
Table of Contents
ভূমিকা
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী “সৃষ্টির শুরুতে” আল্লাহ কী সৃষ্টি করেছিলেন—এই প্রশ্নটি শুধু ধর্মীয় আধ্যাত্মিক বিষয়াদি নয়; এর সঙ্গে জড়িত আছে একটি বড় দাবিও: মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে ইসলামী বর্ণনা বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? কারণ, কোনো বর্ণনা যদি “প্রথম পদার্থ/প্রথম উপাদান/প্রথম ঘটনা” নিয়ে কথা বলে, তাহলে সেটি অবধারিতভাবে বাস্তব জগতের বিজ্ঞানের (physics–cosmology–chemistry) কিছু মৌলিক নিয়মের সঙ্গে ধাক্কা খাবে বা মিলবে। এই প্রবন্ধে তাই আমরা একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করব—ধর্মীয় টেক্সটগুলো কী দাবি করছে, বিজ্ঞান কী জানায়, এবং দু’টির মধ্যে সংঘাত হলে সেটি যুক্তির আলোকে কীভাবে বোঝা যায়।
“প্রথম পদার্থ” বলতে বিজ্ঞান কী বোঝে?
বিজ্ঞানের ভাষায় “প্রথম পদার্থ” বলতে সাধারণত বোঝানো হয় মহাবিশ্বের আদিম পর্যায়ে গঠিত মৌলিক উপাদান—যেগুলো থেকে পরে পরমাণু, অণু, নক্ষত্র, গ্রহ ইত্যাদি তৈরি হয়। স্কুল পর্যায়ে আমরা পর্যায় সারণির মৌল নিয়ে পড়ি: বর্তমানে ১১৮টি মৌল শনাক্ত; এর মধ্যে একটি বড় অংশ প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়, এবং বাকিগুলো কৃত্রিমভাবে (ল্যাব/রিঅ্যাক্টর) তৈরি। মৌল চেনার সবচেয়ে সরল সূচক হলো পারমাণবিক সংখ্যা—একই মৌলের প্রতিটি পরমাণুতে প্রোটন সংখ্যা একই।
একই মৌলের ভেতরেও আইসোটোপ থাকতে পারে—প্রোটন একই, কিন্তু নিউট্রন ভিন্ন; ফলে ভর সংখ্যা ভিন্ন। এগুলো রসায়ন ও নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আদিম মহাবিশ্বে কোন আইসোটোপ কতটা তৈরি হলো—এটা মহাবিশ্বের ইতিহাস বোঝার কেন্দ্রীয় ডেটা।
আধুনিক কসমোলজি অনুযায়ী মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায়ে (মহাবিস্ফোরণ/বৃহৎ সম্প্রসারণের পর) সবচেয়ে বেশি তৈরি হয় হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম; সামান্য পরিমাণে লিথিয়াম/ডিউটেরিয়ামও। এর মানে দাঁড়ায়: মহাবিশ্বের “আদিম বস্তু-তালিকা”তে পানি নেই—কারণ পানি (H2O) হলো একটি অণু; তা তৈরি হতে হলে অন্তত হাইড্রোজেন + অক্সিজেন দরকার, এবং অক্সিজেন নিজেই আদিম পর্যায়ে তৈরি হয় না—এটি মূলত নক্ষত্রে নিউক্লিয়ার ফিউশনের ফল। তাই বিজ্ঞানের মানদণ্ডে পানি হলো পরবর্তী/দেরিতে তৈরি হওয়া পদার্থ, “প্রথম পদার্থ” নয়।
সৃষ্টির আগে “পানি”-র উপর আরশ
কোরআনে এমন একটি বর্ণনা আছে যেখানে বলা হয়—”আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির আগে আল্লাহর আরশ ছিল পানির ওপর”। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, সবকিছুর পূর্বে সর্বপ্রথম অস্তিত্বশীল পদার্থ হচ্ছে পানি [1]—
তিনিই সর্বশক্তিমান, যিনি সৃজন করিয়াছেন আসমান ও জমীনকে ছয় দিবসে আর তিনি সিংহাসনে আসীন ছিলেন যা ছিল পানির উপরে।
হাদিসেও অসংখ্যবার বলা হয়েছে, মহাবিশ্ব সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহর আরশ ছিল পানির ওপর। কিন্তু যখন মহাবিশ্বের পদার্থসমূহ তৈরি হয়নি, তখন পানি আসলো কোথা থেকে? [2]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৯৭/ তাওহীদ
পরিচ্ছেদঃ ৯৭/২২. আল্লাহর বাণীঃ তখন তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল- (সূরাহ হূদ ১১/৭)। তিনি আরশে ‘আযীমের প্রতিপালক- (সূরাহ আত্-তাওবাহ ৯/১২৯)।
৭৪২৭. আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন সব মানুষ বেহুঁশ হয়ে পড়বে। (আমার হুঁশ ফিরলে) তখন আমি মূসা (আঃ)-কে আরশের একটি পায়া ধরে দাঁড়ানো দেখতে পাব।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ)
এবারে আসুন তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে পড়ি, [3]
আস্ সুদ্দী স্বীয় তাফসীরে ইবন মাসউদ ও অন্যান্য সাহাবা (রা) হইতে পর্যায়ক্রমে মুরাহ, ইব্ন আব্বাস, আবু সালেহ ও আবূ মালিক হইতে বর্ণনা করেন- সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ্ তা’আলার আরশ পানির উপর সংস্থাপিত ছিল। পানির পূর্বে আল্লাহ্ পাক কোন বস্তুই সৃষ্টি করেন নাই। সুতরাং সৃজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সর্বপ্রথম তিনি পানি হইতে বাষ্প সৃষ্টি করিলেন। উহা ক্রমান্বয়ে ঊর্ধ্বলোকে উত্থিত হইল এবং উত্থিত বাষ্প ছাদরূপ পরিগ্রহ করিয়া আকাশে পরিণত হইল। এইজন্য উহার নাম হইল ماء )উর্ধ্বলোক)। অতঃপর পানি শুকাইয়া একটি ভূখণ্ড দেখা দিল। তখন উহাকে সপ্তখণ্ডে বিভক্ত করা হইল। রবি-সোম দুই দিনে এই সপ্তখণ্ড সৃষ্টি হইল। অতঃপর পৃথিবীকে সেই মৎসের উপর স্থাপন করা হইল যাহার বর্ণনা সূরা ‘নূন ওয়াল কলম’-এ আসিয়াছে। মৎসটি পানির উপর এবং পানির নীচে সকাত জাতীয় পদার্থ বা পরিচ্ছন্ন মৃত্তিকা শিলা বিদ্যমান। মৃত্তিকা শিলার ধারক হইলেন ফেরেশতা। ফেরেশতা দণ্ডায়মান প্রস্তরের আস্তরের উপর এবং প্রস্তরের আস্তরটি বায়ুমণ্ডলের উপর ভাসমান রহিয়াছে। লুকমান হাকীম এই প্রস্তর আস্তরের কথাই বলিয়াছেন। উহা আকাশ কিংবা পৃথিবীর কোথাও স্থাপিত নহে। মৎসটি নড়াচড়া করা মাত্র পৃথিবী কম্পিত হয় এবং ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। তাই পৃথিবীকে পাহাড় চাপা দেওয়া হইল। ফলে পৃথিবী সুস্থির হইল। পর্বত তাই পৃথিবীর কাছে নিজের বড়াই করিয়া থাকে।

সমস্যা হলো: যদি মহাবিশ্বের পদার্থগত কাঠামো এখনকার বিজ্ঞানের মতোই সত্য হয়, তাহলে “সৃষ্টির আগে পানি”—এই দাবি রসায়নের ন্যূনতম শর্ত ভেঙে দেয়। পানি তৈরি হয় না হাইড্রোজেন ছাড়া, এবং অক্সিজেন ছাড়া তো কথাই নেই। অর্থাৎ “পানি” যদি সত্যিই একটি রাসায়নিক পানি (H2O) হয়, তাহলে সেটি “সৃষ্টির আগে” থাকতে পারে না—কারণ সেটি নিজেই “সৃষ্টির পরে” গঠিত একটি অণু।
এইখানে ধর্মবিশ্বাসীদের পক্ষ থেকে সাধারণত দু’টি পাল্টা-ব্যাখ্যা সামনে আসে—(ক) পানি এখানে প্রতীকী/রূপক; অর্থাৎ পানি আসলে পানি নয় (খ) আল্লাহ চাইলে “কারণ–ফল” নিয়মের বাইরে পানি সৃষ্টি করতে পারেন। প্রথম ব্যাখ্যা (রূপক) মানলে পাঠ্যবাক্যের স্বাভাবিক অর্থকে ছেড়ে ব্যাখ্যা-নির্ভর পাঠে যেতে হয়। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা (অলৌকিকতা) মানলে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনাই কার্যত স্থগিত হয়ে যায়—কারণ তখন যে কোনো অসামঞ্জস্যকে “ব্যতিক্রম” বলে ঢেকে দেওয়া সম্ভব। ফলে যৌক্তিক প্রশ্ন হয়: কোরআন যদি এরকম জ্ঞানের দাবী করে, তাহলে সেগুলোকে বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা দিয়ে যাচাই করা যাবে না কেন? অন্য ধর্মগুলকে যেমন মুসলিমরা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান দিয়ে বা যুক্তি দিয়ে পর্যালোচনা করেন, ইসলামকেও কেন একই মাপকাঠিতে বিচার করা হবে না?
বাইবেল, রামায়ণ, মহাভারত—“জল-আদিম” থিম
লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো—“সৃষ্টির শুরুতে জল” ধারণাটি শুধু কোরআনেই নেই; বাইবেলের আদিপুস্তকেও জলরাশির উপর ঈশ্বরের আত্মা “ভেসে বেড়ানোর” বর্ণনা আছে, এবং সেখানেও জলকে পৃথক করা/জমা করা ইত্যাদি ধারণা দেখা যায়। একই রকম “সবকিছু আগে জল ছিল” ধরনের বক্তব্য রামায়ণ ও মহাভারতের বর্ণনায়ও আছে। এই মিলগুলো ইঙ্গিত করে—এটি কোনো একক “ঐশী–বিশেষ জ্ঞান” না হয়ে প্রাচীন বিশ্বের জ্ঞানের ধারাবাহিকতা থেকে উঠে আসা মতবাদ; যেখানে জলকে আদিম উপাদান হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, কারণ মানুষ নদী–বৃষ্টি–সমুদ্রের উপরেই জীবনকে টিকে থাকতে দেখেছে। সুতরাং এখানে একটি যৌক্তিক সম্ভাবনা দাঁড়ায়: ধর্মগ্রন্থগুলো “বিজ্ঞানভিত্তিক ইতিহাস” দেওয়ার চেয়ে তাদের সময়ের সাধারণ বিশ্ব-ধারণাকে ধর্মীয় ভাষায় পুনর্গঠন করেছে। আসুন দেখা যাক, কোরআনের বহু পূর্বে লিখিত বাইবেলে কী বলা আছে [4] –
আদিপুস্তক ১
১ শুরুতে, ঈশ্বর আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। প্রথমে পৃথিবী সম্পূর্ণ শূন্য ছিল; পৃথিবীতে কিছুই ছিল না।
২ অন্ধকারে আবৃত ছিল জলরাশি আর ঈশ্বরের আত্মা সেই জলরাশির উপর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিল।
৬ তারপর ঈশ্বর বললেন,“জলকে দুভাগ করবার জন্য আকাশমণ্ডলের ব্যবস্থা হোক।”
৭ তাই ঈশ্বর আকাশমণ্ডলের সৃষ্টি করে জলকে পৃথক করলেন। এক ভাগ জল আকাশমণ্ডলের উপরে আর অন্য ভাগ জল আকাশমণ্ডলের নীচে থাকল।
৯ তারপর ঈশ্বর বললেন, “আকাশের নীচের জল এক জায়গায় জমা হোক যাতে শুকনো ডাঙা দেখা যায়।” এবং তা-ই হল।
এবারে আসুন হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ রামায়ণে এই বিষয়ে কী বলা আছে সেটি পড়ে নিই [5] –
सर्वं सलिलमेवासीत्पृथिवी यत्र निर्मिता।
तत: समभवद्ब्रह्मा स्वयम्भूर्दैवतै: सह।।2.110.3।।
At the beginning, all this was water from which the earth was created. Thereafter, the selfexistent Brahma along with the gods came into existence.
প্রায় কাছাকাছি কথা বলা আছে মহাভারতেও। আসুন মহাভারতে মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে কী বলা আছে সেটিও পড়ি [6] –
প্রথমে কেবল একমাত্র সনাতন ভগবান্ ব্রহ্মা বিদ্যামান ছিলেন। অনন্তর তাঁহার মরীচি, অত্রি,অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু ও বশিষ্ঠ এই সাত অগ্নিতুল্য পুত্রের উৎপত্তি হয়।
সমগ্র বিশ্ব এক ঘোরতর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, পরমব্রহ্ম নিজ তেজে সেই অন্ধকার দূর করে জল সৃষ্টি করলেন। সেই জলে সৃষ্টির বীজ নিক্ষেপ করলে একটি অতিকায় সুবর্ণ অণ্ড বা ডিম সৃষ্টি হয়। সেই অণ্ডের মধ্যে পরমব্রহ্ম স্বয়ং প্রবেশ করেন। এরপর অণ্ড দুই ভাগে বিভক্ত হয়। এর একভাগ দ্বারা আকাশ ও অপর ভাগ দ্বারা ভূমণ্ডল তৈরি হয়। এরপর ব্রহ্মা মন থেকে দশজন প্রজাপতি সৃষ্টি করেন। এই প্রজাপতিরাই মানবজাতির আদিপিতা। এই দশজন প্রজাপতি হলেন- অঙ্গিরা, অত্রি, ক্রতু, দক্ষ, নারদ,পুলস্ত্য, পুলহ, বশিষ্ঠ, ভৃগু ও মরীচি। ব্রহ্মার আদেশে এঁরা বিভিন্ন প্রাণী সৃষ্টি করলেন। বাকি একজন অর্থাৎ নারদকে সৃষ্টি রক্ষার ভার দিলেন। কিন্তু ব্রহ্ম-সাধনায় বিঘ্ন হবে বলে নারদ সে ভার গ্রহণ করলেন না। এই কারণে ব্রহ্মা তাঁকে মানুষ ও গন্ধর্বরূপে জন্মগ্রহণ করার অভিশাপ দিলেন।
থেলিসের “সবকিছুর মূল পানি” মতবাদের প্রভাব
প্রাচীন গ্রীক দর্শনে মাইলেটাসের থেলিস (Thales)–এর একটি বিখ্যাত ধারণা ছিল: সবকিছুর আদিমতম উপাদান পানি। [7]। থেলিসকে প্রায়শই “প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা” (naturalistic explanation) দেওয়ার প্রথমদিককার চিন্তকদের মধ্যে ধরা হয়—তিনি কোন দেবতা কিংবা পয়গম্বর ছিলেন না, তিনি একটি পদার্থকে (পানি) মূল উপাদান ভাবতে চেয়েছিলেন।
কোরআন/বাইবেল/হিন্দুগ্রন্থের বক্তব্য যে সরাসরি থেলিস থেকে “কপি”—এটি খুব জোর দিয়ে বলার মত প্রমাণ আমাদের কাছে নেই, তবে এটুকু বলা যুক্তিসঙ্গত যে, জলকে আদিম উপাদান ভাবার ধারা প্রাচীন বিশ্বে ব্যাপক ছিল—দর্শন, ধর্ম, লোক-আখ্যান—সবখানেই। তাই ধর্মগ্রন্থে জল-আদিম থিম থাকা “ঐশী বৈজ্ঞানিক তথ্য” না হয়ে মানবসভ্যতার প্রচলিত কল্পনার ধারার হওয়াই বেশি যুক্তিসঙ্গত।

আরেক দাবিঃ “প্রথম সৃষ্টি কলম”
ইসলামের আরেকটি ভিন্ন ধারার বর্ণনায় বলা হয়, আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন এবং কলমকে তাকদীর লিখতে বলেছেন।কিন্তু কলম তো মানুষের মানবীয় একটি আবিষ্কার। মহাবিশ্বের সর্বপ্রথম সৃষ্ট বস্তু হচ্ছে কলম, এই বক্তব্যটি কোনভাবেই কোন চিন্তাশীল মানুষের ধারনা হতে পারে না [8] –
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৭. তাকদীর সম্পর্কে
৪৭০০। আবূ হাফসাহ (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা উবাদাহ ইবনুস সামিত (রাঃ) তার ছেলেকে বললেন, হে আমার প্রিয় পুত্র! তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত ঈমানের স্বাদ পাবে না যতক্ষণ না তুমি জানতে পারবে ’’যা তোমার উপর ঘটেছে তা ভুলেও এড়িয়ে যাওয়ার ছিলো না। পক্ষান্তরে, যা এড়িয়ে গেছে তা তোমার উপর ভুলেও ঘটবার ছিলো না।
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম যে বস্তু সৃষ্টি করেছেন তা হচ্ছে কলম। অতঃপর তিনি তাকে বললেন, লিখো! কলম বললো, হে রব! কি লিখবো? তিনি বললেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক বস্তুর তাকদীর লিখো। হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি এরূপ বিশ্বাস ছাড়া মারা যায় সে আমার (উম্মাতের) নয়।[1]
সহীহ।
[1]. তিরমিযী, আহমাদ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই বর্ণনাকে আক্ষরিকভাবে নিলে কয়েকটি যুক্তিগত প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে:
- কলম কি সচেতন সত্তা? হাদিসের ভাষ্যে কলম “বলে”—এটি কি রূপক, না বাস্তব কথোপকথন?
- কলম কীভাবে “সব ভবিষ্যৎ” লিখবে? যদি আল্লাহ ধারা-বিবরণী না দেন, কলম জানবে কীভাবে? আর যদি আল্লাহ ধারা-বিবরণী দেন, তবে কলম কার্যত “রেকর্ডার”—নিজস্ব জ্ঞানধারী নয়।
- লেখার মাধ্যম কোথায়? কাগজ/ফলক/কালি—এসব “সৃষ্টির আগে” কীভাবে থাকবে? এখানে আবার অলৌকিক ব্যতিক্রমের আশ্রয় নিতে হয়।
এখানে সাধারণ ইসলামি ব্যাখ্যা হলো: “কলম” হলো তাকদীরের প্রতীকী/গায়েবি রেকর্ডিং ব্যবস্থা, এটি আমাদের জাগতিক কলমের মতো নয়। কিন্তু এই ব্যাখ্যা মানলে আবারও একই সমস্যা ফিরে আসে—বর্ণনাটি তখন যাচাইযোগ্য “পদার্থ–উৎপত্তি” বক্তব্য থাকে না; এটি হয়ে যায় ডগমাটিক মেটাফিজিক্স। অর্থাৎ “প্রথম সৃষ্টি” প্রশ্নের বিজ্ঞানভিত্তিক জবাব এখানে পাওয়া যায় না—পাওয়া যায় কেবল বিশ্বাসভিত্তিক ব্যাখ্যা।
উপসংহার
এই প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণটি সহজ: আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী আদিম মহাবিশ্বে প্রধানত হাইড্রোজেন–হিলিয়াম তৈরি হয়; পানি একটি পরবর্তী পর্যায়ের অণু, যা হাইড্রোজেন–অক্সিজেন ছাড়া সম্ভব নয়। ফলে “সৃষ্টির আগে পানি” যদি আক্ষরিক রাসায়নিক পানি হিসেবে ধরা হয়, তাহলে সেটি রসায়ন–কসমোলজির মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে “প্রথম সৃষ্টি কলম” ধরনের আখ্যান আক্ষরিকভাবে নিলে সচেতনতা, গায়েবজ্ঞান, লেখার মাধ্যম—এইসব প্রশ্ন উঠেই যায়; আর রূপক/অলৌকিক ব্যাখ্যা নিলে তা বিজ্ঞান-সামঞ্জস্যের আলোচনাকে কার্যত এড়িয়ে যায়।
তাই যুক্তিভিত্তিক অবস্থান থেকে বলা যায়: “প্রথম সৃষ্টি” নিয়ে ইসলামী (এবং অনেক প্রাচীন ধর্মীয়) বর্ণনা বেশি করে প্রাচীন কসমোগনি হিসেবে পাঠযোগ্য—বিজ্ঞানভিত্তিক উৎপত্তি-বিবরণ হিসেবে নয়। পাঠক যদি ধর্মকে নৈতিক/আধ্যাত্মিক নির্দেশনা হিসেবে দেখেন, এতে তার ধর্মীয় পাঠ অক্ষুণ্ণ থাকতে পারে। কিন্তু ধর্মগ্রন্থকে যদি ভৌত জগতের উৎপত্তি সম্পর্কে নির্ভুল তথ্যভান্ডার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন “পানি-আদিম” ও “কলম-আদিম” ধরনের দাবি যুক্তি ও বিজ্ঞানের মানদণ্ডে গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়ে।
তথ্যসূত্রঃ
- সূরা হুদ, আয়াত ৭ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৭৪২৭ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, প্রথম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৩৬৯ ↩︎
- বাইবেল, আদিপুস্তক ১ ↩︎
- Script: Devanagari, Kanda:AYODHYAKANDA, Sarga:110, Sloka:3 ↩︎
- মহাভারত, শান্তিপপর্ব, অষ্টাধিকদ্বিশততম অধ্যায়, প্রজাপতি বিবরণ-সৃষ্টিবিস্তার ↩︎
- মো. আবদুল হালিম (মে ২০০৩)। দার্শনিক প্রবন্ধাবলি: তত্ত্ব ও বিশ্লেষণ। বাংলা একাডেমি ↩︎
- সুনান আবু দাউদ(তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৭০০ ↩︎
