ইসলামী শরীয়তে পশু ধর্ষণের শাস্তি হয় পশুটির

ভূমিকাঃ নিরপরাধ প্রাণের ওপর আরোপিত দণ্ড ও শরিয়তি নিষ্ঠুরতা

আধুনিক মানবাধিকার ও প্রাণী অধিকারের মূল ভিত্তি হলো—যে কোনো প্রাণের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা তার প্রাণ হরণ কেবল তখনই জায়েজ হতে পারে যখন তা আত্মরক্ষা বা অত্যন্ত জরুরি কোনো প্রয়োজনে ঘটে। কিন্তু ইসলামি দণ্ডবিধির একটি বিধান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে ন্যায়বিচারের ন্যূনতম বালাই নেই; বরং সেখানে এক আদিম ও যুক্তিহীন নিষ্ঠুরতাকে ঐশ্বরিক রূপ দেওয়া হয়েছে। বিধানটি হলো—কোনো মানুষ যদি কোনো পশুর সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত হয়, তবে অপরাধী মানুষের পাশাপাশি সেই নির্যাতিত পশুটিকেও হত্যা করতে হবে। কোনো যুক্তিবাদী ও মানবিক সমাজ ব্যবস্থায় ‘নির্যাতনের শিকার’ হওয়া কোনো সত্তাকে শাস্তির আওতায় আনার কথা কল্পনাও করা যায় না। পশুটির এখানে কোনো নৈতিক বা আইনি দায়বদ্ধতা নেই, তার কোনো সম্মতি বা অসম্মতির প্রশ্ন নেই; অথচ কেবল মানুষের লালসার শিকার হওয়ার কারণে তাকে প্রাণ হারাতে হয়। এটি এমন এক পদ্ধতিগত অমানবিকতা, যা প্রাণের মর্যাদাকে মানুষের ব্যক্তিগত ‘পবিত্রতা’ বা ‘ঘৃণা’র মাপকাঠিতে বিচার করে—যা আধুনিক নৈতিক দর্শনের পরিপন্থী।


ভিকটিম ব্লেমিং ও নিষ্পাপ প্রাণের বিনাশঃ একটি অযৌক্তিক দণ্ডবিধি

ইসলামি দণ্ডবিধির এই বিশেষ ধারাটি বিশ্লেষণ করলে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে ওঠে, তা হলো—এখানে ‘ন্যায়বিচার’ বা ‘ইনসাফ’ বলতে আসলে কিছু নেই। আধুনিক আইনশাস্ত্রের প্রাথমিক পাঠ হলো, কোনো অপরাধের বিচার করতে হলে ‘মেনস রিয়া’ (Mens Rea) বা অপরাধমূলক মনস্তত্ত্ব থাকতে হয়। একটি অবোধ পশুর পক্ষে কোনো মানুষের লালসার বিরুদ্ধে আইনি বা নৈতিক প্রতিবাদ করা যেমন অসম্ভব, তেমনি তার এই প্রক্রিয়ায় কোনো ‘সম্মতি’ বা ‘অপরাধ’ থাকার প্রশ্নই ওঠে না। তবুও, হাদিসে বর্ণিত বিধান অনুযায়ী মানুষের বিকৃত কামনার শিকার হওয়ার পর সেই পশুটিকেও পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে [1] [2]। এটি সরাসরি ভিকটিম ব্লেমিং বা ‘নির্যাতিতকেই শাস্তি’ দেওয়ার একটি আদিম ও নিষ্ঠুর উদাহরণ।

সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৩/ শাস্তির বিধান
পরিচ্ছদঃ ২৮. পশুর সাথে সংগম করলে তার শাস্তি সস্পর্কে।
৪৪০৫. আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ (রহঃ) ………. ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কেউ কোন পশুর সাথে সঙ্গম করে, তবে তাকে হত্যা করবে এবং সে পশুকেও তার সাথে হত্যা করবে। রাবী বলেন, আমি ইবন আব্বাস (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করিঃ পশুর অপরাধ কি? তিনি বলেনঃ আমার মনে হয়, তিনি সে পশুর গোশত খাওয়া ভাল মনে করেননি, যার সাথে কেউ এরূপ কুকর্ম করে।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৭: দণ্ডবিধি
পরিচ্ছেদঃ দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
৩৫৭৬-[২২] ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোনো জন্তু-জানোয়ারের সাথে অপকর্ম করল, তাকে হত্যা করে দাও এবং তার সাথে ঐ জানোয়ারটিকেও হত্যা করে ফেল। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, জানোয়ারটি কেন হত্যাযোগ্য? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কিছুই শুনিনি। তবে আমি মনে করি যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জানোয়ারটির গোশ্ত/মাংস খাওয়া বা কোনভাবে তাত্থেকে উপকৃত হওয়াকে অপছন্দ করেন। যেহেতু জানোয়ারটির সাথে অপকর্ম হয়েছে। (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ ও আবূ দাঊদ)[1]
[1] সহীহ : আবূ দাঊদ ৪৪৬৪, তিরমিযী ১৪৫৫, ইবনু মাজাহ ২৬৬৪, ইরওয়া ২৩৪৮, সহীহ আল জামি‘ ৫৯৩৮, সহীহ আত্ তারগীব ২৪২৩।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

তৎকালীন সমাজ ও ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে এই প্রশ্নটি যে উদয় হয়নি তা নয়। খোদ ইবনে আব্বাসকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “পশুটির অপরাধ কী?”—তখন তাঁর উত্তরটি ছিল অত্যন্ত দুর্বল এবং যুক্তিহীন। তিনি বলেছিলেন যে, নবী সম্ভবত ওই পশুর মাংস খাওয়া বা তার থেকে কোনোভাবে উপকৃত হওয়াকে অপছন্দ করতেন। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, পশুটির প্রাণের কোনো স্বতন্ত্র মূল্য বা অধিকার এখানে স্বীকৃত হয়নি। কেবল মানুষের ‘ঘৃণা’ বা ‘বিতৃষ্ণা’ দূর করতে একটি জীবন্ত প্রাণীকে হত্যা করা কোনোভাবেই উন্নত নৈতিকতার পরিচয় দিতে পারে না। যদি মাংস খাওয়া নিয়ে কোনো সমস্যা থাকত, তবে পশুটিকে অন্য কোনো কাজে লাগানো যেত বা নিদেনপক্ষে তার জীবন কেড়ে না নিয়ে তাকে লোকালয় থেকে দূরে রাখা যেত। কিন্তু তা না করে ‘হত্যা’র আদেশ দেওয়া প্রমাণ করে যে, ইসলামি আইনে পশুকে কেবল একটি জড় পদার্থের মতো ‘ভোগ্যপণ্য’ হিসেবে দেখা হয়েছে, যা একবার ‘নষ্ট’ হয়ে গেলে তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে হয়।

মানবিক দৃষ্টিতে দেখলে এটি একটি চরম মনস্তাত্ত্বিক নিষ্ঠুরতা। কোনো মানুষ যখন পশুর সাথে এমন বিকৃত আচরণ করে, তখন পশুটি সেখানে স্রেফ একটি শিকার (Victim)। অথচ শরিয়তি বিধানে পশুটিকে মেরে ফেলার নির্দেশ মূলত ওই অপরাধের ‘প্রমাণ’ বা ‘চিহ্ন’ মুছে ফেলার একটি কৌশল হিসেবে কাজ করে। পশুর প্রাণের চেয়ে মানুষের ধর্মীয় ‘পবিত্রতা’ বা ‘অনুভূতি’কে এখানে বড় করে দেখা হয়েছে। একটি নিষ্পাপ প্রাণীকে স্রেফ মানুষের লালসার শিকার হওয়ার কারণে মরতে হবে—এমন বর্বর বিধান কেবল প্রাণি অধিকারের পরিপন্থী নয়, বরং এটি মানবীয় বিচারবুদ্ধির প্রতি এক চরম উপহাস। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি প্রমাণ করে যে, মধ্যযুগীয় এই আইনগুলো প্রাণের পবিত্রতার চেয়ে ‘আদিম ঘৃণা’র ওপর বেশি প্রতিষ্ঠিত ছিল।


প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ঠুরতা ও প্রমাণের বিলোপঃ পশুর জীবনের অন্তঃসারশূন্যতা

ইসলামি আইনের এই বিধানটি পর্যালোচনায় একটি ভয়াবহ নৈতিক স্ববিরোধিতা ফুটে ওঠে—তা হলো ‘অপরাধ’ ও ‘শাস্তি’র মধ্যবর্তী যৌক্তিক সম্পর্কের অনুপস্থিতি। আধুনিক দণ্ডবিজ্ঞানে শাস্তির উদ্দেশ্য হলো অপরাধীকে সংশোধন করা অথবা সমাজকে সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু এখানে যে পশুকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সে কোনো অপরাধী নয়, বরং একটি যৌন নির্যাতনের শিকার বা ‘ভিকটিম’। কোনো বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যবস্থায় নির্যাতনের শিকার হওয়া প্রাণটির জীবন কেড়ে নেওয়াকে ‘ন্যায়বিচার’ বলা অসম্ভব। এটি মূলত একটি ‘ট্যাবু’ বা ঘৃণা-ভিত্তিক আইন, যেখানে পশুর জীবনের নিজস্ব কোনো মূল্য নেই; বরং তার অস্তিত্ব কেবল মানুষের ব্যবহারের উপযোগিতার ওপর নির্ভরশীল।

ইবনে আব্বাসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নবী সম্ভবত ওই পশুর মাংস খাওয়া অপছন্দ করতেন। এই যুক্তিটি নৈতিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল। যদি মাংস খাওয়া বা দুধ পান করা নিয়ে কোনো ধর্মীয় সংশয় বা ঘৃণা কাজ করে, তবে সেই পশুকে হত্যা না করেও তার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা যেত। কিন্তু একটি জীবন্ত প্রাণীকে স্রেফ মানুষের ‘ঘৃণা’ মেটানোর জন্য বা ‘অপবিত্র’ হয়ে গেছে—এই অজুহাতে মেরে ফেলা চরম পরিবেশগত ও নৈতিক অপরাধ। এটি প্রমাণ করে যে, শরিয়তি ব্যবস্থায় পশুর প্রাণের কোনো স্বতন্ত্র মর্যাদা বা ‘রাইট টু লাইফ’ স্বীকৃত নয়। পশুকে এখানে নিছক একটি ‘অপরিচ্ছন্ন আসবাব’-এর মতো বিবেচনা করা হয়েছে, যা মানুষের মাধ্যমে কলঙ্কিত হলে ধ্বংস করে ফেলাই একমাত্র সমাধান।

মানবাধিকার ও আধুনিক নীতিবিদ্যার আলোকে এটি একটি সুসংগঠিত নিষ্ঠুরতা। এই বিধানটি মূলত অপরাধের ‘লিভিং এভিডেন্স’ বা জীবন্ত প্রমাণ মুছে ফেলার একটি আদিম পদ্ধতি হিসেবে কাজ করে। পশুকে হত্যা করার মাধ্যমে সেই ‘লজ্জাজনক’ ঘটনার স্মৃতি সমাজ থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু এতে ওই অবোধ প্রাণটির প্রতি যে চরম অন্যায় করা হয়, তার কোনো প্রতিকার ইসলামি আইনে নেই। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এত কঠোর এবং অমানবিক শাস্তির বিধান থাকা সত্ত্বেও মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে পশুর সাথে এমন বিকৃত লালসা চরিতার্থ করার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। এটি প্রমাণ করে যে, এই ধরণের অযৌক্তিক ও সহিংস আইন আসলে অপরাধ দমনে কোনো কার্যকরী ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে, বরং তা কেবল সমাজে প্রাণের প্রতি সংবেদনশীলতাকে নষ্ট করেছে। এবারে আসুন দেখে নিই, পশুর সাথে এই অপকর্ম করা ইসলামিক দেশগুলোতে মুসলিমদের মধ্যে ঘটার কিছু নমুনা,


আইনি স্ববিরোধিতা ও ন্যায়বিচারের প্রহসনঃ যখন অপরাধীর জন্য কোনো দণ্ডই নেই

ইসলামি বিচারব্যবস্থার আরো অদ্ভুত এবং হাস্যকর দিক হলো এর বিধানগুলোর চরম উদ্ভট নৈতিকতার ধারণা। যেখানে একটি হাদিসে পশুকামী মানুষটিকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেখানেই অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে যে এই জঘন্য অপরাধের জন্য আসলে সেই অপরাধীটির কোনো নির্দিষ্ট বা নির্ধারিত শাস্তির (হদ) বিধানই নেই। লক্ষ্য করুন নিচের হাদিসগুলো [3] [4]

সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
১৫/ হাদ্দ বা দণ্ডবিধি
পরিচ্ছেদঃ ২৩. কোন মানুষ পশুর সাথে কু-কর্মে লিপ্ত হলে
১৪৫৫। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা যে মানুষকে পশুর সাথে কু-কর্মে লিপ্ত দেখ, তাকে এবং পশুটিকে হত্যা কর।
হাসান সহীহ, ইবনু মী-জাহ (২৫৬৪)
ইবনু আব্বাস (রাঃ)-কে বলা হল, পশুটির অপরাধ কি? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কিছু শুনিনি। তবে আমার ধারণামতে যে পশুটির সাথে এরূপ করা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাংস খাওয়া বা এটাকে কোন কাজে ব্যবহার করাকে লোকদের জন্য পছন্দ করেননি।
হাসান
আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি ইকরিমা (রাহঃ)-এর সনদে ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে আমর ইবনু আবী আমর ছাড়া আর কেউ বর্ণনা করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। তবে এটাকে সুফিয়ান সাওরী আসিম হতে, তিনি আবূ রায়ীন হতে, তিনি ইবনু আব্বাস হতে বর্ণনা করেছেন যে, ইবনু আব্বাস বলেছেন, যে ব্যক্তি পশুর সাথে কুকর্ম করল, তার কোন নির্দিষ্ট শাস্তি নেই।
এটি পূর্ববর্তী হাদীসের চেয়ে অনেক বেশি সহীহ। এ হাদীস মোতাবেক অভিজ্ঞ আলিমগণ মতামত দিয়েছেন। এই মত প্রকাশ করেছেন ইমাম আহমাদ ও ইসহাক।

হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৩/ অপরাধ ও তার শাস্তি
পরিচ্ছেদঃ ৩০. যে ব্যক্তি পশুর সঙ্গে সঙ্গম করে
৪৪৬৫ ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, পশুর সঙ্গে সঙ্গমকারী হাদ্দের আওতাভুক্ত নয়। ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, আতাও এরূপই বলেছেন। হাকাম বলেন, আমি মনে করি তাকে বেত্রাঘাত করা উচিত; কিন্তু তা হাদ্দের সীমা (একশো বেত্রাঘাত) পর্যন্ত পৌঁছা উচিত নয়। হাসান বাসরী (রহঃ) বলেন, সে যেনাকারীর সমতুল্য। ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, আসিম কর্তৃক বর্ণিত হাদীস আমর ইবনু আবূ আমরের হাদীসকে দুর্বল প্রমাণিত করে।[1]
হাসান।
[1]. বায়হাক্বী।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)

যৌক্তিক বিশ্লেষণে এই স্ববিরোধিতা একটি বিশাল নৈতিক শূন্যতাকে নির্দেশ করে। যদি এটি স্রষ্টার তরফ থেকে আসা কোনো চূড়ান্ত জীবনবিধান হতো, তবে প্রাণের বিনাশের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এমন আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকার কথা নয়। এক জায়গায় বলা হচ্ছে ‘তাকে হত্যা করো’, আর অন্য জায়গায় বলা হচ্ছে ‘তার জন্য কোনো নির্ধারিত হদ্দ শাস্তি নেই’। এই লিগ্যাল লুপহোল বা আইনি ছিদ্রটি প্রমাণ করে যে, এই নিয়মগুলো কোনো সুসংগত নীতিবিদ্যার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়নি, বরং এগুলো ছিল তৎকালীন সময়ের বিচ্ছিন্ন কিছু পরিস্থিতি, মতামত বা গোত্রীয় অভ্যাসের সংকলন।

একজন অপরাধীকে কোনো শাস্তি না দেওয়া এবং একইসাথে একজন নিরপরাধ পশুকে হত্যার যে বিধান আগের হাদিসে আমরা দেখেছি, এই দুইয়ের সংমিশ্রণ একটি চরম বিশৃঙ্খল বিচারব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। একদিকে পশুর অধিকারকে অস্বীকার করে তাকে স্রেফ মানুষের ‘ঘৃণা’ বা ‘অপবিত্রতা’র অজুহাতে হত্যা করা হচ্ছে, অন্যদিকে মূল অপরাধী মানুষের জন্য শাস্তির কোনো স্থিরতা নেই। এটি কেবল একটি আইনি অসংগতি নয়, বরং ন্যায়বিচারের নামে এক ধরণের প্রহসন। স্কেপটিক দৃষ্টিতে দেখলে, এই বিধানগুলো কোনো মহাজাগতিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে না, বরং এগুলো প্রমাণ করে যে তৎকালীন আইনি কাঠামোটি ছিল চরমভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিক এবং মানবিক ও প্রাণি অধিকারের প্রতি চরম উদাসীন।


আইনি বিশৃঙ্খলা ও নৈতিক দেউলিয়াত্বঃ অপরাধীর মুক্তি বনাম নিরপরাধের বলিদান

ইসলামি দণ্ডবিধির এই পুরো কাঠামোটি কেবল অমানবিকই নয়, বরং এটি একটি চরম আইনি বিশৃঙ্খলা ও স্ববিরোধিতায় পূর্ণ। আমরা যখন দেখি যে একই বিষয়ে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী বক্তব্যই নির্ভরযোগ্য হাদিসে বিদ্যমান, তখন এই ব্যবস্থার ‘ঐশ্বরিক’ বা ‘নিখুঁত’ হওয়ার দাবিটি খড়কুটোর মতো উড়ে যায়। একদিকে যেমন পশুকামী মানুষ এবং ওই পশু—উভয়কেই হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ঠিক তার বিপরীতে আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস থেকেই অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, এই অপরাধের জন্য ধর্ষণকারীর আসলে কোনো নির্দিষ্ট বা নির্ধারিত শাস্তির (হদ) বিধানই নেই।

যৌক্তিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই বৈপরীত্য এক ভয়াবহ প্রহসন। যে ব্যবস্থায় মূল অপরাধী মানুষের শাস্তির ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো নিশ্চয়তা নেই, অথচ নিরপরাধ পশুটিকে হত্যার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোরতা দেখানো হয়েছে, তাকে কোনোভাবেই ‘ন্যায়বিচার’ বলা চলে না। এটি এমন এক বিকৃত বিচারব্যবস্থা যেখানে নির্যাতনের শিকার হওয়া প্রাণীটিকে প্রাণ দিতে হয়, আর নির্যাতনকারী মানুষটি আইনি মারপ্যাঁচে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। যদি এই বিধানগুলো কোনো মহাজাগতিক ইনসাফ বা স্রষ্টার পক্ষ থেকে আসত, তবে প্রাণের বিনাশের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এমন আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকার কথা ছিল না। এটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন আইনি কাঠামোটি ছিল অত্যন্ত অপরিপক্ব এবং প্রাণি অধিকারের প্রতি চরম উদাসীন।

এর চেয়েও বড় নৈতিক পরাজয় হলো ইবনে আব্বাসের সেই যুক্তি—যেখানে তিনি পশুটিকে হত্যার কারণ হিসেবে কেবল ‘মাংস খাওয়ার অযোগ্যতা’র কথা বলেছেন। একটি জীবন্ত প্রাণীর অস্তিত্ব কেবল কি মানুষের উদরপূর্তির জন্য? যদি কোনো পশু খাওয়ার অযোগ্যও হয়ে পড়ে, তবে তাকে বাঁচিয়ে রাখা কেন নিষিদ্ধ হবে? এই দৃষ্টিভঙ্গিটি পরিষ্কার করে দেয় যে, শরিয়তি দর্শনে পশুকে একটি স্বতন্ত্র প্রাণের পরিবর্তে মানুষের ব্যবহারের ‘পণ্য’ হিসেবে দেখা হয়েছে। পণ্যটি ‘কলঙ্কিত’ বা ‘নষ্ট’ হয়ে গেলে তাকে ধ্বংস করে ফেলাই যেন একমাত্র সমাধান। এই আদিম ও নিষ্ঠুর মানসিকতা আধুনিক সভ্যতার আলোকপ্রাপ্ত কোনো মানুষ বা প্রাণি অধিকার রক্ষাকারীদের কাছে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।


উপসংহারঃ বিকৃত লালসার বলিদান ও ন্যায়বিচারের নৈতিক পরাজয়

পরিশেষে, পশুর সাথে যৌন সংসর্গের অপরাধে ওই অবোধ প্রাণটিকে হত্যার শরিয়তি বিধানটি কেবল একটি আইনি ত্রুটি নয়, বরং এটি প্রাণের প্রতি চরম অবজ্ঞা এবং নৈতিক দেউলিয়াত্বের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। আধুনিক প্রাণি অধিকারের দর্শনে পশুর সাথে মানুষের যৌন লালসা চরিতার্থ করাকে দেখা হয় ‘বেস্টিয়ালিটি’ (Bestiality) বা এক ধরণের নিষ্ঠুর যৌন নির্যাতন হিসেবে, যেখানে পশুটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক এক সত্তা বা ভিকটিম। অথচ ইসলামি দণ্ডবিধিতে এই নির্যাতিত ভিকটিমকেই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়। কোনো যুক্তিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় নির্যাতনের শিকার হওয়া একটি সত্তাকে তার ওপর ঘটা পাপাচারের কারণে ‘অশুভ’ বা ‘অপবিত্র’ ঘোষণা করে হত্যা করা—স্রেফ এক আদিম বর্বরতা ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।

ইবনে আব্বাসের দেওয়া যুক্তি—যেখানে তিনি কেবল মাংসের প্রতি ‘অভিরুচি’ বা ‘ঘৃণা’কে হত্যার কারণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন—তা প্রমাণ করে যে, এই বিধানে পশুর জীবনের কোনো স্বাধীন সত্তাগত মূল্য নেই। একটি জীবন্ত প্রাণের বেঁচে থাকার অধিকার কেবল কি মানুষের রসনাবিলাস বা ব্যবহারের উপযোগিতার ওপর নির্ভরশীল? যদি মানুষের লালসার কারণে পশুর মাংস খাওয়ার অযোগ্য হয়েও পড়ে, তবুও সেই প্রাণের স্পন্দন থামিয়ে দেওয়া কেবল মানুষের ‘অহম’ এবং ‘শুচিবায়ু’কে তুষ্ট করার এক পাশবিক পদ্ধতি। পশুকে স্রেফ একটি ‘কলঙ্কিত বস্তু’ হিসেবে গণ্য করে তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এই প্রবণতা সরাসরি প্রাণি অধিকারের আন্তর্জাতিক সনদের পরিপন্থী।

সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো আইনি শূন্যতা। যখন অন্য একটি সহীহ বর্ণনায় অপরাধী মানুষের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দণ্ড বা ‘হদ’ নেই বলে দাবি করা হয়, তখন এই পুরো বিচারপ্রক্রিয়াটি একটি হাস্যকর প্রহসনে পরিণত হয়। অর্থাৎ, মূল অপরাধী মানুষটি আইনি অস্পষ্টতার সুযোগে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, অবোধ পশুটির মৃত্যু অবধারিত। এটি এক ধরণের কাঠামোগত নিষ্ঠুরতা, যেখানে প্রাণের চেয়ে ‘প্রথা’ বড় এবং ন্যায়ের চেয়ে ‘ঘৃণা’ শক্তিশালী। সভ্য সমাজের উচিত এ ধরণের অমানবিক ও যুক্তিহীন বিধানগুলোকে বর্জন করে প্রতিটি প্রাণের জীবনের অধিকার নিশ্চিত করা এবং কোনো মানুষের বিকৃত লালসার দায় অন্য কোনো নিরপরাধ সত্তার ওপর না চাপানো।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৪০৫ ↩︎
  2. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৩৫৭৬ ↩︎
  3. সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), হাদিসঃ ১৪৫৫ ↩︎
  4. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৪৬৫ ↩︎