
Table of Contents
ভূমিকা
আধুনিক দুনিয়ায় “দাসপ্রথা” কোনো ধোঁয়াটে নৈতিক বিতর্ক নয়—এটি ব্যক্তি-স্বাধীনতা, দেহের ওপর মালিকানা, শ্রম-শোষণ, এবং যৌন-নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দেওয়ার একেবারে বাস্তব কাঠামো। আন্তর্জাতিক আইনে দাসত্বকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এমন এক “অবস্থা” হিসেবে, যেখানে কোনো মানুষের ওপর মালিকানাসংশ্লিষ্ট ক্ষমতার (ownership-like powers) আংশিক বা পূর্ণ প্রয়োগ করা হয়। এই সংজ্ঞার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো: দাসত্ব শুধু পুরোনো বাজারে “দাস কেনাবেচা” নয়—বরং কাউকে মানুষের মর্যাদা থেকে নামিয়ে “সম্পত্তি-সদৃশ” অবস্থায় ঠেলে দেওয়ার যেকোনো কাঠামোই দাসত্বের ধারায় পড়ে। একইভাবে আধুনিক “ফোর্সড লেবার/জোরপূর্বক শ্রম”ও—যা আধুনিক দাসত্বের বড় অংশ—আন্তর্জাতিক শ্রমমানদণ্ডে অপরাধ হিসেবে দমনযোগ্য।
এই প্রেক্ষাপটে “আধুনিক যুগে দাসপ্রথা বৈধ”—এমন ইসলামিক ফতোয়া বা ধর্মীয় মতামত কেবল ‘ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা’ নয়; এটি একধরনের নর্মেটিভ লাইসেন্স—যা ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, এবং ন্যূনতম নৈতিক সাধারণবুদ্ধির সঙ্গে সংঘর্ষে যায়। সমর্থকেরা সাধারণত তিনভাবে যুক্তি সাজান: (১) “শরিয়াহর পাঠ্য-ভিত্তিক অনুমোদন আছে”—অতএব নীতিগতভাবে বৈধ, (২) “শর্তসাপেক্ষ/মানবিকীকরণ করে রাখা যায়”—অতএব নিষিদ্ধ নয়, (৩) “ইসলাম ধাপে ধাপে মুক্তির দিকে গেছে”—অতএব আজকের নিষেধাজ্ঞা ঐতিহাসিকভাবে অনুমোদনযোগ্য। কিন্তু এই তিনটি পথেই একটি মৌলিক সমস্যা রয়ে যায়: মানুষকে ‘মালিকানাধীন বস্তু’ হিসেবে কল্পনা করার নীতিটিই যদি ধর্মীয় আইনতত্ত্বে “চির-সম্ভব” (perennially permissible) হিসেবে টিকে থাকে, তবে তা আধুনিক মানবসমাজের নৈতিক-আইনগত ভিত্তির সঙ্গে শুধু অমিল নয়—এটি সরাসরি বিপজ্জনক।
এই বিপদের বাস্তব দৃষ্টান্তও আছে। সাম্প্রতিক জিহাদি গোষ্ঠীগুলো (যেমন আইএস/ISIS) দাসত্ব ও যৌনদাসত্বকে “ধর্মীয়ভাবে বৈধ” দেখাতে পৃথক পুস্তিকা/যুক্তি ব্যবহার করেছে—যেখানে ‘কনকুবিনেজ/ডান হাতের মালিকানা’ ইত্যাদি ধারণাকে নৈতিক সুবিধা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ, “এগুলো শুধু অতীতের কথা”—এই প্রতিরক্ষা এখানে টেকে না; কারণ বাস্তবে দেখা যায়, যে মুহূর্তে ধর্মীয় ভাষায় বৈধতার দরজা খোলা রাখা হয়, সেই দরজা দিয়েই আধুনিক সহিংস রাজনীতি-অর্থনীতি ঢুকে পড়ে।
সুতরাং, আধুনিক যুগে দাসপ্রথার বৈধতার পক্ষে ফতোয়া—যে নামেই আসুক—তার কেন্দ্রে আছে একটি গভীর নৈতিক অসঙ্গতি: মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, অধিকারহীন “বস্তু/সম্পত্তি” হিসেবে ভাবার অনুমতি। এই প্রবন্ধের লক্ষ্য সেই অসঙ্গতিরই নির্মম বিশ্লেষণ: কোন যুক্তি দিয়ে এসব ফতোয়া দাঁড় করানো হয়, সেই যুক্তিগুলো কোথায় আত্মবিরোধী, এবং কেন “শর্তসাপেক্ষ মানবিক দাসত্ব” ধারণাটিই নৈতিকভাবে অকেজো—কারণ দাসত্ব মানেই অধিকারহরণ, সম্মতির ধ্বংস, এবং ক্ষমতার একতরফা আধিপত্য।
সালেহ আল ফাওযানের ফতোয়া
ইসলামের সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদ থেকে খুব পরিষ্কারভাবেই ইসলামে জিহাদ ও কাফেরদের দাসে পরিণত করার বৈধতার কথা অসংখ্যবার উল্লেখ করা হয়েছে। দাস প্রথা যে ইসলামে সম্পূর্ণ বৈধ একটি বিষয়, সে সম্পর্কে কোন দ্বিমত কোন বড় আলেমের মধ্যেই নেই। সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ইসলামিক আলেম শায়েখ সালেহ আল-ফাওজান হচ্ছেন সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ধর্মীয় সংস্থা “ঊর্ধ্বতন উলামা পরিষদ”-এর একজন সদস্য যা ধর্মীয় ব্যাপারে বাদশাহকে উপদেশ প্রদান করে থাকে। ইসলামী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদান স্থায়ী কমিটি “ঊর্ধ্বতন উলামা পরিষদ” সারা পৃথিবীতে স্বীকৃত একটি ইসলাম বিষয়ক পরিষদ। এই পরিষদটি ঊর্ধ্বতন ধর্মতত্ত্ববিদের দ্বারা ইসলামী আইন বা ফিকাহ-এর বিষয় ও বিধিবিধান এবং গবেষণা পত্র প্রণয়ন করে থাকে। তিনি যা বলেছেন, তা ইংরেজিতে অনুবাদ করলে হয় [1] –
“Slavery is a part of Islam. Slavery is part of jihad, and jihad will remain as long there is Islam.”

শাইখ সালেহ আল ফাওজানের কথাটি ইংরেজি থেকে বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায়-
দাসপ্রথা ইসলামের অঙ্গ। দাসপ্রথা জিহাদেরও অঙ্গ, এবং যতদিন ইসলাম ধর্ম থাকবে ততদিন জিহাদও থাকবে।
ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত
ইদানিংকালের অনেক অজ্ঞ মুসলিমই হুট করে কোন দলিল ছাড়াই দাবী করে বসে যে, ইসলাম নাকি দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করেছে! প্রমাণ হিসেবে তারা বলে থাকে, বর্তমানে কোথাও তো দাসদাসী পাওয়া যায় না। এটিই নাকি প্রমাণ করে, ইসলামে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ! কিন্তু ইসলামি শরীয়তে দাসদাসীর বিধান থাকার পরেও এখন আর দাসদাসী পাওয়া যায় না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত বইটি থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর পড়তে হবে, যেখানে একজন প্রখ্যাত মুফতি ইসলামের আলোকে প্রশ্নটির উত্তর দিচ্ছেন [2] –


সূরা মুহাম্মদঃ দাস প্রথা রহিত হয়নি
অনেক মুসলিম আবার সূরা মুহাম্মদের একটি আয়াত দেখিয়ে প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন যে, ইসলামে নাকি দাস বানানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আসুন সূরা মুহাম্মদের তাফসীর পড়ে নিই মা’আরেফুল কোরআন গ্রন্থ থেকে [3] –

আধুনিক আলেমদের বক্তব্য
এবারে আসুন দাসপ্রথা এবং দাসদাসী সম্পর্কে বাঙলাদেশের আলেমদের বক্তব্য শুনে নেয়া যাক,
উপসংহার
আধুনিক যুগে দাসপ্রথাকে বৈধ বলে যে ইসলামিক ফতোয়া বা মতামত হাজির করা হয়, সেগুলো শেষ পর্যন্ত একটি কথাই বলে—মানুষের ওপর মালিকানাসদৃশ কর্তৃত্ব ইসলামিক বিধান অনুসারে নীতিগতভাবে সম্ভব। এখানেই মূল বিপর্যয়: আপনি যতই “ভালো আচরণ”, “খাদ্য-বাসস্থান”, বা “নিয়মকানুন” যোগ করুন না কেন, দাসত্বের কাঠামোটি দাঁড়িয়ে থাকে অধিকার-অসাম্য ও কর্তৃত্বের একচেটিয়া ক্ষমতা-র ওপর। আন্তর্জাতিক আইনে দাসত্বকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে—“মালিকানাসংশ্লিষ্ট ক্ষমতার প্রয়োগ”—সেটি এই বাস্তবতাকেই ধরেছে। একইভাবে জোরপূর্বক মানুষকে দাসে পরিণত করার যে ইসলামিক মানদণ্ড—তা দেখায় আধুনিক বিশ্ব কেন এই ধরনের ক্ষমতাকাঠামোকে আর “নৈতিক বিকল্প” হিসেবে মানে না।
এই ফতোয়াগুলোর আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো—এগুলো প্রায়শই ‘পাঠ্য-নিষ্ঠতা’ (textual fidelity) দেখিয়ে নৈতিক প্রশ্নকে দমন করে, যুক্তি বুদ্ধি এবং মানুষের স্বাভাবিক বিবেক বিবেচনা ব্যবহার ধর্মের ভয় দেখিয়ে বন্ধ করে। কিন্তু নৈতিকভাবে সেটাই সবচেয়ে দুর্বল জবাব: যদি কোনো ধর্মীয় আইনতত্ত্ব মানব শরীরকে সম্পত্তি ভাবার দরজা খোলা রাখে, তবে ওই আইনতত্ত্বের “নৈতিক সার্বজনীনতা” দাবি নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বাস্তব ইতিহাসও দেখায়—দাসত্ব ইসলামী আইন-সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল, এবং বিভিন্ন সমাজে তা বিলোপ/নিষেধাজ্ঞা আসতে গিয়ে বড় নৈতিক-আইনগত টানাপোড়েন তৈরি করেছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—“আজ দাসত্ব নেই” বলা আর “নীতিগতভাবে দাসত্ব হারাম” বলা এক জিনিস নয়। প্রথমটি কেবল সেক্যুলার ও মানিবাধিকারের সামাজিক বাস্তবতা; দ্বিতীয়টি নৈতিক অবস্থান। আইএস/ISIS-এর মতো উদাহরণ দেখিয়েছে—নীতিগত দরজা খোলা থাকলেই সেটি আবার “পুনর্জীবিত” করার চেষ্টা হতে পারে, এবং সেটি কেবল তত্ত্ব নয়—মাঠের ভয়াবহতা।
অতএব এই আলোচনার যৌক্তিক পরিণতি পরিষ্কার: আধুনিক যুগে দাসপ্রথার বৈধতা-দেওয়া ফতোয়া কোনো “বিকল্প মত” নয়; এটি মানব-মর্যাদার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একটি নর্মেটিভ অবস্থান, যা নৈতিকভাবে ভয়াবহ এবং সামাজিকভাবে বিপজ্জনক। ন্যূনতম বুদ্ধিবৃত্তিক সততা থাকলে ধর্মীয় আইনতত্ত্বকে এখানে দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করতে হবে হবে—আমরা দাসত্বকে কেবল ‘ঐতিহাসিকভাবে ঘটেছে’ বলে স্বীকার নয়, বরং ‘নীতিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করছি। কারণ মানুষকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জায়গায় যদি ধর্মীয় ব্যাখ্যা এসে থেমে যায়, তবে সেটি আর নৈতিকতার ভাষা থাকে না—তা কেবল ক্ষমতার ভাষায় পরিণত হয়।
তথ্যসূত্রঃ
- Author of Saudi Curriculums Advocates Slavery ↩︎
- ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত, ১২শ খণ্ড, ফকীহুল মিল্লাত ফাউন্ডেশন, ফকীহুল মিল্লাত মুফতি আবদুর রহমান, পৃষ্ঠা ২৯২, ২৯৩ ↩︎
- তাফসীরে মা’আরেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফী উসমানি, অনুবাদঃ মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬,৭ ↩︎
