ইসলামী শরীয়তে কাফের হত্যা করলে মুসলিমের কোন মৃত্যুদণ্ড নেই

ভূমিকাঃ জীবনের সমমূল্য বনাম ধর্মীয় উচ্চম্মন্যতা

আধুনিক সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছে ‘সকল মানুষ সমান’—এই সর্বজনীন দর্শনের ওপর। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণা (UDHR) পর্যন্ত, মানব ইতিহাসের বিবর্তন মূলত প্রতিটি ব্যক্তির জীবনের সমান মর্যাদা এবং আইনি সুরক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। কিন্তু যখন আমরা ধর্মীয় আইন বা ইসলামী শরীয়তের দণ্ডবিধি (Penal Code) বিশ্লেষণ করি, তখন সেখানে এক গভীর নৈতিক ও আইনি সংকটের সম্মুখীন হতে হয়। ইসলামী ফিকহশাস্ত্র অনুযায়ী, অপরাধের গুরুত্বের চেয়ে অপরাধী ও ভিকটিমের ধর্মীয় পরিচয় দণ্ড নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে, অমুসলিম হত্যার দায়ে মুসলিমের মৃত্যুদণ্ড না হওয়ার বিধানটি আধুনিক মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের মৌলিক সংজ্ঞার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

এটি কেবল একটি আইনি অসামঞ্জস্য নয়, বরং এটি একটি পদ্ধতিগত বৈষম্য যা একজন অমুসলিমের অস্তিত্বকে একজন মুসলিমের তুলনায় নিচু স্তরে স্থাপন করে। শরীয়তের এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, মানবজীবনের মূল্য কোনো জন্মগত বা চিরন্তন বিষয় নয়, বরং তা বিশ্বাসের (Faith) ওপর নির্ভরশীল। যেখানে আধুনিক আইন প্রতিটি ব্যক্তির জীবনের অধিকারকে ‘অবিচ্ছেদ্য’ (Inalienable) বলে গণ্য করে, সেখানে ইসলামী শরীয়ত একে ‘শর্তাধীন’ করে তুলেছে। এই প্রবন্ধের লক্ষ্য হলো, বিভিন্ন প্রামাণ্য শাস্ত্রীয় সূত্র ও হাদিসের আলোকে এই বৈষম্যমূলক বিধানের কঠোর সমালোচনা করা এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এর অগ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরা।


হাদিসের বিবরণঃ কাফের হত্যা করলে মৃত্যুদণ্ড নেই

একটি হাদিসে বলা হয়েছে, “কোন মুসলমান কোন জিম্মি অর্থাৎ জিজিয়া কর দেয়া অমুসলিমকে হত্যা করলে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না“, তবে তার জন্য কোন দুনিয়াবি শাস্তির কথা কিন্তু হাদিসে বলা নেই। যেখানে মুসলিমকে হত্যা করা হলে তার দুনিয়াবি এবং আখিরাত উভয় শাস্তির কথাই বলা আছে। এবারে আসুন আমরা সেই হাদিসগুলো পড়ি, যেখানে বলা হয়েছে কাফের হত্যা করলে মুসলিমের মৃত্যুদণ্ড হয় না, ইসলামের সেই ভয়ঙ্কর বৈষম্যমূলক বিধানের কথা, যেখানে অমুসলিমের জীবনের মূল্য কম [1] [2] [3] [4]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৮৭/ রক্তপণ
পরিচ্ছদঃ ৮৭/৩১. কাফেরের বদলে মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না।
৬৯১৫. আবূ জুহাইফাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের কাছে এমন কিছু আছে কি যা কুরআনে নেই? তিনি বললেন, দিয়াতের বিধান, বন্দী-মুক্তির বিধান এবং (এ বিধান যে) কাফেরের বদলে কোন মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না। (১১১) (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৪৩৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৪৪৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সুনানে ইবনে মাজাহ
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
‏অধ্যায়ঃ ১৫/ রক্তপণ
পরিচ্ছদঃ ১৫/২১. কাফের ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে মুসলিম ব্যক্তিকে হত্যা করা যাবে না
১/২৬৫৮। আবূ জুহাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আলী ইবনে আবূ তালিব (রাঃ) কে বললাম, আপনাদের নিকট এমন কোন জ্ঞান আছে কি যা অন্যদের অজ্ঞাত? তিনি বলেন, না, আল্লাহর শপথ! লোকেদের নিকট যে জ্ঞান আছে তা ব্যতীত বিশেষ কোন জ্ঞান আমাদের নিকট নাই। তবে আল্লাহ যদি কাউকে কুরআন বুঝবার জ্ঞান দান করেন এবং এই সহীফার মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দিয়াত ইত্যাদি প্রসঙ্গে যা আছে (তাহলে স্বতন্ত্র কথা)। এই সহীফার মধ্যে আরো আছেঃ কোন কাফেরকে হত্যার অপরাধে কোন মুসলমানকে হত্যা করা যাবে না।
সহীহুল বুখারী ১১১, ১৮৭০, ৩০৪৭, ৩০৩৪, ৩১৭২, ৩১৮০, ৬৭৫৫, ৬৯০৩, ৬৯১৫, ৭৩০০, মুসলিম ১৩৭০, তিরমিযী ১৪১২, ২১২৭, নাসায়ী ৪৭৩৪, ৪৭৩৫, ৪৭৪৪, ৪৭৪৫, ৪৭৪৬, ৪৫৩০, আহমাদ ৬০০, ৬১৬, ৪৮৪, ৯৬২, ৯৯৪, ১০৪০, দারেমী ২৩৫৬, ইরওয়া ২২০৯। তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৪/ রক্তমূল্য
পরিচ্ছেদঃ ১১. কাফির হত্যার দায়ে মুসলিমকে হত্যা করা হবে কি না?
৪৫৩০। কাইস ইবনু আব্বাদ (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি ও আল-আশতার আলী (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে বলি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি আপনাকে বিশেষ কোনো উপদেশ দিয়েছেন যা সাধারণভাবে মানুষকে দেননি? তিনি বললেন, না; তবে শুধু এতটুকু যা আমার এ চিঠিতে আছে। অতঃপর তিনি তার তরবারির খাপ থেকে একখানা পত্র বের করলেন। তাতে লেখা ছিলোঃ সকল মুসলিমের জীবন সমমানের। অন্যদের বিরুদ্ধে তারা একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তি।
তাদের একজন সাধারণ ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত নিরাপত্তাই সকলের জন্য পালনীয়। সাবধান! কোনো মু‘মিনকে কোনো কাফির হত্যার অপরাধে হত্যা করা যাবে না। চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিককেও চুক্তি বলবৎ থাকাকালে হত্যা করা যাবে না। কেউ বিদ‘আত চালু করলে তার দায় তার উপর বর্তাবে। কোনো ব্যক্তি বিদ‘আত চালু করলে বা বিদ‘আতিকে মুক্তি দিলে তার উপর আল্লাহর অভিশাপ এবং ফিরিশতা ও মানবকূলের অভিশাপ।(1)
সহীহ।
(1). নাসায়ী, আহমাদ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ কায়স ইবনু ‘উবাদ (রহঃ)

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৪/ রক্তমূল্য
পরিচ্ছেদঃ ১১. কাফির হত্যার দায়ে মুসলিমকে হত্যা করা হবে কি না?
৪৫৩১। আমর ইবনু শু‘আইব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অতঃপর আলী (রাঃ) বর্ণিত হাদীদের অনুরূপ। তবে এতে রয়েছেঃ তাদের দূরবর্তীরাও তাদের পক্ষে নিরাপত্তা দিতে পারবে, উত্তম ও দুর্বল পশুর মালিকরা এবং পিছনে অবস্থানরত ও সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ সৈন্যগণও গানীমাতে সমান অংশ লাভ করবে।(1)
হাসান সহীহ।
(1). এটি গত হয়েছে হা/ ২৭৫১।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আমর ইবনু শু‘আয়ব (রহঃ)


আলেমদের ওয়াজঃ কাফেরের জীবনের মূল্য কম

আসুন এই বিষয়ে বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত আলেমের বক্তব্য শুনে নিই,


ইসলামী ফতোয়াগুলোতে বৈষম্যের স্পষ্টতা

বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম এবং ইসলামী ফিকাহ শাস্ত্রের অন্যতম পণ্ডিত ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার সম্পাদনায় প্রকাশিত মো. আব্দুল কাদেরের বই “বাংলাদেশে প্রচলিত শির্ক বিদ‘আত ও কুসংস্কার পর্যালোচনা” গ্রন্থে পরিষ্কারভাবেই বলা আছে যে, শিকর হচ্ছে হত্যাযোগ্য অপরাধ। যারা শিরক করে, তাদের রক্ত মুসলিমদের জন্য হালাল! আসুন সরাসরি বই থেকে দেখি, [5]-

কাফের

এই বিষয়ে ফতোয়া বিষয়ক প্রখ্যাত ওয়েবসাইট ইসলাম ওয়েব থেকে একটি ফতোয়া দেখে নিই [6]

All perfect praise be to Allaah, The Lord of the Worlds. I testify that there is none worthy of worship except Allaah, and that Muhammad is His slave and Messenger. We ask Allaah to exalt his mention as well as that of his family and all his companions.
First of all, you should know that a Muslim should not be killed for killing a belligerent non-Muslim according to the consensus of the scholars may Allaah have mercy upon them. According to the view of the majority of the scholars may Allaah have mercy upon them a Muslim should not be killed against a free non-Muslim under the Muslim rule. The evidence about this is the saying of the Prophet sallallaahu `alayhi wa sallam ( may Allaah exalt his mention ): “A Muslim should not be killed for killing a non-Muslim.” (At-Tirmithi)
Moreover, according to the view of the majority of the scholars may Allaah have mercy upon them the title (and rulings) “disbeliever” is applicable to a free non-Muslim under the Muslim rule. However, Abu Haneefah, and the scholars of his School of jurisprudence may Allaah have mercy upon them are of the view that a Muslim should be killed for killing a free non-Muslim under Muslim rule; their evidence is the two verses which the questioner mentioned. Nonetheless, the correct opinion is that of the majority of the scholars may Allaah have mercy upon them that is based on the above Prophetic narration, which is a direct proof related to the case of dispute.
Allaah Knows best.

বাংলা অনুবাদঃ “সমস্ত প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসুল। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন তাঁর (রাসুল), তাঁর পরিবার এবং তাঁর সকল সঙ্গীদের মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি করেন।
প্রথমত, আপনার জানা উচিত যে, ওলামায়ে কেরামদের (আল্লাহ তাঁদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন) ঐকমত্য বা ইজমা অনুযায়ী, একজন যুদ্ধরত অমুসলিমকে (হারবি) হত্যার দায়ে একজন মুসলিমকে হত্যা (প্রাণদণ্ড) করা যাবে না। অধিকাংশ ওলামাদের (জমহুর ওলামা) মতানুসারে, ইসলামী শাসনের অধীনে বসবাসকারী একজন স্বাধীন অমুসলিমকে (জিম্মি) হত্যার অপরাধেও একজন মুসলিমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে না। এর স্বপক্ষে প্রমাণ হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “কোনো অমুসলিমকে হত্যার দায়ে কোনো মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না।” (তিরমিযী)
এছাড়া, অধিকাংশ ওলামাদের মতে, ইসলামী শাসনের অধীনে থাকা মুক্ত অমুসলিমদের ক্ষেত্রেও ‘কাফের’ শব্দটি (এবং এর বিধানসমূহ) প্রযোজ্য। তবে ইমাম আবু হানিফা এবং তাঁর মাযহাবের ওলামাগণ মনে করেন যে, ইসলামী শাসনের অধীনে থাকা কোনো মুক্ত অমুসলিমকে হত্যার দায়ে মুসলিমের মৃত্যুদণ্ড হবে; তাঁদের প্রমাণ হলো প্রশ্নকর্তার উল্লিখিত দুটি আয়াত। তা সত্ত্বেও, সঠিক মতটি হলো জমহুর বা অধিকাংশ ওলামাদের মত, যা উপরে বর্ণিত নবিজির হাদিসের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত; যা এই বিরোধপূর্ণ বিষয়ে একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
আল্লাহই ভালো জানেন।” [7]


দরসে তাওহীদ ও কিতালঃ ধর্মের ভিত্তিতে জীবনের মূল্য নির্ধারণ

এই বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানা যায় দরসে তাওহীদ ও কিতাল (চতুর্থ দরস) যে সকল কারণে কারো রক্তপাত হালাল হয়ে যায় গ্রন্থ থেকে [8]

চতুর্থ শর্ত: নিহত ব্যক্তি খুনী ব্যক্তির সমকক্ষ হতে হবে। আর এই সমকক্ষতা চারটি বিবেচনায় হয়। যদিও এই চার বিবেচ্য বিষয়ে কিছুটা মতপার্থক্য আছে। তথাপি আমরা চারোটি বিষয় উল্লেখ করে এর মধ্যে থেকে অগ্রাধিকারযোগ্য বিষয়টিও উল্লেখ করবো।
প্রথম বিবেচ্য, ধর্মের ক্ষেত্রে সমকক্ষতা: সুতরাং কোন মুসলিমকে কোন কাফিরের
বদলায় হত্যা করা যাবেনা। কারণ মুসলিম এবং কাফির ধর্মের ক্ষেত্রে সমকক্ষ নয়। অতএব কোন মুসলিমকে কোন যিম্মী বা নিরাপত্তাপ্রাপ্ত কাফিরের বদলায় হত্যা করা যাবেনা। যেহেতু হারবী কাফিরের মৌলিকভাবেই কোন দিয়্যত (রক্তপণ) এবং কিসাস নেই। বরং তাকে হত্যা করা মুস্তাহাব কিংবা ওয়াজিব অথবা মুবাহ (বৈধ)। এটিই জুমহুর শাফেয়ী, হাম্বলী এবং কতিপয় মালেকী ও যাহেরী ফকীহদের মত।
দলীল: হযরত আবু জুহাইফা সূত্রে বর্ণিত মারফু হাদীস। তিনি বলেন, আমি আলী রা. কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার কাছে কি এমন কিছু আছে যা কুরআনে নেই? তখন তিনি বললেন, ঐ সত্বার কসম! যিনি দানা বিদীর্ণ করেন এবং প্রাণী সৃষ্টি করেন- আমার কাছে কুরআনে যা আছে এর বাইরে কিছুই নেই। আর আছে ওই বুঝশক্তি যা কোন ব্যক্তিকে আল্লাহর কিতাব কুরআনের ব্যাপারে দান করা হয় এবং এই পুস্তিকায় যা আছে তাই। আমি বললাম, কী আছে পুস্তিকায়? তিনি বললেন, দিয়্যত (রক্তপণ), বন্দীমুক্তি বিষয়ক বিধানাবলী এবং এই নীতি- মুসলিম ব্যক্তিকে কোন কাফেরের বদলায় হত্যা করা হবেনা।
অতএব, কোন মুসলিমকে কোন কাফেরের বদলায় হত্যা করা যাবেনা। কিন্তু এ ব্যাপারে হানাফী ফকীহগণ কী বলেন? ইমাম আবু হানীফা রহ. একটি যঈফ হাদীস দিয়ে প্রমাণ পেশ করে বলেন, যিম্মী কাফেরের বদলায় মুসলিমকে হত্যা করা হবে। ইমাম মালিক রহ. বলেন, মুসলিমকে কাফেরের বদলায় হত্যা করা যাবেনা। তবে কেবলমাত্র একটি অবস্থায় তা করা যাবে। তা হল, যদি সে তাকে “গীলা” করে হত্যা করে।
“গীলা’ মানে কী? ইবনে রুশদ রহ, এ ব্যাপারে বিদায়াতুল মুজতাহিদ’ কিতাবে লিখেন, গীলা হত্যা হল- (কোন যিম্মী অথবা নিরাপত্তাপ্রাপ্ত কাফেরকে) কাত করে শুইয়ে যবাই করে হত্যা করে তার ধন-সম্পদ লুটে নেয়া। ইমাম মালেক রহ. এর মাযহাব হল, এক্ষেত্রে ওই হত্যাকারী মুসলিমকে এই যিম্মী কাফেরের বদলায় হত্যা করা হবে। তবে এটা খুবসম্ভব তা’যীর ইত্যাদি হবে। আল্লাহই ভাল জানেন। কিন্তু অনুসরণের জন্য সহীহ হাদীসই এক্ষেত্রে অগ্রাধিকারযোগ্য। সহীহ হাদীসে আছে, কোন মুসলিমকে কাফেরের বদলায় হত্যা করা হবেনা।
এটি হল প্রথম বিবেচ্য বিষয়। ধর্মের ক্ষেত্রে সমকক্ষ হওয়া।
দ্বিতীয় বিবেচ্য: স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সমকক্ষতা, অতএব গোলামের বিনিময়ে স্বাধীন
ব্যক্তিকে হত্যা করা যাবেনা। চাই নিহত ব্যক্তি তার নিজের গোলাম হোক বা অন্যের। এ অভিমতই ব্যক্ত করেছেন শাফেয়ী এবং হাম্বলী ফকীহগণ। কিন্তু মালেক রহ. এক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, এ প্রকারের হত্যা যদি “গীলা” করে হয়ে থাকে তবে গোলামের বিনিময়ে স্বাধীন হত্যাকারীকে হত্যা করা হবে। যেমনটা তিনি অন্যান্য ক্ষেত্রেও বলেছেন।
তৃতীয় বিবেচ্য: লিঙ্গের ক্ষেত্রে সমকক্ষতা, কোন পুরুষকে কি কোন নারীর বদলায় হত্যা
করা যাবে? হ্যাঁ, পুরুষকে নারীর বদলায় হত্যা করা যাবে। এ অভিমতই ব্যক্ত করেছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ হাম্বলী ফকীহগণ। এবং এ মতটিই অগ্রাধিকারযোগ্য।
চতুর্থ বিবেচ্য: সংখ্যায় সমকক্ষতা, অর্থাৎ একাধিক ব্যক্তি যেমন দুই, তিন অথবা পাঁচ
কিংবা দশজন লোক যদি এক ব্যক্তিকে হত্যার জন্য একমত হয়, কিংবা তারা সকলে এক ব্যক্তির হত্যায় শরীক হয় তাহলে কি ওই এক ব্যক্তির বদলায় এদের সকলকে হত্যা করা হবে? হ্যাঁ, তাদের সকলকেই তার বদলায় হত্যা করা হবে। এ মতই পোষণ করেছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ ফুকাহায়ে কেরাম তথা হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী এবং হাম্বলী ফুকাহায়ে কেরাম। এ মতের উপরই সাহাবা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের ইজমা (ঐক্যমত্য) প্রতিষ্ঠা হয়েছে। যেমনটি ঘটেছিল ওমর ইবনে খাত্তাব রা. এর যামানায়। সেটি প্রায় অনেকটা ইজমায়ী (ঐক্যমত্যপূর্ণ) মাসআলার রূপ নিয়েছিল। আল্লাহই ভাল জানেন।

কাফের 1
কাফের 3

ফিকহে ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুঃ খলিফাদের পদ্ধতি

এবারে আসুন ফিকহে ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু গ্রন্থ থেকে এই বিষয়ে ওসমানের শাসনামলের একটি ঘটনা জেনে নিই [9]

[ঘ] উত্তেজিত অবস্থায় কোনো অপরাধ করে বসলে: এ ব্যাপারে হযরত ওসমান (রা)-এর অভিমত হচ্ছে-উত্তেজিত অবস্থায় কেউ কোনো অপরাধ করে বসলে তার হুকুম জিনাইয়াতুল খাতা বা ভুলে কৃত অপরাধের মত। এ ক্ষেত্রে কিসাসের পরিবর্তে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ প্রদান করা অপরিহার্য হবে। যেমন-আবদুর রহমান ইবনু আবু বকর (রা) বর্ণনা করেছেন-যখন হযরত ওমর (রা)-কে শহীদ করা হলো, তখন আমি হরমুজান, জুফাইনাহ এবং আবু লুলুর সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম। তারা মদীনার একটি মহল্লায় বসবাস করতো। আমাকে দেখেই তারা পালাতে শুরু করলো। আমিও তাদের পিছু নিলাম। দৌড়ানোর এক পর্যায়ে তাদের হাত থেকে একটি খঞ্জর (বড়ো আকারের ছুরি) পড়ে গেলো, যা দুদিকেই ধারালো ছিলো। আমি দেখেই (আমার সাথীদেরকে) বললাম-দেখো, এটি সেই খঞ্জর যা দিয়ে ওমর (রা)-কে শহীদ করা হয়েছে। লোকজন গিয়ে খঞ্জর দেখে তাঁর কথার সত্যতা স্বীকার করলেন। যখন উবাইদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা) সেই খঞ্জর দেখলেন, তখন তরবারী নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন এবং হরমুজান, জুফাইনাহকে হত্যা করলেন, আর আবু লুলুর কিশোরী কন্যাকে পেয়ে তাকেও হত্যা করে ফেললেন। তারপর তলোয়ার উচিয়ে বলতে লাগলেন-আল্লাহর কসম! আজ মদীনার কোনো গোলাম বা বাঁদী আমার তরবারী থেকে রেহাই পাবে না। এদেরকে ছাড়া আরো কিছু লোককেও হত্যা করতে হবে। আরো কিছু লোক বলতে তিনি কতিপয় মুহাজির সাহাবার দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন। লোকজন তাকে তলোয়ার ফেলে দেয়ার জন্য চাপ দিলেন। তারা কাছে যেতে সাহস পাচ্ছিলেন না। এমন সময় সেখানে হযরত আমর ইবনুল আস (রা) এলেন। তিনি খুব নরম ও স্নেহের স্বরে বললেন-‘ভাতিজা। তরবারীটি আমার কাছে দিয়ে দাও।’ তিনি তরবারী দিয়ে দিলেন।
হযরত ওসমান (রা) মজলিসে শূরার অধিবেশন আহ্বান করে তাদেরকে বললেন-আপনারা উবাইদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা)-এর ব্যাপারে আমাকে পরামর্শ দিন। মতামত দিতে গিয়ে শূরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেলো। কতিপয় মুহাজির সাহাবা পরামর্শ দিলেন-তাকে কিসাস স্বরূপ হত্যা করা হোক। অন্যেরা বললেন-কী আশ্চর্য! কাল তার পিতাকে শহীদ করা হয়েছে আর আজ তাকে হত্যা করা হবে? আল্লাহ হরমুজান ও জুফাইনাহকে ধ্বংস করুন। হযরত ওসমান (রা) চিন্তার গভীরে হারিয়ে গেলেন। পরে সিদ্ধান্তে পৌঁছুলেন উবাইদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা) এমন অবস্থায় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, যখন সে স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলো না। সে এমন কথা বলছে এবং এমন কাজ করছে তা স্বাভাবিক অবস্থায় একজন মানুষ করতে পারে না। তার মানসিক অবস্থা এমন ছিলো, যা কিসাস মুলতবী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। সন্দেহের কারণে হদ এর মত কিসাসও মুলতবী হয়ে যায়।
হরমুজান এবং আবু লুলুর কন্যার কোনো উত্তরাধিকারী ছিলো না। এমতাবস্থায় রাষ্ট্র তাদের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করছিলো। অন্য কথায় হযরত ওসমান (রা) তাদের অভিভাবক ছিলেন। তিনি চাচ্ছিলেন কিভাবে এ সমস্যার ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান করা যায়। তাই যারা উৰাউদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা)-কে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পক্ষে অভিমত দিয়েছিলেন তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন-আপনারা বলনুতো হরমুজানের অভিভাবক কে? ‘আমীরুল মুমিনীন! তার অভিভাবক তো এখন আপনি।’-তারা উত্তর দিলেন। এ জবাব শুনে তিনি বললেন-‘যদি তাই হয় তাহলে আমি উবাউদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা)-কে মাফ করে দিলাম। ‘৬ যখন নিহত ব্যক্তির অভিভাবক হত্যাকারীকে মাফ করে দেন তখন কিসাসের পরিবর্তে দিয়াত (রক্তপণ) ওয়াজিব হয়ে যায়। তাই হযরত ওসমান (রা) বাইতুলমাল থেকে দিয়াত আদায় করে দেবার নির্দেশ দেন। রইলো জুফাইনার ব্যাপারটি। সে খৃষ্টান ছিলো। কোনো অমুসলিম কোনো মুসলমানের হাতে নিহত হলে সেজন্য মুসলমানকে হত্যা করা যায় না। তাই তিনি উবাইদুল্লাহর পক্ষ থেকে তার দিয়াতও আদায় করে দেন।
[খ.১] মুসলিম কর্তৃক কোনো অমুসলিমের ক্ষতি সাধন: কোনো মুসলমানের হাতে যদি কোনো অমুসলিম (সে যিম্মি হোক কিংবা না হোক) নিহত হয়, সে জন্য মুসলিম থেকে কিসাস গ্রহণ করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে দিয়াত গ্রহণ করতে হবে। এজন্য হযরত ওসমান (রা) কোনো মুশরিককে হত্যা করার কারণে কোনো মুসলমান থেকে কিসাস গ্রহণ করতেন না। তার সময়ে একজন মুসলমান এক যিম্মীকে ইচ্ছে করে হত্যা করেন। সে জন্য তিনি কিসাস গ্রহণ করেননি বরং দিয়াতু মুগাল্লাযা (অর্থাৎ পুরো দিয়াত) প্রদানের নির্দেশ দেন। যদি কোনো মুসলমান অমুসলিমকে হত্যা না করে হত্যার চেয়ে কম ক্ষতি সাধন করেন, সে ক্ষেত্রে কিভাবে কিসাস গ্রহণ করা যাবে? এ সম্পর্কে আমরা হযরত ওসমান (রা)-এর অভিমত সংক্রান্ত কোনো বর্ণনা পাইনি। অবশ্য এ ক্ষেত্রে হযরত ওমর (রা) কিসাস গ্রহণ করতেন না, তবে দিয়াতের পরিমাণ

কাফের 5
কাফের 7
কাফের 9

প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যঃ শরীয়তের আলোকে জীবনের মূল্যমান

উপরের দলিল প্রমাণগুলো থেকে এটি স্পষ্ট যে, ইসলামী আইনের এই কাঠামোগত বৈষম্য কোনো তাত্ত্বিক অনুমান নয়, বরং এটি সরাসরি নবি মুহাম্মদের নির্দেশ এবং পরবর্তী খলিফাদের চর্চা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি শাস্ত্রীয় সত্য। এই আইনটি আধুনিক ফৌজদারি আইনের সেই মৌলিক নীতিকে ধ্বংস করে দেয় যেখানে বলা হয়, ‘আইনের চোখে সবাই সমান’। এখানে অপরাধের ধরণ বা বীভৎসতা বিচার্য নয়, বরং ঘাতকের ধর্মই তাকে চরম দণ্ড থেকে দায়মুক্তি দিচ্ছে।

এই বৈষম্য কেবল কাফের বা যুদ্ধরত শত্রুর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মুসলিম রাষ্ট্রে জিজিয়া কর দিয়ে বসবাসকারী অনুগত অমুসলিম (জিম্মি)-দের ক্ষেত্রেও জমহুর বা সংখ্যাগুরু ওলামাদের মত অনুযায়ী একই বিধান প্রযোজ্য। যদিও হানাফী মাজহাবের মতো কিছু শাখা এই ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা দেখানোর দাবি করে, তবুও ‘ইসলাম ওয়েব’-এর মতো আন্তর্জাতিক ফতোয়া বোর্ডগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, অধিকাংশ আলেমের মতে একজন স্বাধীন অমুসলিমকে হত্যার দায়ে মুসলিমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে না [10]

এই আইনি দর্শনের চূড়ান্ত প্রতিফলন দেখা যায় তৃতীয় খলিফা ওসমানের শাসনামলে। যখন উবায়দুল্লাহ ইবনে ওমর তার পিতা ওমর ফারুকের হত্যার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে একজন নিরপরাধ অমুসলিম ‘হুরমুজান’কে হত্যা করেন, তখন খলিফা ওসমান তাকে কিসাস বা প্রাণদণ্ড থেকে রেহাই দেন [11]। এটি প্রমাণ করে যে, শাস্ত্রীয় বিধানটি কেবল কাগুজে নয়, বরং প্রায়োগিক ক্ষেত্রেও অমুসলিমের জীবনের নিরাপত্তাকে খর্ব করে এবং মুসলিম অপরাধীকে দায়মুক্তির একটি ধর্মীয় ঢাল প্রদান করে। ফলে আধুনিক রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকারের যে ধারণা, তা এখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।


মানবাধিকারের লঙ্ঘন এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকত্ব

ইসলামী শরীয়তের এই দণ্ডবিধি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ‘সমান নাগরিকত্ব’ (Equal Citizenship) ধারণাকে সমূলে বিনাশ করে। যখন কোনো রাষ্ট্রে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে একজন নাগরিকের জীবনের মূল্য অন্যজনের চেয়ে কম নির্ধারিত হয়, তখন সেখানে আইনের শাসন (Rule of Law) অর্থহীন হয়ে পড়ে। এটি অমুসলিম নাগরিকদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’ হিসেবে চিহ্নিত করার একটি আইনি বৈধতা। আধুনিক মানবাধিকারের বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী, বিচারব্যবস্থা হবে অন্ধ; যা অপরাধীর সামাজিক বা ধর্মীয় অবস্থান না দেখে কেবল অপরাধের প্রকৃতি বিবেচনা করবে। কিন্তু শরীয়তি বিধান এখানে পক্ষপাতদুষ্ট বিচারকের ভূমিকা পালন করে, যা ন্যায়বিচারের সর্বজনীন সংজ্ঞার পরিপন্থী।

দ্বিতীয়ত, এই আইন সংখ্যালঘুদের জন্য এক চরম নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি করে। যখন একজন সম্ভাব্য অপরাধী জানে যে কোনো অমুসলিমকে হত্যা করলে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ড পেতে হবে না, তখন এটি তাকে অপরাধ সংঘটনে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করে। এটি কেবল একটি বিচারিক অসামঞ্জস্য নয়, বরং সংখ্যালঘুদের প্রতি সহিংসতাকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্রয় দেওয়ার নামান্তর। জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদের ধারা ৩ অনুযায়ী, “প্রত্যেক ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে”; কিন্তু শরীয়তের এই বৈষম্যমূলক অবস্থান অমুসলিমদের সেই মৌলিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত করে একটি মধ্যযুগীয় বর্বর শাসনব্যবস্থাকেই প্রতিনিধিত্ব করে।

তদুপরি, এই বিধানটি নৈতিক ও মানবিক চেতনার মূলে কুঠারাঘাত করে। সভ্য সমাজের মাপকাঠি হলো ভিকটিমের মর্যাদা রক্ষা করা, তার ধর্ম বিচার করা নয়। যখন একজন অমুসলিমের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পরও ঘাতক মুসলিম হওয়ার সুবাদে বেঁচে যায়, তখন রাষ্ট্র ও ধর্ম সম্মিলিতভাবে এই বার্তাই দেয় যে—অমুসলিমের রক্ত মুসলিমের রক্তের চেয়ে অপবিত্র বা সস্তা। এই ধরনের উচ্চম্মন্যতা ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন কেবল সামাজিক ঐক্যকেই বিনষ্ট করে না, বরং এটি আধুনিক গণতন্ত্র ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের পথে প্রধান অন্তরায়।


উপসংহারঃ সভ্য সমাজের দাবি ও মানবিক সমতা

পরিশেষে, ইসলামী শরীয়তের এই দণ্ডবিধি এবং এর প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এই আইন আধুনিক মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক সমতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ধর্মের ভিত্তিতে জীবনের মূল্যমান নির্ধারণ করা কেবল একটি প্রাচীন ও পশ্চাৎপদ চিন্তা নয়, বরং এটি একটি বর্বর বিচারব্যবস্থার প্রতিফলন যা বর্তমান বিশ্বের কোনো সভ্য রাষ্ট্রে কার্যকর থাকার যোগ্যতা রাখে না। যখন একজন অমুসলিমের জীবনের নিরাপত্তা হরণ করা হয় এবং ঘাতক তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে দায়মুক্তি পায়, তখন সেখানে কেবল আইনের মৃত্যু ঘটে না, বরং মানবিকতার পরাজয় ঘটে।

আধুনিক বিশ্বের রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালিত হয় সংবিধান ও সর্বজনীন আইনের ভিত্তিতে, যেখানে নাগরিকের ধর্ম বা বিশ্বাস তার আইনি সুরক্ষার পথে বাধা হতে পারে না। কিন্তু শরীয়তের এই বৈষম্যমূলক বিধান সমাজকে কেবল বিভক্তই করে না, বরং অমুসলিম নাগরিকদের মধ্যে নিরন্তর ভীতি ও প্রান্তিকতা সৃষ্টি করে। একটি ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ গঠন করতে হলে অপরাধীর ধর্ম নয়, বরং অপরাধের গুরুত্বই হতে হবে দণ্ড নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা অনুযায়ী, “আইনের সম-প্রয়োগ” নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক বা মানবিক হতে পারে না।

তাই বর্তমান যুগের দাবি হলো—মধ্যযুগীয় এই বৈষম্যমূলক মানসিকতা পরিহার করা এবং সকল মানুষের জীবনের সমান মূল্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা। একটি সভ্য ও আধুনিক সমাজ গঠনে ধর্মের দোহাই দিয়ে জীবন-মৃত্যুর বিভাজন তৈরি করা অগ্রহণযোগ্য। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক পৃথিবী গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি মানুষের জীবন—তিনি মুসলিম হোন বা অমুসলিম—সমানভাবে মূল্যবান এবং আইনের কাঠগড়ায় প্রত্যেকেই সমান বিচার পাওয়ার অধিকারী।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৬৯১৫ ↩︎
  2. সুনানে ইবনে মাজাহ, তাওহীদ পাবলিকেশন‏, হাদিসঃ ২৬৫৮ ↩︎
  3. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৫৩০ ↩︎
  4. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৫৩১ ↩︎
  5.  বাংলাদেশে প্রচলিত শির্ক বিদ‘আত ও কুসংস্কার পর্যালোচনা ২. শির্কের পরিণতি ↩︎
  6. Killing a Muslim in punishment for killing a non-Muslim ↩︎
  7. ইসলাম ওয়েব ফতোয়া নং: ৯২২৬১ ↩︎
  8. দরসে তাওহীদ ও কিতাল (চতুর্থ দরস) যে সকল কারণে কারো রক্তপাত হালাল হয়ে যা , মূল- শাইখ মুজাহিদ হারেস বিন গাযী আন নাযারী রহ , অনুবাদ- আব্দুল্লাহ সিরাজী, আল-আবতাল মিডিয়া প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৭, ৮ ↩︎
  9. ফিকহে ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু, ড মুহাম্মদ রাওয়াস কালা’জী, ভাষান্তর ও সম্পাদনাঃ মুহাম্মদ খলিলুল রহমান মুমিন, আধুনিক প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ১৫২, ১৫৩, ১৫৪ ↩︎
  10. “Killing a Muslim in punishment for killing a non-muslim”, Islamweb.net, Fatwa No: 92261 ↩︎
  11. ফিকহে ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু, ড. মুহাম্মদ রাওয়াস কালা’জী, পৃষ্ঠা ১৫২-১৫৪ ↩︎