
ভূমিকা
আইনের শাসন (rule of law) মানে—একই অপরাধে একই নীতি, একই প্রক্রিয়া, এবং একই মানদণ্ড। বিচারব্যবস্থা আবেগ বা ব্যক্তিগত ধর্মাচারের উপর দাঁড়ায় না; দাঁড়ায় প্রমাণ, তদন্ত, নির্দিষ্ট অভিযোগ, এবং ন্যায্য প্রক্রিয়া (due process)-এর উপর। এই জায়গায় ইসলামি শরীয়তের উৎস হাদিসগুলোর বয়ান এমন এক নৈতিক-আইনি সংকট তৈরি করে—যেখানে অপরাধের শাস্তি (হদ) কার্যকর হবে কি হবে না, তার মানদণ্ড যেন রাষ্ট্রীয় বিচার নয়, বরং নামাজ আদায়।
বিচারব্যবস্থা মানে “ধর্মাচার বনাম অপরাধ”–এই দ্বন্দ্বে ধর্মাচারকে আইনি ফলাফলের সুইচ বানানো কোন অবস্থাতেই নৈতিক নয়। বিচারব্যবস্থা মানে নির্দিষ্ট অভিযোগ, প্রমাণ, ন্যায্য প্রক্রিয়া, এবং ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের অধিকারকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কিন্তু যে হাদিসগুলো এখানে উদ্ধৃত হয়েছে, সেখানে এক ব্যক্তি এসে বলে “আমি হদ-যোগ্য অপরাধ করেছি, আমার ওপর তা প্রয়োগ করুন”, নবী তার অপরাধ কী—তা জিজ্ঞেস না করেই সালাতের সময় হলে তাকে সাথে নামাজ পড়তে দেন, এবং নামাজের পর আবার শাস্তি চাইলে বলেন—“তুমি কি আমাদের সাথে সালাত আদায় করনি? তোমাকে মাফ করা হয়েছে/আল্লাহ তোমার গুনাহ বা শাস্তি মাফ করেছেন।” এই বর্ণনা বুখারী (আন্তর্জাতিক ৬৮২৩) ও মুসলিম (আন্তর্জাতিক ২৭৬৪)–উভয় জায়গায় একই কাঠামোয় এসেছে। আচ্ছা তর্কের খাতিরে ধরে নিচ্ছি, ঐ ব্যক্তির অপরাধ আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন। কিন্তু নবীর তো অন্তত শোনা উচিত ছিল, অপরাধটি কী? এবং কোন মানুষ সেই অপরাধের কারণে ভুক্তভোগী কিনা?
হাদিসের বিবরণ
আসুন হাদিসগুলো পড়ে দেখি,
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৭৫/ কাফের ও ধর্মত্যাগী বিদ্রোহীদের বিবরণ
পরিচ্ছেদঃ ২৮৪৬. কেউ শাস্তির স্বীকারোক্তি করল অথচ বিস্তারিত বলেনি, তখন ইমামের জন্য তা গোপন রাখা বৈধ কি?
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৬৩৬৫, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬৮২৩
৬৩৬৫। আবদুল কুদ্দুস ইবনু মুহাম্মাদ (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ছিলাম। তখন এক ব্যাক্তি তার কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! ঘটনা আমি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে ফেলেছি। তাই আমার উপর শাস্তি প্রয়োগ করুন। কিন্তু তিনি তাকে অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন না। আনাস (রাঃ) বলেন। তখন সালাতের সময় এসে গেল। সে ব্যাক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সালাত আদায় করল। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন, তখন সে ব্যাক্তি তার কাছে গিয়ে দাঁড়াল এবং বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে ফেলেছি। তাই আমার উপর আল্লাহর বিধান প্রয়োগ করুন। তিনি বললেনঃ তুমি কি আমার সঙ্গে সালাত আদায় করনি? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ তোমার গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। অথবা বললেনঃ তোমার শাস্তি (মাফ করে দিয়েছেন)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫০। তাওবাহ্
পরিচ্ছেদঃ ৭. মহান আল্লাহর বাণীঃ “নিশ্চয়ই সৎকর্ম গুনাহসমূহকে দূর করে দেয়।” (সূরা হুদ ১১ঃ ১১৪)
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৬৮৯৯, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৭৬৪
৬৮৯৯-(৪৪/২৭৬৪) হাসান ইবনু আলী আল হুলওয়ানী (রহঃ) ….. আনাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমি হদ যোগ্য অপরাধ করে ফেলেছি। অতএব আপনি আমার উপর তা প্রয়োগ করুন। রাবী বলেন, তখন সালাতের সময় হলো এবং লোকটি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সালাত আদায় করল। সালাত আদায় হয়ে গেলে লোকটি বলল, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি ’হদ’ যোগ্য অন্যায় করে ফেলেছি। তাই আপনি আল-কুরআনের বিধানানুসারে আমার উপর হদ কার্যকর করুন। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি আমাদের সাথে সালাত আদায় করছিলে? লোকটি বলল, হ্যাঁ। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাকে মাফ করা হয়েছে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৭৫০, ইসলামিক সেন্টার ৬৮০৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-৪: সালাত
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ
৫৬৭-[৪] আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক এসে বললো, হে আল্লাহর রসূল! আমি ’হাদ্দ’যোগ্য-এর কাজ (অপরাধ) করে ফেলেছি। আমার ওপর তা প্রয়োগ করুন। বর্ণনাকারী বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অপরাধ সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। বরং সালাতের ওয়াক্ত হয়ে গেলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করলেন। লোকটিও রসূলের সাথে সালাত আদায় করলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সালাত শেষ করলে লোকটি দাঁড়িয়ে বললো, হে আল্লাহর রসূল! আমি হাদ্দ-এর কাজ করেছি। আমার ওপর আল্লাহর কিতাবের নির্দিষ্ট হাদ্দ জারী করুন। উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি কি আমাদের সাথে সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করনি। লোকটি বলল, হ্যাঁ, করেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, (এ সালাতের মাধ্যমে) আল্লাহ তোমার গুনাহ বা হাদ্দ মাফ করে দিয়েছেন। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
[1] সহীহ : বুখারী ৬৮২৩, মুসলিম ২৭৬৪।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
ধর্মকেন্দ্রিক আইনঃ ন্যায়বিচারের জন্য প্রতিবন্ধক
ইসলামি শরিয়তের এই আইনি কাঠামোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এটা বিচারকে “অপরাধ-কেন্দ্রিক” না রেখে “রিচুয়াল-কেন্দ্রিক” করে তোলে। “হদ-যোগ্য অপরাধ” কথাটাই এখানে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট: হদ-যোগ্য অপরাধগুলো সাধারণত গুরুতর, এবং প্রতিটির জন্য আলাদা শর্ত, আলাদা প্রমাণ-মানদণ্ড, আলাদা প্রক্রিয়া থাকে। অথচ হাদিসে অপরাধটি কী, কার ক্ষতি হয়েছে, কী প্রমাণ আছে—কিছুই নির্ধারিত নয়; তারপরও “মাফ”–জাতীয় সিদ্ধান্ত নামাজকে কেন্দ্র করে ঘোষিত হচ্ছে। এর মানে দাঁড়ায়, আইন ও প্রক্রিয়ার বদলে “ধর্মীয় অংশগ্রহণ”কে দায়মুক্তির দরজা বানানো হচ্ছে। বিচারব্যবস্থার দৃষ্টিতে এটা ভয়ংকর, কারণ এতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং শাস্তি এড়ানোর একটি সহজ সামাজিক কৌশল তৈরি হয়: কেউ যদি জানে—স্বীকারোক্তির ভাষা অস্পষ্ট রাখলে, আর রিচুয়াল অংশগ্রহণ করলেই “মাফ”—তাহলে শাস্তির নিরুৎসাহন (deterrence) ভেঙে পড়ে এবং অপরাধ-পরবর্তী ন্যায়বিচার অনিশ্চিত হয়ে যায়।
আরও গভীর সমস্যা হলো—এটি “আইনের শাসন” ধারণার সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে যায়। রুল অব ল-এর ন্যূনতম অর্থই হলো: একই নিয়ম সবার জন্য, নিয়মগুলো প্রয়োগ হবে একভাবে, যাতে নাগরিকরা পূর্বানুমান করতে পারে রাষ্ট্র কীভাবে আচরণ করবে। ইউরোপীয় কমিশনের ব্যাখ্যাতেও রুল অব ল-এর সাথে “uniform application” এবং “predictable environment”–এর কথা স্পষ্ট। এই হাদিস-ফ্রেমওয়ার্ক ঠিক উল্টোটা করে: অপরাধ কী তা জানা না থাকলেও ফলাফল বদলে যাচ্ছে, এবং সেই বদলের ভিত্তি হচ্ছে নামাজ—যা অপরাধের প্রকৃতি বা ক্ষতির সঙ্গে লজিক্যালি সম্পর্কিত নয়। বিচার এখানে নীতির বিচার নয়; বিচার হয়ে যাচ্ছে আনুগত্য-সিগন্যালের বিচার। এই ধরনের কাঠামো রাষ্ট্রকে ন্যায়বিচারক থেকে “আচার-পর্যবেক্ষক” বানায়—ফলে আদালত/আইন নয়, বরং ধর্মীয় দৃশ্যমান আচরণ আইনি ফলাফলের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে।
এর সাথে “আইনের সামনে সমতা” নীতির সংঘর্ষ আরও সরাসরি। UDHR-এর ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং ICCPR-এর ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ—দুটোতেই বলা আছে সবাই আইনের সামনে সমান, এবং বৈষম্য ছাড়াই সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী; ধর্মসহ নানা ভিত্তিতে সমান ও কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা ICCPR স্পষ্টভাবে বলে। এখন যদি একই অপরাধে একজন “আমাদের সাথে সালাত আদায় করেছে” বলে মাফ পায়, আর অন্যজন (ধরুন অমুসলিম, বা মুসলিম হলেও নামাজি নয়, বা নামাজ পড়লেও “কম গ্রহণযোগ্য”) মাফ না পায়—তাহলে সেটা আইন নয়, ধর্মীয় সদস্যপদ/আচরণ-ভিত্তিক বিশেষাধিকার। এতে ভিকটিমের অধিকারও বাতিল হয়ে যায়: ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, ক্ষতিপূরণ, সামাজিক নিরাপত্তা—সবকিছু গৌণ; মূল হয়ে দাঁড়ায় অপরাধী কীভাবে ধর্মীয়ভাবে “ভাল” সেজে উঠতে পারল। ন্যায়বিচার যদি ভিকটিম ও সমাজের সুরক্ষা নিশ্চিত না করে কেবল অপরাধীর রিচুয়াল-স্ট্যাটাস দেখে সিদ্ধান্ত দেয়, তাহলে সেটি ন্যায্যতা নয়—এটা ক্ষমা-ব্যবসা, এবং বাস্তবে অপরাধকে উৎসাহিত করার মতো একটি নৈতিক বিপর্যয়।
উপসংহারে
এই হাদিসগুলোকে যদি আইন-নীতি হিসেবে ধরা হয়, তাহলে “হদ” নামের শাস্তিব্যবস্থাই আত্মবিরোধী হয়ে পড়ে—কারণ একদিকে তা গুরুতর অপরাধে কঠোর শাস্তির কথা বলে, অন্যদিকে অপরাধের প্রকৃতি-প্রমাণ-প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে নামাজকে দায়মুক্তির চাবি বানায়। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো—জার্মানি/ফ্রান্সের মতো সেক্যুলার আইনি কাঠামো, বা ভারতের মতো সাংবিধানিক সমতার কাঠামো—ধর্মচর্চাকে ব্যক্তিগত অধিকার হিসেবে রক্ষা করে, কিন্তু অপরাধবিচারকে প্রমাণ ও ন্যায্য প্রক্রিয়ার অধীনে রাখে; কারণ সমাজে শান্তি আসে “এক নিয়মে সবার বিচার” থেকে, “ধর্মীয় আচরণ দেখে ভিন্ন বিচার” থেকে নয়। এই লেখার মূল পর্যালোচনাটি দাঁড়ায়: ধর্মীয় রিচুয়ালকে আইন শিথিল করার ভিত্তি বানালে আইন আর সার্বজনীন থাকে না; আইন হয়ে যায় পক্ষপাতদুষ্ট, অনিশ্চিত, এবং শেষ পর্যন্ত দুর্বলের বিরুদ্ধে শক্তের হাতিয়ার—যা রুল অব ল ও মানবাধিকারের ন্যূনতম ধারণার সাথেও অসংগত।
