
Table of Contents
ভূমিকা
ইসলামি শরিয়তের ‘শাশ্বত নৈতিকতা’ ও ‘মানবিক শ্রেষ্ঠত্বের’ আকাশচুম্বী দাবিগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে যখন আমরা এর দাসপ্রথা এবং নাবালিকা যৌনচারের প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামোর দিকে দৃষ্টিপাত করি। তথাকথিত ‘শান্তির ধর্ম’ দাবি করা এই ব্যবস্থায় যুদ্ধবন্দিনী বা বাজার থেকে কেনা দাসীদের কেবল জড়বস্তু বা স্থাবর সম্পত্তির মতো বিবেচনা করা হয়নি, বরং তাদের চরমতম যৌন শোষণের হাতিয়ার হিসেবে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বীভৎস সত্যটি হলো, এই শোষণের হাত থেকে রেহাই পায়নি এমনকি দুগ্ধপোষ্য শিশু বা বয়ঃসন্ধিতে না পৌঁছানো নাবালিকা বালিকারাও। আধুনিক সভ্যতায় যা ‘পেডোফিলিয়া’ বা ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে গণ্য, ইসলামি ফিকহশাস্ত্রে তাকেই অত্যন্ত সুচারুভাবে ‘ইলাহি আইন’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
শরিয়তের এই আইনি কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কোনো আকস্মিক বিচ্যুতি নয়, বরং অত্যন্ত সচেতনভাবে নকশা করা একটি লৈঙ্গিক ও শ্রেণিবৈষম্যমূলক ব্যবস্থা। যেখানে একজন স্বাধীন নারীর সম্মান নিয়ে বাগাড়ম্বর করা হয়, সেখানেই ‘মালিকানাধীন’ (মিল্ক আল-ইয়ামিন) নাবালিকা দাসীর শরীরকে মালিকের কামবাসনা চরিতার্থ করার অবাধ চারণভূমি হিসেবে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এই প্রবন্ধের লক্ষ্য হলো ধ্রুপদী ইসলামি উৎস এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহগ্রন্থগুলোর আলোকে এটি উন্মোচন করা যে, কীভাবে নবীর সুন্নাহ এবং সাহাবীদের কর্মধারাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে শিশুদের ওপর এই প্রাতিষ্ঠানিক যৌন নিপীড়নকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। সেই আলোচনাতে যাওয়ার পূর্বে আসুন কাফের যুদ্ধবন্দী নারীদের গনিমতের মাল হিসেবে ভোগের কারণ কী তা একজন প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলারের মুখ থেকে শুনে নিই,
নাবালিকা দাসী ও ইস্তিবরাঃ যৌন লালসার আইনি ভিত্তি
ইসলামি ফিকহ অনুসারে, কোনো দাসী ক্রয়ের পর তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের আগে ‘ইস্তিবরা’ (জরায়ু গর্ভমুক্ত কি না তা নিশ্চিত করা) করা বাধ্যতামূলক। অত্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে, এই বিধান নাবালিকা বা অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যাদের এখনো ঋতুস্রাব (হায়েয) শুরু হয়নি বা বয়ঃসন্ধি আসেনি।
সুনান আদ-দারেমীর বর্ণনা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি এমন দাসী কিনে নেয় যে এখনো ঋতুপ্রাপ্ত হয়নি, তাহলে তার জরায়ু নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হয় [1]। ইমাম যুহরীর মতে এই সময় তিন মাস, আবার কারো মতে এক মাস [2]। এখানে মৌলিক প্রশ্ন উঠে—যে শিশু শারীরিকভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং যৌনক্রিয়ার জন্য সম্পূর্ণ অযোগ্য, তার জন্য কেন এই ইস্তিবরার নিয়ম? এর একমাত্র যৌক্তিক ব্যাখ্যা হলো, এই বিধান নাবালিকা দাসীর সাথে যৌন সম্পর্ককে আইনিভাবে বৈধ করে তোলার জন্যই প্রণীত। যদি নাবালিকার সাথে যৌনক্রিয়া নিষিদ্ধ হতো, তাহলে এই অপেক্ষার বিধানের কোনো প্রয়োজনই পড়ত না।
ফলে এই বিধান থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামি শরিয়তে নাবালিকা দাসীদের সাথে যৌনকর্ম সম্পূর্ণ হালাল বলে গণ্য। যুদ্ধবন্দী হিসেবে প্রাপ্ত বা বাজার থেকে কেনা ছোট বালিকাদের সাথে মুসলিম পুরুষরা ‘হালাল’ উপায়েই যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে পারতেন। এর চেয়ে নির্মম ও নির্লজ্জ বিধান আর কী হতে পারে তা কল্পনাতীত। এটি শিশুকামীদের জন্য একটি আইনি সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, যাতে তারা এই বিধানের আড়ালে তাদের প্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে পারে। এই অমানবিক নিয়মের শিকার হয়ে অসংখ্য নাবালিকা মেয়ে দীর্ঘদিন ধরে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে—এটি চিন্তা করলেই গভীর কষ্ট হয়। আসুন প্রথমে হাদিসগুলো দেখি [3] [4] [5]
সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি)
১. পবিত্রতা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ১২০. দাসীর ইসতিবরা’আ’
১২১২. আওযাঈ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি যুহরী রাহি. কে জিজ্ঞাসা করলাম যে, একটি লোক একটি দাসী ক্রয় করলো যে এখনো হায়েযে উপনীত হয়নি আর গর্ভধারণের মতো (বয়সও তার) হয়নি। এমতাবস্থায় সেই লোকটি কতদিন তার থেকে সম্পর্কহীন থাকবে? তিনি বললেনঃ তিন মাস।[1]
[1] তাহকিকঃ এর সনদ সহীহ।
তাখরীজঃ এটি ৯৫৬ (অনূবাদে ৯৫১) নং এ গত হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আওযায়ী (রহঃ)
সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি)
১. পবিত্রতা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ১২০. দাসীর ইসতিবরা’আ’
১২১৩. এবং ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাছীর বলেন, পঁয়তাল্লিশ দিন।[1]
[1] তাহকিকঃ এর সনদ সহীহ।
তাখরীজঃ এটি ৯৫৭ (অনূবাদে ৯৫২) নং এ গত হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাসীর (রহঃ)
সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি)
১. পবিত্রতা অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ১২০. দাসীর ইসতিবরা’আ’
১২১৪. ইয়াহইয়া ইবনু বাশার হতে বর্ণিত, ইকরিমাহ বলেন, এক মাস।[1]আব্দুল্লাহ কে জিজ্ঞেস করা হলো: এতদুভয়ের মধ্যে আপনার মত কোনটি? তিনি বললেন: তিনমাসই অধিকতর শক্তিশালী মত। আর একমাস যথেষ্ট।
[1] তাহকিক: রাবীগণ নির্ভরযোগ্য।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তঃ সাহাবীদের আচরণ ও অনুমোদন
নাবালিকা যুদ্ধবন্দিনী বা দাসীর সাথে যৌন সম্পর্কের বিষয়টি কেবল তাত্ত্বিক বা আইনি আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; ইসলামের প্রাথমিক যুগে এটি বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়েছে। এর একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ হলো নবীর জামাতা ও চতুর্থ খলিফা আলী ইবনে আবি তালিবের ঘটনা।
সহীহ বুখারীর একটি হাদিস ও প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘সহজ ইনআমুল বারী’ থেকে জানা যায় যে, আলী ইবনে আবি তালিব যুদ্ধবন্দিনী হিসেবে প্রাপ্ত একটি নাবালিকা বালিকার সাথে সহবাস করেছিলেন, যার তখনো ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার মতো বয়স হয়নি [6]। এই ঘটনা মুহাম্মদের জীবদ্দশায় এবং তাঁর জ্ঞাতসারে ঘটেছিল। ইসলামি নীতি অনুসারে, নবীর সামনে কোনো কাজ সংঘটিত হলে এবং তিনি তাতে কোনো নিষেধ বা প্রতিবাদ না করলে, সেটি স্বীকৃতি বা অনুমোদনের প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়। ফলে অপ্রাপ্তবয়স্ক দাসীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন মুহাম্মদের ধর্মীয় কাঠামোর অভ্যন্তরেই বৈধ বলে প্রতিষ্ঠিত হয়।
অর্থাৎ নবীর চাচাতো ভাই এবং একইসাথে নিজ জামাতা হযরত আলী নাবালিকা যুদ্ধবন্দী নারী ধর্ষণ করেছিলেন বলে জানা যায়। একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক যুদ্ধবন্দী নারীকে দেখে তিনি গনিমতের মাল ভাগাভাগির পূর্বেই মেয়েটিকে ভোগ করে, যা সকল মানবিক বিবেচনায় পরিষ্কার ধর্ষণ। সহজ ইনআমুল বারী যা সহিহ বুখারীর একটি ব্যাখ্যা গ্রন্থ, তা থেকে এই হাদিসটির ব্যাখ্যা যা জানা যায়, তাতে এই ঘটনাটি জানলে পিলে চমকে ওঠে। আলী আসলে যুদ্ধবন্দিনী হিসেবে অপ্রাপ্তবয়ষ্ক পিরিয়ড পর্যন্ত না হওয়া এক বালিকার সাথে সহবত করেছিল [7]
) وكُنتُ أبعْضُ عَلِيًّا وقد اغتسل
বিদ্বেষভাব পোষণ করতে লাগলাম): হযরত বুরাইদা (রযি.) হযরত আলীকে (রযি.) খুমুস থেকে এক বাঁদী নিজের জন্য নির্বাচন করত তার সাথে সহবাস করেছে জেনে তিনি তাঁর প্রতি অত্যন্ত রুষ্ট এবং অন্তরে বিদ্বেষভাব পোষণ করতে লাগলেন। কারণ, তিনি এটাকে আত্মসাৎ মনে করেন, যা শরয়ী দলীল দ্বারা নিষিদ্ধ।
আল্লামা খাত্তাবী বলেন, এ হাদীসের উপর দু’টি প্রশ্ন হয়। (১) গর্ভমুক্ততা
যাচাই (ইস্তেবরা) ব্যতিরেকে বাঁদীর সাথে সহবাস কিভাবে বৈধ হল? (২) বাঁদীকে নিজের জন্য নির্বাচন করা কিভাবে বৈধ হল?
প্রথম প্রশ্নের দু’জওয়াব হতে পারে: (১) বাঁদীটি নাবালেগা ছিল, বিধায়
গর্ভমুক্ততা যাচাইয়ের প্রয়োজন হয়নি। (২) হযরত আলী তাকে নির্বাচনকালে তার মিন্স (হায়েজ) চলছিল। এর একদিন এক রাতের পর সে হায়েজ থেকে পবিত্র হলে তিনি তার সাথে সহবাস করেন। আর দ্বিতীয় প্রশ্নের জওয়াব হলো, গনীমতের মাল প্রাপকদের মধ্যে বণ্টন ও আমীরের নিজের জন্য মাল নির্বাচন করে নেয়া যেরূপভাবে আমীরের জন্য জায়েয, তদ্রূপ নায়েবে আমীরের জন্যও জায়েয।
লামিউদ দারারী গ্রন্থে আছে, হাদীসে এমন কোন বিবরণ নেই, যার থেকে বুঝা
যায় যে, হযরত আলী (রযি.) গর্ভমুক্ততা যাচাই ব্যতিরেকে সহবাস করেছেন। অতএব হতে পারে, গর্ভমুক্ততা যাচাই করত কিছুদিন তথা এক মিন্সকালীন সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তিনি সহবাস করেন। এ সেই বাঁদী, যার গর্ভে পরবর্তীতে মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়াহ (রহ.)-এর জন্ম হয়।
আল্লামা কস্তলানী বলেন, এ হাদীস দ্বারা নবীর (স.) কন্যার বর্তমানে শয্যাশায়িনী বানাতে বাঁদী নির্বাচন ও তা ব্যবহার করার বৈধতা প্রমাণিত হয়। বিবাহ এর বিপরীত।
কেননা তা জায়েয নেই।


এই ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্পষ্ট করে যে, নাবালিকা দাসীদের সাথে যৌন সম্পর্ক কেবল ফিকহের তাত্ত্বিক বিধান নয়, বরং সাহাবীদের বাস্তব আচরণ এবং নবীর নীরব অনুমোদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত প্রথা ছিল।
ফিকহ শাস্ত্রের চূড়ান্ত মোহর: আলমগীরী ও হিদায়া
পরবর্তী যুগের ইসলামি ফিকহবিদরা এই প্রথাকে আরও সুসংগঠিত ও আইনি রূপ দিয়েছেন। হানাফী মাযহাবের অন্যতম প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী’ সরাসরি নাবালিকা দাসীর সাথে সহবাসের বৈধতা এবং পরবর্তী ইদ্দত পালনের নিয়ম বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছে [8]।
যুদ্ধবন্দিনী বা ক্রয়কৃত নাবালিকা দাসীর ক্ষেত্রে সহবাসকে সম্পূর্ণ বৈধ বলে গণ্য করা হয়েছে। কোনো কোনো মত অনুসারে, নাবালিকা যুদ্ধবন্দিনীর সাথে ভাগ-বাটোয়ারা বা ইদ্দত পালন ছাড়াই সরাসরি সহবাস করা যায়—যেমনটি আলীর ঘটনায় দেখা গেছে। অন্য মতে, দেড় মাস বা এক মাস অপেক্ষার পর নাবালিকার সাথে যৌনকর্ম বৈধ হয়ে যায়। এই বিধানগুলো ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীতে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত [9]
( গায়াতুল বয়ান ) কোন নাবালিগ দাসীকে যদি সহবাসের পর তালাক দেওয়া হয় , তবে তার ইদ্দত দেড় মাস হবে।

অপ্রাপ্তবয়স্কা বা সহবাসে শারীরিকভাবে অক্ষম নাবালিকা দাসীর ক্ষেত্রেও ইস্তিবরার পর সহবাসের বৈধতা স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘আশরাফুল হিদায়া’ গ্রন্থে [10]
ইসতিবরা করা ক্রেতার উপর ওয়াজিব, বিক্রেতার উপর নয়। কেননা এর মূল কারণ হলো দাসীর সাথে সহবাসের ইচ্ছা করা। আর তা ক্রেতাই করে থাকে, বিক্রেতা করে না। অতএব, ক্রেতার উপরই ইসতিবরা তথা জরায়ু পবিত্র করা ওয়াজিব। তবে সহবাসের ইচ্ছা একটি গোপন বিষয়, তাই ইসতিবরা এর হুকুম আবর্তিত হবে এর দলিলের উপর। আর সে দলিল হলো সহবাস করার বৈধ কর্তৃত্ব। এ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় মালিকানা ও দখলের দ্বারা। আর তাই কর্তৃত্বকেই কারণ বা সবব সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং বিষয়টিকে সহজ করার জন্য হুকুম উক্ত কর্তৃত্বের সাথেই আবর্তিত হবে। সুতরাং ইসতিবরা করার সবব হলো দাসীর সত্তার মালিকানা যা দখলের মাধ্যমে মজবুত হয়েছে। এ হুকুম মালিকানার অন্যান্য সববের দিকে সম্প্রসারিত হবে। [ মালিকানার অন্যান্য সবব ] যেমন- ক্রয়, দান, অসিয়ত, মিরাস, খুলা ও কিতাবাত ইত্যাদি। অনুরূপভাবে ক্রেতার উপর ইসতিবরা ওয়াজিব হবে যদি সে দাসীকে কোনো শিশুর মাল থেকে অথবা কোনো মহিলার মাল থেকে, অথবা [ ব্যবসায়ে অনুমতিপ্রাপ্ত ] কোনো দাস থেকে কিংবা এমন ব্যক্তি থেকে ক্রয় করে যার জন্য সেই দাসীর সাথে সহবাস করা হালাল নয়। অনুরূপভাবে যদি ক্রয়কৃত দাসীটি সহবাসে অযোগ্য কুমারী হয় তবুও [ ইসতিবরা করা ওয়াজিব হবে ]; সবব পাওয়া যাওয়ার কারণে। আর হুকুমসমূহ সববসমূহের সাথেই আবর্তিত হয়, হিকমত বা রহস্যসমূহের সাথে নয়। কেননা হিকমত গোপন থাকে। সুতরাং জরায়ুতে বীর্য থাকার ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকলেও সবব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে ধর্তব্য হবে।
মুসান্নিফ (র .) বলেন, যেসব দাসী মাস গণনার মাধ্যমে ইদ্দত পালন করতে হয় অর্থাৎ বয়সের স্বল্পতার কারণে এখনো যাদের হায়েয শুরু হয়নি কিংবা অধিক বয়সের কারণে হায়েয বন্ধ হয়ে গেছে এমন দাসী যদি কারো অধিকারে আসে তাহলে সে দাসীর গর্ভাশয় পবিত্র বলে সাব্যস্ত হবে এক মাস অতিক্রান্ত হওয়ার দ্বারা। কেননা এসব মহিলার ক্ষেত্রে একমাসকে এক হায়েযের স্থলবর্তী এবং তিন মাসকে তিন হায়েযের স্থলবর্তী সাব্যস্ত করা হয়েছে ।


‘আশরাফুল হিদায়া’ গ্রন্থে এই যৌন দাসত্বের আইনি ভিত্তি আরও নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়েছে:
| বিষয় | বিধান (ফিকহ অনুযায়ী) |
| নাবালিকা দাসীর সাথে সহবাস | সম্পূর্ণ বৈধ ও হালাল |
| ঋতুস্রাব না হওয়া বালিকার ইস্তিবরা | ১ মাস থেকে ৩ মাস (মতভেদ আছে) |
| আইনি বৈধতার ভিত্তি | মালিকানা ও দখল (Milk-e-Yamin) |
নৈতিক ও যৌক্তিক বিচার
যখন ইসলামকে উচ্চকণ্ঠে “সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বোত্তম, অভ্রান্ত ও চিরন্তন জীবনব্যবস্থা” হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তখন নাবালিকা দাসীদের সাথে যৌন সম্পর্কের এই প্রাতিষ্ঠানিক, আইনি ও ধর্মীয় বৈধতা সেই দাবিকে নির্মমভাবে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। এই বিধান কোনো ঐশ্বরিক নৈতিকতা, মানবতার উচ্চ আদর্শ বা সর্বজনীন সুবিচারের প্রতিফলন নয়—এটি একটি নির্মম, পুরুষতান্ত্রিক, যুদ্ধ-কেন্দ্রিক ও দাসপ্রথা-নির্ভর সমাজের নোংরা বীভৎস প্রতিচ্ছবি, যেখানে যুদ্ধবন্দী বা কেনা ছোট ছোট মেয়েদের—যাদের বয়স এখনো ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার মতো হয়নি—যৌন পণ্য হিসেবে ব্যবহার করার জন্য সরাসরি ধর্মীয় ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
আধুনিক মানবাধিকার, শিশু অধিকার সনদ (UNCRC), সম্মতির ন্যূনতম বয়সের আইন, এবং শিশু যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী ঐকমত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিধানকে আর কোনো নামে ডাকা যায় না—এটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত শিশু ধর্ষণ, লিগালাইজড পেডোফিলিয়া, এবং ধর্মীয় আইনের আড়ালে শিশু যৌন দাসত্ব। এখানে যৌন সম্পর্কের জন্য দাসীর সম্মতি, তার মানসিক-শারীরিক পরিপক্কতা, তার বয়স, তার নিজস্ব ইচ্ছা, তার ব্যথা বা ভয়—কোনো কিছুই বিবেচ্য নয়। একমাত্র মালিকানা (Milk-e-Yamin) এবং দখলই যথেষ্ট। অর্থাৎ একটি শিশু মেয়েকে যদি যুদ্ধে বন্দী করে আনা হয় বা বাজার থেকে কেনা হয়, তাহলে তার শরীরের উপর পুরোপুরি যৌন কর্তৃত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে মালিকের হাতে চলে আসে—এবং সেই কর্তৃত্বকে আল্লাহর হুকুম বলে ঘোষণা করা হয়।
ইসলামের ইতিহাসে যুগে যুগে এই বিধানের শিকার হয়েছে অগণিত অসহায় শিশুকন্যা। যারা এখনো খেলতে শেখেনি, যাদের শরীর এখনো কী ঘটছে তা বোঝে না, যাদের মনে ভয় আর অজানা আতঙ্ক ছাড়া কিছু নেই—তাদেরকে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষেরা “হালাল” উপায়ে বারবার ধর্ষণ করেছে, তাদের শৈশব ছিনিয়ে নিয়েছে, তাদের শরীর ও মন চিরতরে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। সেইসব মেয়েরা কাঁদতে কাঁদতে, চিৎকার করে, ব্যথায় ছটফট করতে করতে, অসহায়ভাবে সহ্য করেছে—কারণ তাদের মালিকের কাছে এটি “হারাম” নয়, বরং “হালাল” এবং “সুন্নাহ-সম্মত”। এই অপরাধের জন্য কোনো বিচার নেই, কোনো শাস্তি নেই—কারণ ধর্ম এবং খোদ আল্লাহ পাক নিজেই এটিকে অনুমোদন করেছে।
যে ধর্ম এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে, যেখানে একটি শিশুর শরীরের উপর পুরুষের যৌন অধিকারকে “ঐশ্বরিক অধিকার” বলে ঘোষণা করা হয়—সেই ধর্ম কীভাবে “মানবতার শ্রেষ্ঠতম পথ” হতে পারে? এটি কোনো সর্বজনীন, অমর নৈতিকতার উৎস নয়। এটি সপ্তম শতাব্দীর আরব উপদ্বীপের যুদ্ধলব্ধ দাসী-ব্যবসা, পুরুষের অপরিসীম যৌনলিপ্সা এবং শিশু-নারীর প্রতি নির্মম অবজ্ঞার একটি সরাসরি প্রতিফলন। পরবর্তী ফিকহবিদরা সেই বর্বরতাকে গ্রন্থে গ্রন্থে সুন্দর করে সাজিয়ে, আরবি শব্দে মোড়ক পরিয়ে, “ইস্তিবরা”, “মিল্কে ইয়ামিন”, “হুকুম” ইত্যাদি শব্দ দিয়ে একে “শরিয়ত” বানিয়ে ফেলেছেন।
আজ যখন আমরা সেইসব অজস্র নাম-না-জানা শিশুকন্যাদের কথা ভাবি—যারা কাঁদতে কাঁদতে মরে গেছে, যাদের শৈশব ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে, যাদের শরীরে চিরকালের ক্ষত রেখে দেওয়া হয়েছে, যাদের কণ্ঠ আর কখনো হাসেনি—তখন হৃদয় ছিঁড়ে যায়। এবং সেইসঙ্গে প্রশ্ন জাগে: যে ধর্ম এই অমানবিকতাকে “আল্লাহর হুকুম” বলে ঘোষণা করে, সেই ধর্ম কি সত্যিই মানুষের মুক্তির পথ? নাকি এটি ক্ষমতা ও লালসার একটি নিষ্ঠুর হাতিয়ার, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসংখ্য শিশুর জীবন ধ্বংস করে এসেছে?
এই বিধানের সামনে “ইসলাম মানবতার ধর্ম” বলে যে দাবি করা হয়, তা আর কখনো মুখে আনা উচিত নয়। কারণ যে ধর্ম শিশুর শরীরকে যৌন দাসত্বের জন্য বৈধ করে, সে ধর্ম মানবতার খুব পরিষ্কার শত্রু।
উপসংহার
নাবালিকা দাসীদের সাথে যৌন সম্পর্কের এই বিধান এবং তার আইনি-ঐতিহাসিক প্রয়োগ ইসলামি শরিয়তের একটি অত্যন্ত অন্ধকার ও বিতর্কিত দিককে উন্মোচিত করে। যে ধর্মকে সর্বজনীন, শাশ্বত ও মানবতার শ্রেষ্ঠ পথ বলে দাবি করা হয়, তার মধ্যে এমন বিধানের অস্তিত্ব—যা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের যৌন পণ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্য মালিকানার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ বৈধতা প্রদান করে—সেই দাবিকে চরমভাবে অসার প্রমাণ করে।
এই বিধানগুলো কোনো অতিমানবীয় বা ঐশ্বরিক নৈতিকতার ফসল নয়। বরং এগুলো সপ্তম শতাব্দীর আরব সমাজের যুদ্ধ, দাসব্যবসা, পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা ও যৌন লালসার একটি সরাসরি প্রতিফলন—যা পরবর্তী ফিকহবিদরা গ্রন্থে গ্রন্থে সুসংগঠিত করে একটি ‘ধর্মীয় আইন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ইস্তিবরা, মালিকানা-ভিত্তিক কর্তৃত্ব, সাহাবীদের বাস্তব আচরণ এবং নবীর নীরব অনুমোদন—সব মিলিয়ে এটি প্রমাণ করে যে, শরিয়তের এই অংশ মানব-নির্মিত, পরিবেশ-নির্ভর এবং সময়-সাপেক্ষ, কোনো সর্বকালীন অভ্রান্ত নৈতিক কাঠামো নয়।
আধুনিক বিবেক ও মানবাধিকারের আলোয় এই বিধানগুলোকে যখন পর্যালোচনা করা হয়, তখন স্পষ্ট হয় যে এগুলো কেবল অমানবিকই নয়, বরং শিশু নির্যাতনের প্রাতিষ্ঠানিককরণের একটি উদাহরণ। যে সমাজ বা ধর্ম এমন নিয়মকে বৈধতা দেয়, তার ‘আসমানি’ ও ‘পূর্ণতম’ দাবি যৌক্তিকভাবে টিকে থাকতে পারে না। এই ঘটনা ও বিধানগুলো আমাদেরকে বাধ্য করে প্রশ্ন করতে: সত্যিকারের ঐশ্বরিক নির্দেশ কি এমন অমানবিকতাকে অনুমোদন করতে পারে?
তথ্যসূত্রঃ
- সুনান আদ-দারেমী, হাদিসবিডি, হাদিসঃ ১২১২ ↩︎
- সুনান আদ-দারেমী, হাদিসবিডি, হাদিসঃ ১২১৪ ↩︎
- সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি), হাদিসঃ ১২১২ ↩︎
- সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি), হাদিসঃ ১২১৩ ↩︎
- সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি), হাদিসঃ ১২১৪ ↩︎
- সহজ ইনআমুল বারী, মাগাযী ও তাফসীর অংশ, পৃষ্ঠা ২২৭, ২২৮ ↩︎
- সহজ ইনআমুল বারী, শরহে বুখারী মাগাযী ও তাফসীর অংশ, অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ মাওলানা মুহাম্মদ আলমগীর হুসাইন, মাকতাবায়ে এমদাদিয়া প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২২৭, ২২৮ ↩︎
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৩৯ ↩︎
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৩৯ ↩︎
- আশরাফুল হিদায়া, ইসলামিয়া কুতুবখানা, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১৫, ৬৩৮ ↩︎
