কসমিক ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন (CMB)- বিগ ব্যাং তত্ত্বের বাস্তব প্রমাণ

ভূমিকা

মহাবিশ্বের উৎপত্তি, বিবর্তন এবং এর চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে মানুষের আদিম কৌতূহল সভ্যতার ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। আদিমকাল থেকে বিভিন্ন দার্শনিক মতবাদ এবং ধর্মীয় ধর্মগ্রন্থগুলো মহাবিশ্বের সৃষ্টি নিয়ে নানা কাল্পনিক ও বিশ্বাস-নির্ভর ব্যাখ্যা প্রদান করে এসেছে, তবে আধুনিক বিজ্ঞানের মানদণ্ডে এসব ব্যাখ্যার পেছনে কোনো পর্যবেক্ষণমূলক বা পরীক্ষামূলক প্রমাণ পাওয়া যায় না [1]। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এবং এডউইন হাবলের গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণের ফলে মহাজাগতিক চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন আসে, যা মহাবিশ্বকে একটি স্থির অবস্থার পরিবর্তে প্রসারণশীল হিসেবে চিহ্নিত করে [2]। বর্তমান কসমোলজির সবচেয়ে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য ভিত্তি হলো বিগ ব্যাং তত্ত্ব (Big Bang Theory), যা প্রস্তাব করে যে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে মহাবিশ্ব একটি অতি উষ্ণ ও অসীম ঘন বিন্দু থেকে সৃষ্টি হয়ে ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। এই তত্ত্বের সত্যতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অকাট্য এবং বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ হলো কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন (Cosmic Microwave Background Radiation বা CMB) [3]

১৯৬৫ সালে এই আদিম বিকিরণের আকস্মিক আবিষ্কার মহাবিশ্বের উৎপত্তি সংক্রান্ত বিতর্কগুলোর অবসান ঘটায় এবং প্রমাণ করে যে মহাবিশ্বের এক সময় অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন দশা ছিল [4]। CMB-কে মহাবিশ্বের ‘বেবি ফটো’ বা আদিম অবস্থার অবশিষ্টাংশ বলা হয়, যা আজও মহাকাশের প্রতিটি প্রান্তে মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গ হিসেবে বিদ্যমান। এই প্রবন্ধে আমরা CMB-এর বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা, এর ঐতিহাসিক আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট, বিগ ব্যাং তত্ত্বের সাথে এর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক এবং আধুনিক স্যাটেলাইট মিশনের (যেমন COBE, WMAP এবং Planck) প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মহাবিশ্বের বয়স ও উপাদান নির্ধারণের বিষয়গুলো বিস্তারিত ও যুক্তিপূর্ণভাবে বিশ্লেষণ করব।


কসমিক ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য

কসমিক ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন কী?

কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (CMB) হলো মহাবিশ্বের আদিম অবস্থার একটি অবশিষ্টাংশ বা ‘আফটারগ্লো’, যা সমগ্র মহাকাশ জুড়ে প্রায় সমানভাবে ছড়িয়ে আছে। বিগ ব্যাং-এর পরবর্তী কয়েক লক্ষ বছর পর্যন্ত মহাবিশ্ব ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত এবং সেখানে আয়নিত প্লাজমার আধিক্য ছিল, যার ফলে ফোটনগুলো (আলোর কণা) মুক্তভাবে চলাচল করতে পারতো না। বিগ ব্যাং-এর প্রায় ৩,৮০,০০০ বছর পর মহাবিশ্বের তাপমাত্রা কমে প্রায় ৩,০০০ কেলভিনে নেমে আসে [5]

এই শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায় প্রোটন এবং ইলেকট্রন একত্রিত হয়ে নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন পরমাণু গঠন করে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘রিকম্বিনেশন’ (Recombination) বলা হয়। এই ঘটনার ফলে ফোটনগুলো পদার্থের সাথে অনবরত সংঘর্ষ থেকে মুক্তি পায় এবং মহাবিশ্ব স্বচ্ছ হয়ে ওঠে; এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় ‘ফোটন ডিকাপলিং’ (Photon Decoupling) [6]। এই মুক্ত হওয়া আদিম ফোটনগুলোই আজকের CMB, যা মহাবিশ্বের শুরুর দিকের একটি সরাসরি চিত্র তুলে ধরে। ১৯৬৫ সালে আরনো পেনজিয়াস এবং রবার্ট উইলসন এই বিকিরণ আবিষ্কার করেন, যা বিগ ব্যাং তত্ত্বের জন্য এক অকাট্য পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃত হয় [4]


CMB-এর তাপমাত্রা ও বিকিরণ শক্তির বৈশিষ্ট্য

CMB-এর বর্তমান বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্যগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং এটি আধুনিক কসমোলজির সবচেয়ে নিখুঁতভাবে পরিমাপকৃত তথ্যগুলোর একটি:

আইসোট্রপি ও অ্যানিসোট্রপি: CMB প্রায় সম্পূর্ণভাবে আইসোট্রপিক, অর্থাৎ আকাশের সব দিকে এর তাপমাত্রা সমান। তবে এতে অতি ক্ষুদ্র তাপমাত্রার পার্থক্য (Fluctuations) রয়েছে, যা প্রতি ১ লক্ষ ভাগে মাত্র ১ ভাগ। এই সামান্য অসমানতাই (Anisotropy) প্রমাণ করে যে মহাবিশ্বের শুরুর দিকে ভরের ঘনত্বের পার্থক্য ছিল, যা পরবর্তীকালে গ্যালাক্সি ও নক্ষত্র গঠনের বীজ হিসেবে কাজ করেছে [7]

তাপমাত্রা: মহাবিশ্বের ক্রমাগত সম্প্রসারণের ফলে আদিম সেই উষ্ণ বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পেয়েছে (যাকে কসমোলজিক্যাল রেডশিফট বলা হয়)। ফলে এর বর্তমান গড় তাপমাত্রা নেমে এসেছে মাত্র ২.৭২৫ কেলভিনে ($2.725 \text{ K}$) [8]

পারফেক্ট ব্ল্যাকবডি স্পেকট্রাম: ১৯৯০-এর দশকে COBE স্যাটেলাইটের FIRAS যন্ত্র নিশ্চিত করে যে, CMB একটি নিখুঁত ব্ল্যাকবডি রেডিয়েশন বা কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ বর্ণালী অনুসরণ করে। এটি প্রমাণ করে যে আদি মহাবিশ্ব ছিল থার্মাল ইকুয়ালিব্রিয়াম বা তাপীয় সাম্যাবস্থায়, যা কোনো নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি থেকে আসা বিকিরণ দ্বারা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয় [9]


বিগ ব্যাং তত্ত্ব ও মহাবিশ্বের উৎপত্তি

বিগ ব্যাং তত্ত্বের মূল ধারণা

আধুনিক কসমোলজির প্রধান ভিত্তি হলো বিগ ব্যাং তত্ত্ব, যা অনুযায়ী মহাবিশ্ব আজ থেকে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে একটি অসীম ঘন এবং প্রচণ্ড উত্তপ্ত বিন্দু (সিঙ্গুলারিটি) থেকে যাত্রা শুরু করে। এটি কোনো সাধারণ বিস্ফোরণ নয়, বরং স্থান ও কালের (Space and Time) একটি অত্যন্ত দ্রুত প্রসারণ [10]। এই তত্ত্বটি অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের গাণিতিক সমাধান এবং আলেকজান্ডার ফ্রিডম্যান ও জর্জ লেমেটারের প্রসারণশীল মহাবিশ্বের মডেলের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। প্রসারণের ফলে মহাবিশ্বের শক্তি ঘনত্ব ও তাপমাত্রা কমতে থাকে, যা পরবর্তীতে কোয়ার্ক, লেপটন এবং সবশেষে পরমাণু গঠনের পরিবেশ তৈরি করে।

বিগ ব্যাং তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক প্রমাণসমূহ

বিগ ব্যাং তত্ত্ব কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং এটি তিনটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে:

গ্যালাক্সির লাল সরণ ও হাবলের সূত্র
১৯২৯ সালে এডউইন হাবল লক্ষ্য করেন যে, দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং তাদের দূরত্ব যত বেশি, সরে যাওয়ার গতিও তত বেশি। একে ‘হাবলের সূত্র’ বলা হয়, যা প্রমাণ করে মহাবিশ্ব স্থির নয় বরং প্রসারিত হচ্ছে [11]
কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (CMB)
এটি মহাবিশ্বের শুরুর দিকের সেই প্রচণ্ড তাপের অবশিষ্টাংশ। বিগ ব্যাং তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্ব এক সময় অত্যন্ত ঘন ও উত্তপ্ত ছিল, এই বিকিরণ তারই সরাসরি প্রমাণ দেয় [12]
বিগ ব্যাং নিউক্লিওসিন্থেসিস (BBN)
মহাবিশ্বের প্রথম কয়েক মিনিটে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম এবং লিথিয়ামের মতো হালকা মৌলগুলোর আপেক্ষিক অনুপাত নির্ধারিত হয়েছিল। বর্তমান মহাবিশ্বে এই মৌলগুলোর যে পরিমাণ (প্রায় ৭৫% হাইড্রোজেন এবং ২৫% হিলিয়াম) দেখা যায়, তা বিগ ব্যাং মডেলের গাণিতিক হিসাবের সাথে হুবহু মিলে যায় [13]

CMB আবিষ্কারের ইতিহাস ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা

আরনো পেনজিয়াস ও রবার্ট উইলসনের আকস্মিক আবিষ্কার

কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের আবিষ্কার বিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং নাটকীয় ঘটনা। ১৯৬৪-৬৫ সালে নিউ জার্সির বেল ল্যাবরেটরিজে কাজ করার সময় দুই রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানী, আরনো পেনজিয়াস (Arno Penzias) এবং রবার্ট উইলসন (Robert Wilson), তাদের ২০ ফুটের বিশাল ‘হর্ন অ্যান্টেনা’ ব্যবহার করে একটি অদ্ভুত শব্দ বা ‘নয়েজ’ (Noise) লক্ষ্য করেন। এটি কোনো নির্দিষ্ট দিক থেকে আসছিল না, বরং আকাশের সব দিক থেকেই সমানভাবে পাওয়া যাচ্ছিল। প্রথমে তারা ভেবেছিলেন এটি যন্ত্রের ত্রুটি অথবা অ্যান্টেনার ভেতরে থাকা পায়রার মলমূত্রের কারণে ঘটছে [4]

সব পরিষ্কার করার পরেও যখন সেই সংকেত (যাকে বিজ্ঞানীরা প্রায় $৩.৫ \text{ K}$ এর অতিরিক্ত তাপমাত্রা হিসেবে চিহ্নিত করেন) বন্ধ হলো না, তখন তারা উপলব্ধি করেন এটি কোনো পার্থিব উৎস নয়, বরং মহাজাগতিক উৎস থেকে আসছে। একই সময় প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট ডিকি এবং তার দল তাত্ত্বিকভাবে এমন একটি বিকিরণের অস্তিত্ব সম্পর্কে কাজ করছিলেন। তারা বুঝতে পারেন যে পেনজিয়াস এবং উইলসন আসলে বিগ ব্যাং-এর অবশিষ্টাংশ খুঁজে পেয়েছেন, যা ১৯৪০-এর দশকে জর্জ গ্যামো এবং তার সহকর্মীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন [14]


বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি ও পরবর্তী মহাকাশ মিশনসমূহ

এই আবিষ্কার বিগ ব্যাং তত্ত্বকে এক অদম্য ভিত্তি দান করে এবং ১৯৭৮ সালে পেনজিয়াস ও উইলসন তাদের এই অসামান্য কাজের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তবে গ্রাউন্ড-বেসড টেলিস্কোপের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের হস্তক্ষেপের কারণে CMB-এর পূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁত তথ্য পাওয়া কঠিন ছিল। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলো একাধিক উন্নত মিশন পরিচালনা করে:

COBE (Cosmic Background Explorer): ১৯৮৯ সালে নাসা এই স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করে। এটি প্রথমবারের মতো প্রমাণ করে যে CMB-এর বর্ণালী একটি নিখুঁত ব্ল্যাকবডি বর্ণালী এবং এতে অতি ক্ষুদ্র তাপমাত্রার পার্থক্য বা অ্যানিসোট্রপি বিদ্যমান। এই সাফল্যের জন্য ২০০৬ সালে জন ম্যাথার এবং জর্জ স্মুট নোবেল পুরস্কার পান [9]

WMAP ও Planck: ২০০১ সালে উৎক্ষেপিত WMAP এবং ২০০৯ সালের Planck মিশন CMB-এর আরও উচ্চ-রেজোলিউশন মানচিত্র তৈরি করে। বিশেষ করে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার Planck মিশন মহাবিশ্বের বয়স, গঠন এবং প্রসারণের হার সম্পর্কে সবচেয়ে নির্ভুল তথ্য প্রদান করেছে [5]। বিজ্ঞানী সম্প্রদায় এই আবিষ্কারগুলোকে আধুনিক কসমোলজির ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে গ্রহণ করেছে।


CMB ও মহাবিশ্বের আদিম অবস্থার প্রমাণ

আদিম বিকিরণ ও মহাবিশ্বের “বেবি ফটো”

কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (CMB) রেডিয়েশনকে মহাবিশ্বের একটি “বেবি ফটো” বা শৈশবকালীন আলোকচিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি যখন মহাবিশ্বের বয়স ছিল মাত্র ৩,৮০,০০০ বছর। এর আগে মহাবিশ্ব ছিল একটি ঘন ও অস্বচ্ছ প্লাজমা মেঘের মতো, যেখানে আলো মুক্তভাবে চলাচল করতে পারতো না। কিন্তু রিকম্বিনেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মহাবিশ্ব যখন স্বচ্ছ হয়ে ওঠে, তখন প্রথম যে আলোগুলো ছড়িয়ে পড়েছিল, সেগুলোই আজ মাইক্রোওয়েভ হিসেবে আমরা দেখতে পাই [6]। এই বিকিরণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, আদি মহাবিশ্ব অত্যন্ত উত্তপ্ত এবং প্রায় সুষম (Uniform) ছিল। তবে এই সুষম অবস্থার মধ্যেও তাপমাত্রার অত্যন্ত ক্ষুদ্র কিছু তারতম্য ছিল, যাকে বলা হয় ‘অ্যানিসোট্রপি’ (Anisotropy)। প্রতি ১ লক্ষ ভাগে মাত্র ১ ভাগ তাপমাত্রার এই পার্থক্যগুলোই প্রমাণ করে যে আদি মহাবিশ্বে ভরের ঘনত্বের পার্থক্য বিদ্যমান ছিল, যা পরবর্তীতে মহাকর্ষীয় টানের ফলে গ্যালাক্সি, নক্ষত্র এবং বৃহৎ মহাজাজতিক কাঠামো গঠনে বীজের ভূমিকা পালন করেছে [7]


CMB থেকে প্রাপ্ত মহাবিশ্বের বয়স ও গঠন

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে মহাবিশ্বের নিখুঁত পরিমাপের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ESA) Planck Satellite মিশন এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এই মিশনের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমরা মহাবিশ্বের বয়স এবং এর অভ্যন্তরে থাকা বিভিন্ন উপাদানের অনুপাত সম্পর্কে সবচেয়ে নির্ভুল ধারণা পাই:

মহাবিশ্বের বয়স
Planck মিশন অনুসারে মহাবিশ্বের বর্তমান বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর (সুনির্দিষ্টভাবে বললে ১৩.৭৮৭ ± ০.০২০ বিলিয়ন বছর) [15]। এই হিসেবটি হাবলের ধ্রুবক এবং মহাবিশ্বের প্রসারণ হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ডার্ক এনার্জি (Dark Energy)
উপাদানের অনুপাত: CMB-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের একটি পূর্ণাঙ্গ বাজেট তৈরি করেছেন, যা স্ট্যান্ডার্ড কসমোলজিক্যাল মডেল বা ΛCDM মডেল-কে সমর্থন করে: মহাবিশ্বের মোট উপাদানের প্রায় ৬৮.৫% হলো এই রহস্যময় শক্তি, যা মহাবিশ্বের ত্বরান্বিত প্রসারণের জন্য দায়ী।
ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter)
মহাবিশ্বের প্রায় ২৬.৮% হলো অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটার, যা আলো বিচ্ছুরণ বা শোষণ করে না কিন্তু মহাকর্ষীয় প্রভাবের মাধ্যমে গ্যালাক্সিকে ধরে রাখে।
সাধারণ পদার্থ (Baryonic Matter)
আমরা যা কিছু চোখে দেখি—যেমন নক্ষত্র, গ্রহ, মানুষ এবং অণু-পরমাণু—তা মহাবিশ্বের মোট ভরের মাত্র ৪.৯% [15]

এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, আমরা যা দেখি তা মহাবিশ্বের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র এবং অধিকাংশ মহাবিশ্বই আমাদের কাছে আজও রহস্যময় রয়ে গেছে।


উপসংহার

কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড বা CMB কেবল একটি মহাজাগতিক বিকিরণ নয়, এটি মহাবিশ্বের আদিম ইতিহাসের এক অকাট্য ও জীবন্ত দলিল। এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে যে মহাবিশ্ব কোনো আকস্মিক বা ব্যাখ্যাতীত ঘটনার ফল নয়, বরং এটি নির্দিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মেনে একটি অতি উষ্ণ ও ঘন দশা থেকে বিবর্তিত হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানের এই অসামান্য অর্জন আমাদের দেখিয়েছে যে, আমরা যখনই পুরনো রেডিওর স্থির শব্দ শুনি বা এনালগ টেলিভিশনের ঝিরঝিরে পর্দায় “সাদা নয়েজ” দেখি, আমরা আসলে মহাবিশ্বের জন্মের সেই আদিম প্রতিধ্বনিই অনুভব করি [4]

COBE, WMAP এবং বিশেষ করে Planck-এর মতো মহাকাশ মিশনগুলোর মাধ্যমে আমরা মহাবিশ্বের যে উচ্চ-রেজোলিউশন মানচিত্র পেয়েছি, তা আমাদের কেবল অতীতের কথাই বলে না, বরং মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ বিবর্তন সম্পর্কেও অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ধারণা দেয়। তবে CMB-এর রহস্যের সমাধান এখানেই শেষ নয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বর্তমান লক্ষ্য হলো CMB-এর পোলারাইজেশন (Polarization) এবং আদিম মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (Primordial Gravitational Waves) বিশ্লেষণ করা। এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের জন্মের প্রথম সেকেন্ডের ক্ষুদ্রতম ভগ্নাংশ সময়ে ঘটা ‘কসমিক ইনফ্লেশন’ বা অতি-দ্রুত প্রসারণের রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে [5]

পরিশেষে বলা যায়, ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচনে CMB-এর এই তথ্যগুলোই বর্তমানে বিজ্ঞানীদের প্রধান পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছে। এই আবিষ্কারটি মানবজাতিকে একটি সুসংগত, তথ্যনির্ভর এবং গাণিতিকভাবে সঠিক বিশ্ববীক্ষা প্রদান করেছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অসীম এই মহাবিশ্বের তুলনায় আমরা দৈহিক আকারে ক্ষুদ্র হলেও, আমাদের বুদ্ধি ও বিজ্ঞানের সাহায্যে আমরা মহাবিশ্বের সেই আদিম ঊষালগ্নকেও পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়েছি [9]


প্রাসঙ্গিক বইপত্র

  • Alpher, R. A., Bethe, H., & Gamow, G. (1948). The Origin of Chemical Elements. Physical Review, 73(7), 803-804. [16]
  • Dicke, R. H., Peebles, P. J. E., Roll, P. G., & Wilkinson, D. T. (1965). Cosmic Black-Body Radiation. The Astrophysical Journal, 142, 414-419. [17]
  • Einstein, A. (1917). Kosmologische Betrachtungen zur allgemeinen Relativitätstheorie. Sitzungsberichte der Preußischen Akademie der Wissenschaften. [18]
  • Fixsen, D. J. (2009). The Temperature of the Cosmic Microwave Background. The Astrophysical Journal, 707(2), 916-920. [19]
  • Hawking, S. W., & Ellis, G. F. R. (1973). The Large Scale Structure of Space-Time. Cambridge University Press. [20]
  • Hubble, E. (1929). A relation between distance and radial velocity among extra-galactic nebulae. Proceedings of the National Academy of Sciences, 15(3), 168-173. [21]
  • Longair, M. S. (2006). The Cosmic Century: A History of Astrophysics and Cosmology. Cambridge University Press. [22]
  • Mather, J. C., et al. (1994). Measurement of the Cosmic Microwave Background Spectrum by the COBE FIRAS Instrument. The Astrophysical Journal, 420, 439. [23]
  • Penzias, A. A., & Wilson, R. W. (1965). A Measurement of Excess Antenna Temperature at 4080 Mc/s. The Astrophysical Journal, 142, 419-421. [24]
  • Planck Collaboration. (2020). Planck 2018 results. VI. Cosmological parameters. Astronomy & Astrophysics, 641, A6. [25]
  • Ryden, B. (2017). Introduction to Cosmology. Cambridge University Press. [26]
  • Smoot, G. F., et al. (1992). Structure in the COBE Differential Microwave Radiometer First-Year Maps. The Astrophysical Journal, 396, L1-L5. [27]

তথ্যসূত্রঃ
  1. Longair, M. S. (2006). The Cosmic Century: A History of Astrophysics and Cosmology. Cambridge University Press. ↩︎
  2. Einstein, A. (1917). Kosmologische Betrachtungen zur allgemeinen Relativitätstheorie. Sitzungsberichte der Preußischen Akademie der Wissenschaften. ↩︎
  3. Peebles, P. J. E. (1993). Principles of Physical Cosmology. Princeton University Press. ↩︎
  4. Penzias, A. A., & Wilson, R. W. (1965). A Measurement of Excess Antenna Temperature at 4080 Mc/s. The Astrophysical Journal, 142, 419-421. 1 2 3 4
  5. Planck Collaboration. (2020). Planck 2018 results. VI. Cosmological parameters. Astronomy & Astrophysics, 641, A6. 1 2 3
  6. Ryden, B. (2017). Introduction to Cosmology. Cambridge University Press. 1 2
  7. Smoot, G. F., et al. (1992). Structure in the COBE Differential Microwave Radiometer First-Year Maps. The Astrophysical Journal, 396, L1-L5. 1 2
  8. Fixsen, D. J. (2009). The Temperature of the Cosmic Microwave Background. The Astrophysical Journal, 707(2), 916-920. ↩︎
  9. Mather, J. C., et al. (1994). Measurement of the Cosmic Microwave Background Spectrum by the COBE FIRAS Instrument. The Astrophysical Journal, 420, 439. 1 2 3
  10. Hawking, S. W., & Ellis, G. F. R. (1973). The Large Scale Structure of Space-Time. Cambridge University Press. ↩︎
  11. Hubble, E. (1929). A relation between distance and radial velocity among extra-galactic nebulae. Proceedings of the National Academy of Sciences, 15(3), 168-173. ↩︎
  12. Penzias, A. A., & Wilson, R. W. (1965). A Measurement of Excess Antenna Temperature at 4080 Mc/s. The Astrophysical Journal, 142, 419-421. ↩︎
  13. Alpher, R. A., Bethe, H., & Gamow, G. (1948). The Origin of Chemical Elements. Physical Review, 73(7), 803-804. ↩︎
  14. Dicke, R. H., et al. (1965). Cosmic Black-Body Radiation. The Astrophysical Journal, 142, 414-419. ↩︎
  15. Planck Collaboration. (2020). Planck 2018 results. VI. Cosmological parameters. Astronomy & Astrophysics, 641, A6. 1 2
  16. এটি বিগ ব্যাং নিউক্লিওসিন্থেসিসের গাণিতিক ভিত্তি প্রদান করে। ↩︎
  17. CMB-এর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এবং এর গুরুত্ব নিয়ে মৌলিক গবেষণাপত্র। ↩︎
  18. সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের কসমোলজিক্যাল প্রয়োগ। ↩︎
  19. CMB-এর বর্তমান গড় তাপমাত্রার সবচেয়ে নির্ভুল পরিমাপ। ↩︎
  20. মহাবিশ্বের গঠন এবং সিঙ্গুলারিটি নিয়ে আকর গ্রন্থ। ↩︎
  21. মহাবিশ্বের প্রসারণ এবং হাবলের সূত্রের মূল ভিত্তি। ↩︎
  22. কসমোলজির বিবর্তন ও ইতিহাস সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা। ↩︎
  23. CMB-এর ব্ল্যাকবডি বর্ণালী নিশ্চিতকারী ঐতিহাসিক গবেষণা। ↩︎
  24. CMB আবিষ্কারের মূল গবেষণাপত্র। ↩︎
  25. মহাবিশ্বের বয়স এবং উপাদানের অনুপাত সংক্রান্ত আধুনিক ও নির্ভুল তথ্য। ↩︎
  26. কসমোলজির গাণিতিক ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার জন্য পাঠ্যবই। ↩︎
  27. CMB-এর অ্যানিসোট্রপি বা তাপমাত্রার তারতম্য আবিষ্কারের প্রমাণ। ↩︎