ইসলামে জন্মসূত্রে দাসদাসী হওয়া ও বংশগত দাসত্বের শরীয়তি আইনি কাঠামো

ভূমিকাঃ জন্মগত অধিকার বনাম মালিকানাধীন গর্ভ

মানবাধিকারের আধুনিক সংজ্ঞায় প্রতিটি শিশু জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং তার শরীরের ওপর কোনো বাহ্যিক মালিকানা অগ্রহণযোগ্য। তবে ইসলামি ফিকহশাস্ত্র ও শরিয়তি বিধানের ব্যবচ্ছেদ করলে এক ভয়াবহ ও অমানবিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে মানুষের প্রজনন ক্ষমতাকে নিছক গবাদি পশুর বংশবৃদ্ধির সমান্তরালে নামিয়ে আনা হয়েছে। ইসলামি আইনে একজন ক্রীতদাসীর গর্ভ কেবল একটি মানবীয় প্রজনন প্রক্রিয়া নয়, বরং তা মালিকের জন্য নতুন ‘সম্পদ’ উৎপাদনের একটি মাধ্যম বা ফ্যাক্টরি হিসেবে বিবেচিত। পশুপালনের ক্ষেত্রে মালিক যেমন অধিকতর মুনাফার আশায় উন্নত জাতের গরু ভেড়ার প্রজনন ঘটান, ইসলামি ব্যবস্থায় দাসীর প্রজনন এবং তার গর্ভজাত সন্তানের ভাগ্যকেও মালিকের বৈষয়িক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের অধীনস্থ করা হয়েছে।

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিকটি হলো ‘বংশগত দাসত্ব’। একটি নবজাতক শিশু তার কোনো ব্যক্তিগত দায় বা অপরাধ ছাড়াই কেবল দাসীর গর্ভে জন্ম নেওয়ার কারণে জন্মমুহূর্ত থেকেই দাসে পরিণত হয়। এখানে শিশুর সত্তাগত স্বাধীনতার চেয়ে মায়ের ওপর মালিকের ‘মালিকানা স্বত্ব’ (Ownership Right) বেশি প্রাধান্য পায়। এমনকি দাসীর স্বামী অন্য কেউ হলেও, সেই সন্তানের নিরঙ্কুশ মালিকানা বর্তায় দাসীর মালিকের ওপর। এই বিশ্লেষণে আমরা দেখব, কীভাবে ইসলামি আইন একটি শিশুর মৌলিক পরিচয় ও মানবাধিকারকে অস্বীকার করে তাকে একটি ‘অস্থাবর সম্পদে’ রূপান্তর করেছে এবং কীভাবে এই প্রথা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও ঐশ্বরিক রূপ দান করেছে।


ইসলামি শরীয়তের বিধানঃ গর্ভের সন্তানও যখন বিক্রয়যোগ্য পণ্য

ইসলামি শরীয়ত অনুসারে, দাসীকে যদি তার মালিক মুদাব্বার বা মালিকের মৃত্যুর পরে মুক্ত হবে এমন ঘোষণা না করে, তাহলে সেই দাসীর গর্ভে মালিক ভিন্ন অন্য কারো সন্তান জন্ম হলে সেই সন্তান মালিকের দাস বলে গণ্য হবে। আসুন এক এক করে আমরা ইসলামিক শরীয়তের দলিলগুলো দেখি।

ফিকহে ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুঃ দাসীর সন্তানও দাসদাসী

[1]। আপনারা কল্পনা করতে পারেন, একটি শিশু, যে মাত্র জন্ম নিলো, জন্ম নেয়ার সাথে সাথেই সে দাসে পরিণত হলো!

[২.২] মুদাব্বার: এমন গোলাম বা বাঁদীকে মুদাব্বার বলা হয় যার মুক্তি মনিবের মৃত্যু পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখা হয়। যেমন, মনিব বললেন-‘আমার মৃত্যুর পর তুমি মুক্ত হয়ে যাবে।’ এ ধরনের গোলাম বাঁদী মনিবের মৃত্যুর সাথে সাথে মুক্ত বলে গণ্য হয়।
যদি মুদাব্বার বিবাহিত বাঁদী হয় এবং তাকে মুদাব্বার ঘোষণার পূর্বে তার সন্তানাদি থাকে তারা মালিকের গোলাম বাঁদী হিসেবেই গণ্য হবে। তবে মুদাব্বার ঘোষণার পর যদি ঐ বাঁদীর সন্তানাদি হয় তারাও তার সাথে মুক্ত হয়ে যাবে। আবদুর রহমান ইবনু ইয়াকুব যিনি বানু যুহাইনা গোত্রের এক শাখা বানু হিরকার মুক্ত ক্রীতদাস ছিলেন-বর্ণনা করেন, আমার দাদীর মনিব তার এক গোলামের সাথে আমার দাদীকে বিয়ে দেন। অতপর তাকে মুদাব্বার ঘোষণা করেন। মুদাব্বার ঘোষণার পর তার গর্ভে এক সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তার কিছুদিন পর আমার দাদীর মনিব ইন্তিকাল করেন। যার ফলে তিনি মুক্ত হয়ে যান। তিনি মুক্ত হয়ে তার সন্তানকে মুক্ত ঘোষণা করার দাবীতে হযরত ওসমান (রা)-এর দরবারে মামলা দায়ের করেন। এ মামলার রায়ে হযরত ওসমান (রা) ঘোষণা করেন-‘যে সন্তান তাকে মুদাব্বার ঘোষণা করার পূর্বে জন্মগ্রহণ করেছে তারা গোলাম বাঁদী হিসেবেই পরিচিত হবে। আর মুদাব্বার ঘোষণার পর যে সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে সে মায়ের সাথে সাথে মুক্ত হয়ে যাবে।’ ৫

জন্ম
জন্ম 1

ফিকাহুস সুন্নাহঃ জন্ম নেয়া সন্তান পরাধীন দাস

একইসাথে আসুন জেনে নিই, মালিক ভিন্ন অন্য কারো দ্বারা দাসীর গর্ভজাত সন্তান যে জন্মগতভাবে দাস হবে, সেটি ফিকাহুস সুন্নাহ গ্রন্থ থেকে পড়ে নিই [2]

এই ছবিতে একটি খালি Alt ট্যাগ রয়েছে; এর ফাইলের নাম slave_girl_1.jpg.webp

আল হিদায়াঃ দাসীর সন্তানও দাস হয়

একই কথা লেখা রয়েছে প্রখ্যাত ফিকাহ গ্রন্থ আল হিদায়াতেও [3]

ইমাম আবূ হানীফা (র) থেকে এ রূপই বর্ণিত রয়েছে। পক্ষান্তরে এ ব্যাপারে ইমাম আবূ ইউসুফ (র) ও ইমাম মুহম্মদ (র) থেকে আলাদা আলাদা দু’টি বর্ণনা রয়েছে। কিফায়াতল মুনতাহী ফিতাবে আমরা তা উল্লেখ করেছি।
আর মনিব যদি তাকে বিবাহ দেয় এবং সে সন্তান প্রসব করে তাহলে সে সন্তান তার মায়ের অনুবর্তী হবে।
কেননা স্বাধীনতার অধিকার সন্তানের মাঝেও সংক্রমিত হয়। যেমন, মোদাব্বার ঘোষণার ক্ষেত্রে। এ কারণেই তো স্বাধীন স্ত্রীর সন্তান স্বাধীন হয় এবং দাসীর সন্তান দাস হয়।
① আর বংশ সম্পর্ক স্বামী থেকে সাব্যস্ত হবে।
কেননা শয্যা অধিকার তার। যদিও বিবাহটি ফাসিদ হয়ে থাকে। কেননা বিধানের ক্ষেত্রে নিকাহে ফাসিদ বিশুদ্ধ বিবাহের সমপর্যায়ভুক্ত হয়ে থাকে।
আর যদি মনিব সন্তানটির সম্পর্ক দাবী করে তাহলে তার থেকে বংশ সম্পর্ক সাব্যস্ত হবে না। কেননা সন্তাটি অন্যজন থেকে সুসাব্যস্ত বংশ সম্পর্কের অধিকারী। আর সন্তানটি স্বাধীন হবে এবং মনিবের স্বীকৃতির কারণে তার মাতা মনিবের উম্মে ওয়ালাদ হবে।
আর মনিব যখন মৃত্যুবরণ করবে তখন উম্মে ওয়ালাদ তার সমগ্র সম্পদ থেকেই আযাদ হয়ে যাবে।
এর দলীল হল সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব থেকে বর্ণিত হাদীস যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে ওয়ালাদগণের মুক্তির ফায়সালা দান করেছেন। এবং ঋণ পরিশোধের জন্য তাদের বিক্রি না করার এবং তাদের মুক্তির বিষয়টিকে এক তৃতীয়াংশ সম্পদ থেকে গণ্য না করার আদেশ দিয়েছেন।
তাছাড়া এই কারণে যে, সন্তান লাভ হচ্ছে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। সুতরাং তা ঋণ পরিশোধের এবং ওয়ারিছদের হকের উপর প্রাধান্য লাভ করবে। যেমন কাফন দাফনের বিষয়টি।
মোদাব্বার ঘোষণার বিষয়টি ভিন্ন। কেননা এ হল অছিয়ত এমন ব্যাপারে, যা তার মৌলিক প্রয়োজন থেকে অতিরিক্ত।
মনিবের ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে পাওনাদারদের অনুকূলে উপার্জন করা উন্মে ওয়ালাদের উপর ওয়াজিব নয়।
প্রমাণ হলো আমাদের পূর্ব বর্ণিত হাদীস।১
তাছাড়া এই কারণে যে, উম্মে ওয়ালাদ অর্থমূল্য সম্পন্ন মাল নয়। এ কারণেই ইমাম আবূ হানীফা (র) এর মতে গছবের কারণে উম্মে ওয়ালাদের ক্ষতিপূরণ আবশ্যক হয় না। সুতরাং
১। বর্ণিত হাদীস দ্বারা সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াবের হাদীস উদ্দেশ্য। প্রমাণের ব্যাখ্যা এই যে, হাদীসে যখন বলা হয়েছে যে, ঋণের কারণে উন্মে ওয়ালাদকে বিক্রি করা যাবেনা, তখন প্রকারান্তরে তা উম্মে ওয়ালাদের অর্থমূল্য রহিত হওয়া প্রমাণ করে। আর যখন অর্থমূল্য রহিত হলো তখন তার উপর উপার্জনে নিযুক্ত হওয়া আবশ্যক হতে পারে না।
২। অর্থাৎ কোন লোক যদি উম্মে ওয়ালাদকে জবর দখল করে নিয়ে যায় আর জবরদখলকারীর দখলে থাকা অবস্থায় উন্মে ওয়ালাদের মৃত্যু হয়, তাহলে উম্মে ওয়ালাদের অর্থমূল্য ক্ষতিপূরণ রূপে জবরদখলকারীর উপর সাবাস্ত হবে না।

জন্ম 4

মা’আরেফুল কোরআনঃ গর্ভের সন্তানের মালিকানা

এবারে আসুন তাফসীরে মা’আরেফুল কোরআন থেকেও দেখে নিই, ক্রীতদাসীর সন্তান যে মালিকের গোলাম বলে বিবেচিত হয়, সে সম্পর্কে [4]

আনুষঙ্গিক জ্ঞাতব্য বিষয়
طول এর অর্থ শক্তি-সামর্থ্য। আয়াতের অর্থ এই যে, যার স্বাধীন নারীদেরকে বিয়ে করার শক্তি-সামর্থ্য নেই কিংবা প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র নেই, সে ঈমানদার দাসী-দেরকে বিয়ে করতে পারে। এতে বোঝা গেল যে, যতদূর সম্ভব স্বাধীন নারীকেই বিয়ে করা উচিত-দাসীকে বিয়ে না করাই বাঞ্ছনীয়। অগত্যা যদি দাসীকে বিয়ে করতেই হয়, তবে ঈমানদার দাসী খোঁজ করতে হবে।
হযরত ইমাম আবু হানীফা (র)-র মাযহাব তাই। তিনি বলেনঃ স্বাধীন নারীকে
বিয়ে করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দাসীকে অথবা ইহুদী-খৃস্টান দাসীকে বিয়ে করা মকরূহ।
হযরত ইমাম শাফিয়ী (র) ও অন্যান্য ইমামের মতে স্বাধীন নারীকে বিয়ে করার শক্তি থাকা সত্ত্বেও দাসীকে বিয়ে করা হারাম এবং ইহুদী বা খৃস্টান দাসী বিয়ে করা সর্বা-বস্থায় অবৈধ।
মোট কথা, দাসীকে বিয়ে করা থেকে বেঁচে থাকা স্বাধীন পুরুষের জন্য সর্বাবস্থায় উত্তম। যদি অগত্যা করতেই হয়, তবে ঈমানদার দাসীকে করবে। কারণ, দাসীর গর্ভথেকে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, সে ঐ ব্যক্তির গোলাম হয়, যে দাসীর মালিক। অমুসলমান দাসীর গর্ভে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে, সে জননীর চাল-চলন অনুযায়ী ভিন্ন ধর্মের অনুসারী হয়ে যেতে পারে। অতএব, সন্তানকে গোলামির কবল থেকে রক্ষা করার জন্য এবং ঈমানদার বানানোর জন্য সন্তানের মাতার স্বাধীন হওয়া জরুরী। দাসী হলে কমপক্ষে ঈমানদার হওয়া দরকার, যাতে সন্তানের ঈমান সংরক্ষিত থাকে। এ কারণেই উলামায়ে-কিরাম বলেনঃ স্বাধীন ইহুদী-খৃস্টান নারীকে বিয়ে করা যদিও বৈধ, কিন্তু তা থেকে বেঁচে থাকাই উত্তম। বর্তমান যুগে এর গুরুত্ব অত্যধিক। কেননা, ইহুদী ও খৃস্টান রমণীরা আজকাল সাধারণত স্বয়ং স্বামীকে ও স্বামীর সন্তানদেরকে স্বধর্মে আনার উদ্দেশ্যেই মুসলমানদের বিয়ে করে।

জন্ম 6

তাফসীরে জালালাইনঃ সন্তান জন্মালে গোলাম হয়ে যায়

তাফসীরে জালালাইন থেকেই দেখি- [5]

তখন যদি কোনো অশ্লীল তথা জেনার কাজে লিপ্ত হয়ে যায়, তাহলে তাদের উপর স্বাধীন কুমারী নারীদের অর্ধেক শাস্তি তথা হদ আসবে। যদি তারা জেনা করে নেয়। সুতরাং তাদেরকে পঞ্চাশটি বেত্রাঘাত ও অর্ধবৎসরের নির্বাসন দেওয়া হবে। এবং তাদের উপর গোলামদেরকে কেয়াস করা হবে। আর বিবাহিতা হওয়ার বিষয়টা হদ ওয়াজিব হওয়ার শর্ত হিসেবে নয়, বরং একথা বুঝাবার স্বার্থে এসেছে যে, তাদের উপর রজম মোটেই নেই। এ বিষয়টা তথা স্বাধীন নারীকে বিয়ে করার সামর্থ্য না থাকা অবস্থায় বাদীদেরকে বিয়ে করার এ হুকুম তাদের জন্য তোমাদের মধ্যে যারা গুনাহ তথা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে ভয় করে।
অনুবাদ: অ-এর আসল অর্থ হচ্ছে কষ্ট। আর
ব্যভিচারের নাম এعن ]কষ্ট] এই জন্য রাখা হয়েছে যে, ব্যভিচার দুনিয়াতে হদ এবং আখেরাতে শাস্তির মাধ্যমে কষ্টের কারণ। পক্ষান্তরে যে স্বাধীন লোকদের জেনাতে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই, তাদের জন্য বাঁদীদেরকে বিয়ে করা হালাল নয়। তেমনিভাবে এই হুকুম ঐ ব্যক্তির জন্যও, যে স্বাধীন নারীকে বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে। ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর মত এটাই। আল্লাহ পাকের 11 11 من فتَيْنِكُمُ الْمُؤْمِنَتِ -বের হয়ে গিয়েছে। সুতরাং তার জন্য বাঁদীদের কে বিয়ে করা হালাল হবে না, যদিও সামর্থ্য না রাখে এবং গুনাহের আশঙ্কা হয়। আর যদি তোমরা সবর কর বাদীদেরকে বিয়ে করা হতে, তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম, যাতে করে সন্তান গোলাম না হয়। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল করুণাময় এ ব্যাপারে প্রশস্ততা প্রদানের মাধ্যমে।

জন্ম 8

আইনি বৈষম্য ও উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত দাসত্বঃ শৈশবের সংজ্ঞায়ন

ইসলামি ফিকহশাস্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ ‘আল হিদায়া’ এবং ‘ফিকাহুস সুন্নাহ’র ভাষ্যমতে, স্বাধীনতার অধিকার কোনো মানুষের মৌলিক সত্তাগত বিষয় নয়, বরং এটি তার মায়ের আইনি পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। এখানে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষণীয়: শিশুর বংশ পরিচয় বা পিতৃত্ব (নাসাব) বাবার মাধ্যমে সাব্যস্ত হলেও তার ‘স্বাধীনতা’ বা ‘দাসত্ব’ নির্ধারিত হয় মায়ের সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে। এটি মূলত প্রাক-ইসলামি বা প্রাচীন রোমান দাসপ্রথার সেই ‘Partus sequitur ventrem’ (সন্তান গর্ভের অনুসারী হবে) নীতিরই একটি ধর্মীয় সংস্করণ। আধুনিক মানবাধিকারের মানদণ্ডে যেখানে প্রতিটি শিশু সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে জন্মায়, সেখানে ইসলামি শরীয়ত একটি শিশুকে তার জন্মের মুহূর্তেই অন্যের ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে কেবল তার মায়ের ‘দাসী’ পরিচয়ের কারণে।

এই ব্যবস্থার নির্মমতা আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা ‘তাফসীরে মা’আরেফুল কোরআন’ বা ‘জালালাইন’-এর ব্যাখ্যা দেখি। সেখানে মুসলিম পুরুষদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে তারা যেন স্বাধীন নারীকে বিয়ে করতে অসমর্থ না হলে দাসীকে বিয়ে না করে, কারণ দাসীর গর্ভজাত সন্তান মালিকের ‘গোলাম’ হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ, ইসলামি তত্ত্বে দাসত্ব একটি বংশগত দায় বা ‘লিগ্যাল বার্ডেন’, যা মায়ের শরীর থেকে সন্তানের ওপর অবধারিতভাবে বর্তায়। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি আইনে দাসত্ব কোনো সাময়িক পরিস্থিতি নয়, বরং এটি একটি নিরেট বাণিজ্যিক ও আধিপত্যকামী সমীকরণ, যা শিশুকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং ‘ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তি’ বা ‘বিক্রয়যোগ্য পণ্য’ হিসেবে বিবেচনা করে।যুক্তির আলোকে দেখলে, যে ধর্ম নিজেকে ‘ঐশ্বরিক সর্বোচ্চ নৈতিকতার ধারক’ হিসেবে দাবি করে, সেই ধর্মে একটি নিষ্পাপ শিশুর জন্মগতভাবে অন্যের অধীনে শৃঙ্খলিত হওয়ার এই বৈধতা চরমভাবে স্ববিরোধী এবং মানবাধিকারের মৌলিক পরিপন্থী।


উপসংহারঃ প্রাতিষ্ঠানিক অমানবিকতা ও জন্মগত শৃঙ্খল

ইসলামি ফিকহশাস্ত্রে দাসপ্রথার এই প্রজননগত উপযোগবাদ (Reproductive Utilitarianism) মূলত মানুষের অনন্য মর্যাদা ও ন্যূনতম সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। পশুপালনের ন্যায় মানুষের বংশবৃদ্ধিকে মালিকের বাণিজ্যিক হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা কেবল মধ্যযুগীয় নয়, বরং তা যে কোনো সভ্য সমাজব্যবস্থার জন্য চরম লজ্জাজনক। আধুনিক মানবাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো—প্রতিটি শিশু স্বাধীন সত্তা হিসেবে জন্মগ্রহণ করবে, কিন্তু ইসলামি বিধান অনুসারে একটি নবজাতকের ভাগ্য পূর্বনির্ধারিত হয় তার মায়ের ‘মালিকানা স্বত্ব’ দ্বারা। [6] এটি প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় আইন ব্যবস্থায় ‘মালিকানা’ বা ‘প্রপার্টি রাইটস’ মানুষের ‘মৌলিক মানবাধিকার’-এর চেয়েও শক্তিশালী ও অনমনীয়।

যৌক্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘মুদাব্বার’ ঘোষণার পূর্বে জন্মানো সন্তানদের আমৃত্যু দাসত্বের শিকলে আটকে রাখা বা মালিক ভিন্ন অন্য কারো ঔরসে জন্মানো শিশুটিকে মালিকের সম্পদে রূপান্তর করা মূলত একটি নিষ্ঠুর আইনি কাঠামো, অসভ্য বর্বর সমাজব্যবস্থার উত্তরাধিকার। এটি শৈশবকে সুরক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে শৈশবকেই শোষণের হাতিয়ারে পরিণত করে। তাফসীরে জালালাইন বা মা’আরেফুল কোরআনের ন্যায় প্রামাণ্য গ্রন্থগুলোতে যখন সন্তানকে ‘দাসত্বের কবল’ থেকে রক্ষার জন্য স্বাধীন নারীকে বিয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়, তখন তা প্রকারান্তরে এই অমানবিক দাসত্ব-ব্যবস্থার অস্তিত্বকেই প্রশ্নাতীত ও অলঙ্ঘনীয় হিসেবে মেনে নেওয়ার নামান্তর।

পরিশেষে, ইসলামি শরীয়তে দাসীর গর্ভজাত সন্তানের জন্মগত দাসত্ব কোনো ‘মানবিক বিধান’ নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত ‘হিউম্যান কমোডিফিকেশন’ বা মানুষের পণ্যকরণ প্রক্রিয়া। যখন একটি নবজাতককে জন্মের মুহূর্তেই বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তখন সেই ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিটিই ধসে পড়ে। যৌক্তিক দৃষ্টিতে দেখলে, এই বিধানগুলো কোনো পরম করুণাময় সত্তার ন্যায়বিচার নয়, বরং যুদ্ধজয়ী পুরুষতান্ত্রিক বর্বর সমাজের আধিপত্য ও শোষণের এক নিরেট আইনি প্রতিফলন, যা আধুনিক বিশ্বের মানবাধিকার ও নৈতিক দর্শনের সাথে সম্পূর্ণ আপসহীনভাবে সাংঘর্ষিক।


তথ্যসূত্রঃ
  1. ফিকহে ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু, ড মুহাম্মদ রাওয়াস কালা জী, ভাষান্তর ও সম্পাদনাঃ মুহাম্মদ খলিলুল রহমান মুমিন, আধুনিক প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২২৯ ↩︎
  2. ফিকাহুস সুন্নাহ, ২য় খণ্ড, সাইয়েদ সাবেক, শতাব্দী প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৮৪, ৮৫ ↩︎
  3. আল হিদায়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৭ ↩︎
  4. তাফসীরে মা’আরেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফী উসমানি, অনুবাদঃ মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫০, ৩৫১ ↩︎
  5. তাফসীরে জালালাইন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮০২-৮০৩ ↩︎
  6. Universal Declaration of Human Rights, Article 4 ↩︎