
Table of Contents
- 1 ভূমিকাঃ ধর্মের আবরণে এক অন্ধকার ইতিহাস
- 2 ইসলামি বর্বরতার আধুনিক পুনরুত্থানঃ ISIS এবং যৌন দাসত্বের কালো অধ্যায়
- 3 ইসলামিক দলিল প্রমাণঃ ফিকাহ গ্রন্থগুলোর নির্লজ্জ প্রমাণ
- 4 দাসবাজারের শরীরতত্ত্বঃ নারী দেহের অনাবৃত প্রদর্শনী ও স্পর্শের আইনি বৈধতা
- 5 আধুনিক মানবাধিকার বনাম মধ্যযুগীয় ফিকহ্: একটি আদর্শিক ও নৈতিক ব্যবচ্ছেদ
- 6 উপসংহারঃ ‘সর্বজনীন দয়া’ ও দালিলিক বাস্তবতার দ্বান্দ্বিকতা
ভূমিকাঃ ধর্মের আবরণে এক অন্ধকার ইতিহাস
আধুনিক বিশ্বের নাগরিক হিসেবে আমরা যখন ‘মানবাধিকার’ বা ‘ব্যক্তিগত মর্যাদা’র কথা বলি, তখন আমাদের চেতনার মূলে থাকে প্রতিটি মানুষের সার্বভৌমত্ব। কিন্তু ইতিহাসের গতিপথ সবসময় এতটা মসৃণ বা মানবিক ছিল না। বিশেষ করে মধ্যযুগীয় সমাজব্যবস্থায় ‘দাসপ্রথা’ ছিল একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক মেরুদণ্ড। আজকের একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে অনেক ধর্মতাত্ত্বিক বা ইতিহাসবিদ সেই সময়কার দাসপ্রথাকে ‘সহমর্মিতা’ বা ‘নিরাপত্তা’র মোড়কে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। দাবি করা হয় যে, আশ্রয়হীন নারী বা যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দিতেই নাকি তাঁদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আনা হয়েছিল। কিন্তু ধ্রুপদী উৎস এবং ইসলামী ফিকহ্ শাস্ত্রের (আইনশাস্ত্র) দালিলিক ব্যবচ্ছেদ করলে এক অত্যন্ত রূঢ় এবং বীভৎস সত্য বেরিয়ে আসে।
সেই সত্যটি হলো—প্রাচীন ও মধ্যযুগের দাসবাজারগুলো আসলে কোনো মানবিক আশ্রয়কেন্দ্র ছিল না, বরং তা ছিল মানুষের মাংসের এক বিশাল পণ্যশালা। সেখানে একজন নারীকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং স্রেফ একটি ‘দ্রব্য’ বা ‘অংশ’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যার উপযোগিতা নির্ধারিত হতো তাঁর রূপ, বয়স এবং যৌন সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে। আধুনিক যুগের কোনো শিক্ষিত মানুষ যখন শোনেন যে, প্রকাশ্য বাজারে একজন নারীর বুক, পেট বা উরু স্পর্শ করে তাঁর ‘মান’ যাচাই করা আইনিভাবে বৈধ ছিল, তখন তাঁর শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। একইসাথে প্রবল ঘৃণায় তারা আচ্ছন্ন হবেন, সেটিই স্বাভাবিক।
এই প্রবন্ধের লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামের ইতিহাসে লুকিয়ে থাকা সেইসব ধ্রুপদী আইনগ্রন্থগুলোর (যেমন: আশরাফুল হিদায়া, মুখতাসারুল কুদুরী) আলোকে সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে তুলে ধরা, যা যুগের পর যুগ ‘আল্লাহর বিধানের’ দোহাই দিয়ে টিকে ছিল। আমরা দেখব কীভাবে একজন মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে পণ্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং কীভাবে দয়া বা ইনসাফের বুলির আড়ালে একটি সুসংগঠিত যৌন লালসার বাজারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। যখন কোনো আইন বলে যে, কুমারীত্বের পর্দা অক্ষত না থাকলে ক্রেতা সেই ‘দ্রব্য’ বা নারীকে ফেরত দিতে পারবে, তখন বোঝা যায় সেই সমাজের নৈতিক মানদণ্ড কতটা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল।
আসুন, আমরা সাহসের সাথে ইতিহাসের সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করি এবং নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করি—যেখানে মানুষ হয়ে উঠেছিল স্রেফ কেনাবেচার সামগ্রী।
ইসলামি বর্বরতার আধুনিক পুনরুত্থানঃ ISIS এবং যৌন দাসত্বের কালো অধ্যায়
অনেকে মনে করেন, মধ্যযুগীয় দাসপ্রথা বা নারী কেনাবেচার ইতিহাস কেবল কিতাব বা প্রাচীন লিপিতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করেছে ‘ইসলামিক স্টেট’ বা আইসিসের উত্থান, যারা আক্ষরিক অর্থেই ধ্রুপদী ফিকহ্ শাস্ত্রের সেইসব বিধানকে পুনরায় জীবিত করেছিল। ২০১৪ সালে উত্তর ইরাকের সিনজার পাহাড়ে ইয়াজিদি জনগোষ্ঠীর ওপর যে তাণ্ডব চালানো হয়েছিল, তা আধুনিক যুগের ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বা জাতিগত নিধনের এক নিকৃষ্ট উদাহরণ। আইসিস কেবল ইয়াজিদি পুরুষদের হত্যাই করেনি, বরং হাজার হাজার নারীকে বন্দী করে তাঁদের ওপর ‘সাবাওয়া’ (Sabaya) বা যুদ্ধবন্দী দাসীর বিধান কার্যকর করেছিল।
১. আইসিসের ধর্মতাত্ত্বিক ও আইনি ভিত্তিঃ আইসিস তাদের এই কর্মকাণ্ডকে কেবল একটি অপরাধ হিসেবে দেখেনি, বরং তারা দাবি করেছিল যে তারা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এক ‘সুন্নত’ বা ধর্মীয় বিধানকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করছে। তাদের দাপ্তরিক ম্যাগাজিন ‘দাবিক’ (Dabiq)-এ তারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিল যে, অমুসলিম নারীদের দাসী বানানো এবং তাঁদের ওপর যৌন আধিপত্য বিস্তার করা একটি ঐশী পুরস্কার [1] [2] । তারা যুক্তি দিয়েছিল যে, যে বিধান স্বয়ং নবীর সাহাবীরা আমল করেছেন এবং চার মাজহাবের চারজন ইমাম সহকারে সকল ধ্রুপদী আলেম ওলামাদের যে বিষয়ে ঐক্যমত্য আছে, যা ইসলামি ফিকহের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এখনো গ্রন্থগুলোর পাতায় পাতায় আছে, একইসাথে ইমাম কুদুরী বা হিদায়ার মতো প্রামাণ্য কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে, তা কখনও অবৈধ হতে পারে না। এই দাবিটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ফিকহ্ শাস্ত্রের সেই প্রাচীন বিধানগুলো আধুনিক অপরাধীদের জন্য কতটা শক্তিশালী ‘আইনি ঢাল’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
২. আধুনিক দাসবাজারের দৃশ্যপটঃ আইসিসের নিয়ন্ত্রিত রাক্কা বা মসুলের বাজারে ইয়াজিদি নারীদের যেভাবে নিলামে তোলা হয়েছিল, তা ছিল মধ্যযুগীয় দাসবাজারের এক কার্বন কপি। গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও এবং বেঁচে ফেরা নারীদের বয়ান অনুযায়ী, বাজারে ক্রেতারা নারীদের মুখ, দাঁত এবং শরীর পরীক্ষা করে দেখত। আইসিসের জারি করা একটি মূল্য তালিকায় দেখা গিয়েছিল, ৯ বছর বা তার কম বয়সী শিশুদের দাম সবচেয়ে বেশি নির্ধারণ করা হয়েছিল—প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ইরাকি দিনার বা ১৭০ ডলারের কাছাকাছি [3]। এটি সরাসরি সেই ফিকহী মাসআলার কথাই মনে করিয়ে দেয়, যেখানে বলা হয়েছে যে সাত বা নয় বছরের কিশোরী যদি কামভাবের পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে তাঁকে বাজারে পেশ করাতে কোনো দোষ নেই।
৩. যৌন দাসত্ব ও পদ্ধতিগত নির্যাতনঃ আইসিস যোদ্ধাদের জন্য একটি হ্যান্ডবুক বা নির্দেশিকা তৈরি করেছিল, যেখানে বন্দিনী নারীদের সাথে সহবাসের নিয়মাবলী লেখা ছিল। সেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছিল যে, বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছায়নি এমন নাবালিকা দাসীর সাথেও যৌন মিলন করা বৈধ, যদি সে শারীরিকভাবে সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। এই বিধানটি মূলত ধ্রুপদী ফিকহ্ শাস্ত্রের সেইসব মাসআলারই আধুনিক সংস্করণ, যা আমরা আশরাফুল হিদায়া বা মুখতাসারুল কুদুরীতে পাই। অর্থাৎ, এক হাজার বছর আগে যে আইনগুলো বাজারে পণ্য যাচাইয়ের দোহাই দিয়ে বুক বা পেট স্পর্শ করাকে বৈধ করেছিল, আধুনিক আইসিস সেই একই যুক্তি ব্যবহার করে হাজার হাজার নারীর জীবন ধ্বংস করেছে।
৪. নৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াঃ আইসিসের এই বর্বরতা প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় নصوص বা আইনের যখন কোনো মানবিক সংস্কার হয় না, তখন তা যেকোনো সময় আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হয়ে আধুনিক সভ্যতাকে গ্রাস করতে পারে। ইয়াজিদি নারীরা যখন তাঁদের ওপর চলা গণধর্ষণ ও কেনাবেচার বর্ণনা দেন, তখন তা কেবল আইসিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে না, বরং সেই বিচারব্যবস্থার প্রতিও বড় প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—যা একজন মানুষকে পণ্য হিসেবে গণ্য করার স্বীকৃতি দেয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে ঘোষণা করলেও, এই অপরাধের তাত্ত্বিক শেকড়গুলো কিন্তু আজও অনেক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘অপরিবর্তনীয় ঐশী বিধান’ হিসেবে পড়ানো হয়।
ইসলামিক দলিল প্রমাণঃ ফিকাহ গ্রন্থগুলোর নির্লজ্জ প্রমাণ
পূর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি আইসিস কীভাবে মধ্যযুগীয় দাসপ্রথাকে আধুনিক যুগে ফিরিয়ে এনেছিল। এখন আমাদের প্রবেশ করতে হবে সেই আইনি প্রকোষ্ঠে, যা একজন মানুষকে কেবল একটি ‘দ্রব্য’ বা ‘অংশ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। ধ্রুপদী ফিকহ গ্রন্থে দাসপ্রথা কেবল কোনো ‘উদ্ধার অভিযান’ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুসংগঠিত ভোক্তা অধিকারের (Consumer Rights) মতো বিষয়, যেখানে ক্রেতার যৌন সন্তুষ্টির নিশ্চয়তা দেওয়া হতো।
নারীর শরীরের উন্মুক্ত প্রদর্শনীঃ যৌনদাসী ক্রয়ের ‘রিটার্ন পলিসি’
ইমাম কুদুরী তাঁর গ্রন্থে দাসীকে সরাসরি একটি ‘দ্রব্য’ (Goods) হিসেবে গণ্য করেছেন। আধুনিক যুগে আমরা যেমন কোনো ত্রুটিপূর্ণ পণ্য ফেরত দিই, ফিকহ শাস্ত্রেও দাসীর ক্ষেত্রে ঠিক একই নিয়ম রাখা হয়েছে। যদি কোনো দাসী ক্রয় করার পর দেখা যায় তার মুখে বা বগলে দুর্গন্ধ আছে, তবে ক্রেতা সেই ‘পণ্য’ বা নারীকে বিক্রেতার কাছে ফেরত দিতে পারবেন।
এর পেছনে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত অবমাননাকর: বলা হয়েছে, দাসী যেহেতু যৌন সম্ভোগের (Sexual Intercourse) উদ্দেশ্যে কেনা হয়, তাই শারীরিক দুর্গন্ধ সেই মিলনের পথে একটি ‘দোষ’ বা অন্তরায়। পক্ষান্তরে, পুরুষ দাসের ক্ষেত্রে এই দুর্গন্ধ তেমন বড় কোনো ত্রুটি নয়, কারণ তার প্রধান কাজ হলো হাড়ভাঙা খাটুনি দেওয়া। অর্থাৎ, একজন নারীর সত্তাকে এখানে কেবল তার সুগন্ধ বা যৌন লালসা মেটানোর ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে পরিমাপ করা হয়েছে। [4]
কুদুরী (আরবি-বাংলা) ২৩০ কিতাবুল বুয়ুই
… এর আলোচনাঃ ক্রয়কৃত বস্তুতে দোষ-ত্রুটি দেখা দেয়ার পর তা ফিরিয়ে দেয়া বা পূর্ণ থাকার কারণ হল, মতলক আকদের চাহিদা হল, তা ত্রুটিমুক্ত হওয়া। তবে এ টা কয়েকটি শর্তের সাথে সম্পৃক্ত। (১) সে ত্রুটি বিক্রেতার নিকট থাকতেই ছিল, ক্রেতার হস্তক্ষেপের পর সৃষ্টি হয়নি। (২) ক্রেতার ক্রয় করার সময় ত্রুটি সম্পর্কে অনবগত হওয়া (৩) এবং হস্তগত করার সময়ও সে ত্রুটি সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকা। (৪) ক্রেতা কষ্ট ব্যতীত ত্রুটি বিদূরীত করতে সক্ষম না হওয়া। (৫) এ ত্রুটি এবং সকল ত্রুটিমুক্ত হওয়ার শর্ত যদি না করা হয় এবং আবূদ ভঙ্গ হওয়ার পূর্বে তা দূর হওয়া যদি সম্ভব না হয় ।
লো তা JS, -এর আলোচনা ঃ পণ্য দ্রব্যের যে কোন দোষ-ত্রুটিকে মনগড়া ভাবে ‘দোষ’ বলে অভিহিত করা যাবে না; বরং ব্যবসায়ীদের রীতি-রেওয়াজে যেটা ‘দোষ’ বলে স্বীকৃত তাই কেবল ‘দোষ’ হিসেবে গণ্য হবে। কেননা ‘দোষ’ থাকলে দ্রব্যের মান ও মূল্যে কমতি দেখা দেয়। আর কোন দ্রব্যের মূল্য কমতি হল কিনা তার বিচার করার ভার ব্যবসায়ীদের ওপর। মনে রাখতে হবে আয়েব বা দোষ সম্পর্কিত এ ব্যাখ্যা বস্তুত একটি মূল সূত্র। এ সূত্র ধরে আরো অনেক মাসায়েল সংকলন করা সম্ভব। স্বয়ং গ্রন্থকারও এ সূত্রে সংকলনকৃত কয়েকটি মাসআলা পেশ করেছেন।
…-এর আলোচনাঃ কোন ক্রীতদাসের মধ্যে পলায়ন প্রভৃতি বদ অভ্যাসগুলো শৈশবে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও যদি বালেগ হওয়ার পর মালিকের নিকট পুনরায় তা প্রকাশ পেয়ে না থাকে, তবে ক্রেতার অধিকারে এসে এর পুনরাবৃত্তি ঘটলে তা দোষ হবে না। অর্থাৎ এটা দোষ তো বটেই, কিন্তু বিক্রেতার নিকট হতে উদ্ভূত দোষ বলে দাবি করা যাবে না এবং গোলামও ফেরত দেয়া যাবে না; বরং ধরে নিতে হবে এগুলো নব সৃষ্ট দোষ। অপর দিকে শৈশবকালীন এ কু-অভ্যাস গুলো যদি ক্রেতার নিকট নাবালেগ অবস্থায়ই প্রকাশ পায় কিংবা বালেগ অবস্থায় বিক্রেতার নিকট প্রকাশ পাওয়ার পর ক্রেতার নিকট এসে তার পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে তা ফেরতযোগ্য দোষ বলে গণ্য হবে। কারণ এ সমস্ত দোষের শৈশবকালীন উৎস এবং বালেগ অবস্থার উৎস এক নয়; বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেননা শৈশবে পলায়ন করে থাকে খেলাধুলার মোহে, পক্ষান্তরে বালেগ হওয়ার পর তা করে চুরি বা বেপরোয়া মনোভাবের বশবর্তী হয়ে। উৎসের ভিন্নতার কারণে দোষও ভিন্ন হয়ে যায় । সুতরাং ক্রেতার নিকট প্রকাশিত দোষ তখন পূর্বের দোষ বলে দাবি করা চলে না ।
…-এর আলোচনাঃ অর্থাৎ কোন দাসী ক্রয় করার পর যদি তার মুখে বা বগলে দুর্গন্ধ অনুভূত হয় অথবা সে ব্যভিচারিণী বা জারজ বলে প্রমাণিত হয়; তবে তাকে ফেরত দেয়া যাবে। কারণ অনেক সময় দাসী যৌন সম্ভোগের উদ্দেশ্যেও ক্রয় করা হয়। আর শারীরিক ও চারিত্রিক এ সব দোষ-ত্রুটি ও দুর্বলতা তখন মিলনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় । সুতরাং দাসীর ক্ষেত্রে এগুলো দোষ। পক্ষান্তরে গোলাম দ্বারা উদ্দেশ্য থাকে গৃহস্থালীর কাজকর্ম সম্পন্ন করা। আর এ সকল ত্রুটি সাধারণত গৃহস্থালীর কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে না। তদুপরি দুর্গন্ধ যদি অতিশয় হয় অথবা ব্যভিচার তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে থাকে, তবে তা দোষের মধ্যে গণ্য হবে। এতে পরিষ্কার প্রতীয়মান হয় যে, দ্রব্যের মধ্যকার ত্রুটি যদি এমন হয় যা থেকে দ্রব্য সাধারণত মুক্ত হতে পারে না, যেমন এক মণ সরিষার মধ্যে পোয়া, দেড় পোয়া ধান বা কলাই থাকা- দূষণীয় নয় । কিন্তু ধুলাবালি বা কলাইর পরিমাণ যদি এক-দুই কেজি হয়, তবে অবশ্যই তা দোষের মধ্যে পরিগণিত হবে।

স্পর্শ ও প্রদর্শনীঃ লাজলজ্জার সকল সীমার বিলুপ্তি
ইসলামী নীতিশাস্ত্রে ‘হায়া’ বা লজ্জাকে ঈমানের অঙ্গ বলা হলেও, দাসবাজারের ক্ষেত্রে সেই হায়া বা পর্দা কোথায় ছিল—তা একটি বড় প্রশ্ন। আশরাফুল হিদায়ার মাসআলা অনুযায়ী, ক্রেতা যদি কোনো দাসী কেনার ইচ্ছা পোষণ করে, তবে সে দাসীর সেই সব অঙ্গ স্পর্শ করতে পারবে যা দেখা জায়েজ। এর মধ্যে রয়েছে বুক, পিঠ এবং পায়ের নলি। এমনকি স্পর্শের ফলে ক্রেতার মনে তীব্র যৌন উত্তেজনা বা কামভাব জাগ্রত হলেও শাস্ত্রীয়ভাবে একে ‘জায়েজ’ বা বৈধ বলা হয়েছে।
এই প্রদর্শনীর বীভৎসতা সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় কিশোরী দাসীদের ক্ষেত্রে। বালেগা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কিশোরী দাসীদের ঊর্ধ্বাংশ (বুক ও পিঠ) খোলা অবস্থায় বাজারে প্রদর্শন করা যেত। এমনকি সঙ্গমের উপযোগী ছোট শিশুদের (যাদের বয়স সাত বা নয় হতে পারে) বাজারে কেবল নিম্নাংশ ঢেকে প্রদর্শন করা হতো। এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে মানুষের মর্যাদাকে এখানে ক্রয়-বিক্রয়ের মুনাফার নিচে বলি দেওয়া হয়েছিল। [5] –
ইমাম কুদুরী (রহ.) তাঁর মুখতাসারুর কুদুরী গ্রন্থে বলেন, যদি কেউ দাসী ক্রয় করার ইচ্ছা পোষণ করে তার জন্য দাসীর ঐ সকল অঙ্গসমূহ স্পর্শ করা জায়েজ, যা দেখা জায়েজ। এমনকি যদি স্পর্শ করার দ্বারা ক্রেতার মধ্যে কামভাব জাগ্রত হয়, তবুও।
মুসান্নিফ (রহ.) বলেন, ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) তাঁর জামিউস সাগীরের মধ্যে এইভাবেই মাসআলাটি বর্ণনা করেছেন। জামিউস সাগীরের ইবারত এই- “ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) ও আবু ইউসুফ (রহ.) এ দুজন ইমাম আবু হানীফা (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি কোন দাসী ক্রয় করার ইচ্ছা পোষণ করেছে তার জন্য দাসীর পায়ের নলি, বুক ও হাত স্পর্শ করাতে কোন ক্ষতি বা দোষ নেই এবং এসব অঙ্গ অনাবৃত অবস্থায় দেখাতেও কোন সমস্যা নেই”। “কামভাব জাগ্রত হলেও স্পর্শ করা বৈধ হবে”।
“স্পর্শ করার দ্বারা কামভাব জাগ্রত হওয়ার আশংকা থাকলেও স্পর্শ করা জায়েজ। তাদের মতে ক্রয় করার উদ্দেশ্যে দাসীর দিকে তাকানো বৈধ, যদিও এতে উত্তেজিত হওয়ার আশংকা থাকে”।
“পূর্বযুগের ইমামগণ দাসী ক্রয় করার সময় তাদের ত্বক সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার উদ্দেশ্যে স্পর্শ করাকে বৈধ বলতেন, কেননা সেই সময়ের লোকজন সাধারণভাবে নেক ছিলেন”।
“পরবর্তীকালে ওলামাগণ কামভাব না থাকা অবস্থায় স্পর্শ করার অনুমতি দিয়েছেন। আর এর উপরেই বর্তমান ফতোয়া”।
“যখন কোন কিশোরী দাসী প্রথম ঋতুমতী হয় তারপর থেকে উক্ত দাসীকে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে বাজারে নিয়ে নিম্নাঙ্গ আবৃত হয় এমন এক কাপড় পরিয়ে তাকে দর্শন করানো যাবে না। কারণ ঋতুমতী হওয়ার অর্থ হল সে বালেগা হয়েছে। আর বালেগা দাসীর পেট ও পিঠ সতরের অন্তর্ভুক্ত যা ইতঃপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। সুতরাং এখন যদি শুধুমাত্র নিম্নাঙ্গের পোশাক পরিধান করানো হয় তাহলে বুক ও পিঠ খোলা থাকবে তাই তাকে উর্ধাঙ্গের কামিস তথা পোশাক পরতে হবে। উল্লেখ্য যে ইজার এমন পোশাককে বলা হয় যার দ্বারা শুধুমাত্র নাভি থেকে নিচের অংশ ঢাকা যায়”।
“এ আলোচনা দ্বারা বুঝা গেল এর চেয়ে কম বয়সী দাসীদের বুক পিঠ খোলা অবস্থায় বাজারে নিয়ে যাওয়াতে কোন দোষ নেই”।
“যে কিশোরী দাসী কামভাবের পর্যায়ে উপনীত হয়েছে (অর্থাৎ সঙ্গমের উপযুক্ত হয়েছে, এতে সাত বা নয় বছর বয়সের কোন শর্ত নেই) তাকে বিক্রির জন্য এক কাপড়ে পেশ করা যাবে না”।


দাসী কেনার সময় যোনী পরীক্ষা করে কেনা
বিশ্ব মানবতার পথপ্রদর্শক নবী মুহাম্মদের সাহাবীগণ দাসবাজার থেকে সুন্দরী ভার্জিন বা কুমারী দাসী কিনে আনতো ভোগের জন্য। তাদের বাজারে কুমারী দাসীদের বাজার মূল্যও ছিল বেশি। কিন্তু মাঝে মাঝে কিনে আনা ক্রীতদাসীকে দেখা যেত, তারা ঠিক কুমারী নন। কুমারী যোনি যেহেতু মুহাম্মদের সাহাবীদের খুবই পছন্দের ছিল (আল্লাহ পাক বেহেশতেও কুমারী যোনির হুরের লোভ দেখিয়েছেন), দাসীদের এনে বিছানায় তোলার পরে যদি দেখা যেতো কুমারী যোনির পর্দা ফেটে যথেষ্ট রক্তরক্তি হচ্ছে না, অথবা সাহাবীরা সঙ্গম করে ঠিক মজা পাচ্ছে না যোনি যথেষ্ট টাইট না হওয়ার জন্য, তখন নবীর সাহাবীগণ ক্ষেপে যেতো। কারণ তারা তো পয়সা দিয়েছিল কুমারী বা ভার্জিন মেয়ের জন্য! মানে তারা ভাবতো, পুরো টাকাই গচ্চা গেল!
এই বিষয়ে আশরাফুল হিদায়াতে যেই মাসালাটি দেয়া আছে, সেটি হচ্ছে, এরকম হলে যাচাই করার জন্য মালিক দাসীর লজ্জাস্থান বা যোনি পরীক্ষা করে দেখতে পারবে। এসব ফিকহী বিধান পড়লে বোঝা যায়, সাহাবীদের মধ্যে দাসবাজারে ‘ভার্জিন’ বা কুমারী দাসীদের চাহিদা ও মূল্য ছিল আকাশচুম্বী। আর এই চাহিদাকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল আরও এক পৈশাচিক আইনি বিধান। যদি কোনো মালিক কুমারী হিসেবে কোনো নারীকে ক্রয় করার পর দাবি করেন যে তিনি কুমারী নন, তবে বিষয়টি যাচাই করার জন্য ওই নারীর লজ্জাস্থান বা যোনি পরীক্ষা করা বৈধ করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, পরীক্ষাটি কীভাবে করা হতো? টু ফিঙ্গার টেস্ট?
ভেবে দেখুন, যে নারী যুদ্ধে তাঁর পরিবার হারিয়েছেন, তাঁকে এখন এক অপরিচিত পুরুষের সামনে স্রেফ তাঁর ‘পণ্যমূল্য’ যাচাইয়ের জন্য জননেন্দ্রিয় উন্মুক্ত করে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। আধুনিক নীতিশাস্ত্রে একে সরাসরি Sexual Assault বা যৌন নিপীড়ন বলা হয়, অথচ ফিকহ শাস্ত্র একে ‘ব্যবসায়িক ইনসাফ’ হিসেবে বৈধতা দিয়েছে। এখানে নারীর সতীত্ব কোনো সম্মান নয়, বরং এটি কেবল একটি ‘মানদণ্ড’ যা দিয়ে তাঁর বাজারদর নির্ধারিত হতো। [6] –
৬. অনুরূপভাবে কোনো ব্যক্তি যদি কোনো দাসীকে কুমারী হিসেবে ক্রয় করে। অতঃপর দেখে যে, উক্ত দাসীর কুমারীত্ব নষ্ট হয়ে গেছে কিন্তু বিক্রেতা কুমারীত্ব নষ্ট হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তাহলে এরূপ অবস্থায় বিষয়টি যাচাই করার জন্য এক পর্যায়ে দাসীর লজ্জাস্থান পরীক্ষার উদ্দেশ্যে দেখা বৈধ।

দাসবাজারের শরীরতত্ত্বঃ নারী দেহের অনাবৃত প্রদর্শনী ও স্পর্শের আইনি বৈধতা
মধ্যযুগীয় দাসবাজারের যে চিত্রটি আমাদের সামনে ধ্রুপদী আইনগ্রন্থগুলো তুলে ধরে, তা স্রেফ কোনো বাজার নয়, বরং এক ভয়াবহ অমানবিক প্রদর্শনী। এখানে একজন নারীর শরীরকে কেবল একটি ‘ব্যক্তি’ হিসেবে নয়, বরং একটি ‘পণ্য’ বা ‘সম্পত্তি’ (মাল) হিসেবে দেখা হতো। আধুনিক নীতিশাস্ত্রে ‘সম্মতি’ (Consent) এবং ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা’ (Privacy) যেখানে প্রধান শর্ত, সেখানে ফিকহী বিধানগুলো ক্রেতাকে অধিকার দিয়েছিল একজন বিক্রেয় নারীর শরীরের গোপনীয়তা ছিন্নভিন্ন করার।
১. ক্রয়-বিক্রয়ের দোহাইয়ে স্পর্শের অধিকারঃ আশরাফুল হিদায়ার মতো প্রামাণ্য গ্রন্থে অত্যন্ত সরাসরি ভাষায় বলা হয়েছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি একটি দাসী ক্রয় করার ইচ্ছা পোষণ করে, তবে তার জন্য সেই নারীর নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গ স্পর্শ করা জায়েজ। বিস্ময়কর এবং ভয়াবহ বিষয় হলো, এই স্পর্শের অনুমতি দেওয়া হয়েছে এমনকি তখনো, যখন ক্রেতা জানে যে স্পর্শের ফলে তার মধ্যে কামভাব জাগ্রত হতে পারে [7]। ইমাম মুহাম্মদ এবং ইমাম আবু ইউসুফের মতো প্রভাবশালী ফকীহদের মতে, ক্রেতা চাইলে সেই দাসীর বুক, পিঠ, হাতের কবজি এমনকি পায়ের নলি পর্যন্ত অনাবৃত অবস্থায় দেখতে এবং স্পর্শ করতে পারতেন। আধুনিক নৈতিকতার আয়নায় এটি কেবল শ্লীলতাহানি নয়, বরং একটি সুসংগঠিত যৌন নিপীড়ন—যাকে আইনের মোড়কে বৈধ করা হয়েছে।
২. পণ্য যাচাইয়ের নামে লাঞ্ছনাঃ এই বিধানের পেছনে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, তা আরও বেশি অপমানজনক। বলা হয়েছে, ক্রেতা যেহেতু পয়সা দিয়ে পণ্য কিনছে, তাই তার অধিকার আছে পণ্যের ‘ত্বক’ বা গুণাগুণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার। এখানে একজন নারীর শরীরকে ঠিক পশুর হাটের গবাদি পশুর মতো বিবেচনা করা হয়েছে। মানুষের মর্যাদাকে এখানে ‘পণ্যের মানের’ নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে। যদিও পরবর্তী যুগের আলেমগণ কামভাব না থাকা অবস্থায় স্পর্শের কথা বলেছেন, কিন্তু মূল শাস্ত্রীয় অধিকারটি কিন্তু ক্রেতাকে সেই আদিম বন্যতার সুযোগই করে দিয়েছে।
৩. কিশোরী দাসীদের উন্মুক্ত প্রদর্শনীঃ দাসবাজারের এই নিষ্ঠুরতা প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়েও বেশি বীভৎস হয়ে উঠত কিশোরী দাসীদের ক্ষেত্রে। হিদায়ার মাসআলা অনুযায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো কিশোরী দাসী ঋতুমতী না হচ্ছে (অর্থাৎ বালেগা হচ্ছে না), ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে বাজারে ‘উর্ধ্বাঙ্গ উন্মুক্ত’ অবস্থায় রাখার বিধান ছিল। এমনকি সে যদি সঙ্গমের উপযুক্ত হয় (তা সাত বা নয় বছর যাই হোক), তবুও তাকে কেবল নাভি থেকে নিচ পর্যন্ত একটি কাপড়ে আবৃত করে বুক-পিঠ খোলা অবস্থায় বিক্রির জন্য পেশ করা যেত [8]। বর্তমান যুগে আমরা একে সরাসরি ‘চাইল্ড পর্নোগ্রাফি’ বা ‘পেডোফিলিয়া’র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বলতে পারি। ধর্মের আবরণে শিশুদের শরীরকে ক্রেতাদের সামনে এভাবে প্রদর্শন করা মানবিক দেউলিয়াগ্রস্ততার এক চূড়ান্ত নিদর্শন।
৪. সতর বা আবরণের দ্বিমুখী মানদণ্ডঃ ইসলামে যেখানে স্বাধীন নারীর (আযাদ নারী) জন্য কঠোর পর্দার কথা বলা হয়েছে, সেখানে দাসী নারীর ক্ষেত্রে ‘সতর’ বা ঢেকে রাখার বিধানটি করা হয়েছে অত্যন্ত শিথিল। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, একজন ক্রীতদাসীর সতর মূলত একজন পুরুষের সতরের সমান (নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত)। এই বৈষম্যমূলক আইনটিই বাজারে নারীদের অর্ধনগ্ন অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখার সুযোগ করে দিয়েছিল। এর মাধ্যমে সমাজকে এই বার্তাই দেওয়া হতো যে—আভিজাত্য এবং সম্মান কেবল স্বাধীন নারীদের জন্য, আর দাসীরা হলো স্রেফ ভোগ্যপণ্য যাদের কোনো লজ্জা বা সম্মানের অধিকার নেই।
আধুনিক মানবাধিকার বনাম মধ্যযুগীয় ফিকহ্: একটি আদর্শিক ও নৈতিক ব্যবচ্ছেদ
মধ্যযুগীয় ফিকহী বিধান এবং আধুনিক মানবাধিকারের মূল সংঘাতটি কেবল আইনের নয়, বরং এটি মানুষের মৌলিক সংজ্ঞার সংঘাত। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিটি মানুষকে ‘জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং মর্যাদাবান’ হিসেবে গণ্য করে। পক্ষান্তরে, আমরা যে আইনি দলিলগুলো পর্যালোচনা করেছি, সেখানে মানুষকে দেখা হয়েছে স্রেফ একটি ‘উপযোগিতা’ বা ‘পণ্য’ হিসেবে। এই দুই দর্শনের মধ্যকার ফাটলগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. ব্যক্তিসত্তা বনাম পণ্যকরণ (Commodification): আধুনিক মানবাধিকারের প্রথম অনুচ্ছেদ (UDHR, Article 1) ঘোষণা করে যে, সকল মানুষ স্বাধীনভাবে এবং সমান মর্যাদা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু মুখতাসারুল কুদুরী বা হিদায়ার মতো গ্রন্থে মানুষকে ‘মাল’ বা সম্পত্তি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। যখন কোনো আইন বলে যে, ‘মুখে বা বগলে দুর্গন্ধ’ থাকলে একজন নারীকে বিক্রেতার কাছে ফেরত দেওয়া যাবে কারণ এটি ‘যৌন মিলনের পথে অন্তরায়’ [9], তখন সেই নারীর ব্যক্তিসত্তা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়। আধুনিক নীতিশাস্ত্রে একে বলা হয় ‘Dehumanization’ বা অমানবিকীকরণ, যেখানে একজন মানুষের মূল্য তার মেধা বা সত্তায় নয়, বরং তার শরীরের ঘ্রাণ বা অঙ্গের নিখুঁত অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
২. যৌন স্বায়ত্তশাসন বনাম মালিকানা: আধুনিক আইন ও নীতিশাস্ত্রে ‘যৌন স্বায়ত্তশাসন’ (Sexual Autonomy) একটি অলঙ্ঘনীয় অধিকার। অর্থাৎ, নিজের শরীরের ওপর কেবল ব্যক্তির নিজেরই অধিকার রয়েছে এবং ‘সম্মতি’ (Consent) ছাড়া যেকোনো শারীরিক স্পর্শ যৌন নিপীড়ন হিসেবে গণ্য। কিন্তু ফিকহী বিধানে আমরা দেখছি, ক্রেতা কেবল কেনার ইচ্ছা করলেই একজন নারীর বুক, পিঠ বা পায়ের নলি স্পর্শ করতে পারে, এমনকি এতে ক্রেতার কামভাব জাগ্রত হলেও তা বৈধ [7]। আধুনিক নীতিশাস্ত্রের আলোকে এটি একটি কাঠামোগত ধর্ষণকামী সংস্কৃতি (Rape Culture), যেখানে নারীর শরীরের গোপনীয়তা বা সম্মতির কোনো স্থান নেই; বরং পুরুষের ‘ক্রেতা-অধিকার’ বা ‘মালিকানা-স্বত্ব’ই সেখানে মুখ্য।
৩. কুমারীত্বের বাণিজ্যিকীকরণ ও লৈঙ্গিক সহিংসতা: কুমারীত্বের পর্দা (Hymen) পরীক্ষা করার যে আইনি বৈধতা হিদায়া প্রদান করেছে, তা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং মানবাধিকারের দৃষ্টিতে চরম অবমাননাকর ও আক্রমণাত্মক [10]। আধুনিক জমানায় একে ‘Virginity Testing’ বলা হয়, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং লৈঙ্গিক সহিংসতা হিসেবে চিহ্নিত। মধ্যযুগীয় এই বিধানটি প্রমাণ করে যে, সেখানে নারীর সতীত্ব বা কুমারীত্ব কোনো সম্মানজনক বিষয় ছিল না, বরং এটি ছিল পণ্যের একটি ‘মানদণ্ড’ (Quality Check), যা নষ্ট হলে ক্রেতার আর্থিক ক্ষতির প্রশ্ন উঠত। একজন মানুষের শরীরকে এভাবে ‘যান্ত্রিক পরীক্ষার’ অধীন করা আদিম বর্বরতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
৪. শিশুদের সুরক্ষা বনাম শৈশব নিগ্রহ: বর্তমান বিশ্বে শিশুদের সুরক্ষা ও তাদের শারীরিক অখণ্ডতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব। অথচ ফিকহী বিধান বলছে, কিশোরী দাসীদের বালেগা হওয়ার আগ পর্যন্ত বুক ও পিঠ খোলা অবস্থায় বাজারে প্রদর্শন করা যাবে [8]। এমনকি সাত বা নয় বছরের শিশুদেরও যৌন উপযোগী মনে করা হলে তাদের বাজারে পেশ করার যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তা আধুনিক অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় ‘Child Sexual Exploitation’ বা শিশু যৌন শোষণ। ধর্মের দোহাই দিয়ে শিশুদের শৈশবকে এভাবে নিলামে তোলা যেকোনো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষের জন্য এক বিরাট নৈতিক চ্যালেঞ্জ।
৫. পর্দার দ্বিমুখী মানদণ্ড ও সামাজিক বৈষম্য: ইসলামে পর্দার বিধানকে প্রায়শই ‘নারীর সুরক্ষাকবচ’ হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু দাসীদের ক্ষেত্রে সেই একই বিধান কেন এত শিথিল? কেন একজন দাসীর পেট ও পিঠ বাজারে খোলা রাখা বৈধ ছিল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের ‘শ্রেণিবিভাগ’-এ। ফিকহী আইন অনুযায়ী, সম্মান ও গোপনীয়তা কেবল ‘স্বাধীন’ নারীদের জন্য সংরক্ষিত, আর দাসীরা হলো সাধারণ ভোগ্যপণ্য। এই দ্বিমুখী মানদণ্ড প্রমাণ করে যে, পর্দার বিধানটি আসলে আধ্যাত্মিক নয়, বরং এটি ছিল একটি সামাজিক পদমর্যাদার প্রতীক। যার টাকা নেই বা যে যুদ্ধে হেরে গিয়ে দাসী হয়েছে, তার লজ্জা বা গোপনীয়তা রক্ষার কোনো অধিকার ইসলামী আইনশাস্ত্র স্বীকার করেনি।
আপনার নির্দেশিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এই গবেষণামূলক প্রবন্ধের সর্বশেষ পরিচ্ছেদ অর্থাৎ উপসংহার নিচে উপস্থাপিত হলো। এখানে আমরা পুরো আলোচনার সারসংক্ষেপ এবং ‘ঐশী দয়া’র বিপরীতে প্রাপ্ত দালিলিক নিষ্ঠুরতার একটি চূড়ান্ত বিশ্লেষণ করব।
উপসংহারঃ ‘সর্বজনীন দয়া’ ও দালিলিক বাস্তবতার দ্বান্দ্বিকতা
আমরা এই দীর্ঘ আলোচনায় ধ্রুপদী ইসলামী ফিকহ্ শাস্ত্রের অন্ধকার অলিগলি অতিক্রম করেছি। আমরা দেখেছি কীভাবে একজন মানুষের রক্ত-মাংসের অস্তিত্বকে স্রেফ একটি ‘পণ্য’ বা ‘নির্জীব বস্তুর’ স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। আধুনিক যুগে অনেক মুসলিম প্রচারক দাবি করেন যে, ইসলামে দাসপ্রথা ছিল একটি ‘সহমর্মিতার ব্যবস্থা’ এবং এটি দাসদের মর্যাদা দান করেছে। কিন্তু আমরা যখন আশরাফুল হিদায়া বা মুখতাসারুল কুদুরীর মতো প্রামাণ্য আইনগ্রন্থগুলোর মাসআলাগুলো নির্মোহভাবে পাঠ করি, তখন সেই ‘দয়া’র দাবি এক বিশাল প্রহাসনে পরিণত হয়।
ইতিহাসের এই নির্মোহ ব্যবচ্ছেদই হতে পারে গোঁড়ামিমুক্ত একটি নতুন মানবিক বিশ্ব গড়ার প্রথম পদক্ষেপ। যেখানে কোনো মানুষ অন্য মানুষের মালিক হবে না এবং কারো শরীর কোনো বাজারের নিলামের বস্তু হয়ে উঠবে না।
তথ্যসূত্রঃ
- Dabiq, Issue 4, “The Revival of Slavery Before the Hour” ↩︎
- The Role of Women and Girls in the Eyes of Islamic State: A Content Analysis of Dabiq and Rumiyah Magazines Stempień, Marta Sara ↩︎
- UN Report on ISIS Crimes against Yazidis, 2016 ↩︎
- আল- মিসবাহুন নূরী শরহে মুখতাসারুল কুদুরী, প্রথম খণ্ড, ইসলামিয়া কুতুবখানা, পৃষ্ঠা ২৩০ ↩︎
- আশরাফুল হিদায়া, ইসলামিয়া কুতুবখানা, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১৮, ৬১৯ ↩︎
- আশরাফুল হিদায়া, ইসলামিয়া কুতুবখানা, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৯৬ ↩︎
- আশরাফুল হিদায়া, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১৮ 1 2
- আশরাফুল হিদায়া, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১৯ 1 2
- আল-মিসবাহুন নূরী শরহে মুখতাসারুল কুদুরী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩০ ↩︎
- আশরাফুল হিদায়া, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৯৬ ↩︎
