী দাবি অনুযায়ী উল্কা হলো শয়তান তাড়ানোর ‘ক্ষেপণাস্ত্র’। অথচ বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে এটি বায়ুমণ্ডলে মহাজাগতিক ধূলিকণার ঘর্ষণের ফলে সৃষ্ট তাপগতিবিদ্যার ফল (Ablation), যার সাথে কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তার সম্পর্ক নেই।
কোরআনে উল্কাপাতকে ‘নিকটবর্তী আসমানের’ অলঙ্কার বলা হয়েছে। বাস্তবে উল্কা পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৮০-১০০ কিমি উচ্চতায় বায়ুমণ্ডলে পুড়ে শেষ হয়, যা মহাকাশ বা আসমানের তুলনায় নগণ্য দূরত্ব।
হাদিস মতে জিনরা সংবাদ চুরি করতে গেলে উল্কা নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু বিজ্ঞান অনুযায়ী উল্কাবৃষ্টি (Meteor Shower) নির্দিষ্ট সময়ে ক্যালেন্ডার মেনে ঘটে। শয়তানরা কি প্রতি বছর একই তারিখে রুটিন মেনে খবর চুরি করতে আসে?
উপসংহার
উল্কাপাত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, যা বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়, এবং ইসলামী ধারণাটি অজ্ঞতা-জনিত কুসংস্কার। ফ্যাক্ট-ভিত্তিক বিশ্লেষণ দেখায় যে এই ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। মানুষের জ্ঞান প্রসারের জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে গ্রহণ করা উচিত, যাতে কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গড়ে উঠে।
তথ্যসূত্রঃ
- Meteors and Meteorites ↩︎
- The Science of Shooting Stars ↩︎
- Meteors & Meteorites Facts ↩︎
- Meteor showers and shooting stars: Formation and history ↩︎
- কোরআন ৩৭ঃ ৬-১০ ↩︎
- কোরআন ৬৭ঃ৫ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯৩ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৬২৫ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৫৭১২ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৪৬০০ ↩︎
